লেবেল

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব- ১০)।। নেপথ্য সংগীতের — আড়ালে অনন্যা দাশ

 



ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব- ১০) 

নেপথ্য সংগীতের আড়ালে

অনন্যা দাশ       




জিকোর লিস্ট

নাম                             মোটিভ            আ্যলিবাই          

শেঠ কুন্দনলাল ঝভর -   ন্সুরেন্স থেকে টাকা আদায়?                         সবাই দেখেছে ফোন ধরতে বাইরে গিয়েছিলেন


ধূর্জটি কর্মকার       মণি নিয়ে বই লিখছিলেন অর্থের জন্যে?

হিম্মতলাল খুরানা     অর্থের ন্য পাথরটা অজিত পাঠকের হাতে

ছিল দেখেছিলেন কি? বন্ধুর জন্যে মিথ্যা বললেন?

অজিত পাঠক         অর্থের জন্যে? পাথরটা ওনার কাছে ছিল মিথ্যা বললেন কেন?

রাজেশ্বর ঝা               অর্থের জন্যে? বলেছেন আলো যাওয়ার সময় পাথরটা পাঠকের কাছে ছিল

তথাগত লাহিড়ি                 অর্থের জন্যে?

 


মামা জিকোর লেখায় চোখ বুলিয়ে বলতে শুরু করলেন, “হ্যাঁ, অ্যালিবাই তো শেঠজি ছাড়া কারো নেই আবার উনি যদি

তথাগতকে বলে থাকেন ওনার জন্যে পাথরটা নিতে এবং পরে ওকে ইনসুরেলের পয়সার সিকি ভাগ দেবেন তাহলেই তো তথাগত বড়লোক তবে কি যেহেতু ওনাদের পরিবারের গৌরবের সাথে মণিটা জড়িত উনি মনে হয় না ওই রকম কিছু করবেন হিন্মতলাল খুরানা সিটি প্যালেসে চাকরি করেন ঠাকুরদার ব্যবসা ছিল কিন্তু ওনার বাবার আমলে সেটা লোকসান হয়ে হয়ে লাটে ওঠে। ওনার মনে কি আছে জানা নেই পুলিশের মতে অজিত পাঠকের পসার ভালই ছিল কিন্তু যে বাড়িটাতে ওনার ক্লিনিক সেই বাড়িটায় কিছু একটা সমস্যার জন্যে ক্লিনিক বন্ধ ওনার নিশ্চয় বেশ কিছুটা ক্ষতি হয়েছে তাই মণি চুরির সুযোগ পেলে লোভ সামলাতে পারবেন এমনটা ওরা মনে করেন না তবে আমাকে ওরা ওই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে বারণ করেছিল তাই আমি করিনি

রাজেশ্বর ঝা সম্পর্কে খারাপ কিছু নেই ওদের কাছে কিন্তু উনিও কি লোভ সামলাতে পারবেন? একই ব্যাপার তথাগতবাবু আর ধূর্জটিবাবুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য

অখিলবাবু বললেন, “কিন্তু একটা কথা বলুন, ধূর্জটিবাবু যদি চুরি না করে থাকেন তাহলে ওনার বাড়িতে যে মণিগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো কোথা থেকে কী করে এলো?”

ধূর্জটিবাবু বলেছেন উনি নাকি বাড়ির চাবি হারিয়ে ফেলেছিলেন কয়েকদিন আগে তারপর আশ্চর্যজনকভাবে ওটা ওনার বাইরের ঘরের টেবিলের তলা থেকে খুঁজে পান কয়েকদিন পর অথচ উনি বলেছেন যে উনি সিওর যে দু'দিন আগেও চাবিটা ওখানে ছিল না তবে উনি ব্যাপারটা নিয়ে আর মাথা ঘামাননি পুলিশ ধরার পর ওদেরও বলেন যদিও পুলিশ সে কথা বিশ্বাস করেনি ওদের বক্তব্য উনি এখন প্যাচে গড়ে ওই সব গল্প বানাচ্ছেন আমরা যদি মেনে নিই যে উনি সত্যি চাবি হারিয়েছিলেন এবং সেই চাবির গোছাই ফিরে এসেছে, তার মানে ওনার চাবির গোছার নকল করে ফেলেছে কেউ আর ওনাকে ফাঁসাবে বলে মণিগুলো ওনার ঘরে রেখেছে

মানে কালনাগ ওনার বাড়ির চাবির কপি করেছে

হ্যাঁ, তাই তো মনে হয়

অখিলবাবু মন্তব্য করলেন, “তবে ধূর্জটিবাবু বোকামি করেছেন। চাবি হারিয়ে যাওয়ার পর ওনার উচিত ছিল দরজার তালা

পালটে ফেলা ।”

হ্যাঁ, তা ঠিক তবে ততক্ষণে হয়তো যা হওয়ার হয়ে গেছে। ধূর্জটিবাবুর পক্ষে ওনলি প্লাস পয়েন্ট হল অঙ্গদের ব্যাপারটা যখন হয় তখন উনি জেলে ছিলেন, কিন্তু ওনার বিরুদ্ধে এত বেশি প্রমাণ।”

 

১৬.

কালনাগের রক্ত উগবগ করে ফুটছিল। ওর সময়টা এখন মোটেই ভাল যাচ্ছে না। বড্ড ছুঁচোর উপদ্রব বেড়েছে চারিদিকে।

এই সব ছুঁচোরা ওর সর্বনাশের ফন্দি আঁটছে। তাদেরকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না। তবে ওদের কৌন ধারণা নেই যে কালনাগ ছুঁচোদের কি দুর্দশা করে। কীধের ব্যাগটাতে হাত ঢুকিয়ে দেখে নিলে কালনাগ। সিরিগ্রটা ঠিকঠাক আছে। যখন মণিমাণিক্যেরসন্ধানে থাকে কালনাগ তখন সে অন্য রকম আর আজ তো ছুঁচো মারার কাজ, তাই আজ সে সাধারণ লোকের মতনই যাচ্ছে কিন্তু ওর ঝোলায় রয়েছে কালনাগের বিষ।

ভাবা যায়, সেই কোন ১৮৪৩ সালে নেপোলিয়ানের ভাই লুসিয়ান বোনাপার্ট সাপের বিষের প্রোটিনগুলো আবিষ্কার করেছিলেন। কয়েকটা প্রোটিনের কি ক্ষমতা! কার্ডিয়োটজসিনগুলো হৃদয়ের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকারক। হৃদয়ের মাংসপেশিগুলোকেশিথিল করে দেয় ওগুলো, ফলে হৃদয় নিজের কাঁজ না করতে পারায় মৃত্যু অনিবার্ধ। হিমোটক্সিনগুলো লোহিত কণিকাগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ফসফোলাইপেজগুলো সেল মেস্ব্েনগুলোকে ফাটিয়ে দেয়। ফ্যাসিকিউলিন আর ডেদ্রোটক্সিনগুলো নার্ভাস সিস্টেমকে প্যারালাইজ করে দেয়। আলফা নিউরেটক্সিনগুলো শরীরকে প্যারালাইজ করে দেয়। ওই ছোট্ট সিরিঞ্জটার মধ্যে অত কিছু আছে ভাবলেই অবাক লাগে কালনাগের, কেমন জানি গা শিরশির করে। সাপের বিষ আবার খেলে নাকি কিছু হয় না। ওটাকে রক্তে মিশিয়ে দিতে হয়।

কলিং বেল বাজাতে ছুঁচোটা এসে দরজা খুলে দিল। কেন এসেছে কি চাই এইসব উল্টোপাল্টা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিল। কালনাগ ভুল ভাল মিথ্যে কথা কয়েকটা আউরে দিয়ে ওর ঘরের সোফায় বসল। তবে বেশিক্ষণ বসা যাবে না সে জানে, বিষের শেল্ফ লাইফ খুব কম। প্রোটিনগুলো বড্ড তাড়াতাড়ি ভাঙ্গতে শুরু করে। ছুঁচোকে অন্যমনস্ক করে সিরিপ্রের পদার্থটা ওর শরীরে ঢুকিয়ে দিতে এতটুকু অসুবিধা হল না কালনাগের। কাজ শেষ করে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সে, মনে হয় না কেউ তাকে দেখতে পেল।


 ১৭.

জয়গড় ফোর্টে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কামানটা রয়েছে। সেটার নাম জয়বাণ। মহারাজা সোওয়াই জয় সিংহ (১৬৯৯-১৭৪৩) তার শাসনকালে ওই কামানটা তৈরি করান। জয়গড়ের এক কারখানাতেই তৈরি হয় সেটা। কামানের গোল পাইপের মতন অংশটা, যেটাকে ব্যারেল বলে, ২০ ফুট লম্বা আর পঞ্চাশ টন তার ওজন। ব্যাস ১১ ইঞ্চি। সেটার গায়ে আবার গাছপালা, পশু পাখি ইত্যাদি খোদাই করা আছে। কামানটাকে এমনভাবে চাকার উপর বসান হয়েছে যে সেটা অনায়াসেই ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরানো যেতে পারে। একটা টিনের ছাউনি তৈরি করা হয়েছিল, সেটার নীচেই থাকত কামানটা। পঞ্চাশ কেজি গোলাবারুদ লাগত আর ২২ মাইল পর্যন্ত ছুটে যেত সেই গোলা!

ওই বিশাল কামান দেখে অখিলবাবু এত আপ্লুত, অভিভূত হয়ে পড়লেন যে ওনার মুখে ছড়া বেরিয়ে এল :

বিশাল এই কামান দেগেছিল যারা

চেহারায় সুবিশাল ছিল নাকি তারা?

নাকি তারা সব ছিল অতি ছোটখাটো

শয়ে শয়ে এসে সবে হাত পা লাগাতো

বিষম শব আর ভয়ানক আগুন

হাজারে হাজারে হত মানুষ খুন

থাকো বাবা কামান তুমি শান্ত হয়ে

দেখি তোমারে প্রাণ কাঁপে ভয়ে

যুদ্ধবিগ্রহ বাবা আর কভু নয়

জয় জয় জয় শান্তির জয়।

জিকো শুনে বলল, “কিন্ত অখিলকাকু, আমি তো পলাম যে এটা কখনও যুদ্ধ ব্যবহারই হয়নি! জপুরের রাজপুতদের

সাথে মোঘলদের তো সন্ধি ছিল।”

কিন্ত অখিলবাবুর কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। দিব্যি কামানের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য পোজ দিতে দিতে বললেন, “এ সব তো

অনেকদিন আগেকার ব্যাপারস্যাপার। ব্যবহার হয়েছিল কি হয়নি কেউ কি আর সঠিক বলতে পারে? আমি তো চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছি আশুনের ভয়ানক গোলা সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছে আর শয়ে শয়ে লোক লুটিয়ে পড়ছে!”

ওনার ওই কথা শুনে একজন সাহেব আর মেমসাহেব এসে কেকাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হোয়াট ইজ হি সেয়িং?”

কেকাকে তখন অখিলবাবুর কথাগুলো অনুবাদ করে বলতে হল। সেটা শুনে মেমসাহেব অখিলবাবুকে বললেন, “সত্যি আপনার কি দারুণ কল্পনাশক্তি।”

অখিলবাবু তার উত্তরে বললেন, “পী! অলওয়েজ পীস! শান্তি। ওঁ শান্তি!

সাহেব মেম জানালেন তারা লন্ডন থেকে এসেছেন আর মহানন্দে অখিলবাবুর সঙ্গে ছবি তুললেন।

জয়গড় দেখা হবার পর একটা পাঞ্জাবি ধাবায় তন্দুরি রুটি আর মাংস খেয়ে আনন্দমোহন ওদের গলতাজি নিয়ে চলল।

বিদেশীরা ওটাকে ‘মাঙ্কি টেম্পল বলে। অনেক বাঁদর আছে বলে।

কেকার তো সেটা শুনে কি হাসি। জিকোকে বলল, “ওই দেখ, এখানেও তোর বন্ধুরা আছে!”

জিকোও কম যায় না। বলল, “তোর লজ্জা করে না পূর্বপুরুষদের নিয়ে ঠাট্টা করতে? ছি ছি!”

যাওয়ার পথে একটা মেঠো রাস্তার ধারে প্রচুর ময়ূর দেখে বাবা মামা অখিলবাবু সবাই ছবি তুলতে নেমে পড়লেন। সে

এক অসাধারণ দৃশ্য। চিড়িয়াখানার বাইরে এত ময়ূর ওরা কখনও দেখেনি আর ছাড়া অবস্থায় তো নয়ই।

গলতাজিতে সত্যি প্রচুর বাঁদর। একটা লোক আবার বাঁদরদের ডেকে ডেকে রুটি খাওয়াচ্ছিল আর তারা পরম তৃপ্তি সহকারে সেগুলো খাচ্ছিল। এখানে অনেক মন্দির আর একটা কুণড যেটা নাকি কখনও শুকায় না। সেটা রাজস্থানের মতন মরুভূমির জায়গায় খুবই আশ্চর্যের । কিন্ত দুঃখের বিষয় জা়গাটাকে যত ভাল করে সংরক্ষণ করা উচিত ততটা করা হয়নি। তাই বেশ কিছু মন্দিরের অবস্থা বেশ জীর্ণ। ওখানে একটা বেদিক স্কুল চলে এবং সেখানে সারা ভারতবর্ষ থেকে ছেলেমেয়েরা এসে বেদ উপনিষদ শিক্ষা নেয়।

তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। শিলিগুড়ির একটা ছেলের সাথে আলাপ হল ওদের। তখন ওদের খেলার সময় তাই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলা গেল। সেও বাংলা বলতে পেরে খুব খুশি। মা-বাবাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে আনন্দমোহন ওদের শেঠ কুন্দনলালের বাড়ি নিয়ে গেল। কাজের লোক বসন্ত এসে দরজা খুলে দিতে মামা জিজ্ঞেস করলেন, “তথাগতবাবুকে একবার ডেকে দেবেন?”

তথাগতবাবু তো আজকে আসেননি কাজে। শেঠজি খুব রাগ করছিলেন উনি কোনও ফোনও করেননি বলে?”

ও তাই নাকি।” মামার কপালে ভাঁজ।

হ্যাঁ, সত্যি বলছি। আমাকে বিশ্বাস না হয় শেঠজিকে জিজ্ঞেস করে নিন

না, না, শেঠজিকে জিজ্ঞেস করতে হবে না,” বলে মামা ছুটে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন।

এখুনি চলো!” বলে নোট বই থেকে তথাগতর ঠিকানাটা আনন্দমমোহনকে বললেন।

 

তথাগত লাহিড়ির বাড়ির গোটের কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকচ্ছিল। মামা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা

তথাগত লাহিড়ির বাড়ি কোনটা?”

লোকটা আঙুল দিয়ে পিছনের দিকে যেতে বলল। পাঁচিলের ধার দিয়ে সরু গলিপথ মতন দিয়ে বাড়িটার পিছনের দিকে

গিয়ে যে দরজাটা দেখতে পাওয়া গেল সেটার গাশের কলিং বেলটা টিপলেন মামা। বেলটা বাজছে বোঝা যাচ্ছিল কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না দেখে মামা বললেন, “জিকো যা তো ওই সামনে যে লোকটা দাঁড়িয়ে বিড়ি খাচ্ছে তাকে জিজ্ঞেস কর যে বাড়িওলা কে”

জিকো গিয়ে জিজ্ঞেস করতে লোকটা বলল, “আমিই তো বাড়িওলা। কি হয়েছে?

আমরা বেল দিচ্ছি কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না।”

তার মানে কেউ বাড়িতে নেই।”

তাও আপনি একবার আসুন, প্লিজ।”

ঠিক আছে চলো” বলে লোকটা বিডিটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে নিবিয়ে চলল জিকোর সঙ্গে

কেউ নেই মনে হয়,” বাড়িওলা লোকটা বললে।

কিন্ত দরজায় তো বাইরে থেকে তালা দেওয়া নেই”

তালা নেই?” বলে লোকটা দরজাটা আলতো করে ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল এবং ভিতরের বীতৎস দৃশ্যটা দেখতে পেল সবাই। মেঝেতে পড়ে রয়েছেন তথাগত লাহিড়ি। মুখ দিয়ে গাঁজলা উঠছে। মামা সঙ্গে সঙ্গে ওদের নিয়ে গলিপথ দিয়ে বাড়ির সামনে এসে পুলিশকে ফোন করতে লাগলেন।



চলবে...




-------------------------------------------------------------------



প্রতি শুক্রবার অঙ্কুরীশা-র পাতায়  ক্লিক করে সম্পূর্ণ বিনে পয়সায় এই ধারাবাহিকটি ডাউনলোড করুন এবং মতামত জানান। 


ankurishapatrika@gmail. com

---------------------------------------------------------------------                      

বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস ( শেষ পর্ব )। অষ্টভুজ রহস্য - অলোক চট্টোপাধ্যায়

 

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস   ( শেষ পর্ব )   

অষ্টভুজ রহস্য 

 অলোক চট্টোপাধ্যায়

 

 

গাড়ি চলতে শুরু করল হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে আবার দত্তবাড়িতে ফিরে গেলেন সুগত বাগচি কুনাল একটু অনুযোগের সুরেই বলল – স্যাররাজিন্দার যে আসলে ছদ্মবেশী পুলিশ অফিসার সেটা আমাদের আগে বলেননি কেন?

রজতস্যার হাসলেন - যখন উনি ছদ্মবেশ ধরেছেন তখন নিজের পরিচয় লুকোনোর জন্যেই সেটা করেছেন তোরা সেটা জেনে গেলে তোদের কথাবার্তা বা আচার ব্যবহারে সেটা প্রকাশ পেতেই পারত সেটা ভেবেই ও সেটা তোদের জানাতে বারণ করেছিল কিন্তু এটা ছাড়া তোদের মনে কি আর কোনো প্রশ্ন নেই?

-আছে তো  পলাশ বলল এবার - আর অনেক প্রশ্ন

-বেশএকএক করে বল

-আপনি বিজয়বাবুকে বললেন যে আপনার পর্ব এখানেই শেষ এরপরেও যদি কিছু থাকে সেটার দায়িত্ব অন্য কেউ নেবেন অন্য কেউ বলতে নিশ্চয়ই সুগত বাগচিমানে পুলিশ কিন্তু সেই পরের ব্যাপারটা কিকুনাল তার প্রশ্ন পেশ করল

-আর আপনি এটাও বললেন যে বিজয়বাবুকে হয়ত আরো কিছু অপ্রিয় সত্যের সামনে পড়তে হবে তার মানে কি আপনি যে ব্যাখ্যাটা দিলেন সেটার পরেও আরো কোনো রহস্য বাকি রয়েছেকুনাল জিজ্ঞাসা করল

রজতস্যার কিন্তু সরাসরি উত্তর দিলেননা বললেন – ঘটনাটা শুনে আমার একটা জায়গায় খটকা লেগেছিল তোদেরও লাগা উচিত ছিল ধরা যাক সুজয়বাবু তার বাড়ির কেয়ারটেকারকে হঠাৎ ফোন করে বললেন তার দাদা সন্ধ্যে নাগাদ ঐ বাড়িতে পৌঁছোলে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে ফেলতে হবে হাতে সময় বড় জোর ঘন্টাখানেক ছোটো একটা গ্রাম কোনো লোক কিভাবে ঐ অল্প সময়ের মধ্যে সেই ওষুধ জোগাড় করবে বা সঠিক মাত্রায় সেটা দেবে যাতে দু-তিন ঘন্টার জন্যে তার দাদাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়একটাই সম্ভাবনাযাকে কাজটা করতে বলা হচ্ছে তার কাছে ওষুধটা আছে আর প্রয়োগ করার ব্যাপারেও তার অভিজ্ঞতা আছে এবং সেটা সুজয়বাবুদের জানাও আছে

পলাশ আর কুণাল মাথা নাড়ল এ ব্যাপারটা তারা ভেবে দেখেনি

-তাছাড়াও আরো একটা পয়েন্ট রজতস্যার বললেন, - কফিতে চুমুক দেবার পরেই বিজয়বাবুর মাথা ঘুরতে শুরু করে তার পরেই তিনি ভুল দেখতে বা শুনতে শুরু করেন যাকে বলে হ্যালুশিনেশন যেহেতু তার মনের মধ্যে আগে থেকেই পুরোনো স্মৃতি ভিড় করে ছিলসেই হ্যালুশিনেশনের ঘোরে তিনি নিজের দাদুসুবলদা বা জীবনদাদুকে প্রায় প্রত্যক্ষ দেখতে বা তাদের গলা শুনতে পাচ্ছিলেন সুবলদার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম হতে পারে কিন্তু কথা হচ্ছেএত সব কান্ড কি সাধারণ ঘুমের ওষুধে আর এত তাড়াতাড়ি হতে পারে?

-নারকোটিক জাতীয় ওষুধকুণাল বলল

-ঠিক তাই সেদিন সুজয়বাবুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুগতর সঙ্গে ঘটনাটা নিয়ে আলোচোনা করতে গিয়ে এই সন্দেহটা প্রকাশ করতেই সে লাফিয়ে উঠল পুলিশের কাছে খবর ছিল যে সাউথ চব্বিশ পরগণায় কোকেন জাতীয় মাদক পাচারকারী একটা দল কাজ করছে কিছুতেই তাদের ধরা যাচ্ছিল না তখনই ঠিক করা হয় ও ড্রাইভারের ছদ্মবেশে আমাদের সঙ্গে যাবে

-ছদ্মবেশে কেনপ্রশ্ন করল কুণাল

-নাহলে সুজয়বাবুরা সতর্ক হয়ে যেতেন ওদের চট করে ধরা যেতনা হতে পারে সঙ্গে পুলিশের লোক যাচ্ছে জানলে  দাদাকে কোনোমতে রাজি করে যাওয়াটাই বন্ধ করে দিত একজন স্কুলটীচার আর দূজন ছাত্র যাবে জেনে নিশ্চিন্তে রাজি হয়েছিল সেজন্যেই ঐ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যদিও সেটা পুরোটাই আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে তারপর অবশ্য দেখা গেল আমার অনুমানটা সঠিক ছিল

একটু থেমে রজতস্যার আবার বললেন – আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম অষ্টভুজ ঘরটার ডুপ্লিকেট আবিষ্কার করে তারপরেও সেটাকে কাছ থেকে দেখতে না দেওয়ায় বা বাগানের গেট টপকে ভেতরে গিয়ে আরো অ্যাডভেঞ্চার করতে না দেওয়ায় তোরা সেদিন বেজায় মনঃক্ষুন্ন হয়েছিলিস সত্যি বলতে কি আমারও যে সেরকম ইচ্ছে হচ্ছিলনা তাও নয় কিন্তু সুগতর সন্দেহটা ঠিক হলেআমাদের বাড়তি কৌতুহল জানাজানি হয়ে গেলে ওদের আর ধরা যেতনা কিছুমাত্র সন্দেহ হলে ওরা উধাও হয়ে যেত

-সেটা ঠিক স্যার পলাশ স্বীকার করে নিল - আমরাও ভাবছিলাম ঐ ঘরটা খুঁজে পেয়েও আপনি কেন আরো নিশ্চিত হবার জন্যে কোনো ছুতোয় বাড়িটার ভেতর ঢোকার চেষ্টাও করলেন না

-আসলে একটা কথা মেনে নিতেই হবেআমরা পেশাদার গোয়েন্দা নই আমাদের মূল উদ্দেশ্য কোনো অলৌকিক ঘটনার লৌকিক কারণ খুঁজে বার করা আমার পদ্ধতি হল ঘটনার সম্ভাব্য কয়েকটা ব্যাখ্যা তৈরি করে তার স্বপক্ষে কিছু প্রমাণ খুঁজে বার করা এক্ষেত্রে সেটা পাওয়া গেল ছবির পেছনের দেওয়ালে ধুলো ময়লার উপস্থিতি বা জলাজমির ওপর কাঠের পাটাতনের দাগ ইত্যাদির মধ্যেযেগুলো ব্যাখ্যাটাকে মজবুত করেছে কিন্তু সুগত বাগচির উদ্দেশ্য অন্য তার অভিজ্ঞ পুলিশি চোখ এরই মধ্যে বাড়ির পেছন দিকের জমিতে নিয়মিত লোক চলাচলের চিহ্ন দেখে নিয়েছে ভাঙা দেওয়ালের পাশের রাবিশের স্তুপের ওপর দিয়ে বস্তা জাতীয় ভারি কিছু টেনে নিয়ে যাবার চিহ্নও তার চোখে পড়েছে আমরা যখন চায়ের দোকানে বসে কথা বলছি সে তখন হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দূরবীন দিয়ে ভাল করে অষ্টভুজকে জরীপ করে ফেলেছে ড্রাইভার সেজে সে চুপচাপ তার নিজের কাজ করে গেছে , কেউ খেয়ালও করেনি কিন্তু আমরা যদি ওই বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে কোনোভাবে ওদের সন্দেহ জাগিয়ে ফেলতাম তাহলে ওর সব প্ল্যান ভন্ডুল হয়ে যেত

পলাশ আর কুণাল মাথা নাড়ল স্যার ঠিকই বলেছেন

-আমরা যখন লাইন হোটেলে লাঞ্চ করছিলাম তখন সুগত তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা বলে লোকাল থানার আউটপোস্টে গিয়ে সব কিছু জানায় আর লালবাজারে কথা বলে ওখানে রেড করার ব্যবস্থা করে আমরা দ্বিতীয়বার কদমফুলি যাবার পরেপরেই পুলিশ গোটা জায়গাটা ঘিরে ফেলে আমাদের ক্যানিং স্টেশনে নামিয়ে সুগত নিজেও চলে যায় ওখানে ভোররাতে অতর্কিতে হানা দিয়ে ওখানকার মালি,চৌকিদারকেয়ারটেকার সবাইকে গ্রেফতার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে যদিও ওদের মোবাইল ফোনগুলোও সীজ করায় সে খবর এখনো সুজয়বাবুদের কাছে পৌঁছোয়নি তবে কিছু একটা বিপদের আশঙ্কা যে ওরা করছিলেন সেটা ওদের ঘন ঘন মোবাইলে কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা দেখে মনেই হচ্ছিল তবে মনে হয় এতক্ষণে সুজয় আর অজয়ও অ্যারেস্ট হয়ে গেছে

-মানে আপনার কথা অনুযায়ী বিজয়বাবু আরও কিছু অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন পলাশ বলল

-রেড করে কিছু পাওয়া গেছেরুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করল কুণাল

-পুরোনো বাড়ির ভেঙে পড়া ঘরগুলোর তলায় মাটির নিচে একটা পাতাল ঘরের মধ্যে প্রচুর বেআইনি মাদক পদার্থ পাওয়া গেছে বস্তা ভর্তি সাদা সাদা পাউডার সম্ভবত কোকেনল্যাবোরেটরিতে পরীক্ষার পরই নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে

-এইসব নিষিদ্ধ জিনিষগুলো নিশ্চয়ই জলপথে ওখানে আসত পলাশ বলল, - সেইজন্যেই খাল পাড়ে নৌকোয় লাগাবার পাটাতনগুলো রাখা ছিল

-খুবই সম্ভব আবার ঐ রকম পাটাতন পেতেই জলা পেরিয়ে পুরোনো বাড়িতে জিনিষগুলো আনা হত রজতস্যার বললেন - খুব সম্ভবত বাংলাদেশ বা ময়নামার থেকে চালান আসত আর ওখান থেকে নানা জায়গায় সাপ্লাইএর ব্যবস্থা হত

একটা কথা অনেকক্ষন থেকে কুণালের মাথায় ঘুরছিল সে এবার প্রশ্ন করল – স্যারআপনি হ্যালুশিনেশনের কথা বলার সময়ে বলেছিলেন বিজয়বাবুর সুবলদাকে দেখাটা অন্যরকম হতে পারে তার মানে কি সুবলদাকে দেখাটা ওনার হ্যালুশিনেশন নয়সে বেঁচেই আছেঅপঘাতে মারা যায়নিকিন্তু তাহলে তো তার অনেক বয়স হওয়া উচিত

-কথাটা ঠিক খেয়াল করেছিস তো  মুচকি হাসলেন রজতস্যার - আসল ঘটনাটা ঠিক তা নয় ভেবে দেখতাকে প্রথম দেখেই বিজয়বাবুর সুবলদার কথা মনে হয়েছিল কফি খাবার অনেক আগেই অ্যারেস্ট করার পর তার পরিচয়টা জানা গেছে সে হল বিমল সুবলদার ছোটো ছেলে সুজয়ের ছোটোবেলার বন্ধুতার উচ্ছন্নে যাবার সঙ্গী তার বাবা তাকে অনেক আগেই বাড়ি থেকে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল সুবল মারা যাবার পর সুজয়ই তাকে ফিরিয়ে আনে সে-ই ভুতের ভয় দেখিয়ে নিজের মা আর দাদার পরিবারকে ঐ বাড়ি থেকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করে ভুতুড়ে কুখ্যাতি পাওয়া বাড়ির ধারে কাছে কেউ ঘেঁষবে না এই মতলবেই হয়তো ভেবেচিন্তে কাজটা করেছিল সে মনে হয় তার বাবার সঙ্গে তার চেহারার একটা স্বাভাবিক মিল আছে যেটা প্রথম দর্শণেই বিজয়বাবুর চোখে পড়েছিল বড় হবার পর তাকে বিজয়বাবু আর দেখেননি বলে চিনতে পারেননি কিন্তু সুবলদার সঙ্গে মিলটা চোখে পড়েছিল

-আমার ধারণা ড্রাগ চক্রের মূল পান্ডা ওই বিমলই একটু থেমে আবার বললেন রজতস্যার - সুজয় আর অজয়কে সেই মনে হয় সেই এরমধ্যে টেনে এনেছে ভুতুড়ে বাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে ওদের ট্রান্সপোর্টের ব্যবসাটাও হয়ত ড্রাগ পাচারের কাজে লাগে তবে সেসব দেখা পুলিশের কাজ আমাদের যেটুকু কাজ ছিলমানে ভৌতিক ঘটনাটার একটা ব্যাখ্যা খুঁজে বার করাসেটা আমরা ঠিকঠাক করে ফেলেছি আরও একবার প্রমান করা গেল যে কোনো অলৌকিক ঘটনাকে ঠিকমত বিশ্লেষণ করলে একটা যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় আমাদের পক্ষে সেটাই যথেষ্ট

 

(সমাপ্ত)



-----------------------------------

এই ধারাবাহিক রহস্য 

উপন্যাসটি পড়ুন ও 

পড়ান।      


মতামত জানান। 

ankurishapatrika@gmil

.com 


-----------------------------------  

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটির সবগুলো পর্বের নীচের লিঙ্ক ক্লিক করে পড়ুন।           


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_3.html



https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_10.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_18.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_39.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_83.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_9.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_16.html


blogspot.com/2020/12/blog-post_23.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_30.html

 

https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_6.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_13.html