ধারাবাহিক প্রেমের উপন্যাস (পর্ব-১৯)
.. এবং ইরাবতির প্রেম
গৌতম আচার্যটিকেট কাউন্টার থেকে সত্যেন একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কেটে নিয়ে পৌঁছে গেলো টি টি দের জন্য নির্দিষ্ট ঘরের দিকে।। দার্জিলিং মেল এর টি টি র সন্ধানে।। ঘরের দরজা ঠেলা মাত্র তার মোবাইল বেজে উঠলো।। তাকিয়ে দেখলো ইরাবতির ফোন।। ঘরে না ঢুকে সত্যেন অভিমানে ইরাবতিকে বললো, "টি টি রুমে আছি, বেড়িয়ে ফোন করবো"।। আর কোন কথা না বলে ফোনটি কেটে দিলো সে।। মনের মধ্যে চূড়ান্ত অসহায়ত্ব এবং অভিমান দলা পাকিয়ে উঠছে তার।। ইরাবতি কে ছেড়ে ফেরার পথে মনের ভিতরে বিদায়ের চরমতম আকুলতায় সে ফোন করেছিলো ইরাবতি কে।। তার এতক্ষণ বাদে এই ভর সন্ধ্যায় তাকে মনে পড়লো ইরাবতির?
সত্যেন খবর নিয়ে জানলো সাতটার সময় দার্জিলিং মেল এর টি টি সাহেব আসবেন।। তিনি না আসা পর্যন্ত যে কিছু হবে না, তা খুব ভালো জানে সত্যেন।। এখনও প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাকি।। সেই সকাল বেলা রিসর্টে যা খেয়ে ছিলো।। সারাদিন আর কিছু খাওয়া হয় নি।। ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে সত্যেন ঢুকলো বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো একটি ফার্স্ট ফুডের দোকানে।। অর্ডার দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে খাবার এসে গেছে।। আবার ঠিক সেই সময় সত্যেন এর মোবাইল বেজে উঠলো।। হ্যা ইরাবতি আবার কল করেছে।। ধরবো কি ধরবো না করতে করতে ফোন রিসিভ করলো সত্যেন।।
-- হ্যালো টিকিট পেয়েছো? কি গো বললে যে, টি টি র ঘর থেকে বেরিয়ে ফোন করবো.......
-- না এখনো কনফার্ম হয় নি।।
-- তুমি টিকিট করে নাও আগে।। টি টি কে জানিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লে টি টি ঠিক ব্যবস্হা করে দেবে।। কিছু এক্সট্রা টাকা নেবে।।
-- জানি।। টিকিট করা হয়ে গেছে।।
-- আমরা শেষ যে বার কোলকাতা গেলাম, টিকিট ছিলো না তো।। আমরা কাউন্টার থেকে টিকিট করে টি টি কে ধরে ছিলাম।। দুশো টাকা করে একস্ট্রা নিয়ে আমাদের বার্থ দিয়ে দিয়েছিলো।। তুমি ঠিক বার্থ পেয়ে যাবে।। ওদের কাছে থাকে তো।।
-- জানি।। সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় সত্যেন।।
-- খুব গম্ভীর মনে হচ্ছে তোমায়।। তির্যক মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় ইরাবতি।।
-- সেটি কি খুব অস্বাভাবিক?
-- কেন কি হয়েছে আবার?
-- এখনও তুমি কি হয়েছে প্রশ্ন করছো?
-- করছি তো।। না বুঝতে পারলে প্রশ্ন তো করবোই।। উত্তর করে ইরাবতি।।
অভিমানী সত্যেন চাউমিন মুখে দিয়ে বলে, এখনও যখন বোঝোনি তখন আর না বুঝলেও চলবে।।
-- এ্যাই বলোনা প্লিজ, এ্যাই সত্যেন কি হয়েছে বলো না।। তুমি এ টি এম থেকে টাকা পেয়েছো? আবদার মিশ্রিত সুরে বলে উঠলো ইরাবতি।।
-- হ্যা টাকা পেয়েছি।।
-- বলো না গো প্লিজ কি হয়েছে তোমার? তুমি এ্যতো গম্ভীর কেন?
-- তোমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য মন ছটফট করছিলো, তোমাকে ফোন করলাম দুপুর দেড়টার সময়।। বললে ফ্রেস হয়ে ফোন করছো।। আমি সারা দিন ধরে অপেক্ষা করছি।। আর তোমার সময় হলো এতোক্ষণে?
-- তাই বলো।। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো ইরাবতি।।
-- মানে? প্রশ্ন করে সত্যেন।।
-- এই যে রাগী বাবু, মিছিমিছি রাগ করলে হবে সব সময়?
-- আমি মিছিমিছি রাগ করছি?
-- করছোই তো
-- ঠিক আছে, আমি যখন অকারন রাগ করছি, তবে আর আমার সঙ্গে......
কথা শেষ হয় না সত্যেন এর।। ইরাবতি ওপাশ থেকে গেয়ে ওঠে, "প্রভু আমার প্রিয় আমার পরম ধন হে।
চির পথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে"।।
হেসে ওঠে সত্যেন।। তারপরই গম্ভীর হয়ে বলে, "ইয়ার্কি করছো"? কোন উত্তর দেয় না ইরাবতি।। এক মনে গেয়ে চলে,
তৃপ্তি আমার, অতৃপ্তি মোর,
মুক্তি আমার, বন্ধনডোর,
দুঃখসুখের চরম আমার জীবন মরণ হে॥
আমার সকল গতির মাঝে পরম গতি হে,
নিত্য প্রেমের ধামে আমার পরম পতি হে।
ওগো সবার, ওগো আমার,
বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার--
অন্তবিহীন লীলা তোমার নূতন নূতন হে ॥
কি অপূর্ব।। মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে একমনে গানটি শুনে গেলো সত্যেন।। অসাধারণ গায়কী না হলেও গানের গলাটি বেশ ভালো লেগেছে সত্যেন এর।। ইরাবতি এ্যতো সুন্দর গাইতে পারে একবারও তো সে জানতে পারে নি এই দুই দিনে।। ইরাবতি এবার হেসে বলে, "রাগী বাবু কি এখনও রেগে আছেন, নাকি একটু শান্ত হয়েছেন"? সত্যেন চুপ করে থাকে।। ইরাবতি আবার বলে, যদি জানতে পারতাম, তাহলে ভরসা করে দুটি কথা বলতে পারতাম।। সত্যেন হেসে বলে, বলো হে শয়তাননী।।
-- আমি শয়তাননী, না তুমি শয়তান?
-- তুমি তুমি তুমি- বলে ওঠে সত্যেন।।
-- কেন, কেন আমি কেন, শুনি?
-- আমি ব্যাকুল হয়ে তোমাকে ফোন করলাম দুপুর বেলা।। তুমি কোন পাত্তাই দিলে না।। বললে, ফ্রেস হয়ে ফোন করবো।। খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে তারপর মনে পড়লো আমাকে? বলে সত্যেন।।
-- এই কারণেই তুমি শয়তান।। বলে ওঠে ইরাবতি।।
-- কি কারণে শুনি, আমি কি কিছু ভুল বলেছি?
-- ভুল-ই তো।। সবটাই ভুল।। বাড়িতে লোকজন আছে, আমি তো এভাবে একা একা কোথাও যাই না, সবার প্রশ্ন, কোথায় ছিলাম, কোন বিপদ হয়েছে কিনা, কারো প্রেমে পড়ে গেছি কিনা? হাজার প্রশ্ন।। সবার উত্তর দিয়ে সুযোগ খুঁজছিলাম কখন তোমাকে ফোন করবো।। কিন্তু কেউ না কেউ সামনে থেকেই যাচ্ছে।। কি করে ফোন করবো? কিন্তু মন একেবারে উথাল পাথাল হয়ে উঠেছিলো।।
-- সত্যি সিরিয়াস? প্রশ্ন করে সত্যেন।।
-- না।। সব বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখতে বসেছি।। কি বিশ্বাস হচ্ছে আমার কথা?
সত্যেন অস্ফুটে বলে ওঠে, "লাভ ইউ মহারানী"।।
ইরাবতি বলে, "লাভ ইউ টু, শয়তান"।
চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন