লেবেল

অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৪ জুন, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প —১৪।। বাবার স্বপ্ন — দীপক বেরা ।Ankurisha।। E. Magazine।। Bengali poem in literature।।

 





প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প —১৪



বাবার স্বপ্ন 
দীপক বেরা 

সকাল হতে না হতেই রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনাতে মনোযোগ দেয়। মা-মরা ছেলে। ছেলের ভালোর জন্য কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়। ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়। 
রঞ্জন ভাবে, চায়ের দোকানে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর বাবার নিশ্চয়ই ক্লান্তি হয়, তাই ফোন করতে পারে না। এই ভেবে সে নিজেকে আশ্বস্ত করে। পরের দিন বাবার ফোন এলে রঞ্জন আবার সবকিছু ভুলে যায়। 
এভাবেই বাবা-ছেলের মান-অভিমান আর ভালোবাসার ফোনালাপে কোথা দিয়ে যে কেটে গিয়েছে চার চারটে বছর, রঞ্জন টেরই পায় নি। আজ তার খুব খুশির দিন, বি. টেক ফাইনাল ইয়ার এর রেজাল্ট বেরিয়েছে। সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। বাবার স্বপ্নপূরণ হয়েছে। নিজের মুখে বাবাকে খবরটা দিয়ে সে সারপ্রাইজ দিতে চায়।
কোলকাতায় ফিরে বাড়ির দরজায় পা দিতে না দিতেই রঞ্জন দেখে বাড়িতে প্রতিবেশিদের ভিড়। তাদের মুখে শোনে— বাবা স্নায়ু রোগগ্রস্ত, আর কোনওদিনই হাঁটতে পারবে না! মুহূর্তেই রঞ্জনের মুখটা রক্তশূন্য ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বাবা ও ছেলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হাউ-হাউ করে কাঁদতে থাকে।
রঞ্জন এখন নিজেই বাবার চায়ের দোকান চালায়। পাশের বাড়ির রিঙ্কুর মায়ের গলা ভেসে আসে, "আজ অঙ্ক পরীক্ষা, দেখিস বাবা, একটাও যেন ভুল না হয়।"... খদ্দের কে চা দিতে দিতে রঞ্জন দীর্ঘশ্বাস ফেলে! রেডিও এফ. এম. থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেসে আসে— "আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে..."


শনিবার, ৩ জুন, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প —১৩ ।। আলোমুখ — দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 






প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প —১৩




আলোমুখ

 দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়


সকাল হতে না হতেই রোজ বাবা ছেলে অরণ্যকে ফোন করে।মা মারা যাওয়ার পর বাবাই ওর সব। বাবা ও ছেলে  একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে আছে  এভাবেই অদ্ভুত এক ভালোবাসার রসায়ণে।  ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাবা কলকাতার বাইরে এক কলেজে ভর্তি করে ছেলেকে। দুজনেরই বুকের পাঁজরে মনখারাপের বাদল সবসময় যেন।ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনায় মন দেয়।
মাঝে মাঝে বাবা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অরণ্যকে ফোন করতে ভুলে গেলে ওর মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট হয় খুব। বাবার একাকীত্বের কষ্টটা বোঝে অরণ্য। বাবাকে মায়ের ফোটোর সামনে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে দেখেছে ও অনেকদিন। মায়ের মুখটা মনে পড়লেই ওরও বুকের ভেতর কান্নার স্রোত বয়ে চলে। তবুও বাবাকে সামলাতে ও কঠিন হয় ঐ সময়। কান্নাকে গিলে গিলে খেয়ে নেয় ও তখন।
 আজ সকাল থেকেই মনটা একটু অন্যরকম হয়ে আছে অরণ্যর। আজ মাকে বড়ো মনে পড়ছে ওর। কান্নায় বিদীর্ণ ওর বুক। মা বেঁচে থাকলে এইদিন বাড়িতে এক আনন্দভৈরবী চলতো সকাল থেকেই।পায়েস, মাংস -- কতো পদ রান্না করতো মা।আমুদে বাবারও মুখে থাকতো হাসি হাসি রাশি রাশি। কিন্তু এখন সবই বদলে যাওয়া সময়!বাবাও অফিসের ব্যস্ততায় দুদিন ফোন করবে না জানিয়েছে। টেবিলে রাখা মানি প্ল্যান্টটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে অরণ্য। মায়ের স্মৃতি এই গাছটার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে।মা বলতো, বড়ো হয়ে গাছের মতো আশ্রয় হয়ে উঠবি সকলের। মায়ের কথার মানে বুঝতো না তখন। এখন বোঝে আর মনে মনে তৈরি হয় ও মায়ের ইচ্ছাকে মর্যাদা দেবে বলে।
 হঠাৎ ওর হোস্টেলের ঘরের বেল বেজে উঠলো। এখন কে এলো আবার? এতো সকালে তো হোস্টেলের কোন বন্ধু ওঠে না !
 দরজা খুলেই চমক ! বাবা দাঁড়িয়ে। হাতে ধরা একটা মাউথ অর্গান সকালের আলো পড়ে চকচক করছে। অনেক দিন আগে ওর মাউথ অর্গান বাজানোর শখের কথা বাবাকে জানিয়ে ছিল অরণ্য। আনন্দে জড়িয়ে ধরলো বাবাকে।অরণ্যকে জড়িয়ে ধরে বাবা বলে উঠলো " হ্যাপি বার্থডে মাই সন।"
  বাবা ও ছেলের কান্নাভেজা আনন্দ মূহুর্তের সাক্ষী হয়ে থাকলো সকালের নরম রোদ।

শুক্রবার, ২ জুন, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প—১২।। উৎসর্গ — রঞ্জন ভট্টাচার্য।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প—১২



উৎসর্গ 
 রঞ্জন ভট্টাচার্য


অকালে মা মারা যাওয়ায় বাবা পরিতোষ বাবু ছেলেকে কলকাতার বাইরে একটি বোর্ডিং এ  রেখে মানুষ করার জন্য সেখানে ভর্তি করাল। তা সত্ত্বেও রুটিন মাফিক বাবা ছেলে রঞ্জুকে ফোন করে তার ভালো মন্দ খোঁজ নিতেন ।সেইসাথে পড়া শুনার ও দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে বলতেন ।
কিন্তু মাঝেমধ্যে  নিজের বন্ধুদের সাথে গল্প গুজবে এমনভাবে লিপ্ত হয়ে পড়তেন যে নিজের ছেলে কি করছে তা বেমালুম ভুলে যেতেন। 

ওদিকে বাবার ফোন না পেয়ে রঞ্জুর খুব মন খারাপ করত। অকালে মা হারানোর যে ব্যথা বেদনা ও সহ্য করতে পারত না তাই বিমর্ষ হয়ে ঘরের এক কোণে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠতো আর ভাবতো "যার মা নেই তার পৃথিবীতে কেউ নেই, সে যেন নিঃসঙ্গ  একজন যা কোন এক অজানা অপরাধের ভাগ তাকে চিরদিন বয়ে নিয়ে যেতে হবে ।"

 এমনি করেই ভাবতে ভাবতে কখনো সারাদিন চলে যেতো ওর অজান্তে । খাওয়া দাওয়া কখন যে ভুলে যেত, পড়াশোনা ও তথৈবচ  কিন্তু বাবার ফোন পেলেই তার মনটা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে যেত যেন পৃথিবীতে হারাবার কিছু নেই মা হারালেও তার তো বাবা আছে। 

সে ভাবতো অনেকেই তো অনাথ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে নিঃসঙ্গ এক পথিকের মত কিন্তু তার বাবা আছে তাই জীবনে ভেঙে পড়লে চলবে না তাকে পড়াশোনা শেষ করে বাবার পাশেই দাঁড়াতে হবে আর সেই ভাবনা বশত কিছুদিনের মধ্যেই সে যেন এক নিঃসঙ্গ মানসিকতার কঠোর বাস্তব  থেকে বেরিয়ে এসে সমাজ জীবনে সচেতন যুবক হয়ে ঘুরে দাঁড়ালো এবং নিজের জীবনকে এক উন্নত থেকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে এসে বাবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মা বাপ হারা অনাথ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতেও পিছপা হলো না ।

ছেলের এহেন আচরণ দেখে বাবা নিজেকে গর্বিত মনে করল সেই সঙ্গে ছেলেকে আশীর্বাদ করলো যেন এভাবেই সে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ১ জুন, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প —১১ ।। পীড়া — স্মৃতি শেখর মিত্র।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 




প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প —১১



পীড়া

স্মৃতি শেখর মিত্র 


রোহিতের বয়স যখন এগার বছর তখন ওর মামারা যান সামান্য জ্বরে। রোহিত তার মাকে খুব ভালবাসত।মা অন্ত প্রাণ।তারা কলকাতার যাদবপুর অঞ্চলে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতো।ওর বাবাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনেকেই উঠেপড়ে লেগেছিল। কিন্তু ছেলের কথা ভেবে তিনি সমস্ত প্রস্তাবগুলি নাকচ করে দেন। বাড়িতে রোহিত ও তার বাবা থাকেন। একজন কাজের মাসী এসে ঘর দুয়ার পরিচ্ছন্ন এবং দু বেলার খাবার বানিয়ে দিয়ে যায়। রোহিতকে প্রায়ই
উন্মনা দেখে তার বাবা বুঝতে পারেন রোহিত সদাসর্বদা ওর মায়ের কথাই ভাবে। তাই তিনি মনস্থির করেন কলকাতার বাইরে কোন ভালো
স্কুলে ভর্তি করে দেবেন যেখানে ছাত্রাবাস আছে। স্কুল হোস্টেলে অনেক সঙ্গী সাথী পেলে ধীরে ধীরে সে পড়াশোনায় মন বসাতে পারবে।
এইভাবেই একদিন পরিতোষবাবু তাঁর একমাত্র সন্তানকে কলকাতার বাইরে একটি নামী স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। এবং তিনি প্রতিদিন সকাল বেলা ছেলেকে তার ও স্কুলের ব্যাপারে সব খবর নেন। বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে রোহিতের খুব ভালো লাগে। প্রতিদিন বাবার ফোনের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। মায়ের অবর্তমানে বাবাই একমাত্র তার কথা ভাবেন।
সেও বাবার পরামর্শ মতো মন দিয়ে পড়াশুনা করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাবার একাকীত্বের সুযোগ নিয়ে বাবার বন্ধুরা বাবাকে গল্প গুজবে ফাঁসিয়ে রাখেন এবং সেদিন হয়তো তিনি তাঁর ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যান। বাবার ফোনে না পেয়ে রোহিত মুষড়ে পড়ে। ভীষণ কষ্ট হয়।ভাবে মা তো চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন।বাবাও যদি এভাবে তাকে ভুলে যান তবে তার কী হবে? এ ব্যাপারটা তাকে খুব পীড়া দেয়।সে অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে খুব কষ্ট পায়।

বুধবার, ৩১ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প -১০।। টান —সুস্মেলী দত্ত।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 





প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প -১০ 



টান

সুস্মেলী দত্ত


-বাবলু বাবলু...

-কে কে ওখানে? ও বাবা, তুমি! ওখানে কেন,?কাছে এসো|বাবা.. কোথায় তূমি?

       স্বপ্নটা তাহলে সত্যি নয়, একথা ভাবতেই বুকটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল|

বাবলু নামটা অনেকদিন পরে ও  আজ বাবার মুখে শুনলো|এমনিতে রাশভারি বাবা ওকে অরূপম বলেই ডাকেন|

বাবা এই শব্দটা মনে করলেই মনের মধ্যে কত না স্মৃতি ভিড় করে আসে|

মাকে মোটামুটি অসুস্থ দেখে দেখেই ওর বড় হয়ে ওঠা|তারপর হঠাৎ একদিন কর্কট রোগের থাবা আরও চওড়া হতে শুরু করলো |গলা থেকে ফুসফুস অব্দি পৌঁছে গেল যখন তখন শরীর আর যুঝতে পারলো না|

     এই তো সেদিনের কথা|মাধ্যমিক পাশ করতে না করতেই বাবার শখে বাবলুর সাময়িক ঠিকানা হোলো দার্জিলিং কনভেন্ট|না এখানে যে কয়েকদিন ও এসেছে সেভাবে অভিযোগ জানাবার মতো কিছু নেই|বাবাও রোজ সকালে ওর নিয়মিত খোঁজ খবর নেন|তাহলে, কিসের অসুবিধে বাবলুর?

      এর উত্তর বাবলুর যেমন জানা নেই, তেমনি ওর বাবারও|বন্ধুদের কাছে বাবলুর কনভেন্টে পড়াটা একটা স্ট্যাটাস সিম্বল|ওকে তো একদিন এই বিশাল দুনিয়ার মধ্যে অন্তত একটা জায়গা করে নিতে হবে|ওর ভবিষ্যৎ ভেবেই...

নিজের মনকে নিজেই প্রবোধ দেন সফল কম্পিউটার  ইঞ্জিনিয়ার অনির্বান চক্রবর্তী|

বাবলুকে আজ সকাল থেকে ফোন করা হয়নি|কে জানে কেমন আছে ছেলেটা? আসলে গতকাল রাতে অনেক দেরিতে বাড়ি ফিরেছে অনির্বান|শত অনুরোধ করা সত্ত্বেও অনির্বান রিয়ার সঙ্গে বেড শেয়ার করেনি|আজকাল রিয়ার মা কি একটু বেশিই প্রশ্রয় দিচ্ছেন রিয়ার অফিসের বস অনির্বানকে|কেন? উনি কি ভাবছেন ডিভোর্সি মেয়ের সঙ্গে এতো মেলামেশা করলে অনির্বান তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হবে!

-মাই ফুট, মুখ থেকে স্ল্যাং টা অবশেষে বেরিয়েই গেল|

নাহ যতই রিয়াকে ওর ভালো লাগুক না কেন মৃত স্ত্রী উর্মির জায়গায়  কিছুতেই ওকে বসাতে পারবে না অনির্বান|

আর তাছাড়া বাবলুই বা কি ভাৱবে? বাবা নষ্টামি করবে বলেই কি ওকে হোস্টেলে...ছিঃ

ফোনের শব্দে ভাবনার রেশ টা কেটে গেল|

বাবলু ফোন করছে|

নিশ্চয় বলবে বাবিন, সারা সকাল আজ তূমি ফোন করলে না, তাই রাতে করলাম|শরীর ঠিক আছে তো?

অনির্বান মনে মনে বললো, সব ঠিক আছে বাবলু, শুধু মনটাই তোর জন্য রাতদিন হু হু করে|তুই ফিরে আয়...ফিরে আয় অরূপম|

ফোনটা আবার বাজার আগে অনির্বান নিজে ডায়াল করলো|

নাহ আর যে তর সইছে না|



-

মঙ্গলবার, ৩০ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প —৯ ।। মা — পাপড়ি ভট্টাচার্য।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 




প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প —৯




 মা 

পাপড়ি ভট্টাচার্য


সকাল হতে না হতেই রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনাতে মনোযোগ দেয়।মা মরা ছেলে ছেলের ভালোর জন্য কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়। ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়। তবু বাবাকে ও খুব ভালবাসে। নিজের কষ্ট চেপে রাখতে শিখে গেছে।তার নতুন মা আর বাবাকে আ্যকসেপ্ট করে নিয়েছে সে।সব ঠিকঠাক ই ছিল। কিন্তু এখন দিনরাতের সামান্যতম সময়ও ভালভাবে কথা পর্যন্ত বলেনা দুজনে। কারণ খুঁজে বেড়ায় রুদ্র। ডাক্তার হলে যা হয়,যখন তখন কল। মফস্বলে ক্যাম্প ডিউটি করে, ওটি করে পরিবারে সময় দিতে পারেন না ডক্টর সুমন সেন। ইনকাম বাড়ছে উত্তরোত্তর। দুহাতে খরচ করে পূবালী।
রুদ্রকে ভালবাসে কিন্তু  ভয়ঙ্কর   রাগ ওর স্বামীর উপর।অথচ হাই কোয়ালিটির চোদ্দ স্কোয়ার ফিটের নতুন ফ্ল্যাট পূবালীর তদারকিতে হয়েছে। সুন্দর গোছানো সংসার। রুদ্র  হোস্টেলে।
  উইন্টারের ছুটিতে রুদ্র বাড়িতে এসে একদিন অনেক রাতে হঠাৎ কান্নার শব্দ পেয়ে ঘুম চোখে উঠে দেখল নতুন মা কাঁদছে । কাছে যাবে কি যাবেনা ভাবছে সে,দেখল শোবার ঘরে বাবা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। নতুন মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল -বল তোকে কখনো অবহেলা করেছি আমি? তবু ঐ মানুষটা আমায় বুঝলনা, একটুও বুঝলনা। তোকেও দূরে পাঠিয়ে দিল।
  -তুমি কি চাও নতুন মা।কেন কাঁদছ?
  -রুদ্র আমি তোর নতুন মা। কিন্তু মাতো নই। আমি , আমি তোর একটা ভাই বা বোন আনতে চাই। আমার তো অন্য কোন বাইরের জগৎ নেই।
  রুদ্র কিবা বলবে এটা বাবা মায়ের সিক্রেট। তবে এই প্রথম একটা সুন্দর মা - মা গন্ধ পেল।ভাবল মায়েরা বা মায়ের মতনরা বলে কিছু হয়না। তাঁরা মা। শুধুই মা,এই উপলব্ধি থেকে সে তার নতুন মাকে আবেগঘন স্বরে বলল -মা ,মাগো!

সোমবার, ২৯ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প—৭ ।। ফুল ফোটার আগে — অশোক রায়।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প—৭




ফুল ফোটার আগে 
অশোক রায়

সকাল হতে না হতেই রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনাতে মনোযোগ দেয়। মা -মরা ছেলে।
ছেলের ভালোর জন্য কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়। ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়।
হোয়াটস্যাপে বাবুলির মেসেজ আসে - বাবা ফোন তুলছো না কেন? এখানে আমার একা ভালো লাগে না, পড়াশোনায় মন লাগে না। তুমি এসো না বাবা আমায় নিয়ে যাও। গৌরাঙ্গ দুঃখ পায় ছেলের উদাস মায়াভরা মুখখানি ভেসে ওঠে। একবার ভাবে সব ফেলে ছুটে যায় ছেলের কাছে। কিন্তু  সাইট ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি  যখন তখন যাওয়া যায় না।
- শিগগির আসব বাবুলি, এই কাজটা শেষ হলেই.... বাবুলি জানে না কবে বাবার কাজ শেষ হবে। তার মন  কাঁদে। একাকিত্ব দূর করতে একটা অবলম্বন চাই তার।
 
স্কুল থেকে ফেরার পথে মিতিন একদিন বলল কি সবসময় মনমরা হয়ে থাকিস চল তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাব। যেতে যেতে পুকুর পাড়ের আকাশী রঙের বাড়ি থেকে গানবাজনা কানে এল।  হারমোনিয়াম তবলা গিটার আরো কত কি। বাজাচ্ছে গাইছে তার বয়েসি কচি কাঁচার দল।একজন স্যর স্মিতমুখে সুরের জল বুনছেন।
বাবুলির তোলপাড় মনটা হাল্কা হয়ে গেল নিমেষে।আকাশে উড়তে উড়তে সে ডেকে ওঠে - বাবা আমি গান গাইব বাবা।।
                                           

রবিবার, ২৮ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে— অণুগল্প —৬ ।। রক্তের কাঁপন — খুকু ভূঞ্যা।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প —৬



রক্তের কাঁপন 

খুকু ভূঞ্যা 


সকাল হতে না হতেই রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশুনাতে মনোযোগ দেয়। মা মরা ছেলে। ছেলের ভালোর জন্য কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে আসে। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়। ছেলে মানসিক যন্ত্রণাও কষ্ট পায়।


শ্রাবণের সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল।

ভেজা গাছগুলো তার দিকে করুণ তাকিয়ে।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিল  ফোনের। রোজ কত কথা হয় বাবা ছেলের। কোনদিন ফোনের ওপার থেকে বাবা বলে, সুপ্রভাত সোনা। ছেলে অমনি বলে ওঠে,আজ সারারাত তোমাকে খুব মিস করেছি। স্বপ্ন দেখলাম, তুমি আমার পাশে শুয়ে।  প্রশ্ন করলাম, আমি কী হলে তুমি খুশি হবে বাবা? তুমি বললে, খুব ভালো মানুষ।


তারপর  কোনদিন ফোনে বলে, আজ পড়তে বসার দরকার নেই। আজ সারাদিন তুমি আকাশ দেখো।মেঘ দেখো। বৃষ্টি মেখে নাও হৃদয়ের কোণায় কোণায়।


ছেলের চোখ ভর্তি জল। ফোনটা নীরব। আকাশ তেমনি কাঁদছে হু হু। সে অভিমানে পেন্সিল ইরেজার বের করে আঁকতে বসল শূন্য হৃদয়ের ছবি। বাবা এলে বলবে, আমি শুধু ভালো মানুষ হবার স্বপ্ন দেখি। এবং আমি চব্বিশ ঘণ্টা তোমায় মিস করি বাবা --




শনিবার, ২৭ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প -৫ জোনাকি — শ্রাবণী বসু।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 





প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প -৫



 জোনাকি

শ্রাবণী বসু



অকালে মা মারা গেল। কারখানায় শিফ্ট ডিউটি করে ছেলের খেয়াল রাখা সম্ভব হচ্ছিলনা অলোকের। বন্ধুর পরামর্শে আত্মীয় স্বজনের সাথে আলোচনা করে ছেলেকে হোস্টেলে রেখে এল অলোক।

যে বয়সে ছেলেরা মাকে বন্ধু মনে করে সেই বয়সে মাকে হারানোর শোক সামলে উঠতে পারেনি কুশল।তার ওপর নতুন জায়গা, কলকাতা শহর। এতকাল নামটাই শুনেছে। শহরটাকে অদ্ভুত লাগে কুশলের । কেউ কারো জন্য ভাবে না। গাদাগাদি করে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে বিস্তর দূরত্ব। 

                  নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, শিক্ষক নতুন,বন্ধু নতুন, হোস্টেল নতুন, এলাকা নতুন।উফ, এত নতুনের সাথে কী করে সে তাল মেলাবে ভেবেই পায়না।কুশলের কান্না পায়। 

                  বাবা ফোন করে রোজই , তাও... বড় শূন্য শূন্য লাগে।মা বলত, ধেড়ে ছেলে ,খাইয়ে না দিলে খেতে পারেনা। আমি মরলে কী করবি?

                  মা যদি জানত, নিজে  নিজে খাওয়া কেন ,মাঝে মাঝে ভাতের ফ্যান ঝরাতেও হয়। হাত পুড়লে জ্বালা সহ্য করতেও হয়।

                 প্রথমটা  দুচোখ জলে ভরে যেত,এখন সেটা আর হয়না।কেবল দলা পাকানো কষ্ট গলার কাছে পাক খায়।এক একদিন  বাবার ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে হতাশ হতে হয় । হয়ত বাবা কিছুটা নিশ্চিন্ত এখন।হয়ত ভাবছে,  মানিয়ে নিতে শিখে গেছি। ।সব ফেলে বাবার কাছে চলে যেতে ইচ্ছে করে।জানি, বাবার কাজের চাপ আছে। মাকে হারিয়ে বাবারও মন ভালো নেই। 

           কিন্তু এখানে আপনার জন বলতে যে কেউ নেই। সারাদিন খাবার না খেলেও কেউ কিচ্ছু বলেনা। জল কম খেলে জোর করে কেউ খাইয়ে দেয়না। পড়তে না বসলে কেউ বকাবকি করেনা। কেউ বলেনা,  কাল রাতে কেন মশারি টাঙাস নি। দরজায় খিলটা ঠিক করে তুলিস।অঙ্কে ফুল মার্কস পেলে কেউ বলেনা, বাহ,কুশল, আজ একটা ক্যাডবেরি কিনে দেবো। 

           বাবা হয়তো মাঝে মাঝে ভুলে যায় ,আমি এখানে একা আছি,এক্কেবারে একা। মায়ের ওপরে অভিমান হয়, এমন করে কেউ যায়! আমি এখনও বড় হয়নি। মা আমাকে একটুও ভালোবাসে না। একদিনের জ্বরে কেউ অমন মরে যায়? কালুর মা তিনমাস জ্বরে ভুগেও বেঁচে আছে। কালুকে কতো ভালোবাসে।তাই বাবাকে একবার ফোন করে মায়ের কথা বলবো? সেটা কি উচিৎ হবে? 

          বাবা যদি চুপি চুপি কাঁদে!  কষ্ট পায় যদি? বাবা তো  বলতে পারবে না কিছু। কুশল মুঠো আলগা করে ফোনটা আলতো করে টেবিলের ওপর রেখে এসে বাইরের বারান্দায় দাঁড়ালো। বাইরে অন্ধকারের মধ্যে থোকা থোকা জোনাকির আলো নক্ষত্রের মতো জ্বলছে নিভছে।কুশল ঐদিকেই তাকিয়ে রয়েছে।

  

















✍🏾আপনিও এই বিভাগে লেখা পাঠান ✍🏾





অঙ্কুরীশা সাহিত্য পত্রিকা 
--------------------------------------
🙏🙏লেখা আহ্বান🙏🙏

        ✍🏾প্রতিদিন বিভাগ✍🏾
              অণুগল্প 
           
 বিষয় —" সকাল হতে না হতেই  রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনাতে মনযোগ দেয়।মা মরা ছেলে।।   ছেলের ভালোর জন্য  কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে।কিন্তু  বাবা মাঝে মাঝে  বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়।  ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়....."— এই অংশটি দিয়ে শুরু করে একটা   অণুগল্প শিরোনাম সহ  লিখে  পাঠিয়ে দিন অঙ্কুরীশা-র  পাতায়।


👩‍❤️‍💋‍👨 অঙ্কুরীশা ই ম্যাগাজিনে শুরু হলো প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প 

✍🏾এই  অণুগল্পটি ২০০ থেকে ২৫০ শব্দের মধ্যে   পাঠাবেন। 

✍🏾 একটা শিরোনাম দিয়ে অংশেটিকে সামনে রেখে  অণুগল্পটি লিখে পাঠাবেন। 

✍️✍ বাংলা বানানবিধি মেনে  মেল বডিতে (অভ্র অথবা ইউনিকোড) টাইপ করে পাঠাবেন। 

🙏এই বিভাগের  লেখা  যেন মৌলিক ও অপ্রকাশিত  হতে হবে।
🙏কোন প্রকার ছবি বা পিডিএফ ফাইল গ্রহণ যোগ্য হবে না।

 🙏এই বিভাগে  আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা কিনা উল্লেখ করে দেবেন। 


 

👇🏾আপনি আপনার  এই অণুগল্পটি  আজই মেল করুন👇🏾
ankurishapatrika@gmail.com

✍️🙏আপনার এই পাঠানো  লেখাটি অঙ্কুরীশা-য় সম্মানের সাথে প্রকাশিত হবে। 

🙏 এই পর্বটি ২৩ শে মে ২০২৩ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত চলবে।

নমস্কার। 
ভালো থাকুন। 
সুস্থ থাকুন। 

 সম্পাদক 
অঙ্কুরীশা
২০/৫/২০২৩

শুক্রবার, ২৬ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প -৪ ।। সমর্পণ — অলক্তিকা চক্রবর্তী।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 




প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প -৪



সমর্পণ 

অলক্তিকা চক্রবর্তী


সকাল হতে না হতেই রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশুনাতে মনোযোগ দেয়। মা মরা ছেলে। ছেলের ভালোর জন্য কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে আসে। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়। ছেলে মানসিক যন্ত্রণাও কষ্ট পায়।

সে কলমের খোঁচায় রক্তাক্ত করে নিজের অস্তিত্বকে তার খেরোর খাতায়। 

এরপরে সে কী করবে ফোন? নাঃ, সে চায় মন ।আজ মা বেঁচে থাকলে কী....।ছেলে সিদ্ধান্ত নেয় একটা ,হঠাৎ করে তার বাড়ি পৌঁছে বাবাকে চমকে দেবে। সেভাবে সে নিজেকে তৈরি করে । এমন সময় তার মনে হয়, কিন্তু গিয়ে যদি দেখে তার সেই আগের বাবা আর নেই, বহিরঙ্গেই সে মিশে যাওয়া   বাবাকে খুঁজে না পায়।  সেই আগের বাবা , যে কোন পুরনো বন্ধুকে লুকোতে জানেনা...। তাহলে সে পৌঁছাবে  কার কাছে ?


এবার সে নিজেকে বোঝায়, সচল যে অস্তিত্বটা সে বহন করছে তার কোষে কোষেই তো কত স্মৃতি ,তার বাবার তার মায়ের ।এই সহজ বোঝা পড়ায় সে খুশি হয়। আবারও মন প্রাণ ঢেলে দেয় অক্ষর বিন্যাসে।



বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প— ৩ ।। ছিল নেই, মাত্র এই — হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 






প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প— ৩



ছিল নেই, মাত্র এই

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায় 

অলক আর অলকা বিয়ে করেছিল পরিবারের অমতে ।ছেলে রাজা হবার সময়ই যে অলকা ওদের ছেড়ে চলে যাবে ভাবতে পারেনি অলক।রাজার মা বাবা বলতে তো সে ই।সে দেখে রাজার মুখের দিকে তাকালেই অলকার কথা মনে পড়ে।তখন সে রাজাকে সহ্য  করতে পারেনা।রাজা যদি না আসতো তাহলে তাকে যেতে হত না।এমনকি তার নিজের উপরেও  রাগ হয় ।সে কেন ...কি এমন তাড়া ছিল ...
দেরাদুনে হোস্টেলে থাকে একা একা ।সকালে ফোন না পেলে ছেলেটা কাঁদে।একেবারে  মায়ের মতো  হয়েছে ।নরম।অফিসের কাজের বাইরে অলক বন্ধু বান্ধবদের সাথে।সময়ই কাটায়।ক্যারাম খেলে।তাস খেলে।
বাড়িতে গেলেই তো সে একা অলকার ছবির দিকে তাকালেই চোখে জল আসে।আত্মহত্যার কথা মাথায় ঘুরতে থাকে।তার  বাবা, মা, কাকু, কাকীমা, জেঠু, জেঠিমা, ঠাকুর্দা, ঠাকুমা সবাইকে নিয়ে এক বৃহৎ একান্নবর্তী সংসার ।
ধর্মতলা-য় এক দিন দেখা হয়ে ছিল কাকুর সাথে বলেছিল চল,বাড়ি ফিরে চল।সবাই তোর রাজার কথা বলে।না,সে যেতে পারেনি।তার অলকা কে ছেড়ে যাবে কোথায়?
বাড়িটা বানিয়েছিল ঠাকুর্দার  বাবা ।হাইকোর্টের ব্যারিষ্টার ছিল।নীচে চারটা উপর ঐ চারটা ঘর।সে যখন ছোট ছিল গমগম করত ।এদিকে ধর্মতলা বাসে কুড়ি মিনিট,শিয়ালদাও তাই,আলিপুর ম্যাক।সিমাম আধঘণ্টা ।অলক ছিল ওদের চোখের মণি ।
কানপুর আইআইটি থেকে  পাশ করার পর বাড়ির লোকেদের কী স্বপ্ন।সব এক নিমেষে ধূলায় ধূসরিত হয়ে গেল।অলকা তার জীবন হয়ে গেল।সেই অলকা...।চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ।না রাজার 
 ফোন আসছে ।ছেলেটার  জন্য  বাঁচতে হবে তাকে...
 

বুধবার, ২৪ মে, ২০২৩

প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প — ২ ।। প্রথম অপরাধ — রক্তিম ।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 




প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প — ২




প্রথম অপরাধ 

রক্তিম    

 

সকাল হতে না হতেই  রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়ে-ই পড়াশোনাতে মনযোগ দেয়। মা মরা ছেলে।।   ছেলের ভালোর  জন্য  কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে। কিন্তু  বাবা মাঝে মাঝে  বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়।  ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়। আজ কেন বাবা আমায় ফোন করলনা এই চিন্তা ছেলেকে কুরে কুরে  খায় আর অপরাধ বোধে ছটফট করতে থাকে। কাল যে বন্ধুরা জোর করে সিনেমা দেখতে নিয়ে গেল। রাস্তার খাবার খেয়েছিল। আর যেটা বাবা বারবার বারণ করেছিল সেটার স্বাদ নিয়েছিল স্বপ্নিল।   সিগারেটের ধোঁয়া টানতে কষ্ট হচ্ছিল, কাশির পর কাশিতে চোখে জল এসে গিয়েছিল। বাবার মুখ ভেসে উঠেছিল  ধোঁয়ার ভিতরে স্পষ্ট বাবা যেন বাবা বলে উঠল – খোকা কষ্ট হচ্ছে কাছে আয় মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। তোর সব যন্ত্রণা আমায় দিয়ে দে। তোকে যে বারবার বারণ করেছিলাম এই জিনিস ধরবিনা। দেখলি তো এখন কত কষ্ট। যে কোন মুহূর্তে শ্বাস বন্ধ হয়ে অঘটন ঘটতে পারে।  ছোটবেলায় ডাক্তারবাবু বলেছিলেন - হার্টে একটা ফুটো আছে অপারেশন করে নেবেন সময়মত।  এই সাবধান বাণী মানতে হবে সারাজীবন ধরে। এই অভাবের সংসারে আমি পেরে উঠিনি খোকা আমায় ক্ষমা করে দিস। তাই বারবার সাবধান বাণী  তোকে বলে গেছি।

 

      স্বপ্নিল বাবাকে ফোন করে বারবার । বাবা ফোন ধরেনা। স্বপ্নিলও ঠিক করলো  বাবাকে কালকের ঘটনা সবটা বলবে। বাবা নিশ্চয় তাকে ক্ষমা করে দেবে জীবনের প্রথম অপরাধ বলে। কিন্ত বাবা যখন ফোন ধরলনা বাবার কাছে চলে আসে হন্তদন্ত হয়ে ।  অসময়ে  ছেলেকে দেখে অবাক - কিরে খোকা কেন অসময়ে আবার কলকাতায় এলি? বাবা তুমি ফোন ধরলেনা ভাবলাম তুমি ভাল নেই তাই চলে এলাম । আমি যদি উল্টোটা বলি তুই নিশ্চয় কোন অপরাধ করেছিস তাই আমার কাছে এসেছিস ক্ষমা চাইতে। খুব কি ভুল হবে সেটা। খবর এসেছে আমি যে বাবা সবটা জেনে গেছি। তবে তোর প্রথম অপরাধ বলে ক্ষমা করে দিলাম সবসময় স্মরণ রাখিস।  তোর মাকে মৃত্যুর সময় কথা দিয়েছিলাম তোকে ভাল রাখব । আমাকে হারিয়ে দিসনা খোকা। আয় কাছে আয় আমার কাছে বসবি আয়।একটু আদর করি।









আপনিও এই বিভাগে লেখা পাঠান ✍🏾




অঙ্কুরীশা সাহিত্য পত্রিকা 
--------------------------------------
🙏🙏লেখা আহ্বান🙏🙏

        ✍🏾প্রতিদিন বিভাগ✍🏾
              অণুগল্প 
           
 বিষয় —" সকাল হতে না হতেই  রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনাতে মনযোগ দেয়।মা মরা ছেলে।।   ছেলের ভালোর জন্য  কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে।কিন্তু  বাবা মাঝে মাঝে  বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়।  ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়....."— এই অংশটি দিয়ে শুরু করে একটা   অণুগল্প শিরোনাম সহ  লিখে  পাঠিয়ে দিন অঙ্কুরীশা-র  পাতায়।


👩‍❤️‍💋‍👨 অঙ্কুরীশা ই ম্যাগাজিনে শুরু হলো প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প 

✍🏾এই  অণুগল্পটি ২০০ থেকে ২৫০ শব্দের মধ্যে   পাঠাবেন। 

✍🏾 একটা শিরোনাম দিয়ে অংশেটিকে সামনে রেখে  অণুগল্পটি লিখে পাঠাবেন। 

✍️✍ বাংলা বানানবিধি মেনে  মেল বডিতে (অভ্র অথবা ইউনিকোড) টাইপ করে পাঠাবেন। 


🙏এই বিভাগের  লেখা  যেন মৌলিক ও অপ্রকাশিত  হতে হবে।
🙏কোন প্রকার ছবি বা পিডিএফ ফাইল গ্রহণ যোগ্য হবে না।

 🙏এই বিভাগে  আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা কিনা উল্লেখ করে দেবেন। 


 

👇🏾আপনি আপনার  এই অণুগল্পটি  আজই মেল করুন👇🏾
ankurishapatrika@gmail.com

✍️🙏আপনার এই পাঠানো  লেখাটি অঙ্কুরীশা-য় সম্মানের সাথে প্রকাশিত হবে। 

🙏 এই পর্বটি ২৩ শে মে ২০২৩ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত চলবে।

নমস্কার। 
ভালো থাকুন। 
সুস্থ থাকুন। 

 সম্পাদক 
অঙ্কুরীশা
২০/৫/২০২৩

 



মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০২৩

আজ থেকে শুরু হল... অঙ্কুরীশা-র পাতায়...প্রতিদিন বিভাগে — অণুগল্প — ১ ।। আজকের কলমে— হাত বাড়ালেই বন্ধু — সমাজ বসু

 






প্রতিদিন বিভাগে 

অণুগল্প — ১ 



হাত বাড়ালেই বন্ধু

সমাজ বসু


সকাল হতে না হতেই রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনাতে মনযোগ দেয়। মা মরা ছেলে।
ছেলের ভালোর জন্য কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়। ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়। আবার পরদিন সকালে বাবার ফোন এলেই সৌম্যর মন ভাল হয়ে যায়। পাখির পালকের মত নরম সুখ ওকে ছুঁয়ে যায়। বাবার মত বন্ধু সৌম্যর একটাও নেই।

এইভাবে বাবা ও ছেলের একটা ছোট্ট পৃথিবী গড়ে উঠেছে। যেখানে এই দুজন ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার নেই। প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল মা নেই। সৌম্যর সেই দিনটার কথা বেশ মনে আছে।

সেই দিন থেকে অনেক ঋতু বদলেছে। কিন্তু বাবা আর ছেলের দুনিয়ার এতটুকু বদল হয়নি। সৌম্য আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত। বাবাকে সে যাবতীয় সুখে মুড়ে দিয়েছে। শুধু তাঁর একাকীত্ব ছাড়া।

--- কোথায় নিয়ে চললি আমায়? 
--- আহ্ চুপ করে বসে থাকো। গাড়ি চালাচ্ছি। এখন কিছু বলতে পারব না।
কিছুক্ষণ পর সৌম্য বাবাকে নিয়ে পৌঁছে যায় গন্তব্যে।
--- ইনি শ্রী বরুণ চৌধুরী,আমার বাবা। কুড়ি বছর হলো আমার মা মারা গেছেন। আমার তখন দশ বছর। সেই দিন থেকে আমাকে উনি একা কোলেপিঠে মানুষ করেছেন। আমি জানি,আপনারা সকলেই একা। কারো স্বামী নেই। কারো স্ত্রী নেই। সন্তানেরা‌ হয়তো কর্মসূত্রে বাইরে আছে। তাই আমি আপনাদের সবার কথা ভেবে গড়ে তুলেছি "হাত বাড়ালেই বন্ধু"। এই প্রতিষ্ঠানের একটাই উদ্দেশ্য, সবাইকে একাকীত্ব থেকে মুক্ত করা। এখানে সম্পর্কের কোন নাম নেই। শুধু হাত বাড়িয়ে দেখুন,"হাত বাড়ালেই বন্ধু"।
সৌম্য চৌধুরীর কথা শেষ হতেই উপস্থিত সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগলেন। বরুণ চৌধুরীও।











✍🏾আপনিও এই বিভাগে লেখা পাঠান ✍🏾




অঙ্কুরীশা সাহিত্য পত্রিকা 
--------------------------------------
🙏🙏লেখা আহ্বান🙏🙏

        ✍🏾প্রতিদিন বিভাগ✍🏾
              অণুগল্প 
           
 বিষয় —" সকাল হতে না হতেই  রোজ বাবা ছেলেকে ফোন করে। ছেলে বাবার ফোন পেয়েই পড়াশোনাতে মনযোগ দেয়।মা মরা ছেলে।।   ছেলের ভালোর জন্য  কলকাতার বাইরে পড়াশোনার জন্য রেখে দিয়ে আসে।কিন্তু  বাবা মাঝে মাঝে  বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছেলেকে ফোন করতে ভুলে যায়।  ছেলে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট পায়....."— এই অংশটি দিয়ে শুরু করে একটা   অণুগল্প শিরোনাম সহ  লিখে  পাঠিয়ে দিন অঙ্কুরীশা-র  পাতায়।


👩‍❤️‍💋‍👨 অঙ্কুরীশা ই ম্যাগাজিনে শুরু হলো প্রতিদিন বিভাগে অণুগল্প 

✍🏾এই  অণুগল্পটি ২০০ থেকে ২৫০ শব্দের মধ্যে   পাঠাবেন। 

✍🏾 একটা শিরোনাম দিয়ে অংশেটিকে সামনে রেখে  অণুগল্পটি লিখে পাঠাবেন। 

✍️✍ বাংলা বানানবিধি মেনে  মেল বডিতে (অভ্র অথবা ইউনিকোড) টাইপ করে পাঠাবেন। 

🙏এই বিভাগের  লেখা  যেন মৌলিক ও অপ্রকাশিত  হতে হবে।
🙏কোন প্রকার ছবি বা পিডিএফ ফাইল গ্রহণ যোগ্য হবে না।

 🙏এই বিভাগে  আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা কিনা উল্লেখ করে দেবেন। 


 

👇🏾আপনি আপনার  এই অণুগল্পটি  আজই মেল করুন👇🏾
ankurishapatrika@gmail.com

✍️🙏আপনার এই পাঠানো  লেখাটি অঙ্কুরীশা-য় সম্মানের সাথে প্রকাশিত হবে। 

🙏 এই পর্বটি ২৩ শে মে ২০২৩ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত চলবে।

নমস্কার। 
ভালো থাকুন। 
সুস্থ থাকুন। 

 সম্পাদক 
অঙ্কুরীশা
২০/৫/২০২৩



বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

"কথাসাহিত্যিক অনন্যা দাশের" দু'টি অণুগল্প


            অনন্যা দাশের দু'টি অণুগল্প 


রূপান্তরণ 

এলার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল ডাক্তার রীডের মাধ্যমে। নিউ ইয়র্কের ক্লিনিকে নার্স ছিল সে, এখন আমাদের এই ছোট মার্কিন গ্রামে এসেছে। যে রকম সুন্দরী সেই রকম বুদ্ধিমতী। সব কাজ নিমেষের মধ্যে করে ফেলে সে। সবাই ওর কথাবার্তায় এবং কাজে মুগ্ধ।  
ডাক্তার রীডের বয়স হয়েছে, উনি মজা করে বলেন, “আমার রুগিরা কেউ আমাকে চায় না! তারা সবাই এলার ভক্ত! সবার মুখে শুধু এক কথা, এলা কখন আসবে?”
ভারি ভাল লেগেছিল আমার মেয়েটাকে। সুন্দরী হলে কী হবে, এতটুকু অহঙ্কার নেই। ওর লাল টুকটুকে ঠোঁটে সব সময় হাসি লেগেই আছে! মাঝে মাঝে দেখা হলে অনেক কথা বলে সে। ছোটবেলার কথা, মা বাবার কথা, আরো কত কী।   
ওর কাজ করার ক্ষমতা দেখে সবাই থ, আমিও। এতটুকু আলসেমি নেই! ও বড় শহরের কোন বড় হাসপাতালে গেলে অনেক বেশি উপায় করতে পারত।   
ওকে কথাটা বলতে বলল, “জানো, আমি আগে যখন নিউ ইয়র্কে ছিলাম তখন অনেক বেশি মাইনে পেতাম কিন্তু আর ফিরে যাব না। তখন আমি প্রচন্ড কুঁড়েও ছিলাম অবশ্য। মানে যাকে বলে প্রোকাস্টিনাটার! সব কাজ পরে করার জন্যে রেখে দিতাম। একটা ভয়ানক ঘটনার জন্যে এখন কিন্তু বদলে গেছি। । আমি মনে করি ওটাই ছিল আমার ওয়েক আপ কল!”  
হঠাৎ লক্ষ করলাম ওর মুখ থেকে হাসিটা মিলিয়ে গেছে! কিছু একটা মনে করে মুখটা বেশ থমথমে। 
আমি একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছিল?” এরা অনেক সময় ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। 
এলা কিন্তু বলল, “ওখানে আমি যে জায়গাটায় থাকতাম সেই পাড়াটা মোটেই ভাল ছিল না। একটা মদের আড্ডা ছিল সেখানে। সেই বারটার জন্যেই পাড়াটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি ছোট শহরে মানুষ। মা আমাকে কত বার বলেছিলেন, ‘নিউ ইয়র্কে যেও না!’ আমি শুনিনি। পরে বলেছেন, ‘তোমাদের এলাকাটা ভাল না, ওখানে থেকো না’ কিন্তু কুঁড়েমির ঠেলায় আমি আর বাড়ি বদল করিনি। মা এও বলেছেন, ‘বড় শহরে ভাল লোক খারাপ লোক সবই বেশি। ব্যাগে অন্তত একটা লঙ্কা গুঁড়োর স্প্রে রেখো।’ সেটাও কুঁড়েমির ঠ্যালায় কেনা হয়নি। একদিন রাতে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন আমার উপর হামলা হল।”   
আমি আঁতকে উঠলাম, “সে কী!”   
“সেদিন হাসপাতাল থেকে বেরোতে একটু বেশি রাত হয়ে গিয়েছিল। ট্রেন স্টেশান থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছি এমন সময় চারটে লোক আমাকে ঘিরে ধরল! মাতাল হলে কী হবে তাদের গায়ে অসুরের মতন শক্তি! আমি ছাড়িয়ে পালাতে পারলাম না!”
আমি আর ভাবতে পারছিলাম না, লোকগুলো কী তাহলে ওকে...  
আমার মনের কথা বুঝতে পেরে এলা বলল, “নাহ, ওরা আমাকে রেপ করতে পারেনি! পারেনি সেটা শুধুমাত্র আমার উপস্থিত বুদ্ধির জন্যে। দাঁত দিয়ে মুখ চাপা হাতটাকে কামড়াতে সেই হাতটা মুহূর্তের জন্যে সরতেই আমি হাঁউমাঁউ করে চিৎকার করে উঠেছিলাম ‘আমাকে ছুঁয়ো না আমার এড্‌স আছে’!”    
ওরা বিশ্বাস করছে না দেখে ব্যাগ থেকে টারা কুপারের মেডিকাল রিপোর্ট টা বার করে ওদের সামনে মেলে ধরলাম।   



তাতে বড়বড় করে লেখা ছিল ২৪ বছরের মহিলা এইচ আই ভি পজিটিভ। টারা মারা গিয়েছিল আগের সপ্তাহে, শরীর বেচে সংসার চালাত বেচারা! কিন্তু তার ফাইলটায় কাজ করা হয়নি। পরদিন ইন্সপেকশান তাই কাজ শেষ করতে ফাইলটাকে এনেছিলাম সাথে। ভগবান আমাকে রক্ষা করলেন মনে হয়। লোকগুলো ওটা দেখেই সুরসুর করে পালাল। ভীষণ ভয় ঢুকে গিয়েছিল মনে বলে অনেকদিন থেরাপি চলেছিল। তারপর থেকে আমি আর কোনদিন কুঁড়েমি করিনি। মার কথা শুনে বাড়ি বদল, শহর বদল সব করেছি। এখন আমার ব্যাগে আর কিছু থাকুক না থাকুক একটা লঙ্কাগুঁড়োর স্প্রে সব সময় থাকে!” 




 মরূদ্যান

থেলমা আজ একটু দেরি করে কাজে ঢোকার মুখেই ওর টিম লিডার বেলিন্ডার সাথে দেখে হয়ে গেল! থেলমা কিছুদিন হল নার্স হয়ে একটা হাসপাতালে ঢুকেছে। ওর বস বেলিন্ডা থেলমাকে দু চক্ষে দেখতে পারে না। নার্সিং পড়া শেষ করে চাকরি পেতে কী আনন্দই না হয়েছিল থেলমার। সে মনে করেছিল কত লোকের সেবা করতে পারবে কিন্তু বেলিন্ডা তার সে সব স্বপ্ন ঘুচিয়ে দিয়েছে। পদে পদে ওর কাজের দোষ ধরে, রেগে কথা বলে। দুবার ডাক্তারদের কাছেও নালিশ করেছে ওর নামে। থেলমার মনে দৃঢ় ধারণা যে ওর গায়ের রঙের জন্যেই বেলিন্ডার ওই রকম আচরণ। ঘানার মেয়ে থেলমা মার্কিন মুলুকে চাকরি করতে এসেছে। ওর গায়ের রঙ মিশমিশে কালো আর বেলিন্ডার রঙ ধবধবে সাদা, চুল সোনালি। তিরিশ বছর হল এই হাসপাতালে চাকরি করছে, অভিজ্ঞতার শেষ নেই। অন্য কোন নার্সের সাথে কিন্তু ওর ব্যবহার ওই রকম নয় কারণ থেলমাই ওদের ইউনিটের একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ!          
ওকে দেখেই বেলিন্ডা চেঁচিয়ে উঠল, “কোথায় ছিলে তুমি? তোমার পেশেন্টকে ঘরে দেওয়া হয়ে গেছে! তোমাকে বলেছি না সকাল আটটার মধ্যে আসতে! তোমার কী দায়িত্বজ্ঞান বলে কিছু নেই?”   
থেলমা কোন রকমে ইউনিফর্মটা চাপিয়ে ছুটে গেল রুগির ঘরে।  


পেশেন্ট একজন বয়স্ক মানুষ। কোমরের ব্যথায় কাতর, হিপ রিপ্লেসমেন্ট অপারেশান হওয়ার কথা। ঘরে ঢুকে হাসি মুখে ‘গুড মর্নিং’ বলল থেলমা। ওমা ওকে দেখেই লোকটা তারস্বরে চেঁচাতে লাগল!  
থেলমা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হল? লাগছে? আমি তোমার নার্স, আমার নাম থেলমা।”
লোকটা গম্ভীর স্বরে বলল, “আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাও! আমি চাই না কোন কালো মহিলা বা পুরুষ আমাকে স্পর্শ করুক!”  
ওর কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল থেলমা! ওর ২৮ বছরের জীবনে কেউ ওকে মুখের ওপর ওই রকম কথা বলেনি! এই লোকটা মনে হয় দাস প্রথা উঠে যাওয়ার আগের সময় থেকে এসেছে! 
লোকটা চেঁচাচ্ছে, “যাও তোমার সুপারভাইজারকে ডেকে নিয়ে এসো! তুমি আমার গায়ে খবরদার হাত দেবে না!”
থেলমা ঘাবড়ে গিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বেলিন্ডাকে ডাকতে গিয়ে দেখল চেঁচামেচি শুনে সে নিজেই ওখানে এসে হাজির।
“কী হয়েছে? পেশেন্ট এত চেঁচাচ্ছে কেন? এসো আমার সঙ্গে!” বলে বেলিন্ডা রুগির ঘরে ঢুকল।
থেলমা অসহায় ভাবে পিছন পিছন গেল। 
“সুপরভাত! শুনলাম আপনি চেঁচাচ্ছিলেন। কী হয়েছে জানলে আমরা প্রতিকারের ব্যবস্থা করব।”
লোকটা বলল, “যাক, সুবুদ্ধি হয়েছে তাহলে! ওই মেয়েটা আমার গায়ে হাত দেবে না!”  
“কেন জানতে পারি?” 
“আমি চাই না কোন কালো লোক আমাকে স্পর্শ করুক!”
বেলিন্ডার মুখ ভাবলেশহীন। কী ভাবছে বোঝা যাচ্ছে না, বলল, “আমাদের এখানে সব ধরনের লোকই কাজ করে। বেশ কিছু ভালো অ্যাফ্রো ডাক্তারও আছেন।”   
“না, না, খবরদার! ওরা কেউ আমার কাছে আসতে পারবে না! আপনি দয়া করা সেটা দরজার বাইরে লিখে দিন!”
বেলিন্ডার চোওয়াল শক্ত হল, “আমি সে রকম কিছুই করব না মিস্টার জেনকিন্স! আমি আপনার আত্মীয়দের ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি। আপনি এখান থেকে যেতে পারেন! আমরা আপনার মতন অন্ধ গোঁড়াদের চিকিৎসা এখানে করি না! বিদায়!” 
থেলমার চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগল।  
ঘরের বাইরে গিয়ে বেলিন্ডা বলল, “তুমি ভাবছিলে আমি ওই পাগলের প্রলাপ শুনব? মোটেই না! আর শোনো মেয়ে তোমার গায়ের রঙ লাল, নীল না কালো তাতে আমার কিছু যায় আসে না! আমার টিমের সব নার্সদের কাজ সব থেকে ভালো হতে হবে! যতদিন না তারা তাদের কাজে পার্ফেক্ট হচ্ছে তারা আমার কাছে বকুনি খাবেই! তবে তোমার পার্ফেক্ট হতে আর বেশি দিন নেই। যাই গিয়ে পাগলটার আত্মীয়দের ফোন করি। ডাইভারসিটি অফিসকেও জানাতে হবে শেষে কোন গন্ডগোল না বাধায় লোকটা।”  
থেলমা অবাক হয়ে বেলিন্ডার হন হন করে হেঁটে যাওয়া দেখল। চারিদিকের আলো যেন আরো বেশি উজ্জ্বল মনে হল ওর। 



বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২০

অণুগল্প /বিমল মণ্ডল


১.
স্রোত
 


আনন্দবাবু একটা  অফিসে  কাজ করেন। সামনের   সেপ্টেম্বরে তাঁর  রিটায়ার্ড । তবে অফিস  নিয়ে বেশি ব্যস্ত  থাকার ফলে সংসারে সময় দিতে ঠিক ততটা পারেন না। 
আনন্দ বাবুর স্ত্রী , এক মেয়ে, আর এক ছেলে। এককথায়  সুখের  সংসার  বলা যেতে পারে। 
স্ত্রী  অন্নপূর্ণা  সংসার সামলাতে  সামলাতে  চোখে মুখে  ক্লান্তির ছাপ ধরা পড়ে। অন্নপূর্ণা  স্বামী কে খুব ভালোবাসে। আর ছেলে -মেয়েকে নিয়ে তার বেশ  কাটে। ছেলে বিদেশে  থাকে। একটা  কোম্পানির  কাজ করে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। জামাই কলকাতার  পি. এস.  অফিসে  চাকরি  করে। তাই মেয়ে ও জামাই কলকাতার  একটা ফ্ল্যাটে থাকে। একটা  নাতিও হয়েছে । 

আনন্দবাবু আজ অফিস  থেকে ফেরেননি । অন্নপূর্ণা  ফোন করলে সুইচ স্টপ বারবার  বলছে। বিকেল গড়িয়ে  সন্ধ্যা  হয়ে এলো কিন্তু  আনন্দবাবু এখনো  পর্যন্ত  বাড়ি  এলেন না। অন্নপূর্ণার  ভয় বাড়তে লাগলো । পাড়ার  মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে  থাকে। স্বামী  বলতেই অজ্ঞান । তাই সময়ের স্রোতে   এদিক  সেদিক পায়চারি করতে লাগলো । 

চাঁদিনী রাতে একটু অদূরে  কে যেন হেঁটে  আসছেন।  অন্নপূর্ণা  এগিয়ে  যায় । সত্যিই  তার স্বামী কে দেখে চমকে  ওঠে । অন্নপূর্ণার গা , হাত, পা ঠান্ডা  হয়ে আসে। 
আনন্দ বাবুর  চোখে মুখে  দুঃখের  ছবি। নিরব- নিথর । অন্নপূর্ণা  স্বামীর  হাতধরে বাড়ি ফিরে। 
আনন্দবাবুকে আজ যেন অচেনা  পুরুষের  মতো লাগছে। স্বামীর এই অবস্থা দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগলো। নিজেকে  ঠিক রেখে অন্নপূর্ণা  এক গ্লাস  জল দিয়ে জিজ্ঞাসা  করতে থাকে-
-কি গো আজ  তোমাকে এমন লাগছে কেন?
-আজ আফিস থেকে  আসতে এতো দেরি হলো কেন?
-কি হয়েছে তোমার?

অন্নপূর্ণা  একেরপর এক প্রশ্ন করে যায় তা স্বামী  কে। কোনো  উত্তর  না দিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলো -
-আমি অন্নপূর্ণা  কে কি বলবো। ছেলে  মহারাষ্ট্রে  থাকে তার  মধ্যে  করোনা ভাইরাস  ধরা পড়েছে।

 ছেলের অফিস  থেকে ফোন করে জানিয়েছে। তাই আনন্দবাবু অফিসে  নিশ্চুপ হয়ে অন্যমনস্ক  ভাবে বসে ছিলো । কখন  সে অফিস  ছুটি  হয়েছে তার ধারণা নেই। তারপর  বুঝতে  পেরে দেরি করে বাড়ি  ফিরছিলেন। 
আনন্দবাবু  জানেন যে অন্নপূর্ণা স্বামী , পুত্র, কন্যা ছাড়া সে বাইরের জগৎ  সম্পর্কে  কিছুই  জানে না। বাড়ির  সমস্ত কাজ নিজেই করে থাকে। কাজের লোক সে রাখে না। নানান কষ্টের মধ্য  দিয়েও সে সংসার পরিচালনা  করে। 
তাই আনন্দবাবু কি ভাবে এই দুঃসংবাদ তার স্ত্রীকে  জানাবেন তা সে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ  একটা  ফোন এলে চমকে  উঠে  আনন্দবাবু। 

আনন্দবাবুর ফোন ধরার আগে অন্নপূর্ণা  ফোন ধরতে গেলে, তাকে ফোন ধরতে নিষেধ  করেন। 
অন্নপূর্ণার মধ্যে  সন্দেহ  জন্মায়। ভাবতে থাকে তার স্বামী  যেন কিছু লুকোচ্ছেন। আগ্রহ  বাড়তে থাকে জানার। তাই ফোনটা আনন্দবাবুর ধরার আগে অন্নপূর্ণা ঝাঁঝালো  গলায় বলে -
- তুমি অফিস  থেকে  এলে ,,একটু বিশ্রাম  করো। আমি ধরছি ফোনটা। 
আনন্দবাবুর  শরীর  শীতল হয়ে আসে।  ছেলের শরীরে  করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছে - এই কথা শুনলে অন্নপূর্ণা তো মারা যাবে তাই চিন্তা  করতে করতে  মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। 

এদিকে  অন্নপূর্ণা  ফোন ধরে হ্যালো  বলতেই
আনন্দবাবু অসুস্থ  হয়ে  পড়েন। 
ফোনের ওপাশ থেকে  ভেসে আসে মেয়ের কণ্ঠ 
- মা, কেমন আছো? 
-ভালো
-বাবা কেমন  আছে?
-খুব ভালো নেই। 
- তোরা সবাই ভালো  আছিস? 
-হ্যাঁ,তবে তোমার জামাই কাশছে আর তোমার নাতির জ্বর । 
- রক্ত পরীক্ষা  করেছিস?
- হ্যাঁ  গো । 
- সরকার  ঘোষণা  করেছেন  যে করোনা  ভাইরাস  চার দিকে  ছড়িয়ে পড়েছে। তাই জ্বর,  কাশি হলে সব পরীক্ষা  করে নিতে হবে। তাই করেছি। 
- ভাইয়ের  খবর নিয়েছো?  ওখানে তো অনেকের শরীরে  করোনা ভাইরাস  ধরা পড়েছে, এবং পুরো মহারাষ্ট্রে বহু লোক মারা গেছে। 

অন্নপূর্ণা চমকে ওঠে । তার সাথে সাথে আনন্দবাবুও ভয়ে এবং  আতঙ্কে  বিছানা  নিয়ে নেয়। অন্নপূর্ণা  ফোন কেটে দিয়ে স্বামীর কাছে ছুটে যায়। স্বামীর মাথায় হাত বোলাতে থাকে। আর বলতে থাকে -
- কি গো তোমার কি অসুবিধা  হচ্ছে?
- মেয়ে ফোন করেছিলো। 
- ছেলের  খবর  নিয়েছো?  কেমন আছে? সাবধানে  থাকতে বলে দিয়েছো তো?

অন্নপূর্ণার মুখে  ছেলের  কথা শুনতে শুনতে আনন্দবাবুর কথায় জড়তা চলে আসে। কিছু যেন বলতে চায় অন্নপূর্ণাকে। তবুও  জড়িয়ে  জড়িয়ে  বলে -
-তেলে ভানো লেই।
এই কথা শুনে  অন্নপূর্ণা যেন পাথর  হয়ে যায়। একটা আকাশ  মাথায় যেন তার ভেঙে  পড়ে। 
আনন্দবাবুর দুচোখ দিয়ে শুধু  জল পড়তে থাকে। রাত বাড়তে থাকে। 

কিচ্ছুক্ষণ পরেএকটা  ফোন আসে। অন্নপূর্ণা  নিজেকে  ঠিক  সামলে  নিয়ে নিজেই এসে ফোন ধরে-

-হ্যালো, কে বলছেন? 
ওপাশ থেকে  বলতে থাকে -
-আমি মহারাষ্ট্র  থেকে থানার বড়ো বাবু বলছি। 
অন্নপূর্ণা  চুপ হয়ে যায়। ফোন কানের কাছে রাখে
ফোনের ওধার  থেকে  বলে যাচ্ছেন-
-ছেলের শারীরিক  অবস্থার কথা। 

অন্নপূর্ণা  মুহূর্তের মধ্যে  স্বামীর পাশে বিছানা অজ্ঞান  হয়ে  পড়ে। ঠিক যতটা  আনন্দবাবু ভেবে ছিলেন  সেটাই হলো। আনন্দ বাবু স্ত্রীর  পাশে থেকে দু'জন দু'জন কে  জড়য়ে  দুঃখের  স্রোতে  ভেসে যায়। আর করুন  দৃষ্টিতে জানালার  বাইরের জ্যোৎস্নার আলোর দিকে তাকিয়ে  থাকেন।  


(গৃহশোভা পত্রিকাতে প্রকাশিত)   
      

২.
বিবেক

-কি গো খাতাতে কি করছো?
-না মানে একটা  হিসেব  কষছিলাম।
-কিসের?
-দিনের আর রাতের 

এই বলতে  বলতে শুভ্রা এগিয়ে আসে। আর বলে -
-তোমার অহংকার  হয় না?
-কেন?
- এই যে বললে?? 

জানো শুভ্র জীবনের  অনেকগুলো  অতীত  থাকে। তোমার আছে। আমার আছে। পৃথিবীর  সবার আছে। কিন্তু  নেই বিবেক। 

শুভ্রা চুপকরে অতীতের  কথা ভাবছিলো। মনে করছিলো  কলেজের  সেই পরেশ। পরেশ চৌধুরী । দারুণ  দেখতে  ছিলো। ৬ফিট লম্বা । শারীরিক  গঠন  অত্যাশ্চর্য । পড়াশোনায়ও ভালো  ছিলো।  যা দেখে মেয়েরা  প্রেমে পড়ে যায়। সেইসব গুণ পরেশের  মধ্যে  বহাল । 
সেই পরেশের  সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন  দেখেছিলো শুভ্রা। কিন্তু  পরেশ উচ্চশিক্ষা লাভের  জন্য  বিদেশে গিয়ে ফোন করতো  প্রায়।  কিন্তু  কিছুদিন  পরেশকে ফোনে  না পেয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত  নিতে  বাধ্য  করে শুভ্রা। 
স্বামী  কলেজের  অধ্যাপক । বেশ ভালোবাসে শুভ্রাকে। একছেলে বেশ সুখেই আছে বলা যায়। 
পরেশের  সাথে যে তার প্রেম ছিলো তা তার স্বামীকে জানাই নি। তাই বিবেকের  কথা শুনে চমকে  ওঠে  শুভ্রা। 
এদিক  তার স্বামী  বলে যায় -
-জানো শুভ্রা। মানুষ যে মিথ্যা  কথা বলে। সত্যটাকে লুকিয়ে  থাকে। তা কিন্তু  তার জীবনে  একদিন  হলেও  যন্ত্রণা  পাবে।  

শুভ্রা  স্বামী কে চা দেয়  । সেও এক কাপ নিয়ে বসে।  ততক্ষণে  ছেলেটা  জেগে উঠেছে । শুভ্রা  অন্যমনস্ক  ভাবে  রান্নাঘরে ছেলের  খাওয়ার  তৈরি  করে।  
শুভ্রার ফোনে একটা  অজানা  ফোন আসে। তখন  তার স্বামী   বলে -
-কি গো তোমার ফোন
-একটু ধরো।যাচ্ছি
-হ্যালো
ফোনের  ওপাশ  থেকে  একটা পুরুষ কণ্ঠ বলে -
-শুভ্রা আছে? 
-হ্যাঁ। আপনি  কে?
-আমি পরেশ। পরেশ চৌধুরী  
-ধরুন দিচ্ছি

শুভ্রা ফোনে কথা বলে। তার স্বামী  ছেলেকে নিয়ে বারান্দায়  যায়। মুহূর্তের মধ্যে 
শুভ্রার শরীরে  অন্ধকার  নেমে আসে। সারা শরীর  কেঁপে ওঠে  অজানা  ভয়ে। ফোনে অনর্গল  কথা বলে  যায় পরেশ।শুভ্রা নিশ্চুপ হয়ে বিছানায়  ঘামতে থাকে। তরতর করে প্রেসারটা বেড়ে যায়।
শুভ্রার স্বামী  ছুটে আসে। প্রেসারের ঔষধ  দেয়। শুভ্রা স্বামীর কোলে  মাথা রাখে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। 

ওপাশ থেকে  হ্যালো  হ্যালো  করে যায় পরেশ 
শুভ্রার বিবেক যেন প্রেম ও ভালোবাসার সাথে লড়াই করে।


(গৃ্হশোভা পত্রিকাতে প্রকাশিত)   


৩.
ভিখিরির দান


-কি রে বল্টু  কেমন আছিস?
-ভালো নেই গো মঙ্গল দাদা। 
-কেন রে?
-চারদিকে  শুধু  মৃত্যু  আর মৃত্যু । এর মধ্যে  ভালো  থাকবো কেমন করে? 
-তাতে তোর কী? তুই তো  ফুটপাতে  থাকিস। আর ভিক্ষা করে ছোটো  বোন এবং  মায়ের মোটামুটি  পেট চালাস। তোর কথা কেউ ভেবেছে? 


বল্টু  মঙ্গলের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে তারপর ভাবলো  যে ভিক্ষা করে হলেও  একবেলা  খেয়ে বাঁচে আছি। কিন্তু  করোনা  সংক্রমণের  জেরে কত মানুষ  মারা যাচ্ছে। কত মানুষ  অনাহারে আছে। তাদের কি হবে?  এইসব কথা ভাবতে  ভাবতে চোখ দিয়ে জল পড়তে  লাগলো । মঙ্গল  বল্টুর চুপচাপ  থাকা দেখে বলল-
-কি রে চুপ করে গেলি কেন?বল, কি করবি?
বল্টু নিচের  দিকে মুখ করে  চুপি চুপি  কাঁদছিল। মঙ্গল  দু'হাত দিয়ে মুখটা তুলতেই দেখতে  পায় যে বল্টু  কাঁদছে। 
আসলে বল্টু ছোটো  থেকেই মায়া- মমতা, স্নেহ  - ভালোবাসা  মায়ের থেকে পেয়েছে। জানে সে  অভাবের  কি জ্বালা । অনাহারে  থাকার কষ্ট । যদিও  ভিক্ষা করে  সংসার চালায়।অভাবের  জন্য  অক্ষরজ্ঞান  নেই। সব কষ্ট  নিজেই সহ্য করে। মা আর বোন কে ভালো রাখতে  পেরেছে। স্টেশনে , ট্রেনে  সমস্ত যাত্রী  একবাক্যে বল্টু কে চেনে।বল্টু  গরীব  ভিখিরি  হলেও  সে পরোপকারী। মঙ্গল  ও বল্টু একই পাড়াতে থাকে। মঙ্গল  বল্টুকে খুব ভালোবাসে। তার চোখে  জল দেখে  মঙ্গল অবাক  হয়ে 
বলে - 
- কি রে কাঁদছিস  কেন?কি হয়েছে  তোর?
- জানি না মঙ্গলদা? 
-আমায় বল?
-মঙ্গলদা কি  হবে এই পৃথিবীর? আমরা আদৌ বেঁচে থাকবো তো? 
এই কথা বলতে বলতে মঙ্গলের কাঁধে  নিজের মাথা চাপিয়ে কাঁদতে  লাগলো । 

হঠাৎ  দেখে একটা ছোট্ট  শিশু  তার মায়ের  কোলে। আর একটি  তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে । রাস্তা  শুনশান  লকডাউনের  জন্য। ওরা বাঁকুড়া  থেকে হেঁটে হেঁটে  পূর্ব  মেদিনীপুর  আসছে। ওরা পরিয়ারী শ্রমিক । কয়েকদিন কাজ না থাকায় বসে বসে  ছিলো । হাতে যেটুকু  টাকা ছিলো  সব শেষ  হয়ে যায়।ওখানে কার প্রশাসন  বলে দিয়েছে  - যে যার জেলায়  ফিরে যেতে।তারা দায়িত্ব  নিতে পারবে না।তাই বাড়ি যাচ্ছে।    ছোটো  ছোটো  দুটো  শিশু  না খেয়ে আছে। রাস্তায়  দোকান ও নেই। 
বল্টু আর মঙ্গলের  কাছে এসে ওরা  দাঁড়ায় । বল্টু সোজা  হয়ে চোখ তুলে দেখে চারজন তার কাছে। 
বল্টু  অবাক  হয়ে জিজ্ঞেস  করে -
-কে আপনারা ? কোথায় যাবেন? 
ছোট্ট শিশুটি তার মার বলার আগে বলে -
-দাদা, দুটো  খেতে দেবে?  কয়েকদিন খাইনি দাদা। 
বল্টু  পিছিয়ে  আসে। মুহূর্তে  যেন সমস্ত  চাওয়া -পাওয়া, ইচ্ছে -অনিচ্ছা, আশা- নিরাশায় স্তব্ধ  হয়ে গেল। এগিয়ে এলো  বল্টু। সারাদিনের  ভিক্ষে যতটুকু  সম্ভব , ততটুকুই ওদেরকে দিয়ে দিল। ওরা আনন্দে  খাচ্ছে আর বিল্টু ওদের দিকে তাকিয়ে ... 

(আকাশবাণীতে প্রচারিত-২৩/৪/ ২০২০)



৪.
প্রশ্ন


রথীন দাস আর তার ছেলে রামু  চুপচাপ মাটির  ঘরের  উঠানে  বসে । রথীনের স্ত্রী দরজার কাছে দাঁডিয়ে দাঁড়িয়ে  কাঁদছে । রামু মাঝে মাঝে  বাবাকে  বলে -
- বাবা আমি কি আর পড়বো না?
- এখন  কি করবো  বাবা? 

রথীন ছেলের  কথার উত্তর  দিতে পারে না। আসলে রথীনের ছেলে  ও বৌ নিয়ে তিন জনের সংসার। সে টোটো  চালিয়ে  সংসার দেখে। ছেলেটা  মাধ্যমিক  দেবে কিন্তু  দীর্ঘ  লকডাউনের  ফলে বাড়িতে  বসে আছে। রেশন থেকে  যতটা  খাদ্য সামগ্রি নিয়ে আসে সেই দিয়ে পেট চালায়। কাজকর্ম  সব বন্ধ। 
দিশাহারা  রথীন যেন কয়েকদিনে খিটখিটে  হয়ে  গেছে । 
এদিকে  ছেলেটার পড়াশোনা  বন্ধ। কেননা স্কুল  বন্ধ থাকার ফলে সারাক্ষণ  রামু বাড়িতে  বসে থাকে। কিন্তু  সরকার  অনলাইনে  ক্লাস  নেওয়ার  কথা ঘোষণা  করেছেন। তাই রামুর স্কুলেও অনলাইন  ক্লাস  চালু হয়েছে। 
এদিকে  রামুর বাড়িতে  কোনো  মোবাইল  ফোন না থাকায়  অনলাইন  ক্লাস  থেকে  পিছিয়ে  পড়ছে। রথীনও জানে। রথীন চেষ্টাও করেছে তাতে রথীনের কিছু লাভ হয়নি। কারণ  লকডাউনে  সমস্ত  দোকান  বন্ধ। তাই রথীন চুপচাপ  থাকে । 

রামু অনান্য  বন্ধদের থেকে  পিছিয়ে  পড়ছে  দেখে খাওয়া  - দাওয়া  প্রায় ছেড়ে দিয়েছে । রামুর মা ছেলের এমন অবস্থা  দেখে অসুস্থ  হয়ে  পড়েছে। 
রথীন যেন দিকভ্রান্ত  পথিকের  ন্যায় বোবা হয়ে বসে থাকে। 
রামুর মুখের  দিকে তাকানো যায় না। ভারী ভারী গলায় রথীন রামুকে বলে -
- আমি তোর অযোগ্য  বাবা। আমাকে ক্ষমা করিস না। 

-সামান্য  আবদার যে বাবা মেটাতে  পারেনা  তার এই সংসারে থেকে  লাভ কী? 

রামু ছুটে আসে।  বাবার গলা জড়িয়ে  ধরে বলে -
-আর কাঁদবো  না বাবা। 
- আমি তোমাদের বাধ্য হয়ে থাকবো। দেখো বাবা আমি আর চিন্তা  করবো  না। কোনোদিন  এই ভাবে তোমাদের  প্রশ্ন করবো না। 

- বাড়িতে  বই আছে বাবা সেগুলোই পড়বো। 
-আমি একদিন  তোমার মুখ উজ্জ্বল  করবো  বাবা। 

সন্ধ্যা  হয়। রাত ঘনিয়ে আসে। সংসারে থমথমে  পরিবেশ । সেই মুহূর্তে রামুর মুখে  এই কথাশুনে রথীন আর তার স্ত্রী  ছেলেকে  জড়িয়ে  ধরে কাঁদতে  থাকে...


(গৃহশোভা পত্রিকাতে প্রকাশিত)    


 
৫.
অপেক্ষায় 

দিনেশ  আজ  অন্য দিনের  থেকে সকাল থেকে  ঘরে মায়ের ছবির  নীচে  বসে। তার বাবা মোহন  বাবু  স্কুল  শিক্ষক । কয়েক বছর   আগে দিনেশের ভাই অনিশের জন্মের  পর দীনেশর মা মারা যায়। তারপর  এই দুজনকে দেখা  শোনার জন্য মোহন বাবু  বিয়ে করেন। তারও এক মেয়ে। দুই  ছেলে এক মেয়ে নিয়ে মোহন বাবুর এখন  খুব সুখী । 
দিনেশ বড়ো  হয়েছে। ভাইও পড়াশোনা  ভালো। বাবার চাকরি  আর বেশি দিন  বাকি  নেই। দিনেশ আর অনিশ দুজনেই  বাবা - মা, বোনকে  ভালোবাসে। 
  দিনেশ তার নিজের  মা কে  ভুলতে পারে নি। প্রতিবছর এই মাতৃদিবসের জন্য অপেক্ষায়  থাকে দিনেশ। দিনেশের স্মৃতিতে জেগে ওঠে ছোটোবেলার আদর, তারাদের  সাথে গল্প, ঘুম পাড়ানি গান আরও  কতো কি। মোহন বাবু  তার ছেলেদের  সমস্ত আবদার মেটায়। কখনো   কোনো  কিছুতেই বাধা  দেয় না। 

মোহনবাবু প্রতিবছর  ঘরের দরজা  বন্ধ করে পুরনো  ছবি খানা বুকে  নিয়ে কাঁদে। কষ্ট  পায় আর বলে-

- কি গো আমায় ছেড়ে তো আজ ভালোই আছো? 
আমার কথা কি তোমার  মনে পড়ে না? 
আজ তোমার  দুই  ছেলে  বড়ো  হয়েছে।শুধু  তোমার  ছেলে গো। হয়তো  তোমার  মতো  আমি  তোমার  ছেলেদের  যত্ন নিতে পারিনি । তুমি ওদের প্রাণভরে  আশীর্বাদ  দিও। ওরাও  তোমাকে  আজ আমার মতো  স্মরণ  করে। 

কথা শেষ  হতে না হতেই  দরজায় অনিশ। সে বলে-

-বাবা তুমি কাঁদছো কেন? 
- না রে বাবা!  কাঁদছি না। 
- আবার লুকোচ্ছো? 
- না কিছুই  লুকোইনি। শুধু  তোমার মায়ের ছবি দেখছিলাম । 
- বাবা! 
অনিশকে জড়িয়ে  ধরে মোহন বাবু। দীর্ঘ খরার পরে মেঘ থেকে যেভাবে  বৃষ্টি  ঝরে। ঠিক সেই ভাবেই মোহন বাবু  চোখ দিয়ে প্রবল  বর্ষণ হচ্ছিলো। 
এই দীর্ঘ  সংসারজীবনে  ভরা সংসারে থেকেও  অন্ধকার  গভীর  রাতে  আজও  তাঁর  স্ত্রীর  অপেক্ষায়...!

(গৃহশোভাতে প্রকাশিত)   



 
৬.
মৃত্যুর  পাড়ে

কয়েক  বছর  ধরে সুবল  মাঠে আলুচাষ করে আসছে। এক বিঘা  জমি তার। দুই ছেলে আর দুই মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে তার ভরাট  সংসার। মাঠে দিনের পর দিন এই ভাবে  চাষ করে সুবল জীবন  নির্বাহ করে। ছেলে  মেয়ে দের পড়িয়েছে। এক মেয়ের  বিয়ে হয়েছে আর একমেয়ে উচ্চামাধ্যমিক পরীক্ষা  দিচ্ছিল  কিন্তু  মাঝে বিপত্তি  ঘটলো  কারণ  অজানা করোনা ভাইরাসের জন্য পরীক্ষা  পিছিয়ে  গেল। দুই  ছেলে  বাইরে থাকে। কোম্পানিতে ভালো  কাজ করে।
এককথায়  সুবলবাবুর জমজমাট  সংসার। কিন্তু এমনই  আনন্দের সময়ে সুবলবাবু  চুপচাপ  হয়ে পড়ে।একদম  চুপচাপ । কয়েক  দিন আগে তার মেয়ে তাকে বলে যে -

- বাবা আমার কি হবে?  আর কি পড়াশোনা  করা যাবে?  এখন কী করবো? 
সুবল বাবু অতসব কথা বোঝে না। সে সরল মানুষ  সেই হিসেবে  মেয়ে কে বলে -

- কেন রে মা?  সবার যা হবে তোর তাই হবে?এতো চিন্তা  কেন?
-তোর কিছুই  ভয় নেই। আমি আছি। 

বাপ বেটিতে কথা বলতে বলতে বাইরে  শোরগোল  পড়ে গেল। সুবল বাবু  মেয়েকে রেখে বাইরে গিয়ে অবাক হয়ে যায়। তার দুই ছেলেকে ঘিরে যুদ্ধাংদেহী  অবস্থা । সে এগিয়ে যায়। দুই ছেলে অঝোরে  কেঁদে  কেঁদে  বলছে -
- আমাদের  বাড়ি যেতে দাও। 
- সত্যি  বলছি আমরা কয়েক দিন ভালো খাই নি। ভালো  ঘুমোই  নি। 
- ডাক্তারই টেস্ট  করে ঢুকছি। 

- এই কথা শেষ  হতে না হতে  তাদের উপর  রে রে শব্দে  গ্রামের  মানুষ  তাদের চেপে ধরলো । সামান্য দুরত্ব  রেখে সুবলবাবু  বলেন  -
- দেখুন আমার ছেলেকে ছেড়ে দিন।
- ওরা আজ থেকে  ১৪ দিন ঘর বন্দী  থাকবে। আপনাদের সংস্পর্শে  আসবে না। এই কথা দিলাম। 

মোটামুটি  নেতাদের  সঙ্গে  একটা  রফাদফা  হয়ে যায় টাকার অঙ্কে ।ছেলেরা বাড়ি যায়। 

আজ বিকেলে আনন্দে  সুবলবাবুর পরিবার  মেতে উঠেছে। কিন্তু  ঘটনা ঘটলো  বড়সড়  রকমের। সুবল বাবু  জ্বরে  পড়েছে। কাশিও আছে। কি হবে সবাই চিন্তায় পড়ে যায়। মেয়ে একটু চালাক তাই হাসপাতালে  পরের দিন নিয়ে গিয়ে করোনার পরীক্ষায়  নেগেটিভ  দেখা দেয় একং দুএক দিনের  মধ্যে  বাড়ি চলে আসে। 
সন্ধ্যার  সময় থেকে মাইকিং  করা হয় যে আমফান  আসছে ১৮০ - ২০০ কিমি বেগে। সেই কারনে সুবল বাবু  মুচড়ে পড়ে। স্ত্রীর সঙ্গে  কথা বলতে বলতে ঝড় ঘনিয়ে আসে। মাটির ঘর। বেশ মজবুত। কিন্তু  হঠাৎ  ঝড়ে  ঘর ভেঙে  যায়। দুই ছেলে কোথায় যাবে ভেবে  পায় না। তাই করোনা  থেকে   বাঁচার  আগে আরফান  থেকে  বাঁচাতে  হবে। এই কথা আলোচন  হতে হতে সুবল বাবুর এক ছেলের  মাথায় একটি নারকেল  গাছ  ভেঙে  পড়ায় সে ছটপট করতে থাকে।বাইরে বৃষ্টি তার  সঙ্গে  ভীষণ  ঝড়ে  কঠিন পাথর  হয়ে নিরুপায়  হয়ে ছেলে মেয়ে বউ অসময়ে সুবলবাবুকে ঘিরে বসে থাকে,আর কেঁদে  যায় সেই একই সুরে।

(গৃ্হশোভাতে প্রকাশিত)   




৭.
অক্ষমা


বিনয় বিকলাঙ্গ  শরীরে  একটা  থালা  নিয়ে ত্রান শিবিরের  সামনে কাঁদছে। বিনয়ের বাবা নেই এই রকম আয়েলা ঝড়ে  রাক্ষুসে  নদীটা  খেয়ে ফেলেছে তার বাবাকে। মায়ের সাথে  সে থাকে। তার এখন  বয়স  ১৫ বছর। মাধ্যমিক  পরীক্ষা  দিয়েছে গেরামের স্কুল  থেকে । মা কয়েকটি  বাড়িতে  কাজ করে দুটো  পেট চালিয়ে নেয়। 

শ্রাবণ ধারার ন্যায়  বিনয়ের  অসীম ধৈর্য্য । ছোট্ট  বেলায়  দেওয়াল পড়ে একটা  পা খোঁড়া এবং প্রায় শরীরের কিছু  অংশ  অকেজো  হয়ে গেছে । তবুও  বিনয় জীবনের  সাথে  এককভাবে  মায়ের দুঃখ  নিয়ে লড়াই  করে  যাচ্ছে। 

আয়েলাতে  ত্রান তহবিল  থেকে  একটা  পলিথিন  ছাড়া আর কিছুই পায়নি।সেই পলিথিন  দিয়ে দুটো  প্রাণী  থাকার একটা  সুন্দর  নিবাস  তৈরি  করেছিলো । বেশ সুখেই ছিলো  বিনয় ও তার মা। 

সেই সুখ কেড়ে নিলো আবার ভীষণ  ঝড়ের তান্ডবে। সেই সাধের ঘর উড়ে  গেছে। মায়ের উপর  গাছের  খণ্ড পড়ে মা অসুস্থ  হয়ে  পড়েছে। বিনয় দিশাহারা  হয়ে খোঁড়া  পায়ে এদিকে  সেদিকে যাচ্ছে। ত্রান শিবিরের  বারান্দায়  মা শুয়ে। 

একথা  ভাবতে  ভাবতে  তার থালায় ভাত আর সবজির  তরকারি  নিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বসে। মা'কে কেঁদে  কেঁদে  বলে -
- উঠে  পড়ো। খাইয়ে দিচ্ছি খেয়ে নাও। 
মা বিনয়কে মুহূর্তে  জড়িয়ে  ধরে আর দুজনেই  কাঁদতে  থাকে। 
বিনয় মা'কে খাইয়ে দেয়। বিনয়ও খায়। বিনয়ের  মা ধরা গলায় বলে -
- আমাকে ক্ষমা  করিস বাবা। আমি তোকে  দুমুঠো  ভাত  দিতে পারিনি। থাকার জায়গা টুকু দিতে পারিনি । 
বিনয় চোখের  জলে  নীরবে  অদ্ভুত ভাবে ত্রান  শিবিরের উঠান ঘেঁষে  খোলা আকাশের  দিকে তাকিয়ে...

 
৮.
 ভাগ্য


প্রতাপ ভালো  ছেলে। অনিমেষ  তার ভালো  বন্ধু । অনিমেষের বাড়ির অবস্থা  প্রতাপের চেয়ে ভালো । প্রতাপ  পড়াশোনায় ভালো  হলেও অনিমেষ  তার টাকার  জোরে একটি  চাকরিও পেয়েছ। প্রতাপ পায়নি । 

প্রতাপের বাবা নেই।মা'ই তার একমাত্র  ভরসা । একটা  জুতো দোকানে  প্রতাপ কাছ করে যা পায় তাতে তাদের মোটামুটি  চলে যায়। 

একদিন  প্রতাপের মা আবদার করে প্রতাপের কাছে। 
- মরার আগে তোর বৌ দেখে যেতে চাই। 
প্রতাপ চুপচাপ  হয়ে যায়। সে অনিমেষকে বলে। অনিমেষ  বন্ধুকে  বলে -
- মা যখন  বলছে তাই করে নে। মায়ের  আবদার। রাখতেই হবে। 

প্রতাপ অনিমেষের কথা শেষ  হতে না হতে বাড়ি চলে যায়। অনিমেষ  ভাবে ' প্রতাপের এই অবস্থায়  পাশে দাঁড়ানো দরকার '। প্রতাপ তার মায়ের কাছে যায়। মা তাকে দেখে ভালো  - মন্দ নিয়ে বলে -
- প্রতাপ আমি আর ক'দিন?  ছেলেটা  চাকরি  পেলো না। সারাদিন  কি ভাবে  থাকে আমি মা হয়ে বুঝি। তাই ওর একটা  বিয়ের  ব্যবস্থা  করো। তোমার কথা তো শোনে তাই তুমি একটু রাজি  করাও। 

অনিমেষ  আর কিছুই  বলতে পারলো  না। সে ভাবলো - সত্যিই  তো মাসিমা তো নেহাত  ভুল কিছু বলছে না। ওকে বোঝাতে হবে। কিন্তু  পরে মাসিমাকে জিজ্ঞাসা  করলো -
- মাসিমা , প্রতাপ কোথায়?  ও বাড়ি আসেনি ? 
- না তো। তোমার সঙ্গে  দেখা হয় নি? 
- না মানে, ও তো আমার কাছে গিয়েছিল । কিন্তু অনেকক্ষণ  আগেই চলে এসেছে। 

প্রতাপের মা অনিমেষকে  অনুরোধ করে প্রতাপকে খুঁজে  আনার জন্য। হঠাৎ  বাইরে  চিৎকার । অনিমেষ  বেরিয়ে দেখে কয়েকজন  ধরাধরি  করে প্রতাপকে নিয়ে আসছে। সারা শরীরে রক্ত। অনিমেষ  ছুটে  যায়। জড়িয়ে  ধরে। অপেক্ষা  না করে হাসপাতালে  নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু কে অনিমেষ  তার পরিচয়  দিলে তাড়াতাড়ি  চিকিৎসার  ব্যবস্থা   শুরু করে। 
এদিকে তার মা ছেলের  চিন্তায় বিছানা  ধরে।   


বড়ো দূর্ঘটনা থেকে অনিমেষ  প্রতাপকে  বাঁচিয়ে  আনলে প্রতাপ  অনিমেষকে বলে -
- মা'এর জন্য আমাকে  বিয়ে করতে  হবে। তুই মেয়ে দেখ। 

অনিমেষ  প্রতাপকে  জড়িয়ে  ধরলো । আর বললো  -
- এটাই  তো ছেলের  উপযুক্ত  কাজ হবে। তুই মা'য়ের  সত্যিই কারের ছেলে । 

অনিমেষ  আর প্রতাপ বাড়ি আসে। মায়ের কাছে যায় প্রতাপ।  মায়ের সারা শরীর  ঠান্ডা। মা'কে  জড়িয়ে  ধরে  কাঁদে। অনিমেষ  নির্বাক হয়ে প্রতাপের দিকে  চেয়ে।

(আকাশবাণী গীতাঞ্জলিতে প্রচারিত) 



৯.
 মায়ের ভালোবাসা 



অজ পাড়াগাঁ । দারিদ্র্যতা বুকে নিয়ে  আশিষ আর তার মা একটা  ঝুপড়ি ঘরে থাকে।আশিষ মাকে নিয়ে বেশ গর্বিত । সারাদিন সবজির ঝুড়ি  মাথায় নিয়ে বাজারে বাজারে ঘোরে আর বিক্রি  করে। মায়ের চিন্তা  বাড়ে। 

আশিষ একটা  স্কুলে পড়ে। পড়াশোনায় খুব ভালো । মায়ের কষ্ট  সে অনুভব  করে। মাঝে  মাঝে  মা কে সাহায্য  করে। রাতে কখনো কখনো  উপোস  করে থাকে। মা ছেলের  ভালোবাসায় কোনো  শূন্যস্থান  নেই । 
আশিষ বড়ো  হলো । চাকরি  পেল। মাকে নিয়ে চলে গেল। 
আশিষের বিয়ে হলো । মায়ের  আনন্দ বাড়তে থাকলো। 

মায়ের ক্যান্সার । আশিষের বৌ মায়ের সেবা করে না। সে নীরবে  সবার দায়িত্ব  পালন  করে । 
মা মৃত্যু শয্যায়। আশিষের মাথায় হাত রাখে। বাড়তি ভালোবাসায় আশিষের চোখে  জল আসে। আর মাকে জড়িয়ে রাখে দুহাতে।

১০.
স্নেহ


অনির্বাণ  একটি গ্রামে  বাসকরে।বয়স  প্রায় ১০/১২ বছরের। অত্যন্ত গরীব  পরিবারের । বাবা আর মায়ের সাথে কেটেছে  তার দিন গুলি। ছয় ভাই বোনের মধ্যে ছোটো  সে। তবে দাদাদের দারিদ্র্যতা ছিলো  গভীর  কিন্তু  ভালোবাসার অভাব ছিল। মা ছিলো  তার একমাত্র  দর্শন ।
 
    পরিশ্রম  আর চেষ্টা  অনির্বানের অন্য ভাইদের তুলনায়  অনেক বেশি। তবে মনটা ছিলো  তার সহজ সরল। তাই এর জন্য অনেক কষ্ট  তাকে সহ্য করতে হয়েছে।
দীর্ঘ  পরিশ্রম  করে দুমুঠো  সাদা ভাত খেয়ে মায়ের আশীর্বাদে সে এম. পাশ করে।
এই পাশের পেছনে অনেক বাধা আর বিঘ্ন  ছিলো ।
শেষমেশ অনির্বাণ  চাকরি  পায়। বাবা ও  মা মারা যায়। সবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত  হয়। দুঃখ তাকে আরো সময়ে নিয়ে যায়।

আসলে ছোটো  থেকে  অনির্বাণ  অভাব যেমন পেয়েছে তেমনি স্নেহ কি তাও ঠিক বোঝে না।
এমনই  ভাবে এক স্নেহ চক্করে  পড়ে। ফলে স্নেহের  পরিবর্তে  মানসিক যন্ত্রণা  পেয়ে আবার ফিরে  আসে ।
কতজন  তাকে কতভাবে  নিয়ে খেলে  তার সরলতার মন নিয়ে।

একদিন অনির্বাণ  সত্যিকারের একজন পেলেন যে তার সমস্ত চাওয়া  আর পাওয়ার সাথে সাথে পুত্র স্নেহ  দিতে শুরু করে। 
অনির্বাণ  এতো বড়ো  আকাশের নীচে  সে একজনকেই পেয়ে আনন্দে  আত্মহারা হয়ে বলে "আমি
আমার স্নেহময়  বাবাকে  পেয়েছি"। অনির্বাণের সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে তাকে সস্নেহে জড়িয়ে ধরে।

১১.
প্রত্যাশা 



গ্রামময় জলের হাহাকার। নানান অসুখে  ঘিরে ফেলেছে গ্রাম।দেখালী গ্রামের একটা  পরিবারের দুজন সদস্য মারা যায়। সেই বাড়ির  ছেলে তার দুই ভাই বোন কে নিয়ে  এখন  বেঁচে  আছে। ছেলেটির নাম মুকুন্দ।
মুকুন্দ নিজে পড়াশোনা  করেনি । তবে ভাই ও বোনকে সে শত কষ্টের মধ্যে থেকেও ভালো স্কুলে  পড়াশোনা  করায়।
মুকুন্দ একদিন তার বোনের বিয়ে একটি সামান্য বাড়ির ছেলের  সাথে দিলেন। তবে ভাই কে নিয়ে এক সমস্যায়  পড়লে  সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

আর মুকুন্দ  বাড়ি যায়না। সে একা একা খোলা আকাশের নীচে  ঘুরে বেড়ায়। কিছুদিন  যাওয়ার  পর  মুকুন্দ ভীষণ  রোগে আক্রান্ত  হয়ে পড়ে।। হঠাৎ  ফেসবুকে  এক দাদার সাথে তার পরিচয়  হয়। সে দাদা মুকুন্দের কাছে আসে।
ভাই, বোন কেউই  যখন  আর তার খবর  নেয় না। তখন  মুকুন্দের প্রত্যাশা বাড়তে থাকে।  দাদার প্রতি অগাধ প্রত্যাশা  জন্মায় তার। হাসপাতালে  শুয়ে শুয়ে  মুকুন্দ যখন কাঁদছিল ঠি তখনই  সেই দাদা তার কাছে আসে। মুকুন্দ আনন্দে  দাদার কোলে মাথা রেখে সারা জীবনের  মতো  প্রত্যাশা  কে নিয়ে ঘুমিয়ে  পড়ে।