লেবেল

গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আজকের ভৌতিক গল্প । চতুর্থ পজিশন — কবিরূল। Ankurisha।E.Magazine । Bengali poem in literature ।

 


আজকের  ভৌতিক গল্প 


চতুর্থ পজিশন 
 কবিরূল
   
 

     নাচের অনুষ্ঠানে এসে যে এই রকম ভৌতিক ঘটনা ঘটবে সেটা কেউই ভাবতে পারেনি। চৌদ্দজনের গ্রুপ ডান্স। সেখানে একটি মেয়েকে গ্রুপ ডান্সের সময় দেখা যাচ্ছে না। অথচ তার পরিবর্তে অন্য একজন ঢুকে বেশ নাচ করছে। কিন্তু যখন ছবি তোলা হল তখন নতুন মেয়েটিকে আর কেউ ছবিতে দেখতে পাচ্ছেনা।

      সুবিমল অনেক কটা শট নিল। আর প্রতিবারেই একই ঘটনা। নতুন মেয়েটি কখন এসে স্টেজে উঠে চৌদ্দ জনের গ্রুপে ঢুকে পড়ছে সেটা কেউই বুঝতে পারল না। আর ও সেটা করছে বাঁদিক আর ডানদিক থেকে   যখন কোন মেয়ে চতুর্থ পজিশন এ থাকছে। আর চৌদ্দছনের টিমে সাত জন করে দুটো রো। প্রথম আর দ্বিতীয়। দুটি রোতেই এই ঘটনা ঘটছে।চতুর্থ পজিশনে থাকা মেয়েটির পরিবর্তে নতুন মেয়েটি ঢুকে নাচ করছে।

     সুবিমল নাচের মেন কোরিওগ্রাফারের কাছে গেল। তিনি অনেকক্ষণ ধরে গ্রীনরুমে আছেন। আসলে কোন সাড়াশব্দ নেই। এদিকে একটু পরেই আরো একটি গ্রুপের নাচ শুরু হবে। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করার পরও যখন কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেলনা সুবিমল গ্রীনরুমে উঁকি মারতেই গা ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কোরিওগ্রাফারের মৃতদেহটা বিছানার উপরে পড়ে রয়েছে। ইলেকট্রিকের তার দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

     শুধু কোরিওগ্রাফার নয়। অনুষ্ঠানের যিনি অর্গানাইজর তারঁও অনেকক্ষণ কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। পরে উনার ডেডবডি পাওয়া যায় বাথরুমের পাশে জঙ্গলে। দু দুটো তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে গেল। সবার শরীরে রীতিমত কম্পন শুরু হয়েছে। ডেডবডি পোস্ট মর্টেমে পাঠাতেই আরো চমক দেখা গেল। ডাক্তার রিপোর্ট করেছে বেলা দেড়টাতে মারা গেছে। কিন্তু মরার সময় দেখাচ্ছে বৈকাল চারটে।

      সুবিমল ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। এবার চারটেতে আবার প্রতিযোগিতা শুরু হবে। ওকে দেখতেই হচ্ছে নতুন কোন মেয়ে নাচ করছে।আর চতুর্থ পজিশনে কে  এসে ঢুকে পড়ছে। আগের বেশ দু তিনটে প্রতিযোগিতায় চতুর্থ পজিশনে থাকা মেয়েদের জিজ্ঞাসা করে জানা গেল যে  ওরা ঐ পজিশনে নাচ করে গেছে। ওদের পরিবর্তে নাচ কেউ  করেনি। বা কেউ স্টেজে ওঠেনি। আর ছবিতেও ধরা পড়েনি নতুন কোন মেয়ে নাচ করেছে কি না ?

     তাহলে? ব্যাপারটা ভীষণভাবে ভাবাচ্ছে সুবিমলকে?

       ঠিক চারটেতে আবার নাচ শুরু হল। চৌদ্দজনের টিমে সবাই ঠিক মতো নাচ করছে। শুধু দেখতে হবে চতুর্থ পজিশনে কি এমন ঘটনা ঘটছে যার জন্য অন্য কোন মেয়ে এসে নাচ করছে? অথচ চৌদ্দজনের প্রতিজনকে জিজ্ঞাসা করলে সকলের একটাই কথা - চৌদ্দজনের গ্রুপে নতুন কেউ ডান্স করেনি।

        এবারের গ্রুপ ডান্সের চৌদ্দজনের টিমে যারা আছে তারা প্রত্যেকেই টেলেন্টেড। সুবিমল বেশ খুশী। একটার পর একটা ছবি তুলছে। হঠাৎ করে লোডশেডিং হবার মত সব আলো নিভে গেল। যদিও টিমটিম করে দু একটা আলো জ্বলছে। সুবিমল দেখল সত্যিই চতুর্থ পজিশনে একজন এসে নাচ করছে। চতুর্থ পজিশনে যার থাকার কথা -  ডান্সার কমলীকা ঘোষ সে নেই।আর ঐ পজিশনে একটা কঙ্কাল নাচ করছে।

      আতংকে সবাই হল  থেকে বেরিয়ে এল।চতুর্থ পজিশনে থাকা ভান্সার কমলীকা ঘোষের পরে ডেড বডি পাওয়া যায়।
  আসল বিষয়টা পুরানো নেপালী নাইটগার্ডের ভায়েরী থেকে জানা যায়।

       বহুদিন আগে একটি গ্রামের খুবই প্রতিভাবান মেয়ে এখানে নাচ করতে আসে। ওকে অনুষ্ঠানের অর্গানাইজর আর কোরিওগ্রাফার সুযোগ করে দেয়। মেয়েটিকে বলা হয় যে চৌদ্দজনের গ্রুপ ডান্সে চতুর্থ পজিশনে সে নাচবে। কারণ চতুর্থ পজিশনে যিনি নাচ করবে তিনি অসুস্থ। অনুপস্থিত। আর তার বিনিময়ে মেয়েটিকে কুপ্রস্তাব দেয়। আর মেয়েটি রাজি না হওয়ায় ওকে ঐ দুজনে ধর্ষণ করে। সেই থেকে ঐ মেয়েটার অতৃপ্ত আত্মা ঐ ভাবে নাচের অনুষ্ঠানে নাচ করে। আর সুযোগ পেলেই মানুষকে হত্যা করে। এবারের বলি তিনজন।




আরও  পড়ুন 👇👇👇

https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/ankurisha-emagazinebengali-poem-in.html


  


বুধবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

উৎসব সংখ্যার গল্প ।। আমার আমি — বহ্নিশিখা

 




 উৎসব সংখ্যার গল্প   


আমার আমি

বহ্নিশিখা


বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত আমিই এসেছি।
আমার হয়ে আর কেউ আসবে না। আমার বিয়ের জন্য। প্লিজ মাসিমা...


আর কিছু বলতে পারলো না,কান্নায় ভেঙে  পড়লো স্বাতী। 

কমলের মা বিশাখা স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন।  কি বলবেন মেয়েটাকে? একে আর কি বলা যায়? 

পাঁচ বছর প্রেমের ইতিহাসে কমল কখনো বলেনি সে কাউকে ভালোবাসে। 
তার মা- বাবা জানে ছেলে শহরে পড়াশোনা করে। পড়ার ফাঁকে টিউশনি করে। নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয় অনেকখানি। 
স্কুল শিক্ষক বাবার পক্ষে ছেলের পড়াশোনা ভার্সিটির সমগ্র খরচ বহন করা খুব কষ্ট হতো । একসময় কমল বললো আমি কয়েকটি ছেলেকে পড়াই বাবা। ভালো টাকা দেয়। আমি চালিয়ে নেবো। তোমাকে আর টাকা দিতে হবে না।

সেই থেকে কমল স্বাতীদের পড়ায়। ওরা চার বোন,চার ভাই। ওদের সবার সাথে সময় কাটাতে কাটাতে ওদের ফ্যামিলির সদস্য হয়ে ওঠলো। 

স্বাতীর বাবা ফরেস্টে চাকরি করতেন। ফ্যামিলি নিয়ে যাননি। বাচ্চাদের নিয়ে মফস্বল শহরে নিজের বাড়িতেই থাকতেন স্ত্রী পাঞ্চালী সিংহ।  
কিছুদিন ধরে পাঞ্চালী স্বাতীর  বিয়ে নিয়ে কথা বলছিলেন। জানতেন স্বাতী কমলকে ভালোবাসে। তিনি কমলের সাথে স্বাতীর বিয়ে দেবেন না। 

স্বাতী কমলকে ছাড়া বিয়ে করবে না।

 এই নিয়ে সংসারে তুমুলঝগড়া।

 স্বাতীর বাবা অরুণ লাহিড়ীও স্ত্রীর কথার প্রতিবাদ করেন না। মেয়েকে বললেন,তুমি বড় হয়েছো অনেক বুঝতে শিখেছো। অনার্স পাশ করেছো। আর আমরা কি চাই সেটা বুঝো না? ওখানে বিয়ে করতে হলে আমরা কেউ যাবো না। 

ঠান্ডা লড়াইয়ে স্বাতী তার বাবাকে বলল বাবা, মা আমাকে রেখে চলে  গেলো, তুমিও আজ আমার সাথে নেই। ঠিক আছে, আমি একাই যাবো। একথা বলে বেড়িয়ে পড়লো।

সোজা কমলদের বাড়িতে।
সবাই অবাক হয়ে দেখছিল, পরিচয় দিয়ে স্বাতী যতোটা সম্ভব খুলে বললো। 

স্তব্ধতা ভেঙে বিশাখা বললেন,তুমি কেঁদো না। বিয়ে হবে এবং এ মাসেই হবে। 



 আরও পড়ুন👇👇👇👇👇👇👇👇👇


নীচের লিঙ্কগুলো ক্লিক করে পড়ুন 
মতামত জানান। আপনিও আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। 
ankurishapatrika@gmail.com

