লেবেল

গল্প ( ৪০০ শব্দে) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প ( ৪০০ শব্দে) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৩ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —১২ ঝড় —অজিত দেবনাথ।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।




          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

  বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —১২




ঝড়

অজিত দেবনাথ


রাস্তার ধারে বসন্ত প্রামাণিকের সেই পুরনো সেলুন যেন শহরের এক প্রান্তে নির্জনে পড়ে থাকা অস্পষ্ট পথবাতি। আলো আছে, কিন্তু দৃষ্টির স্বচ্ছতা নেই। ছোট্ট এক খুপরি, সামনের দিকে ঝুঁকে-পড়া টিনের ছাউনি, আর দেয়ালে কয়েকজন অভিনেতার অস্পষ্ট  ছবি— দেব, অমিতাভ বচ্চন, আর এক পাশে রজনীকান্ত। ফিকে হয়ে যাওয়া পোস্টারগুলোর মধ্যেও  ছিল এক অদ্ভুত আভিজাত্য, যেন তারা বসন্তের কাঁচির কারুকার্যকে নীরবে অভিনন্দন জানায়।

উপরে হাতে আঁকা সাইনবোর্ডে লেখা, “মডার্ন হেয়ার ড্রেসার”। যদিও তাতে আধুনিকতার চেয়ে বেশি ছিল স্মৃতি ও ভালোবাসার নিবিড় ছোঁয়া । এই দোকানটাই ছিল বসন্তের একমাত্র ভরসা।এর থেকে যা উপার্জন হতো তাই দিয়ে সে কোনোরকমে সংসার চালাত।

স্ত্রী স্নিগ্ধা চলে যাওয়ার পর, একমাত্র ছেলে শৌনককে বড় করে তোলার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল।  একটা পুরোনো আয়না,  ধারালো কাঁচি, আর একটা ছোট পিঁড়ি—এই ছিল তার একমাত্র সম্বল।

প্রতিদিন গড়ে দশজন খদ্দের। আর বসন্তের  মুখে ছিল সেই ঢেউ-খেলানো হাসি,

“কেমন ছাঁট দেবো, বাবু? আধুনিক না ক্লাসিক?”

এই সহজ প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতো তার অনাবিল আত্মপ্রত্যয় ।

কিন্তু শহরের পরিবর্তন কেবল দালানকোঠায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের জীবনকে অনেক সময় নিঃশেষিত করে দেয়।

সেলুনের পেছনে হঠাৎ একদিন মাপজোক শুরু হল। তারপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আকাশছোঁয়া আবাসন। কাঁচের দেয়াল, নিরাপত্তারক্ষী, এসি গাড়ি আর আধুনিকতার অদৃশ্য দেয়াল। বসন্তের কাঠের দোকানটি তাদের চোখে হয়ে উঠল “অবাঞ্ছিত দৃশ্যদূষণ”।

কিছুদিনের মধ্যেই মিউনিসিপ্যালিটির গাড়ি এল, ঘোষণা করল, “অবৈধ নির্মাণ, ভেঙে ফেলতে হবে।” 

পঁচিশ বছরের আত্মনির্মিত ঘরটা আচমকাই আইনবিরুদ্ধ হয়ে উঠল। কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই । শুধু আদেশ, “ভেঙে ফেলো”।

দোকান ভাঙার দিন বসন্ত চোখের জল ফেলেনি। কেবল মেঝের উপর পড়ে থাকা চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। তারপর নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো।আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল। তিন চার দিন পর ফুটপাতে একটা ত্রিপল টানিয়ে, চারদিকে ইট সাজিয়ে, একটা ছোট আয়না ঝুলিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করল।

এইবার সমস্ত আকাশটাই যেন তার মাথার উপর এসে দাঁড়ালো। নীল আকাশ। নড়বড়ে চেয়ার। কুচিকুচি পাথর, পিঁড়ির নিচে ইট।

তবুও, হাতে কাঁচি ধরলে সে যেন নিজের ছন্দে ফিরে আসে।

তারপর ঘনিয়ে এল সেই অভিশপ্ত সন্ধ্যা যা এক লহমায় জীবনকে পথে বসিয়ে দিল।

 নিমেষে চারদিক কালো হয়ে এল। ঝড় আসার পূর্বসন্ধ্যার হাওয়া যেন থরথর করে  কাঁপতে লাগল। বসন্ত তখনও এক বৃদ্ধ খদ্দেরের মাথা ছাঁটছিল। প্রথমে উড়ে গেল তার ছাতা, তারপর হঠাৎ এক প্রবল ঝাপটা—ত্রিপল ছিঁড়ে উড়ে গেল গাছের ডালে, আয়নাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল , পিঁড়িটা ছিটকে পড়ল পাশের ড্রেনের জলে।

ঝড় থামলে শহর আবার ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে ফিরে আসে। কিন্তু বসন্ত ফিরতে পারে না। সে নির্বিকার ভাবে বসে থাকে। বসে থাকে ভাঙা আয়নার সামনে, কিন্তু নিজের মুখে কোনো প্রতিবিম্ব খুঁজে পায় না।সারারাত এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ছেলে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল,

“চলো বাবা, কিছু নতুন করি। একটা ছোট্ট খাবারের দোকান, ঠেলাগাড়ির উপর।এইভাবে আর নয়।”

বসন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ছেলের চোখের দিকে মাথা তুলে তাকাল।

সেই চোখে ছিল আলোর শিখা, যায় স্পর্শে পুরোনো বসন্ত প্রামাণিক আবার একবার জেগে ওঠে।

হ্যাঁ, একটা ঝড় সবকিছু ভেঙে দিতে পারে। সে উপলব্ধি করল, যেখানে চুল কাটা হয়, সেখানেই আবার নতুন চুল গজায়। জীবনও কখনো কখনো যেন নতুন করে গড়ে ওঠে। আবার চলতে শুরু করে। এবার না হয় ঠেলাগাড়ির উপরেই জীবনটা শুরু হোক।

বৃহস্পতিবার, ১২ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —১১ রবীন্দ্রনাথ —অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।




          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

  বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —১১





 রবীন্দ্রনাথ

অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়


অধ্যাপক মহাশয় কথাচ্ছলে ছাত্রদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন আমাদের জীবনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যে কতটা প্রাসঙ্গিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না । তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে আকারে ইঙ্গিতে অনেক অজানা তথ্য পরিবেশন করে গিয়েছেন কিন্তু প্রকৃত পর্যালোচনার অভাবে সেগুলো এখনো অনাবিস্কৃতই হয়ে আছে । এই দুর্ভাগা দেশে তাঁকে কেউই চিনলো না । উত্তর প্রদেশে স্কুল পাঠ্য পুস্তক থেকে তাঁকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে । অথচ কীমাশ্চর্যম্ তিনি যদি এ্যামেরিকা বা ইউরোপের কোন শহরে জন্মগ্রহণ করতেন তাহলে তাঁর জনপ্রিয়তায় কোন খামতি থাকতো না । এই দেশে ক’জন রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে চর্চা করেন বা রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনেন বলতে পারো ? 

         কিন্তু যে যাই বলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে অপার বিস্ময় এই কথা একবাক্যে স্বীকার করতেই হবে ! একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি অর্থাৎ তিনি এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক আমাদের জীবনে -- বাংলা ও বিহার রাজ্য দুটোকে একই মায়ের দুই মেয়ে বলা যায় কারণ ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলার অন্তর্গত ছিল বিহার প্রদেশ । ছট পুজো উপলক্ষে বিহারে থাকে দুই আর বাংলায় থাকে তিন দিন ছুটি । কেন জান ? তোমরা রবীন্দ্রনাথ রচিত “দেবতার গ্রাস” কবিতাটি স্মরণ করো । উত্তর পেয়ে যাবে । রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন – “সে থাকিবে সুখে মার চেয়ে আপনার মাসিমার বুকে” । বলা বাহুল্য বিহার প্রদেশের মানুষরা বিহারের চেয়ে বাংলায় বেশি সুখী । তাঁরা বাঙালিদের চলন্ত লোকাল ট্রেন থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়ার অধিকার রাখেন । তাঁরা বাংলায় স্নেহময়ী মাসির আদরে পরম নির্বিঘ্নে কালাতিপাত করছেন । আর সুযোগ পেলেই বড়বাজারে গণধোলাই দিচ্ছেন বঙ্গ সন্তানদের অথচ কোন প্রতিবাদ নেই । পশ্চিমবঙ্গবাসী বাঙালিরা কেবল কবিতা আর লিটিল ম্যাগাজিনের জন্ম দিতেই ব্যস্ত । 

সোমবার, ৯ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —১০ বিবর্ণ — মানস মুখোপাধ্যায়।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

     



          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

  বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —১০





বিবর্ণ

মানস মুখোপাধ্যায় 


 

হঠাৎ-ই অয়নের ঘুমটা ভেঙে গেলো।ভাঙবেই বা না কেন! গতকাল রাতে শোবার আগে থেকেই মাথায় ঘুরছিল তার আর শ্রাবণীর বিয়ের দশ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ইচ্ছে ছিল কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব নিমন্ত্রণ করে একটু লুচি আর কষা মাংস খাওয়াবে। কিন্তু সাহসে কুলোয় নি শ্রাবণীকে এ কথা বলতে।পাছে গল্প গুজব করতে করতে কেউ যদি তার সামনে আবার সেই কথাগুলো পেরে ফেলে। শ্রাবণীর আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে ফেলে সেই ভয়েই। এমনিতেই তার বন্ধ্যাত্ব নিয়ে আত্মীয় স্বজনেরা কানাঘুষো করে।

অয়ন অবশ্য কোনদিনই হাত পা গুটিয়ে বসে থাকে নি। অনেক ডাক্তার কবিরাজ করেছিল কিছুতেই কিছু হয় নি। শেষমেষ কোলকাতার এক নামি গাইনো স্পেশালিস্টও দেখিয়েছিল।নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তিনি জানিয়েছিলেন শ্রাবণী কোনদিনই নিজে গর্ভধারণ করতে পারবেনা।এরপর থেকেই শ্রাবণীর মুখ থেকে উচ্ছ্বল হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। পরিবর্তে এলো খিটখিটে আর ছুঁচিবাই স্বভাব।

ডাক্তার অবশ্য একটা বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলেছিল। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে সারোগেট মাদার মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার কথা। কিন্তু তাতে শ্রাবণীর মত ছিল না।নিজেই যখন গর্ভধারণ করতে পারবেনা তখন কারুর নির্ভরতায় সন্তান নিতে রাজি নয়। বুকে একটা চাপা কষ্ট যন্ত্রণা বয়ে নিয়ে অয়ন আর কোনদিন ইশ্রাবণীর সামনে এবিষয় উত্থাপন করে নি।

       পুবের খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে অয়ন

দেখলো দিনটা ক্রমশঃ ফুটে উঠছে একটু একটু করে। সবেমাত্র শীত গেছে। বসন্ত এলেও ঠান্ডাটা পুরোপুরি চলে যায় নি। মোবাইলটা বেজে উঠল।বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে মোবাইলটার দিকে হাত বাড়ালো। এতো ভোরে কার ফোন!দেখলো বন্ধু মৃন্ময়ের ফোন। হ্যালো -বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো -অয়ন মেয়ে হয়েছে। অয়নের বুঝতে বাকি রইল না --ওদেরও দীর্ঘদিন বিয়ে হয়েছে প্রায় সাত আট বছর।এতো ভোরে কার ফোন!দেখলো বন্ধু মৃন্ময়ের ফোন। হ্যালো -বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো -অয়ন মেয়ে হয়েছে। অয়নের বুঝতে বাকি রইল না --ওদেরও দীর্ঘদিন বিয়ে হয়েছে প্রায় সাত আট বছর কোনো বাচ্চা কাচ্চা হয় নি। মৃন্ময় একটা সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। শুনেছিল মৃন্ময় আর দীপালি সারোগেট মাদার মাধ্যমে বাচ্চা নিতে চলেছে।খুশির খবর।কিন্তু কাকে জানাবে!শ্রাবণীকে? সাহসে কুলালো না। শ্রাবণীকে জাগিয়ে খবরটা দেওয়া ঠিক হবে না।শ্রাবণীকে জানানো মানে তার দুঃখবোধ আরো বাড়িয়ে তোলা। খুব খুশি হয়েছি জানাতেই অয়ন বুঝলো ওপাশ থেকে মৃন্ময় লাইনটা কেটে দিয়েছে। একটা গভীর শ্বাস ফেলে মোবাইলটা রেখে দিলো। আবার খোলা জানালার দিকে অয়ন তাকিয়ে দেখল আকাশ কেমন যেন রঙিন হয়ে উঠেছে।এসময় চারিদিক কেমন যেন সুন্দর হয়ে উঠছে। অয়নের কেন যেন মনে হচ্ছে এ সুন্দর তার জীবনের জন্য নয়।এ রঙিন আভা কোনদিনই তার মনে রাঙিয়ে দিতে পারবে না।পেটের ভিতর থেকে একটা যন্ত্রণা উঠে এসে অয়নের গলা যেন চেপে ধরছে। অয়নের চোখছলছল করে উঠলো। হাল্কা বেড কভারটা গায়ে চাপিয়ে অয়ন আবার শুয়ে পড়লো।


রবিবার, ৮ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৯ অসুরনাশিনী — দীনেশ সরকার।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।




          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

      বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৯






অসুরনাশিনী

দীনেশ সরকার

 

 

          ‘দে টাকা দে‘ বলে টলতে টলতে বদন জবার হাত চেপে ধরে।

          ‘না, দেব না, একটা টাকাও তোমায় দেব না।‘ জবা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে।

          ‘ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আজ শনিবার হপ্তা পেয়েছিস। ভালোয় ভালোয় টাকা বার কর।‘

         ‘বললাম না, একটা টাকাও তোমায় দেব না। তোমার লজ্জা করে না বউএর কামাইয়ের টাকায় মদ গিলতে।‘

          ‘না করে না। বেশী ফ্যাচ ফ্যাচ না করে তুই টাকা বার কর।‘

          ‘বললাম তো মদ গেলার জন্য একটা টাকাও তোমায় দেব না।‘ 

          ‘দিবি না! দেখি তুই দিস্‌ কিনা!’ বদন জবার হাত ছেড়ে দিয়ে জবার চুলের মুঠি ধরে হ্যাচকা টানে নিজের দিকে টেনে এনে শাড়ির আঁচলের খুঁট খোলার চেষ্টা করে। খুঁট খুলে দেখে আঁচলের খুঁটে দুটো লজেন্স বাঁধা। লজেন্স দুটো ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আরও জোরে চুলের মুঠি ঝাঁকিয়ে বলে,

           ‘টাকা কোথায় রেখেছিস্‌ বল। শিগগির বার কর।‘

           ‘আজ হপ্তা হয় নি।‘

          ‘আজ শনিবার, হপ্তা হয় নি বললেই আমি বিশ্বাস করবো ভেবেছিস। তুই ভালোয় ভালোয় টাকা দিবি কিনা বল।‘

            ‘না, একটা টাকাও তোমায় দেব না।‘  

           ‘দিবি না! দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা!’ বদন টলতে টলতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়। বদন আগে একটা ভ্যানরিক্সা চালাত। যা উপায় করত তার বেশীরভাগটাই মদের ঠেকে দিত। জবা সংসারের জন্য টাকা চাইলে হ’ত অশান্তি। জুটতো চড় থাপ্পড়। ছোট ছোট দুটো ছেলেমেয়ের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য জবা এক কন্ট্রাকটরকে ধরে রাজমিস্ত্রীর যোগাড়ের কাজ জুটিয়ে নেয়। তাতে বদন আরও পেয়ে বসে। যখন তখন মদ খাওয়ার টাকার জন্য জবার ওপর হুজ্জুতি করে। মারধর করে।

            বাবামায়ের ঝগড়া দেখে ছেলেমেয়েদুটো ভয়ে ঘরের এককোণায় সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জবা লজেন্সদুটো মেঝে থেকে তুলে ছেলেমেয়েদুটোর হাতে দিয়ে ওদেরকে আদর করে।    

            বদন বাইরে থেকে একটা গাছের ডাল ভেঙে এনে জবার পিঠে সাপাসপ কয়েক ঘা বসিয়ে দেয়। বলে, ‘টাকা বার কর্‌! বার কর টাকা!’

            বাচ্চাদুটো ভয়ে কান্না জুড়ে দেয়। জবার সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায়। জবা উঠে দাঁড়িয়ে বদনকে এক ধাক্কা দিতেই বদন ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। আসলে চোলাই মদ খেয়ে খেয়ে বদনের শরীরে শক্তি বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই সামান্য ধাক্কাও সহ্য করতে পারে না। জবার চোখ দিয়ে আগুন বের হয়। বদনের হাত থেকে গাছের ডালটা কেড়ে নিয়ে জবা সপাসপ কয়েক ঘা কষিয়ে দেয় বদনকে। বদন চিৎকার করে ওঠে, ‘বাবা গো, মেরে ফেললে গো।‘

          রণচন্ডী রূপ ধরে জবা বলে ,’খুব বউ পেটানোর শখ হয়েছে, না! তোমার বউ পেটানোর শখ আমি ঘুঁচিয়ে দেব। সপাসপ আরও কয়েকঘা কষিয়ে দেয় জবা।

          ‘আর মারিস্‌ নে জবা। আমি মরে যাব।‘

          ‘মরলে তো আমি বাঁচি। আমার হাড় জুড়োয়।‘ জবা ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। 

          ‘তুই তোর বরের মরণ চাইছিস্‌ জবা।‘

         ‘বর! যে বর তার বউ-বাচ্চাদের খাওয়াতে-পরাতে পারে না, তেমন বর থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। ভ্যান রিক্সাটা কি করেছ?’

          ‘বেচে দিয়েছি।‘

          ‘টাকা কি করেছ?’

          ‘মদ খেয়েছি।‘

         ‘ভ্যান রিক্সা বেচে মদ খাওয়া!’ জবা আরও কয়েক ঘা কষিয়ে দেয়। ‘তোমার মদ খাওয়া আমি ঘুঁচিয়ে দেব।‘

         ‘ও বাবা গো! মরে গেলাম গো!’

         ‘কান খুলে শুনে রাখ। সকালে উঠে মজুর খাটতে কাজে যাবে। যদি মদের ঠেকের দিকে ঠ্যাং বাড়িয়েছ তো তোমার ঠ্যাংদুটো আমি ভেঙে দেব। এমনিতে তো তোমাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াচ্ছি। তখন ঠ্যাং ভেঙে ঘরে ফেলে রেখে খাওয়াব। আর যদি কোনদিন আমার গায়ে হাত তুলেছ, তোমার হাতদুটোও আমি ভেঙে দেব। আমরা মায়ের জাত, আমরা সব কিছু সহ্য করতে পারি, আবার প্রয়োজনে মাদুর্গার মতো অসুরনাশিনীও  হতে পারি। ভাত রান্না করা আছে, বেড়ে খেয়ে শূয়ে পড়।

           চিৎকার চেঁচামেচি আর বাচ্চাদুটোর কান্না শুনে আশপাশের ঝুপড়ি থেকে বউরা এসে জবার ঘরের সামনে ভিড় জমায়। টিয়া, লক্ষ্মী বলে ওঠে, ‘তুই ঠিক করেছিস্‌ জবা। তুই আমাদের পথ দেখালি জবা। আমরাও আর সোয়ামিদেরহাতে মার খাব না। আমরাও রুখে দাঁড়াব। আমরাও অসুরনাশিনী হব।‘

           জবা বাচ্চাদুটোকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

শনিবার, ৭ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৮ আত্মোপলব্ধি —জয়শ্রী সরকার।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

      বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৮




আত্মোপলব্ধি

জয়শ্রী সরকার

সুজয়ের টাই ঠিক করতে করতে অন্বেষা বললো, 'অফিস থেকে ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথের 'শেষের কবিতা' উপন্যাসটা এনো তো '। 'পেলে অবশ্যই আনবো' বলে দ্রুত বেরিয়ে গেল সুজয়।

রবিবার এলেই সকাল আটটার সময় সুজয় আর অন্বেষা উন্মুখ হয়ে বসে প্রিয় রেডিওটার সামনে। শুরু হয় 'শিশুমহল'। সঞ্চালিকার মিষ্টি কন্ঠের সঞ্চালনা আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আধো আধো স্বরে আবৃত্তি আর গানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা অনুষ্ঠান। এরই মধ্যে ব্রেকফাস্টটা সেরে নেয় ওরা। অদ্ভুত এক আকর্ষণে আবিষ্ট হয়ে ওঠে ওদের মন। ছোট্ট ভবনটা যেন এক আলোকিত ভুবন হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠান শেষে এক বুক অক্সিজেন নিয়ে ওরা বাস্তবে ফেরে। বুকের থেকে অসহনীয় জগদ্দল পাথরটা যেন একটু একটু করে সরে যায়। এ এক অন্য আবেশ। অন্য অনুভূতি ! না পাওয়ার যন্ত্রণাটা কিছু সময়ের জন্য হলেও লাঘব হয়। 
অন্বেষা একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াতো। নিঃসন্তান হওয়ার কারণে সহকর্মীদের নানান টিকাটিপ্পনী শুনতে শুনতে ক্লান্ত অন্বেষা শেষমেশ চাকরিটাই ছেড়ে দিয়েছে। আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ওর মাতৃসত্তা।

সুজয় বেরিয়ে যাওয়ার পর নিঃসন্তান অন্বেষা নিজেকে নিয়ে বসলো। অনেক কাটাছেঁড়া করলো নিজেকে। যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ। এ এক অন্য অন্বেষা। একেবারেই নিরপেক্ষ। সুগভীর ভাবনায় ডুব দিল অন্বেষা। 'এতদিন নিজের কথাই ভেবেছি। পরস্পরকে ভালোবেসে আমাদের বিয়ে। সুজয় কেন ওর অক্ষমতাকে স্বীকার করে না ---- একবারও ভেবেছি? সুজয়ের যন্ত্রণা এমনিতেই কুরে কুরে খাচ্ছে ওকে। সেখানে আমিও যদি ------- । কথায় কথায় নারীনির্যাতন নিয়ে সোচ্চার হই আমরা। কিন্তু পুরুষের যন্ত্রণা, তার অন্তর্দহন কোনোদিন হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছি কী? পুরুষের ঘাম দেখলেও অশ্রু দেখতে পাই কী?' মায়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেল অন্বেষার -----'দ্যাখ্ অনু, দাম্পত্যসুখের চাবিকাঠিই হলো আন্ডারস্ট্যান্ডিং, অ্যাডজাস্টমেন্ট আর স্যাক্রিফাইস ! তুই তো তবু চাকরি ছেড়ে দিয়ে রেহাই পেয়েছিস । কিন্তু সুজয়? ওকেও তো একই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে । তবু , চাকরিটা ওকে করতেই হচ্ছে । একটু ওর  দিকটাও ভাবিস । নিজেকে আত্মবিশ্লেষণের এ্যানাটমি টেবিলে বসিয়ে ডিসেকশন করছে অন্বেষা। আমূল পরিবর্তন এল অন্বেষার মধ্যে। এও কী সম্ভব !

সেদিন সন্ধ্যে থেকেই প্রচন্ড ঝড়, সেইসঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। অন্বেষার অন্তর্দেশেও চলছে  তুমুল তোলপাড়। প্রশ্নের পর প্রশ্নে বিদ্ধ করছে নিজেকেই। দু'চোখে বাঁধভাঙা বৃষ্টি। একসময় শান্ত হলো আকাশ। ঝড়ও গেল থেমে। অন্বেষা আকুল হয়ে অপেক্ষা করছে সুজয়ের জন্য। অবশেষে, সুজয় এলো। একেবারেই কাকভেজা। 'শেষের কবিতা' কিন্তু অক্ষত। টাওয়েল নিয়ে অন্বেষা ছুটে এলো। অফিস ব্যাগ থেকে বইটা বের করে অন্বেষার হাতে দিল। খুশিতে আত্মহারা অন্বেষা। রাত্রে একান্তে সুজয়কে বললো, 'অনাথ শিশুদের জন্য একটা আশ্রম গড়তে চাই, তুমি পাশে থাকবে তো?' 
দুই বাহু দিয়ে সুজয় ওর প্রশস্ত বুকে অন্বেষাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিল !

শুক্রবার, ৬ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৭ এই তো সেদিন — সোমা চক্রবর্তী।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

      বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৭



এই তো সেদিন 

সোমা চক্রবর্তী 

হাঁটু পর্যন্ত জল ঠেলে বাবলা, বাঁধের রাস্তায় উঠলো পল্টু,সুজয়, আর অংশুর সাথে। কদিন ধরেই প্রচন্ড বৃষ্টি, সাথে ঝোড়ো হাওয়া। চার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু বড়ো দের সাথে তাল মিলিয়ে বালির বাঁধ  তৈরী আর মেরামতে লেগেছে। ওরা সব কাজে আছে এই চার জন। গ্রামের আপদে বিপদে, ছুটে যায় এই চার মূর্তি।
মাইকিং চলছে পরশু থেকে, গ্রাম ফাঁকা করে সেই কলেজ বাড়ি তে সবাই আশ্রয় নিয়েছে।
ভাঙবে ভাঙবে এই বাঁধ, প্রতিবছর ই এই অবস্থা হয়, এ যেনো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

নদী আসে রাক্ষসী হয়ে তার খিদে নিয়ে, গিলে খায়, পেট ভরে খেয়ে চলে যায়, তখন আবার ভিটে য় ফেরা। গরীবের যা কিছু সম্বল সেই নিয়ে ছোটে রিলিফ ক্যাম্পে।

আজ রাতেই আসবে রাক্ষসী টা, মাইকে বলে যাচ্ছে সমানে। ঘূর্ণি ঝড় নিয়ে নাচতে নাচতে আসবে সে। পল্টু বলে বাবলা, একবার ঘর পানে চ ক্যানে। কেনো? দেখি কেউ আছে কিনা? গতবারের হাবুর পিসি টার কথা তো কারো মনে ছেলনে।
চার বন্ধু ঝমঝম করে পড়া বৃষ্টির সাথে ঘরে ঘরে ঢুকে তল্লাশি নেই। ঘর বলতে ওই ত্রিপলের ছাউনি, দরমার বেড়া। খেটে খাওয়া গরীবের রাজপ্রাসাদ।
সুজয় বলে পাগলী টাকে কিন্তু দেখিনি, চল যাই দেখি তো আছে কিনা।
হ্যাঁ!সে পাগলী বসে আছে ওই শিব মন্দিরেই। ভাঙা জীর্ণ মন্দির থেকে তাকে বের করে নিয়ে আসা কি সমস্যা। আয়লার ঝড়ে তার সব চলে যায়, ভরা সংসার, স্বামী, সন্তান হারিয়ে তার মাথা টাই খারাপ।
এদিকে বাতাসের দাপট, শো শো আওয়াজ, নদীর জল এগিয়ে আসছে,  কি তার গর্জন!বীভৎস তার রূপ। চার বন্ধু তে টেনে হিচড়ে নিয়ে চলে আধ বুড়ি পাগলিটাকে।
পাগলী শুধু হাসে আর বলে আসছে ওই আসছে, এবারে গিলে খাবে। বৃষ্টি আরো আরো জোরে পড়া শুরু করে। পাঁজা কোলা করে তাকে তুলে, পল্টু, সুজয়, বাবলা,অংশু জল ঠেলে পা চালায় রিলিফ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
যেমন করেই হোক পৌঁছতে হবে, সামনে বিপদ ওত পেতে আছে।

বৃহস্পতিবার, ৫ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৬ ইলিশ — অজিত বাইরী।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

      বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৬



ইলিশ   

অজিত বাইরী



পুটি প্রাণ ভরে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ নিচ্ছে। পাশের বাড়িতে ভাজা হচ্ছে । তার জিভে জল এল। তাদের বাড়িতে একদিনও ইলিশ মাছ ওঠেনি। ইলিশ মাছ ভাজা আর মাছের তেল মেখে ভাত খাবার তার বড় শখ।

সক্কালবেলাই মাছওয়ালা হেঁকে যাচ্ছিল--পদ্মার ইলিশ, বাংলাদেশের ইলিশ। পাশের বাড়ির সামনে ঝাঁকা নামিয়েছিল। রুপোর মতো মাছগুলো! কী সুন্দর দেখতে! তার মধ্যে থেকে বেছে ওরা একটা কিনলো। এক কেজির মতো। পাঁচ-সাত'শ ওজনেরও ছিল।

মাছওয়ালা বলছিল, এক কেজি ওজনের মাছ হাজার-বারো'শ।আর পাঁচ'শ ওজনের মাছ সাত-আট'শ টাকা। ওরা কিনলো। হাজারের নিচে কিছুতেই দিলো না। ও-বাড়ির গিন্নি খুশি-খুশি মনে মাছটা নিয়ে ভেতরে গেল। পুটি অনেকক্ষণ রাস্তার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। মা ডাকতে সে বিরস মনে ঘরে ঢুকলো। মনে মনে ভাবলো, বাবার কাছে যখন সে দুপুরবেলা খেতে বসবে, বাবাকে ইলিশ কেনার কথা বলবে।

পুটির বাবা কাজ থেকে ফিরলো দুপুরবেলা। তার দিন-মজুরির কাজ। রোজ দু'শ টাকা। সব দিন কাজ মোটেও না। দুপুরে একসঙ্গে খেতে বসলো বাবা মেয়ে। দু'এক গ্রাস মুখে তুলেছে, এমন সময়  পুটি কথাটা পাড়লো, বাবা, আমাদের একদিন ইলিশ মাছ কিনবে?

মুখের কাছে হাত তুলে থমকে গেল তার বাবা। মেয়ে এমন আব্দার কখনও করেনি। আজই করলো। কিন্তু  মেয়ের মুখের উপর না বলতে পারলো না। আশ্বস্ত করে বললো, ঠিক আছে, একদিন কিনবো'খন।

না কিনলেও পুটির বাবা জানে, মাছের দাম। খুব ছোট হলেও পাঁচ-সাত'শ-র নিচে নয়। তার আড়াই তিন রোজের মজুরি। ইলিশ মাছ কেনার সাধ্য কোথায়?

দিনের-পর-দিন যায়, মেয়ে মাছের কথা আর না তুললেও পুটির বাবা মন থেকে মুছে ফেলতে পারলো না। তার কেবলই মনে হতো, মেয়ের এই সাধটুকু সে পূরণ করতে পারবে না? এ মাসে পারলো না। পরের মাসে নিশ্চয় কিনবে। পরের মাসটাও চলে গেল। বাজারে ইলিশ কমতে কমতে ইলিশের মরশুম শেষ হয়ে এল। আর দামও চড়ে গেল দ্বিগুণ।

পুটির বাবা খেতে বসে রোজই দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর মেয়ের পাতের দিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে  থাকে। মেয়ে ইলিশের কথা ভুলে গেছে। বাবা কিন্তু ভুলতে পারেনি।

বুধবার, ৪ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৫ আমরা —দুর্গাদাস মিদ্যা।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

      বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৫



আমরা

দুর্গাদাস মিদ্যা

কমলার মাথা সিতানে রাখা মোবাইল ফোন টা বেজে উঠলো ।তখন ভোর সাড়ে তিনটা ।রমলা ফোন করে জানিয়েছে ও বাড়ি থেকে এসে ওদের সঙ্গে যোগ দেবে সময় মতো।এই খবর জানানোর জন্য এই কাক ডাকা ভোর সাড়ে তিনটায় ফোন! অবাক হয়েছিল কমলা। রমলার কোথাও যাবার কথা থাকলে বারে বারে ফোন করে সকলকে।তাতে যে কেউ বিরক্ত হয় তা নয় । ওদের সম্পর্কের মধ্যে বিরক্তির কোন জায়গা নেই।
ওরা চারজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে এক ক্লাসে  পড়ে। রেজাল্ট ভীষণ কম্পিটিটিভ। সবার নম্বর সবার গায়ে গায়ে লাগানো। এই চারজন একেবারে হরিহর আত্মা। ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষা দিয়ে ওরা ঠিক করেছে খাজুরাহো মন্দির দেখতে যাবে।
কমলা  বিমলা রমলা এবং অমলা। এই চারজন এক হস্টেলে থেকেছে ।দুজন দুজন করে রুম শেয়ার করেছে। সিনেমা থিয়েটার যখন যা ইচ্ছা হয় এই চার মূর্তি বেরিয়ে পড়ে।শত চেষ্টা করেও এদের মধ্যে আর কারো অনু প্রবেশ ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরা চার মূর্তি। যেন চারটি নোটন পায়রা।
ভোরে ফোন করে কমলাকে জানিয়েছে রমলা যে ও বাড়ির গাড়ি করে হাওড়া স্টেশনে এসে একসাথে মিট করবে।
সকাল থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে। সাথে বজ্র বিদ্যুৎ।কড়কড় শব্দে বাজ পড়ছে।চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে একেবারে। রহমান বিশ্বস্ত ড্রাইভার।হাতও বেশ ভালো।মা বারণ করেছিল এই আবহাওয়ায় না বেরোতে। বলেছিল কমলাকে জানিয়ে দে যে এই দুরবস্থায় যাচ্ছি না।
কিন্তু রমলা এমন চারবন্ধুতে বেড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি। তাছাড়া রেজাল্ট বের হলে কে কোথায় ছিটকে যাবে?
দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে  ঝমঝম বৃষ্টির তান্ডব কাটিয়ে গাড়ি চলেছে। পিছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে গান শুনতে শুনতে আসছে রমলা।ডানকুনির কাছাকাছি এসে গাড়ি হঠাৎ স্কিড করে এক চলন্ত ডাম্পারে ধাক্কা। তারপর আর কী হয়েছে মনে নেই
রমলার যখন জ্ঞান এসেছে তখন দেখে কমলা অমলা আর বিমলা খুব চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে।রমলা খুব কষ্টে জিজ্ঞেস করে এখন সে কোথায়? কমলা বলে  --আমরা এখন বেলভিউ নার্সিং হোমের আই সি সি ইউ কেবিনে।

মঙ্গলবার, ৩ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৪ *অনুসন্ধান* — অজিত দেবনাথ।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

      বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৪



*অনুসন্ধান* 

  অজিত দেবনাথ


অভিরাম দশম শ্রেণির ছাত্র। ছন্নছাড়া দারিদ্র্য তার প্রাত্যহিক সঙ্গী। যেন  কোনো কোনো দিন তার বুকের জীর্ণ  শিরাগুলো দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। জীবনের  প্রতিটি মোড় একেকটি ক্লান্ত ধুলোর মলিন কাব্য, প্রতিটি পদক্ষেপে জমে থাকে অবহেলার যন্ত্রণা। বাবা চটকলের শ্রমিক—দিনভর মেশিনের একঘেয়ে গর্জনে কানে জমে ওঠে বিষাদের নিশ্চিন্ত গোলক, আর সন্ধ্যার স্নিগ্ধ আলোয় তাঁর ক্লান্ত শরীর নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে ঘরের নির্জন  কোণে। মা  খুব ভোরে ওঠেন, সূর্য ওঠারও অনেক আগে— ঝুড়ি কাঁধে নিয়ে হাঁটেন বাজারের দিকে, বিক্রি করেন সবজি; রোদ আর ঘামের জলে ধুয়ে যায় প্রতিদিনের শর্তাধীন স্বপ্ন। সন্ধ্যায় ফেরেন হাতে অবিক্রীত পেঁয়াজ-আলু আর হৃদয়ে জমা একরাশ ক্লান্তি।

শীতকালে তাদের ঘরে নতুন কম্বল আসে না—মায়ের পুরোনো শাড়ির আঁচলই হয়ে ওঠে উষ্ণতার প্রাচীর। পুজো আসে, কিন্তু নতুন জামার গন্ধ আসে না; শুধু দোকানের কাঁচে জমে থাকে প্রতীক্ষার দীর্ঘশ্বাস।

তবু এই জীবনের স্তব্ধ অন্ধকারে অভিরামের ভিতর বেঁচে থাকে এক দীপ্ত স্বপ্ন—অঙ্ক শেখার, অঙ্ককে আপন করে তোলার দয়িত প্রয়াস।

তবে অঙ্ক তার কাছে প্রথম থেকেই যেন এক রহস্যময় অরণ্য। সূত্রেরা ঘন ছায়ার মতো তাকে বিভ্রান্ত করে, সংখ্যাগুলো পালিয়ে বেড়ায় তার বোধের নাগালের বাইরে। ক্লাসরুমের বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ভুল করলে মাস্টারমশাই অনায়াসে বলে বসেন, “ এই জন্মে তোর আর  অঙ্ক শেখা হবে না !”

আর সহপাঠীরা?—তাদের মুখে ব্যঙ্গের হাসি, “তোর মাথায় অঙ্ক ঢোকে না কারণ সেখানে জায়গাই নেই, শুধু শূন্য উদ্যান!”

কিন্তু অভিরাম থেমে থাকে না। প্রতিরাতেই, যখন সমস্ত পাড়া ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এক কোণায় বসে  আবছা আলোয় সে বই খুলে বসে।  ঘুমে চোখ ভেঙে আসে , খাতার পাতা কখনও কখনও গতিপথ হারিয়ে ফেলে । ভুল করে, আবার শেখে। যেন রূপান্তরিত মানচিত্রের উপর দিয়ে হেঁটে  যাচ্ছে এক নিঃসঙ্গ পথিক। তার হাত কাঁপে, কিন্তু মনের ভেতরে রাশি রাশি স্বপ্নের বিপুল বিস্তার। সে ভাবে—একদিন নিশ্চয়ই এই ছায়াগুলো আলো হয়ে উঠবে। শঙ্কিত দীপশিখা পূর্ণতা পাবে।

একদিন সন্ধ্যায় মা হাঁপাতে হাঁপাতে বাজার থেকে ফিরে এসে বলেন, “জানিস, তোর বয়সে আমিও স্কুলে যেতে চেয়েছিলাম। পারিনি। তুই যেন থেমে যাস না রে। তোর ভিতরে একটা অনন্য মন আছে, সেটা অনেকের কপালেও জোটে না—সেটাই তোর সবচেয়ে বড় শক্তি।”

মায়ের কণ্ঠে ক্লান্তি আর চোখে জমে ওঠা জলের মধ্যে যে আশীর্বাদ লুকিয়ে ছিল, অভিরাম বুঝে যায়—এই শব্দগুলোই তার অসম্ভবকে সম্ভব করার পাথেয় হয়ে ওঠে।

অকস্মাৎ একদিন স্কুলে ঘোষণা করল যে—আন্তঃবিদ্যালয় গণিত প্রতিযোগিতা হবে। পুরস্কার—এক বছরের টিউশন ফি মুকুব, সঙ্গে উন্নত মানের গণিত বইয়ের সেট। ছাত্ররা তালিকা দেখে উল্লসিত  হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন দেখে, সেই তালিকায় অভিরামের নাম, তখন তাদের চোখে অদ্ভুত বিস্ময়।

কেউ বলে, “তুই বুঝি এবার গণিত অলিম্পিয়াডে যাবি?”

আরেকজন  বিদ্রুপের স্বরে বলে, “তুই তো কলা বিভাগে! অঙ্ক তোর কিসের?”

কিন্তু সেদিন অভিরামের চোখে এক নতুন আলোর রশ্মি । সে ক্লাস ছুটির পর সোজা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছোয় পাড়ার এক বৃদ্ধ গণিত শিক্ষক বিমলবাবুর দরজায়। কাঁপা গলায় বলে, “স্যার, আমি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছি। আপনি যদি একটু শেখান...”

বিমলবাবু কিছুক্ষণ ছেলেটার চোখের দিকে চেয়ে থাকেন। সেই চোখে ক্লান্তি আছে, অপমানের  ক্ষতচিহ্ন আছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি আছে—একরাশ জেদ, এক চিলতে  শাণিত দীপ্তি। বিমলবাবু মৃদু হেসে বলেন, “তুই যদি সত্যিই মন দিয়ে চাস, তাহলে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।”

তারপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়—প্রতিদিন বিকেলে অভিরাম পৌঁছোয় বিমলবাবুর ছায়াঘেরা বারান্দায়। শুরুতে সূত্র মুখস্থ করতেই রাত কাবার হয়ে যায়, কিন্তু ধীরে ধীরে সূত্রেরা তার সঙ্গে কথা বলতে শেখে। π, √ আর উপপাদ্য তার কাছে ভয় নয়, বরং তারা হয়ে ওঠে তার ভাষা—বিশ্বকে বোঝার এক অনুপম ছন্দ।

বিমলবাবু একদিন বলেন, “অঙ্ক মানে হিসেব নয় রে—এটা এক ধরনের ভাষা, যার ভেতর লুকিয়ে থাকে জগতের অনাবিল, রহস্য, সৌন্দর্য।”

প্রতিযোগিতার দিন  এল। অভিরাম গায়ে চাপাল তার একমাত্র সাদা শার্ট—যার বোতাম নেই একটায়, পকেটের ধারে সেলাই উঠে গেছে। কিন্তু তার চোখে কোনও দ্বিধা নেই, কেবল দুর্দমনীয় আত্মবিশ্বাস। প্রশ্নপত্র হাতে নিয়েই সে বুঝল—এই প্রশ্নগুলো তার চেনা, এই অঙ্কের পথেই তো সে হেঁটেছে।

এক সপ্তাহ পর ফলাফল প্রকাশিত হল—অভিরাম প্রথম।

স্কুলজুড়ে চমক। সেই শিক্ষক, যিনি একদিন অপমান করেছিলেন, আজ নিজেই বললেন, “তোর এই নিষ্ঠা আর পরিশ্রম আমাদের সবাইকে অবাক করে দিল। তুই আজ সত্যিকারের অনুকরণীয়।”

সেই রাতে মা অভিরামের কপালে চুমু খেয়ে চোখ মুছলেন। বললেন, “আমি জানতাম—তুই পারবি।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোকে দেখে মনে হচ্ছে, এ জীবনও একদিন চাঁদের আলোর মতো আলোকিত হয়ে উঠবে।”

সেই রাতে অভিরাম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে একাকী, নির্জনে। তার মনে হয়, সংখ্যাগুলো আজ তার সঙ্গী, সূত্রগুলো তার বন্ধু। জীর্ণ চালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকে পড়ে তার বুকের ভেতর। হাওয়ার দোলায় যেন ভেসে আসে এক নীরব স্বর—

“অঙ্কের পথে হাঁটলে, কোনো গন্তব্যই দূরের নয়।”

সোমবার, ২ জুন, ২০২৫

।। প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৩ সুরেলা আকাশ — দেবাশীষ সরখেল।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



          

          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

      বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) —৩




সুরেলা আকাশ 

 দেবাশীষ সরখেল 


সেদিন ঝমঝমিয়ে সকাল থেকে বৃষ্টি,আকাশ মেঘলা। বাইরে খুব একটা হাওয়া নেই। এরই মধ্যে চার বন্ধু মনে মনে ঠিক করলাম আজকে আর কোথাও বেরোবো না। নিজের বাড়িতে বসেই আমাদের প্রথম পরিচয়য়ের দিনটি নিয়ে ইনবক্সে চারজনে লিখব।

      লিখতে গিয়ে দেখি সুরলার কথা কিছুতেই বাদ দেওয়া যাচ্ছে না, কলেজ জীবনের সে ভালো আবৃত্তি করতো। কুইজে দারুণ দক্ষতা ছিল। আর ইংরেজি অনার্সের ক্লাসে তার স্থান ছিল খুব উপরের দিকে। সেই কলেজ ক্যান্টিনে এসে প্রথম আমাদের তার একক আবৃত্তি  অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানায়। আমরা যাব বলে প্রতিশ্রুতি দিই। এর থেকেই পরিচয় বন্ধুত্ব, কিছুটা নৈকট্য। হয়তো আমার মত আরও তিন বন্ধুই তার সাথে আলাদা করে মিশতে চাইতো। বন্ধুত্বের এই শীর্ণ ধারাকে মেশাতে চাইত প্রেমের ঝর্ণায়, কিন্তু সুবেলা কখনো সেটা চায়নি।

     তারপর অনেক বর্ষা এসেছে, বসন্তে পলাশ ফুটেছে, ঝরে গেছে। আমরা যে যার জীবন ও জীবিকার সন্ধানে।  সুরে লা কখন নিজের অজান্তে নিজের পরিসর থেকে মুছে গেছে,কেউ আমরা বুঝতে পারিনি।

    আশ্চর্য দিনশেষে যখন সকলে সকলের লেখা পড়লাম, প্রায়  চারজনই আমরা এক জিনিস লিখেছি। শুধু কিছুটা শব্দের জাগলারি, কিছু বর্ণনার হেরফের।

    সুরেলা কোথায় আমরা এখন কেউ জানিনা। সে কি এখনো কুমারী, বিবাহিতা সন্তানবতি সিঙ্গেল মাদার ---- আমরা কেউ কিচ্ছু জানি না!

   কিংবা হয়তো সবাই জানি, কেউ কারো কাছে ভাঙতে চাইছি না।

শনিবার, ৩১ মে, ২০২৫

আজ থেকে প্রকাশিত... অঙ্কুরীশা-র পাতায়... । প্রতিদিন বিভাগ।। ।। জুন সংখ্যা।। বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) ।। আজকের কলমে — সমাজ বসু।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।



          ।।  প্রতিদিন বিভাগ।। 

             ।।  জুন সংখ্যা।। 

          বিষয় - গল্প ( ৪০০ শব্দের মধ্যে) 




উইকএন্ড ট্যুর

সমাজ বসু


সেদিন সকাল থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। আকাশ মেঘলা। বাইরে খুব একটা হাওয়া নেই। এরইমধ্যে চার বন্ধু ফোনে ঠিক করলাম আজ রাতের ট্রেনেই চাঁদিপুরে যাবো। যে যার অফিসের কাজ সেরে রাতের পুরী এক্সপ্রেস ধরে নেবো। বালাসোর থেকে সড়কে ঘন্টাখানেকের পথ। এই একটা ছোট্ট দিন দুয়েকের ট্যুরে সবাই যে যার কনসেন্ট জানিয়ে দিলাম।


রজত,সুময় আর দীপক বিবাহিত। ওদের পারিবারিক ঝুটঝামেলা থাকা সত্ত্বেও দিব্যি রাজি হয়ে গেল। আমি তো ভাবতেই পারছি না,যে ওরা মাত্র এক ঘন্টার নোটিশে গিন্নিদের রিলিজ অর্ডার পেলো কি‌ করে? ওদের ক্যারিশমার বাহবা দিতে হয়। আমি তো ঝাড়া হাত পা। আমার দিদির কানে যেই কথাটা তুলেছি, ব্যাস্ সঙ্গে সঙ্গে দিদি নিজেই আমার শার্ট-প্যান্ট,পেস্ট,টুথ ব্রাশ গোছাতে গোছাতেই অফিসের রান্নাও সেরে ফেলল।

--- দিদি, জামাইবাবুকে বলার সাহস পাইনি। অফিসে বেরিয়ে গেলে ঝোপ বুঝে কোপ মারিস। দেখিস, আমার এই যাওয়া নিয়ে তোর সঙ্গে যেন অশান্তি না হয়।

--- তুই একদম নিশ্চিন্তে থাক রে ভাই। এই বৃষ্টির মাঝে আমি কি আর তোর চাঁদিপুর ট্যুরের কথা বলব? এই উইকএন্ডটা ভাই এক বন্ধুর বাড়িতে কাটিয়ে আসবে বলতে হবে। আসলে তোর মানবদা তো তোকে নিজের ছেলের মতই ভালবাসে। যদি শোনে এই ওয়েদারে তুই চাঁদিপুরে যাচ্ছিস,তাহলে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে ছাড়বে। তাই চাঁদিপুরের কথা ঘুণাক্ষরেও বলা যাবে না।

--- ঠিক আছে,সে তুই যা ভাল বুঝিস করবি। আমি অফিসে তো বেরিয়ে যাই।


অফিসে ডেস্কে সবে ল্যাপটপ খুলে কফিতে চুমুক দিয়েছি,এমডির আদেশ নিয়ে রতনদা হাজির। অগত্যা কফির কাপ রেখে‌ সোজা এমডির চেম্বারে।

--- মিঃ সৌগত আজ সন্ধের ফ্লাইটে আমাকে দিল্লিতে যেতে হচ্ছে। ফরেন ডেলিগেটরা আসছেন। একটা মিটিং আছে। তাই এই উইকএন্ডটা তোমাকে অফিসে থাকতে হবে। রুল অনুযায়ী অবশ্যই স্পেশাল বেনিফিট থাকবে। সোমবার বিকেলের মধ্যেই এপ্রিল মাসের ব্যালেন্সশিট রেডি রাখতে হবে। কাল একটু তাড়াতাড়িই অফিসে আসবে। 

এমডির কথায় ঘাড়টাকে পুরোপুরি হেলিয়ে চেম্বার থেকে কোনরকমে পায়ে পায়ে নিজের ডেস্ক অবধি এলাম।

ফোন খুলতেই রজত আর দীপকের চার চারটে মিসডকল আমার দুচোখে বেশ কয়েক মুঠো সর্ষেফুল ছড়িয়ে দিল।


দিদি ঘরে এসে পর্দাটা সরাতেই বুঝলাম আমার সকাল হয়েছে।

রাতে চাঁদিপুরে না যাওয়ার যন্ত্রণা মেখে শুয়েছি জেনে দিদি কিছু কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দিদি বুঝতে পেরেছে আজ শনিবারও অফিসের মুখ দেখা কি বিড়ম্বনা! শুধু চায়ের কথা বলে বেরিয়ে গেল।

চাঁদিপুর রিসোর্টে চায়ের কাপ হাতে এইসময় ওরা তিনজন সমুদ্রের হাওয়া মাখতে‌ মাখতে‌ নিশ্চয়ই আমাকে এক হাত নিচ্ছে--- আমাদের কেমন নাচিয়ে দিয়ে নিজে দিব্যি কেটে পড়ল। 

কিংবা হয়ত একজন এও বলছে,কপালটাই খারাপ।

--- আরে সৌগত,দেখো আজকের কাগজের প্রাইম লাইন। বালাসোরের  কাছে পুরী এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত। বেশ কিছু আহতও হয়েছে। জামাইবাবু কথা শুনে চায়ের কাপ ফেলে ছুটে ঘরে গিয়ে ওদের তিনজনকে রিং করলাম। কিন্তু তিনজনের ফোনই সুইচড অফ।

আমি একা‌ একাই আজ এই উইকএন্ডের যন্ত্রণা ভোগ করতে লাগলাম। 

অজান্তেই হাত দুটো জড়ো হয়ে এলো‌ তাঁর উদ্দেশে।