লেবেল

শ্রদ্ধা ও স্মরণে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শ্রদ্ধা ও স্মরণে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২১ মে, ২০২১

ভারতের নবজাগরণের পিতাঃপ্রসঙ্গ রামমোহন রায় ।। শ্রদ্ধা ও স্মরণে— বিমল মণ্ডল।। Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 




ভারতের  নবজাগরণের পিতাঃপ্রসঙ্গ রামমোহন রায় 

শ্রদ্ধা ও স্মরণে— বিমল মণ্ডল 

"সত্যকে স্বীকার করে রামমোহন তাঁহার দেশবাসীর নিকটে তখন যে নিন্দা ও অসম্মান পেয়েছিলেন, সেই নিন্দা ও অপমানই তাঁর মহত্ত্ব বিশেষ ভাবে প্রকাশ করে। তিনি যে নিন্দা লাভ করেছিলেন সেই নিন্দাই তাঁর গৌরবের মুকুট।”-রবীন্দ্রনাথ


নবজাগরণের অগ্রদূত' রাজা রামমোহন রায়ের।   তিনি প্রথম ভারতীয় ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি দার্শনিক।আঠারো এবং উনিশ শতকে বাংলার মাটিতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা- এসব ক্ষেত্রে যে যে পরিবর্তন এসেছে তার জন্য পুরো কৃতিত্ব রাজা রামমোহন রায়ের।  জন্ম ১৭৭২ সালের ২২ মে৷আজ তাঁর ২৪৯ তম জন্মদিন।  এই দিনটি আপামর বাঙালির পাশাপাশি গোটা দেশের কাছেই একটা উল্লেখযোগ্য দিন ৷ এই দিনেই হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে জন্ম নেন রাজা রামমোহন রায়৷ সারাজীবন অন্ধবিশ্বাস ও গোঁড়ামি থেকে সমাজকে মুক্ত করার লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়কেই বলা হয় ভারতের প্রথম আধুনিক পুরুষ ; ‘আধুনিক ভারতের জনক’ এবং ‘ভারতের নবজাগরণের পিতা’ হিসাবেও অভিহিত করা হয়। 



খুব অল্প বয়সেই বাবার সঙ্গে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে মতের মিল না হওয়ায় তিনি ঘর ছাড়েন। দীর্ঘ ভ্রমণ করেন হিমালয় এবং তিব্বতে। বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর বাবা-মা সন্তানের ‘মতিগতি’ বদলানোর লক্ষ্যে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন। যদিও, তাতে রামমোহন রায়কে কোনওভাবে আটকানো যায়নি। হিন্দুধর্মের একদম গভীরে গিয়ে সেই ধর্মের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে ধর্মব্যবসায়ীদের প্রশ্নের মুখে ফেলাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।সেই সময়ে বাংলায় নেমে এসেছিল কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা এবং অশিক্ষার কালো অন্ধকারে ৷ এই অন্ধকার দূর করতেই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সেই কঠিন লড়াইয়ের ফলেই সতীদাহ প্রথার মতো ঘৃণ্য সামাজিক প্রথার অবসান হয়। ১৮১৪ সালে তিনি কলকাতায় আসেন ও ধর্ম সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। কলকাতায় ১৬ বছরের সংগ্রাম ও সংস্কার রামমোহনের কর্মযুগ বলা যেতে পারে। নবযুগের অগ্রদূত রামমোহন সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে হাতে তুলে নেন রণ-শৃঙ্গ।ফলে স্বাভাবিকভাবে তার অনেক শক্রর সৃষ্টি হয়। একবার তিনি মধু দিয়ে রুটি খেতে খেতে বালক মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলছিলেন-বেরাদর (পারস্য শব্দ ভাই), আমি মধু ও রুটি খাচ্ছি, কিন্তু লোকে বলে আমি গরুর মাংস ভোজন করে থাকি। সামাজিক কুৎসা, জীবনের উপর আক্রমণ সবকিছুই সইতে হয়েছে রামমোহনকে।

সমাজ সংস্কার, প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতির অবস্থান নেওয়ার ফলে রামমোহন কম যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় নাই। সমাজের মানুষের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধেও তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়। রামমোহনের পুত্র রাধাপ্রসাদের বিয়ের সময় তার বিরুদ্ধ দল বিয়ে ভাঙার অনেক চেষ্টা করে। এমনকি রামমোহনকে এক ঘরে করে রাখার আয়োজন করা হয়। যদিও তারা ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু তার বিরোধী পক্ষরাও দমিবার পাত্র ছিল না। তার বিরোধী পক্ষরা রামমোহনের বাড়ির কাছে এসে সকালে মুরগির ডাক ডাকত, বাড়ির ভেতরে গরুর হাড় ফেলে যেত। এমনকি তার বিরুদ্ধে গানও রচনা করে সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল শক্ররা।যেমন—

সুরাই মেলের কুল
(বেটার) বাড়ি খানাকুল,
বেটা সর্বনাশের মূল।
ওঁ তৎসৎ বলে বেটা
বানিয়েছে স্কুল।
ও সে জেতের দফা
করলে রফা, মজালে তিন কুল।''


প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের এতো অত্যাচার সহ্য করার পরও রামমোহনের কোন লেখায় কারো প্রতি কোন বিদ্বেষ দেখা যায়নি। কারণ তিনি ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল একজন মানুষ। ছেলেরা দল বেঁধে রামমোহনকে খেপাইত। কলকাতায় যখন ব্রাহ্মসভায় উপাসনা করতে যেতেন তখন লোকে তার গাড়িতে ঢিল ছুড়ত। তাই বেশির ভাগ সময় গাড়ির জানালা বন্ধ করে রাখতে বাধ্য হতেন। শুধু তাই নয়; তার বিরোধী পক্ষ তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা পর্যন্ত করছে। এই জন্যে রামমোহন তাঁর সঙ্গে কিরিচ ও পিস্তল সঙ্গে নিয়ে বের হতেন। কিন্তু এর পরও কারো বিরুদ্ধে তার কোন অভিযোগ ছিল না। অসহিঞ্চু নীতিতে ছিল তাঁর আস্থা।



রামমোহন কলকাতায় চিন্তাশীল ও সংস্কার প্রয়াসী বিশিষ্ট জনদের নিয়ে একটি সমমনা-সভা গঠন করলেন। সেখানে বেদান্ত শাস্ত্র ও ধর্মের ব্যাখ্যা ও বিচার সম্পর্কে আলোচনা হতো এবং একেশ্বরবাদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন হতো। শহরের শিক্ষিত গণ্য-মান্য ব্যক্তিরা সভায় উপস্থিত হতো। তাদের মধ্যে ছিলেন জোড়াসাঁকোর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, পাথুরিয়াঘাটার  প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, টাকীর কালীনাথ ও বৈকুণ্ঠনাথ মুন্সী, বৃন্দাবন মিত্র, কাশীনাথ মল্লিক, ভূকৈলাসের রাজা কালীশঙ্কর ঘোষাল, তেলিনিপাড়ায় অন্নদাপ্রসাদ ব্যানার্জি, হরিনারায়ণ তীর্থস্বামী এবং বৈদ্যনাথ ব্যানার্জি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া  ব্রজমোহন মজুমদার, হলধর বসু, রাজনারায়ণ সেন, চন্দ্রশেখর দেব, তারাচাঁদ চক্রবর্তী প্রমুখ তাঁর সাহচর্য লাভ করেন।এছাড়া নিজের মত প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ১৮১৫ সালে তিনি ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। সপ্তাহে একদিন আত্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হতে তাতে বেদান্তানুযায়ী এক ব্রহ্মের উপাসনা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হতো। সভায় বেদ পাঠের পর ব্রহ্ম সঙ্গীত গাওয়া হতো। সভা সকলের জন্যে উন্মুক্ত ছিল না। শুধু রামমোহনের কয়েক জন বন্ধু তাতে যোগদান করতে পারতেন। সে সময় নিন্দুকেরা আত্মীয় সভার বিরুদ্ধে গুজব রটায় যে, আত্মীয় সভায় গো মাংস খাওয়া হয়। ফলে অনেক বন্ধু রামমোহনকে ত্যাগ করে। পরবর্তীতে ১৮১৯ সালে আত্মীয় সভা বিহারীলাল চৌবের বাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়।

১৮১৫ সালে রামমোহনের সকল বিচারের ভিত্তিস্বরূপ সর্বপ্রথম বেদান্ত গ্রন্থ বা বেদান্তসূত্র  বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়। বেদান্তসূত্র অতি বিস্তৃত ও কঠিন গ্রন্থ ছিল তাই বাধ্য হয়ে সার সংকলন বেদান্তসার নামে আরেকটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। সময়টা ছিল বাংলা গদ্যরচনার শৈশবকাল। যদিও ১৮০১ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হয়। সেখানে ইংরেজ সিবিলিয়ানদের বাংলা শেখানোর জন্যে কলেজের কয়েকজন পণ্ডিত কয়েকটি বাংলা গ্রন্থ রচনা করেন। যা একেবারে সংস্কৃত-ঘেঁষা সন্ধি সমাজ বিবর্জিত সংস্কৃত বই বলা যায়। রামমোহনের পূর্বে এটাই ছিল বাংলা গদ্য রচনা। রামমোহন সংস্কৃত বহুল বাংলাকে সহজ-সরল করলেন। লোকে যাতে বাংলা পড়তে পারে তার জন্যে তিনি বেদান্ত-গ্রন্থে গদ্য  পড়ার  একটা নিয়ম লিখে দেন। 

১৮১৬ সালে রামমোহনের গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ দেখে ইংরেজ পাদ্রীরা অবাক হোন। তারা রামমোহনের পরিচয় সেসময় ইউরোপে প্রচার করেন। যে বেদ শূদ্র সম্প্রদায় উচ্চারণ করলে জিহ্বা কেটে দেওয়ার রীতি ছিল সেই বেদ-কে সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত করে দেন রামমোহন। আমরা এই ক্ষেত্রে স্মরণ করতে পারি-রাজা রবি ভার্মার কথা। দেবতার মন্দিরে শূদ্রদের জায়গা ছিল না। মন্দিরের দেবতাকে ছবির মাধ্যমে সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেন রাজা রবি ভার্মা। সর্বসাধারণের জন্যে বেদ ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে রামমোহনের বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজে চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে শুরু হয় নির্যাতন। তাই তো ইংরেজি বেদান্ত গ্রন্থের ভূমিকায় রামমোহন রায় লিখেন- ‘’আমি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করে বিবেক ও সরলতার আদেশে যে পথ অবলম্বন করেছি তাতে আমার প্রবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন আত্মীয়গণের তিরস্কার ও নিন্দার পাত্র হতে হল। কিন্তু ইহা যতোই হোক না কেন, আমি এই বিশ্বাসে ধীরভাবে সমস্ত সহ্য করতে পারি যে, একদিন আসবে, যখন আমার এই সামান্য চেষ্টা লোকে ন্যায় দৃষ্টিতে দেখবে। হয়তো কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করবেন। লোকে যাই বলুক না কেন, অন্তত: এই সুখ হতে আমাকে কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না। আমার আন্তরিক অভিপ্রায় সেই পুরুষের নিকট গ্রাহ্য, যিনি গোপনে দর্শন করে প্রকাশ্যে পুরস্কৃত করবেন।” রামমোহনের ভবিষ্যৎ বাণী ব্যর্থ হয় নাই।

রামমোহনের বই ও বইয়ের অনুবাদের ফলে দেশে বিদেশে রামমোহনের নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। লন্ডন, ফ্রান্স, আমেরিকায়ও রামমোহন খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সেই সাথে ভারতে রামমোহনের বিরুদ্ধে দেশে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৮১৩ সালে মাদ্রাজ গভর্নমেন্ট কলেজের প্রধান ইংরেজি শিক্ষক শঙ্কর শাস্ত্রী মাদ্রাজ কুরিয়ার পত্রিকায় রামমোহনের বিরুদ্ধে প্রতিমা পূজার সমর্থন করে একটি চিঠি লেখেন। তার উত্তরে রামমোহন A Defence of Hiduism বা হিন্দুধর্মের সমর্থন নামে একটি প্রতিবাদ গ্রন্থ রচনা করেন। সেই বইতে শঙ্কর শাস্ত্রী’র চিঠিরা পুনর্মুদ্রণ করা হয়। এছাড়া রামমোহনের বিরুদ্ধে আরো বহু গ্রন্থ রচনা করে তাঁর বিপরীত পক্ষ। যেমন: পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার রচিত- বেদান্তচন্দ্রিকা। রামমোহন প্রতিটি বই কিংবা লেখার বিপরীতে গ্রন্থ রচনা করেন এবং বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করেন। এমনকি বিদ্যালঙ্কার যখন কদর্য ভাষায় রামমোহনকে আক্রমণ করেন তখনও রামমোহন তাঁর লেখার উদারতা ও মহানুভবতার পরিচয় দেন।




রামমোহন রায়ের  আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বাইরের দেশে ভ্রমণ এবং সেখানে যা কাজ হচ্ছে, সেগুলোর সাথে বাংলার মানুষদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তিনি জানতেন যে, শিক্ষা ছাড়া এই দেশের মানুষ কখনও উন্নতি করতে পারবে না। আবার উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাদের মতো করে ভাবতে হবে, তাদের কাজগুলো বুঝতে হবে, তাদের সংস্কৃতির সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে হবে। রাজা রামমোহন রায়ের পশ্চিমা দেশের সংস্কৃতি নিয়ে এবং তাদের সেখানে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া জ্ঞান নিয়ে আমূল আগ্রহ ছিল।

সেই সময়ে বিজ্ঞানে চলছিল নিউটন পরবর্তী যুগ এবং শিল্প-কারখানা সৃষ্টির একটি রেনেসাঁ যুগ। তখন পশ্চিমারা নিজেদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত করার চেষ্টা করছে। রাজা রামমোহন রায়ের মনে হয়েছিল, পশ্চিমে বিশেষ করে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানে যা হচ্ছে, তা কখনোই ফেলে দেয়ার মতো না এবং এসবকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। এজন্য তিনি দেশে ফিরে নিজেদের পড়াশোনার মধ্যে ইংরেজি ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার উপর জোর দেন এবং সমাজের মানুষদেরকে বোঝান যে নিজেদের দেশকে উন্নতির শিখরে নিতে হলে অবশ্যই সংস্কৃত ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাটাও রপ্ত করতে হবে। সে সময়ের চিত্র যদি আমরা এখন পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়ে বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশ এবং ইউরোপের মধ্যে সেসময় কী পরিমাণ পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছিলো, যেটা তখন রামমোহন রায় বুঝতে পেরেছিলেন।নিউটনের সময়ে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উন্নতি সাধন হয়, সেটার পেছনে সেই দেশের অভিজাত শ্রেণির মানুষদেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। রয়্যাল সোসাইটি এবং এর মতো আরও কিছু প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারকে প্রচার করেছিলো এবং বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো। অন্যদিকে বাংলার মাটিতে এমন কাজ করার কেউ ছিল না। ইংরেজদেরও একধরনের অনিচ্ছা ছিল এই দেশের মানুষদের উন্নত করার প্রতি। এখানকার মানুষদের খাটিয়ে নিয়ে তারা নিজেদের দেশের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি করছিলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানে ক্রমেই যে দুই দেশের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, রামমোহন রায় তা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই যখন ইংরেজরা কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ তৈরি করার কথা বলে, তখন তিনি প্রচণ্ডভাবে সেটার বিরোধিতা করেন। সেখানে তিনি প্রস্তাব করেন শুধু সংস্কৃতি নয়, সেখানে বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, ভূগোল এসব বিষয়ও পড়াতে হবে। তার ধারণা ছিল পশ্চিমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবং তাদের নিত্য-নতুন আবিষ্কার এবং ধারণাগুলোকে বুঝতে হলে উপমহাদেশ তথা বাংলার ছেলেমেয়েদেরকেও এসব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান দিতে হবে, যাতে তারা নিজ দেশকে উন্নত করতে পারে এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর সাথে যেন প্রতিযোগিতা করতে পারে। তার এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ধারণা আমাদের দেশের সমাজে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছিলো।



অনেকেই মনে করেন, রাজা রামমোহন রায় পশ্চিমাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করতেন, কিন্তু আদৌ ব্যাপারটি এরকম ছিল না। তিনি বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায় যখন খ্রিস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক সমালোচিত হতো, তখন কড়া ভাষায় সেগুলোর প্রতিবাদ করতেন। ঠিকভাবে প্রতিবাদ করার জন্যই তিনি গ্রিক এবং হিব্রু ভাষা শিখেছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলার মানুষদের স্বাধীন চিন্তাধারার পক্ষে ছিলেন। সেজন্য ব্রাহ্ম সমাজ নামক একটি ধর্মীয় সংঘও গড়ে তোলেন, যেখানে স্বাধীন চিন্তাধারার বিষয়ে আলোচনা করা হতো এবং তাদের বিশ্বাস সমাজে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া হতো। এমনকি তিনি যখন দিল্লির সম্রাটের পক্ষ থেকে ১৮৩০ সালে ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিতে যান, তখন তার কথা এবং আলোচনার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ যে জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ দেশ, তা পুরোপুরি প্রকাশ পায়। ১৮৩৩ সালের সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখে বাংলার এই মহান পণ্ডিত এবং সমাজ-সংস্কারক ইংল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন।



আজকের দিনে দাঁড়িয়েও, নারীকে পুরুষের সমান স্থানটি পাওয়ার জন্য, নিজের অধিকারের জন্য, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে যেতে হয়। কিন্তু, আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে, সতীদাহের মতো ভয়ঙ্কর একটি প্রথা কুরে কুরে খেয়ে নিয়েছিল সমাজকে, সেই সময়ে, রামমোহন রায়ের মতো মানুষই প্রথম রুখে দাঁড়ান এর বিরূদ্ধে। কোনও মহিলার স্বামীর মৃত্যুর পর, স্বামীর চিতাতেই সেই মহিলাকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হত।রামমোহন রায় অবিরামভাবে সারা জীবন সামাজিক কিছু রীতিনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে জাত বা সমাজের স্তরবিন্যাস ও জাতি বিদ্বেষ এবং আরেকটি সতীদাহ প্রথা। তার সময়ে এই দুই রীতির প্রভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং চেতনাবোধের অভাব দেখা দেয়। শক্ত হাতে তিনি তা দমন করেন।

তিনি মহিলাদের সমান অধিকারের দাবিতে প্রথম আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের অংশ হিসাবেই ছিল মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার এবং পুনর্বিবাহের অধিকারের কথাও।



ভারতের নবজাগরণের এই প্রাণপুরুষকে ওনার ২৪৯তম  জন্মবার্ষিকীতে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।







    





রবিবার, ২ মে, ২০২১

বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায়-এর জন্মশতবর্ষ; শ্রদ্ধা ও স্মরণে:- গৌরী পাল।। Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 




বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায়-এর জন্মশতবর্ষ;

শ্রদ্ধা ও স্মরণে:- গৌরী পাল




সত্যজিৎ রায় শুধু চলচ্চিত্রকার নয়, তিনি শিল্প সাহিত্যের সক্রিয় সারথি, বহুমুখী ব্যক্তিত্বের প্রতিভূ।কালান্তরের চিত্রনাট্যকার,শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক, লেখক, সঙ্গীত স্বর লিপিকার,সম্পাদক, প্রকাশক ও প্রচ্ছদ শিল্পী।তাঁর  সাধনা শিল্পের সাধনা, তাঁর  ধর্ম শিল্পের ধর্ম। সবাই নিজ নিজ উপলব্ধির জায়গা থেকে যাপন করেন তাকে, বিশ্লেষণ করেন নিজস্ব পঠন পাঠন থেকে।চিত্রের ব্যবচ্ছেদ করেন অনুভবের বোধ থেকে। তবু প্রকাশ থাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের এক বিরল ব্যক্তিত্ব  সত্যজিৎ রায়। বিশেষ করে চলচ্চিত্র পরিচালনায় তার অসাধারণ নৈপুণ্য, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে একটি  নক্ষত্র হয়ে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। মায়ের আদরের মানিকের চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি বড়, মাথায় এক ঝাঁকড়া চুল। যেন বাংলার শিল্প শহরে একসাধকের আবির্ভাব। তাঁর  শৈশব থেকে চলনে-বলনে, পোশাকে-আশাকে এমন এক সৌন্দর্য ছিল,যা মননশীল আভিজাত্যে পূর্ণ।



সত্যজিৎ রায়ের শুভ জন্মদিনে শুভেচ্ছা...


শুনেছি পূর্নিমা রাতে এসেছো তুমি

ধরনীর কোলে,

সেদিন খুশির হাট বসেছিল

তারা'র দেশে।


তোমার জন্যে পৃথিবীতে আজ

আলোর ধারা,

তোমার জন্যে বাগানে আজ

ফুলের মেলা,

তোমার জন্যে জোনাক জ্বলে

পুকুর পাড়ে,

তোমার জন্যে কাঁচপোকারা

গান গায় সুরে সুরে।


দক্ষিণের জানালায় বইছে

সুরেলা বাতায়ন,

পাখিদের ঠোটে আজ

উল্লাসের মাতম।

বৃষ্টিবিলাসী ধানের ক্ষেতে

সবুজের ঢেউ দোলে,

চিরদুঃখি কৃষাণির মুখে

হাসির খৈ ফুটে।

রূপালী চাঁদের মেলা বসেছে

তোমার উঠোনে,

নদীর বুকে জোয়ার এসেছে

তোমার আগমনে।


তোমার তরে রক্তজবা

হাজার ফুলের উৎসব,

তোমার তরে কোকিলের গান

দোয়েলের শীষ।


তোমার তরে কৃষ্ণচূড়া

তোমার তরে আকাশ নীল,

তোমার তরে রংধনু রং, 

আজ তোমার জন্মদিন।


তোমার তরে শুভেচ্ছা আমার

নীল খামে রবে অমলিন।


ছড়িয়ে দাও তোমার সৌরভ

ছড়িয়ে দাও ভালবাসা,

রাঙিয়ে দাও তোমার পৃথিবী 

বেঁচে থাকো নিয়ে আশা।


তোমার আলোয় ঘোচে যাবে

নিরাশার অন্ধকার,

তোমার আলো জ্বালিয়ে দাও

পৃথিবীর এপার-ওপার।





আরও পড়ুন 👇👇👇


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/05/blog-post.html




শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০

স্বল্প-পরিচিত কবি -জন কীটস।। জন্মদিন।। শ্রদ্ধা ও স্মরণেঃ—বিমল মণ্ডল

 














John Keats

স্বল্প-পরিচিত কবি -জন কীটস
 শ্রদ্ধা ও স্মরণেঃ—বিমল মণ্ডল 



কীটসের প্রাথমিক মৃত্যুর ফলে কতটা হারিয়ে গেছে তা বলা অসম্ভব। তবে উনিশ শতকের জুড়ে তাঁর খ্যাতি অবিচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যদিও ১৮৪০ এর দশকের শেষের দিকে প্রি-রাফেলাইট চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হলম্যান হান্ট তাকে "এই স্বল্প-পরিচিত কবি" হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আলফ্রেড, লর্ড টেনিসনের প্রথম দিকের কাজ থেকে শুরু করে ভিক্টোরিয়ান যুগের আলংকারিক রোমান্টিক শ্লোকে তাঁর প্রভাব সর্বত্র পাওয়া যায় । তাঁর সাধারণ আবেগময় মেজাজ এবং তার প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণের এক মুহূর্তের  স্বাদযুক্ততা প্রাক-রাফেলাইটরা প্রশংসিত হয়েছিল , যিনি উভয়ই তাঁর নিজের কবিতাকে স্বকীয়ভাবে প্রতিপন্ন করেছিলেন এবং তাদের চিত্রগুলিতে চিত্রিত করেছেন। কিটসের উনিশ শতকের অনুসারীরা পুরোপুরি তাঁর কাজের আরও সূক্ষ্ম দিকগুলিকে মূল্যবান বলে বিবেচনা করেছিলেন 

ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম রোমান্টিক কবি জন কীটস। লর্ড বায়রন ও পার্সি বিশি শেলির সাথে সাথে তিনিও ছিলেন দ্বিতীয় প্রজন্মের রোমান্টিক কবিদের একজন। কবিতা ছাড়া কীটস কোনো গদ্য লেখার চেষ্টা করেননি। তার কবিতা ইন্দ্রিয় বিষয়বস্তু কেন্দ্রিক। তার কাব্য জীবন ছিল মাত্র ছয় বছর (১৮১৪-১৮১৯)। অর্থাৎ উনিশ থেকে চব্বিশ বছর বয়স। তাঁর মৃত্যুর মাত্র চার বছর আগে তাঁর সৃষ্টিগুলো প্রকাশিত হয়। তৎকালীন সমালোচকদের দৃষ্টিতে তার কবিতা খুব একটা উচ্চ মর্যাদা পায়নি। তবে তার মৃত্যুর পর তার কবিতাগুলো সঠিক মূল্যায়ন পেতে শুরু করে। ১৮১৭ সালে ৩০ টি কবিতা ও সনেটের সমন্বয়ে Poems শিরোনামে প্রকাশিত হয় কীটসের কাব্য সংকলন। এই কবিতাগুচ্ছ কীটসকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের পাশে স্থান দিয়েছে। কীটসের বিখ্যাত কবিতা গুলোর মধ্যে রয়েছে The Eve of St Agnes, La Belle Dame Sans Merci, Ode to a Nightingale, To Autumn, Ode On A Gracian Urn ইত্যাদি। ইংরেজি ভাষায় পাঁচটি বিখ্যাত Ode এর মধ্যে Ode to a Nightingale অন্যতম। Ode On A Gracian Urn এ কীটসের একটি বিখ্যাত উক্তি হলঃ Beauty is truth, truth beauty that is all Ye know on earth, and all ye need to know. উনিশ শতকের শেষ দিকে তিনি অন্যতম জনপ্রিয় ইংরেজি  কবির স্বীকৃতি পান। পরবর্তীকালে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকের ওপর তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতে, কিটসের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় তাঁর সাহিত্যিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। ১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান জন কীটস।



জন কীটস ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর লন্ডনের মুরগেটের এক আস্তাবলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা থমাস কীটস এবং মা ফ্রান্সিস জেনিং। দু'শ বছর আগের কথা। লন্ডন শহরের প্রাণকেন্দ্রে ছিল একটি আস্তাবল। এমনি একটি আস্তাবলের পরিচালক ছিলেন টমাস কীটস। নিচে আস্তাবল, উপরে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন টমাস। স্ত্রী আস্তাবলের মালিকের মেয়ে। কাজের প্রয়োজনে টমাসকে যেতে হতো মালিকের বাড়িতে। সেখানেই দুজনের দেখা, তারপর প্রেম, একদিন বিবাহ। বিবাহের এক বছর পর ১৭৯৫ সালের অক্টোবর মাসে টমাস কীটস ও ফ্রান্সিস জেনিং দম্পতির প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। যথাসময়ে শিশুর নামকরণ করা হলো জন কীটস। ১৮০৪ সালে তার বাবা টমাস কীটস ঘোড়া থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর কীটসের মা রলিগুস নামে একজনকে বিয়ে করলেন। কিন্তু অল্পদিনেই দুজনের সম্পর্কে ফাটল ধরল। এক বছরের মধ্যেই বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় তাদের। এর পর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি এলেন কীটসের মা। কীটস তখন দশ বছরের ছেলে। ১৮১০ সালে মারা গেলেন কীটসের মা। মরার আগে নিজের অজান্তেই রাজরোগ যক্ষ্মার বীজ দিয়ে গেলেন সন্তানদের।

কীটস প্রথমে এনফিল্ডের একটি স্কুলে ভর্তি হন। দিন-রাত পড়াশোনা নিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে মনের খেয়ালে কবিতা লেখেন। ১৫ বছর বয়সে স্কুলের পড়া শেষ হলো। কীটসের অভিভাবকের ইচ্ছা কীটস ডাক্তারি পড়বেন। ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হলেন মেডিকেল কলেজে। কিন্তু যার মনের মধ্যে জেগে উঠেছে কবিতার নেশা, হাসপাতালের ছুরি কাঁচি ওষুধ রোগী তার ভালো লাগবে কেন। সৌভাগ্য সেই সময় তার স্কুলের বন্ধু কাউডেন ক্লার্ক কীটসকে নিয়ে গেলেন সেই সময়ের খ্যতিমান তরুণ কবি লে হান্টের কাছে। হান্টের সাথে পরিচয় কিটসের জীবনে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। হান্ট কীটসের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হলেন, তাকে আরো কবিতা লেখার জন্য উৎসাহিত করলেন। হান্ট একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। সেই পত্রিকাতেই কীটসের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হলো। এখানে কীটসের পরিচয় হলো শেলির সাথে। আর ডাক্তারির মোহে নিজেকে বেঁধে রাখতে পারলেন না। অভিভাবকের উপদেশ অগ্রাহ্য করে ১৮১৬ সালে মেডিকেল কলেজ ছেড়ে দিয়ে পরিপূর্ণ ভাবে কবিতায় মনোনিবেশ করেন। ১৮১৮ সালে কীটসের ভাই টম মারাত্মকভাবে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন এবং কীটস তার সেবা যত্ন করেন। কিন্তু টম ডিসেম্বরে মারা যান। এর পরে কীটস তার বন্ধু চার্লস ব্রাউনের হ্যাম্পস্টেডর বাসায় চলে আসেন।

এখানে এসে কীটস ফ্যানি ব্রন নামে ১৮ বছরের এক তরুণী প্রতিবেশীর প্রেমে পড়ে যান। ফ্যানি ব্রন, সুন্দরী প্রাণোচ্ছল তরুণী। ফ্যানি তাঁর মায়ের সাথে ব্রাউনের বাড়ির ভাড়াটিয়া হয়ে এসেছিল। কয়েক দিনের পরিচয়ে ভালো লেগে গেল দু'জনের। কীটস ফ্যানিকে বিবাহ করতে চাইলেন। ফ্যানি সম্মত হলেও সংসার অভিজ্ঞ মিসেস ব্রন তৎক্ষণাৎ কোনো সম্মতি দিলেন না। বললেন, আগে কীটস স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক তারপর বিয়ে হবে। কীটস স্থির করলেন যেমন করেই হোক তাকে অর্থ উপার্জন করতেই হবে। স্বাস্থ্য আগের মতো ভালো যাচ্ছিল না। কিন্তু মনের অদম্য শক্তিতে কীটস লিখে চললেন একের পর এক কবিতা। এর পর থেকেই কীটসের সৃষ্টিশীল সময়ের সূচনা হয়। প্রকৃতপক্ষে কীটসের জীবনের সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিতাই এই সময়ে লেখা।


অল্পদিনের মধ্যে কীটস প্রকাশ করলেন তার প্রথম কবিতা সংকলন। সকলের মনে আশা ছিল এই বই নিশ্চয়ই জনপ্রিয় হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য কীটসের, পরিচিত কিছু লোকজন ছাড়া এই বইয়ের একটি কপিও বিক্রি হলো না। প্রথম কাব্য সংকলনের ব্যর্থতায় সাময়িক আশাহত হলেন কীটস। কিন্তু অল্পদিনেই নতুন উৎসাহে শুরু করলেন কাব্য সাধনা। লেখা হলো প্রথম দীর্ঘ কবিতা এন্ডিমিয়ন। এ এক অসাধারণ কবিতা। এই কবিতার প্রথম লাইনের মধ্যেই কীটসের জীবন দর্শন ফুটে উঠেছে। A thing of beauty is joy forever. কীটস আশা করেছিলেন তার এই কবিতা নিশ্চয়ই খ্যাতি পাবে। কিন্তু তৎকালীন দুটি পত্রিকা ব্ল্যাকউড ম্যাগাজিন এবং কোয়াটার্লি রিভিউ তীব্র ভাষায় কীটসের নামে সমালোচনা করল। জঘন্য সে আক্রমণ। এই তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ সমালোচনা প্রকৃতপক্ষে কীটসের মানসিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। তা ছাড়াও আর্থিক অবস্থা ভালো যাচ্ছিল না কিটসের। কীটসের শরীর যতই ভেঙে পড়ছিল ততই ফ্যানি তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। তার সাজগোজ হাসি, অন্য ছেলেদের সাথে মেলামেশা কীটস সহ্য করতে পারতেন না। তার সমস্ত অন্তর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেত।

লন্ডনে ফিরে এলেন কবি জন কীটস। একদিন বাইরে বেড়াতে বেরোলেন তিনি। বাড়িতে ফিরে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল, সেই সাথে কাশি। এক ঝলক রক্ত উঠে এল মুখ দিয়ে। কীটস বললেন, একটি মোমবাতি নিয়ে এস। ব্রাউন মোমবাতি নিয়ে আসতেই কীটস কিছুক্ষণ রক্তের দিকে চেয়ে বললেন, এই রক্তের রং আমি চিনি, এ রক্ত উঠে এসেছে ধমনী থেকে। এই রক্ত আমার মৃত্যুর সমন। ডাক্তার এল। সে যুগে যক্ষ্মার কোনো চিকিৎসা ছিল না। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে শিরা কেটে কিছুটা রক্ত বের করে দেওয়া  হলো। কিন্তু তাতে কোনো সুফল দেখা গেল না। তখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ। গলার স্বর ভেঙে গিয়েছিল, মাঝে মাঝেই জ্বর হতো, গলা দিয়ে রক্ত উঠে আসত, এই সময় তার সৃষ্টির উৎসও ফুরিয়ে আসছিল।

১৮২০ সালের শুরুর দিকে কীটসের যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। ওই বৎসরের জুলাই মাসে তার কবিতার দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশ হয় কিন্তু তখন সে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেপ্টেম্বরে উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে কীটস ও তার বন্ধু জোসেফ সেভার্ন ইতালি গমন করেন। তারা আশা করেছিলো এতে কীটসের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। তারা যখন রোম পৌছেন তখন কিটস অসুস্থতার কারণে বিছানায় পড়ে যান। কীটসের বন্ধু সেভার্ন তাকে যথাসাধ্য সেবা যত্ন করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ১৯২১ সাল। সমস্ত দিন কেমন আচ্ছন্ন ছিলেন কীটস। রাত তখন প্রায় এগারোটা, মাথার পাশে বসে ছিল বন্ধু সেভার্ন। আস্তে আস্তে কীটস বললেন, ‘আমাকে তুলে ধর, আমার মৃত্যু এগিয়ে এসেছে। আমি শান্তিতে মরতে চাই, তুমি ভয় পেয়ো না-ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, অবশেষে মৃত্যু এল।’ ২৫ বছর বয়সে ১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইতালীর রোমে সেভার্নের কোলেই চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়লেন চিরসুন্দরের কবি কীটস। মৃত্যুৃর পর তাকে রোমের প্রটেস্টান্ট সিমেটারিতে কবর দেওয়া হয়। তাঁর  সমাধিলিপিতে লেখা রয়েছেঃ ‘Here lies One Whose Name was writ in writer।' দুই বছর পরে এই সমাধিক্ষেত্রেই সমাধি দেওয়া  হয় আর এক তরুণ কবি শেলিকে।

কবিতায় কল্পনার সৌন্দর্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন কীটস। সৌন্দর্যই ছিল তাঁর কাছে শেষ সত্য, আর কল্পনার মধ্য দিয়েই তাতে উপনীত হওয়া যায় বলে মনে করতেন তিনি। মাত্র ২৫ বছর বয়সে শেষ হয়ে গিয়েছিলেন জন কীটস। ইতিহাস বলছে, যক্ষ্মাই কেড়ে নিয়েছিল এই তরুণ কবির প্রাণ। সত্যি তাই, অকালে চলে গেলেন ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি জন কীটস অনেক ক্ষত নিয়ে।

---------------------------------------------------------------------------     
তথ্যসূত্র; -কীটস রচনাবলী,উইকিপিডিয়া 
--------------------------------------------------------------------------------------------

পড়ুন ও পড়ান। 

অঙ্কুরীশা পত্রিকা    

মতামত জানান।    

মৌলিক ও অপ্রকাশিত   লেখা পাঠান 
ankurishapatrika@gmail.com

-------------------------------------------         

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২০

সমালোচনামূলক সংবর্ধনার ইতিহাসে এডগার এল্যান পো।। শ্রদ্ধা ও স্মরণে- বিমল মণ্ডল

 






সমালোচনামূলক সংবর্ধনার ইতিহাসে এডগার এল্যান পো

শ্রদ্ধা ও স্মরণে- বিমল মণ্ডল       



একটি স্বপ্ন
এডগার অ্যালান পো

অন্ধকার রাতের দর্শন
আমি বিদায় নিয়েছি স্বপ্ন দেখেছি—
তবে জীবন ও আলোকের জাগ্রত স্বপ্ন
আমাকে ভগ্ন হৃদয় রেখে গেছে।

আহ! দিনের পর দিন কি স্বপ্ন নয়
যার দিকে চোখ
একটি রশ্মি নিয়ে তার চারপাশের জিনিসগুলিতে
অতীতকে ফিরিয়েছে?

সেই পবিত্র স্বপ্ন — সেই পবিত্র স্বপ্ন,
যখন সমস্ত বিশ্ব চঞ্চল ছিল,
আমাকে একটি সুন্দর মরীচি হিসাবে উৎসাহিত করেছে
একাকী আত্মা অনুসরণ 

সেই হালকা হলেও, ঝড় ও রাতে,
তাই দূর থেকে কাঁপছে
এর চেয়ে বিশুদ্ধ উজ্জ্বলতা আর কী হতে পারে
সত্যের দিন তারকা?

(ভাষান্তর - বিমল মণ্ডল)   


বিশ্ব সাহিত্যের প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসাবে এডগার অ্যালান পোয়ের মর্যাদাগুলি মূলত তাঁর উদ্ভাবনী এবং গভীর সংক্ষিপ্ত গল্প, কবিতা এবং সমালোচনামূলক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে নির্মিত, যা কবিতা এবং কল্পকাহিনী উভয় ক্ষেত্রেই সংক্ষিপ্ত রূপের জন্য অত্যন্ত প্রভাবশালী যুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আধুনিক ছোটগল্পের স্থপতি হিসাবে সাহিত্যের ইতিহাস এবং হ্যান্ডবুকগুলিতে নিখুঁত, পোও উনিশ  শতকের ইউরোপীয় সাহিত্যে "শিল্পের পক্ষে শিল্প" আন্দোলনের প্রধান অগ্রদূত ছিলেন। যেখানে পূর্বের সমালোচকরা মূলত নৈতিক বা আদর্শিক সাধারণতার সাথে নিজেকে উদ্বিগ্ন করেছিলেন, পো তাঁর সমালোচনাগুলি স্টাইল এবং নির্মাণের নির্দিষ্টকরণগুলিতে মনোনিবেশ করেছিলেন যা কোনও কাজের কার্যকারিতা বা ব্যর্থতায় অবদান রেখেছিল। নিজের কাজে তিনি ভাষা ও কৌশলের একটি উজ্জ্বল আদেশের পাশাপাশি একটি অনুপ্রাণিত এবং মূল কল্পনাও প্রদর্শন করেছিলেন।

পো নিজেকে কেবল কবিতা ও কথাসাহিত্যের এক উচ্চমানের লেখক হিসাবেই পরিচিতি দিয়েছিলেন না, এমন সাহিত্যিক সমালোচক হিসাবেও পরিচিত করেছিলেন যার কল্পনাশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি এখনও পর্যন্ত আমেরিকান সাহিত্যে অপ্রকাশিত ছিল। ১৮৩০ এর  শেষের দিকে এবং ১৮৪০ এর  গোড়ার দিকে পোয়ের লেখাগুলি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তাঁর কাজ থেকে প্রাপ্ত লাভ খুব কমই থেকে যায়  এবং ফিলাডেলফিয়া এবং  ব্রডওয়ে জার্নালে বার্টনের জেন্টলম্যানস ম্যাগাজিন  এবং  গ্রাহামের ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে তিনি নিজেকে সমর্থন করেছিলেন। 

 

বিশ্বসাহিত্যে পোয়ের সবচেয়ে সুস্পষ্ট অবদান বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি থেকেই তিনি সৃজনশীল লেখক এবং তাঁর সমসাময়িকদের রচনার সমালোচক হিসাবে অনুশীলন করেছিলেন।  তাঁর স্ব-ঘোষিত উদ্দেশ্যটি ছিল এক মিলিয়তে কঠোরভাবে শৈল্পিক আদর্শ গঠন করা যা তিনি সাহিত্যের উপযোগী মূল্যবোধের সাথে অত্যাধিক  উদ্বিগ্ন বলে মনে করেছিলেন, এমন একটি প্রবণতা যা তাকে "ডিড্যাক্টিকের ধর্মবিরোধী" বলে অভিহিত করেছিলেন। যদিও পো এর অবস্থান বিশুদ্ধ নান্দনিকতার প্রধান প্রয়োজনীয়তা অন্তর্ভুক্ত করে, সাহিত্যিক আনুষ্ঠানিকতার উপর তার জোর তার দার্শনিক আদর্শের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল: ভাষার গণনার ব্যবহারের মাধ্যমে কেউ সর্বদা অসম্পূর্ণভাবে, সত্যের দর্শন এবং মানুষের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয় অবস্থা প্রকাশ করতে পারে। সাহিত্যের সৃষ্টির পো এর তত্ত্বটি দুটি কেন্দ্রীয় পয়েন্টের জন্য উল্লেখ করা হয়েছে:—

 প্রথমতঃ-একটি কাজ অবশ্যই পাঠককে সফল হিসাবে বিবেচিত হওয়ার জন্য প্রভাবের ঐক্য তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীযতঃ-এই একক প্রভাবের তৈরি  অনুপ্রেরণার ঝুঁকির মধ্যে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়, তবে স্টাইল এবং বিষয়টির ক্ষুদ্রতম বিবরণে লেখকের পক্ষে যুক্তিযুক্ত আলোচনার ফলাফল হওয়া উচিত। কবিতায়, এই একক প্রভাব অবশ্যই পাঠকের সৌন্দর্যের বোধকে জাগিয়ে তুলবে।
এই আদর্শ পো যে দুঃখ, কষ্টের   সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত; গদ্যের ক্ষেত্রে এই প্রভাবটি কিছু সত্যের প্রকাশ হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে।   যেমন "অনুপাতের গল্প" বা "সন্ত্রাস, বা আবেগ বা ভৌতিক ঘটনা" উদ্দীপনার কাজ করে।একটি সাধারণ তাত্ত্বিক ভিত্তি বাদে, একটি মানসিক তীব্রতা রয়েছে যা পো এর লেখার অন্যতম  বৈশিষ্ট্য। বিশেষ  করে গল্পগুলি যা তাঁর সেরা এবং সর্বাধিক পরিচিত রচনাগুলিকে সমন্বিত করে। এই গল্পগুলিতে- যার মধ্যে রয়েছে "দ্য ব্ল্যাক ক্যাট," "দ্য ক্যাস্ক অফ অ্যামোনটিল্যাডো" এবং "দ্য টেল-টেল হার্ট" - প্রায়শই প্রথম-ব্যক্তি বর্ণনাকারীর দ্বারা বলা হয়, এবং এই ভয়েসের মাধ্যমে পো কোনও চরিত্রের মানসিকতার কাজটি অনুসন্ধান করে। এই কৌশলটি ফায়োডর দস্তয়েভস্কির মনস্তাত্ত্বিক অন্বেষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদের বিদ্যালয়ের পূর্বাভাস দেয়। তাঁর গথিক গল্পগুলিতে, পোও মূলত প্রতীকী, প্রায় রূপক পদ্ধতিতে কাজ করেছিল যা "হাশ অব হাউসারের পতন," "রেড ডেথের মসজিদ" এবং "লাইজিয়ার" মতো এর প্রতীকী কাজের সাথে  যুক্ত। পোয়ের গল্পগুলির প্রভাবটি পরবর্তীকালের লেখকদের কাজে দেখা যেতে পারে, যেমন অ্যামব্রোজ বিয়ার্স এবং এইচপি লাভক্রাফ্ট, যারা পোয়ের সূচনা করেছিলেন ভৌতিক সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক ভৌতিক গল্পের স্রষ্টা হিসাবে তাঁর কৃতিত্বের পাশাপাশি পো কে আরও দুটি জনপ্রিয় ঘরানা: বিজ্ঞান কল্পকাহিনী এবং গোয়েন্দা গল্পের প্যারেন্টিংয়ের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। “দ্য অনুপম সাহসিক অফ হ্যান্স পাফাল” এবং “ভন কেম্পেলেন এবং তাঁর আবিষ্কারের মতো কাজগুলিতে,” উনিশ  শতকের গোড়ার দিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণের যে আকর্ষনীয় ও চমকপ্রদ বিবরণ তৈরি হয়েছিল তা এক ধরণের সাহিত্যের প্রত্যাশা করে পোও মনোযোগ নিয়েছিলেন যা বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্যাপকভাবে অনুশীলিত হয়নি। একইভাবে, পো'র অনুপাতের তিনটি কাহিনী - "দ্য ম্যুর্ডস ইন দ্য রিও মর্জি," "দ্য পার্লোইনড লেটার, "এবং" মেরি রোজের রহস্য "- এমন একটি মডেল হিসাবে স্বীকৃত যা গোয়েন্দা কথাসাহিত্যের প্রধান চরিত্রগুলি এবং সাহিত্যিক সম্মেলনগুলি প্রতিষ্ঠা করে, বিশেষত অপেশাদার  যিনি এমন কোনও অপরাধ সমাধান করেন যা কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করেছে এবং যার দ্বারা প্ররোচিত যুক্তির প্রমাণগুলি দলিল করেছে সহযোগী পো যেভাবে বহু সফল লেখককে প্রভাবিত করেছিল এবং সিম্বলিজম এবং পরাবাস্তববাদের মতো বড় সাহিত্যিক আন্দোলনের পূর্বপুরুষ হিসাবে গণ্য হয়, তেমনি তিনি পূর্ববর্তী সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব এবং আন্দোলন দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। পৈশাচিক এবং কৌতুকপূর্ণ ব্যবহারে পো, 'ইটিএ হফম্যান' এবং 'অ্যান র‌্যাডক্লিফের গথিক' উপন্যাসগুলির গল্পগুলির প্রভাবের প্রমাণ দিয়েছিল, যখন তাঁর লেখার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হতাশা ও বেদনা  উনিশ শতকের গোড়ার দিকে রোমান্টিক আন্দোলনের সাথে সখ্যতা প্রতিবিম্বিত করে। ।

কবিকে তাঁর সংক্ষিপ্ত কথাসাহিত্যের জন্য প্রায়শই স্মরণ করা হয়, লেখক হিসাবে তাঁর প্রথম প্রেমটি ছিল কবিতা, যা তিনি কৈশর কালে লেখা শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রথম শ্লোকটি লর্ড বায়রন ,  জন কিটস এবং  পার্সি বাইশে শেলির মতো ইংরেজি রোম্যান্টিকসের প্রভাবকে প্রতিফলিত করে , তবুও তাঁর পরবর্তী কবিতাগুলি চিত্রিত করে যা একটি বিষয়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরাবাস্তবতা রহস্যময় দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। "টেমর্লেইন" এবং "আল আরাফ" পোয়ের বিবর্তনকে বাইরোনিক নায়কদের চিত্রায়ণ থেকে তাঁর নিজস্ব কল্পনাশক্তি এবং অবচেতনতার মধ্যে ভ্রমণের  এক চিত্র  তুলে ধরেন। বায়রনের "চিল্ড হ্যারল্ডের তীর্থযাত্রা" তা স্মরণ করিয়ে দেয়।   এই প্রবন্ধটি চতুর্দশ শতাব্দীর মঙ্গোল বিজয়ীর জীবন ও দুঃসাহসিক ঘটনা বর্ণনা করে; পরবর্তী কবিতাটি একটি স্বপ্নের জলের চিত্রায়িত হয়েছে যেখানে ভাল বা মন্দ দুটোই স্থায়ীভাবে বাস করে না এবং যেখানে পরম সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করা যায়। অন্যান্য কবিতাগুলিতে - " টু হেলেন ," " লেনোর ," এবং " দ্য রেভেন " বিশেষত - পো আদর্শ আদর্শ সৌন্দর্যের ক্ষতি এবং এটি পুনরুদ্ধারে অসুবিধা সম্পর্কে তদন্ত করে। এই টুকরোগুলি সাধারণত একটি যুবক দ্বারা বর্ণিত হয় যিনি তার প্রিয়জনের অকাল মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। " টু হেলেন"  যা ইংরেজি ভাষার অন্যতম সুন্দর প্রেমের কবিতা হিসাবে পরিচিত। কাজের বিষয় হ'ল একজন মহিলা যিনি বর্ণনাকারীর দৃষ্টিতে প্রাচীন গ্রীস এবং রোমের ধ্রুপদী সৌন্দর্যের রূপ ধারণ করেছিলেন। "লেনোর" এমন উপায় উপস্থাপন করে যাতে মৃতদের স্মরণ করা হয়, হয় শোক বা পার্থিব সীমানা ছাড়িয়ে জীবন উদযাপন করে। "দ্য রেভেন"-এ পোও সাফল্যের সাথে তাঁর দার্শনিক এবং নান্দনিক আদর্শকে এক করে দিয়েছেন। এই মনস্তাত্ত্বিক অংশে, একজন তরুণ পন্ডিত তার মৃত প্রেমিকের সাথে পরবর্তীকালের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর প্রশ্নের উত্তরে "নেভারমোর" এর কাকের অশালীন পুনরাবৃত্তি দ্বারা আবেগময়ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। চার্লস বাউডিলায়ার  "দ্য রেভেন" সংস্করণটির ফ্রেঞ্চ সংস্করণটির ভূমিকাতে উল্লেখ করেছিলেন : “এটি হতাশার নিদ্রাহীনতার কবিতা; এর কোনও কিছুরই অভাব নেই: না ধারণার জ্বর, না রঙের হিংস্রতা, না অসুস্থতার সাথে যুক্তি, না সন্ত্রাস চালানো, না এমনকী উদ্ভট অত্যাচার যা এটিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে পোও এমন কবিতা লিখেছিলেন যেগুলি উচ্চস্বরে পড়ার উদ্দেশ্য ছিল। শব্দ এবং তালের সংমিশ্রণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি পুনরাবৃত্তি, সমান্তরালতা, অভ্যন্তরীণ ছড়া, স্বাক্ষরকরণ, এবং আমেরিকান কবিতায় তাদের ভুতুড়ে, সংগীতের গুণগত মানের জন্য অনন্য যে রচনাগুলি তৈরি করার জন্য  প্রযুক্তিগত ডিভাইস ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, “বেলস” -তে, বিভিন্ন কাঠামোর মধ্যে "ঘণ্টা" শব্দের পুনরাবৃত্তি কবিতায় বর্ণিত বিভিন্ন ধরণের ঘন্টার অনন্য স্বরূপকে ফুটিয়ে তোলেন।

যদিও তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর রচনাগুলি সুস্পষ্টভাবে প্রশংসিত হয়নি,  পো প্রতিভাধর কথাসাহিত্যিক, কবি এবং চিঠিপত্রের মানুষ হিসাবে সম্মান অর্জন করেছিলেন এবং মাঝে মাঝে তিনি জনপ্রিয় সাফল্য অর্জন করেছিলেন, বিশেষত " দ্য রেভেন " এর উপস্থিতি অনুসরণ করে । তাঁর মৃত্যুর পরে, তবে তাঁর সমালোচনামূলক সংবর্ধনার ইতিহাস নাটকীয়ভাবে   মর্যাদা পায়। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।