লেবেল

ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-২৮)।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-২৮)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ 
বিশ্বেশ্বর রায়

     'বন্দরের কাল হল শেষ'। দেশে, বাড়ি ফেরার জন্য মন ছটফট করছে বহুদিন আগের থেকেই। 'দেশের কুকুর তুলি বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া', কিংবা 'তবু ভরিল না চিত্ত----তাই মা তোমার কোলে এসেছি আবার'। এই যে টান, এই যে আপন দেশ, আপন ঘর, আপন পরিবেশের মধ্যে ফেরার আকুতি --এর যে কী রসায়ন তা মনে হয় মানুষ কখনও অনুধাবন করতে পারবে না। এখানে এত সুখ, এত আনন্দ, এত নি:শঙ্ক নির্ভার জীবনযাপন, তবু বেশিদিন তা দীর্ঘায়িত করতে ভাল লাগে না। তবে আমাদের এবারের এই আনন্দ-ভ্রমণ অন্য তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, এখানে আমাদের ছেলে এবং মেয়ে-জামাই সবাই আছে। তবে যাবার বেলা মেয়ে-জামাইয়ের জন্য তেমন মন খারাপ করছে না। কারণ, ওরা দু'জন একসঙ্গে আছে এবং আছে প্রায় দু'বছর ধরে। ওরা ঠিকঠাক সামলে চলতে পারবে। কিন্তু বাবাইকে অনেকটা অসহায় মনে হল। কেমন যেন একটা নির্ভরতা গড়ে উঠেছিল আমাদের উপর। আমাদের সুখ-সুবিধার জন্য ওর সদাব্যস্ততা আর ব্যাগ্রতা দেখলেও ভাল লাগে। এর উপর ওর অফিসের কাজের চাপ, বাথরুম যাওয়া, নাওয়া-খাওয়ার সময় পর্যন্ত পায় না ঠিকঠাক। একুশে নভেম্বরে যেদিন ওর জন্মদিন গেল সেদিনও work from home করতে হয়েছে ওকে। সকাল সাতটা থেকে সন্ধে আটটা পর্যন্ত ও কম্পিউটার ছেড়ে উঠতেই পারে নি। সকালের জলখাবার, দুপুরের খাওয়ার সময় পর্যন্ত পেল না প্রায়। হাতের কাছে সবকিছু গুছিয়ে দিয়েও এই অবস্থা। আমরা না থাকলে ও যে কিভাবে সামলাবে তাই ভাবতে ভাবতে মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। এর মধ্যেই আজ ফিরতে হবে। আজ আমাদের জন্যই ও P. T.O. নিল। সারাদিন গল্পগুজব করে কেটে গেল। তারপর ঠিক সন্ধে ছটায় আমরা বেরিয়ে পড়লাম। সাতটা একান্নয় আমাদের উড়ান। ব্র্যাডলি(হার্টফোর্ড) পৌঁছাবো এগারোটা চব্বিশ মিনিটে। অত রাত্রে পৌঁছে ট্যাক্সি ধরে ওদের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাতে প্রায় বারোটা বেজে গেল। মুনিয়ারা জেগেই ছিল। আমাদের ট্যাক্সি দরজার মুখে থামতেই মুনিয়া ছুটে বেরিয়ে এল। এরপর প্রায় দেড়টা পর্যন্ত গল্প করে কেটে গেল। এর মধ্যেই মুনিয়ার মুখে শুনলাম বাবাই আমাদের এয়ারপোর্টে ছেড়ে ঘরে ফিরেই মুনিয়ার সঙ্গে কথা বলেছিল। তখন বলেছে-'বাবা-মা এখানে দু'মাস ছিল তখন ঘরে ফিরে দেখতাম বাবা-মা ঘরে আছে। ঘরের সবকিছু পরিপাটি করে গোছানো, খাবারও প্রস্তুত। কিন্তু আজ ঘরে ফিরে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। কেমন এক শূন্যতা, ফাঁকা ফাঁকা!' শুনে বুকটা মুচড়ে উঠল। চোখের সামনে ওর অসহায়তাগুলো যেন ভেসে উঠল ছবির মত। এখন কিভাবে যে ও সামলাবে সবকিছু! আরও তিন মাস এভাবেই সামলাতে হবে ওকে। তারপর বিয়ের পর যদি অনামিকাকে নিয়ে আসতে পারে তবে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে।
     কাল অনেক রাত অবধি জেগে সকালে বেশ দেরিতে ঘুম ভাঙল। তারপর সারাদিন আর ঘরের বাইরে বের হইনি। সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে বাবাই Skype-এ যোগাযোগ করল। অনেক রাত অবধি নানা গল্প এবং কাজের কথা হল। কাজের কথা বলতে বাবাইয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ। ওরই মধ্যে এখানকার ব্যাগগুলো একটু একটু করে গোছানো শুরু করলাম। জয়দীপ অফিস থেকে ফিরে হাত লাগাল আমাদের সঙ্গে।
     এখানে আজ খুবই হালকা তুষারপাত হল। সামনে গাছের পাতায় চিনির দানার মত বরফকুচি জমে আছে। রাস্তায় বোঝা যাচ্ছে না। তবে লনে, ঘাসের উপর সাদা সাদা বরফের স্তর কেমন এক প্রস্তরিভূত দুধের নদীর মত শুয়ে আছে।
     দু'মাস আগে এখান থেকে যাবার সময় যে গাছগুলোকে প্রথমে ঘন সবুজ এবং পরে fall foliage-এর সময় রঙিন দেখে গিয়েছিলাম এখন এসে দেখছি সেই সবুজ সতেজ গাছগুলো  সম্পূর্ণ পত্রহীন, বজ্রাহত, শুকনো, নিষ্প্রাণভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বড় খারাপ লাগছিল তাদের দিকে তাকাতে তাকাতে। তবে জানি এই শীত শেষ হলে গাছগুলো আবার পত্র-পুষ্পে ভরে উঠবে বসন্তের আগমনে। প্রকৃতির সেই রূপ আমরা দেখতে পাব না। আমাদের এদেশে বাসকাল আর মাত্র দু'দিন।
     মাঝের দু'দিন শুধু গোছগাছ, বাবাইয়ের সাথে Skype-এ গল্প, ফেরা, বিয়ের কেনাকাটার পরিকল্পনা--এসবই চলল। সবাই বেশ exited. মুনিয়াও এখন অনেক সহজ স্বাভাবিক ব্যবহার করছে। বুঝি না মাঝে মাঝে ওর ঘাড়ে কী ভূত চাপে!
      জয়দীপ আগেই গ্রেহাউন্ড বাসের টিকিট কেটে রেখেছিল। চারজনের জন্য। মুনিয়া-জয়দীপ আমাদের সঙ্গে জে, এফ, কে, পর্যন্ত যাবে। আমাদের বিদায় দিয়ে ওরা একটু নিউইয়র্কে ঘোরাঘুরি করে রাতে হার্টফোর্ডে ফিরবে। আমাদের ফ্লাইট ছিল দুপুরের দিকে। হার্টফোর্ড থেকে আমরা বেরিয়েছিলাম রাত তিনটের দিকে। নিউইয়র্ক পৌঁছানো গেল সকাল ছটায়। গ্রেহাউন্ড বাসস্ট্যান্ডে প্রাত:কৃত্যের সুব্যবস্থা আছে। সেসব সেরে, সঙ্গে আনা কিছু খাবারের সদ্ব্যবহার করে আমি আর জয়দীপ বেরোলাম আরও কিছু খাবারদাবার কিনতে। দুপুরের খাওয়াটা এখানেই সেরে আমরা ট্যাক্সি ধরে জে, এফ, কে, পৌঁছাবো এগারোটার মধ্যে--এমনই পরিকল্পনা।
      এয়ারপোর্ট পৌঁছে মুনিয়ার চোখ-মুখ একটু ছলছল করছিল। আমাদের চোখও আর্দ্র হয়ে উঠল। ওরা ভাল থাকুক এই কামনা করে ওদের বিদায় দিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকে গেলাম।

ভেতরে ঢুকে জানতে পারলাম ফ্লাইট ছাড়তে অন্তত ঘন্টা তিনেক দেরি হবে। সেজন্য এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ সবাইকে কাউন্টারে আহ্বান করে নগদ কুড়ি ডলার করে দিল লাঞ্চের জন্য। এমন সময় ফোন বেজে উঠল। বাবাই ফোন করেছে। ওর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলার পর কিছু খাবারদাবার কিনে খেয়ে নেওয়া গেল। তারপরেও আরও তিন ঘন্টা কাটাতে হবে। উড়ান ছাড়বে পাঁচটায়।পঁয়ত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে ঘন্টায় ছশো কিলোমিটার বেগে যখন আমাদের ফ্লাইট পূর্বাভিমুখী হয়ে ছুটে চলেছে তখন যেন সেই উচ্চতা থেকে আমার দেশ, আমার কলকাতাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আর তো মাত্র আঠারো-ঊনিশ ঘন্টা পরেই পৌঁছে যাব সেখানে।



(সমাপ্ত

      

বুধবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৭) । পৃথিবীর উল্টো পিঠ- বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 





ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৭)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

দূরের রাস্তা। একটানা তিন/সাড়ে তিন ঘন্টা গাড়ি চালাতে হবে। তাছাড়া নতুন জায়গায় যাচ্ছি, সন্ধের  আগে পৌঁছানো ভাল। তবে এদেশে এমন সুষ্ঠভাবে রাস্তার নাম এবং বাড়ির নম্বর দৃশ্যমান হয় যে ভুল হবার জো নেই। তার উপর আছে GP S, সে ঠিক উদ্দিষ্ট বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেবে। যাইহোক, দেরি যাতে দীর্ঘতর না হয় সেইজন্য বাবাই এখানে রাস্তার পাশে পাশে যে গতি নির্দেশিত থাকে তার থেকে অনেক বেশি জোরে চালাতে শুরু করল। ফলে যা ঘটার তাই ঘটল। পুলিশের গাড়ি আমাদের পিছনে এসে থামতে বলল। এবং নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি জোরে গাড়ি চালানোর অপরাধে টিকিট ধরিয়ে দিলেন ।  অবশ্য তার আগে খুব ভদ্রভাবে জিজ্ঞাসা করলেন 'স্যার, আপনার কি খুব তাড়া আছে?' সব শুনে এবং এদেশে নতুন বলে সর্বনিম্ন একাশি ডলার ফাইন। পনেরো দিনের মধ্যে টাকাটা জমা দিতে হবে। স্বভাবতই মনটা একটু বিগড়ে গেল।
     তবে check in করে ঘরে ঢুকে ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই মনটা ভরে উঠল আনন্দে। ফাইনের দুঃখ বেমালুম ভুলে গেলাম সকলেই। আমাদের ঘরটা booking ছিল ocean view, দোতলায়। ব্যালকনিতে বেরিয়েই দেখা গেল প্রায় হাত বাড়ানো দূরত্বেই অ্যাটলান্টিক মহাসমুদ্র আমাদের সঙ্গে সখ্যতা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে পায়ের নিচে, কূলে। আদিগন্ত বিস্তৃত সুনীল জলরাশি। কী তার কলহাস্য, কী তার উচ্ছ্বলতা!
     হোটেলের নাম Holiday Sands North. বারোতলা হোটেলটিতে parking, spa, swiming pool ইত্যাদি অত্যাধুনিক সমস্ত ব্যবস্থা বিদ্যমান। আর ঘরের মধ্যেও সব ব্যবস্থাই মজুত। বাথটাব, ঠাণ্ডা-গরম জল, রান্নার প্রায় যাবতীয় সরঞ্জাম--চার বার্নারের ইলেকট্রিক হিটার, মাইক্রোওয়েভ, ফ্রিজ, হিটার, টিভি, ড্রেসিংটেবিল, ডাইনিং টেবিল, বেডসাইড টেবিল, টেলিফোন, ভল্ট ইত্যাদি। অবশ্য এদেশের সব হোটেলেই প্রায় অল্পবিস্তর এসবই থাকে। আমাদের দেশের মতো দু'শো টাকার থেকে দশ হাজার হোটেল, এমন বিশাল ফারাক প্রায় নেই বললেই চলে। অন্তত আমরা যেখানে যেখানে গেছি সেখানে তো দেখিনি।
     যাইহোক, এখানে এসে এদেশের অদ্যাবধি সবচেয়ে বেশি আনন্দ উপভোগ করা গেল। ষাট মাইল লম্বা বীচ জুড়ে হোটেল, মোটেল, রেস্টোরেন্ট, নানান ধরনের আনন্দ উপকরণ, মেলা, গান-বাজনা, থিয়েটার, ম্যাজিক ইত্যাদির ছড়াছড়ি। আর Up Town-এর মূল আকর্ষণের জায়গাটায় আছে সমুদ্রের তীর বরাবর Broad walk-এর রাস্তা। এই রাস্তাটার দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় মাইল। আট-ন ফুট চওড়া, দু'পাশে চার ফুট উচ্চতার রেলিং দেওয়া মোটা কাঠের পাটাতনের উপর রাস্তা। সেখানে কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ স্কেট করছে বা নিছক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়াও আছে কাঠের রাস্তার পাশ দিয়ে কংক্রিটের আর একটা রাস্তা। এবং আরও একটু সমুদ্রের কাছ বরাবর মাটির আরও একটা রাস্তা। সেখান দিয়ে পুলিশের গাড়ি টহল দেয়।
     এখানে একটা মজার ব্যাপার চোখে পড়ল। সমুদ্রে হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে বা কাঠের সেতুর উপর দাঁড়িয়ে মাছ ধরা, হুইল-এ। এবং আমাদের চোখের সামনেই বেশ কয়েকবার ছিপে মাছ ধরতে দেখলাম। তবে এই ষাট মাইল তীরভূমি যেহেতু মানুষের ভ্রমণের জায়গা তাই এখানে কোনও ট্রলার বা জেলেনৌকা আসে না মাছ ধরে। ফলে সৈকত সুন্দর, পরিস্কার, দুর্গন্ধহীন। এখানকার মজা বা আমোদের উপকরণের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল Sky wheel, Bungee Jumping, Trolling ইত্যাদি। এসব শিহরণ জাগানো খেলার উৎসাহীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কাল গিয়েছিলাম সৈকত ছেড়ে একটু ভিতরের দিকে একটা মেলায়। নাম  Celebrity Centre. একটা দীর্ঘ লেক ঘিরে হাজার একটা আনন্দ-উপকরণ। একটা উল্টো বাড়ি তার অন্যতম। নাম Wonder Works. আসলে জায়গাটা একটা স্থায়ী মেলা প্রাঙ্গণ। সমগ্র প্রাঙ্গণটা ঘুরে কোথাও একটু ময়লা বা নোংরা চোখে পড়ল না। হাজার হাজার মানুষ ঘুরছে, খাচ্ছে,  হৈহল্লা করছে তবু প্রাঙ্গণে ধুলোময়লা, কাগজ, পলিথিন,  চায়ের কাপ বা ঠোঙা জাতীয় কিছু নজরে পড়ল না। প্রাঙ্গণটা নানা ধরনের সিমেন্টের কারুকার্য করা ইট বা স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো। মনে হয় তার উপরে বসে পড়লেও প্যান্ট-জামায় একটুও ময়লা লাগবে না। এতটাই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন।

     তিন দিনের আনন্দ-ভ্রমণ সেরে রবিবার দুপুর  দু'টোর সময় শার্লটে ফিরলাম। তিনদিনে মনে হল বাবাই বেশ অক্সিজেন পেয়েছে। অনেক তরতাজা এখন। নতুন কেনা DSRL ক্যামেরায় প্রায় পাঁচ-ছশো ফটো তুলেছে।

     আর দুটো রাত্রি শার্লটে থাকার মেয়াদ। তারপর হার্টফোর্ডে চার রাত্রি কাটিয়ে পাড়ি দেওয়া নিজভূমে। ফলে গোছগাছ শুরু করতে হল। অবশ্য শুরু করা বা শেষ করার বিশেষ কিছু নেই। তবে আসার সময় যেমন ভেবেছিলাম যে, ফেরার সময় লাগেজগুলো অনেক হালকা হবে, তা মোটেও হল না। বরং বেড়ে গেল অনেক। টুক্ টুক্ করে অনেককিছুই কেনাকাটা হয়েছে। এছাড়া অনামিকা, তপস্যা, বড়দি-মেজদি সবার জন্য কিছু কিছু নিতে হয়েছে। ফলে 'তিল কুড়িয়ে তাল' হয়েছে।
      মনটা ভারাক্রান্ত আমাদের দু'জনেরই। তার প্রধান কারণ, বাবাইয়ের এই প্রজেক্টটায় যা কাজের চাপ তা সামলে ও শরীর ঠিক রাখবে  

কিভাবে! আমরা এখানে থাকতেই, ওর খাওয়া-দাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দেওয়া সত্ত্বেও ও খাওয়ার সময়টুকুও পায় না, আমরা চলে যাওয়ার পর তো দিশেহারা হয়ে যাবে! বেচারার শরীর এই দু'মাসেই একেবারে কাহিল হয়ে গেছে। সময়ে খাওয়া নেই, ঘুম নেই, ঠিকমত বিশ্রামটুকুও নেই ---এক বিশ্রী অবস্থা। প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই অফিসের কাজ আর কাজ। নিজের জন্য একটু সময় যদি না পায় মন-মেজাজ ঠিক থাকবে কিভাবে! কিন্তু 'নান্য পন্থা'। ফিরতে আমাদের হবেই।


চলবে...


বুধবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৬) ।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ —বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 



ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৬)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

     আরও একটা ব্যাপার এখানে খুবই স্বাভাবিক এবং ভাল লাগে। সেটা আমাদের শিক্ষণীয়ও বটে। এখানে পথ-কুকুর, বিড়াল, গবাদি পশু নেই বললেই চলে। সেগুলি কারও না কারও পোষ্য। এখানে কুকুর-বিড়ালও অনেকে দত্তক নেয়। সেসব প্রাণীকে এরা আপন সন্তানের চেয়ে কম আদর-যত্ন করে না।অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় বুঝিবা বেশিই যত্ন-আত্তি করে। তবে যেটা অনুকরণীয় তা হল--এইসব পোষ্যরা যেমন খাওয়া-দাওয়া করবে তেমনি প্রস্রাব-পায়খানাও  করবে। তারজন্য মালিক সর্বদা কাগজ বা পলিব্যাগ সঙ্গে রাখেন। আর সঙ্গে থাকে দস্তানা বা গ্লাভস। রাস্তাঘাটে, পার্কে পোষ্যরা যেখানেই পটি করুক না কেন হাতে গ্লাভস পরে সেই পটি তুলে কাগজ বা পলিব্যাগেনিয়ে নিকটবর্তী কোনও বিন বা কন্টেনারে ফেলেন। সঙ্গে যদি কাগজ বা পলিব্যাগ না থাকে তাও চিন্তা নেই, পার্কের মধ্যে স্থানে স্থানে টয়লেট পেপার রাখা থাকে সর্বসাধারণের জন্য। মোটকথা রাস্তাঘাট, পার্কে কোথাও কুকুর-বিড়ালের বিষ্ঠার পড়ে থাকে না উন্মুক্ত স্থানে। আমাদের দেশে এর ঠিক বিপরীত চিত্র নজরে পড়ে। কুকুর-বিড়ালের বিষ্ঠা তো কোন্ ছার, মানুষের বিষ্ঠাও যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। এছাড়া প্রত্যেকটি পার্কে অনেকগুলো বসার জায়গা থাকে। আর থাকে গাছগাছালি,  ফুলের বাগান এবং মখমলের মত তৃণাচ্ছাদিত ক্ষেত্র। যা দেখলেই বসতে বা শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বড় পার্কে একটি-দুটি জলাশয় বা লেক এবং পায়েচলা রাস্তার ধার বেয়ে বয়ে চলে স্বল্পতোয়া ঝিরঝিরে নদী। সেখানে কেউ কেউ মাছ ধরে। জলে হাঁস ভেসে থাকে অজস্র, ফোয়ারায় জল ওঠে। কোথাও কোথাও প্যাডেল বোট থাকে। সবই বিনামূল্যে প্রাপ্তব্য। কোথাও কোনও প্রবেশমূল্য নেই। সবই সরকারি বা কোনও ট্রাক্টরে অধীন।
     অনেক বড় বড় পার্কের মধ্যে রেস্টোরেন্ট আছে। আর আছে রেস্ট রুম বা টয়লেট। এখানকার প্রতিটি রেস্ট রুম বা টয়লেটে লিক্যুইড সাবান, টয়লেট পেপার, তাড়াতাড়ি হাত শুকনোর গরম হাওয়ার মেশিন বা কাগজ ইত্যাদি রাখা থাকে। এবং  বলা বাহুল্য সমস্তকিছুই বিনামূল্যে।
     ম্যাকডোনাল্ড, ওয়ালমার্ট, সেভ আর লট, ডলার ট্রি, ফ্যামিলি ডলার, সাবওয়ে, কে এফ সি, ট্যাকোবেল, বার্গার কিং বা যেকোনো মলে বা বাস ডিপোতে, স্টেশনে,  এয়ারপোর্টে সর্বত্রই এমন রেস্টরুম আছে। কিছু না কিনলেও শুধুমাত্র টয়লেট করার জন্যও সেখানে গিয়ে যেকেউ বিনা পয়সায় পরিষেবা পায়। সারা দেশে শুধুমাত্র টয়লেট পরিষেবায় যত টাকা খরচ হয় সেই টাকায় আমাদের দেশে কয়েক হাজার গ্রামীণ পায়খানা বানানো যায়।
     আবার দিন চলেছে মন্দাক্রান্তা ছন্দে। এখন দু'দিন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্রোগ্রাম নেই। বাইশ তারিখে আমরা South Carolina-র একটা নামকরা Beach-এ ঘুরতে যাবে তিন দিনের জন্য। তার আগে অবশ্য অনেক কেনাকাটা, গোছগাছ করতে হবে এই দু'দিন। কারণ, ওখানে খাওয়া খরচ ভীষণ বেশি। তাই যতটা বাইরের খাওয়া কমানো যায় তার জন্যই অনেক শুকনো খাবার, ফল, দুধ, চা-কফি ইত্যাদি সঙ্গে নিতে হবে। কিছু খাবার তৈরি করেও নিতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে Wal-Mart-এ যাওয়া হল সন্ধ্যায়। তবে বাবাই-এর এই project-টা এত বিশ্রী রকমের tough যে ও সারা দিন-রাতে বিশ্রাম প্রায় পাচ্ছেই না। সকাল সাতটা থেকে call শুরু হয়। নটা সাড়ে নটা পর্যন্ত call সেরেই ছুটতে হচ্ছে অফিস। সেখানেও সেই একটানা call attend বা meeting attend. কোনও কোনও দিন তো দুপুরের খাবার খাওয়ারও সময় পায় না। যে খাবার নিয়ে যায় তার সবই প্রায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এরমধ্যে সাতটা সাড়ে সাতটায় বাড়ি ফিরে আবার সঙ্গে সঙ্গে Wal-Mart বা Patel Brothers-এ গিয়ে কিছু কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফিরে কোনোরকমে একটু রাতের খাওয়া সেরেই আবার call-এ বসতে হচ্ছে। চলছে প্রায় বারোটা বা কোনও কোনও দিন রাত দেড়টা-দু'টো পর্যন্ত। কখন ঘুমোবে বা একটু বিশ্রাম নেবে তার সময়ও প্রায় নেই। এই মাসখানেকের মধ্যে ওর শরীরটা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে বেশ বুঝতে পারছি। তার উপর 'গোদের উপর বিষফোঁড়া'! আগামী সপ্তাহে এখানে ওর একমাত্র work partner মিমি এক সপ্তাহের ছুটিতে যাবে। On site-এর পুরো দায়িত্ব এখন একা ওর ঘাড়ে। অবশ্য ওর P. M.-ও খুব খাটছে। কিন্তু সে তো সবসময় ওকে প্রায় খুঁচিয়ে চলেছে project-এর হাল হকিকত জানতে। তার উপর আছে clients side-এর নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, তাদের সঙ্গে ঘন ঘন মিটিংয়ে বসা। এর সঙ্গে যোগ হয় off sore-এর পঞ্চাশ জনের নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, তাদের সঙ্গে call-এ বসা।
     এইজন্যই এই weekend-এ দু'দিন ছুটি পাওয়া এবং তার সঙ্গে শনি-রবি যোগ করে চারদিন একটানা ছুটি হয়ে যাওয়ায় ও ঠিক করেছে তিন রাত্রি চার দিনের একটা tour করা হবে। Internet-এ খুঁজে খুঁজে পাওয়া গেল এখান থেকে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে, পরের স্টেট South Carolina-য় খুব সুন্দর একটা beach আছে। নাম Myrtle Beach. ষাট মাইল লম্বা এই বীচটা। আমরা গাড়িতে যাব। Hotel booking হয়ে গেছে। আমাদের খাবারদাবারও প্রস্তুত।


আগামীকাল সকালে যাত্রা করা হবে ওই প্রমোদ-ভ্রমণে। ঠিক ছিল সকাল দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যে যাত্রা শুরু করা হবে। কিন্তু বাবাইয়ের ঘুমই ভাঙল প্রায় দশটায়। ও ছুটি পেয়ে অনেকদিন পরে এমন বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল যে, ওকে ডাকতে মায়া হল। যাইহোক, সবকিছু প্রস্তুতি সেরে বেরোতে বেরোতে বারোটা বাজল। আমাদের check in বিকেল তিনটেয়। G P S-এর দিদিমণি  দেখাচ্ছেন যে, ঠিকঠাক চললেও আমাদের পৌঁছাতে সাড়ে তিনটে পার হয়ে যাবে। মাসখানেক আগে যখন Smokee Mountain-এ ঘুরতে গিয়েছিলাম তখন রাস্তার দু'ধারের গাছপালাগুলো ছিল অনেক সতেজ, সবুজ এবং  Falfoliage-এর জন্য বিচিত্র বর্ণের। লাল হলুদ মেরুন ইত্যাদি রঙের বাহার ছিল সারা পথে। এখন গাছগুলো সব পাতা ঝরিয়ে যেন পোড়া পোড়া দেখাচ্ছে। বিশেষত আপেল ম্যাপল্ ওক এবং পাতাঝরা নানা গাছের পাতা অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে দিন পনেরোর মধ্যে প্রথমে রঙিন হয়, যাকে এখানে বলে falfoliage. তারপর পাতাগুলো শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। এখন সেই ঝরার পালাও প্রায় শেষ। ফলে গাছগুলো ন্যাড়া পোড়া বিবর্ণ।


(চলবে)

বুধবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৫) ।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।।E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৫)



পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

     বাবাইয়ের অফিস ছুটি থাকলেই বা শনি-রবি ছুটির দিনে আমাদের নিয়ে কোথাও না কোথাও বেড়াতে বেরোবেই। আজও আমরা এখানে একটা Nature Museum-এ গেলাম। সেখানে কয়েকটি জীবন্ত প্রাণী--যেমন প্রজাপতি ব্যাঙ সাপ গিরগিটি মাকড়সা আরশোলা টিকটিকি বোলতা মৌমাছি কচ্ছপ ইত্যাদি প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকা পতঙ্গ ও প্রাণী ছাড়াও ছিল ফসিল এবং স্টাফড প্রাণীর প্রায় জীবন্ত রূপ। তাদের মধ্যে বাজপাখি পেঁচা কাক মাছ ছাড়াও ছিল বিভিন্ন বিশাল বা ছোট গাছের সুচারুরূপে  কাটা কাণ্ডের অংশ। যার রেখাচক্র দেখে গাছটির বয়স নির্ধারণ করা যায়। তেমন একটি কাণ্ডের বয়স প্রায় দু'শো বছর বলে লেখা আছে দেখলাম। এরপর ওখানকার বনপথে (Trail) বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে, ছবি তুলে আমরা গেলাম অন্য একটি পার্কে। এটিকে পার্ক না বলে খেলার মাঠ বলাই ভাল। বিশাল বিশাল দু'তিনটি ফুটবল মাঠ। তার মধ্যে দু'টিতে ম্যাচ চলছিল। খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই দেখলাম হয় স্প্যানিশ নেপালি চীনা জাপানি বা কালো মানুষ। সাদা চামড়ার মানুষ প্রায় একজনও দেখলাম না। তারা রাগবি টেনিস বা অন্য খেলাই পছন্দ করে। একটি মাঠে দেখলাম এক দঙ্গল কুকুরকে ট্রেনিং দেওয়া চলছে। নানা কৌশল শেখানো হচ্ছে। কুকুরের মালিক বা মালকিন ছাড়াও মনে হল ট্রেনারও আছে। প্রতিটি মাঠ লোহার তার দিয়ে ঘেরা। আট-দশ ফুট অন্তর লোহার পিলার এবং তার সঙ্গে দশ ফুট উঁচু তারের জাল ঘেরা মাঠগুলোতে অল্প কিছু গ্যালারিরও ব্যবস্থা আছে। জানতে পারলাম অন লাইনে কোনও দল বা সংস্থা মাঠটি ভাড়া নেয় বা খেলার অনুমতি নিতে পারে। তবে মাঠে কোনও আবর্জনা ফেললে বা ভাঙচুর করলে ওই সংস্থাকে ভাল রকম জরিমানা গুনতে হয়। তবে বলতে দ্বিধা নেই--এখানে মাঠ নোংরা করার মানসিকতা কারও নেই। এখানকার প্রত্যেকটি মানুষ, ছোট-বড় নির্বিশেষে, এত বেশি পরিবেশ সচেতন যে, যেখানে সেখানে থুতু পর্যন্ত ফেলে না। প্রস্রাব বা পটি তো দূর অস্ত। আর এখানকার পার্ক বা মাঠের পাশে মাঝে মাঝেই ময়লা ফেলার ড্রাম বা ভ্যাট রাখা থাকে। আর থাকে প্রস্রাব বা পায়খানা করার অস্থায়ী মোটা প্লাস্টিকের ছোট ছোট খুপরি। যার মধ্যে লিক্যুইড সাবান, টয়লেট পেপার ইত্যাদি রাখা থাকে। খেলোয়াড় বা ভ্রমণকারী যে কেউ তা ব্যবহার করতে পারে। আর থাকে বহু সাইকেল। টাকা দিয়ে ঘন্টা হিসেবে যা ভাড়া নেওয়া যায় পার্কের মধ্যে সাইক্লিংয়ের জন্য। আর আগেই বলেছি এখানে আবালবৃদ্ধবনিতা প্রায় সকলেই কিছু না কিছু শারীরিক কসরৎ করছেই। কেউ হাঁটছে, কেউ জগিং করছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ কুকুর নিয়ে হাঁটছে আবার কেউ খালি হাতে ব্যায়াম করছে। এছাড়া বাস্কেটবল, টেনিস, ফুটবল, ভলিবল, রাগবি ইত্যাদি খেলা তো আছেই। আর আছে স্কেট বোর্ডে হাঁটা বা দৌড়ানো এবং এক চাকার ছোট্ট স্কুটারে হাঁটা বা ছোটা। গোটা জাতিটাই যেন পার্কে শরীর চর্চায় মগ্ন। এখানে তো পার্কের ছড়াছড়ি। এছাড়াও রাস্তার পাশে ফুটপাথে স্কেট বা স্কুটার চালানোর পথ এবং বড় শহরে রাস্তার পাশে আলাদা সাইক্লিং এবং জগিং রোড আছে। এত স্বাস্থ্য সচেতনতা সত্বেও কিন্তু এদেশেই স্থুলকায় মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক। এবং এই স্থুলতা যেমন তেমন নয়। আমাদের দেশের গনেশ মার্কা ভুঁড়ি-সর্বস্ব নয়। হাত পা সর্বাঙ্গই বিপুল মোটা। আর এদের ওজন তিন থেকে চারশো পাউন্ড হামেশাই হয়। তবু ওই বিশাল বপু নিয়েও তারা দিব্বি কর্মক্ষম।


     এখানে আর একটা ব্যাপার খুব নজর কাড়ে। এখানে পুলিশের গাড়ি, ফায়ারব্রিগেডের গাড়ি এবং কিছু কিছু এমার্জেন্সি সার্ভিসের গাড়ি, যেমন অ্যাম্বুলেন্স ইত্যাদিতে লাল-নীল তীব্র আলো ঝিকমিক করে। চোখে ধাঁধা লাগায়। ওইসব গাড়ির অগ্রাধিকার পথ চলায়। শুধু তাই নয় এখানে Emergency signal-ও আছে ওইসব গাড়ির জন্য। আর রাস্তায় তিন/চারটে করে লেন থাকায় এসব গাড়িকে কখনও জ্যামে আটকে পড়তে হয় না। আর এটা নিশ্চিত করার জন্য এসব গাড়ির একটা নির্দিষ্ট লেন থাকে। সেই লেনেও অন্যান্য গাড়ি চলে। তবে পিছনে এমার্জেন্সি সার্ভিসের গাড়ি এলে তৎক্ষণাৎ সেটা ছেড়ে দিতে হয়। অন্যথায় ফাইন অনিবার্য। এসব গাড়ির সঙ্গে এখানে স্কুলবাসকেও এমার্জেন্সি সার্ভিসের মধ্যে গণ্য করে। স্কুলবাসের পিছনেও এখানে নীল আলো ব্লিঙ্ক করে। তবে এমার্জেন্সি সার্ভিস হলেও এখানে সবাই সিগন্যাল মেনে চলে। এমন কি লেন বদলের ক্ষেত্রেও পিছনের আলোর সিগন্যাল দিতে হয়। আমাদের দেশে যার বালাই নেই। যে যখন যেমন খুশি হুটহাট লেন বদল করে। আর অল্প যে দু'চারটি রাস্তায় সিঙ্গল লেন, সেখানে সবাই পর পর পিছনে পিছনে চলে। ওভারটেক করে না। পাশের উল্টোদিকের লেন যদি ফাঁকাও থাকে সেখান দিয়ে কেউ ওভারটেক করে না ভুলেও। আর লেন বিভাজনের চিহ্ন যদি  নিরবচ্ছিন্ন থাকে সেখানে তো ওভারটেক করাই বেআইনি। আর লোকালয়ের কাছে, মোড়ের মুখে বড় বড় করে লেখা থাকে STOP. সামনে যদি পাঁচশো মিটারও ফাঁকা থাকে তবু কেউ হু হু করে গাড়ি ছুটিয়ে যায় না। STOP লেখা জায়গায় অন্তত এক সেকেন্ডও থেমে তবে গতি বাড়ায়।  


এটা এখানকার ড্রাইভিংয়ের প্রাথমিক শর্ত। না মানলে ফাইনের ব্যবস্থা পাকা। আর একটি আইন আছে যা সবাই মেনে চলে। এখানে পার্কিং লটের মধ্যে দু'চারটি জায়গা প্রতিবন্ধীদের জন্য চিহ্নিত থাকে। সেখানে প্রতিবন্ধী ছাড়া অন্য কেউ  ভুলক্রমেও যদি গাড়ি পার্ক করে তাহলে সর্বাধিক দু'শো পঞ্চাশ ডলার ফাইন গুনতে হবে।
     আর একটা ব্যাপার এখানে বেশ নজর কাড়ে। এখানে প্লাস্টিকের ব্যবহার মনে হয় আমাদের দেশের থেকে অনেক বেশিই হয়। কারণ, দেখেছি ওয়ালমার্ট বা যেকোনো শপিং মলে বা সেন্টারে গিয়ে পনেরো/কুড়িটা আইটেম কিনলে পনেরো/কুড়িটা প্লাস্টিক ব্যাগে আলাদা আলাদাভাবে দেয়। একই ব্যাগে দু'তিন রকম জিনিস ঢুকিয়ে দেয় না। তবে এখানে এতো প্লাস্টিক ব্যবহার সত্বেও এখানকার কোনও জলনিকাশি নর্দমা, খাল বা রাস্তাঘাটে প্রায় কোথাও একটা প্লাস্টিক ব্যাগও পড়ে থাকতে দেখা যায় না। তার কারণ, এখানকার প্রতিটি নাগরিক পরিবেশ সচেতন এবং তাঁদের নাগরিক সচেতনতা এতটাই প্রখর যে, তাঁরা যেখানে সেখানে কোনও পলিব্যাগ বা প্লাস্টিকের কোনও জিনিস ফেলবেনই না। এখানে প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি বা দোকান-মল-এর পাশে বা কাছাকাছি ময়লা ফেলার ড্রাম, ভ্যাট বা ট্র্যাস আছে। তার কোনোটাতে সাধারণ ময়লা, কোনোটাতে প্লাস্টিক ক্যান বা বোতল, কোনোটাতে পলিথিন বা কাগজের টুকরো ইত্যাদি ফেলার আলাদা আলাদা ব্যবস্থা আছে। এবং ওই প্লাস্টিক বা পলিথিন আমাদের দেশের মতো রাস্তাঘাট, মাঠ-ময়দান, খাল, জলা, পুকুর-নদীতে না ফেলার ফলে যেমন পরিবেশ দূষণ ঘটে না এবং সেগুলি সংগ্রহ করা এতো সহজ বলে সেগুলিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইক্লিং করাও এখানে অত্যন্ত সহজ। কিন্তু আমাদের দেশে এগুলো সংগ্রহ করে এক শ্রেণীর নিম্নতম আয়ের মানুষ। যদিও নর্দমা, খাল, পুকুর, নদী ইত্যাদি থেকে সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে স্বল্প সময়েই ওগুলি ভরে ওঠে। খাল, নর্দমা, নদী তাদের নাব্যতা হারায়। ফলে অচিরেই  পরিবেশ দূষিত হয়ে নরক সৃষ্টি করে। সুতরাং এ ব্যাপারে নাগরিক সচেতনতাই বেশি জরুরি।


(চলবে) 

বুধবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:পর্ব-৩৪।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:পর্ব-৩৪
পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়


আজকে অ্যাপার্টমেন্টে pest control দেবার দিন ছিল। অফিসে যাবার আগে বাবাই সেটা বলে গিয়েছিল।ফলে রান্নাঘরের সব জিনিসপত্র ক্যাবিনেট থেকে বের করে অন্যত্র সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। ছেলেটা এল প্রায় তিনটের দিকে। ও স্প্রে করে চলে যাবার পর সাড়ে তিনটের দিকে আমরা দু'জন বেরিয়ে কাছেই ভেটেরান্স পার্কে গেলাম। বিশাল পার্কটা। তবে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। পার্কে ঢুকেই নজরে পড়ল একটা Notice. তাতে লেখা--"For your safety/ walk inside the park with a friend." নোটিসটা দেখে একটু শঙ্কিত হলাম। 'বং কানেকশন' সিনেমায় দেখেছি এখানে নির্জন জায়গায় একা কাউকে পেলে বদমাইশ লোকজন তাদের কাছে ডলার চায়। না দিলে কেড়ে নেয়। আমার পার্সে তিনশো ডলারের উপর ছিল। ফলে ভয় বেড়ে গেল। তবুও সাহস করে একটু এগোতেই দেখি দু'জন কালো মানুষ রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। আমরা সেদিকে না গিয়ে দেখলাম পাশে একটা টেনিস কোর্টে দু'জন খেলছে। তার পাশের কোর্টে একজন আপন মনে প্র্যাকটিস করে চলেছে। সেখানে ঘাসের উপর কিছুক্ষণ বসলাম। আশপাশের অপূর্ব নিসর্গের কিছু ছবি তুললাম। তারপর এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে দেখি অন্য একটা মাঠে চার-পাঁচজন নেপালি বা ভিয়েতনামি ছেলে ফুটবল খেলছে। সেখানেও খানিকক্ষণ বসে তাদের খেলা দেখলাম। আশেপাশে মিলে গোটা চারেক টেনিসকোর্ট, দু'তিনটে বাস্কেটবল কোর্ট, তিনটে বেসবল কোর্ট, দূরে কয়েকটা ফুটবল ও রাগবির কোর্ট। এছাড়াও বাচ্চাদের স্লিপ, সি স, নাগরদোলা ইত্যাদি নানা খেলার সরঞ্জাম। মাঝে মাঝেই বসার চেয়ার-টেবিল। সাইক্লিং এবং জগিং ট্র্যাক। আর সারা পার্ক জুড়ে নানা বর্ণের গাছপালা এবং ফুলের ছোট ছোট বাগান। পার্কটা কখনও টিলার মত উঁচু, কখনও ঢালু হয়ে নেমে গেছে অনেকটা। আর সারা মাঠটা মখমলের মত সবুজ ঘাসে ছাওয়া। তবে ওই বিশাল পার্কটায়(আনুমানিক 25/30 একর তো হবেই) সাকুল্যে 15/20 জন মানুষ খেলছে বা ঘোরাঘুরি করছে। বাচ্চা একজনও নেই। মনে হয়  মাঝ-সপ্তাহ বলে। সপ্তাহান্তে নিশ্চয়ই এখানে ভিড় হয় অন্যান্য পার্কের মত। শনি-রবিবারে একদিন আসতে হবে আবার।
     হুসেন বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের জন্য আবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেন। তাঁর প্রতিপক্ষ রোমানি তাঁকে স্বাগত জানালেন হাসিমুখে, করমর্দনের মাধ্যমে।কী সহজ সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃশ্য! মাসব্যাপী বিতর্কে যেমন ছিল না কাদা ছোঁড়াছুড়ি, অশালীন বাক্য প্রয়োগ বা চিৎকার চেঁচামেচি, তেমনই এই জয়-পরাজয়ের নিষ্পত্তিতেও দেখা গেল সেই শান্ত-সুন্দর দৃশ্য। যেন খেলায় জয়-পরাজয়। এখানে পরাজিত দল নির্বাচনের পরে আর বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করে না। এরপর সব দল মিলে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজে লেগে পড়ে। সরকারকে পদে পদে বাধা দেওয়া,তার ভাল-মন্দ সব কাজে বাগড়া দেওয়া, ভাল কাজেরও সুখ্যাতি না করা, অকারণে বিরূপ সমালোচনা করা এসব আমাদের দেশের রেওয়াজ। কিন্তু এখানে ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়। আগেও একবার উল্লেখ করেছি--এদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ মনে করে দেশটা তারও, দেশের ভাল-মন্দের দায়দায়িত্ব সকলের। যে দল জনাদেশের বলে চার বা পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এল তাকে কাজ করার সম্পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে। কারণ, দেশের ভাল হলে সরকার, বিরোধী সবারই মঙ্গল। শুধু বিশেষ একটা দলের মঙ্গলের জন্য সরকার নয়--এই বিশ্বাস এখানকার আপামর জনগণের। সরকারও মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা দেয়। আমাদের দেশে দেশপ্রেম ব্যাপারটাই প্রায় বিলুপ্ত। বা বলা ভাল দেশপ্রেম জাগাবার মানসিকতাই নেই আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে। তারা মনে করে দেশটা যেন শুধুমাত্র তাদেরই এবং তাদের দলের। দেশের ভাল করার দায়-দায়িত্ব শুধু তাদেরই হাতে। অন্যরা তাতে ভাগ বসালে তাদের আত্মাভিমানে লাগে বুঝি। ফলে বিরোধীপক্ষ চায় সরকারকে পদে পদে বিড়ম্বিত করতে। তার  সব কাজে বাগড়া দিতে। তাহলেই তারা সরকারের ব্যর্থতাকে জনসমক্ষে ফলাও করে তুলে ধরে পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারবে। সরকারকে সহযোগিতা করলে, সরকারের সাফল্য হলে তাদের দলের কোনও ফায়দা নেই--বিরোধীপক্ষের এমনই মানসিকতার ফলে দেশের মঙ্গল কিছুতেই হয় না। দেশ জাহান্নমে যাক আখেরে তাদের দলের কোনও লাভ হল কিনা এটাই মুখ্য বিবেচ্য। তারা ভাবে না যে, সরকারকে সাহায্য করলে, দেশ গড়ায়, দেশের উন্নয়নে সাহায্য করলেও তাতে তাদের দলের ভাবমূর্তিও ঊজ্জ্বল হয়, মানুষ সেটাও লক্ষ করে। এবং তার জন্যও তারা পরবর্তীতে ক্ষমতায় ফিরতে পারে জনসমর্থনের মাধ্যমে। কিন্তু ওই নেতিবাচক মনোভাবের জন্য দেশ বা তাদের দল কারও মঙ্গল হয় না।
     এখানকার খবরের কাগজের দিকে চোখ বোলালেও আমাদের দেশের খবরের কাগজের সঙ্গে তার মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ে। আমাদের ওখানকার খবরের কাগজে শুধুমাত্র নেতিবাচক খবরই ছাপা হয়। খুন, ধর্ষণ, নারী পাচার, শিশু নিগ্রহ, বধূহত্যা, হুমকি, লুটতরাজ, ছিনতাই, রাস্তা অবরোধ, চলবে না চলবে না, ক্লোজার, ছাঁটাই, ধর্মঘট, বনধ্,  পুলিশি জুলুম, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা,  



দারিদ্র্যের জন্য সন্তান বিক্রি বা আত্মহত্যা, হাসপাতালে কুকুর ঢোকা বা ডাক্তারদের চিকিৎসায় গাফিলতি--তজ্জনিত অবরোধ, প্রহার--এবম্বিধ খবরেই ঠাসা থাকে পৃষ্ঠাগুলো। তার সঙ্গে সরকারের অপদার্থতা, সমালোচনা, কুৎসা। কোনও ভাল কাজের প্রশংসা নয়। কিন্তু এখানকার খবরের কাগজে এসমস্ত খবরগুলো কিছু থাকলেও বিশেষ গুরুত্ব পায় না। গুরুত্ব পায় গঠনমূলক, উন্নয়নমূলক, বিকাশশীল খবরে। এই যে এখানে বিধ্বংসী ঝড় স্যান্ডি হয়ে গেল--তারজন্য সরকারি ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলি খুঁচিয়ে তুলে হাইলাইট করা নয়, সরকারি প্রচেষ্টা এবং সাফল্যকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিভাবে ওই বিপর্যয় থেকে দেশ মুক্ত হতে পারছে বা চেষ্টা  চালাচ্ছে এগুলোই তুলে ধরে। অর্থাৎ সেই আগে দেশ এবং মানুষ, দল বা ক্ষুদ্র স্বার্থ নয়। এবং এক্ষেত্রে বিরোধীপক্ষও দেশের স্বার্থে সরকারকে সাহায্য করে বা সহযোগিতা করে। রাজনৈতিক লাভের জন্য তারা সরকারকে বিড়ম্বনায় ফেলে দেশের মানুষের দুর্দশাকে দীর্ঘায়িত করে না। অবশ্য  বলা বাহুল্য ব্যতিক্রমও আছে।


(চলবে)
 

বুধবার, ১০ নভেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৩)।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা(পর্ব-৩৩)



পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

আজ আরও একটা ঘটনায় এদের কর্মনিষ্ঠা, কাস্টমারদের সঙ্গে আফটার সেল ডিলিং কী রকম হওয়া উচিত তা জানতে পারলাম। আজ সন্ধে সাড়ে সাতটার দিকে ওয়ালমার্টে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ গাড়িটা চলতে চলতে এক বিদঘুটে শব্দ শুরু করল। যাইহোক, ওভাবেই আরও মাইল দু'য়েক গিয়ে ওয়ালমার্টে পৌঁছে দেখা গেল গাড়ির বাঁদিকের পিছনের চাকাটি একেবারে ফেটে চৌচির। এখানকার গাড়ির টায়ারের মধ্যে কোনও টিউব থাকে না। ফলে ফেটে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়নি এবং চাকাও বিশেষ নীচু হয়ে যায়নি। যাইহোক, বাবাই গাড়ির Rental Office-এ ফোন করল। তারা জানাল যে, পঁচিশ মিনিটের মধ্যে মেকানিক আসছে। মিনিট কুড়ির মধ্যে প্রায় সত্তর বছর বয়স্ক এক ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে হাজির। এসে চাকার অবস্থা দেখে প্রথমেই তো ভীষণ দুঃখ প্রকাশ করলেন। তারপর মাত্র চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফাটা চাকা খুলে নতুন চাকা লাগিয়ে দিলেন। সম্পূর্ণ কাজটা  করলেন যন্ত্রের সাহায্যে। নাট-বোল্ট খোলা-লাগানো থেকে জ্যাক দিয়ে গাড়ি উঁচু করা সবই। যাওয়ার আগে আরও একবার ক্ষমা চেয়ে গেলেন।
     আমাদের কলকাতার মানসিকতায় বাবাই একটু জিজ্ঞাসা করল যে, আচ্ছা এভাবে টায়ার পাংচার হল এটা কি কারও কারসাজিতে বা ক্ষতি করার জন্য? উনি বললেন, না না, কক্ষণো না। এখানে এ ধরনের মানসিকতার মানুষ নেই। কোনমতেই সম্ভব নয়। টায়ারটা যেভাবেই হোক ফেটেছে। তারপর তুমি ওই অবস্থায় চালিয়ে এসেছো বলে এতো জায়গায় ফেটেছে। অবশ্য তার জন্য তিনি কোনও দোষারোপ করলেন না।
     এরপর ঠিক পঞ্চান্ন মিনিট পর একটা অটোমেটেড কল এল। সেখানে জিজ্ঞাসা-- গাড়ির চাকা কি পাল্টানো হয়ে গেছে, না এখনও কাজ চলছে? আসলে এখানে শহরের মধ্যে যদি এমন কোনকিছু ঘটে তবে এদের সার্ভিস রুল অনুযায়ী পঞ্চান্ন মিনিটের মধ্যে কাজটা সম্পূর্ণ করতে হবে নাহলে অন্তত শুরু করতেই হবে। আবার বুঝলাম একটা দেশ কেন এগিয়ে আর আমরা কেন পিছনে ছুটছি। S.L.A. বা Service level agreement নামে একটা আইন আছে এখানে। যার অন্তর্ভুক্ত এসব কাজ। এবং এসব আইন শুধু বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে লুকিয়ে থাকে না, তার প্রয়োগ নিখুঁতভাবে হয়। যদি না হয় তবে কাস্টমার একটা case ঠুকলেই তাদের ব্যবসা লাটে উঠবে এবং  ক্ষতিপূরণ তো করতেই বাধ্য। যা আমাদের দেশে চিন্তা করাই যায় না। যদিও এমন আইন আছে কিন্তু তার বিচারপদ্ধতি এতো দীর্ঘমেয়াদী যে, দু'হাজার টাকা আদায় করতে বিশ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাবে।
     আজ থেকে এখানকার সময় এক ঘন্টা পিছিয়ে গেল। এটাকে এখানে বলা হয় Day time saving. জানি না তাতে কিছু ক্ষতি-বৃদ্ধি হয় কিনা। কিন্তু রাতারাতি এক ঘন্টার হেরফেরে সকাল একঘন্টা পরে হচ্ছে। অর্থাৎ এক ঘন্টা পরে স্কুল, কলেজ, অফিস ইত্যাদি শুরু হচ্ছে।
     সে যাইহোক, আজ বিকেলে কাছাকাছি একটা পার্কে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। নাম Delta Park. U.S.A.তে এসে যতগুলো পার্কে বেড়াতে গেছি এটা তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। এর আগে হার্টফোর্ডে থাকতে আমরা গিয়েছি বুশনেল পার্ক, এলিজাবেথ পার্ক ছাড়াও আরও একটা পার্কে। যাদের আয়তন এটার চেয়ে অন্তত  দশ-পনেরো গুণ বড়। এখানে এসেও আমরা গিয়েছি Freedom Park-এ। তার আয়তনও বিশাল। তবে ছোট বড় যেমনই হোক এখানকার সব পার্কে যে ব্যাপারটা সচরাচর দেখা যায় সেটা হল, প্রতিটি পার্কের একাধিক খেলার মাঠ আছে। ফুটবল, বাস্কেটবল, টেনিস, রাগবি ইত্যাদি খেলার মাঠ আলাদা আলাদাভাবে আছে। এছাড়া বহু নারী-পুরুষ ছুটছে, হাঁটছে, জগিং করছে, স্কিপিং করছে বা অন্য শারীরিক কসরৎ করছে। এছাড়া বাচ্চাদের জন্য আছে নানাবিধ খেলার সরঞ্জাম। আর আছে ট্রেল। সেখানে কেউ দৌড়াচ্ছ, সাইক্লিং করছে। এক-দু'বছর বয়সী থেকে সত্তর-আশি বছর বয়স্ক মানুষ সবাই শরীরচর্চায় ব্যস্ত। এছাড়া কুকুর নিয়ে ঘোরা বা কুকুর চরানো তো আছেই।
     রাতে Up Town-এ  Rock Bottom রেস্টোরেন্টে ডিনার সেরে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজল।
     এখানে অর্থাৎ শার্লটে জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস রাতের তাপমাত্রা  (--1°) সেন্টিগ্রেডের নীচে নামবে। তবে ঘরের ভেতরে কিছুই বোঝা যায় না। এখানে প্রতি ঘরেই হিটিং-এর ব্যবস্থা আছে। ফলে তাপমাত্রার তারতম্য কিছুই বোঝা যায় না। ওদিকে হার্টফোর্ড থেকে মুনিয়ারা জানালো যে, ওদের ওখানে দু'তিন দিন ধরে  (--3-4°) তাপমাত্রা চলছে। ওদের ওখানে আবার Centrally heating  দেয় Apartment Authority থেকে। তার heat এতো বেশি যে শরীরে সহ্য হয় না। মাঝে মাঝেই heating machine বন্ধ করে রাখতে হয়। যন্ত্রও মাঝে মাঝে যন্ত্রণারও কারণ হয়ে ওঠে।



(চলবে) 








বুধবার, ৩ নভেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:পর্ব-৩২।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ — বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 





ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:পর্ব-৩২

পৃথিবীর উল্টো পিঠ 




বিশ্বেশ্বর রায়

      আজও সারাদিন প্রায় কোথাও বেরোনো হয়নি। প্রাত্যহিকের মতো সকালে রেস্টোরেন্টে গিয়ে প্রাতরাশ খাওয়া, সন্ধেয় ডিনারে যাওয়া আর সারাদিন ঘরেই শুয়ে-বসে টি ভি দেখে বা ইউটিউবে গান শুনে কাটানো। তবে আজ বিকেলে বেরিয়েছিলাম। Marriott -এর আশপাশে ঘুরে ঘুরে কিছু ফটো তোলা হল দু'জনে। তবে ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডির জন্য হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছিল থেকে থেকে। ফলে বিশেষ কাজ হল না। অর্থাৎ ফটো তোলা সম্পূর্ণ হল না। তাই পরদিন আবার বেরোলাম। আজ আকাশ অনেকটা পরিস্কার, বৃষ্টিও নেই। ফলে বেশ ভালোভাবেই ফটো তোলা গেল।
      এরমধ্যে দুপুরবেলা Margarita এসেছিল একতোড়া গোলাপ হাতে। ও এখানকার হাউস কিপিং-এর কর্মী। সুমিত্রার সঙ্গে ওর ভীষণ বন্ধুত্ব  হয়ে গেছে। ওর বাড়ি মেক্সিকোতে। অবিবাহিত, স্প্যানিশ, পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি বয়স। ছোটখাটো চেহারা। সুমিত্রা ওকে একটা জামা দিলো। বম্বে থেকে কেনা। ও খুব খুশি। আমাদের দু'জনের সঙ্গে ফটো তুললো ওর মোবাইলে। সেলফি। আমরাও ওর সঙ্গে ফটো তুলে রাখলাম।
      আজ সকাল সাড়ে নটার দিকে দরজায় টোকা। দরজা খুলতেই সামনে মার্গারিটা। হাতে একটা গিফট প্যাক। খুলে দেখা গেল তারমধ্যে পাথর আর রঙিন কাচ মিলিয়ে নেকলেস, চুড়ি আর কানের দুল। কালকের গিফট-এর রিটার্ন গিফট। মেয়েটা সুমিত্রাকে বেশ পছন্দ করে ফেলেছে। ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। স্প্যানিশ ভাষা বেরিয়ে আসে। আমরাও ইংরেজিতে খুব একটা দক্ষ নই। কাজ চলে যায়। বেশি গল্প করতে পারি না। ফলে দু'চার কথা বলেই উভয়ে কাজ সারে।

      যে স্যান্ডি ঝড় দু'দিন আগে হালকা আভাস দিচ্ছিল তা ক্রমশ মারাত্মক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে আমেরিকার তেরোটি রাজ্যে থাবা বসিয়েছে। এরকম ঘূর্ণিঝড় আমেরিকায় প্রায় প্রতি বছরই আছড়ে পড়ে সমুদ্র উপকূলবর্তী বিভিন্ন প্রদেশে। এবার নিউইয়র্ক ও নিউজার্সি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া ওয়াশিংটন ডি সি, ফিলাডেলফিয়া, কানেকটিকাট প্রভৃতি আরও কয়েকটি রাজ্যেও বেশ তাণ্ডব চালিয়েছে। খবরে শুনলাম পনেরো-ষোলো জনের প্রাণহানি হয়েছে। সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে বিপুল পরিমাণে। বহু ঘরবাড়ি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বহু গাছ ভেঙে পড়েছে বা উপড়ে গেছে। বহু জায়গায় প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহারা। সমুদ্রের জল প্রায় চার মিটার উচ্চতায় বেলাভূমিতে আছড়ে পড়েছে। ফলে অনেক ছোট জাহাজ এবং নৌকা ভেঙে গেছে বা ডাঙায় আছড়ে পড়েছে। বান্টি নামের এক জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। ডাঙার বহু গাড়ি তুষারে ঢেকে গেছে, গাড়ির উপর গাছ ভেঙে পড়ে গাড়ি চূরমার হয়েছে। অনেক ডাঙায় থাকা গাড়ি জলের তোড়ে নদী বা সমুদ্রে ভেসে চলে গেছে। আমেরিকার এ এক বাৎসরিক বিভীষিকা। তবে এবারের ঝড় নাকি অনেক বেশি শক্তিশালী। গত দশ বছরে এতো শক্তিশালী ঝড় দেখা যায়নি।
      তবে আমরা যেখানে আছি সেই নর্থ ক্যারোলিনা রাজ্যে ঝড়ের ব্যাপকতা ততটা হয়নি। তার কারণ, এই রাজ্যটি সমুদ্র উপকূল  থেকে বেশ অনেকটা ভিতরে।তবে এই রাজ্যের পার্বত্য অঞ্চলে ভীষণ তুষারপাত হয়েছে।
      'We are sorry we missed you.' Oak Park-এ বাবাই নতুন apartment নিয়েছে। আমরা গতকাল এখানে shift করেছি। যদিও apartment-টা studo type, কিন্তু বেশ বড়।বড় হল ঘরটায় অন্তত চারখানা খাট পাতা যাবে। বেশ বড়সড় modular kitchen. একসঙ্গে চারজনের পরিবারের তিন-চার মাসের রসদ রাখার ব্যবস্থা আছে। চার বার্নারের ইলেকট্রিক  ওভেন। ওভেনের নীচে গ্রিলার। স্টেনলেস স্টিলের বড় সিঙ্ক। ঢাউস ফ্রিজ। ধোঁয়া বা পোড়া গন্ধ বের করার জন্য চিমনি। এছাড়া ছ'জনের খাওয়ার টেবিল রাখার জায়গা। দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেই shoe rack. সাত×ছয় বাথরুম। বাথরুমে বাথটাব, বেসিন,আয়না, কমোড ইত্যাদি যাবতীয় সরঞ্জাম আছে। বাথরুমের সামনে আরও একটা সাত×ছয় ছোট্ট ঘর। সেখানে আছে wardrobe.এছাড়াও পিছন দিকে  ষোলো ফুটের এক বিশাল কাচের স্লাইডিং দরজা। তার সামনে ওই ষোলো × ছয় ফুটের একটি বারান্দা বা ব্যালকনি। এখানে যাকে patio বলে। এতো কথা বললাম এই কারণে যে,এখানে ছোট-বড় সব অ্যাপার্টমেন্টেই সাধারণ সুযোগসুবিধাগুলো প্রায় সমান।
      যে বাক্যটি দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের বিষয়ে শুরু  করেছিলাম তার অবতারণার কারণ আছে। এই ওক পার্ক আবাসনের অফিস খোলা থাকে সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। তার আগে বা পরে কেউ যদি অফিসে যায় বা ফোন করে তবে তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য এই বাক্যটি। কেউ দেরি করলেও তাকে দোষ না দিয়ে এরা  (আমেরিকানরা) অপরাধটা যেন ওদেরই এমনটি বোঝাতে চায়। আমাদের দেশের মতো 'দূর মশাই এখন এসেছেন কেন! অফিসের সময় আসবেন অন্যদিন।' এ জাতীয় কথা এখানে শুনবেন না কেউ। একটা দেশ, জাতি কেন প্রথম বিশ্ব আর আমাদের দেশ কেন তৃতীয় বিশ্বের গণ্ডি টপকাতে পারছে না তা এদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের ব্যবহার, মানসিকতা, ভদ্রতাবোধ, কর্মসংস্কৃতি ইত্যাদির পরিমাপেই বোঝা যায়।




        

      চলবে...









বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা( পর্ব-৩১)।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ — বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণকথা( পর্ব-৩১)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ 

বিশ্বেশ্বর রায়


দেখতে দেখতে Marriott-এ প্রায় এক মাস হয়ে গেল। আর সপ্তাহখানেক এখানের বাস কাল। এরপর যেতে হবে বাবাইয়ের নেওয়া নতুন অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানেও কাটবে প্রায় এক মাস। তারপর 'মন চলো নিজ নিকেতনে'। মন বেশ কিছুদিন ধরেই টানছে। কলকাতায় কতো কাজ। তিন মাস পরে বাবাইয়ের বিয়ে। তার সবকিছু সারতে হবে। তারপর একে একে বাড়িঘর, পেনশন, ব্যাঙ্ক, পোষ্টঅফিস, D.S.,M.I.S. কতো কিছু কাজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সব সামলাতে হবে। তারপর রয়েছে বিয়ের কার্ড ছাপানো, নিমণ্ত্রণ করার পর্ব, ডেকরেটর, ক্যাটারার, কেনাকাটা। এখানে মহাসুখে শুধু কাটালেই তো চলবে না। বাবাই তো প্রায়ই বলে--'কী হবে কলকাতায় থেকে? লাইফটা এনজয় করো। এখানে আমার কাছে, দিদির কাছে থাকো। ইন্ডিয়ায় গেলে মুম্বইয়ে আমাদের কাছে থাকবে। আস্তে আস্তে কলকাতার পাট চুকিয়ে দাও।' বললেই কি আর চুকিয়ে দেওয়া যায়! নিজেদের হাতে গড়া সংসার, বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব-- এসব শিকড়ের টান ছিন্ন করে যাওয়া কি অতই সহজ! এই বয়সে অতল-প্রোথিত শিকড় উন্মূল করে নতুন জল-মাটি-আবহাওয়ায় নতুন করে কি মাটির গভীরে শিকড় ছড়ানো সম্ভব! ওরা হয়তো আমাদের এই যন্ত্রণা ঠিক বুঝবে না। কারণ, ওদের শিকড় বেশিদূর চারিয়ে যেতে পারেনি। আগে তো কলকাতায় ফিরি, আগে তো বাবাইয়ের বিয়ে থাকে চুকুক। তারপর ফ্ল্যাট আর গাড়ির একটা বন্দোবস্ত করতে হবে। বাড়ির কথা না হয় পরে ভাবা যাবে। অনেক কাজ, অনেক চিন্তা, অনেক সমস্যার পারাবার পেরিয়ে তবেই না অন্যত্রের ভাবনা!

      বাবাই অফিস থেকে ফিরলে প্রায় আটটার দিকে আবার সবাই মিলে বের হলাম। কিছু কেনাকাটার ছিল। বাবাইয়ের নতুন অ্যাপার্টমেন্টের সংসারের টুকিটাকি প্রায় সবই কেনা হয়ে গেছে। এখনও রান্নার কিছু বাসনপত্র কেনা বাকি। আগের অ্যাপার্টমেন্টে বাবাইকে বেশ কিছু জিনিসপত্র ফেলে আসতে হয়েছে। আনা সম্ভব হয়নি। তাই ঠিক হয়েছে এবার ভারী এবং দামি কিছু কেনা হবে না। কারণ, কখন আবার অন্যত্র ছুটতে হবে তার নিশ্চয়তা নেই। যেগুলো নেহাতই না হলেই নয় সেগুলোই কেনা হল। যাতে আবার অন্যত্র যাওয়ার সময় সেগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। বাকিগুলো ফেলে গেলেও আর্থিক ক্ষতি খুব বেশি হবে না।

      কয়েক দিন পর আজ আবার বেরিয়েছিলাম 3700 নম্বরে Metal Morphosis দেখতে।কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখা গেল সেটা অন্য কিছু। গুগল্-এ যা বলছে তা নয়। G P A-তে পথনির্দেশ  নিয়ে আমরা দু'বার চেষ্টা করলাম সঠিক জায়গায় পৌঁছবার; কিন্তু দু'বারই একই জায়গায় নিয়ে গেল। যাইহোক, শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে Wal-Mart, Family Dollar, Dollar General, Dollar Green, Dollar Tree ইত্যাদি Mall এবং দোকানে যাওয়া হল কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা সারতে। কারণ, আর তিন/চার দিন পর Marriott ছাড়তে হবে বাবাইকে। যেতে হবে নতুন অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে রান্না-খাওয়ার সরঞ্জাম তো লাগবে। এখানে সবকিছুই আছে, কেনার প্রয়োজন পড়েনি। ওখানে রান্না-খাওয়ার সরঞ্জাম ছাড়াও বিছানা-বালিশ-লেপ-কম্বল, ল্যাম্পশেড ইত্যাদি তো চাই। 
      আজ রবিবার, কোথাও বেরুনো হল না। যদিও বেরোবার কথা ছিল। কিন্তু দুপুরের খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে এতো দেরি হয়ে গেল যে বেরোবো বেরোবো করেও আর হয়ে উঠলো না। তারউপর বাবাইয়ের এক অফিস-কলিগ্ এই ম্যারিয়টেই এসে উঠেছে ইন্ডিয়া থেকে, আজই। আসার খবর জানিয়ে ফোন করেছিল। বাবাই তার সঙ্গে দেখা করতে গেল সন্ধ্যায়। তারউপর ওর অন্য এক কলিগ্, যে কাছাকাছি অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, সে-ও এসেছিল দেখা করতে। ফলে তিনজনে অনেকক্ষণ আড্ডা  দেবার পর নতুন কলিগের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে তিনজনে বেরিয়েছিল। তারপর অতো দেরি করে আমাদেরও আর বিশেষ বেরোবার ইচ্ছা ছিল না। কারণ, আর দু,দিন পর একত্রিশ তারিখে ম্যারিয়ট ছেড়ে নতুন অ্যাপার্টমেন্টে Shift করতে হবে। জিনিসপত্র ছড়িয়েছিটিয়ে এলোমেলো হয়ে আছে, সেসব গোছাতে হবে।



         
(চলবে) 

বুধবার, ২০ অক্টোবর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা(পর্ব-৩০)।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।।Ankurisha ।। E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা(পর্ব-৩০)


পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

      আমরা মুখেই বলি---সব মানুষ সমান, সবাই  একই পরমাত্মার থেকে সৃষ্ট, সবার মধ্যেই ভগবানের অধিষ্ঠান, সবাই 'অমৃতস্য পুত্রাঃ'; কিন্তু আদতে তা নয়। তাই আজও দেখি এক জাতের সঙ্গে অন্য জাতের বৈবাহিক মিলনে শত বাধা। যারা নিজেদের উঁচু জাত বলে ভাবে তাদের সঙ্গে তথাকথিত কোনও নীচু জাতের ছেলেমেয়ের প্রেমঘটিত বিবাহও মেনে নিতে পারে না উচ্চমন্যরা। ত্যাজ্যপুত্র বা ত্যাজকন্যা তো আছেই, তার উপর আছে বিবাহ বিচ্ছেদ। তাতেও রাগ না মিটলে আছে খুনোখুনি। তাই সবাই সমান, সবাই অমৃতের পুত্র, সবার মধ্যে ভগবানের অধিষ্ঠান--এসবই কথার কথা হয়েই রয়ে গেল। মান্যতা দেয় না কেউ। তাই পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনে দেখা যায় বিভাজন-- ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, বৈশ্য,পৌণ্ড্র, নম:শূদ্র, তিলি, কর্মকার, নাপিত, বারুজীবী, খৃষ্টান, বৌদ্ধ,  জৈন, শিখ, উপজাতি ইত্যাদি সহস্রবিধ বিভাজন। এবং বহুক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে বলা থাকে 'জাতিভেদ নাই, তবে এস সি, এস টি বাদে।' কী নির্মম পরিহাস, কী অবমাননাকর, কী জঘন্য আত্মশ্লাঘা! তাই এই দেশ পিছনে ছাড়া এগোবে কিভাবে! কবির ভাষায়--'যারে তুমি নীচে ফেলো সে তোমাকে পশ্চাতে টানিছে।' এই বিপরীতমুখী আকর্ষণে কেউ কি এগিয়ে যেতে পারে! অনেকেই বলেন যে, তাঁরা এসব মানেন না, তবে সমাজে তো বাস করতে হবে! সমাজের অন্যরা কী ভাববে? নিজেরা পতিত বা নিম্নগামী হয়ে গেল না তো! এসব ভেবেই ক্ষান্ত হয় সংস্কারে।

      আজ গিয়েছিলাম শার্লটের একমাত্র দুর্গাপুজো দেখতে। 'প্রবাসী অব শার্লট' এই পুজোর উদ্যোক্তা এবং আয়োজক। বাবাই আগেই ফোনে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুজোর স্থান-কাল ইত্যাদি জেনে নিয়েছিল।  এখানে শনিবার ও রবিবার এই দু'দিনেই পাঁচ দিনের পুজো সারা হয়। সমগ্র ইউ এস এ-তেই এই ব্যবস্থা। সন্ধে ছটায় সন্ধিপুজোর পর শুরু হয় বিচিত্রানুষ্ঠান, পরে নৈশাহার। ভারতের নাম করা শিল্পী, বিশেষত কলকাতার শিল্পীদের প্রাধান্য থাকে। পুজোমণ্ডপে পৌঁছে আলাপ হল কৌশিক, স্বপন, কেয়া প্রমুখ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। শার্লটের আগে দু'টো পুজো হত। এবছর থেকে একটাই। অন্য উদ্যোক্তারা হাল ছেড়ে দিয়ে 'প্রবাসী অব শার্লট'-এর নৌকায় চড়েছেন। পুরোহিতের নাম অজয় চক্রবর্তী। সন্ধিপুজোর পর শুরু হল বিচিত্রানুষ্ঠান। সবই ঘরোয়া। একদম বাচ্চা থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ অনেকেই নাচ, গান ইত্যাদি পরিবেশন করলেন। কয়েকটি অনুষ্ঠান--বিশেষত দু'টি নাচের এবং তিন-চারজনের গানের অনুষ্ঠান খুবই উচ্চস্তরের হল। ভাবতেও পারিনি শুধুমাত্র প্রবাসী বাঙালিরা এখানে এমন মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান উপস্থাপিত করতে  পারেন। কলকাতা থেকে আসার সময় আমার লেখা দু'টি বইয়ের কয়েকটি কপি এবং 'প্রগতি সাহিত্য পত্র' পত্রিকার কয়েকটি কপি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলো সংগঠকদের হাতে তুলে দিলাম। ওখানেই স্টেজে বই ও পত্রিকাগুলো হাতে হাতে বিলি করা হল। ওঁদের বাৎসরিক স্যুভেনির দেখলাম।  লেখা বিনিময়ের কথা বললাম। ওঁরা আপাতভাবে তো আগ্রহ দেখালেন। জানি না পরবর্তীতে কী হবে!
      আজ রবিবার, বাবাই-এর ছুটি আছে। আগেই ঠিক ছিল আমরা 'The Great Smokee  Mountain' দেখতে যাব। পরিকল্পনা অনুযায়ী বেশ সকালে বেরিয়ে পড়া গেল। দীর্ঘ পথ। যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় ছ'শো কিলোমিটার পথ। আমরা রাত্রিবাস করবো না, আজই ফিরে আসবো। প্রথমে পৌঁছালাম চেরোকীতে। ওখানে বেশ কিছু রেড ইন্ডিয়ান আছেন। তাঁদের কিছু শিল্পকলার নিদর্শন এবং মূর্তি দেখা হল। কয়েকটা ছবি তোলা হল।
      তবে এই দীর্ঘ ভ্রমণের অন্য যে আকর্ষণ তা হল গাছে গাছে পাতায় পাতায় বিচিত্র রঙের খেলা উপভোগ করা। আগেই বলেছি অক্টোবর-নভেম্বর মিলিয়ে পনেরো-কুড়ি দিন চলে এই রঙের চমক। যাকে এখানে বলে Fall Foliage. বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে 'ঝরা পাতার রংবাহারি' বা 'পাতায় পাতায় রঙের খেলা'। সারা  দিনের ভ্রমণ, দ্রষ্টব্য, খাওয়াদাওয়া, পথচলা সেরে ঘরে ফিরতে  ফিরতে রাত্রি প্রায় সাড়ে আটটা বাজলো। ঘরে ফিরে জানতে পারলাম বাংলা সাহিত্যজগতের এক নক্ষত্র পতন ঘটেছে। 'কাকাবাবু' স্রষ্টা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অকস্মাৎ চলে গেছেন। বাংলা সাহিত্যজগতের এই মহীরূহ পতনে যে বাংলা সাহিত্য যে বহুলাংশে দরিদ্র হবে তা বলাই বাহুল্য।


চলবে...








বুধবার, ৬ অক্টোবর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-২৯) ।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 






ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-২৯)



পৃথিবীর উল্টো পিঠ

বিশ্বেশ্বর রায়



      এখন চলছে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রোমানি মিটের (Romany Mitt)এর সঙ্গে। এখন ওঁদের দু'জনের সঙ্গে প্রতিদিনই চলছে বিতর্ক(debate)। এই বিতর্কের মধ্যে থাকে না কোনও ঝগড়াঝাঁটি, কথার উপর কথা বলা। একজনের বক্তব্যের মধ্যে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে অন্যজনের বক্তব্য পেশ, উত্তেজনা, উচ্চরোলে গলা তুলে আস্ফালন বা অন্যকে যেনতেনপ্রকারেণ বিরক্ত করা এসব কিছুই ঘটে না। খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ বা হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে বিতর্ক চলে। এক এক জনের জন্য যে সময় বরাদ্দ থাকে  (যেমন দু'মিনিট বা তিন মিনিট) তার মধ্যে একজন তাঁর বক্তব্য বা প্রশ্ন পেশ করেন। পরে অন্যজনও তাঁর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাঁর বক্তব্য, যুক্তি পরিসংখ্যান সহযোগে তুলে ধরেন। আবার প্রথমোক্তজন দু'মিনিটে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। দ্বিতীয়জনও ওই দু'মিনিটেই তা খণ্ডন করেন বা প্রতিযুক্তি সহযোগে তাঁর বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই চলতে থাকে বিতর্ক। আমাদের দেশে যেমন একজন বক্তব্য বলেই চলেন তো বলেই চলেন। অন্যকে বলার সুযোগই দেন না বা তাঁর বক্তব্যের মাঝখানে কথা বলতে থাকেন। ফলে দেখা দেয় উত্তেজনা, গোলমাল, কথা কাটাকাটি। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় আলোচনাটাই পণ্ড হয়ে যায়। একটা হযবরলভাবে অনুষ্ঠানটা শেষ হয়। এক এক জন ভাবেন যে তিনিই শ্রেষ্ঠ বক্তা,জ্ঞানী বা বিজ্ঞ। অন্যজন বা অন্যরা নেহাতই এলেবেলে। তাদের বক্তব্য তাঁর বা দর্শক-শ্রোতাদের শোনার প্রয়োজন নেই। তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যই শ্রোতারা শুনবেন।


      এখানেই আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে এদেশের নেতা-নেত্রীদের পার্থক্য। আমাদের দেশের নেতা -নেত্রীদের মানসিকতার সঙ্গে এঁদের মানসিকতার আকাশপাতাল পার্থক্য। মনে যাই থাক না কেন রাজনৈতিক লড়াই খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে এখানে সম্পন্ন হয়। বড়ো  বড়ো জনসভা করে, উচ্চরোলে যাতা বক্তব্য পেশ করে  জনগণকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ এখানে নিতান্তই কম। কারণ, এখানে যে পরিসংখ্যান ওঁরা পেশ করেন তা হতে হয় নির্ভুল, তথ্যনিষ্ঠ। যাহোক মনগড়া কিছু বলে আসর গরম করা নয়। তাই শেষ পর্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তাঁদের বিতর্ক শেষ হয়। শুরুর সময় যেমন করমর্দন ও আলিঙ্গন দিয়ে আলোচনা শুরু হয়, শেষেও দেখা যায় একই দৃশ্য। তারপর তাঁরা উপস্থিত শ্রোতা ও দর্শকদের সঙ্গেও করমর্দন করেন, সৌজন্য বিনিময় করেন। এসবই শিক্ষণীয়। একটা দেশ এমনি এমনি উন্নত হয়নি, পৃথিবীর সেরা দেশ হয়নি। তারজন্য শুধু অর্থ নয়, আরও বহুবিধ ফ্যাক্টর বা অনুসঙ্গ কাজ করে। এদের শিক্ষা-দীক্ষা, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ, পরিবেশচেতনা সবকিছুর মধ্যেই আছে এক শালিনতা এবং সচেতন ভাবনা। সর্বোপরি এখানকার গ্রাম এবং শহরের মধ্যে বৈষম্য খুবই কম। শহরের মানুষ যে যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে গ্রামের মানুষও প্রায় তার সবকিছুই পায়। যেমন--এখানে শহরের মানুষের সবারই গাড়ি আছে, ঘরে ঘরে এ সি, হিটার, কার্পেট, গ্যাস, বাথটাব, টিভি, ফ্রিজ,মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি আধুনিক জীবনযাত্রার যাবতীয় সরঞ্জাম যেমন আছে, গ্রামের মানুষদেরও প্রায় প্রত্যেকেরই এসব আছে। একটু ঊনিশ-বিশ। ভালো স্কুল একটু দূরে, শহরের চাকচিক্য একটু কম, এই যা। সর্বোপরি গাঁইয়া, চাষা, ছোটলোক, নিম্নবর্গ, পিছড়েবর্গ, অচ্ছুত, এস টি, এস সি, ও বি সি, বামুন, কায়েত, বৈশ্য, শূদ্র ইত্যাদি সহস্রবিধ বিভাজন নেই। এখানের অফিসে চাকরিতে যোগ দিলে প্রথমেই যে কটি রুল বা আইন বা নিয়ম খুবই কঠোরভাবে মানতে বলা হয় তার অন্যতম হল কোনও মানুষকেই হেয় করা চলবে না, অসম্মান করা তো ভীষণ গর্হিত অপরাধ। চাকরিই চলে যেতে পারে। সব মানুষ সমান এই বোধ এখানকার প্রতিটি মানুষের অন্তরে গেঁথে দেওয়া হয়। কেউ কাউকে তাই হেয় বা অসম্মান করার চিন্তাও করে না ভুল করেও। তাই উচ্চমন্যতা বা হীনম্মন্যতা এখানে নিতান্তই বিরল। তবুও কিছু মানুষের মধ্যে যে ভেদবুদ্ধি নেই তা সর্বাংশে বলা যাবে না। অবশ্য তা শুধু কালো(  black) আর ধলোর (white) সীমায় আবদ্ধ। ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যায় আমাদের দেশে। বামুন,  কায়েত, বদ্যি, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, মাহিষ্য, বারুজীবী, তিলি, কামার, কুমোর, চাষা, জেলে, ধোপা, নাপিত, তপশীল ইত্যাদি সহস্রবিধ বিভাজনে মানুষ বিভক্ত। এক জাতি বা গোষ্ঠী অন্য জাতি বা গোষ্ঠীকে হেয় করে আত্মশ্লাঘা অনুভব করে। তাই কখনও 'এক জাতি এক প্রাণ' হয়ে উঠতে পারেনি ভারতবর্ষ। যেন বৈষম্যের এক হিমালয় পর্বত বয়ে চলেছে ভারতবাসী যুগযুগান্ত ধরে। আরও কত যুগ বয়ে চলবে তা কেউ জানে না। যতদিন না এই বৈষম্য ঘুচবে ততদিন ভারতবর্ষের সার্বিক উন্নতির কোনও আশা নেই। যুগে যুগে কত ভগবান, মহাপুরুষ, যুগাবতার, সংস্কারক তো আমাদের দেশে জন্মেছেন কিন্তু কেউই বৈষম্য ঘোচাতে পারেননি। আর এদেশে একমাত্র যীশু সবকিছু একাকার করে দিয়েছেন।



(চলবে...)

বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা( পর্ব- ২৮)।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ —বিশ্বেশ্বর রায়।।Ankurisha ।। E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 



ধারাবাহিক ভ্রমণকথা( পর্ব- ২৮)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়



আজ আমরা ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। শার্লটের বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থান বাছাই করে প্রথমে একটা লিস্ট বানানো হল। কাছাকাছি কোথায় কোথায় আগে যাওয়া যেতে পারে। তো সেইমতো আমরা দুপুর এগারোটার দিকে প্রথমে গেলাম শার্লটের বিখ্যাত এক মানুষ বিলি গ্রাহাম প্রতিষ্ঠিত The Billy Graham Library-তে। 1921 সালে বিলি এখানকার এক সম্পন্ন চাষির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পারিবারিক কর্মে লিপ্ত হন। পরে 1952 সাল থেকে তাঁর মধ্যে এক প্রবল ঐশ্বরীয় প্রভাব লক্ষ করা যায়। তখন থেকেই বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর ধর্মীয় ভাবনা নিয়ে নানা প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। 'মানুষ নিমিত্ত মাত্র, ঈশ্বরই  সবকিছুর নিয়ন্তা' এটাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র। এই মন্ত্র নিয়ে তিনি বাইবেল এবং জেশাস ক্রাইস্টকে পৃথিবীময় প্রচারে মনোনিবেশ করেন। U S A Government তাঁকে ধর্মীয় প্রচারক তথা শান্তিদূত হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রেরণ করে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত ঘটেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তিনি শান্তিদূত হিসেবে হাজির হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী Ruth ছিলেন এক জাপানি খৃষ্টান পরিবারের কন্যা। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাত ঘটেছিল। 2007 সালে তাঁর দেহাবসান ঘটে। তাঁদের পারিবারিক বাসগৃহ থেকে চার মাইল দূরে তাঁর স্থাপিত এই লাইব্রেরিটি শার্লট তথা আমেরিকার এক অন্যতম দ্রষ্টব্য।


      বিশাল জায়গা জুড়ে এই লাইব্রেরিটির বৈশিষ্ট্য হল--শুধু নিছক বইপত্র নয়, বিভিন্ন কক্ষে টি ভি এবং পর্দায় তাঁর সারা জীবনের কীর্তি-কাহিনি নিরন্তর প্রচারিত হয়ে চলেছে। প্রথম দ্রষ্টব্য একটি রোবটের জার্সি গাই, একটি রোবটের বিড়াল, এবং গোয়ালে রাখা পর পর বিশ-পঁচিশটি রোবট জার্সি গাই-বাছুর। প্রাথমিকভাবে দেখে জীবন্ত বলেই ভ্রম হওয়া স্বাভাবিক। তাদের শুধু ঘাড়ে, কান, চোখ এবং লেজটুকুই নড়ে। শরীরের বাকি সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনড়। যেহেতু তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান তাই ওই ডেয়ারি ফার্ম দিয়েই শুরু হয় দেখার পর্ব। এখানে কোনও প্রবেশমূল্য নেই। তবে অনুদানের ব্যাপার আছে। এবং আছে একটি রেস্টোরেন্ট। সেখানের খাবার কিন্তু বিনা পয়সায় মিলবে না।  সেখানকার খাদ্যসামগ্রীর প্রায় সবই তাঁরই কৃষিক্ষেত্রে উৎপন্ন।


        ওখানে মধ্যাহ্নভোজ সেরে চারটের দিকে ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম Up Town-এর কাছাকাছি এক বিশাল পার্কে। নাম Freedom park. সেখানে নানাবিধ খেলাধুলোর মাঠে, শিশুদের মনোরঞ্জনের নানান আনন্দ উপকরণ, অসংখ্য গাছপালা, একটি সুদীর্ঘ লেক--তার দু'পাশ দিয়ে চলাচলের রাস্তা, একটি সুবৃহৎ মুক্তমঞ্চ, দুটি ট্রেল, পিকনিক স্পট ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে। তবে ওই পিকনিক স্পটে রান্না করার অনুমতি নেই। বাইরে থেকে রান্না করা খাবার এনে সবাই ওখানে খাওয়াদাওয়া সেরে সারাদিন হইচই করে, খেলাধুলো করে, আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকে। সবই চলে তবে কোনও হাঁকাহাঁকি, গোলমাল বা নোংরামি নেই। সবাই ক্যামেরায় ছবি তুলছে, খেলছে, জগিং করছে, ট্রেল করছে। আবার কেউ বা চুপচাপ বেঞ্চে বসে আছে, গল্পগুজব করছে।এক সুন্দর শোভন পরিবেশ। আর পুরো পার্কটাই 'No smoking zone.' অজস্র গাড়ি নিয়ে মানুষ আসছে, যাচ্ছে, আনন্দে মেতে আছে। জীবনকে এরা উপভোগ করতে জানে। এতো বিশাল পার্ক কলকাতা কেন সারা ভারতের কোথাও আছে কিনা জানা নেই। এর মধ্যে আছে একটা Nature  Auditorium. যেটা সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। ওই পার্কে বিকেল সাড়ে ছ'টা পর্যন্ত কাটিয়ে আমরা সন্ধের মুখে মুখে Target Mall-এ গেলাম। কিছু কেনাকাটা সেরে  সাড়ে নটায় অ্যাপার্টমেন্টে ফিরলাম।




চলবে...


















শুধু কবিতায়...  আগমনী  বন্দনা বিভাগের  জন্য  আপনিও আপনার  মৌলিক  ও অপ্রকাশিত  দুটি কবিতা  পাঠিয়েদিন। 
ankurishapatrika@gmail.com




বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:(পর্ব-২৭) ।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ — বিশ্বেশ্বর রায়।।Ankurisha ।। E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।




ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:(পর্ব-২৭)



পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

      গয়ংগচ্ছ দিনযাপন চলছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে  প্রাতঃকৃত্য  সেরে রেস্টুরেন্টে   যাওয়া, ব্রেকফাস্ট করা। ফিরে আসতে না আসতে বাবাইয়ের অফিসের তাড়া। ওকে একটু লাঞ্চের খাবারদাবার গুছিয়ে দেওয়া। পৌনে নটা থেকে ন'টার মধ্যে বাবাই চলে যায় অফিসে। তারপর আমাদের কাজকর্ম কিছু থাকে না। নিজেদের জন্য একটু রান্নাবান্না, ব্যস। তারপর দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে ভাতঘুম। বিকেলে বা সন্ধের দিকে হোটেলের চারপাশে একটু ঘোরাঘুরি।এছাড়া সারা দিনরাত টি ভি দেখা, মুনিয়া-জয়দীপের সঙ্গে Skype-এ কথা বলা বা কলকাতার কারও সঙ্গে ফোনালাপ। এরই মধ্যে সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে বাবাই আবার আমাদের নিয়ে কোনোদিন Wal-Mart, কোনোদিন Patel Brothers, কোনোদিন অন্যান্য  Mall-এ যায়। আর যাওয়া মানেই কিছু না কিছু কেনাকাটা। প্রয়োজন ছাড়াই অকারণে কেনাকাটা করতে যে বাবাইয়ের এত আনন্দ তা বলার নয়। গুচ্ছের জামাপ্যান্ট, শীতের নানা পোশাক ভর্তি হয়ে রয়েছে ওয়রড্রোব, স্যুটকেস, ট্রলি ব্যাগে। তারপরও কিনছে এবং সেগুলোর সবই যে ব্যবহার হয় তা নয়। নতুনই পড়ে থাকে ডাঁই হয়ে।

      এখানকার যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই অফুরন্ত সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যের সিংহভাগই প্রাকৃতিক। এখানকার যেকোনো রাস্তার দু'পাশ জুড়ে অজস্র গাছগাছালি। প্রায় ঘন বনের মতো। শুধুমাত্র Down Town বা Up Town-এর আশপাশের কিছু অংশ ছাড়া সারা দেশটাই বনময় বা বাগানময়। সেই গাছগাছালির কোনোটাই প্রায় আমাদের দেশের সমতলে দেখা যায় না। অবশ্য পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা যায়। ঝাউ বা ক্রিসমাস ট্রি আকারের গাছ, ম্যাপল ট্রি এবং সুউচ্চ ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বট-অশ্বত্থ জাতীয় গাছ সর্বত্র। তবে আমাদের দেশের সমতলের গাছপালা --যেমন, বট, অশ্বত্থ, অশোক, বাবলা, শিরিষ, তেঁতুল, নিম, আম, জাম, কাঁঠাল, শাল, সেগুন, শিশু, নারকেল, তাল, খেজুর, চালতা, ডুমুর, অর্জুন, কুল, ভেরেণ্ডা, বেড়াচিতি, বকুল, লিচু, হরিতকি, শ্যাওড়া ইত্যাদি গাছ, এমনকি কলা, পেঁপে, সফেদা, আতা, ড্যাফল, পেয়ারা ইত্যাদি ফলের গাছও চোখে পড়েনি। হয়তো এসব গাছ এখানকার চাষিদের বাগানে, গ্রামের দিকে কোথাও চাষ হয়। কারণ, এসবের বেশিরভাগ ফলমূল বাজারে পাওয়া যায়। মনে হয় না এর সবগুলিই বিদেশ থেকে আমদানিকৃত। তবে গাছগাছালি অফুরন্ত বলে কাঠের সামগ্রীর প্রাচুর্য সর্বত্র চোখে পড়ে। প্রতিটা বাড়ির মেঝে, দেওয়ালের ভিতর দিক কাঠের। আসবাবপত্র বেশিরভাগই কাঠের। লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের আসবাবপত্র প্রায় নেই বললেই চলে। এমন কি অনেক বাড়ির পাঁচিল বা ঘেরাগুলিও স্রেফ গাছ চেরাই করে বড় বড় পেরেক বা গজাল ঠুকে তৈরি। অনেক পার্কে বসার বেঞ্চগুলিও ওভাবে গাছ চিরে দু, ভাগ করে আচাঁছা ডালের পায়ার উপর বসানো। অতি সাধারণ ও সহজভাবে তৈরি। কিন্তু তার মধ্যেও কী সৌন্দর্যবোধ, শিল্পভাবনা।
      রাস্তার বা ফুটপাতের পাশের গাছের অবাঞ্ছিত ডালপালা, পার্কের মধ্যে গাছের ঝুলে পড়া  ডালপালা কী সুন্দরভাবে যান্ত্রিক করাত দিয়ে এমন নিখুঁতভাবে কাটা হয় যে তার মধ্যেও সৌন্দর্যবোধ ধরা পড়ে। কুড়ুল বা দা দিয়ে এবড়োখেবড়োভাবে কাটা নয়। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস, পার্ক, রাস্তা বা ফুটপাতের পাশের বাগানগুলির পাতাবাহার জাতীয় গাছগুলির ছোটবড় ডালপালা নির্দিষ্ট সময় অন্তর নিখুঁতভাবে ছাঁটা হয়। একটা ডগা বা পাতাও যেন ছোটবড় না থাকে। আর গাছগাছালির ছাঁটা ডালের টুকরো আর পাতাগুলি ছোট্ট কুচিকুচি করে সব গাছের গোড়ায় বিছিয়ে দেওয়া হয়। যা পরবর্তীকালে গাছগুলির সারে পরিণত হয়।


চলবে...







আরও পড়ুন 👇👇

*প্রেমের কবিতা পর্ব-৫৪* 
 *আজকের কবি* 
 *দেবাশিস চক্রবর্ত্তী* 
🌹🌹🌹🌹🌹🌹

https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/09/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_21.html

বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-২৬)।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 



ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-২৬)


পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

Marriott-এ প্রতিদিন সকালের খাবার (প্রাতরাশ )দেয় বিনা পয়সায়। খাবারের রকমারিত্ব এবং মান খুবই ভালো। ব্যুফে সিস্টেমে খাওয়া। যার যা ইচ্ছা, যতখুশি ইচ্ছা। তবে প্রতিদিন স্ক্রাম্বেল এগ, পোটাটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কেক, আপেল জুস, অরেঞ্জ জুস, দুধ, চিজ, নানা ধরনের মিশ্রিত কাটা ফল, গোটা কলা, আপেল, চা, কফি, পোর্ক, বিফ, কার্ড, চকোলেট ছাড়াও নানা ধরনের স্যান্ডুইচ এবং বার্গারও থাকে। আর তিনদিন ফ্রি ডিনার দেয়। ডিনারে এক এক দিন এক এক রকম আইটেম থাকে। প্রতি সপ্তাহে আইটেমগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেয়।এটা হল ওখানকার হোটেল বা রিসর্টের সাধারণ রীতি।

      শনি-রবি ছাড়াও এ সপ্তাহে সোমবারও বাবাইয়ের ছুটি আছে। অবশ্য ঠিক কর্মহীন ছুটি নয়। ওদের Bank of America-য় ছুটি। ওদের work from home  করতে হবে। 6ই সেপ্টম্বর আমেরিকায় 'কলম্বাস ডে' পালিত হয়। ওইদিন কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন বা আমেরিকার মাটিতে পা রাখেন সাড়ে চারশো বছর আগে।
      আজ 'প্যাটেল ব্রাদার্সে' গিয়েছিলাম। শার্লটেও প্যাটেল ব্রাদার্সের আউটলেট আছে। তবে সেটা একটু দূরে। তাই আমরা পাশের সিটি পিনেভেল-এ (Pineville) গেলাম। আমেরিকায় যতগুলি ইন্ডিয়ান গ্রসারি আছে তারমধ্যে প্যাটেল ব্রাদার্সই সবচেয়ে বড় চেইন। ওদের মারফতেই আমেরিকার বিভিন্ন শহরে গ্রসারি খুলেছে ভারতীয়রা। এছাড়াও হার্টফোর্ডে দেখেছি Cosmos নামে Indian Grossary. এইসব দোকানগুলোতে ভারতীয় যাবতীয় জিনিস পাওয়া যায়। চাল, ডাল, আটা, ময়দা থেকে শুরু করে সমস্ত প্রকার সবজি, চানাচুর, ঝুরিভাজা, সিঙাড়া জাতীয় নোনতা ভাজাভুজি, মশলাপাতি, মাছ-মাংস প্রায় সবই পাওয়া যায়। তবে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার-দাবারের প্রাধান্যই বেশি। এখানকার বড় বড় দোকান বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্স যেমন--ওয়ালমার্ট, ওয়ালগ্রিন, ডলার ট্রি, ফ্যামিলি ডলার, সেভ আ লট ইত্যাদি নানা ধরনের বিশাল বিশাল বিক্রয় কেন্দ্রে সূঁচ থেকে গাড়ি পর্যন্ত যাবতীয় জিনিস পাওয়া যায়। তবে ভারতীয় মশলাপাতি, চাল, বিশেষত মসুর ডাল এবং সর্বোপরি পোনা, পারশে, ভেটকি, পাবদা, ট্যাংরা, পুঁটি, পাঁকাল, কই, শোল, ল্যাটা, মৌরলা জাতীয় মাছ প্রায় দেখাই যায় না। ওসব দোকানগুলোতে মাছ বলতে পাওয়া যায় সলমন, পোলক, টুনা আর অঢেল চিংড়ি এবং তিলাপিয়া। কিছু অন্যবিধ সামুদ্রিক মাছও পাওয়া যায়। আর পাওয়া যায় হিলসা বা ভালো সাইজের ইলিশ। বেশিরভাগ মাছই কাঁটা ছাড়া ফিলে করা। তবে আশপাশে ভারতীয় দোকান না পাওয়া গেলে চিংড়ি, তিলাপিয়া আর মাটন-চিকেন দিয়েই দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যায়। ভেড়ার মাংসও পাওয়া যায়। আর পাওয়া যায় টার্কির মাংস। তবে গরু এবং শুয়োরের মাংস অঢেল পাওয়া যায়। কিন্তু সবই ফ্রোজেন। তবে প্রত্যেকটি খাদ্যের মোড়কে খাদ্যগুণ, কতদিন খাওয়া যেতে পারে, ক্যালরি থেকে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, প্রোটিন, ফ্যাট ইত্যাদি সমস্তকিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লেখা থাকে। কোন্ জিনিস মানুষ খাবে তা দেখেশুনে খাবে, বিচার করে খাবে। তার জন্য প্রস্তুতকারক সংস্থার কোনও দায় থাকবে না। এখানকার খাদ্য-আইন খুব কড়া। কোনও উপভোক্তা যদি কেস ঠুকে দেয় তো এখানকার খাদ্যসামগ্রী বা যেকোনো দ্রব্য প্রস্তুতকারক সংস্থা সেই কেসে যদি হেরে যায় বা তাদের তরফে কোনও গাফিলতি ধরা পড়ে তবে বড়সড় জরিমানা তো হবেই এমন কি তাদের লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। আমাদের দেশেও নানা আইন আছে বটে তবে তার প্রয়োগ প্রায় নেই বলে অসাধু ব্যবসায়ী এবং প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি আইনের তোয়াক্কা করে না।
      শুধু তাই নয়, এখানকার প্রস্তুত যেকোনো সামগ্রীর মান
এমন উচ্চতায় বাঁধা যে, তার দাম বেশ চড়া হতে বাধ্য। তাই চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার ইত্যাদি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কমদামি সামগ্রীতে মলগুলো এবং বড়ো  বড়ো দোকানগুলো ঠাসা। তার অর্থ এই নয় যে সেখানে দ্রব্যের গুণমানে কোনও আপোস করা হয়েছে। আসলে আমেরিকায় শ্রমিকের মূল্য এতো বেশি যে, দ্রব্যমূল্য বাড়তে বাধ্য। পক্ষান্তরে এশিয়ার ওসব দেশে শ্রমিকের মূল্য আমেরিকার সিকি ভাগও না। ফলে দ্রব্যমূল্য অনেক কম। কিন্তু ওষুধ এবং কসমেটিক্স-এর ক্ষেত্রে কোনও আপোস করে না। তাই এই দ্রব্যগুলির সিংহভাগ আমেরিকায় তৈরি এবং দামও অনেক বেশি।


চলবে...

বুধবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব-২৫) ।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।।E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 






ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব-২৫)



পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়


বাবাই সকাল সাড়ে আটটার দিকে অফিসে বেরিয়ে যায়। ফিরতে ফিরতে প্রায় আটটা সাড়ে আটটা। ফলে ডিনারে তো বটেই, ব্রেকফাস্টেও ওর যাওয়া হয়ে ওঠে না। আবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেও নিস্তার নেই।  শুরু হয়ে যায় call. চলে এক-দেড় ঘন্টা।
      সারাদিন শুয়-বসে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ডিনারে গেলাম। এখানে ডিনারের সময় বিকেল ছটা থেকে সন্ধে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবে আমাদের, ভারতীয়দের এটা নৈশাহারের সময় নয়। দেখলাম অনেকেই রেস্টোরেন্টে না খেয়ে খাবার নিয়ে ঘরে যাচ্ছে এবং তারা সবাই প্রায় ভারতীয়। যদ্দৃষ্টং তৎ শিখিতম। আমারাও খাবার  নিয়ে ঘরে এলাম। তারপর খাবারগুলো ঘরে রেখে আমারা দু'জনে ঘন্টাখানেক আশপাশে সান্ধ্যভ্রমণ সারলাম। যায় পরবর্তী মাসাধিককাল


আমাদের নৈমিত্তিক রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাবাই ফোন করে জানালো ওর ফিরতে দেরি হবে। একেবারে ডিনার করে একটা call সেরে ফিরবে।

      আজ 2রা অক্টোবর। মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন। অবশ্য এখানে তার আভাস পাইনি। স্বাভাবিক। অবশ্য জানি না এখানে সরকারিভাবে কোনও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয় কিনা। বারাক ওবামা তো শুনেছি গান্ধীজীর একজন বড় ভক্ত।
      বাবাই ফিরলো প্রায় দশটায়। ওর খাওয়ার পাট ছিল না। তবে call-এর পাট ছিল। চললো প্রায় বারোটা পর্যন্ত। ইতিমধ্যে আমরা খাওয়ার পাট চুকিয়ে ফেলেছি। এখানে রাত্রি বড় তাড়াতাড়ি গভীর হয়।
      Residence Inn Marriott থেকে একটা বই দিয়েছে। আসলে সব অ্যাপার্টমেন্টেই বইটা রাখা থাকে 'Where guest book, Charlotte.' বইটার পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিলাম শার্লটে কী কী দ্রষ্টব্য আছে। কয়েকটা spot দেখলাম। তবে বেশিরভাগ দ্রষ্টব্যগুলি হল Art Gallery, Museum, Mall ইত্যাদি।
      টিভির সংবাদে জানাচ্ছে এখানে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা। তিন-চার দিন ধরে আকাশ জুড়ে কখনও কালো মেঘ, কখনও ছাড়া ছাড়া ঝড়ের মেঘ জমে আছে। সূর্যের মুখ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মিহি ধুলোর মতো বৃষ্টি পড়ছে। এতো মিহি যে রাস্তায় বেরোলেও প্রথম দিকে বৃষ্টির অস্তিত্ব অনুভব করাও যায় না। তবে একটু পরে মাথার চুল ভিজে ভিজে ভারী হয়ে ওঠে। রাস্তাঘাটও ভিজে ভিজে হয়ে ওঠে।  আমাদের দেশে ঘন কুয়াশা হলে যেমন রাস্তাঘাটের অবস্থা হয়। রাস্তায় জল জমে না বা গড়ায় না। টিনের চালের কানাত বেয়ে দু'এক ফোঁটা গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে, তেমনই।
      ওই সামান্য বৃষ্টিতেই আমার মাথায় জল বসে ঠাণ্ডা লেগে গেল। আসলে ঠাণ্ডাটা আমার লেগেছে বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই। হার্টফোর্ডে থাকতে থাকতেই। অল্প অল্প ঘুষঘুষে জ্বর, সঙ্গে কাশি। আর আগেই বলেছি এখানে আসার দিন ফ্লাইটে কানে ভীষণ ব্যথা করছিল, এখন বুঝতে পারছি তার কারণও ওই ঠাণ্ডা লাগা। আসলে বুকে, গলায়, নাকে, কপালে ভয়ানক সর্দি জমে গেছে এবং তার থেকে Infection হয়ে গেছে। প্রথমে কান দিয়ে জলের মতো রস বেরোচ্ছিল, পরে তার সঙ্গে হালকা হালকা রক্ত। Ear bud দিয়ে কান পরিস্কার করতে গিয়ে ব্যাপারটা মালুম হল। এছাড়াও কফের রংও প্রথমে ঘন হলুদের পর লালচে হয়ে উঠলো। এত দুর্বল লাগছিল যে কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না। শুয়ে থাকলে ঘুমতো আসছে না। ভীষণ অস্বস্তি আর কাশির দমকে ঘুমটুম ছুটে যাচ্ছে। ডাক্তার দেখাতে পারলে ভালো  হতো। তবে এখানে কোথায় ডাক্তার, কোথায় হাসপাতাল কিছুই জানি না। আর বাবাইয়েরও আগামী শুক্রবার পর্যন্ত ফুরসত নেই। সকাল আটটা থেকে রাত্রি আটটা-নটা পর্যন্ত অফিসেই কাটছে। অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেও call চলছে মাঝরাত পর্যন্ত। ফলে কানের ইনফেকশন সারাতে একটা নিওসপোরিন জেল কিনতে হলো। দু,দিন লাগাবার পর দেখছি রক্ত বন্ধ হয়েছে। কফের রংও আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। দুর্বলতাও বহুলাংশে কেটে গেছে। বুক, গলায়, নাকে,কপালে যে লালচে ভাবে ছিল  তাও প্রায় মিলিয়ে যাবার অবস্থায়। অর্থাৎ বুঝতে পারছি ইনফেকশন তার থাবার শক্তি হারিয়ে ফেলছ।
   
      দুপুর একটা থেকে তিনটে পর্যন্ত বাবাইয়ের নতুন প্রজেক্টে প্রেজেন্টেশান ছিল। এর জন্য প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ও notes তৈরি করেছে। India এবং U S A-এর অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে কনফারেন্স করে প্রেজেন্টেশানাকে রপ্ত করেছে, ঝালিয়ে নিয়েছে। আজ এই প্রেজেন্টেশানের জন্য ও অফিস যায়নি। বাড়ি থেকে Net Conference-এর মাধ্যমে ওর বক্তব্য রেখেছে। ইংরেজিটা ও বরাবরই ভালো বলে এবং সাবলীলতাও খুবই ভালো। ফলে প্রায় দু'ঘণ্টার ওপর ও একটানা ওর বক্তব্য বলে গেল। তারপর প্রায় সাড়ে তিনটের দিকে presentation শেষ করে তবে স্নান-খাওয়া করলো। আমরাও তখনই খেলাম। কারণ, প্রেজেন্টেশান বা call-এর সময় সামান্য শব্দেও ওর অসুবিধা হয়। ফলে আমরা নিশ্চুপে কাটালাম দু'ঘন্টার ওপর।