লেবেল

শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২১

বইমেলা সংখ্যার গল্প।। ভুলভাবে ঠিক সিদ্ধান্ত — সুবীর ঘোষ

 




বইমেলা সংখ্যার গল্প    

ভুলভাবে ঠিক সিদ্ধান্ত

সুবীর ঘোষ

 


ক্লাস টিচার ক্লাসে ঢুকে দেখেন আগের পিরিয়ডের শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডটা মুছে যাননি । তিনি বললেন --–কেউ এসে বোর্ডটা মুছে দিয়ে যা । কে আসবি ? রূপম তুই আয় ।

রূপম এগিয়ে যেতেই স্যার বললেন -- এ্যাই দাঁড়া দাঁড়া  । যা যা শিগগির বাথরুমে যা । ক্লাসের মনিটর মোহন ঝাঁপিয়ে এল--কেন স্যার কী হয়েছে ?

স্যার বললেন -- দেখছিস না  ওর প্যান্টে পটি হয়ে গেছে ।

রূপম  ভয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে । মোহন  হাঁটু মুড়ে ভালো করে দেখে বলল--না স্যার পটি নয় । এই জলটা পকেট থেকে বেরুচ্ছে । পেছন থেকে নয় । মোহনই রূপমের পকেটটা চাপ দিয়ে বলল---পকেটে নরম নরম কিছু আছে স্যার । স্যার বললেন--কী আছে বের কর । রূপম তো ভয়ে কাঠ হয়ে পকেট চেপে দাঁড়িয়ে । মোহন বলল--ভয় কিসের ? স্যারকে দেখা না কী আছে । মোহন নিজেই তখন টেনে বের করে আনল । পাতলা প্লাস্টিকে ভরা খানিকটা খিচুড়ি । সারা ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল । মোহন বলল ---কী রে মিড ডে মিলে খেতে পারিসনি না কী ? রূপমের মুখে রা টি নেই । স্যার বললেন--যা যা প্যাকেটটা ফেলে দিয়ে পা টা ধুয়ে আয়। 

 

 

পল্টু দাস । লোকে বলে খোঁড়া পল্টু । খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই । কিন্তু সে তো সত্যি খোঁড়া । তবে জন্ম থেকে পায়ের কোনো দোষ ছিল না পল্টুর । ট্রেনে ট্রেনে খেলনা ফেরি করত সে । চলন্ত ট্রেনে এ কামরা থেকে সে কামরা করতে পারত পল্টু । এ রকম করতে গিয়ে গেল বর্ষার এক দিন তার পায়ের চটি পিছলে যায় । আর সে চলন্ত ট্রেন থেকে লাইনে গিয়ে পড়ে । মরেই যেত হয়তো । নেহাত কপালে পরমায়ু লেখা ছিল । স্থানীয় লোকজন তাকে কাছাকাছি এক হাসপাতালে ভর্তি করে দেয় । প্রাণে বেঁচে যায় পল্টু তবে একটা পায়ের বিনিময়ে ।

সেই থেকে সে গৃহবন্দী । বউ জবা সাত বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে । সাত বাড়ি নয় । এখন ছয় বাড়ি । একটা বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে জবা । সে বাড়ির মালকিন বাপের বাড়ি গেছিল ।  রোববার, বাবুটা একাই ছিল । সে  বলে কী না --- সারা দুপুরটা থাকবি ? এখানেই খাবি । আলাদা পয়সা দেব । জবা সেই বেলাতেই কাজ ছেড়ে দিয়েছিল । বকেয়া মাইনে আনতেও যায়নি ।   ট্রেনে খেলনা বেচে পল্টু যা সঞ্চয় করেছিল সব নিজের  শরীর সারাতেই চলে যায় । বসে বসে খেতে গিয়ে বাকিটাও শেষ ।

 

                                             ২

 

জবার চেষ্টায় দু’একবার পাড়ার কাছাকাছি একটা পানবিড়ির দোকান দেবার চেষ্টা যে সে করেনি তা নয় । কিন্তু কেউ বসতেই দেয় না । নিজেদের বিক্রি কমে যাবার ভয় । সবাই বলে কাউন্সিলর না বললে দোকান বসানো যাবে না । পিছিয়ে যায় পল্টু ।

সাত বছরের ছেলে রূপম পৌরসভার স্কুলে পড়ে । মাইনে দিতে হয় না । মিডডে মিলে দিনের খাওয়াটা হয়ে যায় তার ।

ঘরের চালের অবস্থা খারাপ । কিছু খড় কিনে ছাওয়ানো না  করাতে  পারলেই নয়। আগে এ সব কাজ পল্টু নিজেই করত । এখন লোক ডেকে করাতে হবে । তার জন্যে খরচা আছে ।

বেলা চারটেয় স্কুল থেকে ফেরে রূপম । পল্টু বাড়িতেই । একদিন রূপম বলে --জানো বাবা আজ মিডডে মিলে খিচুড়ি আর ডিম দিয়েছিল ।

n  আস্ত ডিম ?

n  হ্যাঁ বাবা একটা গোটা ডিম । এবার যেদিন দেবে তোমার জন্যে পকেটে করে নিয়ে আসব।

n  না বাপ , ডিম আনতে লাগবে না । তুই বাচ্চা ছেলে । তোর এখন ভালোমন্দ খাওয়া দরকার ।  আমার মা চারটে হাঁস পুষেছিল । ছোটবেলায় অনেক ডিম খেয়েছি। 

অন্য একদিন বাবা তাকে বলেছিল--–তোদের বুঝি প্রায়ই খিচুড়ি করে  ? তোর মা-টা না খিচুড়ি করতেই চায় না । কতদিন যে খিচুড়ি খাইনি !

ছেলে কিছু বলেনি । কিন্তু মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিল তার বাবাকে সে একদিন খিচুড়ি

খাওয়াবে ।

তার বাবাকে খিচুড়ি খাওয়াতে গিয়ে যে এই কান্ড হবে কে জানত। 




----------------------------------------------------------------------------

মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান। 


ankurishapatrika@gmail.com


-----------------------------------------------------------------------------                   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন