লেবেল

বুধবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৭) । পৃথিবীর উল্টো পিঠ- বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 





ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৭)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

দূরের রাস্তা। একটানা তিন/সাড়ে তিন ঘন্টা গাড়ি চালাতে হবে। তাছাড়া নতুন জায়গায় যাচ্ছি, সন্ধের  আগে পৌঁছানো ভাল। তবে এদেশে এমন সুষ্ঠভাবে রাস্তার নাম এবং বাড়ির নম্বর দৃশ্যমান হয় যে ভুল হবার জো নেই। তার উপর আছে GP S, সে ঠিক উদ্দিষ্ট বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেবে। যাইহোক, দেরি যাতে দীর্ঘতর না হয় সেইজন্য বাবাই এখানে রাস্তার পাশে পাশে যে গতি নির্দেশিত থাকে তার থেকে অনেক বেশি জোরে চালাতে শুরু করল। ফলে যা ঘটার তাই ঘটল। পুলিশের গাড়ি আমাদের পিছনে এসে থামতে বলল। এবং নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি জোরে গাড়ি চালানোর অপরাধে টিকিট ধরিয়ে দিলেন ।  অবশ্য তার আগে খুব ভদ্রভাবে জিজ্ঞাসা করলেন 'স্যার, আপনার কি খুব তাড়া আছে?' সব শুনে এবং এদেশে নতুন বলে সর্বনিম্ন একাশি ডলার ফাইন। পনেরো দিনের মধ্যে টাকাটা জমা দিতে হবে। স্বভাবতই মনটা একটু বিগড়ে গেল।
     তবে check in করে ঘরে ঢুকে ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই মনটা ভরে উঠল আনন্দে। ফাইনের দুঃখ বেমালুম ভুলে গেলাম সকলেই। আমাদের ঘরটা booking ছিল ocean view, দোতলায়। ব্যালকনিতে বেরিয়েই দেখা গেল প্রায় হাত বাড়ানো দূরত্বেই অ্যাটলান্টিক মহাসমুদ্র আমাদের সঙ্গে সখ্যতা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে পায়ের নিচে, কূলে। আদিগন্ত বিস্তৃত সুনীল জলরাশি। কী তার কলহাস্য, কী তার উচ্ছ্বলতা!
     হোটেলের নাম Holiday Sands North. বারোতলা হোটেলটিতে parking, spa, swiming pool ইত্যাদি অত্যাধুনিক সমস্ত ব্যবস্থা বিদ্যমান। আর ঘরের মধ্যেও সব ব্যবস্থাই মজুত। বাথটাব, ঠাণ্ডা-গরম জল, রান্নার প্রায় যাবতীয় সরঞ্জাম--চার বার্নারের ইলেকট্রিক হিটার, মাইক্রোওয়েভ, ফ্রিজ, হিটার, টিভি, ড্রেসিংটেবিল, ডাইনিং টেবিল, বেডসাইড টেবিল, টেলিফোন, ভল্ট ইত্যাদি। অবশ্য এদেশের সব হোটেলেই প্রায় অল্পবিস্তর এসবই থাকে। আমাদের দেশের মতো দু'শো টাকার থেকে দশ হাজার হোটেল, এমন বিশাল ফারাক প্রায় নেই বললেই চলে। অন্তত আমরা যেখানে যেখানে গেছি সেখানে তো দেখিনি।
     যাইহোক, এখানে এসে এদেশের অদ্যাবধি সবচেয়ে বেশি আনন্দ উপভোগ করা গেল। ষাট মাইল লম্বা বীচ জুড়ে হোটেল, মোটেল, রেস্টোরেন্ট, নানান ধরনের আনন্দ উপকরণ, মেলা, গান-বাজনা, থিয়েটার, ম্যাজিক ইত্যাদির ছড়াছড়ি। আর Up Town-এর মূল আকর্ষণের জায়গাটায় আছে সমুদ্রের তীর বরাবর Broad walk-এর রাস্তা। এই রাস্তাটার দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় মাইল। আট-ন ফুট চওড়া, দু'পাশে চার ফুট উচ্চতার রেলিং দেওয়া মোটা কাঠের পাটাতনের উপর রাস্তা। সেখানে কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ স্কেট করছে বা নিছক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়াও আছে কাঠের রাস্তার পাশ দিয়ে কংক্রিটের আর একটা রাস্তা। এবং আরও একটু সমুদ্রের কাছ বরাবর মাটির আরও একটা রাস্তা। সেখান দিয়ে পুলিশের গাড়ি টহল দেয়।
     এখানে একটা মজার ব্যাপার চোখে পড়ল। সমুদ্রে হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে বা কাঠের সেতুর উপর দাঁড়িয়ে মাছ ধরা, হুইল-এ। এবং আমাদের চোখের সামনেই বেশ কয়েকবার ছিপে মাছ ধরতে দেখলাম। তবে এই ষাট মাইল তীরভূমি যেহেতু মানুষের ভ্রমণের জায়গা তাই এখানে কোনও ট্রলার বা জেলেনৌকা আসে না মাছ ধরে। ফলে সৈকত সুন্দর, পরিস্কার, দুর্গন্ধহীন। এখানকার মজা বা আমোদের উপকরণের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল Sky wheel, Bungee Jumping, Trolling ইত্যাদি। এসব শিহরণ জাগানো খেলার উৎসাহীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কাল গিয়েছিলাম সৈকত ছেড়ে একটু ভিতরের দিকে একটা মেলায়। নাম  Celebrity Centre. একটা দীর্ঘ লেক ঘিরে হাজার একটা আনন্দ-উপকরণ। একটা উল্টো বাড়ি তার অন্যতম। নাম Wonder Works. আসলে জায়গাটা একটা স্থায়ী মেলা প্রাঙ্গণ। সমগ্র প্রাঙ্গণটা ঘুরে কোথাও একটু ময়লা বা নোংরা চোখে পড়ল না। হাজার হাজার মানুষ ঘুরছে, খাচ্ছে,  হৈহল্লা করছে তবু প্রাঙ্গণে ধুলোময়লা, কাগজ, পলিথিন,  চায়ের কাপ বা ঠোঙা জাতীয় কিছু নজরে পড়ল না। প্রাঙ্গণটা নানা ধরনের সিমেন্টের কারুকার্য করা ইট বা স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো। মনে হয় তার উপরে বসে পড়লেও প্যান্ট-জামায় একটুও ময়লা লাগবে না। এতটাই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন।

     তিন দিনের আনন্দ-ভ্রমণ সেরে রবিবার দুপুর  দু'টোর সময় শার্লটে ফিরলাম। তিনদিনে মনে হল বাবাই বেশ অক্সিজেন পেয়েছে। অনেক তরতাজা এখন। নতুন কেনা DSRL ক্যামেরায় প্রায় পাঁচ-ছশো ফটো তুলেছে।

     আর দুটো রাত্রি শার্লটে থাকার মেয়াদ। তারপর হার্টফোর্ডে চার রাত্রি কাটিয়ে পাড়ি দেওয়া নিজভূমে। ফলে গোছগাছ শুরু করতে হল। অবশ্য শুরু করা বা শেষ করার বিশেষ কিছু নেই। তবে আসার সময় যেমন ভেবেছিলাম যে, ফেরার সময় লাগেজগুলো অনেক হালকা হবে, তা মোটেও হল না। বরং বেড়ে গেল অনেক। টুক্ টুক্ করে অনেককিছুই কেনাকাটা হয়েছে। এছাড়া অনামিকা, তপস্যা, বড়দি-মেজদি সবার জন্য কিছু কিছু নিতে হয়েছে। ফলে 'তিল কুড়িয়ে তাল' হয়েছে।
      মনটা ভারাক্রান্ত আমাদের দু'জনেরই। তার প্রধান কারণ, বাবাইয়ের এই প্রজেক্টটায় যা কাজের চাপ তা সামলে ও শরীর ঠিক রাখবে  

কিভাবে! আমরা এখানে থাকতেই, ওর খাওয়া-দাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দেওয়া সত্ত্বেও ও খাওয়ার সময়টুকুও পায় না, আমরা চলে যাওয়ার পর তো দিশেহারা হয়ে যাবে! বেচারার শরীর এই দু'মাসেই একেবারে কাহিল হয়ে গেছে। সময়ে খাওয়া নেই, ঘুম নেই, ঠিকমত বিশ্রামটুকুও নেই ---এক বিশ্রী অবস্থা। প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই অফিসের কাজ আর কাজ। নিজের জন্য একটু সময় যদি না পায় মন-মেজাজ ঠিক থাকবে কিভাবে! কিন্তু 'নান্য পন্থা'। ফিরতে আমাদের হবেই।


চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন