ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-৩)
মুখোশের আড়ালে
আবীর গুপ্ত
অনামিকা সুধাময়বাবুর কাছ থেকে উঠবে উঠবে করছে এমন সময় উনি বললেন –
- একটা বিষয় তোমাকে জানানো উচিত কিনা ভাবছিলাম। এটা কোন রকম ড্রাগ রেকেট এর সঙ্গে মনে হয় যুক্ত নয়, তাও জানাচ্ছি এই ভেবে যদি তা কাজে আসে।
- তাহলে খুলে বলুন। আমি তো ইনফরমেশন পেতেই এসেছি।
- মাস দুয়েক আগে আমাদের হেডকোয়ার্টারে দিল্লি পুলিশের থেকে একটা ছবি পাঠিয়ে রিকোয়েস্ট করা হয় তার সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য জানানোর জন্য। ওঁরা যা জানিয়েছিলেন তাতে ভদ্রলোকের নাম চন্দন রায়। এটাও জানানো হয়েছিল উনি একজন ব্যবসায়ী এবং দিল্লীতে একটা হোটেলে ওঁকে খুন করা হয়েছে। ওঁরা ওঁর ভোটার আই কার্ডের স্ক্যান করা ইমেজও পাঠিয়েছিলেন। আমাদের গোয়েন্দা দপ্তর অনুসন্ধান শুরু করে এবং দেখে ওই ভোটার কার্ডটা জাল এবং ওতে চন্দন রায়ের যে ঠিকানা আছে সেটাও ভুয়ো। তখন গোয়েন্দা দপ্তর নড়েচড়ে বসে এবং চন্দন রায়ের ছবি দিয়ে নিউজপেপারে ভদ্রলোকের আসল পরিচয় জানার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। ফলও পাওয়া যায়। জানা যায় ভদ্রলোকের আসল নাম সুবিনয় ঘোষাল। উনি একজন ব্যবসায়ী, ইমপোর্ট এক্সপোর্টের বিজনেস করতেন। পুলিশের কাছে আরও খবর আসে ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট বিজনেসের আড়ালে চোরাকারবার করতেন। তবে, কখনই কোনরকম মাদক দ্রব্যের ব্যবসা করেন নি। উনি নাকি মাদক ব্যবসার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন! উনি কী কাজে ছদ্মনামে ফলস্ ভোটার কার্ড নিয়ে দিল্লি গিয়েছিলেন তা এখনও রহস্যই রয়ে গেছে।
- আপনি এত কথা জানলেন কী করে!
- তার কারণ ভদ্রলোকের বাড়ি সাদার্ন এভিনিউতে। যেহেতু ওঁর বাড়ি আমার এরিয়ার মধ্যে পড়ছে তাই আমাকে সব জানানো হয়েছিল। তদন্তের প্রয়োজনে আমাকে সুবিনয় ঘোষালের বাড়িতেও যেতে হয়েছিল। এই হলো পুরো ঘটনা। উনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনভাবেই যুক্ত ছিলেন না তাই এই ঘটনাটা জানাতে ইতস্তত করছিলাম।
- বাংলায় একটা প্রবাদ আছে “যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন”। আপনি এই ঘটনাটা জানিয়ে ভালো করেছেন। শুধু একটাই প্রশ্ন, সুবিনয় ঘোষাল মিথ্যা পরিচয়ে ফলস্ ভোটার কার্ড নিয়ে কেন দিল্লী গিয়েছিলেন? এর উত্তর কি জানতে পেরেছেন?
- না। আমি ওঁর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কথা বলেছি। উনি দিল্লি যাওয়ার আগে বাড়িতেও কাউকে বলেন নি যে উনি দিল্লি যাচ্ছেন।
- তার মানে বিষয়টা অত্যন্ত সিরিয়াস। উনি ফ্লাইটের টিকিট কি ট্রাভেল এজেন্টকে দিয়ে করিয়েছিলেন নাকি নিজেই করেছিলেন?
- আমাদের কাছে যতটুকু খবর সম্ভবত দিল্লীর কোন ট্রাভেল এজেন্ট টিকিটটা করেছিল। ব্যাস, এটুকুই জানি।
- আপনি একটু আগে আমায় বলেছিলেন একজন ক্রিমিনাল মাদকদ্রব্যসহ ধরা পড়েছে। সে জানিয়েছে, মাদকদ্রব্য দিল্লি থেকে কলকাতায় আসছে?
- হ্যাঁ।
- তাহলে দিল্লী থেকে কলকাতার মাদকদ্রব্য সাপ্লাই হতে পারে। সেক্ষেত্রে সুবিনয় ঘোষালের খুনের সঙ্গে মাদকদ্রব্যের যোগাযোগ থাকতে পারে।
কিন্তু, উনি নিজে মাদক ব্যবসার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন।
- সেই কারণেই হয়তো ওঁকে সরিয়ে দেওয়া হল। নাঃ, দিল্লী যাওয়া দরকার। দিল্লীতে গিয়ে তদন্ত করা দরকার।
- কোন লাভ হবে? দিল্লী পুলিশ তদন্ত টদন্ত করে কিছু না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে ফাইল ক্লোজ করে দিয়েছে।
- দেখা যাক।
অনামিকা উঠে পড়ল। ওর যা জানার ছিল জানা হয়ে গেছে। গাড়ি চালিয়ে সোজা চলে এল বাড়িতে। তবে, থানা থেকে বেরোনোর আগে সুধাময়বাবুর কাছ থেকে সুবিনয় ঘোষালের বাড়ির ঠিকানাটা নিয়ে নিয়েছিল। ওর ইচ্ছা, সম্বুদ্ধ ঘোষের ছেলে দেবাঞ্জনের সঙ্গে যখন কথা বলতে যাবে তখন সুবিনয় ঘোষালের বাড়ির লোকেদের সঙ্গেও কথা বলে আসবে।
দুপুরে বাড়িতেই লাঞ্চ করে কিছুক্ষণ টিভি দেখে অনামিকা গাড়ি নিয়ে যখন বেরোলো তখন ঠিক বিকাল সাড়ে চারটে বাজে। মেঘমল্লার অ্যাপার্টমেন্টটা ঢাকুরিয়া লেক কালিবাড়ির আগে সাদার্ন এভিনিউ-এর উপর। অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গাড়ি পার্ক করে লিফ্টে করে পাঁচ তলায় পৌঁছে দেখল লিফ্টের উল্টোদিকেই সম্বুদ্ধ ঘোষের ফ্ল্যাট। দরজায় নেম প্লেট লাগানো আছে। ও বেল টিপতেই সম্বুদ্ধবাবু দরজা খুলে ওকে ড্রইং রুমে বসালেন। ফ্ল্যাটটা বেশ সাজানো-গোছানো, ভদ্রলোকের রুচির ছাপ সর্বত্র। সম্বুদ্ধবাবু ওর ছেলে দেবাঞ্জনকে ডেকে আনলেন। দেবাঞ্জনের বয়স চৌদ্দ-পনেরো বছর, মুখে সবে গোঁফের রেখা ফুটেছে। বেশ লম্বা অন্তত পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি তো হবেই। অনামিকার এরকমই মনে হল। অনামিকা হেসে ওকে পাশে বসিয়ে বলল –
- আমি তোমার একটা দিদি হই। আমাকে অনামিকাদি বলতে পার। আমি তোমার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। শুনেছি তুমি খুব ইন্টেলিজেন্ট ছেলে। দেখা যাক তুমি কতটা ইন্টেলিজেন্ট। কোন ক্লাসে পড়?
দেবাঞ্জন একটু জড়োসরো হয়ে বসেছিল, প্রশ্নটা শুনে একটু বাদে উত্তর দিল –
- ক্লাস নাইনে পড়ি।
- তোমার বয়স কত?
- পনেরো বছর এক মাস।
- ভেরি গুড। তুমি তো সায়েন্স নিয়ে পড়ছো?
- হ্যাঁ।
- কোন সাবজেক্টটা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?
- ফিজিক্স।
- ফিজিক্সের আলাদা টিউটর আছে?
- বাংলা বাদে সব সাবজেক্টে আমি আলাদা করে টিউটরের কাছে পড়ি।
—তাঁদের বাড়িতে পড়তে যাও?
- না। তাঁরা আমার বাড়িতে পড়াতে আসেন।
- আজ স্কুল ছিল?
- ছিল, কিন্তু যাই নি।
- কেন?
-বাবা বারণ করলেন। বললেন, আপনি কথা বলতে আসবেন।
- তোমার কোন স্কুল?
- সেন্ট জেভিয়ার্স মিশনারি।
- এটা কোথায়?
- পার্ক স্ট্রিটে।
- গতকাল স্কুল ছিল?
- হ্যাঁ।
- স্কুলে সারাদিন কীভাবে কাটালে কী কী করলে যদি একটু খুলে বল।
-বলছি
আমাদের স্কুল সকাল দশটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটে অবধি। আমি সাধারণত সাড়ে নটা থেকে পৌনে দশটার মধ্যে স্কুলে পৌঁছে যাই। বাবা গাড়ি করে অফিস যাওয়ার সময় আমায় নামিয়ে অফিস চলে যায়। গতকাল সাড়ে নটায় স্কুলে পৌঁছই। তারপর, প্রেয়ার করে দশটা পনেরোতে ক্লাস শুরু হয়।পরপর তিনটা ক্লাস ছিল
–ইংরেজি,বাংলা আর ফিজিক্স। তারপর সোয়া একটার সময় টিফিন। টিফিন আওয়ার্স দুপুর দুটো অবধি। আমি বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে যাই। টিফিন খেয়ে নিচে বাইরে স্কুলের পিছন দিকে গেটের কাছে গেলাম গ্রিলের গেট বন্ধ থাকে কিন্তু বাইরে আইসক্রিম, ঝাল-মুড়ি, ঘুগনি আর একজন লজেন্স-ওলা বসে।আমি আইসক্রিম কিনে খেলাম। তারপর, প্রতিদিন যা করি দুটো লজেন্স কিনে ক্লাসে ফেরত এলাম দুটো থেকে ফিজিক্স প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস ছিল। মাথা ভার ভার লাগছিল, ঘুম পাচ্ছিল। আমি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আন্টি দেখতে পেয়ে খুব বকা দিলেন। তাও, জেগে থাকতে পারছিলাম না। তারপর সাড়ে চারটের সময় স্কুল শেষ হলে গাড়িতে বাড়ি ফিরলাম।
- বাহ্, খুব সুন্দর বলেছ। ছোট্ট দু-একটা প্রশ্ন আছে। আজও কি তোমার দুপুরবেলায় ঘুম ঘুম পেয়েছে, মাথা ভার হয়েছে?
- না। আজ ঠিক ছিলাম।
- স্কুলে গেলেই ওরকম মাথা ভার হয়, ঘুম ঘুম পায়?
- হ্যাঁ, তবে টিফিন পিরিয়ডের পর, সেকেন্ড হাফে।
- গেটের বাইরে যারা খাবার নিয়ে বসে তাদের খাবার প্রচুর বিক্রি হয়? প্রচুর ছেলে কেনে?
- হ্যাঁ। আমার অনেক বন্ধুই তো কেনে।
- ইলেভেন টুয়েলভের ছেলেরাও কেনে?
- হ্যাঁ। ওরা বেশি কেনে।
- এদের মধ্যে কার বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয়?
-গরমের সময় আইসক্রিম আর অন্যসময়ে ঘুগনি বা ঝালমুড়ি। লজেন্স-ওলার বিক্রিও খারাপ নয়। এই লজেন্স-ওলা অদ্ভুত! মাসখানেক আগে থেকে বসছে। প্রথমে কয়েকদিন তো ফ্রিতে সবাইকে লজেন্স দিয়েছিল! দাম অবশ্য একটু বেশি, কিন্তু লজেন্সটা খুব ভালো।
অনামিকা একটু চুপ করে থেকে ওকে বলল –
—তুমি এখন যেতে পার। এই দিদির ছোট্ট একটা অনুরোধ আছে, রাখবে?
—কী?
— এখন কয়েকদিন বাইরে থেকে খাবার কিনে খেও না। বাড়ি থেকে যে খাবার নিয়ে যাচ্ছ তাই খেও। কথাটা রাখবে তো?
- হ্যাঁ।
দেবাঞ্জনের সঙ্গে কথা বলা শেষ হয়ে গিয়েছিল, ওকে যেতে বলল। তারপর, সম্বুদ্ধবাবুর সঙ্গে কথা বলল। ওঁকে কিছু প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রাকশন বিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
চলবে...
ধারাবাহিক এই রহস্য উপন্যাসটি প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহের রবিবার প্রকাশিত হবে অঙ্কুরীশা-র পাতায়।আপনারা এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি ক্লিক করে পড়ুন ও মতামত জানান।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন