লেবেল

গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২০

বিজ্ঞান বিষয়ক বিশেষ গদ্য।। সমাজ, ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের সামাজিক ভিত্তি ।। —পার্থ সারথি চক্রবর্তী


------------------------------------------------------------
বিজ্ঞান বিষয়ক  বিশেষ গদ্য 
--------------------- 

  




সমাজ,  ব্যক্তি  ও ব্যক্তিত্বের সামাজিক   ভিত্তিঃ
                         —পার্থ সারথি চক্রবর্তী 




বিজ্ঞানীরা মনে করেন মানুষ প্রজাতির ইতিহাস প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর পুরনো ।এই সময়কালে মানুষের জৈবিকভাবে(biological)বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় নি। মানুষের মস্তিষ্ক, হৃৎযন্ত্র ও পাঁচ ইন্দ্রিয় বা অন্যন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ও বিশেষ একটা পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু মানুষ পাল্টেছে সামাজিকভাবে এবং তার চিন্তা-চেতনাগত ভাবে। মানুষের যা কিছু মানবিক, নৈতিক, সৃজনশীল, শিল্প ও সংস্কৃতির ঔৎকর্ষ্য- এক কথায় যা কিছু মনুষ্যত্ব সম্পর্কীয়,  তা সবই আর্থ- সামাজিক উৎপাদন ব্যাবস্থা,  সামাজিক জীবন,  সমাজ গঠন ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ অর্জন করেছে ও করে চলেছে । তাই মানুষকে সমাজের বাইরে কোন আলাদা সত্তা মনে করার কোন অবকাশ নেই । যদিও এটা সত্য যে, মৌলিকভাবে মানুষ শারীরিক গঠন প্রক্রিয়ায় এক থাকা সত্ত্বেও দৈহিক খানিকটা অতি ধীরভাবে পরিবর্তন দেখা গেছে । শেষের ১০/১২ হাজার বছরের তথা গবেষণা করে দেখা যায়,  এই সময় মানুষ অতি দ্রুত তার সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছে । এই উন্নতি তাকে এক অন্য সত্তা দান করেছে ।তাই একমাত্র মানুষকেই বিজ্ঞান Bio- social system  এর উৎপত্তি বলে অভিহিত করেছে।

একথা বলা কঠিন নয় যে, মানুষ হঠাৎ করে নর ও নারী রূপে কোন এক স্হানে দৈব কোন শক্তিবলে আবির্ভূত হয়ে  বংশবিস্তার করে আজ ৮০০ কোটি মানুষের পরিবারে পরিণত হয় নি । জীববিজ্ঞানের ছাত্র মানেই জানেন যে, প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশের প্রক্রিয়ায় বিরুদ্ধ দ্বৈত সত্তার অবস্থান ছাপ ফেলে থাকে ।এখানে কাল্পনিক দৈব শক্তির কোন স্থান নেই ।নর ও নারীতে বিভাজন মানবিক সত্তার অস্তিত্ব ও বিকাশের প্রক্রিয়া; যা নিরবচ্ছিন্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।এই শিক্ষাই সমাজে নর-নারী ভেদাভেদ,  উঁচু-নীচু বিকৃত চিন্তা সমাজকে এবং তার বৃহত্তম অংশের মানুষকে কালিমালিপ্ত বা কলুষিত হবার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।গত ১০/১২হাজার বছরে মানবদেহের বিশেষ কোন পরিবর্তন না হলে ও তাদের মানসিক জগতে এক সুবিশাল পাহাড়-প্রমান বদল এসেছে ।এই পরিবর্তন ঘটে চলেছে ব্যক্তির চরিত্রে । এই চরিত্র বা ব্যাক্তিত কোন বিমূর্ত বিষয় নয় ।পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব  গড়ে ওঠে। সমাজ যেমন যেমন পাল্টায়,  মানুষের ব্যক্তিত্ব ও তেমন করেই পরিবর্তন হয় ।সাধারণত একটা ধারণা আছে যে, ব্যক্তিত্ব হ'ল শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্য এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ আচরণ । এ ধারণা অবৈজ্ঞানিক ।ব্যক্তিত্ব মানুষের কিছু গুণ বা দোষ যা তাকে দীপ্তময় করে তুলতে পারে ।ব্যাক্তিত ব্যক্তিত্ব তার সামাজিক অবস্থান বা কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পায় ।চিন্তা-ভাবনা,  দৃষ্টিভঙ্গি,  সিদ্ধান্ত গ্রহণের বলিষ্ঠতা ও স্বচ্ছতা,  বুদ্ধি,  জ্ঞান-প্রজ্ঞা, ইচ্ছা শক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তা,  সামাজিক মূল্যবোধ ইত্যাদি গুণাবলীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।সৃজনশীলতা বা বিরুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সাহস ও দৃঢ়তাও ব্যাক্তিত্বের পরিচায়ক । এক কথায় মানবিক, মহান গুণের সমন্বয় যখন একজন ব্যাক্তির মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়,  তখন সেই রূপ হল তার ব্যক্তিত্ব । সমাজ বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে, সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে মানুষের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে ।আদিম জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করলে দেখা যায় যে, তখনকার সমাজ সম্মিলিত প্রয়াসের উৎপাদন-কেন্দ্রীক ছিল ।উৎপাদিত দ্রব্য ভোগ করাও ছিল যৌথ-প্রয়োজন এবং উপলব্ধতা অনুযায়ী তা ব্যবহার করা হত।সম্পদ জমানো বা গচ্ছিত রাখার ইচ্ছা বা প্রবণতা চোখে পড়ত না ।গোষ্ঠীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হতেন গোষ্ঠীপতি।বাকিদের মধ্যে ও এইসব গুণাবলি কমবেশি থাকত।যদিও পরে ধীরে ধীরে গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে শুরু করে।বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সমাজ এগিয়ে যেতে থাকে ।গুণগত নতুন সমাজ ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দিতে শুরু করে ।তার বিশ্লেষণ এই  আলোচনার বিষয় নয়।


ছবির উৎস - গুগুল (নেট) 


  বিগত ১০/১২ হাজার বছরের এই ইতিহাস মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ-ক্ষমতায় একটা উচ্চমান প্রতিষ্ঠা করে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব আলাদা হতে থাকে । সমাজ ও তার সামাজিক প্রভাব মানুষের বুদ্ধিমত্তার মোড় ঘুরিয়ে দিতে থাকে ।মানুষ বস্তুজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি । শুধুমাত্র দেহতন্ত্র ( anatomically) বা শারীরবৃত্তীয় (physiologically)  চিন্তা করলে হবে না। মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্র মস্তিষ্ক হ'ল বিশ্বে বস্তুর সর্বোচ্চ গঠনতন্ত্র ।মানব মস্তিষ্ক তাই চিন্তা করতে পারে,  অজানাকে জানতে পারে। বিশ্বের রহস্য জানতে সে তার মস্তিষ্ক কে ব্যবহার করতে পারে। কবিতা,  শিল্প,  সাহিত্য,  বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে পারে।নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মাপকাঠিতে বিচার করতে পারে । ফলে আদিম কাল থেকে মানুষ যে জানার সংগ্রাম শুরু করেছে তা চালিয়ে যেতে পারছে।জ্ঞানের স্পৃহা এবং তার জ্ঞান ভান্ডারের সম্প্রসারণ তাই অপ্রতিরোধ্য ।সৃজনশীল ক্ষমতার সম্প্রসারণ  অসীম ও অশেষ প্রক্রিয়া ।মানুষের জ্ঞান,  সৃজনশীলতা তাই অসীমের দিকে দুর্নিবার গতিতে প্রবাহিত হয়ে চলেছে ।



বিঃ দ্রঃ- এই বিশেষ গদ্যের জন্য দুটি ছবির উৎস Google(নেট)  থেকে।     



বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০

ভালো আছি কিনা বলতে আজকাল খুব কষ্ট হয়- কেন ? - পার্থ সারথি চক্রবর্তী







ভালো আছি কিনা বলতে আজকাল খুব কষ্ট হয়- কেন ?
   - পার্থ সারথি চক্রবর্তী 

ভালো লাগার অনুভূতিগুলো যেন দিনদিন দূরে সরে যাচ্ছে। আমার এক বন্ধু , যে কলেজে পড়ায়, কেমন আছিস জানতে চাওয়ায় বলছিল ভালো আছি বলতে খুব কষ্ট হয় । গড়পড়তা এটাই মোটামুটি সবার অবস্থা । কোথায় যেন ভালো থাকার  বা ভালো বোধ করার তাল কেটে যাচ্ছে । আমরা প্রায় সব কিছুই হাতের মুঠোয় পেয়েও ভালো থাকতে বা অন্যকে ভালো রাখতে পারছিনা । কিন্তু কেন । কি কারনে ? 
পাড়ার এক প্রবীন নাগরিক যাকে কাকু বলে ডাকি তার সাথে দেখা হয়েছিল সেদিন সন্ধ্যায়। কাকুর ছেলে সাত বছর ধরে বোস্টনে থাকে, আর দেশে ফিরবে কিনা নিশ্চয়তা নেই । বছরে দুবার আসে, কাকুও বার দুয়েক গিয়েছিলেন বোস্টনে , কিন্তু তার বোধহয় সেখানে থাকতে বিশেষ ভালো লাগেনা । যদিও কিছু বুঝতে দিতে চাননা, ভালো থাকার বোধহয় চেষ্টা বা ভান কিংবা  দুটোই করেন। বাজার থেকে ফেরার সময় সকালে কাশেমদার রিকশা করে আসছিলাম। আসার পথে কথা হচ্ছিল। ওনার ছোট ছেলেটা একটা বাসে খালাসির কাজ করে , মাইনে মাসে ৩৫০০ টাকা । কিন্তু কাজ কামাই করলে, তা যে কারনেই হোক , মাইনে কেটে নেয় । আর বড়টা জয়পুরে  নির্মাণ শ্রমিক ।কাশেমদা বলল এখন আর আগের মত ভালো নেই ।  কেন ?

এই কেনর উত্তর পাওয়া কঠিন জানি , বা আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তাও জানা নেই । আজ থেকে বছর দশেক আগে ফিরে গেলেও দেখা যাবে , মানুষ অনেক সহজ সরল ছিল , তার আচরণ ছিল অনেক সাদাসিধে । তার চাহিদা ছিল অনেক সীমিত । একজনের সাথে অন্যের  যোগাযোগ ছিল নিবিড় । পাড়ার উৎসব গুলো ছিল ঘরোয়া । এখন সেখানে বিগ বাজেট , থিম পুজা । জমকালো আয়োজন , আলোর রোশনাই ।  তাতে আপত্তি করার বা করলেও তা শোনার বা শোনানোর কেও নেই , অন্তত প্রকাশ্যে । হোক বড় আয়োজন । কিন্তু কোথায় যেন প্রানের অভাব বোধ হয় কিনা ! আসলে মানবিক বন্ধনের জায়গা গুলো ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে । সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন মানুষ ই একমাত্র বায়লজিকাল এবং সামাজিক জীব । তারাই একমাত্র ভাবনাচিন্তা করতে পারে যৌক্তিক ভাবে । মনে হয় সেই জায়গায় কোথাও যেন ভাঁটা পড়ছে অথবা ধরণটা পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে । মানুষ ধীরেধীরে সময়ের সাথে সাথে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে । সে ভাবছে শুধু তার কথা বা তাকে নিয়ে আবর্তিত হয় যে কজন মুষ্টিমেয় লোক , শুধুই তাদের কথা । এর পেছনে কাজ করছে ভোগবাদের চরম ইচ্ছা আর অসীম স্বার্থপরতা । তাই আমরা দেখতে পাই পথের পাশে পরে থাকা অসুস্থ  পথচারীর দিক থেকে অক্লেশে মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে পারি আমরা । তথাকথিত আইনী ঝামেলার কথা ভেবে দুর্ঘটনাগ্রস্তর দিকে দেখেও দেখিনা। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছচ্ছে যে পাশের পাড়া তো দুরস্থান , পাশের বাড়ির খবর ও আমরা রাখিনা । তার সামাজিক প্রভাব পড়ছে নব প্রজন্মের উপর। তারা তাদের বাবা মাকে দেখছে পাগলের মত ছুটতে তাদের জন্য , তাদের সাফল্যের জন্য, সে ভাল স্কুলে ভরতি হোক বা পরীক্ষায় প্রথম হওয়াই হোক । তার জন্য তারা কখন সখন সত্য-মিথ্যার বাছবিচার করছেন না । স্বার্থপরতা ধীরে ধীরে প্রবিষ্ট হচ্ছে সন্তানের মনে । ক্ষয় ধরছে আদর্শ বা মূল্যবোধে । ঘুণ ধরছে মানবিকতাতে । মহীরুহ হয়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থপরতা । কারন যে বীজ আজ রোপিত হছে শিশুর অন্তরে, সকলের অলক্ষ্যে ; তাই রুপ নিচ্ছে বিষবৃক্ষের ,কিছুদিন বাদে । বড়দের প্রতি , গুরুজন দের প্রতি সম্মানবোধ কি , ন্যুনতম সৌজন্য দেখাতে ভুলে যাচ্ছে নবপ্রজন্ম । এর মুলে হয়ত আমরা নিজেরাই ।চরম স্বার্থপরতা , অন্যের প্রতি উদাসীনতা আর যেন তেন প্রকারেন নিজের কাজ চরিতার্থ করার উদগ্র বাসনা আমাদের ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে এক তুমুল অনিশ্চয়তার  দিকে ।
উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে আমাদেরকেই। আর সেই পথে হাঁটতে হবে।তবে তা কিন্তু শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকেই । কথায় আছে -আপনি আচারি ধর্ম পরেরে শিখায় ।আমাদের ঘরের ক্ষুদ্রতম সদস্যকে দিয়ে এই পাঠ শুরু করতে হবে । স্বার্থপরতা  ত্যাগ করতে হবে । আত্মনির্ভরতা আবশ্যিক , কিন্তু আত্মকেন্দ্রিকতা পারিত্যাজ্য  । সমাজ গঠনের পাঠদান  করা দরকার নবপ্রজন্মকে । এই বোধ জাগানো খুব দরকার যে একা ভালো থাকলে , সেই ভালো থাকা স্থায়ী হতে পারে না । আর সমাজের একজন ভালো না থাকাও সংক্রামক রোগের মত । সকলের প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পাশে থাকতে হবে।আমরা সমাজবদ্ধ জীব , এটা ভুলে গেলে চলবে কেন? উপরের জনৈক বন্ধু বা পাড়ার কাকু বা কাশেমদা আমাদের ই লোক , এই সমাজের প্রতিনিধি। সবাইকে ভালো রাখতে পারলেই আমরা ভাল থাকব, বা সমাজ ভালো থাকা সম্ভব । মূল্যবোধ আর নৈতিকতাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জাগাতে হবে  সৌ-ভ্রাতৃত্ববোধ । ভারতীয় সমাজের সুপ্রাচীন সংস্কার বাঁচিয়ে রাখতে হবে, কুসংস্কার কে চিরতরে বিদায় জানাতে হবে । দেখাই যাক না। আশায় বাঁচে চাষা ।