-------------------------------------------            পড়ুন👆👆👆👆👆👆👆
  👇   পড়ুন 
           পড়ুন 👇👇👇👇👇👇👇👇
    

https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_35.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_24.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_27.html

https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_28.html
 


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_77.html



https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_29.html



https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_30.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_31.html



https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/blog-post.html




https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/blog-post_2.html



সম্পূর্ণ বিনামূল্যে  কবিতা, গল্প, ছড়া, ধারাবাহিক উপন্যাস প্রভৃতি বিষয়ে   অঙ্কুরীশা-র  পাতা ডাউনলোড করুন এবং পড়ুন।     

আপনার সুচিন্তিত মতামতও জানাবেন।     
 

মঙ্গলবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০

বুধবারের গল্প। স্নান— তপনজ্যোতি মাজি

 


গল্প


স্নান

তপনজ্যোতি মাজি


পাখিদের স্নান দেখেছিল অনির্বান বালকবেলায়। তখন সে ক্লাস নাইনের

ছাত্র। দুটো শ্বেত পায়রার স্নান। ওদের বাড়ির পাশে ছিল খেজুর পুকুর।

বেশ কয়টা খেজুর গাছ ছিল পাড়ে। লম্বা। জলের দিকে একটু বেঁকে 

আকাশমুখী। হয়তো এই জন্যেই পুকুরটার খেজুর পুকুর নামে পরিচিতি।

বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই স্নান দৃশ্য দেখেছিল অনির্বান। পুকুরের জল

মেখে  একটা পায়রা আর একটা পায়রার কাছে গিয়ে ডানা ঝাড়ছিলো। 

অন্যটাও তাই। এই যৌথ স্নানের ভঙ্গি দেখে মজা পেয়েছিল খুব। খেলাচ্ছলে

স্নান। ঠিক যেমন সকাল ইস্কুল ফেরত স্নানের সময় দুটো ছেলে পরস্পরের 

দিকে জলছোঁড়ে স্নানের সময়। 


পরে এই দৃশ্যের কথা রাজীবকে বলেছিল অনির্বান। রাজীব  ওর সঙ্গে এক 

ক্লাসে পড়লেও,একটু পাকা স্বভাবের ছিল।কত কি ঐ বয়সেই জানতো

রাজীব।কত রকম ব্যাখ্যা থাকত ওর সংগ্রহে। জীবন সম্মন্ধে জীবনবিজ্ঞান

বিষয়ের বাইরে গিয়ে কত যে তথ্য দিয়েছিল রাজীব , এখনও মনে পড়লে

হাসে অনির্বান। এরকম বন্ধু ইস্কুল কিংবা কলেজ জীবনে থাকেই। রাজীবের

সঙ্গে কতদিন দেখা হয়নি। হয়তো আর দেখা হবেনা কোনও দিন।তবু, মাঝে

মাঝে মনের জলে ঘাই দেয় এই সব বন্ধুরা। ও ঘটনা প্রসঙ্গ । জীবন বুঝি 

এরকমই।


এই যেমন আজ। রবিবার। ছুটির বাতাস বইছে মনে। জীবনের গতি আজ

মন্থর। হচ্ছে হবে।কোনও কিছুতেই তাড়া নেই।কাজগুলো সব লুকোচুরি 

খেলছে।সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠেছে।আর একটু ল্যাদ খাওয়ার ইচ্ছা

ছিল। উর্মি প্রায় জোর করে তুলেছে।


উর্মি , উর্মিমালা অনির্বানের জীবনে উজ্জ্বল আশ্রয়। উর্মিমালার নিখুঁত 

পরিচর্যায় গৃহের আরাম তার জীবনে সুনিশ্চিত হয়েছে উর্মিমালা সংসারে

 পা রাখার পর থেকেই। অনির্বানের মতো কর্মব্যস্ত মানুষের কাছে বাড়ি হলো নিশ্চিন্ত নির্ভরতা  ও আরামের ঠিকানা। সব মানুষের কাছে তাই। বাড়ির

পরিবেশ রচনা থেকে রসনা তৃপ্তি সবই উর্মিমালার সৌজন্যে। কর্ম ব্যস্ততার

মধ্যেও উর্মিমালার সাহচর্য অনির্বানকে ভরে রাখে।


সোফার সামনে টি-টেবিলে ছোট ট্রেতে দুকাপ লাল চা ও দুরকমের বিস্কিট

রেখে উর্মিমালা জলের বোতল ভরছিল ওয়াটার ফিল্টারে। ইতিমধ্যে 

ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে পোশাক চেঞ্জ করে অনির্বান এসে বসেছে

সোফায়। পাজামা আর টি শার্ট। এখনো শীতের দেখা নেই এবছর। ভোরের

দিকে শীত শীত ভাব হলেও এখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে উর্মিমালার 

কপালে। পাখাটা অন করে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। চা নিতে নিতে

সাংসারিক এবং সংসারকে বৃত্ত করে যে সম্পর্ক এবং মানুষজন সাধারণত

সে রকমই কথা হয়  এই চা পর্বে। আজ অবশ্য প্রসঙ্গ অন্য। দীর্ঘ করোনা

পরিস্থিতিতে ঘরবন্দি হয়ে থাকা। কি রকম একটা অন্তরীণ অনুভুতি মন

ও শরীরে চেপে বসেছে। মুক্তি খুঁজছে মন ও শরীর এক সঙ্গে। সারা পৃথিবী

যেন কারাগার হয়ে গেছে।প্যারোলে মুক্তি পেয়ে কেউ কেউ একটু বাইরে 

বেরিয়েছে এই মাত্র।  দীর্ঘ লকডাউন , মাস্ক , স্যানিটাইজার সর্বোপরি 

আতঙ্ক মানুষকে মানসিক ভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। এখন যদিও আনলক

পর্ব শুরু হয়ে গেছে, দোকান বাজার খুলেছে,তবু স্বাভাবিক হতে কতদিন

লাগবে কে জানে!


উর্মিমালার মন চাইছে একটু মুক্তি। কাছাকাছি কোথাও। প্রকৃতি সান্নিধ্যে

কয়েকটা ঘন্টা। জাস্ট ফর এ চেঞ্জ। আজ চায়ের টেবিলে কথাটা বললো 

অনির্বানকে। বেড়ানোর কথা উঠলে, কাছে বা দূরে, অনির্বান সবসময়

উৎসাহী। আজও সেই স্পিরিটের ব্যতিক্রম হলো না। তবে , স্পট, ডেট 

এবং বাহন কি হবে,  এই সব ঠিক করার দায়িত্ব উর্মিমালাকে দিয়ে বাজারে যাওয়ার জন্যে চটপট রেডি হয়ে উর্মিমালার পাশে এসে দাঁড়াল। উর্মিমালা

চেয়ারে হেলান দিয়ে পা দুটো তুলে দিয়েছে সোফার ওপর। ফেসবুক খুলে আপডেটগুলো দেখে নিচ্ছে। 


কাল রাতের নীল হাউসকোটটাই পরে আছে উর্মিমালা। এক মুহূর্ত দেখলো নিঃশব্দে।অনেকদিন এরকম নিঃশব্দে উর্মিমালাকে দেখেনি অনির্বান। কাল

রাত দুটো নাগাদ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনির্বানের। ঘুম ফিরে আসছিলনা 

কিছুতেই।এপাশ ওপাশ করলো কিছুক্ষন। উঠে জল খতে গেল ডাইনিংএ।

জানালার কাছে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েছিল। আকাশে ঘোর লাগা ম্লান 

জ্যোৎস্না। চাঁদের অলোর মধ্যে কেমন একটা আবেশ থাকে। নির্জন রাতে

এই আবেশ মন স্পর্শ করে। হৃদয়ে স্রোত অনুভব হয়। অনেকে প্রশ্ন,জিজ্ঞাসা

সামনে এসে দাঁড়ায়। শোয়ার ঘরে ফিরে এসেছিল অনির্বান। নীল আলোর 

হালকা পরশ বেড রুমে। সুসজ্জিত বেডরুম। প্লাই বোর্ড দিয়ে ফার্ণিশ 

করিয়েছে গতবছর। সে আর উর্মি মিলে রঙ পছন্দ করেছিল ক্যাটালগ

দেখে।


চোখ পড়ল ঘড়ির দিকে।চশমা না থাকলেও ডিজিটাল ওয়াল ক্লক বলছে

রাত্রি দুটা কুড়ি। ঘড়ি থেকে দৃষ্টি গেল খাটে। গভীর ঘুমে উর্মি। নিঃশ্বাস

নেওয়ার মৃদু শব্দ। চুল খোলা। মুখের এক দিকে নীল আলো পড়েছে।

খাটের ওপর বসল অনির্বান কোনও শব্দ না করে। নীল আলো স্নিগ্ধ

মায়া সৃষ্টি করেছে উর্মির ঘুমন্ত চোখে মুখে। কতদিন গভীর ভাবে আদর

করা হয়নি উর্মিকে। নিবিড় আদর পছন্দ করে উর্মি। উর্মিমালার ঘুমন্ত চোখে 

ও কপালে ওষ্ঠের আলতো স্পর্শ দিতে ইচ্ছা হলো। মুখ নেমে এলো 

অনির্বানের। নাকে মিষ্টি সুগন্ধ পেলো সে। উর্মির প্রিয় ডিও র হালকা সুবাস।

খুব সন্তর্পনে উর্মির কপালে ওষ্ঠ ছোঁয়াল। পালক স্পর্শে উর্মিমালার নিদ্রিত

শরীর পাশ ফিরল। অনির্বান নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। ভাবলো, তার ঘুম ভেঙে

গেছে, কিন্তু উর্মি ঘুমোচ্ছে। উর্মিমালা পাশ ফিরে শোয়ার জন্যে খোলা চুল 

ছড়িয়ে আছে বালিশের পাশে।অনির্বান বালিশে মাথা রাখলো। মনে হলো

জুঁই ফুল ফুটেছে কোথাও কাছাকাছি। খেয়াল করতে বুঝলো উর্মির

চুলের সুগন্ধ।একটু সরে সুগন্ধ নিতে থাকল।খুব ইচ্ছা করছে নিবিড় 

করে জড়িয়ে ধরতে। 


সুগন্ধ নিতে নিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল অনির্বানের মনে নেই।আজ 

সকালে যখন উর্মির ডাকে ঘুম ভেঙেছিল , আশ্চর্য লেগেছিল তার।

এখন উর্মিমালার পাশে দাঁড়িয়ে কাল রাতের ঘটনার কথা মনে হতে 

রক্তে ও স্নায়ুতে মৃদু স্রোত বয়ে গেল। মুহূর্তে নিজেকে বাস্তব বিন্দুতে

এনে উর্মিকে জিজ্ঞাসা করলো কি কি বাজার আনতে হবে, স্পেশাল কিছু

আনতে হবে কিনা। উর্মিমালা ফোন রেখে ফ্রিজের স্টোরেজ চেক করলো, 

ডিপ ফ্রিজে মাছের বক্স এবং কিচেনে ফলের ঝুড়ি, পেঁয়াজ,আদা,রসুনের

ঝুড়ি দেখে নিয়ে কি কি আনতে হবে বলে দিল অনির্বানকে। অনির্বান ব্যাগ

নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামছিল।আজ সে অন্য রবিবারের থেকে একটু লেট।

উর্মিমালা ডাকল , অনির্বান থেমে গিয়ে ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসু চোখে

উর্মিমালার দিকে তাকালে, উর্মিমালা বলল, ফেরার সময় মোড়ের মিষ্টি

দোকান থেকে গরম কিছু নিয়ে আসবেতো। সম্মতি সূচক ইংগিত করে

অনির্বান পুনরায় পা বাড়াল বাজারের উদ্দ্যেশে।


অনির্বান বাজার যাওয়ার পর বন্দনা এলো। বন্দনা উর্মিমালার বহুদিনের

বাধ্য এবং বিশ্বস্ত হেল্পিং হ্যান্ড। বন্দনা কে নিয়ে ছাদে গিয়ে ছাদবাগানটা

একটু অন্যরকম করে সাজিয়ে নিল দ্রুত হাতে। কাল জল দিয়ে রেখে ছিল। 

একটু পেস্টিসাইড স্প্রে করতে হবে। পোকা এসেছে চন্দ্রমল্লিকা ও হাইব্রীড জবাগাছে। অনির্বানকে  আজ পেস্টিসাইড আনার কথা বলবে। বন্দনাকে 

বাকি কাজের কথা বুঝিয়ে নিচে এলো। স্নান করতে হবে। রান্নার চাপ নেই।

 দুপুরে পাড়ায় ঘরোয়া জন্মদিনের আমন্ত্রণ আছে। কোভিড১৯ এর সতর্কতা

 মেনে অনুষ্ঠান হচ্ছে এবং না গেলে খারাপ  দেখাবে , তাই যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  গিজারের সুইচ অন করে ছাদে গিয়েছিল। প্রয়োজনীয় পোশাক নিয়ে স্নানঘরে ঢুকলো উর্মিমালা। একটু সময় নিয়ে স্নান করতে হবে। ট্যাপ থেকে জলপড়ার শব্দ শোনা গেল সঙ্গে মৃদু গলায় রবীন্দ্র গান।


বাজার থেকে ফিরে অনির্বান গান শুনতে পেল। স্নানঘরে গান। উর্মি গাইছে।

 ঝির ঝির জল তরঙ্গ। সম্ভবত শাওয়ার খোলা। কতক্ষন স্নানে গেছে উর্মি? 

 প্রশ্নটা মনে এলো। ভাবলো তার ফিরে আসার সংবাদ দেবে।পরক্ষনেই,

কাল রাতের সুন্দর ঘুমন্ত মুখটা মনে এলো। স্নান পর্ব একান্ত ব্যক্তিগত।

জলের প্রসাধন। গুন গুন সুর স্নানঘরের দরজা পার হয়ে হওয়ায় ভাসছে।

কোন সুদূর অতীতে ছোটবেলায় দেখা পাখির স্নান দৃশ্যের কথা মনে

পড়ল অনির্বানের। মনে হলো শাওয়ারের নিচে দেবী শরীর। এই সময়টুকু

উর্মির একান্ত ব্যক্তিগত।



----------------------------------------------------------------    

এই বিভাগে আপনিও আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান। 

ankurishapatrika@gmai.. com

            

________________________________________


শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

রবিবারের গল্প। আত্মজ — গৌতম বাড়ই

 



    রবিবারের গল্প 


   আত্মজ

 গৌতম বাড়ই



 আড়ংঘাটা থেকে দক্ষিণ কলকাতার এই বনেদী বাড়িতে নিরঞ্জন যখন এসে ঢুকলো তখন বিকেল তিনটে।ট্রেন বন্ধ তাই সোজা পথটার এখন কত হ্যাপা।বাড়ির ভেতর অনেক লোকজন ।


দরজায় এক ভাঙ্গাচোরা বিবর্ণ লোক বসে রয়েছে। এই লোকটি আর প্রীতি প্রায় একসাথেই এ বাড়িতে এসেছিল।জনার্দন সেন পা ছড়িয়ে আরাম কেদারায় মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ।রাহুল তাদের ঊষর দাম্পত্য জীবনে দশবছর পরের একমাত্র সন্তান।একটু বাদেই তার মৃতদেহ আসবে।বাইরে কাঁদছেন অঝোরে নিরঞ্জন আর ভেতরের ঘরে প্রীতিকণা সেন। হঠাৎ মেঘলা করে তুমুল বৃষ্টি সন্ধের বিকেলে।বাবুকে কোলে পিঠে মানুষ করেছেন।দেশের বাড়িতে খবরটা তাই যায়।এরকম বাদলা এক বিকেলে তার নিঃসন্তান বৌদিমণি জনশূন্য বাড়িতে খুব কেঁদেছিলেন তার কাছে ।নিরঞ্জন উঠে পড়ে তড়িঘড়ি। শব বাহনের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে গেটে।





----------------------------------------------------------------

এই বিভাগে মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান।  

ankurishapatrika@gmail.com



----------------------------------------------------------------    


            

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

শুক্রবারের ছোটদের জানা ও অজানার গল্প ।। আঁচড়হাটি জঙ্গলের বাঘ — রতনতনু ঘাটী

 




শুক্রবারের 



ছোটদের  জানা ও অজানার গল্প   



  আঁচড়হাটি জঙ্গলের বাঘ                                           

 রতনতনু ঘাটী


আমি সারা জীবনে বাঘ দেখব বলে কম জঙ্গলে ঘুরিনি। আজকাল টাইগার রিজার্ভ ছাড়া বাঘের দেখা পাওয়া মুশকিল। একমাত্র সুন্দরবনের বাঘ ভাগ্যে থাকলে দেখা যায়। সুন্দরবনের গোসাবায় আমার ফুলিপিসির বাড়ি। সেখানে কবে থেকে যাব-যাব করেও যাওয়া হয়নি। কখনও পরীক্ষা, কখনও দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা, এসব সামলে আর যাওয়াই হয়নি। এখন বড় হয়েছি। আমি ভূমিরাজস্ব অফিসে চাকরি পেয়েছি। এখন ইচ্ছে করলে ফুলিপিসির বাড়ি যাওয়াই যায়।

   আমরা কয়েকজন মিলে জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়ার একটা দল তৈরি করেছি। আমাদের বন্ধু অন্তুই তার নাম রেখেছে ‘টিম-টাইগার’। টিম-টাইগারের সদস্য মোটে চারজন। আমি, অন্তু হালদার, ভবেশ দাস আর শ্রীনিবাস নিয়োগী। অন্তু জেলাপরিষদ অফিসে কাজ পেয়েছে। ভবেশ শহরতলির একটা স্কুলে সহশিক্ষকের চাকরি করছে বছর তিনেক হল। স্কুলটার নাম আকুতিনগর উচ্চ বিদ্যালয়। শ্রীনিবাস ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে পোস্টিং বাঁকুড়ার জয়পুরে। বলা যায় শ্রীনিবাসই আমাদের মধ্যে বাঘ দেখার নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। শ্রীনিবাসের রেফারেন্সে আমরা অনেক ফরেস্ট বাংলোয় বেড়াতেও গিয়েছি।

   শ্রীনিবাস ছুটিছাটায় বাড়ি এলে কত যে বাঘের গল্প বলে। না, বাঘ সে নিজেও কখনও চোখে দ্যাখেনি ঠিকই। তবে জঙ্গলে তার পোস্টিং, তাই সে বাঘের যেসব গল্প শুনে এসে আমাদের কাছে বলে, তার সিক্সটি পারসেন্ট গুলগল্প বলে ফেলে দিলেও, যে ফর্টি পারসেন্ট পড়ে থাকে, সেটুকুকেও হেলাফেলা করা যায় না। অন্তত আমরা তিনজনই হেলাফেলা করিনি কোনও দিন।




   আমি এর মধ্যেই গত কলকাতা বইমেলা থেকে শখ করে বেশ কয়েকখানা বাঘের উপর লেখা বই কিনেছি। তার মধ্যে বাঘ নিয়ে লেখা গল্পের বইও যেমন আছে, জিম করবেটের লেখা ‘ম্যান-ইটার্স অফ কুমায়ুন’ এবং ‘দ্য ম্যান-ইটিং লেপার্ড অফ রুদ্রপ্রয়াগ’ বই দুটিও আছে। বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে বাল্মীক থাপারের লেখা ‘লিভিং উইথ টাইগার্স’ বইটা হঠাৎ একটা পুরনো বইয়ের দোকানে পেয়েই কিনে নিয়েছি। এই তো সেদিন বাংঘের গল্পের সংকলনের একটা বইতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বুকের উপরে বাঘ’ গল্পটিও আমি পড়ে ফেললাম।

   এবার শ্রীনিবাস ছুটিতে বাড়িতে ফিরেই ফোনে আমাদের খবর পাঠাল, ‘তোরা আজ সন্ধেবেলা আমার বাড়িতে চলে আয়। একটা দারুণ ফরেস্টের খোঁজ পেয়েছি।’

   ওর ফোন পেয়ে আমরা তিনজনই উত্তেজিত। সন্ধেবেলা অফিস ফেরত আমরা তিনজন হাজির ওর বাড়িতে। আমরা জঙ্গলের খবর শোনার জন্যে উসখুস করছি। দেখি, শ্রীনিবাস জঙ্গলের কথা তুলছেই না। এ কথা সে কথার পর কফি দিয়ে গেলেন কাকিমা। কফিতে চুমুক দিয়ে পা দুটো সোফার উপর তুলে জমিয়ে বসে প্রথম আমাদের দিকে তাকিয়ে শ্রীনিবাস বলল, ‘নে, কফি খা!’

   আমি বললাম, ‘তুই নতুন জঙ্গলের কথাটা তো বল? শুনব বলেই তো ছুটে এসেছি।’

   আমার দিকে তাকিয়ে শ্রীনিবাস বলল, ‘দ্যাখ দেবতোষ, এবার যে জঙ্গলের খোঁজ পেয়েছি, সেখানে বাঘের দেখা পাওয়াটা কোনও ব্যাপারই নয়। এক্কেবারে পাক্কা!’

   ‘জায়গাটা কোথায় বলবি তো?’ কফিতে লম্বা চুমুক দিয়ে অন্তু জিজ্ঞেস করল।

   ভবেশ চোখ নাচিয়ে বলল, ‘জায়গাটা বল তো আগে! সেবার করবেট ন্যাশনাল পার্কে বাঘ দেখাবি বলে কত ধুমধাম করে আমাদের নিয়ে গেলি। জঙ্গলের ভিতরের গেস্ট হাউস বুক করে রাখলি আগে থেকে। আমরা জানি যে করবেট পার্কে অনেক বাঘ আছে। কিন্তু সবই তো ফক্কা হয়ে গেল। বাঘের লেজ পর্যন্ত দেখাতে পারলি না।’

   আমি বললাম, ‘গতস্য শোচনা নাস্তি! যা গেছে তা গেছে। এখন যা ঘটতে চলেছে সে নিয়ে কথা বল! শ্রীনিবাস, বল তো আগে, জায়গাটা কোথায়?’

   শ্রীনিবাস খানিক চুপ করে থাকার পর বলল, ‘জায়গাটা হল কালিম্পংয়ে

   আমার বাঘ নিয়ে যেটুকু পুঁথিগত বিদ্যা, আমি বললাম, ‘কালিম্পংয়ে বাঘ? কী বলছিস তুই? অত হাই অল্টিচিউটে বাঘ মানে রূপকথার গল্প হয়ে গেল না রে শ্রীনিবাস?’

   শ্রীনিবাস মাথা দুলিয়ে বলল, ‘সেটাই খবর! বছর দু’-তিন আগে খবর পাওয়া গেছে, এক শীতের সন্ধেবেলা নর্থ প্যাঙ্গোলাখা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারিতে লুকিয়ে পেতে রাখা ক্যামেরায় ধরা পড়েছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ফোটো। অনুসন্ধানী দলের একজন বলেছেন, ‘আমরা বাঘের যাতায়াতের একটা সরু রাস্তাও জঙ্গলের মধ্যে দেখতে পেয়েছি। ধুলোর উপর বাঘের থাবার চিহ্ন দেখে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, বাঘ ওই পথে শিকারের সন্ধান করে গভীর জঙ্গলে ফিরে যায়। তবে বাঘ আছে একটা নয়, দুটো। তাঁদের ক্যামেরায় বাঘের ফোটোও তোলা সম্ভব হয়েছে। একটা পূর্ণবয়স্ক বাঘ জঙ্গলের পথে হেঁটে যাচ্ছে।’ বলে শ্রীনিবাস ঘরের ভিতর উঠে গিয়ে একটা ফাইল বের করে আনল। আমরা চোখ বড়-বড় করে দেখছি। সত্যি-সত্যি শ্রীনিবাস একটা মস্ত বাঘের ফোটো বের করে দেখিয়ে বলল, ‘এই সেই বাঘের ফোটো। তোরা যদি বিশ্বাস না করিস, তাই এক কপি ফোটো আমার ফরেস্ট রেঞ্জারকে দিয়ে আনিয়েছি।’

   আমরা তিনজনই হুমড়ি খেয়ে বাঘের ফোটেটা দেখতে লাগলাম। অন্তু বলল, ‘আরে এ তো মস্ত বাঘ!’

   শ্রীনিবাস বাহাদুরি কুড়নোর ভঙ্গিতে বলল, ‘তা হলে আর বলছি কী? অত উপরে এই প্রথম বাঘের খবর পাওয়া গেল।’

   ভবেশ বলল, ‘করবেটের জঙ্গলে দু’শো পনেরোটা বাঘ থাকা সত্ত্বেও একটা বাঘের দেখা পেলাম না। আর এখানে একটা কি দুটো বাঘ! তা দেখতে আমাদের ছোটা ঠিক হবে না।’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘আরে, একটা প্রবাদ আছে না—বাঘের দেখা, সাপের লেখা! ভাগ্যে থাকলে বাঘের দেখা মিলবেই। কালিম্পংয়ের নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কে বাঘের থাবা লক্ষ করেছেন ডি এফ ও-রা। তাঁদের অনুমান, ওখানকার ইয়াকের সুস্বাদু মাংসের লোভে বাঘ ওখানে অত হাই অল্টিচিউডেও দেখা গেছে।’

   আমি বললাম, ‘শ্রীনিবাস, আমরা যে জায়গাটায় বাঘ দেখতে যাব, সে জঙ্গলটার নাম কী?’

   শ্রীনিবাস কেসে নিয়ে বলল, ‘এ কোনও নামী জঙ্গল নয়। এটা সরকারি ব্যাঘ্রপ্রকল্পও নয়। জঙ্গলটার নাম ‘আঁচড়হাটি’। ছোট্ট জঙ্গল। লম্বায়-চওড়ায় কয়েকশো একরের মতো। ঘন জঙ্গলে ঢাকা। জঙ্গলটা শাল-সেগুন গাছে ভরতি। অনেক চিতল হরিণও আছে। তবে চর্যাপদে একটা কথা আছে না—‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’। এখানেও তাই হয়েছে। হরিণের বড় শত্রু হল তার নিজেরই সুস্বাদু মাংস। সেই লোভে মানুষ হরিণ শেষ করে ফেলছে এই আঁচড়হাটির জঙ্গলেও। দু’ দিন পরে বাঘেরও খাদ্যসংকট দেখা দেবে। তখন বাঘ আবার অন্য জঙ্গলে পাড়ি জমাবে। এখনই চল, যাই, বাঘ দেখে আসি!’

   আমি বললাম, ‘জায়গাটা কোথায়, কীভাবে যাওয়া যাবে, কতদিনের প্রোগ্রাম, থাকব কোথায়, সেসব তুই ঠিক করে বল। আমার তো সরকারি অফিস। ছুটির সমস্যা নেই।’

   অন্তু একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘সামনে যদি ইলেকশান ডিক্লেয়ার করে দেয়, তবে আমার ছুটি পাওয়ার চান্স নেই। তার আগে চল, দিন পনেরোর মধ্যে একটা প্ল্যান খাড়া করা যাক।’

   শ্রীনিবাস ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আগে দেখি, থাকার জায়গাটা পাই কিনা। তোরা মনে-মনে তৈরি হয়ে থাক। আমি ফরেস্টে গিয়ে সব খোঁজখবর করে তোদের ফোন করছি।’

   ভবেশ সব কিছুতে গাঁইগুঁই করতে পছন্দ করে। মাথা চুলকে বলল, ‘সেই কবে করোনা পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছে বলা যায়! অথছ আমার স্কুলে করোনার সময় ক্লাস নাইন-টেনকে অন লাইনে যে কোচিং করানোর চল শুরু হয়েছিল, সে আজও চলছে। স্কুলের সময় ক্লাস, সন্ধে থেকে অন লাইন কোচিং। কী যে জ্বালায় পড়েছি না। দেখি, হেডস্যারকে কথাটা বলে ছুটি পাই কিনা।’

   এরকমই বলা-কওয়ার পর শ্রীনিবাস বাঁকুড়ার জয়নগরের জঙ্গলে তার ডিউটির জায়গায় চলে গেল। গিয়েই শুনল প্রিন্সিপ্যাল চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট আসছেন মহারাষ্ট্র থেকে জয়পুরে তবে দিন পনেরোর মধ্যে তাঁর আসার এবং চলে যাওয়ার পর্ব মিটে যাবে।

   সেদিন শ্রীনিবাসের ফোন এল অন্তুর কাছে। শ্রীনিবাস বলল, ‘শোন, আমাদের আঁচড়হাটির জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়ার কোনও বাধা আপাতভাবে নেই দেখতে পাচ্ছি। তবে আলিপুর আবহাওয়া অফিস থেকে খবর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হচ্ছে একটা নিম্নচাপরেখা। সেটি যদি দিন পনেরোর মধ্যে শক্তি অর্জন করে প্রবল আকার ধারণ করে, তা হলে আমার ছুটি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল তবু তোরা তৈরি থাকিস!’

   অন্তু সকলকে এই খবরটা কনভে করে দিল। অন্তু বলল, ‘এর মধ্যে আমাদের টিকিট কেটে ফেলতে হবে। আমরা এন জে পি’র টিকিট কেটে নিই অন লাইনে?’

   আমি বললাম, ‘তুই তা হলে ট্রেনের টিকিটটা কেটে নে শিয়ালদা থেকে এন জে পি। তারিখটা সতেরো নভেম্বর, মনে রাখিস কিন্তু

   সেরকমই টিকিট কেটে ফেলল অন্তু। কোন ট্রেন কোন স্টশন থেকে কোথায় যায়, সব অন্তুর নখদর্পণে। এক-এক সময় আমার সন্দেহ হয়, অন্তু বুঝি কখনও রেলওয়েতে চাকরি করত কি? না হলে ট্রেনের এত খবর জানল কেমন করে?

   দিন যতই এগিয়ে এল, ততই দেখা গেল, বঙ্গোপাগরের নিম্নচাপ সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আপাতত তার আর দেখা পাওয়ার চান্স নেই। এর মধ্যে শ্রীনিবাসের প্রিন্সিপ্যাল চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট, মহারাস্ট্রের ভদ্রলোকের শ্বশুরমশাইয়ের মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে। তিনি তড়িঘড়ি শ্বশুরবাড়িতে সপরিবার রওনা হয়ে গেছেন বেঙ্গালুরুতে। যা খবর, তাঁর দিন পনেরোর আগে তো ফেরাই হবে না।

   আমরা কোথায় উঠব, সেসব শ্রীনিবাস খোলসা করে কিছুই জানায়নি। শুধু ফোন করে অন্তুকে বলে দিয়েছে, ‘সতেরো তারিখ তোরা ট্রেনে চড়ে পরের দিন এন জে পি-তে নেমে স্টেশনের বাইরে চলে আয় ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। দেখবি একটা ঝাঁকড়া কৃষ্ণচূড়া গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। তারই ছায়ায় আমি তোদের নিতে দাঁড়িয়ে থাকব।’

   ক’ দিনের জন্যে আমরা আঁচড়হাটির জঙ্গলে যাচ্ছি, সেসব কোনও কথাই শ্রীনিবাস জানায়নি। দিন সাতেকের বেশি লাগবে না ধরে নিয়েই চব্বিশ তারিখ ফেরার টিকিট কেটে রেখেছে অন্তু।

   রোদ ঝলমলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামতেই মন ভাল হয়ে গেল সকলের। কাঁচা সোনার মতো রোদ উঠেছে। স্টেশনের বাইরে তিন-চারটে চ্যানেলে অনেক ভাড়ার জিপ দাঁড়িয়ে আছে। প্যাসেঞ্জারদের মধ্যে ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেছে। ওদের সেসব কিছু করতে হল না। দূর থেকে হাত নেড়ে শ্রীনিবাস ডাকল। গাড়ি রেডি করেই রেখেছিল শ্রীনিবাস। লাগেজ উঠিয়ে নিল ড্রাইভার। অন্তু ড্রাইভারের বাঁ দিকের সিটে বসল। আমি, ভবেশ আর শ্রীনিবাস, আমরা মাঝের সিটে তিনজন। গাড়ি স্টার্ট দিতেই শ্রীনিবাস ড্রাইভারকে বলল, ‘রাজদীপ, কালিম্পং চলো!’

   ড্রাইভার ছেলেটির বছর বাইশেক বয়স হবে। হাসিখুশি। নিচু স্বরে কথা বলে। সে আগে নাকি এর আগে বার দুয়েক আঁচড়হাটির জঙ্গলে টুরিস্ট নিয়ে গেছে। শ্রীনিবাস জলপাইগুড়ি রেঞ্জের ফরেস্টের লোকজনের কাছ থেকে ওর খোঁজ পেয়েছে।

   গাড়ি স্টার্ট দিয়েই ছুটছিল সাঁইসাঁই করে। রাজদীপ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা আঁচড়হাটির জঙ্গলে বাঘ দেখতে যাচ্ছেন তো? সে কি আর সকলের ভাগ্যে ঘটে? শুনেছি, মাত্র গোটা তিনেক বাঘ আছে জঙ্গলটায়।’

   শ্রীনিবাস হেসে বলল, ‘আমি তো শুনেছি, দুটো বাঘের কথা। যেসব ফরেস্ট ওয়াচারের ক্যামেরায় তারা ধরা পড়েছে, তার সংখ্যা দুই। তুমি আবার শুরু থেকে বাঘের সংখ্যা বাড়িয়ে বলতে শুরু করলে যে?’

   রাজদীপ বলল, ‘বাঘ দেখতে পেলে দেখবেন। বাঘ তো আর আমার পোষা বাঘ নয়। জঙ্গলে বাঘ দেখতে টিকিটও লাগে না। চলুন!’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘রাজদীপ, আমি শুনেছি, আঁচড়হাটির জঙ্গলে একটা ‘বাঘপথ’ নামে নাকি একটা রাস্তা আছে। স্থানীয়রা সে রাস্তাটার ওরকম নাম রেখেছে। বাঘ ওই পথে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে হরিণ আর ইয়াকের খোঁজে। সন্ধের মুখে বাঘ ফিরে যায় জঙ্গলের ওই পথ দিয়েই। তুমি কি সে পথটা চেনো?’

   রাজদীপ সত্যি কথা বলতে পছন্দ করে বোঝা গেল। সে গুলগাপ্পায় বিশ্বাস করে না। রাজদীপ বলল, ‘একবার গিয়েছিলাম। নেওড়া ভ্যালি থেকে তিরিশ কিলোমিটার জঙ্গলে ঢুকলে তবে আঁচড়হাটির জঙ্গল। সে রাস্তার পাশে গভীর জঙ্গলের দিকে এগোলে একটা ছোট জলাশয় পড়ে। শুনেছি হরিণরা সেখানে জল খেতে আসে। আর জানেন তো স্যার, হরিণ আসে মানে বাঘও আসবে। শিকারের লোভে তো বটেই, বাঘেরও তো তেষ্টা পায়।’  

   ‘আঁচড়হাটি জঙ্গলে ঢুকলে কিলোমিটার খানেক এগোলে একটা ‘লেপচা ভিলা’ আছে। ওর মালিক ফুরকিত লেপচা। টুরিস্ট গেলে সে ওখানে থাকার ব্যাবস্থা করে দেয়। ফুরকিতের ছেলে মিলন লেপচা আঁচড়হাটির জঙ্গলটা ভাল করে চেনে। আমাদের আজ ফুরকিত লেপচার ভিলায় থাকার কথা। তুমি ওখানে নিয়ে চলো!’

       শ্রীনিবাসের কথায় ঘাড় নাড়ল রাজদীপ। এবার শুরু হয়ে গেল জঙ্গল। দু’ পাশে বড় বড় শাল-সেগুনের প্রাচীর। দু’-একটা বনপাখি এদিক থেকে উড়ে ওপারের জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হ্যাঁ রে শ্রীনিবাস, ওখানে ফরেস্ট বাংলোটাংলো নেই?’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘আরে, এটা পপুলার টুরিস্ট স্পট নয় রে। এখানে এখনও রিসর্ট তৈরি হয়নি, গেস্ট হাউসও নেই, থাকার মতো হোটেলও পাবি না। যা আছে সবেধন ওই একটাই ‘লেপচা ভিলা’। ফুরকিতের বউ জানকী দারুণ বনমুরগি রাঁধতে পারে বলে শুনেছি। ওটা পেলে জমে যাবে!’

   অন্তু বলল, ‘বনমুরগি জুটুক কি না জুটুক, বাঘ দেখতে পেলেই হল। আমার অত দামি ক্যামেরাটা এনেছি তো! নিরাশ করিস না যেন! অন্তত একটা বাঘের ফোটো না তুলে ফিরব না, এই বলে দিলাম।’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘বাঘের ফোটো না হোক, ভল্লুকের ফোটো এক-আধটা তুলতে পারি নিশ্চয়ই।’

   আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন, আঁচড়হাটির জঙ্গলে বুঝি ভল্লুকের দেখা পাওয়া যায়?’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘দ্যাখ দেবতোষ, এরকম তো শুনেছি! চল, গিয়ে সব ঠিকঠাক দেখা যাবে। সব জঙ্গল নিয়েই কত না কাহিনি ছড়িয়ে থাকে। আঁচড়হাটি নিয়েও কত না গল্প শুনেছি।’

   নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের গেট ছাড়িয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল ‘লেপচা ভিলা’র দিকে। সূর্য বিকেলের দিকে ঢলে পড়েছে। সবুজ বনরেখার উপর তারই শেষ আলো স্পর্শ রেখে অস্তাচলে চলে যাবে একটু পরে। কিছুক্ষণ পরে আমাদের গাড়ি পোঁছে গেল ফুরকিত লেপচার ভিলায়। একটা বছর বাইশের ছেলে এসে তুবড়ে যাওয়া গেটটা খুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা জলপাইগুড়ির ফরেস্ট রেঞ্জার সাহেবের কাছ থেকে আসছেন তো?’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘হ্যাঁ। আমাদের চারদিনের বুকিং আছে তোমাদের ভিলায়। তোমার নাম কী? ফুরকিত লেপচা নেই?’

   ছেলেটা বলল, ‘আমার নাম মিলন লেপচা। বাবা আপনাদের জন্যে হাটবাজার করে আনতে গেছে নেওড়া ভ্যালিতে। এক্ষুনি চলে আসবে।’

   মিলন কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওদের উপরের কাঠের ঘরে নিয়ে গেল। একটা বড় ঘর। তাতে চারটে বেড। বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। অ্যাটাচড বাথ। মিলন বলল, ‘গরম জল লাগলে বলবেন, আমি নীচ থেকে এনে দেব। খাওয়ার ঘর নীচে।’

   একটু পরে মিলন চা নিয়ে এল। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ গো মিলন, বাঘ দেখতে পাব তো?’

   শ্রীনিবাস জিজ্ঞেস করল, ‘শুনেছি ‘বাঘপথ’-এর ধারে নাকি তোমাদের একটা মাচা বানানো আছে? বাঘ নাকি মাচার পাশ দিয়ে যাতায়াত করে?’

   মিলন বলল, ‘মাচায় বসে বাঘ দেখতে চাইলে মাচার ভাড়া লাগে। রাতপিছু পাঁচশো টাকা।’

   ভবেশ জিজ্ঞেস করল, ‘ভাড়া না হয় দেওয়া যাবে। কিন্তু মাচায় বসে বাঘ দেখতে পাওয়া যায় কি?’

   মিলন হেসে বলল, ‘এ পর্যন্ত যারাই মাচা ভাড়া করে বাঘ দেখতে এসেছে, কেউ নিরাশ হয়নি।’

   ভবেশ ফের জিজ্ঞেস করল, ‘বাঘ রাতে কখন ওই পথে নামে?’

   মিলন বলল, ‘ভোররাতের দিকে।’

   অন্তু বলল, ‘ভাই, মোট ক’টা বাঘ আছে আঁচড়হাটির জঙ্গলে?’

   মিলন কাপ-প্লেটগুলো ট্রে-তে সাজাতে সাজাতে বলল, ‘দুটো বাঘ আছে, এটা পাক্কা। কেউ বলে নাকি একটা বাঘিনি এসে এ জঙ্গলে আস্তানা গেড়েছে। সত্যি-মিথ্যে বলতে পারব না।’

   ‘তুমি কি নিজে কখনও বাঘ দেখেছ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

   মিলন বলল, ‘না, আমি কখনও বাঘ দেখিনি। তবে আমার বাবা ক’বার বাঘ দেখেছে।’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘আমাদের ড্রাইভার রাজদীপ তিনটে বাঘের কথাই তো বলল গাড়িতে আসতে-আসতে?’

   মিলন কাপ-প্লেট নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে-যেতে বলল, ‘কী জানি। বাবাকে জিজ্ঞেস করবেন।’

   খানিক পরে ফুরকিত লেপচা এসে উঠে এল উপরে। লম্বা দোহারা চেহারা। মাথায় কাঁচা-পাকা বাবরি চুল। গায়ে নীলচে রঙের ফতুয়া। একটা কালো রঙের বারমুডা পরনে। হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, কোনও কষ্ট হয়নি তো? জলপাইগুড়ির রেঞ্জার সাহেব পাঠিয়েছেন। পান থেকে চুল খসলেই মহা বিপত্তি!’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘আমি বাঁকুড়ার জয়পুর ফরেস্টে চাকরি করি। তবে তোমার চিন্তা নেই। ভুলত্রুটি হলে আমরা মানিয়ে নিতে জানি। রেঞ্জারসাহেবকে বলতে যাব না। একটা কথা বলো তো ফুরকিত, কবে আমরা বাঘ দেখতে যাব? তুমি সঙ্গে যাবে তো?’

   ফুরকিত হাসতে হাসতে বলল, ‘না না স্যার, এমনিতে আপনারা চারজন! আপনাদের সঙ্গে আমি আর ভিড় বাড়াব না। বেশি লোক গেলে বাঘ টের পেয়ে যায়। বরং আমি খবর পেলে আপনাদের বলব। সেদিন যাবেন।’

   অন্তু মজা করল, ‘তোমার কাছে কি ওয়্যারলেসে খবর আসবে নাকি?’

   ফুরকিত লেপচা বলল, ‘বাঘ নেমে আসার দিন সন্ধে থেকে হরিণগুলো ছোটাছুটি করে। ভল্লুকগুলো দৌড়োদৌড়ি শুরু করে দেয়। ও আমি ঠিক বুঝতে পারি।’

   জঙ্গলের রাত ভারী সুন্দর। নির্জন। দূর থেকে রাতপাখির ডাক ভেসে আসছে। ভাগ্যে থাকলে দু’-একবার বাঘের গর্জনও হয়তো শোনা যাবে জঙ্গল কাঁপিয়ে।

   ফুরকিত বলল, ‘আজকের রাতটা আমার ভিলায় কাটান। ভাল করে বনমুরগির ঝোল আর ভাত খান। আমার বউ জানকী কিন্তু মাংসটা ভালই রাঁধে। পায়ে হেঁটে আবার জঙ্গল দেখতে যাবেন না যেন! কাল মাচায় বসে বাঘ দেখার ব্যবস্থা করে দেব। আমার ছেলে মিলন সব ব্যবস্থা করে আসবে। সঙ্গে রাতের খাবার দিয়ে দেব, পরোটা আর মাংস। ফ্লাস্কে গরম চা দিয়ে দেব। মাচায় বসে বাঘ দেখবেন।’

   সেরকমই ব্যবস্থা হল। সারাদিন লেপচা ভিলার আশপাশে ঘুরে কাটল। সন্ধে নামার মুখে মিলন আমাদের নিয়ে গাড়িতে করে পৌঁছে দিল মাচার কাছে। একটা নড়বড়ে বাঁশের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম চারজনেই। মাচার চারপাশে রেলিংয়ের মতো করে বাঁশ দিয়ে ঘেরা। পাটাতনের উপর ছেঁড়া তোষকের মতো একটা গদি পাতা। একটা সাত ব্যাটারির টর্চ শ্রীনিবাসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মিলন গাড়ি নিয়ে চলে গেল।

   যাওয়ার সময় রাজদীপ বলে গেল, ‘আপনারা সাবধানে থাকবেন। বাঘের মতো চতুর প্রাণী কিন্তু জঙ্গলে বেশি নেই

   টানটান রোমাঞ্চ নিয়ে রাতের এক-একটা প্রহর কাটতে লাগল। ফুরকিত লেপচা কিন্তু একটা কথা বলে দিয়ে গেল আমাদের, ‘স্যার, জঙ্গলের বুনো গন্ধের সঙ্গে যদি নাকে আসে পচা বোটকা গন্ধ, তা হলে জানবেন তিনি এসে গেছেন!’

   সারারাত নাক সিঁটকে চারজন চারদিকে তাকিয়ে বসে থাকলাম। দূরে জঙ্গলের মাথায় একটা তারা খসে পড়ল। একবার খামোকা সাঁ-সাঁ করে ঝোড়ো বাতাস বইল। কিন্তু না, কোনও বোটকা গন্ধ চারজনের কেউই পেলাম না।

   ভোর হয়ে এল। বনের পাখি বেরিয়ে পড়ল খাবারের খোঁজে। সূর্য উঠি-উঠি করছে ভোরের আকাশে। আমদের বাঘ দেখার প্রথম দিনটা নিরাশায় ডুবে গেল। এমন সময় অন্তু আঙুল তুলে চাপা গলায় বলল, ‘দেবতোষ, ওই দ্যাখ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার!’






   আমরা কোমর তুলে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলাম। অন্তু বলল, ‘আরে, ওই তো, দূরের ঝোপটার পাশ দিয়ে দ্যাখ, একটা মা-বাঘ তার তিনটে বাচ্চাকে নিয়ে সকালের রোদে খেলা করছে। আরে, ওই তো, ওই ঝোপটার বাঁ দিক দিয়ে সোজা তাকা।’

   প্রথমে আমি দেখতে পেলাম। তারপর শ্রীনিবাসও বলে উঠল, ‘হ্যাঁ রে। একটা বাঘ আর তার তিনটে বাচ্চা!’

   ভবেশ সকলের শেষে দেখতে পেল এই দৃশ্যটা। হঠাৎ চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে মা-বাঘটা হাওয়া হয়ে গেল কোথায়? ওমা! এই তো ছিল? আমাকে বাঁ হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে অন্তু ক্যামেরাটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাঁশের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার তাল করল। মুখে বলল, ‘ক্যামেরা এনেছি, ফোটো তুলব না তা কি হয়? ফিরে গিয়ে সকলকে দেখাব কী?’

   আমি ওর প্যান্ট ধরে টেনে রাখলাম। বললাম, ‘তুই কি পাগল হয়েছিস রে অন্তু? বাঘের ফোটো তুলবি? যা তোলার মাচার উপর থেকে তোল। আমি তোকে নামতে দেব না।’

   শ্রীনিবাস বলল, ‘শোন, দৌরাত্ম ভাল নয় অন্তু! শান্ত হয়ে বোস!’

   ভবেশ অন্তুকে নিষেধ করতে গিয়ে জড়িয়ে-মড়িয়ে কী যে বলল, বোঝা গেল না। অন্তু বলল, ‘শোন, মা-বাঘটা মনে হয় শিকারের খোঁজে কোথাও চলে গেল। এই তো সুযোগ বাচ্চা বাঘ তিনটের ফোটো তোলার! এ সুযোগ কি জীবনে কখনও আসবে রে, পাগলা!’ বলে আমার হাত ছাড়িয়ে তরতর করে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে নেমে গেল অন্তু। কিছুতেই আটকানো গেল না অন্তুকে।

   আমরা মাচার উপর পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে বসে থাকলাম। অন্তু গটগট করে হেঁটে এগিয়ে গেল বাঘের বাচ্চা তিনটের একদম কাছে। তারপর নিচু হয়ে হাঁটু মোড়ার মতো ভঙ্গিতে ফোটো তোলার জন্যে ক্যামেরা তাক করল অন্তু।

   তারপর জঙ্গল তোলপাড় করে প্রচণ্ড গতিতে কিছু একটা ঝাঁপিয়ে পড়ল অন্তুর উপর। পলক ফেলতে না-ফেলতে তীব্র ঝটাপটির শব্দটা মুহুর্তে মিলিয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে। তখন বাঘের বাচ্চা তিনটে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, অন্তু নেই!




--------------------------------------------------------------------------


আপনারাও এই বিভাগে আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে পারেন। মতামত জানান। 


ankurishapatrika@gmail.com


 -------------------------------------------------------------------------  অঙ্কুরীশা-র পাতায় ক্লিক  করে  পড়ে নিন  —  

        https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/09/blog-post_11.html         

   


বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২০

শুক্রবারের গল্প।। গরিবিয়ানা — উত্তমকুমার পুরকাইত।।





 ৷।শুক্রবারের গল্প।। 


গরিবিয়ানা  

 উত্তমকুমার পুরকাইত 


  আকাশের দিকে চেয়ে থাকে সঞ্জয়। মনটা ভাল নেই। বউ আর বউমা কিছুতেই মিলছে না। দু'জন দু'জনকে সহ্য করতেই পারে না। এই নিয়ে ছেলে-মায়েও লেগে যায়। ক'দিন আগে তো ছেলে মাকে বলল, মনে হিংসা থাকলে সততা আর দায়বদ্ধতা নিয়ে কি ধুয়ে খাবে? ওটা দূর করো, তবে এগোতে পারবে। বছর দশেক আগে মুখার্জিবাবুও তাই বলেছিল। গরিবের গরিবিয়ানা না ঘুচলে সে চারদিকে উদার চোখে তাকাতে পারে না, তার মনের মধ্যে ক্ষোভ জমে, সে পৃথিবীকে সুন্দর করে দেখতে শেখে না।

  স্বপনের মাথার ঘিলু টগবগিয়ে উঠেছিল। গরিবের হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস দেখলেই কেন যে এদের জ্ঞানে পায়! ঠিক এই সুযোগে সেও বলেছিল, এবার একটু মাইনে বাড়িয়ে দিন না বাবু।

  মুখার্জিবাবু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল। মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছিল, হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। 

  মাস শেষ হল। মাইনে বাড়ল না। সঞ্জয় মনে করিয়ে দিতেই লোকটা হাঁ হয়ে গেল। তাৎক্ষণিক বিপর্যয়কে সামাল দিতে তখনকার মতো বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ দেখছি।  

  আরও কয়েকটা সপ্তাহ, মাস কেটে গেল। লোকটার দেখা আর হয়ে উঠল না। ছেলে-গিন্নির চাপে বছর শেষের মাইনে বাড়াতে গিয়ে যে-লোক ইতস্তত করত, হাত খুলে তাকাতে পারত না, অথচ জ্ঞান...  

  এসো দেখি বাড়িতে একটু এসো। এমন ঠূঁটো জগন্নাথের মতো বোবা সেজে থাকলে হবে না, একটা বিহিত করতে হবে। নইলে ও থাকবে, নয় আমি।

  সূর্য ডুবে গেছে। একটা মেয়ে বুড়ো বলদটাকে দড়িতে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে গোয়ালে। বুড়ো হলে মানুষকেও কি সবাই এভাবে আছাড়িপিছাড়ি টানে? 

  কী হল, শুনতে পাচ্ছ? একটু পা চালিয়ে এসো। 

  কেন কী হয়েছে? তোমার বউমা এই ভর সন্ধেয় বেরিয়েছে, বাপের বাড়ি যাবে।

  যেতে চাচ্ছে যাক না। মিছিমিছি অশান্তি বাড়াচ্ছ কেন?

  ও যা ইচ্ছে তাই করবে! সংসারে মঙ্গল-অমঙ্গল বলে কিছু নেই? ওর না হয় যা কিছু হল, কিন্তু ছেলেপিলে...

  চুপ থাকলে হবে না, কিছু একটা বলতে হবে বলে দিলুম।

  লাঠিটা বাড়িয়ে দেয় সঞ্জয়। গোধূলির আলোয় একটা প্রজাপতি। জীবনে কতবার একটু রঙের প্রত্যাশায় হাত বাড়িয়েছিল, কেউ এগোয়নি। বউটাও না। এই বয়সে কোমর বেঁকিয়ে তরতরিয়ে কেমন চলেছে। প্রতিদিন বউমার সঙ্গে ঝগড়া করবে, আর তার কাছে শালিস মাঙবে। 

  সে গরিব ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল। সে মুখার্জিবাড়িতে কেয়ারটেকারের কাজ করত, আর বউ গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে কাঁথা সেলাই করে বেড়াত। তাতে হয়তো কেউ একবাটি চাল দিল, কেউ বাগানের সব্জি দিল, কেউ ছেলের বই কেনার টাকা দিল। চলে যেত। সে কম রোজকার করত বলে বউ কখনও টানাহেঁচড়া করত না। একবার রেগেছিল বউ। ছেলেটা যেদিন পলিটেকনিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হল। সঞ্জয়ের আশা ছিল বাবু তার বিশাল চৌহদ্দিতে ছেলেটার একটু ঠাঁই দেবে। গ্রাম থেকে কলকাতা যাতায়াত করে পড়াশোনা তো সম্ভব নয়। সঞ্জয় সাহস করে বাবুর কাছে পেড়েছিল, ছেলেকে একটু জায়গা দেবেন বাবু। লোকটা মুখের দিকে তাকাল, দেখি তোর গিন্নিমার সঙ্গে কথা বলে।

  সঞ্জয় অপেক্ষায় ছিল। দু'দিন গেল, চারদিন গেল, ছ'দিন। কোনও জবাব এল না। মুখার্জিবাড়ির ছোটছেলে একদিন মদ খেয়ে ব্যালকনি থেকে চেঁচাতে শুরু করল, কাজের লোকের এখানে ঠাঁই হতে পারে, তাই বলে তার পোষ্য? কারও ঠাঁই হবে না এখানে, কারও না। সঞ্জয় হাসল। মানুষটা বলেছিল, গরিবের গরিবিয়ানা না ঘুচলে সে চারদিকে উদার চোখে তাকাতে পারে না।

  সেই প্রথম রেগেছিল বউ, কাদের দেখভাল করতে পড়ে আছো ওখানে? পিশাচ! চলে এসো এখানে।

  একটু ইতস্তত করেছিল সঞ্জয়, কিন্তু এতদিন পরে গ্রামে গিয়ে বা কী করব বলো তো? এই বয়সে গ্রামের খাটনিতে বড় কষ্ট। 

  ওখানে পড়ে থাকতে তোমার লজ্জা করছে না? কী করবে আমি ভেবে রেখেছি, চলে এসো। 

  রাতারাতি ব্যাগপত্তর গুছিয়ে নিয়েছিল সে। সূর্য ওঠার আগে বাবুর ঘরে গিয়ে দরজায় ঠোক্কর দিয়েছিল।

  দরজাটা খুলে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বাবু সামনে দাঁড়িয়েছিল, কী ব্যাপার?

  আমি চলে যাচ্ছি।

  চলে যাচ্ছি মানে?

  এখানে পোষাচ্ছে না, কাজ করব না।

  কী বলছিস এসব!

  সঞ্জয় হেসেছিল। গিন্নিমা একটু থতমত খেল, কিন্তু বাছা হঠাৎ করে যাব বললে তো হয় না। সঙ্গে সঙ্গে কাজের লোক আমরা পাব কোথায়?

  মুখার্জিবাবু দু'চোখ তুলে তাকাল, তোর এখানে অসুবিধা কোথায়?

  আপনি তো জানেন অসুবিধা কোথায়। গরিবদের হয়ে কথা বলবেন, অথচ গরিবি দূর করার সু্যোগ পেয়েও চোখ বুজে থাকবেন, এতেই তো রাগ হয় আপনাদের উপর। আপনার উপর ভরসা করে আমি ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বলেছিলাম। আপনি কথা রাখলেন না। আপনারা মনে-প্রাণে কেউ চান না দেশ থেকে গরিবিয়ানা দূর হোক। সোজাটা ভাবার পর বাঁকাটাও ভেবে ফেলেন আপনারা। তাহলে আপনাদের ফাইফরমাশ খাটবে কে? আপনাদের চাকরগিরি করবে কে?

  মুখ সামলে কথা বল সঞ্জয়। ছোট মুখে বড় কথা বলিস না।

  উপর থেকে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে নীচে নামছিল বাড়ির ছোট ছেলে। ট্যারা চোখে তাকাল, যাব বললে তো যাওয়া যায় না।

  যদি যাই আটকাতে পারবেন?

  পুলিশে দেব, চুরির দায়ে।

  সঞ্জয় সামলাতে পারল না নিজেকে। ওরা সক্কলে ঠোঁট চেপে হাসল। সঞ্জয়ের চোখে-মুখে বারুদ। ফস করে জ্বলে উঠল, জেল থেকে ফিরে যদি সবকটাকে খুন করি।

  কী বললি হারামির বাচ্চা? ছোটবাবু ছুটে এসে ওর গলাটা চেপে ধরে, খুন করব শুয়োরকে।

  সবাই মিলে থামিয়ে দিয়েছিল সে যাত্রায়। গিন্নিমা চিৎকার করে বলেছিল, ও ছোটলোক হয়ে বড়লোকের সুখ-স্বাচ্ছন্দকে ঈর্ষা করতে পারে, কিন্তু তা বলে তুইও মাথা গরম করবি।

  মুখার্জিবাবু সবার সামনে হুকুম করল, ওকে যেতে দাও।   

  গ্রামে ফিরেছিল সঞ্জয়। বউকে সঙ্গে নিয়ে মুড়িভাজার ব্যাবসায় নামল। একটু একটু করে অভাব ঘুচল। ছেলেটা পলিটেকনিক পাশ করে কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হল। দূর হল তাদের গরিবিয়ানা। ছেলেকে দেখেশুনে পছন্দ ঘরে বিয়ে দিল। নাতি হল, নাতনি হল। সুখের আলোয় যখন চারপাশ ঝলমলে দেখাচ্ছে, তখনই বউ-বউমার ঠোক্কর। 

  বউমা পরিষ্কার জানিয়ে দিল, শুধু জল তোলার লোকে তো হবে না, রান্নার লোকও একজন চাই।

  তেড়ে নেমে এল বউটা, আর তুমি কী করবে? শুয়ে শুয়ে সিনেমা?

  বউমা বিছানায় শুয়ে পা দোলাচ্ছিল। সোজা হয়ে বসল, দ্যাখো মা, খোঁচা দেবে না। আমি কেয়ারটেকারের বউ নই।

  ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদল বউ, শ্বশুরকেও খোঁচা দিচ্ছ! ওরে কে আছিস শোন, আমরা গরিব ছিলাম, কিন্তু মানুষ ছিলাম গো। এ কে এল আমাদের ঘরে? মেরে ফেলবে গো।

  বউমা নীচে নামল, খবরদার চেঁচাবে না। আমারও কাজ আছে, ছেলেমেয়েকে পড়ানো।

  আহা পড়ানো! ভাত-পান্তা ছেড়ে রাতদিন দোকানের খাবার গিলছে, আর কার্টুন দেখছে। পড়বে!

  সঞ্জয় অতীষ্ঠ হয়ে বারান্দায় নেমে পড়ত। ছেলের দেখাশোনার সময় বউকে কতবার বলেছিল, আমরা যেমন ঝাড়ের, তেমন ঝাড় দেখবে। সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি।

  বউ কথা শোনেনি। ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিল তার কথা, আমি মুখ্যু বলে, কালো বলে, বউকেও তাই আনব নাকি? আমাদেরও তো শখ-আহ্লাদ আছে। ছেলেরও আছে।

  সঞ্জয় হেসেছিল, ছেলে চাকরি পাওয়ায় তাহলে তো বড়লোক হয়ে গেলে। এবার মুখার্জিবাবুদের মতো হবে। ধরাকে সরা জ্ঞান। চারপাশের মানুষকে গরিব ভেবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে।   

  চুপ করো তো। তোমার ওই বাবুর মতো কাফের হব না।

  সঞ্জয় মনে মনে হাসে, হবে গো বউ হবে। নিজের সঙ্গে বউমার ফারাকটা চোখে পড়ছে তোমায়। তোমার ঈর্ষা হচ্ছে। মনের কোণেও তুমি গরিব রয়ে গেছ। অভ্যাস পালটাতে পারোনি।

  ছেলে বলেছিল, তোমরা কষ্ট করেছিলে বলে বউমাকেও কষ্টের মধ্যে দেখবে। এত ছোট মন কেন তোমাদের? এখন তো সময় ফিরেছে। তবু সুখী হতে পারছ না কেন? গরিববেলার গ্লানিকে বুকের মধ্যে পোষ্য করে রেখেছ কেন? সবার সুখ দ্যাখো। কত গরিব তো আজকাল স্টাইলে দিন কাটায়। অথচ তোমরা... তোমরা হলে জন্মদুঃখী। নিজে ভাল থাকবে না, আর কাউকে ভাল থাকতে দেবে না। তোমাদের স্বভাবটাই নষ্ট হয়ে গেছে। 

  অফিসের সাজগোজ করে কাঠ-কাঠ কথাগুলো মাকে বলে হনহন করে বেরিয়ে গিয়েছিল ছেলে।

  হাউহাউ করে কেঁদেছিল মা। সঞ্জয়ের হাতদুটো জড়িয়ে ধরে।

  কী গো আসবে? বউটা আবার ডাকে। 

  এই বয়সে সঞ্জয়ের আর কারও সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি করে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কত ভেবেছিল, ছেলে নেই, বউমা এসে শ্বশুর-শাশুড়িকে বাপ-মার মতো মান্য করবে। সারাক্ষণ এ নিয়ে অশান্তি করে বউ। অথচ মেয়েটার স্বভাব বদলায় না। 

  হঠাৎ পুকুরের ওপাশ দিয়ে তেড়েফুঁড়ে একটা কান্না বেরিয়ে আসে। ফেলুকার বাপটা মরল বোধহয়। অনেকদিন ভুগছিল বুড়োটা। কিডনির রোগে। ছেলে-বউ একটু চিকিৎসা করাল না। কতবার মানুষটা তাকে বলেছে, নিজের দুঃখ নিজের কাছে রাখিস বাবা, কাউকে জানাতে যাস না। কেউ কারও নয়।

  লোকটা মরে গেল। ছেলে, ছেলের বউ কেউ দেখত না। বেঘোরে মারা গেল।    

  প্রজাপতিটা ওড়ে। অন্ধকারে ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। সঞ্জয় দাঁড়ায়। আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। বড় অন্ধকার। তবু ঈশানে একফালি ঠোঁট। কনেবেলার মেয়ের মতো। একটাও জোনাকি নেই। শুধু একটা ঠোঁট। বউটা সব ভুলে হারিয়ে যাওয়া ঠোঁট নিয়ে আবার যদি চেয়ে থাকত। বউটার জন্য কষ্ট হয়। খাটতে খাটতে জীবনের সব রসকষ শুকিয়ে ফেলেছে। আবার যদি নতুন করে তাকাত তার দিকে, হয়তো বদলাত। হয়তো নতুন করে তাকাত ছেলের দিকে, ছেলের বউয়ের দিকে, নাতি-নাতনির দিকে। কান্নাটা উত্তোরত্তর বাড়তে থাকে। যারা জীবিতকালে দেখল না, তারা এখন মরা কান্না কাঁদছে। ভাল লাগে না কিছু। ভাল হয়েছে, ফেলুকা মরেছে। 

  বেশভূষা করে ছেলে-মেয়ের হাত ধরে বউমা উঠান ছাড়িয়ে পথে নেমেছে। বউটা সমানে চিৎকার করছে, গুরুজনকে মানে না ও। গ্রামে একটা মানুষ মরেছে, এ-সময় বেরোয়, ওর আক্কেল নেই।

  লাঠি হাতে বউমার সামনে দাঁড়ায় সঞ্জয়, অন্য কোনওদিন যেও মা। লোকে খারাপ বলবে।

  ক'দিন থেকে তো বলছি বাবা আমার মা'র অবস্থা ভাল নয়, দাদাও দিল্লি থেকে এসেছে, দেখতে। এক্ষুনি ফোন করল কাল ভোররাতে চলে যাবে, একটু দেখা করবে। তাছাড়া যে মানুষটা মরেছে আমাদের জ্ঞাতি তো নয়।

  তাতে কী? পাড়ার মানুষ তো?

  আমাকে যেতে হবে বাবা।

  তাহলে নিজে যাও, বাচ্চাদুটোর নে যাওয়ার কী দরকার? 

  বউও চিৎকার করে, কোনও কথা শুনবে না যখন নিজে যাও। আমরা ওদের দেখব। এত কথা বলে কেমন হাঁপিয়ে যায়। 

  নিজের সামলাতে পারো না, আবার ওদের! সারাক্ষণ তো গজরাবে।

  কী গো, কিছু একটা বলো।

  সঞ্জয় কী যে বলবে বুঝে ওঠে না। বেহাইয়ের শরীরটা খারাপ। পেটে টিউমার। একটা অপারেশন হয়েছে কিন্তু ডাক্তার আশ্বাস দিচ্ছে না।  এই নিয়ে অশান্তি সঞ্জয়ের পছন্দ নয়। বউটার বয়স হচ্ছে, তবু কেন যে বোঝে না। বউমাও ভাবতে পারত। একটা মান্নুষ মরেছে, অথচ ছেলেপিলে নিয়ে এই অন্ধকারে...। চারপাশে তাকালে মনে হয় কোথায় যেন সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো মেয়েটা ঠিক, তারাই ভুল। ছেলে তো সরাসরি বলল, সবাই এগোচ্ছে, অথচ তারা পারছে না। গরিব রয়ে গেছে। 

  ফেলুকাকে নিয়ে মরা কান্নাটা ক্রমশ বাড়ছে। ঝিম মারছে অন্ধকার।

  বউমা বলে, দেরি হলে গাড়ি পাব না, চললাম।

  থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বউ। বউমা দু'পা এগোতে ফোঁস করে,  অভাব নেই, বাধা নেই। জানি না কেন এত তাড়া...

  পিছন ফেরে বউমা, তুমি তো জানবে মা। তুমি মনে করো তোমার ছেলের সব ইনকামের টাকা আমার বাবার চিকিৎসায় ঢালছি।

  মেয়েটা একটু এগিয়ে আসে। একেবারে মুখের কাছে। বলে, আর নিলেই বা? ছেলে তার বাপ-মার জন্য করতে পারে, আর শ্বশুরের জন্য নয়? এত পর ভাবো তাদের! এত নীচ তোমরা! তোমার ছেলের সব ফুরিয়ে যাবে না। যাক। যে-টাকা ভালর জন্য কাজে লাগে না, সে টাকা উইপোকা খাক। ভিখিরি হোক তোমার ছেলে।

  হিম স্রোত বয়ে যায় সঞ্জয়ের শরীরে। এই অন্ধকারে মেয়েটাকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। কিন্তু বউটা যে বোবা হয়ে কাঁপছে, টের পায় সে।

  মেয়েটা অন্ধকারে ফণা নাড়াতে নাড়াতে বলে, মৃত মানুষকে নিয়ে আদিখ্যেতা দেখাতে পারো, আর একটা মরতে বসা মানুষকে বাঁচাতে পারো না। কমে যাবে তোমাদের! ছি!

  অন্ধকারকে ঘুলিয়ে দিয়ে, মরা কান্নাকে ঘুলিয়ে দিয়ে বউমা ছেলেমেয়েকে নিয়ে এগিয়ে যায়। বউটা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। সঞ্জয় কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।  




----------------------------------------------------------------


পড়ুন ও পড়ান। 

মতামত জানান 


ankurishapatrika@gmail. com


----------------------------------------------------------------