ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
(১ম পর্ব)
নেপথ্য সংগীতের অন্তরালে
অনন্যা
দাশ
পূবর্কথা
পার্টি
থেকে ফিরেই রানি প্রভাদেবী গলা থেকে হারটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখলেন। এই গরমে
এত সাজগোজ গয়নাগাটি পরাটা যেন এক বিড়ম্বনা! ঘরের আবছা আলোতেও ১৫০ ক্যারাটের সবুজ
পান্নাটা ঝিলিক দিয়ে উঠল! পান্নাটার চারধারে আবার ফুলের পাপড়ির ঢঙ্গে হীরে বসানো
আর পুরো সেটিংটা প্ল্যাটিনামে করা। রাজা জয়দেব সিংহ তাঁদের পাঁচিশ বছরের বিবাহবার্ষিকীতে
রানিকে ওই পান্নাটা উপহার দিয়েছিলেন। জয়দেব সিংহ মানে ওঁর স্বামী, এখন ব্যাবসার কাজে
জামার্নিতে গেছেন তাই রানিকে এইসব পার্টিতে এক৷ একাই যেতে হচ্ছে লোকে আশা করে ওঁদের
উপস্থিতির এবং সেটা নিয়ে গর্ব করে তাই যেতেই হয়। রাজত্য তো কবেই গেছে কিন্তু জয়দেবের
ব্যাবসা বুদ্ধি ভালো বলে ব্যবসাটা দাঁড়িয়েছে। আজ ওই ব্যবসার জোরেই উপাধিটা রক্ষা
হচ্ছে আর এই প্রাসাদটা চলছে। জয়দের সিং বাড়ি থাকলে অবশ্য কখনই ওঁকে ওই দামি হারটা
ওইভাবে ড্রেসিং টেবিলে ফেলে রাখতে দিতেন না। ওটা সাধারণত লকারেই থকে। ঝোঁকের মাথায়
আজ সকালে গিয়ে ওটাকে লকার থেকে তুলে এনেছিলেন রানি আজকের পার্টিতে পরবেন বলে।
দুতিনজন বন্ধ ফোন করে বলেছিল, “তেজেশ্বর প্রসাদের
বউয়ের নাকি ২৫০০-টা হিরে বসানো কি একটা হার পরে আসার কথা, সেটা পরলে তো কেউ আর আমাদের
দিকে তাকিয়েও দেখবে না?”
তা প্রভাদেবী সেটা তো হতে দিতে পারেন না। তিনি
না সিসোদিয়া বংশের মেয়ে, তার উপর রানি বলে কথা।
কেউ রানির গয়নাগাটি না দেখে এক হোটেল মালিকের
বউয়ের গয়না দেখবে সেটা তো ওঁর ঠিক ভাবতে ভালো লাগে না! তাই উনি স্বামীর অনুমতি ছাড়াই
হারটাকে বার করে নিয়ে ছিলেন। অবশ্য সমস্যা কিছু ছিল না। ড্রাইভার সাকেত তো ছিল! আর
এখানেও তো দুজন পাহারাদার রয়েছে। জয়দেবের ভয় অমূলক। অবশ্য ছেলে ভূষণ থাকলেও কিছু
করা যেত না, সেও বাবার মতনই হয়েছে। ভাগ্যিস এখন কলেজে পড়তে ব্যাঙ্গালোর গেছে। এইসব
ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত প্রভাদেবী বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
বাইরে রাতের অন্ধকারে কেউ' লক্ষ করল না যে মার্সিডিস
গাড়িতে করে রানি পার্টি থেকে ফিরলেন সেই গাড়িটার পিছনের ট্রাঙ্কটা খুলে গেল। কালো
মুখোশ আর কালো পোশাক পরা কালনাগ বেরিয়ে এল। তার হাতে
একটা ছোট থলে, তাতে ছোটখাটো দরকারি কিছু যন্তপাতি।
সেগুলোর সাহায্যেই সে গাড়ির পিছনের ট্রাঙ্কটাতে ঢুকতে এবং বেরতে পেরেছে। নিঃশব্দে
বাগান পেরিয়ে প্রাসাদের দরজার কাছে গিয়ে দাড়াল কালনাগ। রাজা জয়দেব সিংহের বোকামি
দেখে হাসল। এইখানে একটা বিশাল শক্ত লোহার দরজা ছিল কিন্তু রাজা সাহেবের সেটা পছন্দ
ছিল না তাই উনি সেটাকে সরিয়ে হাল ফ্যাশানের একটা কাঠের দরজা লাগিয়েছেন। তাতে কালনাগের
সুবিধাই হয়েছে, তাকে কষ্ট কম করতে হবে। এই সব নতুন দরজার তালাওলো একেবারে ঠুনকে৷ হয়।
কিছুক্ষণের চেষ্টাতেই সেটা খুলে ফেলা গেল। খুট করে একটা শব্দ হল!
“কৌন হ্যায়?”
উফফ! আর পারা যায় না! একজন পাহারাদার চলে এসেছে!
কেন যে মরতে এখানে এলি? ওকে মারার
কোন ইচ্ছা ছিল না কিন্ত উপায় নেই। লোকটা কিছু
বোঝার আগেই কালনাগের সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকটা
থেকে ‘ব্লপ’ করে একটা শব্দ বেরল আর রক্ষীটা মাটিতে
লুটিয়ে পড়ল। ওর পড়ে যাওয়ার আওয়াজে দ্বিতীয়
রক্ষীও ছুটে এলো। তাকে কাৎ করতেও বেশি সময় লাগল
না কালনাগের। সদর দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল সে।
বাড়ির ভিতরটা অন্ধকার । তবে কালনাগের চোখ অন্ধকারেও
সব দেখতে পায়। কী একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল প্রভাদেরীর। কি হয়েছে, বুঝে ওঠার আগেই
দুটো শক্ত হাত তার হাত পা মুখ বেঁধে ফেলল। ওঁকে সাহায্য করার কেউ নেই। কাজের লোকজন
সব অন্য প্রান্তে আউট হাউসে থাকে। রক্ষী দুজন কোথায় কে জানে। মুখ দিয়ে গোঙানির মতন
আওয়াজ বার করতে ধাঁ করে তাঁর কপালে আঘাত করল লোকটা। যন্ত্রণার বুদবুদ ফেটে পড়ল প্রভাদেবীর
মাথায় যেন। সেই ব্যথার মধ্যে উনি অস্পষ্ট দেখলেন ছায়ামৃর্তি ড্রেসিং টেবিল থেকে হারটা
তুলে নিচ্ছে। কাছে এসে হারটা রানির গালে ঠেকিয়ে ফিস ফিস করে বলল লোকটা, “এই মণিহার
তোমায় মোটেই সাজে না!” বলে আরেকবার আঘাত করল ওঁর কপালে । অকথ্য যন্ত্রণায় জ্ঞান হারালেন
প্রভাদেবী।
১.
বাড়ি ফেরার জন্যে হনহন করেই হাঁটছিল লোকটা।
অনেক রাত হয়ে গেছে। রাস্তায় আর কোন গাড়িঘোড়া নেই। এমনিতেই এখানে একটু রাত হলেই
যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় আর এখন তো রাত দুটো বাজে প্রায়। আসলে ট্রেনটা এত লেট
করল। এত রাতে কিছু পাওয়া যাবে না বলে হেঁটেই বাড়ি ফিরছিল লোকটা। যাক যে কাজের জন্যে
গিয়েছিল সেটা ভালভাবে হয়েছে অন্তত। হঠাৎ ওর মনে হল ওর গিছন পিছন কেউ আসছে। এই খেয়েছে!
এই আশঙ্কাই করছিল সে। এইরকম রাতেই তো ছিনতাইকারীর সব ঘুরে বেড়ায়। তারা ওর টাকা পয়সার
জন্যে নিশ্চয়ই ওর পিছু নিয়েছে। হাটার গতি বাড়াল লোকটা কিন্ত পিছনের পায়ের শব্দ
কমল না। যে পিছু নিয়েছে সে এগিয়ে আসছে। গম্ভীর স্বরে পিছন থেকে কে বলল, “দাঁড়াও!
আমার হাতে বন্দুক আছে! নড়লেই গুলি করব!”
লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল ভয়ে। মরবার মোটেই ইচ্ছে
তার নেই!
“এবার হাত দুটো মাথার ওপর তুলে আস্তে আস্তে পেছনে
ফেরো!”
লোকটা ভয়ে ভয়ে তাই করল। সত্যি বন্দুক হাতে
একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার পরনে আঁটোসাটো কালো পোশাক, মুখে কালো মুখোশ। লোকটা হাঁউমাউ
করে বলল, “আমার টাকাপয়সা যা আছে আমি সব তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি কিন্তু দয়া করে আমাকে
প্রাণে মেরো না!”
“তোমার ওই ব্যাঙের আধুলি আমার চাই না আর তোমাকে
প্রাণে আমি মারব না, মানে অন্তত এখন তো নয়। আমি তোমাকে দুটো কাজ করতে দেবো খালি। খুবই
ছোট্ট দুটো কাজ। সেই কাজগুলো লক্ষ্মী ছেলের মতন করলে তোমার কোন ক্ষতি হবে না, কিন্তু
যদি না করো তা হলে জয়ন্তর শরীরের ছোট ছোট টুকরো করে তোমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো। আমি
মিথ্যা হুমকি দিচ্ছি ভেব না। ওর সম্পর্কে আমি সব কিছু জানি। একটা নীলরঙের স্কুটার চালায়
ও। কি বলো করবে তো কাজগুলো?” লোকটা অসহায় ভাবে মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বলল।
ক্রমশ...
------------------------------------------------
প্রতি শুক্রবার প্রকাশিত হবে ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস- 'নেপথ্যে সংগীতের আড়ালে'।
আপনারা পড়ুন। মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
-------------------------------------------------


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন