নববর্ষ ১৪৩৩ এর কবিতা সংখ্যা
সূচিপাতা
বীথি চট্টোপাধ্যায়
তৈমুর খান
গৌতম হাজরা
রবীন বসু
ফটিক চৌধুরী
সুধাংশুরঞ্জন সাহা
অমিত কাশ্যপ
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
গৌতম বাড়ই
মহাদেব চক্রবর্তী
ভক্ত গোপাল ভট্টাচার্য
বাবলু গিরি
সেণ্টু রঞ্জন চক্রবর্তী
অশোক রায়
জগদীশ মণ্ডল
শিশির সাহা
জয়দেব মাইতি
বহ্নি শিখা
অজয় দেবনাথ
দীপা কর্মকার
ত্রিপর্ণা ঘোষ
দীপক বেরা
বিমল মণ্ডল
দেবপ্রসাদ জানা
বিচিত্র কুমার
জয়শ্রী সরকার
কবিতা সংখ্যা নববর্ষ ১৪৩৩
পদ্মিনী-আলাউদ্দিন
বীথি চট্টোপাধ্যায়
মৃদু মেঘে ঢেকে দিল জ্যোৎস্না
ঘন ঘুমে ডুবে আছে দুর্গ ;
রাতভোর হয়ে যায় অপরূপ
রাণি পদ্মিনী ছাদে দাঁড়ালে
#
এসে দিল্লি ছাড়িয়ে কিছুদূর
তাঁবু ফেলেছেন আলাউদ্দিন।
চোখে ভারতের মানচিত্র
কত কাজ পড়ে সামনে...
#
রোগা চিতোরের দ্বার রক্ষী
ভারি পাগড়িতে রোদ ঝলমল
ঘরে বউ বাচ্চার সঙ্গে
বলো কতদিন দেখা হয়নি?
#
ছিল ঘোড়া হয়ে গেল বিদ্যুৎ
ঋজু শওয়ার স্বয়ং সুলতান
নিচে ভারতের মানচিত্র
ধুলো উড়ছে অপ্রতিরোধ্য।
#
পোষা টিঁয়াপাখিদের খাওয়াতে;
কত বেলা হয়ে গেল ছাদে আজ
কাল রাত থেকে রাজা রয়েছেন
দূরে অন্য রাণির কক্ষে।
#
যেন পুড়ে যায় হৃৎপদ্ম
তবে একেই কি লোকে বলে প্রেম?
চোখে বালি উড়ে এসে পড়ল
কাল প্রাসাদে বসবে মেহফিল।
#
ঠিক মাথার ওপর সূর্য
আলো ঝলসে দিচ্ছে চারপাশ
ঘোড়া ছটফট করে তেষ্টায়
যেন চিন্তিত আলাউদ্দিন।
#
আলো মুছে দিয়ে নামে সন্ধে
তারা ঝকঝকে রণকৌশল
সেনা ছাউনি বানিয়ে ফেলল
ঠিক চিতোর গড়ের সামনেই।
#
খোলা ভারতের মানচিত্র
পাশে লন্ঠন রাগ রক্তিম
হাতে রসদ ফুরিয়ে অাসছে;
চোখে ধুলো দিতে হবে শত্রুর
#
রাতে জ্যোৎস্নাচিহ্ন অায়নায়
চাঁদ পুড়ে যাবে এত উত্তাপ
কাকে দেখে কেঁপে ওঠে কার বুক
কেউ জানবেনা সেই গল্প।
#
কাকে ভাল লেগেছিল কবে কার
সেটা ভুলে যেতে হবে যুদ্ধে।
মাথা ঢেকে নিল ঘন ওড়নায়
এতে দমবেনা আলাউদ্দিন?
#
তবু যুদ্ধে তো কেউ জিতবেই
রাতভোর হয়ে যায় অপরূপ
ক্রমে এগিয়ে আসছে সুলতান
মৃদু মেঘে ঢেকে দিল দুর্গ।
নববর্ষের চিঠি
তৈমুর খান
মালতীকে চিঠি লিখিব
আমরা কেমন নববর্ষ আনিতেছি
এমন আর কখনও আসে নাই
মাটির কলস কিনিয়া আমরা জল ভরিব
রবি ঠাকুরকে মালা পরাইয়া পথে নামাইব
নতুন কাপড় পরিয়া শঙ্খ বাজাইব
তুমি দূর হইতে জলহরিণীর মতো চাহিয়া রহিবে
তোমার উৎসুক মুহূর্তগুলি পাপড়ি মেলিবে
এবার আমরা সত্যিকারের বাঙালি হইব
তুমি বাঙালার মাটিকে প্রণাম করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিবে।
আজগৌতম হাজরা
আজ আলোর অক্ষরে লিখছি খাতার পাতায়
লিখছি, এক বর্ণময় নতুন পথের লেখা
ঘাসে ঘাসে, পাতায় পাতায়, মাঠে মাঠে, প্রান্তরে প্রান্তরে
বাতাসের মতো জলের মতো ছলছল উচ্ছল
স্রোতের ভাষা।
আজ চারিদিকে কতশত রঙ, কত না মুখের মিছিল
মনে হয় কতশত যেন কথা বলা
নতুন সময়ের দিকে, নতুন ইস্তাহারে
নতুন দিনের দিকে চলা!
বৈশাখ আসে
রবীন বসু
ওই দেখ, কৃষকের আলে শুয়েছে নতুন বৈশাখ
চিকন পরিপাটি। পুরনো খোলস ছেড়ে
নতুন শরীর নিয়ে জেগেছে বছর;
আতপ্ত আশ্লেষ দিন, প্রত্যাশার ঝুলি নিয়ে
মাধুকরী দাঁড়িয়েছে দ্বারে;
যত চিঠি পড়া হল, পুরনো খামের গন্ধ
বধূটির বুকে ভরে থাকে
যে স্মৃতি হারিয়ে গেল তার মায়া চৈত্র গায়ে রাখে
মায়াস্বপ্ন জেগে ওঠে আমাদের প্রাত্যহিক
তবু বৈশাখ আসে,তবুও নতুনদিন আল্পনা আঁকে!
নির্বাচিত কলাম
রবিন বণিক
যা কিছু জোনাকি তা আমার আন্তরিক হরমোন
যা কিছু চকচকে তা তোমার পরিকল্পিত হঠাৎ
ভীষণ পেয়েছে ব’লে ভেবো না জোনাকির ভেতর
আমাদের ভাঙা আত্মকথন
মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে আমাদের সফল মধুচন্দ্রিমা
ধরে রেখো, ভেঙে পড়ে যেতে পারে তোমার নির্বাচিত কলাম
বছর শেষে সাঁওতাল পরগণা
ফটিক চৌধুরী
নতুন বছর আসুক না নিজের মত করে
শেষ-চৈত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে মহুয়া ফুলের গন্ধ
কচিপাতার নরম আমাকে ছুঁয়ে গেলে
সারাবছরের বিষাদ-বরফ গলে জল।
সহজ ছিল না সাঁওতাল পরগণার পথঘাট
কর্দমাক্ত রাস্তা এখন সাঁওতাল রমণীর ত্বক
চলে গেছে শাল মহুয়ার বুক চিরে জামতাড়া
মহুয়া ফুলের গন্ধ নেশা ধরিয়ে দেয় চৈত্রমাস।
স্মৃতিরা হারিয়ে যায় একবুক শ্বাস নিতে নিতে
এখনও দেখা যায় অনেক মলিন মুখ, তবুও
ফুসফুসে জেগে ওঠে বছর আঠারোর শ্বাস
এখন বাঁধন ছাড়া আমায় আর কে পায় !
বছর শেষে ঘুরে আসি সাঁওতাল পরগণা
শৈশব-স্মৃতি নস্টালজিক, কিছুটা উন্মনা।
নতুন লিপি
সুধাংশুরঞ্জন সাহা
গাছে গাছে কচি পাতায় নতুন লিপি।
ঘাসে ঘাসে লেগে আছে বৈশাখের উচ্চারণ।
উৎসবের আলোয় মাতোয়ারা উদাসীন বৈশাখ।
ফের একটি বছরের দুরু দুরু পরিক্রমা সূচিত।
একটি ভয়াবহ বছর শেষ করে
আবার নতুন কোন ভয়ের দিকে এগোচ্ছে না তো দিন !
সময়ই জানান দেবে সবটা একে একে ।
বৈশাখী আহ্বান
বিমল মণ্ডল
এতো মৃত্যুর দাগ শরীরে মুছে ফেলেছি
তবুও লাল অক্ষরে লিখে যাই আমৃত্যুর ইতিহাস
নতুন আলোর অক্ষরে অক্ষরে চারদিকে বর্ণময় দিশা
লিখে যাই, শুধু লিখে যাই বৈশাখী আহ্বান।
বসন্ত পেরিয়ে চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদ ঢেলে দেয়
কত না উদভ্রান্ত সকাল
যা আজ সবুজ ঘেরা মাঠের প্রান্তরে প্রান্তরে
মিলিয়ে যায় স্বপ্নিল স্রোতের ভাষা
আমার চিরন্তন আবেগের বৈশাখী মৃত্যু যন্ত্রণা
ইস্তাহার মেখে
এগিয়ে যায় নতুন দিনের দিকে।
পয়লা বৈশাখ
অমিত কাশ্যপ
আমার সবদিনই আহ্লাদী, সকাল মানে ভোর
ভোর মানে কর্মদিবস খুলে যাওয়া
দুধ আনা, কাগজ আনা, বাজার আনা
আনার পর হই হই সংসার ফুটে ওঠে
গিন্নিমা, বউমারা, ছেলেরা বৈশাখী রোদের ভেতর
কলকল করে, আজ যেন উৎসব উৎসব
ঠাকুর ঘরে পুজো ভেতর কামনাটুকু
সারা বছর সাজিয়ে উঠতে যেটুকু সময়
সময় বলতে হই হেঁটে হেঁটে প্রতিদিন
সময় বলতে হু হু দূরপাল্লার কোনো ট্রেন
স্টেশনের নীরবতা ম্লান করে চলে যাওয়া
আমি নব আনন্দে পয়লা বৈশাখ মাখি
:
আমার না হয় নাই হলোদেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
ডেকেছি তোমাকে অনেকবার
সূর্যের হাসিতে অথবা বেদনার ফলায়
তোমার প্রসারিত সুগন্ধ ছোঁয়নি আমাকে
বুঝেছিলাম ,তার আমার নয়
ঐ যে উজ্জ্বল দাঁতের ঝিলিক
অথবা বিভাজিকার আবেশী আবেদন
সেখানে তো কখনো আমি ছিলাম না
অনেকের রক্তিম স্পর্শ ছিল অহঙ্কারে
তাই সেখানে ভাস্কো-দা-গামা নি
অতিরিক্তের রিক্ততায় তুমি ঢেকে গেলে
তোমার শুভয় জ্বালাই সান্ধ্য প্রদীপ হৃদয় মেলে।
আদিম নারীর মতন বনজোছনায়
গৌতম বাড়ই
হাওয়ার মতন কখন যেন দমকা মেরে যাওয়া
লোহাগড়ের জঙ্গল পশ্চিমা বাতাসে
মুখ ফিরিয়ে কথা বলছিল
মেচি নদীর ওপারে ভিন্ন একটা দেশ
এপারে তরাইয়ের বনবাদাড়
অনন্ত একটা নদী ঝোরার মতন নেমে এসে
এই শীতকাল জল নেই রুখাসুখা বালি নুড়ি
পৃথিবীর একটা আদিম প্রান্তে বসে
দূর্গ ছিল টারজান ছিল অরণ্যদেব ছিল
পিরানহা মাছেদের নিষ্ঠুর শৈশব
এখন পড়ে আছে নদীর চরে
পোড়া রাত্রিতে চাঁদ আলো জ্বালে
নিশির মতন চুল খুলে দাঁড়িয়ে আছে কদমাগাছ
মেঘেরবস্তা পিঠে কালো রুকস্যাক নিয়ে
দামাল হাতির দল বালাসন পেরিয়েছে
মৃত্যুর গভীরতা লোহাগড় ছাড়া কেউ বোঝেনা
পাহাড়ি চিতার মুখেও বনমোরগের লাশ
চাপাতার মিঠে গন্ধটা থেকে থেকে
বজ্জাতের মতন নাকে লেগে আছে আজও
যেখানে প্রতিমুহূর্তে কান্নার শব্দ-ই পাই
ঢেউ উঠে অনন্ত যৌবন হা করে চায়
বৃষ্টি পড়ে ওপারের দুধিয়ায়
ভেজা বাতাসের সঙ্গে কিছু পাহাড়ী সংগীত
কলকল বয়ে যায় বালাসন ধারায়
আমি আমৃত্যু সুঠাম বনজোছনার
হাত ধরে নাস্তানাবুদ থাকব
গভীর প্রত্যাশায়
সমুদ্রের অতলতায়
আর পাহাড়ের সু- উচ্চে
গভীর এক রাতের রহস্য থাকে
চোদ্দশো আঠাশ
মহাদেব চক্রবর্তী
ভিক্ষায় সব সমস্যা সমাধান
প্রয়োজন নেই কোন কাজের।
পুষ্পক রথ আছে যখন,
কি দরকার রাফাল বিমান?
হনুমান ভরসায় মুশকিল আসান ,
বলো জয় শ্রীরাম, বলো জয় শ্রীরাম।
স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়
হোক, গির্জা মসজিদ মন্দির।
আকাশ বাতাস মুখরিত হোক ,
ঈশ্বর আল্লা তোমার নাম
সকলের সুমতি দাও ভগবান।
ধুততোর,আজকাল গাঁজাতেও ভেজাল।
পয়লা বৈশাখ
ভক্ত গোপাল ভট্টাচার্য
প্রতিটি বাঙালির লাল রক্তে
মেখে আছে নতুন বছরের গন্ধ
প্রতিবাদ বাঁচার..., উঁকি মারে
নববর্ষের উৎসব ।
সবদিকে কান্নার পাহাড়, খোঁজে মানবতা
অপব্যবহার করেও ওরা লজ্জিত নয়
নগ্ন চেতনায় আজ সভ্যতার সমাধি
কেন এতো নির্মম ক্ষমতার গন্ধ
তাজা মানুষের রক্তে স্নান, আর কত গণতন্ত্র ?
লক্ষ লক্ষ হাত উত্থিত, চায় পুনর্বাসন
বিনাশময় পৃথিবীর দিকে এগিয়ে
ফিরিয়ে দাও আমাদের ভালোবাসার জন্মভুমি
বৈশাখের হাত ধরে যেন শুনি
মর্মরে মর্মরে শান্তির গান ...।
ষড়জের সুর
বাবলু গিরি
সারা শরীর জুড়ে যখন রাত্রি নামলো-
প্রস্ততি নিচ্ছে বায়াংসি দূর যাত্রায় পাড়ি দিতে,
পাহাড়ি গ্রামে তখন পেঁজা তুলোর মতো বরফ,
মনেস্ট্রিতে প্রার্থনা, এখানেই পড়ে আছে
অহল্যার মতো পাথর সব, জিবনানন্দ ও তার ধানসিঁড়ি নদী তীরে বাঁশি বেজেছিলো পরকীয়া অন্ধকারে পৃথিবীর গন্ধমাখা শরীরে,
ফসিলেরা খুঁজে নিচ্ছিলো
নতুন পৃথিবীর জন্ম।
সারা শরীর জুড়ে জন্ম জন্ম গন্ধ ।
জন্ম হচ্ছে নতুন বছরের, নববর্ষের আগমনে।
মৃত্যু তখন খুঁচিয়ে দিচ্ছিলেন
গনগনে ভোরের আগুন ।
শরীর জুড়ে পৃথিবীর তমসা মাথা ভোর ।
আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে তখনো ছুটছে-
লম্বা জিরাফের মতো মাথা নিয়ে নতুন
সূর্যের দিকে।
ব্রহ্মান্ডের তানপুরায় ষড়জের সুরে-
সেই মহা সঙ্গীতকার, নিরন্তর বেজে চলে
ভাঙ্গা গড়ার,নব নব মূর্ছনায় ।
আজি এ প্রভাতে
সেন্টু রঞ্জন চক্রবর্তী
অন্তর তুমি পূর্ন করোহে
অনন্ত অসীম দানে,
জীর্ণ পুরাতন ভুলিয়ে দাও আমায়
নতুনের আহবানে।
আজি এ প্রভাতে দুয়ারে আমার
পাঠালে যে সূর্যের আলো,
তাই দিয়ে তুমি মুছে দাও আমার
অন্তর হতে সকল কলঙ্ক আঁধার কালো।
শুভ নববর্ষ – আলো অন্ধকার
অশোক রায়
নববর্ষ সে তো একটি দিনের ফুলবাহার রঙিন জীবন
তবু কিছু পয়লা বৈশাখ ফুটে থাকে স্মৃতি-অঙ্গনে অম্লান
ছোটবেলা নতুন-জামা বাবা-মা ভাই-বোন বন্ধুদের খেলা
পোলাও কালিয়া মাছ-মাংস দই মিষ্টি আরো কত কি মেলা
সুধামাসির ছেলেও খেলত সাথে পরনে আমার বাতিল পরিধান
যত্নহীন মুখে লেগে থাকা স্মিত হাসিটি তার অন্তরের বিজ্ঞাপন
জন্ম-জন্মান্তর তৃপ্তির ঝিলে যেন ফোটা-পদ্মের আলিঙ্গন।
ওদের কথা কেউ বোঝে না কেউ ভাবে না চেয়েও দেখে না
একটা কাপড় নতুন বছরে তাও দিতে পারি না
নতুন কবেই ওদের জীবনে পুরোনো হয়ে গেছে বরাবরের মত
আগাছার মত অবহেলায় জীবন-গাড়ির অসম দোলায় নত
শতচ্ছিদ্র আবরণ জোড়া-তালির ধুসর প্রেক্ষাপটে
অথচ ওরাই আমাদের জীবনটাকে ঝেড়ে মুছে সুন্দর করে রাখে।
তার বদলে কি পেয়েছে তারা ভেবে দেখেছ কি হায়
দেনা-জর্জর চিন্তায় উধাও ঘুম রক্তাক্ত সে হৃদয়
দিবসান্তে বাউল রাত একতারায় কাঁদে অসহায়
রবীন্দ্রসঙ্গীত কাব্য নাটক নিখিল ভূবন উৎসবের প্রেম
ফ্যাশন-পাখায় ভর করে চায়না টাউন সিক্স বালিগঞ্জ প্লেস
চতুর্দিকে হুল্লোড় টাকার গরমে ভুলে যাই মনুষ্যত্ব মানুষ
মধ্যরাতে জন্ম-মাতাল নিয়ে ফেরে নতুন বছরের ফানুস ।।
নববর্ষ এলো
জগদীশ মন্ডল
রোদের ডানায় মেঘ জমেছে
বিদ্যুৎ চমকালো,
গাছে গাছে নতুন পাতা
নববর্ষ এলো।
দোকানগুলো উঠলো সেজে
মিষ্টি সুরে ঢাক,
হালখাতার পুজোর গন্ধে
এলো যে বৈশাখ।
নতুন সাজে মিষ্টি বিলোয়
পাড়ার কচিকাঁচা,
ছোট্ট মুখের সবুজ হাসি
নতুন করে বাঁচা।
বছর বছর ঘুরে ঘুরে
বোশেখ যদি আসে,
অনেক বাধা দূর হয়ে যায়
আনন্দ উল্লাসে।
আলো ১৪২৮
শিশির সাহা
ঠিক চলে যায়, যার যেখানে যাবার কথা
ভুল হয়না দিকদর্শনে, ঘূর্ণিঝড় এলেও বা।
আবার সে যখন আসে, মেঘ গায়ে মাখে
সে যখন ফিরে যায়, মেঘের গায়ে লেপ্টে থাকে
সে আসার আগেই কিংবা যাবার অনেক পরেও
একনিষ্ঠ আমার জন্য।
যদি কখনো আমি দেরি করি
উড়ে যাওয়া পাখির ডানায় এসে বসে,
আরো যদি দেরি হয়, উঁকি দেয় গাছের মগডালের পাতায়।
চুপিচুপি বলি, তারপরেও আমার দেরি হয়
একটুকুও রাগ না করে সে জানালা দিয়ে এসে - লুটোপুটি খেলে বিছানায়।
ঠিক এইরকম করেই যাবার বেলায়,
আমি বারান্দায় এসে বিদায় না জানালেও
ঘরে - পর্দায় দেওয়ালে দোল খায়। একটু পরে -
সে তার সহোদর অন্ধকারকে দিয়ে যায় ;
আমি সানন্দে মাতৃগর্ভে ঘুমোই
যেখানে আলো ইশারায় ডাক দিয়ে যায়।
প্রত্যাশার দিনে
জয়দেব মাইতি
অন্তরাল ছাড়িয়ে সামনে আসে মুখ
উঠোন বারান্দা চৌকাঠ ডিঙিয়ে
খিড়কি পর্যন্ত চলে সমান অভি চলন। স্পর্শে গন্ধে
মোহিত হয় অন্তরাত্মা
আগল খুলে যায় সর্বত্র।
যে চেনা সুর গুলো ফিরিয়েছে তোমার গান-
যে চেনা মুখগুলো প্রত্যাঘাত করেছিল তোমার ভালোবাসা-
তারাও আজ ভীষণ ভীড় করে।
ভীড় এড়াই -
পলাশ শিমুলের মতো কৃষ্ণচূড়া রাঙতে দেখে
আমিও ভরসা পাই।সাহস জোগাই
বুঝে নিই- আর নয়! বিদায় আসন্ন প্রবীনের
নববর্ষ খুব কাছে।
ভালোবাসি
বহ্নি শিখা
বৈশাখ এলো ঝলমলিয়ে
বুকে নতুন আশা
মেঘের ডাক গড়গড়িয়ে
বাতাস ভাঙে বাসা।
বৈশাখ এলো ধূলো ছড়িয়ে
মেঘের বাড়ি হয়ে
বৃষ্টি নামে ঝমঝমিয়ে
শিলা বৃষ্টি লয়ে।
কঠিন ঝড়ে নষ্ট সবি
বিলাপ করে চাষি
তবুও আমরা নববর্ষের
বৈশাখ ভালোবাসি।
নববর্ষ
অজয় দেবনাথ
সুখে থেকো, ভালো থেকো
তোমাকেই তুমি ভালো রেখো
ভয়, ভক্তি, হুজুগের দিনে
এভাবেই আজ টিকে থাকা।
ঐতিহ্য ধুলোয় ঢেকে
পরশ্রীকাতর দুশো বছরের দাস
রুটির লড়াই…
কখনও-বা নেহাত অবহেলায়
বর্ণমালা ধূলায় লুটায়…
ব্যতিক্রমী নির্মোহ সাধক
গরিব মায়ের কোলে ইতিউতি বাড়ে…
পঞ্জিকায় দিন বদলায়…
নববর্ষ
দীপা কর্মকার
জীর্ণ পুরাতন,ভাঙ্গা এই মন
যাও নিয়ে যাও ওগো চৈতালী
নববর্ষের নবারুণ রঙে
এসো বৈশাখ সাজিয়ে ডালি।
চৈত্র রঙে বাসনার আশ
দারুন দহনে হোক লয় তার
এসো বৈশাখ এসো এসো ত্বরা
খোলা আছে আজি রুদ্ধ দ্বার।
মালা আছে গাঁথা বরণের লাগি
বেল, যুথিকার প্রেমের পরশে
নিশি অবসান আসন্ন প্রায়
বৈশাখী ভোর গগনে হরষে।
মধু-মাধবের মিলন খেলা
নববর্ষের আগমন বাণী
মগ্ন প্রকৃতি নব আহ্বানে
বাতাসের কানে করে কানাকানি।
নববর্ষের সওগাত
ত্রিপর্ণা ঘোষ
আগুন রোদে জড়ানো বৈশাখী দুপুর।
শাল,মহুলের সবুজ মাঝে গেছে যে পথ,
সেই পথেই দূর হতে দেখেছিলাম তারে।
হাঁটুর ওপর নেতানো কাপড়,
কলসী কাঁখে যাচ্ছিল সে কুয়াপাড়ের দিকে।
আদিবাসী রমণীর জিজ্ঞাসু চোখের মায়ায়,
কিছুটা অপ্রস্তুত সত্বেও কৌতূহলী মন
ব্যস্ত ঠিক হয়েই পড়ল আলাপচারিতায়।
আলাপ শেষে নতুন সখীর হাত ধরেই,
লাল মাটির পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম
টালির বাড়িতে সাজানো পাহাড় ঘেঁষা গ্রামে।
গ্রামের সরলতা আর আদিবাসী মেয়ের মায়ায়,প্রখর রোদের দাবদাহও হয়েছে মলিন।
কঠোর জীবনযুদ্ধ শেষেও বেঁচে থাকে নির্মল ভালোবাসা।গ্রীষ্মদিনের নবচিত্র এঁকেছিল ভিন্ন এ মানবসভ্যতা।
বিষাদপুরাণ
দীপক বেরা
কৃষ্ণচূড়ার সাথে জীবনের কত বসন্ত আসে
অনন্ত তৃষ্ণা জাগে, কামনার আগুন জ্বলে প্রাণে
সময় ভাঙছে, ভেঙে চলেছে প্রতিনিয়ত..
ভাঙছে নদীপাড়, ভাঙছে সংসার, সম্পর্ক
বাসনার ক্ষণিক ঘ্রাণ মিলিয়ে যায় অন্ধকারে
মুহূর্তের এই সৃজন, মনে হয় এক ভ্রান্তিময় মায়া
আজন্মকাল জীবনের শূন্যতার ভিতর
গুঢ় সৃষ্টির স্তব্ধতা বা নীরবতা মিলেমিশে যায়!
শরীরী ক্যানভাসে ছড়ানো ছিটানো
হতোদ্যম ম্লান সূর্যের ফ্যাকাসে হলুদ চিত্রকল্প
মৃত্যুগন্ধা বুকের ভিতর স্মৃতির কফিন জুড়ে
নিথর শুয়ে থাকে আমার নিঃসঙ্গ বিষাদপুরাণ!
সময় চলে যাবে
দেবপ্রসাদ জানা
সময় চলে যাবে, এক বৈশাখ থেকে আর এক বৈশাখ।
পকেটে কিছু পয়সা থাকলেও সময় নেই একটুও।
হিসাব করি না।
জন্মের পর জন্ম উপেক্ষায় স্তব্ধ
প্রথাগত কালের কল্লোলে হারিয়ে যাচ্ছে-
কত ভালো সময়।
সময় এখন ভারি তটস্থ।
হয়তো অনেকে ভাবতে পারে সময় উড়নচণ্ডী, একদম সংসারী না।
কিন্তু আমার মনে হয়,
জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওনা সময়।
ইচ্ছের দুরন্ত টগবগে ঘোড়ার মত আসে
চলমান স্বপ্নের মতো সকালে হারিয়ে যায়।
একে ধরে রাখতে হয়,
এক বৈশাখ থেকে আর এক বৈশাখ।
নইলে সময় শরীরে আর শক্তি থাকবে না,
মন চাইলেও ইচ্ছা থাকবে না।
বিত্তের বিলাসী ঘুম, স্বার্থ নিয়ে নিশ্চিত সুখ-
মিছিল করে আসবে আর ক্ষনিকের জন্য
চলে যাবে দূরে, বহু দূরে।
একটু হাত ধরাধরি করে হাঁটা,
একটু হাসাহাসি, একটু ভীমরতি,
হ্যাঁ বুড়ো বয়সের ভীমরতি, ভারি মিষ্টি।
ভ্রান্তি গুলো গুটিয়ে রেখে,
বহু জরুরি কাজ ফেলে রেখে,
কখনো বুড়ো বাপ মায়ের সামনে বসে,
একটু মুড়ি খেতে খেতে, টিভি দেখা-
পড়াশোনা চুলোয় দিয়ে ছেলে মেয়ে গুলোর
শিশুপনা গুলো নিয়ে খেলা-
সুন্দর সুন্দর স্মৃতির ক্যামেরাবন্দী-
সময় কথা বলবে, ক্ষণকাল দাঁড়াবে হাসবে
বিষাদের মেঘ কেটে -সূর্য আসবে নেমে,
প্রেম ভালোবাসার-কথায় আনন্দে মন ভাসবে।
নতুন ভোরে
বিচিত্র কুমার
নতুন ভোরে নতুন সুরে সুখ পাখিটা গায়
স্মৃতির পাতা ফেলে দিয়ে উড়াল দিতে চাই,
রঙিন এই পৃথিবীটা ঘুরে ঘুরে
আমিও দু-নয়ন মেলে দেখতে চাই।
নতুন রঙে নতুন করে আবার যেন
এ জীবন শুধু করতে চাই,
যেখানে সুখ ছাড়া দুঃখ কোন নাই
এমন একটা জীবন চাই।
নববর্ষ
জয়শ্রী সরকার
ভোরের আজান শুরু, পাখিদের কলরবে অন্ধকার ভেদ করে
নতুন সূর্যোদয়; পাতাঝরা ন্যাড়া গাছে সবুজের সমারোহ।
মাঠে মাঠে অনন্ত গালিচা, মৌবনে মায়াবী মহুয়ার দল/নেচে নেচে হেসে যায় গেয়ে যায় প্রাণ খুলে
মেঠো সুরে সাঁওতালি সুখী পরিবার, নববর্ষ এলো বুঝি!
'আনন্দধারা বহিসে ভুবনে.....!'
সময়ের শূন্যোদ্যান পেরিয়ে শিলান্যাস হতে চলেছে
আরো একটা নতুন বছরের! কত প্রস্তুতি, ঢাকঢোল মিডিয়ার আলোড়ন
প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, কথামৃত আর হিতোপদেশ। তবু, কোথাও যেন একটা
ফাঁক থেকে গেছে ক্ষুধা আর উদ্বৃত্তের মেলবন্ধনে;
তাই, নতুন বছরের শুভলগ্নে সমুদ্র সবুজ ধ্যানে প্রার্থনা করি,
আর কোনো জনযুদ্ধ নয়, মনযুদ্ধ নয়, নয় কোনো রক্তপাত!
আস্ত একটা মানবিক পৃথিবী দেখতে চাইে চলমান জীবন্ত মর্গে।
প্রত্যয়ী কন্ঠে নিঃসীম আকুতি ধ্বনিত হোক,
'নব আনন্দে জাগো জাগো......!'
---------------- ---------------- ---------------- ---------------- --------------
অঙ্কুরীশা পত্রিকার পক্ষ থেকে সমস্তত কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং সমস্ত পাঠাককে শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ এর আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। সবাই ভালো থাকুন। সাবধানে থাকুন।
---------------- ---------------- ---------------- ----------------