লেবেল

সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক বিশেষ নিবন্ধ ।। উৎসব- উৎস, প্রভাব, বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা (শেষ পর্ব) - পার্থ সারথি চক্রবর্তী

 



ধারাবাহিক বিশেষ নিবন্ধ   

উৎসব- উৎস, প্রভাব, বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা

 (শেষ পর্ব) 

পার্থ সারথি চক্রবর্তী 

গুহাযুগে যা ছিল, জেটের যুগেও তাই। আনন্দ, উল্লাস ও মনোরঞ্জনের জন্য উৎসবের সূত্রপাত। সারাদিনের ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ কাটাবার জন্য উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। আর তা যে আকারে বা প্রকারেই হোক না কেন! যুগ যুগ ধরে উৎসব মানব সমাজে ও মানব সভ্যতায় এক অপরিহার্য অবদান রেখে চলেছে। ধর্মীয়, সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনমুখী - সব ক্ষেত্রেই উৎসব মানুষকে আনন্দ দিয়ে এসেছে। সেই সঙ্গে উৎসবের অর্থনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব পূর্বে আলোচিত হয়েছে। দুর্গাপূজা, ঈদ, দীপাবলি, বড়দিনের মতো ব্যপক প্রচলিত উৎসবগুলোর পাশাপাশি আদিবাসী, স্থানীয় ইত্যাদি উৎসবও গুরুত্বপূর্ণ। এক বিরাট বাজার জড়িত আছে এর সাথে। কোটি কোটি টাকার সামগ্রী কেনাবেচা হয়, অর্থের হাতবদল হয় , ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তবে ২০২০ এক অভূতপূর্ব বছর গিয়েছে। করোনা অতিমারির জন্য উৎসবে রাশ টানতে হয়েছে। মুখে মাস্ক, হাতে স্যানিটাইজার নিয়েও সীমিত অবসরে মানুষ কিছুটা হলেও উৎসবে মেতেছে। তবে মার্চ, ২০২০ থেকে গোটা বিশ্বে দফায় দফায় লকডাউন হয়েছে। তাতে স্কুল, কলেজ,  অফিস, বাজার, সিনেমাহল, শপিং মল,  বাস ট্রেন,  বিমান চলাচল সবই প্রায় বন্ধ ছিল। ফলে উৎসব তো ভাবনার বাইরে। কেরালায় ওনামের পরে প্রচুর মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। বাংলায় দুর্গাপূজাও অনেক ছোট করে নিয়ন্ত্রিত আকারে হয়, সেইসঙ্গে ঈদ ও দীপাবলিও। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি থিমপূজায় মাস্ক পরিহিতা দেবীদূর্গা, ভার্চুয়াল অঞ্জলির মতো চিন্তা ভাবনার। ভার্চুয়াল পূজা পরিক্রমা, বাড়িতে বড় জলের গামলার ছটপূজা, পোর্টেবল ইফতার নজর কেড়েছে। ঐতিহ্যবাহী অনেক উৎসব বন্ধও রাখতে হয়েছে। যেমন কোচবিহারের রাজ আমলের রাসমেলা। দর্শকহীন মাঠে শুরু হয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, ভারত অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট সিরিজ। মানুষ টিভিতে খেলা দেখার আনন্দ নিয়েছে। এভাবেই চেষ্টা করা হয়েছে অল্প অল্প করে ছন্দে ফিরে আসার। বইমেলা, শিল্পমেলা ইত্যাদি হয় বন্ধ রাখা হয়েছে নতুবা নিয়ন্ত্রিত আকারে করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বন্ধ হয়েছে। নবান্নর মতো দেশীয় উৎসবগুলো খুব ছোট করে সারতে হয়েছে। আসলে আনন্দ ও উল্লাসের থেকে জীবন, সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকাকেই বাধ্যতামূলক প্রাধান্য দিতে হয়েছে।
উৎসবের অভাবে মানসিক অবসাদ হবার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ভাবে অনেক ক্ষতি হয়েছে। লকডাউনের সময় বিশ্বব্যাঙ্ক, আরবিআই ভারতের জিডিপি ঋনাত্মকে নেমে আসবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছিল। শুধু ভারত নয়, সমগ্র বিশ্বেই বাণিজ্য,  উৎপাদন,  রপ্তানি ইত্যাদি ভীষণভাবে মার খেতে থাকে। উন্নত দেশগুলোতে জিডিপি নামতে থাকে। কেবলমাত্র চিনে জিডিপির বৃদ্ধি সবার কাছে বিষ্ময়ের উদ্রেক করে। ভারতের মতো দরিদ্র দেশে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো অনেকটাই ধাক্কা খায়।
সম্প্রতি আরবিআই  গভর্নরের কথায়, ভারতের অর্থনীতি যতটা নেমে যাওয়ার আশংকা করা হয়েছিল, ততটা কিন্তু হয়নি। জিডিপিরও ততটা পতন হয়নি। আর তা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র উৎসবের কারনে। সীমিত আকারে উৎসব সংঘটিত হওয়ায় অর্থনীতি বেশ খানিকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই একটিমাত্র বিষয় উৎসবের অর্থনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব বোঝাতে যথেষ্ট।

নতুন ইংরেজি বছরের শুরুতে শুভ সংবাদ এসেছে- কোভিডের টিকার রূপে। মানুষের মনে আশার সঞ্চার শুরু হয়েছে। অতিমারিকে নিয়ন্ত্রণ করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে সবাই। আবার ছন্দে ফিরে মেতে উঠবে আনন্দে, উৎসবে। 
' একদিন ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে।' সেইসঙ্গে মানুষ আবার উৎসবমুখর হবে। নিজের নিজের মতো করে আনন্দ খুঁজে পাবে। আর উৎসবের হাত ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে চেনা ছন্দে ফিরে আসবে এই বসুন্ধরা।

( সমাপ্ত)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন