লেবেল

অনুবাদ কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুবাদ কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

অনুবাদ কবিতা।। মূলভাষা-- অসমিয়া।। ভাষান্তর- বাসুদেব দাস

 



    

     অনুবাদ কবিতা

মূলভাষা-- অসমিয়া

ভাষান্তর- বাসুদেব দাস                             



জীবন বৃত্ত 

মেঘালী গগৈ

মূল ভাষা- অসমিয়া 

বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

            

          একসময়ে

             বাতাস   ছুঁলেও

             লজ্জাবতী লতা হয়ে পড়া

             এই হৃদয়!

             এখন শব্দের হিরণ্ময় স্পর্শে

             সপ্রতিভ,বাঙময়!

 

             ভঙ্গুর কাঁচের ঘরের মতো

             ভেঙ্গে চুরমার হওয়া

             আশার আলয়,

             শব্দের সুকঠিন আলিঙ্গণে

             হয়ে উঠে নির্ভয়।

            

             পূর্ণতা থেকে শূন্যতার দিকে

             শূন্যতা থেকে

             পুনরায় পূর্ণতার দিকে

             হৃদয়ের যেন

             এক বৃত্তাকার পরিভ্রমণ।

 

             ভাস্কর শব্দের কুশল স্পর্শে

             মুক্ত হয় ধীরে ধীরে

             এক পাষাণ বন্ধন

             বর্ণিল এক ইতিহাস হয়ে উঠে

             আমার এই নিস্তরঙ্গ জীবন

 

 

 

 পাথরের বুকের কথাগুলি

মেঘালী গগৈ

মূল ভাষা-  অসমিয়া  

বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

           

  নির্বাক নির্বিকার পাথরের সঙ্গে

             চুক্তি ছিল—

             একবারও উচ্চারিত না হয়ে

             অর্বুদ কোটি বছর পর্যন্ত

             ফসিল হয়ে থাকবে,

             না শুনেই বুকে

             অনুরণিত হওয়া কথাগুলি।

             কিন্তু হল না,

             চুক্তি ভঙ্গ হয়ে গেল।

             পাথর কথা বলে উঠল।

             আর সঙ্গে সঙ্গে

             বুকে স্তব্ধ হয়ে শুয়ে থাকা

             পাখির ঝাঁক গাইতে শুরু করে দিল

             বসন্তের গান।

             ঝরাপাতার গালিচার ওপরে

             অতি যত্নে আদর করলাম

             একটা সুপ্রাচীন স্বপ্নের

             অম্লান কামনা।

             সম্প্রতি আমার অনুভবে

             উষ্ণ হয়ে থাকে

             বলার আগেই বুঝতে পারা কথাগুলি।

             যেসব পুরোনো কথায়—

             মন ভালো হয়ে যায়

             স্বপ্নের মতো,

             বার বার শুনেও বিরক্তি না লাগা 

             রূপকথার মতো।

             পাথরের বুকের কথাগুলি যে

             আমাকে এখন কান্না থামিয়ে

             নিশ্চুপ করে রাখে।





---------------------------------------------------------------------------

  পড়ুন ও পড়ান।   মতামত জানান।      

ankurishapatrika@gmail. com


---------------------------------------------------------------------------        

শনিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২১

অনুবাদ কবিতা।। কবি- প্রদীপ শইকীয়া।। মূলভাষা-অসমিয়া।। ভাষান্তর- বাসুদেব দাস

 



অনুবাদ কবিতা

কবি- প্রদীপ শইকীয়া

মূলভাষা-অসমিয়া

ভাষান্তর- বাসুদেব দাস       


জন্মান্তর -১


    অন্ধকারে হেলান দিয়ে যখন চাঁদটা বেড়াতে যায়

    আমি জলের বৃত্তে মুখ দেখি

    খুলে রেখে পুরোনো জামা

    কাঁধ থেকে নামাই ধেনু

    অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত

    আমি জলের কাছে আসিনা

 

    আমাকে সবাই নিষাদ বলে ডাকে

    ক্ষুধার্ত তীরে আমার

    স্বপ্নের বিষ মাখানো আছে

    তূণে আছে যাত্রার ভবিষ্যৎ

 

    পাথরের স্তূপ কাঁপিয়ে যখন একটা হরিণের চিৎকার

    কুণ্ডলি পাকিয়ে শিখর গুলির দিকে এগিয়ে যায়

 

    আমি জলের ছবিতে ডুব দিই

    স্তূপীকৃ্ত ভস্মে পুঁতে রেখে

    নিষাদের মুখোশ। 

 


জন্মান্তর-২



  জলে ডোবা একটি মানুষ,  তারও অতীত রয়েছে

 

জলে নেমে জল খাওয়া একটি বাঘ

তারও ইতিহাস রয়েছে

 

তারও গর্ভে শিকড় প্রোথিত রয়েছে প্রতিধ্বনি

একঝাঁক গর্ভিনী হরিণীর মৃত্যুনিনাদ

আমি নিষাদ

বাঘ

না মানুষ

জলে ডুবেছি ভিজিনি

নিদ্রায় ভিজেছি ডুবিনি

আর্তনাদ করেছি শুনিনি

চিরহরিৎ বৃক্ষের শিকড়ে অন্ধকার নেমেছে

চিৎকার করে করে পাখির ঝাঁকটা

অন্ধকার হয়ে আসছে। 




----------------------------------------------------------------


অঙ্কুরীশা-র পাতায় ক্লিক করে পড়ুন। লাইক করুন। 👍👍👍👍👍👇👇

 ankurishapatrika@gmail. com

-----------------------------------------------            




 

শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

একগুচ্ছ অনুবাদ কবিতা।। মূলভাষা- অসমীয়া।। ভাষান্তর - বাসুদেব দাস




একগুচ্ছ অনুবাদ কবিতা 
মূলভাষা- অসমীয়া
ভাষান্তর - বাসুদেব দাস   
 
১.
একটি নিঃসঙ্গ হাসপাতাল
সৌ্রভ শইকীয়া
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস 


গাছের পাতার মতো একটি আকাশ…
একটি হাতে টানা রিক্সা ঘুমোচ্ছে 
দুপুরবেলাটা মরছে।পিপিই কিট পরে 
দুটো ঢেঁকীয়ার সঙ্গে একটি কালো পিঁপড়া ঘুমোচ্ছে
একটা হাসপাতালের সঙ্গে রশির একটা বিছানা ভেসে যাচ্ছে
ভেসে যাচ্ছে স্বপ্নে 
ভেসে যাচ্ছে সমুদ্রে 
যুদ্ধকালীন একটা প্রস্তুতি 
একটা খবর 
সবচেয়ে মারাত্মক রাস্তাটাই দৌড়ে যাওয়ার একমাত্র পথ 
সবচেয়ে মারাত্মক পৃথিবী্টাই 
খট খট খট 
খট খট খট 
কাল সারা রাত আর্তনাদ 
কেউ সংক্রামক ছড়িয়ে দিয়েছিল
কাল সারা রাত রক্তপাত 
কেউ লকডাউন ঘোষণা করেছিল 
আর আমি মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছিলাম,যখন 
স্তব্ধ কাগজের চাঁদটিকে সরাসরি 
কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছিল।
সারারাত সেইসব মৃত অক্ষরের বিলাপ 
সারা রাত আহত-নিহত সেই নক্ষত্রমালার মধ্য দিয়ে  
উদভ্রান্তের মতো আমি দৌড়ে গিয়াছিলাম 
আঃ।জানালার ওপারেই অট্টহাসি 
জানালার ওপারেই শ্মশান 
কে ডাকে…?
ভারী বাতাস গায়ে জড়িয়ে ধরে।
স্বাভিমানী,অহঙ্কারী ভাইরাস 
আর কত ডেড বডি চাই তোমার?
কত ডেড বডি চাই তোমার?
যার জন্য তাড়াহুড়ো করে এই হাসপাতাল
একটি হলুদ হাসপাতাল। 
(মৃত্যু প্রবেশ করে ফুসফুসে অনুগ্রহ করে দূরে যান) 


২.
কবির সমাধি ফলক
রুদ্র সিংহ মটক
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃবাসুদেব দাস 

 আজও বন্দি আমি জানালা বিহীন ব্যাঙ্কের
 আবদ্ধ ঘরে 
রোদের কোনো অক্ষর নেই এখানে 
কেবল ‘কোর ব্যাঙ্কিং’,গ্লোবালাইজেশন
 আর লাভালাভের কোটি টাকার অঙ্ক ঢেকে রেখেছে 
আমার সভ্যতার চোখের পাতা 
বহুজাতিক কম্পিউটার ফ্যাক্স-ইন্টারনেটের ছন্দহীন
প্রেত-ছায়া স্বরলিপি,মোবাইল এবং দামী জুতোর
 কৃত্রিম কোলাহল কেড়ে নিয়েছে আমার লাল 
হৃদপিন্ডের সবুজ শ্বাস
 আজ সবই হারিয়েছি, স্বপ্ন পাখির শিস 
নারীর  প্রেম 
হারিয়েছি কলম এবং হৃদয়ের যুদ্ধভূমি 
আলোড়িত সূর্য এবং শস্যোজ্জ্বল কবিতার পথ
'হরিণার  মাংস বৈরী'  হওয়ার মতো
         হাতের ঘড়িটাই আজ কাল হল আমার, যে 
সাত শত্রুর মতো গোপনে নিরীক্ষণ করে আমার 
প্রতিটি মুহূর্তের বোবা অস্থিরতা আমার মৃত্যু 
এবং আর্তনাদ 
কখনও কখনও ভাবি,
 পৃথিবীটা অভাবিতভাবে সংকীর্ণ,যেন  
 এস বি আইর স্ট্রং রুম,যেখানে ক্ষুদ্র একটা অক্সিজেন
 সিলিন্ডার নিয়ে অসহায় আমি ছটফট করছি সারারাত
 অসম্ভব একটি স্বপ্নের দরজা মুখে 
কংক্রিট ভেঙ্গে অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে 
চলে আসবি নাকি সাতটি তারা সাতটি পাগলা 
ঘোড়া 
তারই উজ্জ্বল  চোখের কালো ঘোড়াটি
 দৌড়ে চলে যাব আমি দূর-দূরান্তের সেই সবুজ ঘাসে
 অথবা নিষিদ্ধ বনগোলাপের অবিন্যস্ত কোনো
 গহন অরণ্যে 
আর যদি তা সম্ভব না হয়
 কাল আমার অনিবার্য মৃত্যু হবে
 পাখিগুলি গুনগুন করে সকালের গান আরম্ভ করার 
আগে আগে 
উডহাউসের গল্প পড়ে ভালোলাগা আমার 
উদাসী বন্ধুটি সেদিন সন্ধ্যার আড্ডায় বিষণ্ণ 
স্বরে বলেছিল 
আমার সমাধি-ফলকে নাকি কালো অক্ষরে লেখা 
থাকবে,-
‘ তিনি ছিলেন এই পৃথিবীর সবচেয়ে 
 ভাগ্যবান অথচ করুণার পাত্র
 টাকার চেয়েও বসন্তের মতোই স্বাধীন,উজ্জ্বল 
শব্দগুলির গন্ধটা 
 তিনি অনেক বেশি ভালোবাসতেন।’


৩.
মায়াবন
নিবেদন দাস পাটোয়ারী 
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

 
আকাশটা কখন কোথায় গেল 
টেরই পেলাম না 
এখন ভাবতে ভয় হচ্ছে 
আকাশ ছাড়া 
কীভাবে কাটাই দিন

হে আমার প্রাণের পাখি 
তোর আকাশের বরফ সাদা 
মেঘের খোঁজে 
তুই উড়ছিস কোথায় 
পাখা মেলে 

মুখ ফুলিয়ে 
ক্রন্দনমুখী 
রাতের বেলা ফসফরাস হয়ে জ্বলছে 
আমার  ধানক্ষেতে

এই কয়েকদিন 
আমার সমস্ত বানান ভুল 
নীরবতার দীর্ঘ প্রুফ দেখে দেখে 
বসে রয়েছি 
তোর ছাপাশালায় 

আকাশ বিহীন একটা দিনে 
কোন রাখাল খুঁজে বেড়াবে 
অশ্বত্থের ছায়া 
আকাশ বিহীন রাতে 
তুই কী প্রসাধন মাখলে 
উজ্জ্বল হবে 
সন্ধ্যার জোনাকী মুখ 

সময় 
কাউকে ছোট হয়ে থাকতে দেয় না 
এমনকি 
আকাশকেও
ডায়েরির শূন্য পাতা 
পূর্ণ করে নিজের আকাশ 
ঠিকই আঁকতে জানে 
সময় 
অন্ধকারে নিজেকে বাঁচানো 
কত কঠিন 
আকাশ আজও বুঝল না

  

৪.
ননস্টপ
নিবেদন দাস পাটোয়ারী 
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃবাসুদেব দাস

পাঁচ টাকায় ছয়টা কলম 
পাঁচটা কিনলে একটা ফ্রি 
কলম নিন দাদা কলম 
ছেলেমেয়েদের জন্য নিন 
ননস্টপ কলম 
সকাল ছয়টার আগে 
আদাবাড়ি পৌছে যায় সে 
হাতে কাঁধে সবখানেই কলম 

প্রথম বাসটা সাড়ে ছয়টায় ছাড়ে 
মঙ্গলদৈ হয়ে তেজপুর 
প্রতিটি যাত্রীর শার্টের পকেটে 
তার চোখ 
একটাই আশা 
পকেটে একটা কলম না থাকুক 
আদাবাড়িতে সারাদিনে অগণন বাসের 
আসা যাওয়া 
অলেখ যাত্রী 
কলম থাকা কলম না থাকা 

আজ দশ বছর কলমের সঙ্গে 
বন্ধুত্ব করেও 
‘ক’অক্ষরের কোণটাও সে আঁকতে পারে না 
রোজই বিক্রি করছে কলম 
সন্ধ্যেবেলা রান্নার জন্য চাল কিনেছে
তার সঙ্গে
আঁক-বাঁক করার জন্য একটা খাতা 
ক্রেতাকে ননস্টপ লেখার 
প্রমাণ দেখানোর জন্য 
দিনটাকে কবর দিয়ে 
বাড়ি ফেরে সে  
পড়ার টেবিলে থাকা 
ছেলে-মেয়েদের 
প্রায়ই বলে 
কখনও কলম বিক্রি করবি না 
যত পারবি কিনবি 
কিন্তু বিক্রি করবি না
ওরাও বোধহয় কিছু একটা বোঝে 
এবং 
মাথা নাড়ায়।


----------------------------------------------------------------------------------------
আপনার মতামত একান্ত কাম্য। ভালো থাকুন। 
ankurishapatrika@gmail.com  

---------------------------------------------------                









শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

অনুবাদ গল্প - দান। সৈয়দ আব্দুল মালিক। মূল ভাষা- অসমিয়া। ভাষান্তর- বাসুদেব দাস

 



  দান

সৈয়দ আব্দুল মালিক 

মূল ভাষা-অসমিয়া 

ভাষান্তর  –বাসুদেব দাস 


এক কুড়ি বারো বছর বাড়ি থেকে দূরে রইলাম।জীবনের একটা প্রধান অংশ কয়লার খনিতেই গেল।অন্যের মেঝেতে আলো ফেলার জন্য,অন্য যাত্রীর যাতায়ত সুগম করার জন্য,সম্বন্ধ পাতলাম মাটির নিচের কালো কয়লার সঙ্গে,নিজের জীবন অন্ধকার করে,অচল করে।কয়লাখনি স্থবির পাহাড়টা দিয়ে জীবনটাও স্থবিরতাকে সঙ্গী করে নিয়েছে।দেড় কুড়ি দুই বছর।অর্থাৎ পুরো জীবনটা।

নিজের বাড়ি ফিরে এসে দেখলাম গ্রামের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।অনেক অপরিচিত যুবক,অপরিচিত যুবক-বৃ্দ্ধে গ্রামটা ভরে উঠেছে।তাদের মধ্যে আমি পুরোপুরি বহিরাগত।

আগের পরিচিত অনেকেই নেই।আমার সমবয়সীদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে।আগের ছেলেরা আধবয়সী হয়েছে,আগের আধাবয়সীরা বুড়ো হয়ে মরেছে।অনেক পুরোনো বাড়ির জায়গায় নতুন বাড়ি হয়েছে।কালের কীর্তি। 

খবর নিয়ে জানলাম রাজীবলোচন এখনও বেঁচে আছে।রাজীব্লোচন ছিলেন আমার চেয়ে তেরো বছরের বড়।আমার বয়স এখন বাহান্ন বছর।রাজীবলোচনের বয়স তাহলে ৬৫ বছর হবে।সেই সময়ের সুগঠিত যুবক,বলিষ্ঠ রাজীব আজ তিন কুড়ি পাঁচ বছরের বুড়ো।মনটা খারাপ হয়ে গেল।

রাজীবরা পাঁচ ভাই।মেয়ে তিনটি।পরিবারের মধ্যে রাজীবই বড়।মানুষগুলো খুব দুঃখী ছিল।রাজীবের যখন আঠারো বছর বয়স তখনই তার পিতার মৃত্যু হয়,কোনোমতে প্রবেশিকা পাশ করে যেখানে যেভাবে পারল বোনেদের বিয়ে দিয়ে দিল।তারপর শুরু হল ভাইদের পড়ানোর গুরু দায়িত্ব।ছোট ভাইয়ের যখন দেড় বছর তখনই পিতার মৃত্যু হয়।সে তার চেয়ে ষোল বছরের বড়।একটা বড় পরিবারের সেই আঠারো বছরের রাজীব হল বাড়ির অভিভাবক।তাকে ঘিরে ছিল তখন নিদারুণ দারিদ্র।

শুনতে পেলাম আজকাল রাজীবের অবস্থা বেশ ভালো।আজকাল রাজীব কিছুই করে না।বাগানে কেরানির কাজটাও আজ থেকে কয়েকবছর আগে ছেড়ে দিয়েছে।এখন রাজীব বাড়িতেই থাকে।প্রতিটি ভাই ভালো কাজ করে।তারাই রাজীবকে টাকা পয়সা কাপড় চোপড় দিয়ে সব সময় সাহায্য করে।রাজীবের কোনো কিছুর জন্যই চিন্তা করতে হয় না।

মাঘের শেষ।ফুরফুরে বাতাস বইছিল।বুড়ো দেহে এমনিতেই ঠান্ডা বেশি লাগে।গরম কাপড়ে নিজেকে ঢেকেঢুকে নিয়ে রাজীবের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।আজ বহু বছর রাজীবকে দেখিনি,হ্যাঁ বহু বছর।

তখন সন্ধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে।

গনগনে আগুনের পাশে একটা পুরোনো বেতের চেয়ারে রাজীব বসে ছিল।আমি ভেতরে চলে এলাম।

‘তুমি এসেছ বলে শুনেছি।তবে দেখা করতে যেতে পারিনি,শরীরটা ভালো নয়।ওখানে বস।’

রাজীবের চুল দাড়ি সব পেকে সাদা হয়ে গেছে।গালদুটোর চামড়া কুঁচকে গেছে।চোখে চশমা।এই বার্ধক্য যেন স্বাভাবিক নয়,অকাল।

আমরা বসে অনেক কথা বললাম।ছোটবেলার কথা।যৌবনের কথা।তারপর এখন বয়স কালের কথা।রাজীবের সমস্ত কিছুই মনে আছে।

তারপরে একেবারে অপ্রয়োজনীয় যদিও আমি রাজীব সারা জীবনে কেন বিয়ে করল না সে কথা জিজ্ঞেস করলাম।জানি,পঁয়ষট্টি বছরে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার কোনো মানে হয় না,তবু জিজ্ঞেস করলাম।

শুকনো ঠোঁট দুটিতে পাতলা হাসি ফুটিয়ে রাজীব আমার দিকে তাকাল।রাজীবের মুখটা যেন বড় ক্লান্ত।ধীরে ধীরে রাজীব বলল,‘বিয়ে করার সময়ই হল না।’

আমি স্বাভাবিক কৌ্তূহল নিয়ে রাজীবের চোখের দিকে তাকালাম।

রাজীব বুঝতে পারল যে আমি তার কথা ভালো বুঝতে পারিনি।আগুনটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে রাজীব বলল,সত্যিই সময় পাইনি।বাবার মৃত্যুর পরে বোনেদের বিয়ে দেবার কথা এবং ভাইদের মানুষ করার কথা প্রথম মাথায় এল।বাবা যে ঋণ করে গিয়েছিলেন সে সবও শোধ করতে হল।বোনেদের বিয়ে দিতে দিতে দশ বছর পার হয়ে গেল।তখন ছোট ভাই পাঠশালা স্কুলে।তারপর ভাইদের খরচ-পত্র জুগিয়ে পড়াশোনা করালাম।অনেক কষ্ট হল।তখন বাগানে কেরানির কাজ করে আট টাকা পাই।ভাতও জুটে না।ওদের কাপড় চোপড়,ফীস সমস্ত দিতে হয়।এর মধ্যে মায়ের মৃত্যু হল।দাহের কাজ,শ্রাদ্ধানুষ্ঠান আদিতে আরও ভালোরকমই ধার হল।তারপরে-- কপাল ভালো,ভাইগুলো পড়াশোনায় ভালো ছিল—ছোট ভাই বিএ পরীক্ষা দিল,তখন ঘুরে তাকিয়ে দেখি,আমি চল্লিশের কোঠায় পা রেখেছি।

দুই কুড়ি বছরে আর মানুষের নিজের জন্য ভাবার আগ্রহ থাকে না।সেইজন্য আমি ভাইদের বিয়ে দেওয়ায় হাত দিলাম।নিজে আর বিয়ে করার সময় হল না…।

রাজীব কথাটা সাধারণভাবেই বলল।যেন এই পুরো কথা বার্তাটাই একেবারে স্বাভাবিক।

‘আচ্ছা,আজকাল ভাইয়েরা টাকা পয়সা পাঠায়।নয় কি?’

‘কেউ কেউ পাঠায়।বড়টার নাম ছিল মুনচুপ।এখন জেলার হাকিম হয়েছে।তার পরেরটা শিলঙে কাজ করে।এটা স্কুলের মাস্টার এবং ছোটটি ডাক্তার।প্রত্যেকেই টাকা পাঠায়।’

‘হোক হোক এই বুড়ো বয়সে যে টাকাগুলো দিচ্ছে,সেটা সুখের কথা।তা নাহলে আজকাল চলাই মুশকিল’-আমি বললাম।যাই হোক রাজীবের ত্যাগ সার্থক হয়েছে।সবগুলো ভাই বড় মানুষ হয়েছে।

রাজীব কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইল।তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,‘কিন্তু ওদের ভালোভাবে থাকতে দেখে আমার যেমন ভালো লাগে মাঝে মধ্যে তে্মনই খারাপ ও লাগে।’

‘কেন?’আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘ভাইগুলো,ওরা অকৃ্তজ্ঞ নয়।’ওরা আমাকে যথেষ্ট টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করে।আমার জন্য খরচ করতেই থাকে…’

‘তাহলে?’

‘কিন্তু ওদের মানুষ করে তোলার জন্য আমি কেবল আমার অর্জিত টাকা-পয়সাই দিইনি।’   ‘আর কী দিয়েছিলে?’আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘যে টাকা পয়সা ওদের জন্য খরচ করেছিলাম সেটা ওরা ফিরিয়ে দিতে পারে।অনেক বেশি দিয়েছেও।কিন্তু আমার নিজের যে জিনিসটা দিলাম,সেটা ওরা আর আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।কেউ পারবে না।’

রাজীবের কথাগুলো আমি বুঝতে পারলাম না।আমি তার চোখের দিকে তাকালাম।

‘ও আমি ওদের কি দিয়েছি বুঝতে পারছিস না তাই না?’কি দিলাম জানিস--? দিলাম আমার যৌবন,আমার যৌবনের দিনগুলো।ওরা কি আমাকে আর আমার যৌবনের দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে?’

মরণের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আজ রাজীব হারিয়ে যাওয়া যৌবনের কথা ভাবছে।সত্যি,সবগুলো ভাই মিলেও আর তার একটা দিনও ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

মনটা খারাপ হয়ে যাওয়ায় অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম।গনগনে আগুনটা নিভে ছাই হয়ে আসছে।

রাজীব কয়েকটা নতুন খড়ি আগুনের মধ্যে গুঁজে দিল।

---------------------------------------------------------------------    

লেখক পরিচিতিঃসমিয়া কথা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার সৈয়দ আব্দুল মালিক ১৯১৯ সনে অসমের শিবসাগর জেলার নাহরণিতে জন্মগ্রহণ করেন।যোরহাট সরকারি হাইস্কুল থেকে পাশ করে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ করেন।পরবর্তীকালে যোরহাট জেবি কলেজে অধ্যাপনা করেন।লেখকের গল্প সংকলন  গুলির মধ্যে ‘পরশমণি’,শিখরে শিখরে’,শুকনো পাপড়ি’বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।‘অঘরী আত্মার কাহিনী’উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।

----------------------------------------------------------------


এই বিভাগে আপনিও মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান।   

ankurishapatrika@gmail. com      


---------------------------------------------------------------------            

বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২০

সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত কবি সুলী প্রুধোমের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ। সুবীর ঘোষ ।

 






সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত কবি সুলী প্রুধোমের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ

সুবীর ঘোষ

সুলী প্রুধোম:সংক্ষিপ্ত কবি - পরিচিতি        


René François Armand Prudhomme বা Sully Prudhomme –এর জন্ম মার্চের ১৬ তারিখ ১৮৩৯ খ্রীষ্টাব্দে   ফ্রান্সের প্যারিসে ।

প্রুধোম , কিছুকাল ইন্জিনিয়ারিং ও আইন পড়ার পর দর্শনশাস্ত্র ও কবিতার দিকে মনোনিবেশ করেন  ।

১৮৭০ খ্রী-তে ফ্রাঙ্কো-জার্মান যুদ্ধে তিনি জড়িয়ে যাওয়ায় তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে ।

তাঁর প্রথম কবিতার বই  Stances et Poèmes ("Stanzas and Poems", 1865) প্রশংসিত হয় । তাঁর কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে  দর্শন ও  বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ।

 তিনি ১৮৮১ খ্রী-তে   Académie française নির্বাচিত হন ।এবং  Légion d’honneurপান  ১৮৯৫-তে ।.

Le Bonheur এর পরে প্রুধোম কবিতা থেকে প্রবন্ধের দিকে বেশি মনোনিবেশ করতে থাকেন । দুটি বই-ও প্রকাশিত হয় ।

প্রুধোম  সাহিত্যের প্রথম বছরের নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন । ১৯০১ খ্রী-তে । তিনি একটি কবিতা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন যার নাম Société des poètes français ১৯০২ খ্রী-তে । নোবেল পুরস্কারের অধিকাংশ অর্থমূল্য তিনি সেখানেই ব্যয় করেন ।

প্রুধোম  ৬ই সেপ্টেম্বর ১৯০৭  খ্রিস্টাব্দ।  ৬৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন ।





প্রুধোম-এর কয়েকটি কবিতার বাংলা রূপান্তর

            জলে  

(On The Water)


তীরের শব্দ , জলের শব্দ ---আমি শুনি

ক্রন্দসী বসন্তের হতাশ সমর্পণ

অথবা সেই প্রস্তরখন্ড যে প্রহরে প্রহরে অশ্রু ঝরায়

আর বার্চগাছের পাতার হালকা কাঁপন ।

নদীতে তো কোনো নৌকো যেতে দেখি না

সময় বয়ে যায় ফুলে ঢাকা তীরে

আর আমি পড়ে থাকি ।

আমি যখন জলের গভীরে ছুঁয়ে দেখি

নীল আকাশ যেন পর্দার মতো দোলে

ঘুমের ভেতর দোলে জল , তীর কোথা !

আমাকে না জানতে দিয়ে আমার জীবননদীর তীরে

ওই ফুলেদের মতোই তো  মানুষ বসবাস করতে চায় ।


 

 

     এ জগতে 

(In The World)

 

এ জগতে ফুল শুকায়
পাখির মিষ্টি গান শেষ হয়ে আসে
আমি এক চিরোষ্ণ কালের কথা ভাবি ।
এ জগতে অধরোষ্ঠ ছোঁয়া হয় মৃদু

সুমিষ্ট স্বাদেরও আর অবশিষ্ট থাকে না
 আমি এক অফুরান চুম্বনের স্বপ্নে থাকি ।
এ জগতে সবার শোক—

সখ্যের বা প্রেমিকার
আমি সব সময় অনুগতের অনুসরণের স্বপ্ন দেখি ।






কোনোদিন  শুনব না দেখব না আর

(Never To See Or Hear Her)

 

ফিরে দেখা হবে না তো আর

যাবে শোনা তার কোনো কথা ?

জোরে ডাকা যাবে  নাম তার ?

তবু তাকে ভালোবেসে সব ব্যস্ততা ।

 

দুই বাহু বাড়িয়ে কী হবে ?

অফসলি আলিঙ্গন তবে ।

পরিণতি অশ্রুমোচন

মধুঋতুস্বপ্নবপন ।

 

কোনোদিন  শুনব না দেখব না আর,

নাম ধরে ডাকব না জোরে ,

ভালোবাসা কমলিনী তবু শতধার

চিরপ্রেম সোচ্চারে ঘোরে ।








**************************************