লেবেল

ভালোবাসার গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভালোবাসার গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ভালোবাসার গল্প ।। মালা ঘোষ (মিত্র)।।Ankurisha ।।E.Magazine।Bengali poem in literature ।।

 





ভালোবাসার  গল্প 

 

মালা ঘোষ (মিত্র)

১.

অপত্য


নীলাব্জ  আর সাথী দুজন দুজনকে ভালোবাসে বিয়ে করে, তারা আজ ভীষণ সুখী। নীলাব্জ ম্যাল্টিন্যাশানল কোম্পানীতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।ঐশ্বর্য  আর প্রাচুর্যে তারা পরিপূর্ণ, ভালোবাসায়, ভালোলাগায় তারা একে অপরের পরিপূরক।দেখতে দেখতে পাঁচ বছর চলে যায় কিন্তু আজও সাথী মাতৃত্বের স্বাদ পায়নি, তবে তাতে তাদের ভালোবাসা একবিন্দুও কমেনি। সাথী নীলাব্জের গলা জড়িয়েআদুরে স্বরে   বলে-- 'এই যে শোন না তুমি না আবার বিয়ে করো, ডাক্তার তো বলেই দিয়েছেন আমি আর সন্তানের জন্ম  দিতে পারবোনা।  'নীলাব্জ রাগত স্বরে বলে ওঠে আবার সেই আজে- বাজে কথা, ছাড়ো ছাড়ো আমায়। আর কোন কথা না।'অফিস থেকে এসে নীলাব্জ  বেজায় খুশি, আনন্দে সাথীর গালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলে'  শোন- না আজ আমি ডাঃ নন্দীর সাথে দেখা করেছি, উনি
বলেছেন যে চিন্তার কিছু নেই, ভাড়াটে মায়ের সাহায্যে আমরা সন্তান পাব।কয়েক দিন পর তারা ড: নন্দীর ক্লিনিকে যায়। সব পরীক্ষা করে ডাঃ নন্দী বললেন' ঠিক আছে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনারা ঠিক সময় খবর পেয়ে যাবেন।' নীলাব্জ একটা দু লাখ টাকার চেক ডাঃ
নন্দীর হাতে তুলে দেয়।তারপর নয় মাস অনন্ত অপেক্ষা, কত জল্পনা-
কল্পনা। অবশেষে ভাড়াটে মায়ের গর্ভে বেড়ে উঠছে ওদের সন্তান, এই আনন্দে ওরা খুশিতে ভেসে চলে।কত কত প্রতিক্ষা, রাতে নীলাব্জের কন্ঠলগ্না হয়ে সাথী  বলে--'এই নাম কি দেবে? আমি কিন্তু 'ছোট্টো নীলাব্জ' র নাম দেবো "ঋক"। ' আচ্ছা '-- বলে নীলাব্জ আরো জোরে বুকে টেনে নেয় সাথীকে এবং সুখে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়।ডাক্তারের ফোনে ওরা ছুটল নার্সিংহোমে, ফুটফুটে তুলতুলে ছেলে কোলে নিয়ে সাথী আর আবেগে কথা বলতে পারে না, তার চোখ দুটো বানভাসি
হয়ে যায়, তার জীবন সন্তান স্পর্শে সার্থক হয়ে ওঠে।



২.
ভালোবাসার বাড়ি 

মল্লিকার কলেজের প্রথম দিনেই দেখা হয়ে যায় মানসের সঙ্গে, ফটো আটকানোর জন্য আঠাটা ওর কাছ থেকেই পাওয়া গেল। এরপর ক্রমশ দুজন দুজনকে ভালো লাগতে শুরু করে। সময় পেলেই মানসের গান আর কবিতা মল্লিকাকে চুম্বকের মতন আকর্ষণ করে। ওই কন্ঠ যেন বিশ্বের সবচেয়ে স্বপ্নিল রঙিন আবেশ। সেই আবেশে
মল্লিকার হৃদয়ে ঢেউ ওঠে। সেই ভালোবাসার ঢেউয়ে ওরা দুজনে ভাসতে থাকে। হঠাৎ একদিন মানস বলে 'চল না আমাদের বাড়িতে'
মল্লিকা - 'গিয়ে কি বলবি! 'মানস-'বলব আমার বান্ধবী, দেখ পছন্দ কিনা? 'এই শুনে মল্লিকা আপন মনে হেসে ওঠে।মল্লিকাকে দেখে মানসের মা তো খুব খুশি। বলেন-'তুমি তো দেখছি রূপে লক্ষ্মী গুনে সরস্বতী। 'তোমার জন্য অনেক আর্শীবাদ রইল। সময় পেলে
আমাদের বাড়ি এসো।তারপর ওরা পড়াশোনা শেষ করে, মল্লিকা একটা প্রাইমারী স্কুলে চাকরি পেয়ে যায় কিন্তু মানস কিছুতেই একটা কিছু জোগাড় করতে পারে না তাই গানটাকেই  পেশা হিসাবে গ্রহণ করে। মল্লিকার বাবা এই সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। তাই অগত্যা মল্লিকা নিজের পছন্দের মানসের হাত ধরে বাপের বাড়ি ছাড়ে।

আজ মানস গীতিকার, সুরকার ও গায়ক হিসেবে বেশ পসার করেছে। মল্লিকা- মানসের ঘর আলো করে দুটি ফুটফুটে সন্তান। তারা আজ ভালোবাসার বাড়িতে বেশ সুখেই আছে।




আরও  পড়ুন  👇👇👇


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_20.html






শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ভালোবাসার গল্প।। সুধাংশুরঞ্জন সাহা।। Ankurisha ।।E.Magazine ।Bengali Poem in literature ।।

 






ভালোবাসার গল্প


সুধাংশুরঞ্জন সাহা


১.
ভ্যানচালকের গল্প


অস্তগামী সূর্য ডোবার জলের তলায় ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে । আমি পেরিয়ে যাচ্ছি চোলাই, বাংলা মদের বস্তি, মেথর, মেথরানিদের দুর্বোধ্য সান্ধ্য হুল্লোড়। টিম টিম করে জ্বলা বাল্বের আলোয় ছোট ছোট দোকানিদের লোকালয়,  কুয়াশাঘন শীতের সন্ধ্যা ক্রমেই জমে উঠছে। 
এইসব লোকালয় ফেলে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাই।  সামনেই সরকারি  ষ্ট্রিট ডগ হসপিটাল । শিবমন্দির, যেখানে সন্ধিপুজোর ঝাঁঝর ঘন্টা সমানে বেজে চলেছে । চলছে নৃত্যারতি । শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে এক তন্বী অবিরাম নেচে চলেছে। অথচ কেউ কোথাও নেই, দৃশ্যত দু'একজন বয়স্কা মহিলা ছাড়া ।

নাচতে নাচতে হঠাৎ মেয়েটি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে  । সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা থেকে ভ্যানচালক এক যুবক ছুটে এসে চোখেমুখে জল ছিটিয়ে দিতে থাকে । মেয়েটির জ্ঞান ফিরতেই তাকে ভ্যানে শুইয়ে স্থানীয় এক ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায় দ্রুত।

জানা যায় মেয়েটির নাম সূচনা দাস। বয়স আঠারো । ছেলেটি তার স্কুলের সহপাঠী । একই পাড়ায় বাস । স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আর পড়াশোনার সুযোগ না পেয়ে বাড়ির প্রয়োজনে ভ্যান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় । বাবা-মা আর ছোট ছোট ভাই-বোনের মুখ চেয়ে । সে-ই দরিদ্র পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস । 

ডাক্তারের চেম্বারের উল্টো দিকের ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ আর জল কিনে এনে সূচনাকে ওষুধ খাইয়ে দেয় । সূচনা অনেকটাই সুস্থ বোধ করে । কৃতজ্ঞতায় ওর হাত চেপে ধরে বলে, আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিবি না, অজয় ? চল, মাকে সব বলতে হবে। অজয় একগাল হেসে বলে, ওঠ, আমার হাত ধর ।







২.

ভিন্ন রঙ


মানব আমার বন্ধু । মঠপুকুরের এক কানা গলিতে থাকে । আবৃত্তিচর্চা করে ।  ধাপার মাঠে ওদের রয়েছে এক টুকরো জমি । সেই জমিতে চাষাবাদ করেই চলে যায় সংসার । সংসার বলতে এক বিকলাঙ্গ ভাই আর নিজে । এই জমিতে বারোমাস চাষ হয় লেটুসপাতা, শশা, পেঁয়াজ, ধনেপাতা,টমেটো ইত্যাদি। 

জমিতে কাজ করা ছাড়া বাড়িতে ভাইকে খাওয়ানো, স্নান করানো, জামাকাপড় পরানো সবই নিজের হাতে করতে হয় । মানব বাড়িতে ঢুকলেই আনন্দে, খুশিতে ফেটে পড়ে ভাই । মানবও ভাই ছাড়া কিছু বোঝে না । সেই ভাই-ই হঠাৎ করে চলে গেল ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকে।

এই ঘটনার পর মানব খুব একা হয়ে যায় । আবৃত্তির ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করে না, জমিতে যেতে ইচ্ছে করে না ।  আচমকা নেমে আসা বিপর্যয়ে সে যেন দিশেহারা । কোন কিছুতেই তার আর উৎসাহ নেই ।
 পাশের ঘোলপাড়ার একটি মেয়ের মা ওকে ধরলো মেয়েকে আবৃত্তি শেখাতে হবে । না, না বলেও মানবকে রাজী হতে হলো । সপ্তাহে দুদিন রাতে এক ঘন্টা করে শেখাতে হবে।

মেয়েটির নাম ব্রততী পাল । এগারো ক্লাসের ছাত্রী । লেখাপড়ায় ভালো ।  মনোযোগী । খুব দ্রুতই একের পর এক আবৃত্তি তুলে নিচ্ছে গলায় । মানবও বেশ খুশি । এভাবেই বিপর্যয় কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে মানব ।

সপ্তাহে দুদিনের জায়গায় তিন দিন, চার দিনও হয়ে যায় শেখানো । আবৃত্তির অনুষ্ঠান থাকলেও নিয়ে যায় ব্রততীকে । ব্রততীর মাও খুব খুশি । রাতে ক্লাসের পর ডিনার না খাইয়ে ছাড়ে না মানবকে ।
কখন যে মানবদা আপনি থেকে তুমিতে এসে ঠেকেছে মানব সেটা খেয়ালই করেনি । ইদানিং আবৃত্তি শেখার চেয়ে গল্প করতেই বেশি পছন্দ করে ব্রততী । একদিন আব্দার করলো পদ্মানদীর মাঝি থিয়েটারটা দেখাবে মানবদা ! মানব দুটো টিকিট কেটে আনে একাডেমির । থিয়েটারের বিভিন্ন দৃশ্যে মোহিত হয়ে ব্রততী ঘনিষ্ঠ হয় মানবের সঙ্গে । মানবও এড়াতে পারে না। অনেক দিন বাদে ভাইয়ের অভাব অনেকাংশে ভুলিয়ে দেয় ব্রততী। মানব বদলে যেতে থাকে । জীবনের ভিন্ন রঙ খুঁজে পায় ব্রততীর মধ্যে ।




আরও  পড়ুন 👇👇👇



https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_60.html


বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ভালোবাসার গল্প ।। ফটিক চৌধুরী ।Ankurisha।E.Magazine।।Bengali Poem in literature ।।

 





ভালোবাসার  গল্প 

ফটিক চৌধুরী 


১.

বুদ্ধি



আসলে আমি জানতেই পারিনি রমার পেটে পেটে এত বুদ্ধি ! ওকে সাধারণ মেয়েই জানতাম। সাদামাটা চেহারার মেয়ে, কী করে ওর বিয়ে থা দেব, এ নিয়ে দুশ্চিন্তা তো ছিলই।
রমা আমাদের ভাইঝি। দাদা-বৌদি হঠাৎ দুর্ঘটনায় মারা যাবার পর তাঁদের একমাত্র সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব ছিল আমাদের। আমি তো বাড়িতে টিউটোরিয়াল খুলে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে ওর মনের খবরই রাখতে পারিনি।
-- কাকু, আমি তোমার প্রিয় ছাত্র রনো কে বিয়ে করতে চাই, তোমার কি আপত্তি আছে ?
কে যেন সপাটে আমার গালে চড় মারল।
-- মানে? রনো তোকে বিয়ে করবে কেন ? তাছাড়া ও তো  ডবল্যু বি সি এস দিয়েছে। আগে চাকরি পাক।
-- আজই রেজাল্ট বেরিয়েছে। 'এ' গ্রুপে ভালো র্্যাঙ্ক ।
-- তোর পেটে পেটে এত বুদ্ধি, জানতেই পারিনি।
-- জানো কাকু ! প্রেম এভাবেই আসে। তারজন্য বুদ্ধি লাগে না। তুমি প্রফেশনাল শিক্ষক, কাগুজে বুদ্ধিটাই দেখো। এর বাইরেও যে অন্যরকম বুদ্ধি আছে, তা জানবে কি করে ?







২.
সুবেশার আহ্বান


করোনা-আবহে কলেজ না খুললেও সরস্বতী পুজো হল। অনেকদিন পর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা। সবাই যেন এই অক্সিজেনটুকু চাইছিল। প্রথমে একটু দ্বিধা, তারপর বাঁধ ভেঙে গেল সবার। পুজোর পর সবাই নাচগান শুরু করল, শেষ হল অন্তক্ষরী দিয়ে।
সুবেশা শুধু সুন্দরীই নয়, সুগায়িকাও। সবার প্রশংসা পেল, একজন বাদে। সে আহ্বান। সাধারণ থাকে কিন্তু অসাধারণ মেধা। আহ্বানকে ভালো লাগে সে কারণেই। ওর কাছ থেকে প্রশংসা তাই প্রত্যাশিত ছিল। কিছুটা মনখারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরল সুবেশা। ঘুমিয়ে পড়েছিল ঘুম ভাঙল মোবাইলের রিংটোনে। অজানা নাম্বার, ধরবে কি না ভাবতে ভাবতে ধরেই ফেলল সুবেশা।
-- হ্যাঁ, কে বলছেন?
-- আমি আহ্বান।
-- ওহ্
-- তোমাকে সুন্দরীই জানতাম।এত ভালো গান গাও, জানতাম না।
-- সকলেই তো প্রশংসা করল, তুমি বাদে।
-- আসলে গানে এমন বিহ্বল হয়ে গেছিলাম! তোমার এক বন্ধুর কাছে নাম্বার নিয়ে ভাবলাম, আমার অনুভূতিটা না জানালে খারাপ দেখায়।
-- তাই বুঝি! তা অনুভূতিটা কীরকম শুনি !
-- ভালোলাগার, ভালোবাসার। তোমাকে আমার ভালো লাগে।
লজ্জার মাথা খেয়ে সুবেশা বলেই বসলো
-- আমারও।
-- আমি তোমাকে সত্যিই ভালবাসি।
-- মি, টু।







আরও  পড়ুন । আরও  মতামত  জানান  । আরও  লাইক করুন । 👇👇👇👇👇👇

নিচের  লিঙ্ক  ক্লিক  করে পড়ুন
https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_16.html








আপনিও  এই বিভাগে মৌলিক  ও  অপ্রকাশিত  লেখা  পাঠান।। 
ankurishapatrika@gmail. com




সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ভালোবাসার গল্প ।। কার কাছে হৃদয় —শ্রাবণী বসু। Ankurisha। E.Magazine। Bengali poem in literature।

 

ভালোবাসার গল্প  

কার কাছে হৃদয়

                 শ্রাবণী বসু


 ১.                         

অষ্টাদশী মেয়েটির গা চুঁইয়ে তেল গড়িয়ে পড়ছে। হ্যাঁ , কোনো ভনিতা না করেই বলা যায় মেয়েটির গায়ের রং পিচ রাস্তার মতো কালো।
মাথার চুল থেকে ভকভক করে উড়ে আসছে করঞ্জার তেলের গন্ধ। গায়ের রঙের মতোই চকচক করছে তার চুল।
চুলটা কপালের উপর চিরুনির সাহায্যে নামিয়ে এনেছে। চলতি ভাষায় এই চুল আঁচড়ানোকে বলে,পেটি পেড়ে  চুল আঁচড়ানো।প্রশস্ত ললাটকে ক্ষুদ্র দেখানোর  এইটি একটি  সূক্ষ্ম প্রয়াস।
চুলটাকে কানের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে পিছনে টেনে এনে আঁটোসাঁটো করেছে একটি আলগা খোঁপা বেঁধেছে টুয়া।
পরণে গোলাপি সালোয়ার। সাদা একটা ওড়না কোমর থেকে পেঁচিয়ে বুকের ওপর সাপের মতো করে জড়িয়ে রেখেছে।
অবাধ্য বক্ষের ঔদ্ধত্যকে  ঢেকে রাখার  নিখুঁত চেষ্টা করা হলেও সেকাজে সে চরম ব্যর্থ। যৌবন বর্ষার নদীর মত প্রকট।
মাটিতে ঝুঁকে পড়ে  মেয়েটি একখানি লাল টকটকে রুদ্র পলাশ কুড়িয়ে নিয়ে খোঁপায় বেঁধে নিলো।
মকবুল ফিদা হুসেন এখানে উপিস্থিত থাকলে নির্ঘাৎ রঙ তুলির টানে এই মুহূর্তটাকে অমর করে রাখতেন।
অথবা যদি রামকিঙ্কর বেইজ থাকতেন , জাদুস্পর্শ দিয়ে কিশোরী নদীটির প্রতিটি বাঁকের সুস্পষ্ট চিহ্ন রেখে দিতেন নিখুঁত ভাস্কর্য নির্মাণ করে।

মাটির ওপর পড়ে থাকা একটা সরু লম্বা কাঠি হাতে তুলে নিয়ে সেটা শূন্যে ঘোরাতে ঘোরাতে টুয়া বাড়ি ফিরলো।

 ২.                      

আমি এখানে নবাগত। রেলের চাকরীতে ট্রান্সফার নিয়ে পলাশতলীতে এসেছি।
যেদিকে চোখ ফেলছি , রাশি রাশি পলাশ ফুটে আছে। হয়তো কখনো শিমূল গাছও ছিল ,তাই অমন নাম জায়গাটির।
টুয়াকে আমি চিনি। সদ্য আলাপ হয়েছে। যেদিন প্রথম রেল কোয়ার্টারে মালপত্তর নিয়ে এসেছি সেদিন টুয়া ওর মায়ের সাথে এসেছিল।
ওর মায়ের কাছে স্টেশনমাস্টার চাবি রেখেছিলেন।স্টেশনমাস্টার ছুটিতে আছেন।টুয়ার বাবা রেলের চতুর্থশ্রেণীর কর্মী। ঘটনাচক্রে টুয়ার বাবাও এখন বাইরে।সেই কারণেই চাবি নিয়ে টুয়ার মা এসেছিল।সঙ্গে টুয়া।
টুয়াকে দেখে আমার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছিল। আমি কলকাতার ছেলে। চোখ ট্যারা করে দেবার মতো রূপসী আমি বহু দেখেছি। অথচ এমন কোনোদিন হয়নি।
টুয়ার মধ্যে একটা বন্য সৌন্দর্য আছে। করঞ্জার তেলের চড়া গন্ধ নাকে লাগলো।নাম না জানা বুনো ফুলের মতোই মাতাল করা সে গন্ধ।
যুবতী মহিলা দেখে আমার কোনোদিন নিজেকে এমন মাতাল মনে হয়নি এর আগে।আমি লোভী নই।কিন্তু আমি পুরুষ ।সেদিন বিশেষভাবে টের পেলাম।

যাইহোক ,নিজের দুর্বলতাকে আড়াল করতে পেরেছি শহুরে কৌশল দিয়ে।
চাবিটা দিয়ে আর সাধারণ কয়েকটা কথা বলে মা-মেয়েতে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যে সন্ধ্যা নামতেই গোটা গ্রামটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে।কলকাতার কলতান হাত ছানি দিয়ে ডাকছে। মাথার ভিতরটা ঝিমঝিম করছে।

                          
৩.
এখানে আসার সময় সুমী ক্যামেরাটা ব্যাগে ভরে দিয়েছে। সুমী আমার হবু স্ত্রী। দুই পরিবারে অবাধ যাতায়াত। হঠাৎ এ রকম গন্ডগ্রামে বদলীর অর্ডার হওয়াতে যাতে আমি বোর ফিল না করি তাই সে আমার শখের ডি এস এল আর ক্যামেরাটা ব্যাগে ভরে দিয়েছে।
সত্যি কাজে লাগছে ।এখানে বিনোদনের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। সময় পেলে চড়াই উৎরাই পথে হেঁটে আসি।ঘাড়ে ক্যামেরাটা থাকে। প্রচুর ছবি তুলেছি এই কদিনে।

                            
৪.
আজ সরস্বতী পূজা। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি। হালকা চাঁদের আলো মাথার উপর লণ্ঠনের মতো ঝুলে আছে। ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
একটা সিগারেট ধরিয়ে বেরোবো বলে ভাবছি।
আসলে ঘরে চাল নেই। কাজেই বেরোতেই হবে।
সুমী ফোন করেছে। এমন সময় সুমী ফোন করে না তো? কোনো অঘটন না কি? ভাবতে ভাবতে ফোনটা রিসিভ করলাম।
সুমী খুব ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
সুমীর দাদা জোর করে তার বসের লম্পট ছেলের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছে।
ভাই,বোন,বাবা ,মা সকলেই তার রোজকারে খায় । চাকরিতে উন্নতি করার জন্য বসের অন্যায় আবদারেতে তার দাদা রাজী হয়ে গেছে।এবং দাদার মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারেনি।

 ৫.                     
এমন পরিস্থিতির জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি কী করবো ,কী করা উচিৎ সব গুলিয়ে গেল।
সুমীকে শান্ত করার জন্য বললাম, মেনে যখন নিতেই হবে আর কী করবে।সুখে থেকো।ভালো থেকো। এ জন্মে আমাদের মিল হলোনা ।ভাগ্যের এটাই হয়তো লিখন।

 ৬.                           
মনটা খুব খারাপ। বসে বসে একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছি। চোখ দিয়ে আগুন বেরোনোর মতো জ্বালা করছে।হয়তো কাঁদতে পারলে জ্বালা কমতো।

টুয়া একটা চিঠি আমার হাতে পৌঁছে দিতে এসেছে। ভদ্রতার খাতিরে ভেতরে আসতে বলা উচিৎ কিন্তু সেটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিনা।
না, থাক...। ও বরং চলেই যাক।যা ভাববে ভাবুক গে।

টুয়া  এদিক ওদিকে দেখতে দেখতে ঘরে ঢুকে ক্যামেরাটা দেখতে লাগলো।
এত্তো বড় ক্যামেরা ? কেন? প্রশ্ন করলো।
অতি সংক্ষেপে বললাম,ছবি তোলার জন্য।
সঙ্গে সঙ্গে বললো,আমার ছবি তুলে দাও তাহলে?
একদম মুড ছিলো না।কিন্তু মুখের ওপর না বলতে পারিনি।
টুয়া আলগা খোঁপাটা  তৎক্ষণাৎ খুলে দিলো। লম্বা চুলের ঢাল কোমর পেঁচিয়ে ধরলো সাপের মতো।
বাম পা-টা ডান পায়ের কাছে এনে দেহটাকে ভেঙেচুরে মহেঞ্জোদারোর নৃত্যরতা নারীর মতো করে দাঁড়ালো। হাত দুটো তার দেহের অনুপাতে লম্বা।
হাজার হাজার বছরের সেই নারীকে আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি।

সেই মুহূর্তে আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো ময়াল সাপ হয়ে যেতে। চাপ দিয়ে গুঁড়িয়ে দিতে।একটু একটু করে গিলে খেতে।


কী হলো? ছবি তুলে দাও?
ওর সরল বিশ্বাসে আমার লোভের নিঃশ্বাস পড়তে পারলো না।
আমি তার কপালের কুচো চুল আঙুল দিয়ে গুছিয়ে দিলাম।
টুয়া আজ শাড়ি পরেছে। শাড়ির আঁচলখানা বুকের ওপর ঠিক করে রেখে দিলাম।তার পায়ের কাজললতা নুপুর উল্টে গেছিলো।হাত দিয়ে সোজা করে দিলাম।
ছবি তোলা হলো। টুয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো, চিঠিটা দিয়ে গেলাম। হারিয়ে ফেলো না।
 
 ৭.                    
আমার কপাল ভালো ।কলকাতায় একটা মিউচুয়াল ট্রান্সফারের অফার এসে গেল।চিঠিটাতে সেই খবরটাই ছিল।
বেশ কিছু চিঠি চালাচালির পরে কলকাতায় ফিরে এলাম।

টুয়ার ছবিটা আমার কাছেই আছে। ডিলিট করতে পারিনি।সুমীর ছবি কোনোদিন দেখিনি ওর বিয়ে হবার পর।কিন্তু টুয়ার ছবিটা...!

নিজেকে বহুবার প্রশ্ন করেছি ,সুমী না কি টুয়া ? টুয়া না কী সুমী। উত্তর পাইনি...


----------------'-----------------------------------------------------------------------

এই পর্বে আপনিও আপনার মৌলিক ও  অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। 

ankurishapatrika@gmail.com

--------------------------------------------------------------------------------