লেবেল

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২০

অণুগল্প /বিমল মণ্ডল


১.
স্রোত
 


আনন্দবাবু একটা  অফিসে  কাজ করেন। সামনের   সেপ্টেম্বরে তাঁর  রিটায়ার্ড । তবে অফিস  নিয়ে বেশি ব্যস্ত  থাকার ফলে সংসারে সময় দিতে ঠিক ততটা পারেন না। 
আনন্দ বাবুর স্ত্রী , এক মেয়ে, আর এক ছেলে। এককথায়  সুখের  সংসার  বলা যেতে পারে। 
স্ত্রী  অন্নপূর্ণা  সংসার সামলাতে  সামলাতে  চোখে মুখে  ক্লান্তির ছাপ ধরা পড়ে। অন্নপূর্ণা  স্বামী কে খুব ভালোবাসে। আর ছেলে -মেয়েকে নিয়ে তার বেশ  কাটে। ছেলে বিদেশে  থাকে। একটা  কোম্পানির  কাজ করে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। জামাই কলকাতার  পি. এস.  অফিসে  চাকরি  করে। তাই মেয়ে ও জামাই কলকাতার  একটা ফ্ল্যাটে থাকে। একটা  নাতিও হয়েছে । 

আনন্দবাবু আজ অফিস  থেকে ফেরেননি । অন্নপূর্ণা  ফোন করলে সুইচ স্টপ বারবার  বলছে। বিকেল গড়িয়ে  সন্ধ্যা  হয়ে এলো কিন্তু  আনন্দবাবু এখনো  পর্যন্ত  বাড়ি  এলেন না। অন্নপূর্ণার  ভয় বাড়তে লাগলো । পাড়ার  মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে  থাকে। স্বামী  বলতেই অজ্ঞান । তাই সময়ের স্রোতে   এদিক  সেদিক পায়চারি করতে লাগলো । 

চাঁদিনী রাতে একটু অদূরে  কে যেন হেঁটে  আসছেন।  অন্নপূর্ণা  এগিয়ে  যায় । সত্যিই  তার স্বামী কে দেখে চমকে  ওঠে । অন্নপূর্ণার গা , হাত, পা ঠান্ডা  হয়ে আসে। 
আনন্দ বাবুর  চোখে মুখে  দুঃখের  ছবি। নিরব- নিথর । অন্নপূর্ণা  স্বামীর  হাতধরে বাড়ি ফিরে। 
আনন্দবাবুকে আজ যেন অচেনা  পুরুষের  মতো লাগছে। স্বামীর এই অবস্থা দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগলো। নিজেকে  ঠিক রেখে অন্নপূর্ণা  এক গ্লাস  জল দিয়ে জিজ্ঞাসা  করতে থাকে-
-কি গো আজ  তোমাকে এমন লাগছে কেন?
-আজ আফিস থেকে  আসতে এতো দেরি হলো কেন?
-কি হয়েছে তোমার?

অন্নপূর্ণা  একেরপর এক প্রশ্ন করে যায় তা স্বামী  কে। কোনো  উত্তর  না দিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলো -
-আমি অন্নপূর্ণা  কে কি বলবো। ছেলে  মহারাষ্ট্রে  থাকে তার  মধ্যে  করোনা ভাইরাস  ধরা পড়েছে।

 ছেলের অফিস  থেকে ফোন করে জানিয়েছে। তাই আনন্দবাবু অফিসে  নিশ্চুপ হয়ে অন্যমনস্ক  ভাবে বসে ছিলো । কখন  সে অফিস  ছুটি  হয়েছে তার ধারণা নেই। তারপর  বুঝতে  পেরে দেরি করে বাড়ি  ফিরছিলেন। 
আনন্দবাবু  জানেন যে অন্নপূর্ণা স্বামী , পুত্র, কন্যা ছাড়া সে বাইরের জগৎ  সম্পর্কে  কিছুই  জানে না। বাড়ির  সমস্ত কাজ নিজেই করে থাকে। কাজের লোক সে রাখে না। নানান কষ্টের মধ্য  দিয়েও সে সংসার পরিচালনা  করে। 
তাই আনন্দবাবু কি ভাবে এই দুঃসংবাদ তার স্ত্রীকে  জানাবেন তা সে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ  একটা  ফোন এলে চমকে  উঠে  আনন্দবাবু। 

আনন্দবাবুর ফোন ধরার আগে অন্নপূর্ণা  ফোন ধরতে গেলে, তাকে ফোন ধরতে নিষেধ  করেন। 
অন্নপূর্ণার মধ্যে  সন্দেহ  জন্মায়। ভাবতে থাকে তার স্বামী  যেন কিছু লুকোচ্ছেন। আগ্রহ  বাড়তে থাকে জানার। তাই ফোনটা আনন্দবাবুর ধরার আগে অন্নপূর্ণা ঝাঁঝালো  গলায় বলে -
- তুমি অফিস  থেকে  এলে ,,একটু বিশ্রাম  করো। আমি ধরছি ফোনটা। 
আনন্দবাবুর  শরীর  শীতল হয়ে আসে।  ছেলের শরীরে  করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছে - এই কথা শুনলে অন্নপূর্ণা তো মারা যাবে তাই চিন্তা  করতে করতে  মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। 

এদিকে  অন্নপূর্ণা  ফোন ধরে হ্যালো  বলতেই
আনন্দবাবু অসুস্থ  হয়ে  পড়েন। 
ফোনের ওপাশ থেকে  ভেসে আসে মেয়ের কণ্ঠ 
- মা, কেমন আছো? 
-ভালো
-বাবা কেমন  আছে?
-খুব ভালো নেই। 
- তোরা সবাই ভালো  আছিস? 
-হ্যাঁ,তবে তোমার জামাই কাশছে আর তোমার নাতির জ্বর । 
- রক্ত পরীক্ষা  করেছিস?
- হ্যাঁ  গো । 
- সরকার  ঘোষণা  করেছেন  যে করোনা  ভাইরাস  চার দিকে  ছড়িয়ে পড়েছে। তাই জ্বর,  কাশি হলে সব পরীক্ষা  করে নিতে হবে। তাই করেছি। 
- ভাইয়ের  খবর নিয়েছো?  ওখানে তো অনেকের শরীরে  করোনা ভাইরাস  ধরা পড়েছে, এবং পুরো মহারাষ্ট্রে বহু লোক মারা গেছে। 

অন্নপূর্ণা চমকে ওঠে । তার সাথে সাথে আনন্দবাবুও ভয়ে এবং  আতঙ্কে  বিছানা  নিয়ে নেয়। অন্নপূর্ণা  ফোন কেটে দিয়ে স্বামীর কাছে ছুটে যায়। স্বামীর মাথায় হাত বোলাতে থাকে। আর বলতে থাকে -
- কি গো তোমার কি অসুবিধা  হচ্ছে?
- মেয়ে ফোন করেছিলো। 
- ছেলের  খবর  নিয়েছো?  কেমন আছে? সাবধানে  থাকতে বলে দিয়েছো তো?

অন্নপূর্ণার মুখে  ছেলের  কথা শুনতে শুনতে আনন্দবাবুর কথায় জড়তা চলে আসে। কিছু যেন বলতে চায় অন্নপূর্ণাকে। তবুও  জড়িয়ে  জড়িয়ে  বলে -
-তেলে ভানো লেই।
এই কথা শুনে  অন্নপূর্ণা যেন পাথর  হয়ে যায়। একটা আকাশ  মাথায় যেন তার ভেঙে  পড়ে। 
আনন্দবাবুর দুচোখ দিয়ে শুধু  জল পড়তে থাকে। রাত বাড়তে থাকে। 

কিচ্ছুক্ষণ পরেএকটা  ফোন আসে। অন্নপূর্ণা  নিজেকে  ঠিক  সামলে  নিয়ে নিজেই এসে ফোন ধরে-

-হ্যালো, কে বলছেন? 
ওপাশ থেকে  বলতে থাকে -
-আমি মহারাষ্ট্র  থেকে থানার বড়ো বাবু বলছি। 
অন্নপূর্ণা  চুপ হয়ে যায়। ফোন কানের কাছে রাখে
ফোনের ওধার  থেকে  বলে যাচ্ছেন-
-ছেলের শারীরিক  অবস্থার কথা। 

অন্নপূর্ণা  মুহূর্তের মধ্যে  স্বামীর পাশে বিছানা অজ্ঞান  হয়ে  পড়ে। ঠিক যতটা  আনন্দবাবু ভেবে ছিলেন  সেটাই হলো। আনন্দ বাবু স্ত্রীর  পাশে থেকে দু'জন দু'জন কে  জড়য়ে  দুঃখের  স্রোতে  ভেসে যায়। আর করুন  দৃষ্টিতে জানালার  বাইরের জ্যোৎস্নার আলোর দিকে তাকিয়ে  থাকেন।  


(গৃহশোভা পত্রিকাতে প্রকাশিত)   
      

২.
বিবেক

-কি গো খাতাতে কি করছো?
-না মানে একটা  হিসেব  কষছিলাম।
-কিসের?
-দিনের আর রাতের 

এই বলতে  বলতে শুভ্রা এগিয়ে আসে। আর বলে -
-তোমার অহংকার  হয় না?
-কেন?
- এই যে বললে?? 

জানো শুভ্র জীবনের  অনেকগুলো  অতীত  থাকে। তোমার আছে। আমার আছে। পৃথিবীর  সবার আছে। কিন্তু  নেই বিবেক। 

শুভ্রা চুপকরে অতীতের  কথা ভাবছিলো। মনে করছিলো  কলেজের  সেই পরেশ। পরেশ চৌধুরী । দারুণ  দেখতে  ছিলো। ৬ফিট লম্বা । শারীরিক  গঠন  অত্যাশ্চর্য । পড়াশোনায়ও ভালো  ছিলো।  যা দেখে মেয়েরা  প্রেমে পড়ে যায়। সেইসব গুণ পরেশের  মধ্যে  বহাল । 
সেই পরেশের  সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন  দেখেছিলো শুভ্রা। কিন্তু  পরেশ উচ্চশিক্ষা লাভের  জন্য  বিদেশে গিয়ে ফোন করতো  প্রায়।  কিন্তু  কিছুদিন  পরেশকে ফোনে  না পেয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত  নিতে  বাধ্য  করে শুভ্রা। 
স্বামী  কলেজের  অধ্যাপক । বেশ ভালোবাসে শুভ্রাকে। একছেলে বেশ সুখেই আছে বলা যায়। 
পরেশের  সাথে যে তার প্রেম ছিলো তা তার স্বামীকে জানাই নি। তাই বিবেকের  কথা শুনে চমকে  ওঠে  শুভ্রা। 
এদিক  তার স্বামী  বলে যায় -
-জানো শুভ্রা। মানুষ যে মিথ্যা  কথা বলে। সত্যটাকে লুকিয়ে  থাকে। তা কিন্তু  তার জীবনে  একদিন  হলেও  যন্ত্রণা  পাবে।  

শুভ্রা  স্বামী কে চা দেয়  । সেও এক কাপ নিয়ে বসে।  ততক্ষণে  ছেলেটা  জেগে উঠেছে । শুভ্রা  অন্যমনস্ক  ভাবে  রান্নাঘরে ছেলের  খাওয়ার  তৈরি  করে।  
শুভ্রার ফোনে একটা  অজানা  ফোন আসে। তখন  তার স্বামী   বলে -
-কি গো তোমার ফোন
-একটু ধরো।যাচ্ছি
-হ্যালো
ফোনের  ওপাশ  থেকে  একটা পুরুষ কণ্ঠ বলে -
-শুভ্রা আছে? 
-হ্যাঁ। আপনি  কে?
-আমি পরেশ। পরেশ চৌধুরী  
-ধরুন দিচ্ছি

শুভ্রা ফোনে কথা বলে। তার স্বামী  ছেলেকে নিয়ে বারান্দায়  যায়। মুহূর্তের মধ্যে 
শুভ্রার শরীরে  অন্ধকার  নেমে আসে। সারা শরীর  কেঁপে ওঠে  অজানা  ভয়ে। ফোনে অনর্গল  কথা বলে  যায় পরেশ।শুভ্রা নিশ্চুপ হয়ে বিছানায়  ঘামতে থাকে। তরতর করে প্রেসারটা বেড়ে যায়।
শুভ্রার স্বামী  ছুটে আসে। প্রেসারের ঔষধ  দেয়। শুভ্রা স্বামীর কোলে  মাথা রাখে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। 

ওপাশ থেকে  হ্যালো  হ্যালো  করে যায় পরেশ 
শুভ্রার বিবেক যেন প্রেম ও ভালোবাসার সাথে লড়াই করে।


(গৃ্হশোভা পত্রিকাতে প্রকাশিত)   


৩.
ভিখিরির দান


-কি রে বল্টু  কেমন আছিস?
-ভালো নেই গো মঙ্গল দাদা। 
-কেন রে?
-চারদিকে  শুধু  মৃত্যু  আর মৃত্যু । এর মধ্যে  ভালো  থাকবো কেমন করে? 
-তাতে তোর কী? তুই তো  ফুটপাতে  থাকিস। আর ভিক্ষা করে ছোটো  বোন এবং  মায়ের মোটামুটি  পেট চালাস। তোর কথা কেউ ভেবেছে? 


বল্টু  মঙ্গলের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে তারপর ভাবলো  যে ভিক্ষা করে হলেও  একবেলা  খেয়ে বাঁচে আছি। কিন্তু  করোনা  সংক্রমণের  জেরে কত মানুষ  মারা যাচ্ছে। কত মানুষ  অনাহারে আছে। তাদের কি হবে?  এইসব কথা ভাবতে  ভাবতে চোখ দিয়ে জল পড়তে  লাগলো । মঙ্গল  বল্টুর চুপচাপ  থাকা দেখে বলল-
-কি রে চুপ করে গেলি কেন?বল, কি করবি?
বল্টু নিচের  দিকে মুখ করে  চুপি চুপি  কাঁদছিল। মঙ্গল  দু'হাত দিয়ে মুখটা তুলতেই দেখতে  পায় যে বল্টু  কাঁদছে। 
আসলে বল্টু ছোটো  থেকেই মায়া- মমতা, স্নেহ  - ভালোবাসা  মায়ের থেকে পেয়েছে। জানে সে  অভাবের  কি জ্বালা । অনাহারে  থাকার কষ্ট । যদিও  ভিক্ষা করে  সংসার চালায়।অভাবের  জন্য  অক্ষরজ্ঞান  নেই। সব কষ্ট  নিজেই সহ্য করে। মা আর বোন কে ভালো রাখতে  পেরেছে। স্টেশনে , ট্রেনে  সমস্ত যাত্রী  একবাক্যে বল্টু কে চেনে।বল্টু  গরীব  ভিখিরি  হলেও  সে পরোপকারী। মঙ্গল  ও বল্টু একই পাড়াতে থাকে। মঙ্গল  বল্টুকে খুব ভালোবাসে। তার চোখে  জল দেখে  মঙ্গল অবাক  হয়ে 
বলে - 
- কি রে কাঁদছিস  কেন?কি হয়েছে  তোর?
- জানি না মঙ্গলদা? 
-আমায় বল?
-মঙ্গলদা কি  হবে এই পৃথিবীর? আমরা আদৌ বেঁচে থাকবো তো? 
এই কথা বলতে বলতে মঙ্গলের কাঁধে  নিজের মাথা চাপিয়ে কাঁদতে  লাগলো । 

হঠাৎ  দেখে একটা ছোট্ট  শিশু  তার মায়ের  কোলে। আর একটি  তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে । রাস্তা  শুনশান  লকডাউনের  জন্য। ওরা বাঁকুড়া  থেকে হেঁটে হেঁটে  পূর্ব  মেদিনীপুর  আসছে। ওরা পরিয়ারী শ্রমিক । কয়েকদিন কাজ না থাকায় বসে বসে  ছিলো । হাতে যেটুকু  টাকা ছিলো  সব শেষ  হয়ে যায়।ওখানে কার প্রশাসন  বলে দিয়েছে  - যে যার জেলায়  ফিরে যেতে।তারা দায়িত্ব  নিতে পারবে না।তাই বাড়ি যাচ্ছে।    ছোটো  ছোটো  দুটো  শিশু  না খেয়ে আছে। রাস্তায়  দোকান ও নেই। 
বল্টু আর মঙ্গলের  কাছে এসে ওরা  দাঁড়ায় । বল্টু সোজা  হয়ে চোখ তুলে দেখে চারজন তার কাছে। 
বল্টু  অবাক  হয়ে জিজ্ঞেস  করে -
-কে আপনারা ? কোথায় যাবেন? 
ছোট্ট শিশুটি তার মার বলার আগে বলে -
-দাদা, দুটো  খেতে দেবে?  কয়েকদিন খাইনি দাদা। 
বল্টু  পিছিয়ে  আসে। মুহূর্তে  যেন সমস্ত  চাওয়া -পাওয়া, ইচ্ছে -অনিচ্ছা, আশা- নিরাশায় স্তব্ধ  হয়ে গেল। এগিয়ে এলো  বল্টু। সারাদিনের  ভিক্ষে যতটুকু  সম্ভব , ততটুকুই ওদেরকে দিয়ে দিল। ওরা আনন্দে  খাচ্ছে আর বিল্টু ওদের দিকে তাকিয়ে ... 

(আকাশবাণীতে প্রচারিত-২৩/৪/ ২০২০)



৪.
প্রশ্ন


রথীন দাস আর তার ছেলে রামু  চুপচাপ মাটির  ঘরের  উঠানে  বসে । রথীনের স্ত্রী দরজার কাছে দাঁডিয়ে দাঁড়িয়ে  কাঁদছে । রামু মাঝে মাঝে  বাবাকে  বলে -
- বাবা আমি কি আর পড়বো না?
- এখন  কি করবো  বাবা? 

রথীন ছেলের  কথার উত্তর  দিতে পারে না। আসলে রথীনের ছেলে  ও বৌ নিয়ে তিন জনের সংসার। সে টোটো  চালিয়ে  সংসার দেখে। ছেলেটা  মাধ্যমিক  দেবে কিন্তু  দীর্ঘ  লকডাউনের  ফলে বাড়িতে  বসে আছে। রেশন থেকে  যতটা  খাদ্য সামগ্রি নিয়ে আসে সেই দিয়ে পেট চালায়। কাজকর্ম  সব বন্ধ। 
দিশাহারা  রথীন যেন কয়েকদিনে খিটখিটে  হয়ে  গেছে । 
এদিকে  ছেলেটার পড়াশোনা  বন্ধ। কেননা স্কুল  বন্ধ থাকার ফলে সারাক্ষণ  রামু বাড়িতে  বসে থাকে। কিন্তু  সরকার  অনলাইনে  ক্লাস  নেওয়ার  কথা ঘোষণা  করেছেন। তাই রামুর স্কুলেও অনলাইন  ক্লাস  চালু হয়েছে। 
এদিকে  রামুর বাড়িতে  কোনো  মোবাইল  ফোন না থাকায়  অনলাইন  ক্লাস  থেকে  পিছিয়ে  পড়ছে। রথীনও জানে। রথীন চেষ্টাও করেছে তাতে রথীনের কিছু লাভ হয়নি। কারণ  লকডাউনে  সমস্ত  দোকান  বন্ধ। তাই রথীন চুপচাপ  থাকে । 

রামু অনান্য  বন্ধদের থেকে  পিছিয়ে  পড়ছে  দেখে খাওয়া  - দাওয়া  প্রায় ছেড়ে দিয়েছে । রামুর মা ছেলের এমন অবস্থা  দেখে অসুস্থ  হয়ে  পড়েছে। 
রথীন যেন দিকভ্রান্ত  পথিকের  ন্যায় বোবা হয়ে বসে থাকে। 
রামুর মুখের  দিকে তাকানো যায় না। ভারী ভারী গলায় রথীন রামুকে বলে -
- আমি তোর অযোগ্য  বাবা। আমাকে ক্ষমা করিস না। 

-সামান্য  আবদার যে বাবা মেটাতে  পারেনা  তার এই সংসারে থেকে  লাভ কী? 

রামু ছুটে আসে।  বাবার গলা জড়িয়ে  ধরে বলে -
-আর কাঁদবো  না বাবা। 
- আমি তোমাদের বাধ্য হয়ে থাকবো। দেখো বাবা আমি আর চিন্তা  করবো  না। কোনোদিন  এই ভাবে তোমাদের  প্রশ্ন করবো না। 

- বাড়িতে  বই আছে বাবা সেগুলোই পড়বো। 
-আমি একদিন  তোমার মুখ উজ্জ্বল  করবো  বাবা। 

সন্ধ্যা  হয়। রাত ঘনিয়ে আসে। সংসারে থমথমে  পরিবেশ । সেই মুহূর্তে রামুর মুখে  এই কথাশুনে রথীন আর তার স্ত্রী  ছেলেকে  জড়িয়ে  ধরে কাঁদতে  থাকে...


(গৃহশোভা পত্রিকাতে প্রকাশিত)    


 
৫.
অপেক্ষায় 

দিনেশ  আজ  অন্য দিনের  থেকে সকাল থেকে  ঘরে মায়ের ছবির  নীচে  বসে। তার বাবা মোহন  বাবু  স্কুল  শিক্ষক । কয়েক বছর   আগে দিনেশের ভাই অনিশের জন্মের  পর দীনেশর মা মারা যায়। তারপর  এই দুজনকে দেখা  শোনার জন্য মোহন বাবু  বিয়ে করেন। তারও এক মেয়ে। দুই  ছেলে এক মেয়ে নিয়ে মোহন বাবুর এখন  খুব সুখী । 
দিনেশ বড়ো  হয়েছে। ভাইও পড়াশোনা  ভালো। বাবার চাকরি  আর বেশি দিন  বাকি  নেই। দিনেশ আর অনিশ দুজনেই  বাবা - মা, বোনকে  ভালোবাসে। 
  দিনেশ তার নিজের  মা কে  ভুলতে পারে নি। প্রতিবছর এই মাতৃদিবসের জন্য অপেক্ষায়  থাকে দিনেশ। দিনেশের স্মৃতিতে জেগে ওঠে ছোটোবেলার আদর, তারাদের  সাথে গল্প, ঘুম পাড়ানি গান আরও  কতো কি। মোহন বাবু  তার ছেলেদের  সমস্ত আবদার মেটায়। কখনো   কোনো  কিছুতেই বাধা  দেয় না। 

মোহনবাবু প্রতিবছর  ঘরের দরজা  বন্ধ করে পুরনো  ছবি খানা বুকে  নিয়ে কাঁদে। কষ্ট  পায় আর বলে-

- কি গো আমায় ছেড়ে তো আজ ভালোই আছো? 
আমার কথা কি তোমার  মনে পড়ে না? 
আজ তোমার  দুই  ছেলে  বড়ো  হয়েছে।শুধু  তোমার  ছেলে গো। হয়তো  তোমার  মতো  আমি  তোমার  ছেলেদের  যত্ন নিতে পারিনি । তুমি ওদের প্রাণভরে  আশীর্বাদ  দিও। ওরাও  তোমাকে  আজ আমার মতো  স্মরণ  করে। 

কথা শেষ  হতে না হতেই  দরজায় অনিশ। সে বলে-

-বাবা তুমি কাঁদছো কেন? 
- না রে বাবা!  কাঁদছি না। 
- আবার লুকোচ্ছো? 
- না কিছুই  লুকোইনি। শুধু  তোমার মায়ের ছবি দেখছিলাম । 
- বাবা! 
অনিশকে জড়িয়ে  ধরে মোহন বাবু। দীর্ঘ খরার পরে মেঘ থেকে যেভাবে  বৃষ্টি  ঝরে। ঠিক সেই ভাবেই মোহন বাবু  চোখ দিয়ে প্রবল  বর্ষণ হচ্ছিলো। 
এই দীর্ঘ  সংসারজীবনে  ভরা সংসারে থেকেও  অন্ধকার  গভীর  রাতে  আজও  তাঁর  স্ত্রীর  অপেক্ষায়...!

(গৃহশোভাতে প্রকাশিত)   



 
৬.
মৃত্যুর  পাড়ে

কয়েক  বছর  ধরে সুবল  মাঠে আলুচাষ করে আসছে। এক বিঘা  জমি তার। দুই ছেলে আর দুই মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে তার ভরাট  সংসার। মাঠে দিনের পর দিন এই ভাবে  চাষ করে সুবল জীবন  নির্বাহ করে। ছেলে  মেয়ে দের পড়িয়েছে। এক মেয়ের  বিয়ে হয়েছে আর একমেয়ে উচ্চামাধ্যমিক পরীক্ষা  দিচ্ছিল  কিন্তু  মাঝে বিপত্তি  ঘটলো  কারণ  অজানা করোনা ভাইরাসের জন্য পরীক্ষা  পিছিয়ে  গেল। দুই  ছেলে  বাইরে থাকে। কোম্পানিতে ভালো  কাজ করে।
এককথায়  সুবলবাবুর জমজমাট  সংসার। কিন্তু এমনই  আনন্দের সময়ে সুবলবাবু  চুপচাপ  হয়ে পড়ে।একদম  চুপচাপ । কয়েক  দিন আগে তার মেয়ে তাকে বলে যে -

- বাবা আমার কি হবে?  আর কি পড়াশোনা  করা যাবে?  এখন কী করবো? 
সুবল বাবু অতসব কথা বোঝে না। সে সরল মানুষ  সেই হিসেবে  মেয়ে কে বলে -

- কেন রে মা?  সবার যা হবে তোর তাই হবে?এতো চিন্তা  কেন?
-তোর কিছুই  ভয় নেই। আমি আছি। 

বাপ বেটিতে কথা বলতে বলতে বাইরে  শোরগোল  পড়ে গেল। সুবল বাবু  মেয়েকে রেখে বাইরে গিয়ে অবাক হয়ে যায়। তার দুই ছেলেকে ঘিরে যুদ্ধাংদেহী  অবস্থা । সে এগিয়ে যায়। দুই ছেলে অঝোরে  কেঁদে  কেঁদে  বলছে -
- আমাদের  বাড়ি যেতে দাও। 
- সত্যি  বলছি আমরা কয়েক দিন ভালো খাই নি। ভালো  ঘুমোই  নি। 
- ডাক্তারই টেস্ট  করে ঢুকছি। 

- এই কথা শেষ  হতে না হতে  তাদের উপর  রে রে শব্দে  গ্রামের  মানুষ  তাদের চেপে ধরলো । সামান্য দুরত্ব  রেখে সুবলবাবু  বলেন  -
- দেখুন আমার ছেলেকে ছেড়ে দিন।
- ওরা আজ থেকে  ১৪ দিন ঘর বন্দী  থাকবে। আপনাদের সংস্পর্শে  আসবে না। এই কথা দিলাম। 

মোটামুটি  নেতাদের  সঙ্গে  একটা  রফাদফা  হয়ে যায় টাকার অঙ্কে ।ছেলেরা বাড়ি যায়। 

আজ বিকেলে আনন্দে  সুবলবাবুর পরিবার  মেতে উঠেছে। কিন্তু  ঘটনা ঘটলো  বড়সড়  রকমের। সুবল বাবু  জ্বরে  পড়েছে। কাশিও আছে। কি হবে সবাই চিন্তায় পড়ে যায়। মেয়ে একটু চালাক তাই হাসপাতালে  পরের দিন নিয়ে গিয়ে করোনার পরীক্ষায়  নেগেটিভ  দেখা দেয় একং দুএক দিনের  মধ্যে  বাড়ি চলে আসে। 
সন্ধ্যার  সময় থেকে মাইকিং  করা হয় যে আমফান  আসছে ১৮০ - ২০০ কিমি বেগে। সেই কারনে সুবল বাবু  মুচড়ে পড়ে। স্ত্রীর সঙ্গে  কথা বলতে বলতে ঝড় ঘনিয়ে আসে। মাটির ঘর। বেশ মজবুত। কিন্তু  হঠাৎ  ঝড়ে  ঘর ভেঙে  যায়। দুই ছেলে কোথায় যাবে ভেবে  পায় না। তাই করোনা  থেকে   বাঁচার  আগে আরফান  থেকে  বাঁচাতে  হবে। এই কথা আলোচন  হতে হতে সুবল বাবুর এক ছেলের  মাথায় একটি নারকেল  গাছ  ভেঙে  পড়ায় সে ছটপট করতে থাকে।বাইরে বৃষ্টি তার  সঙ্গে  ভীষণ  ঝড়ে  কঠিন পাথর  হয়ে নিরুপায়  হয়ে ছেলে মেয়ে বউ অসময়ে সুবলবাবুকে ঘিরে বসে থাকে,আর কেঁদে  যায় সেই একই সুরে।

(গৃ্হশোভাতে প্রকাশিত)   




৭.
অক্ষমা


বিনয় বিকলাঙ্গ  শরীরে  একটা  থালা  নিয়ে ত্রান শিবিরের  সামনে কাঁদছে। বিনয়ের বাবা নেই এই রকম আয়েলা ঝড়ে  রাক্ষুসে  নদীটা  খেয়ে ফেলেছে তার বাবাকে। মায়ের সাথে  সে থাকে। তার এখন  বয়স  ১৫ বছর। মাধ্যমিক  পরীক্ষা  দিয়েছে গেরামের স্কুল  থেকে । মা কয়েকটি  বাড়িতে  কাজ করে দুটো  পেট চালিয়ে নেয়। 

শ্রাবণ ধারার ন্যায়  বিনয়ের  অসীম ধৈর্য্য । ছোট্ট  বেলায়  দেওয়াল পড়ে একটা  পা খোঁড়া এবং প্রায় শরীরের কিছু  অংশ  অকেজো  হয়ে গেছে । তবুও  বিনয় জীবনের  সাথে  এককভাবে  মায়ের দুঃখ  নিয়ে লড়াই  করে  যাচ্ছে। 

আয়েলাতে  ত্রান তহবিল  থেকে  একটা  পলিথিন  ছাড়া আর কিছুই পায়নি।সেই পলিথিন  দিয়ে দুটো  প্রাণী  থাকার একটা  সুন্দর  নিবাস  তৈরি  করেছিলো । বেশ সুখেই ছিলো  বিনয় ও তার মা। 

সেই সুখ কেড়ে নিলো আবার ভীষণ  ঝড়ের তান্ডবে। সেই সাধের ঘর উড়ে  গেছে। মায়ের উপর  গাছের  খণ্ড পড়ে মা অসুস্থ  হয়ে  পড়েছে। বিনয় দিশাহারা  হয়ে খোঁড়া  পায়ে এদিকে  সেদিকে যাচ্ছে। ত্রান শিবিরের  বারান্দায়  মা শুয়ে। 

একথা  ভাবতে  ভাবতে  তার থালায় ভাত আর সবজির  তরকারি  নিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বসে। মা'কে কেঁদে  কেঁদে  বলে -
- উঠে  পড়ো। খাইয়ে দিচ্ছি খেয়ে নাও। 
মা বিনয়কে মুহূর্তে  জড়িয়ে  ধরে আর দুজনেই  কাঁদতে  থাকে। 
বিনয় মা'কে খাইয়ে দেয়। বিনয়ও খায়। বিনয়ের  মা ধরা গলায় বলে -
- আমাকে ক্ষমা  করিস বাবা। আমি তোকে  দুমুঠো  ভাত  দিতে পারিনি। থাকার জায়গা টুকু দিতে পারিনি । 
বিনয় চোখের  জলে  নীরবে  অদ্ভুত ভাবে ত্রান  শিবিরের উঠান ঘেঁষে  খোলা আকাশের  দিকে তাকিয়ে...

 
৮.
 ভাগ্য


প্রতাপ ভালো  ছেলে। অনিমেষ  তার ভালো  বন্ধু । অনিমেষের বাড়ির অবস্থা  প্রতাপের চেয়ে ভালো । প্রতাপ  পড়াশোনায় ভালো  হলেও অনিমেষ  তার টাকার  জোরে একটি  চাকরিও পেয়েছ। প্রতাপ পায়নি । 

প্রতাপের বাবা নেই।মা'ই তার একমাত্র  ভরসা । একটা  জুতো দোকানে  প্রতাপ কাছ করে যা পায় তাতে তাদের মোটামুটি  চলে যায়। 

একদিন  প্রতাপের মা আবদার করে প্রতাপের কাছে। 
- মরার আগে তোর বৌ দেখে যেতে চাই। 
প্রতাপ চুপচাপ  হয়ে যায়। সে অনিমেষকে বলে। অনিমেষ  বন্ধুকে  বলে -
- মা যখন  বলছে তাই করে নে। মায়ের  আবদার। রাখতেই হবে। 

প্রতাপ অনিমেষের কথা শেষ  হতে না হতে বাড়ি চলে যায়। অনিমেষ  ভাবে ' প্রতাপের এই অবস্থায়  পাশে দাঁড়ানো দরকার '। প্রতাপ তার মায়ের কাছে যায়। মা তাকে দেখে ভালো  - মন্দ নিয়ে বলে -
- প্রতাপ আমি আর ক'দিন?  ছেলেটা  চাকরি  পেলো না। সারাদিন  কি ভাবে  থাকে আমি মা হয়ে বুঝি। তাই ওর একটা  বিয়ের  ব্যবস্থা  করো। তোমার কথা তো শোনে তাই তুমি একটু রাজি  করাও। 

অনিমেষ  আর কিছুই  বলতে পারলো  না। সে ভাবলো - সত্যিই  তো মাসিমা তো নেহাত  ভুল কিছু বলছে না। ওকে বোঝাতে হবে। কিন্তু  পরে মাসিমাকে জিজ্ঞাসা  করলো -
- মাসিমা , প্রতাপ কোথায়?  ও বাড়ি আসেনি ? 
- না তো। তোমার সঙ্গে  দেখা হয় নি? 
- না মানে, ও তো আমার কাছে গিয়েছিল । কিন্তু অনেকক্ষণ  আগেই চলে এসেছে। 

প্রতাপের মা অনিমেষকে  অনুরোধ করে প্রতাপকে খুঁজে  আনার জন্য। হঠাৎ  বাইরে  চিৎকার । অনিমেষ  বেরিয়ে দেখে কয়েকজন  ধরাধরি  করে প্রতাপকে নিয়ে আসছে। সারা শরীরে রক্ত। অনিমেষ  ছুটে  যায়। জড়িয়ে  ধরে। অপেক্ষা  না করে হাসপাতালে  নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু কে অনিমেষ  তার পরিচয়  দিলে তাড়াতাড়ি  চিকিৎসার  ব্যবস্থা   শুরু করে। 
এদিকে তার মা ছেলের  চিন্তায় বিছানা  ধরে।   


বড়ো দূর্ঘটনা থেকে অনিমেষ  প্রতাপকে  বাঁচিয়ে  আনলে প্রতাপ  অনিমেষকে বলে -
- মা'এর জন্য আমাকে  বিয়ে করতে  হবে। তুই মেয়ে দেখ। 

অনিমেষ  প্রতাপকে  জড়িয়ে  ধরলো । আর বললো  -
- এটাই  তো ছেলের  উপযুক্ত  কাজ হবে। তুই মা'য়ের  সত্যিই কারের ছেলে । 

অনিমেষ  আর প্রতাপ বাড়ি আসে। মায়ের কাছে যায় প্রতাপ।  মায়ের সারা শরীর  ঠান্ডা। মা'কে  জড়িয়ে  ধরে  কাঁদে। অনিমেষ  নির্বাক হয়ে প্রতাপের দিকে  চেয়ে।

(আকাশবাণী গীতাঞ্জলিতে প্রচারিত) 



৯.
 মায়ের ভালোবাসা 



অজ পাড়াগাঁ । দারিদ্র্যতা বুকে নিয়ে  আশিষ আর তার মা একটা  ঝুপড়ি ঘরে থাকে।আশিষ মাকে নিয়ে বেশ গর্বিত । সারাদিন সবজির ঝুড়ি  মাথায় নিয়ে বাজারে বাজারে ঘোরে আর বিক্রি  করে। মায়ের চিন্তা  বাড়ে। 

আশিষ একটা  স্কুলে পড়ে। পড়াশোনায় খুব ভালো । মায়ের কষ্ট  সে অনুভব  করে। মাঝে  মাঝে  মা কে সাহায্য  করে। রাতে কখনো কখনো  উপোস  করে থাকে। মা ছেলের  ভালোবাসায় কোনো  শূন্যস্থান  নেই । 
আশিষ বড়ো  হলো । চাকরি  পেল। মাকে নিয়ে চলে গেল। 
আশিষের বিয়ে হলো । মায়ের  আনন্দ বাড়তে থাকলো। 

মায়ের ক্যান্সার । আশিষের বৌ মায়ের সেবা করে না। সে নীরবে  সবার দায়িত্ব  পালন  করে । 
মা মৃত্যু শয্যায়। আশিষের মাথায় হাত রাখে। বাড়তি ভালোবাসায় আশিষের চোখে  জল আসে। আর মাকে জড়িয়ে রাখে দুহাতে।

১০.
স্নেহ


অনির্বাণ  একটি গ্রামে  বাসকরে।বয়স  প্রায় ১০/১২ বছরের। অত্যন্ত গরীব  পরিবারের । বাবা আর মায়ের সাথে কেটেছে  তার দিন গুলি। ছয় ভাই বোনের মধ্যে ছোটো  সে। তবে দাদাদের দারিদ্র্যতা ছিলো  গভীর  কিন্তু  ভালোবাসার অভাব ছিল। মা ছিলো  তার একমাত্র  দর্শন ।
 
    পরিশ্রম  আর চেষ্টা  অনির্বানের অন্য ভাইদের তুলনায়  অনেক বেশি। তবে মনটা ছিলো  তার সহজ সরল। তাই এর জন্য অনেক কষ্ট  তাকে সহ্য করতে হয়েছে।
দীর্ঘ  পরিশ্রম  করে দুমুঠো  সাদা ভাত খেয়ে মায়ের আশীর্বাদে সে এম. পাশ করে।
এই পাশের পেছনে অনেক বাধা আর বিঘ্ন  ছিলো ।
শেষমেশ অনির্বাণ  চাকরি  পায়। বাবা ও  মা মারা যায়। সবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত  হয়। দুঃখ তাকে আরো সময়ে নিয়ে যায়।

আসলে ছোটো  থেকে  অনির্বাণ  অভাব যেমন পেয়েছে তেমনি স্নেহ কি তাও ঠিক বোঝে না।
এমনই  ভাবে এক স্নেহ চক্করে  পড়ে। ফলে স্নেহের  পরিবর্তে  মানসিক যন্ত্রণা  পেয়ে আবার ফিরে  আসে ।
কতজন  তাকে কতভাবে  নিয়ে খেলে  তার সরলতার মন নিয়ে।

একদিন অনির্বাণ  সত্যিকারের একজন পেলেন যে তার সমস্ত চাওয়া  আর পাওয়ার সাথে সাথে পুত্র স্নেহ  দিতে শুরু করে। 
অনির্বাণ  এতো বড়ো  আকাশের নীচে  সে একজনকেই পেয়ে আনন্দে  আত্মহারা হয়ে বলে "আমি
আমার স্নেহময়  বাবাকে  পেয়েছি"। অনির্বাণের সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে তাকে সস্নেহে জড়িয়ে ধরে।

১১.
প্রত্যাশা 



গ্রামময় জলের হাহাকার। নানান অসুখে  ঘিরে ফেলেছে গ্রাম।দেখালী গ্রামের একটা  পরিবারের দুজন সদস্য মারা যায়। সেই বাড়ির  ছেলে তার দুই ভাই বোন কে নিয়ে  এখন  বেঁচে  আছে। ছেলেটির নাম মুকুন্দ।
মুকুন্দ নিজে পড়াশোনা  করেনি । তবে ভাই ও বোনকে সে শত কষ্টের মধ্যে থেকেও ভালো স্কুলে  পড়াশোনা  করায়।
মুকুন্দ একদিন তার বোনের বিয়ে একটি সামান্য বাড়ির ছেলের  সাথে দিলেন। তবে ভাই কে নিয়ে এক সমস্যায়  পড়লে  সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

আর মুকুন্দ  বাড়ি যায়না। সে একা একা খোলা আকাশের নীচে  ঘুরে বেড়ায়। কিছুদিন  যাওয়ার  পর  মুকুন্দ ভীষণ  রোগে আক্রান্ত  হয়ে পড়ে।। হঠাৎ  ফেসবুকে  এক দাদার সাথে তার পরিচয়  হয়। সে দাদা মুকুন্দের কাছে আসে।
ভাই, বোন কেউই  যখন  আর তার খবর  নেয় না। তখন  মুকুন্দের প্রত্যাশা বাড়তে থাকে।  দাদার প্রতি অগাধ প্রত্যাশা  জন্মায় তার। হাসপাতালে  শুয়ে শুয়ে  মুকুন্দ যখন কাঁদছিল ঠি তখনই  সেই দাদা তার কাছে আসে। মুকুন্দ আনন্দে  দাদার কোলে মাথা রেখে সারা জীবনের  মতো  প্রত্যাশা  কে নিয়ে ঘুমিয়ে  পড়ে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন