ভালোবাসার গল্প
সুধাংশুরঞ্জন সাহা
১.
ভ্যানচালকের গল্প
অস্তগামী সূর্য ডোবার জলের তলায় ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে । আমি পেরিয়ে যাচ্ছি চোলাই, বাংলা মদের বস্তি, মেথর, মেথরানিদের দুর্বোধ্য সান্ধ্য হুল্লোড়। টিম টিম করে জ্বলা বাল্বের আলোয় ছোট ছোট দোকানিদের লোকালয়, কুয়াশাঘন শীতের সন্ধ্যা ক্রমেই জমে উঠছে।
এইসব লোকালয় ফেলে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাই। সামনেই সরকারি ষ্ট্রিট ডগ হসপিটাল । শিবমন্দির, যেখানে সন্ধিপুজোর ঝাঁঝর ঘন্টা সমানে বেজে চলেছে । চলছে নৃত্যারতি । শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে এক তন্বী অবিরাম নেচে চলেছে। অথচ কেউ কোথাও নেই, দৃশ্যত দু'একজন বয়স্কা মহিলা ছাড়া ।
নাচতে নাচতে হঠাৎ মেয়েটি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে । সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা থেকে ভ্যানচালক এক যুবক ছুটে এসে চোখেমুখে জল ছিটিয়ে দিতে থাকে । মেয়েটির জ্ঞান ফিরতেই তাকে ভ্যানে শুইয়ে স্থানীয় এক ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায় দ্রুত।
জানা যায় মেয়েটির নাম সূচনা দাস। বয়স আঠারো । ছেলেটি তার স্কুলের সহপাঠী । একই পাড়ায় বাস । স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আর পড়াশোনার সুযোগ না পেয়ে বাড়ির প্রয়োজনে ভ্যান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় । বাবা-মা আর ছোট ছোট ভাই-বোনের মুখ চেয়ে । সে-ই দরিদ্র পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ।
ডাক্তারের চেম্বারের উল্টো দিকের ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ আর জল কিনে এনে সূচনাকে ওষুধ খাইয়ে দেয় । সূচনা অনেকটাই সুস্থ বোধ করে । কৃতজ্ঞতায় ওর হাত চেপে ধরে বলে, আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিবি না, অজয় ? চল, মাকে সব বলতে হবে। অজয় একগাল হেসে বলে, ওঠ, আমার হাত ধর ।
২.
ভিন্ন রঙ
মানব আমার বন্ধু । মঠপুকুরের এক কানা গলিতে থাকে । আবৃত্তিচর্চা করে । ধাপার মাঠে ওদের রয়েছে এক টুকরো জমি । সেই জমিতে চাষাবাদ করেই চলে যায় সংসার । সংসার বলতে এক বিকলাঙ্গ ভাই আর নিজে । এই জমিতে বারোমাস চাষ হয় লেটুসপাতা, শশা, পেঁয়াজ, ধনেপাতা,টমেটো ইত্যাদি।
জমিতে কাজ করা ছাড়া বাড়িতে ভাইকে খাওয়ানো, স্নান করানো, জামাকাপড় পরানো সবই নিজের হাতে করতে হয় । মানব বাড়িতে ঢুকলেই আনন্দে, খুশিতে ফেটে পড়ে ভাই । মানবও ভাই ছাড়া কিছু বোঝে না । সেই ভাই-ই হঠাৎ করে চলে গেল ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকে।
এই ঘটনার পর মানব খুব একা হয়ে যায় । আবৃত্তির ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করে না, জমিতে যেতে ইচ্ছে করে না । আচমকা নেমে আসা বিপর্যয়ে সে যেন দিশেহারা । কোন কিছুতেই তার আর উৎসাহ নেই ।
পাশের ঘোলপাড়ার একটি মেয়ের মা ওকে ধরলো মেয়েকে আবৃত্তি শেখাতে হবে । না, না বলেও মানবকে রাজী হতে হলো । সপ্তাহে দুদিন রাতে এক ঘন্টা করে শেখাতে হবে।
মেয়েটির নাম ব্রততী পাল । এগারো ক্লাসের ছাত্রী । লেখাপড়ায় ভালো । মনোযোগী । খুব দ্রুতই একের পর এক আবৃত্তি তুলে নিচ্ছে গলায় । মানবও বেশ খুশি । এভাবেই বিপর্যয় কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে মানব ।
সপ্তাহে দুদিনের জায়গায় তিন দিন, চার দিনও হয়ে যায় শেখানো । আবৃত্তির অনুষ্ঠান থাকলেও নিয়ে যায় ব্রততীকে । ব্রততীর মাও খুব খুশি । রাতে ক্লাসের পর ডিনার না খাইয়ে ছাড়ে না মানবকে ।
কখন যে মানবদা আপনি থেকে তুমিতে এসে ঠেকেছে মানব সেটা খেয়ালই করেনি । ইদানিং আবৃত্তি শেখার চেয়ে গল্প করতেই বেশি পছন্দ করে ব্রততী । একদিন আব্দার করলো পদ্মানদীর মাঝি থিয়েটারটা দেখাবে মানবদা ! মানব দুটো টিকিট কেটে আনে একাডেমির । থিয়েটারের বিভিন্ন দৃশ্যে মোহিত হয়ে ব্রততী ঘনিষ্ঠ হয় মানবের সঙ্গে । মানবও এড়াতে পারে না। অনেক দিন বাদে ভাইয়ের অভাব অনেকাংশে ভুলিয়ে দেয় ব্রততী। মানব বদলে যেতে থাকে । জীবনের ভিন্ন রঙ খুঁজে পায় ব্রততীর মধ্যে ।
আরও পড়ুন 👇👇👇
https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_60.html

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন