লেবেল

ধারাবাহিক বিশেষ নিবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক বিশেষ নিবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক বিশেষ নিবন্ধ(পর্ব-৯)। উৎসব- উৎস, প্রভাব, বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা - পার্থ সারথি চক্রবর্তী

 




ধারাবাহিক বিশেষ নিবন্ধ(পর্ব-৯)   

উৎসব- উৎস, প্রভাব, বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা 

পার্থ সারথি চক্রবর্তী 


অনুরূপভাবে, আমাদের বাংলার সাথে মিল আছে এমন স্থান যেমন ওপার বাংলা তথা বিশ্বের সর্বত্র উৎসবের এক বিরাট অর্থনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। যেমন মুসলিমদের অন্যতম প্রধান উৎসব ঈদের প্রেক্ষাপট চিন্তা করা যেতে পারে। গরীবদের মধ্যে দান করা, সকলের সাথে মেলামেশা করা ইত্যাদির মাধ্যমে সবাই আনন্দে সামিল হয়ে ওঠে। কোরানে বলা আছে বিত্তবানদের সম্পদের উপরে গরীবদের হক আছে। বাস্তবে এই ধারণার কতটা প্রতিফলন ঘটে, তা বিশাল সামাজিক বিতর্কের বিষয়। তবে এই উৎসবের দিনগুলোতে তার অনেকটাই ব্যতিক্রম ঘটে। ঈদের নামাজের আগে ' জাকাত ' ও ' ফিতর ' দিতে হয়। সকলে সাধ্যমত নতুন পোশাক কেনে। একটি সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ঈদে লক্ষ কোটি টাকার নগদ লেনদেন হয়। কাপড়ের দোকান ও খাদ্য সামগ্রীর ব্যবসাতেই
এই আমদানি। সরকার যে বোনাস ঘোষণা করে, তা প্রদান করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে টাকা যোগাড় করতে হয় সুদে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণনীতিতে বিশেষ পরিস্থিতিতে শৈথিল্য আনতে হয়। পক্ষান্তরে ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। জাকাতকে ঘিরে প্রচুর অর্থের হাতবদল হয় ও অনেক অর্থই পৌছে যায় সমাজের সব স্তরের মানুষের হাতে। এটিএম বুথে বাড়তি অর্থের ব্যবস্থা রাখতে হয়। ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণ। এ সময় লোকের আনাগোনা বাড়ে ও পর্যটন শিল্পেও নতুন জোয়ার আসে। এটা কোন বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। গোটা বিষয়ের একটা খন্ডচিত্র মাত্র। ভ্রমণকে কেন্দ্র করে এই সময় বাংলাদেশের মতোই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন পাশ্চাত্য দেশ, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ভারত থেকে বহু পর্যটকের আগমন ঘটে। ঈদকে জড়িয়ে পর্যটন, হোটেল, আমোদ প্রমোদ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও প্রচুর অর্থাগম হয়। বৈদেশিক মুদ্রার আমদানি হয়। যাতায়াতের ফলে এয়ারলাইন্স শিল্প,  রিসোর্ট ইত্যাদিও ব্যাপক বাণিজ্য করে ও লাভের মুখ দেখে। মানুষের বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা সহজাত। তার ক্লান্তি, অবসাদ ও একঘেয়েমি কাটাতে পথ খুঁজে নেয়  ভ্রমণের  মধ্য দিয়ে। তাই ভ্রমণও আজ এক উৎসবের চেহারা নিয়েছে। আর উৎসব মরশুমে তা যেন এক বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। উৎসবের সময় মানুষের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক কাজের সুযোগ বেড়ে যায়। জীবনযাত্রার উন্নতির এক ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনে ও সমাজে। তার ধনাত্মক প্রভাব সবার মধ্যে ভাগ হয়।
চিরাচরিত ও প্রচলিত উৎসবগুলোর পাশাপাশি এখন অনেকগুলো দিবস পালিত হয়। যেগুলো উৎসবের চেহারা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, পিতৃদিবস, মাতৃদিবস ইত্যাদি উপলক্ষ্যে প্রচুর মানুষ আনন্দে মাতে। আর উপহার কেনা, রেস্টুরেন্ট যাওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে। যাকে বলা যায়  'Multiplicative effect '। এমনকি খেলাধূলা যেমন বিশ্বকাপ ফুটবল বা ক্রিকেট, অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমস্  ইত্যাদিতেও মানুষ উৎসবের মেজাজে পৌছে যায়। স্টেডিয়াম, শপিং মল, হোটেল,  বিনোদন কেন্দ্রগুলো ভীড়ে গমগম করে। এমনকি নতুন নির্মাণকার্য পর্যন্ত সম্পন্ন করা হয়। কবিতা, সাহিত্য,  চলচ্চিত্র শিল্পেরও উৎসবের তকমা মেলে। উদাহরণস্বরূপ, কান চলচ্চিত্র উৎসবের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। গোটা বিশ্বের প্রচুর মানুষ, অভিনেতা অভিনেত্রী,  কলাকুশলীরা ফ্রান্সে পৌছে যায়। বাংলায় রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। তাকে কেন্দ্র করে প্রচুর পত্রিকা বের হয়। প্রেসে প্রচুর কাজ বাড়ে। লোকের হাতে অর্থ আসে। অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে।
এ শুধু বিশেষ উৎসবের ক্ষেত্রে নয়, সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে উৎসবেরও বদল এসেছে । এবং তা এসেছে অনিবার্যভাবেই। উৎসবের ধরনধারনও বদলেছে। তবে মানবসভ্যতার ইতিহাসে গত এক বছরে করোনা অতিমারির এক অভূতপূর্ব প্রভাব পড়েছে। তাও উৎসব একেবারে থেমে থাকেনি। তবে তার আকার ও প্রকারে পরিবর্তন এসেছে।


চলবে...



--------------------------------------------------------------------------------------------

আপনিও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান। 
ankurishapatrika@gmail.com

---------------------------------------------------------------------------------------------                   

শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক। উৎসব - উৎস, বৈচিত্র্য, প্রভাব ও কার্যকারিতা (পর্ব-৫) পার্থ সারথি চক্রবর্তী





উৎসব - উৎস, বৈচিত্র্য, প্রভাব ও কার্যকারিতা  (পর্ব-৫) 
পার্থ সারথি চক্রবর্তী 


আগের পর্বগুলোতে প্রধান কিছু উৎসবের আলোচনা সংক্ষেপে করা হয়েছে। এছাড়াও  অনেক উৎসব সাড়ম্বরে পালিত হয়ে থাকে।
খ্রিস্টানদের আরো উৎসবগুলোর মধ্যে গুড ফ্রাইডে ও ইস্টার বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।
খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দিনটি গুড ফ্রাইডে নামে পরিচিত। অন্যদিকে লৌকিক উৎসব হিসেবে ' ইস্টার ' কিন্তু চলে আসছে খ্রিস্টজন্মের অনেক আগে থেকে। পরবর্তীতে প্রোটেস্টান্টদের প্রভাবে ইস্টারের নিয়ম কানুনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। তা হয়তো সময়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়েই।

ইহুদিদের উৎসব-

পাস ওভার: আট দিন ব্যাপী এই উৎসব পালিত হয় মিশরীয়দের দাসত্ব থেকে ইহুদিদের মুক্তি উপলক্ষ্যে। কাহিনী শোনা ও ভোজের মাধ্যমে পালন করা হয় এই উৎসব।

সাবাথ: ইহুদিদের বিশ্বাস,  ঈশ্বর ছয় দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন আর সপ্তম দিনে বিশ্রাম নিয়েছেন। এই বিশ্বাস থেকে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সাবাথ উৎসব পালিত হয়। মোমবাতি জ্বালিয়ে,  সিনাগগে প্রার্থনা করে ও খাওয়া দাওয়া করে এই উৎসব পালিত হয়।

রোশ হাশানা: ইহুদিদের নববর্ষের উৎসব। ঈশ্বরের মানুষ সৃষ্টির উপলক্ষ্যে এই দিনে এই উৎসব পালিত হয়। এই দিন থেকে ইহুদিদের নববর্ষ শুরু হয়।

হানুক্কর: নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এ যেন ইহুদিদের ' দীপাবলি '। এক আলোর উৎসব। আর এই উৎসব  চলে আট দিন ধরে।

ইয়োম কিপপুর: ' রোশ হাশানা ' উৎসবের দশ দিন পর সাধারণত এই উৎসবটি হয়ে থাকে। তাদের বিশ্বাস, ঈশ্বর এই দিনে ইহুদিদের সব অপরাধ ও পাপকাজ ক্ষমা করেছিলেন। তাই ইহুদিরা তাদের বিশ্বাস মতে প্রায়শ্চিত্তের জন্য উপোস ও ব্রত রাখেন।







জৈনদের উৎসব-

মহাবীর জয়ন্তী: জৈনদের উপাস্য যতজন তীর্থঙ্কর ছিলেন, তাদের মধ্যে চব্বিশতম ছিলেন মহাবীর। তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও পূজিত। তারঁ জন্মজয়ন্তীতে জৈনদের সর্ববৃহৎ উৎসবটি পালিত হয়। জৈন মন্দিরগুলো রঙ বেরঙের পতাকায় সেজে ওঠে। শোভাযাত্রা বের হয়। মহাবীরের প্রতিকৃতি নিয়ে সুসজ্জিত রথ পথ পরিক্রমায় বের হয়।
জৈনদের ও নিজস্ব একটি ' দীপাবলি ' আছে। যদিও কারণটা ভিন্ন। মহাবীর সেদিন নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছিলেন ও মোক্ষ লাভ করেন ব'লে কথিত আছে। আর তাই তাঁর জ্ঞানের আলো প্রজ্জ্বলিত করে রাখতে আঠারোজন রাজা উপস্থিত হয়েছিলেন বলে বিশ্বাস। তাই ওই রাতে জৈনরা নিজেদের গৃহ আলোকিত করে রাখেন।

পর্যুশন
এই উৎসবকালে জৈন সন্ন্যাসীরা বিশ্রাম করে থাকেন। শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের লোকেরা এই উৎসব পালন করেন আট দিন ধরে আর দিগম্বরেরা দশ দিন ধরে। এই সময় দশগুণের সঞ্চারের জন্য প্রত্যেকে ব্রতী হন।





পারসীদের উৎসব-

গহম্বর: পারসীরা তাদের ছয় ঋতুতে ছয়টি গহম্বর উৎসব পালন করেন। এই সময় বিশ্বের সমস্ত সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়।

জরথ্রুস্ট নো দেশো:  পারসীদের কাছে এ এক গুরুত্বপূর্ণ পরব। এ দিন জরথ্রুস্টের নির্মাণের দিন।

খোরাদাদ সাল: জরথ্রুস্টের জন্মদিন উপলক্ষে এই উৎসব পালিত হয়। প্রাচীনকাল একে ' নভরোজ ই খাস ' নামে উল্লেখ করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সব স্তরের মানুষেরা এই উৎসবের অংশীদার হয়ে থাকেন।


বৌদ্ধদের উৎসব-

বুদ্ধজয়ন্তী: ভগবান বুদ্ধের জন্ম, বোধি লাভ ও মহাপরিনির্বাণ- সবই বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে। আবার কারো মতে, বুদ্ধদেবের স্ত্রী যশোধরা ও কয়েকজন শিস্য ও এ'দিনেই জন্মান। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে তাই বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় উৎসব। জাপান, চিন, কোরিয়া প্রভৃতি দেশে এটি জাতীয় উৎসবের মর্যাদা পেয়ে আসছে।

লোসার:  বৌদ্ধদের নববর্ষের উৎসব হল ' লোসার '। বাড়িঘর আলোকিত করা, প্রার্থনায় সামিল হওয়া ও খাওয়া দাওয়ার মাধ্যমে জমে ওঠে এই জনপ্রিয় উৎসব।



শিখদের উৎসব-

বৈশাখী: দশম শিখ গুরু গোবিন্দ সিংহ এই দিনে শিখদের পবিত্র ' খালসা ' প্রতিষ্ঠা করেন। প্রত্যেক গুরুদ্বারে এ'দিন পবিত্র ' গ্রন্থসাহেব ' পাঠ করা হয়। ' গ্রন্থসাহেব ' নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয়। কীর্তন, তরোয়াল খেলা ও ভাঙরা নাচের প্রদর্শন করা হয়।

গুরুপরব: দশজন শিগগুরুর জন্মদিনই গুরুপরব হলেও প্রধানতঃ গুরু নানকের জন্মদিনই মর্যাদার সাথে ও উৎসাহের সাথে ' গুরুপরব ' হিসাবে পালন করা হয়। কার্ত্তিক মাসের শুরুতেই প্রস্তুতি আরম্ভ হয়ে যায়। ' আলোর উৎসব' এর রূপ ধারণ করে এই উৎসব। সমস্ত শিখ ধর্মাবলম্বীরা আনন্দে মেতে ওঠেন এই উৎসবের আবহে।

(চলবে)

সূত্র- নানান সাময়িকী পত্রিকা।