গুচ্ছ কবিতা
ত্রিপর্ণা ঘোষ
১.
প্রবাহমান
কথা ছিল হেঁটে যাব,
জীবন নদীর গতি বেয়ে;
পাহাড় থেকে সমতল,
শত পরিবর্তনের শেষে,
মিলব আবার একই সাথে।
খরস্রোতা,ঝড়,ঝঞ্জা
আসবে যদি আসুক;
দৃঢ় বন্ধনে বাঁধব তখন,
একটি শ্রোতেই ভেসে যাব দুজন।
হাজার প্রতিশ্রুতি এইভাবেই ছিল সাজানো,
যা হারিয়েছে অজানা এক বন্যায়।
বন্যা শেষে আজও জেগে বালুচর,
স্মৃতির মণিকোঠা হয়ে।
নদী আবারও বহমান একই গতিধারাই,
কিন্তু দিক পরিবর্তন স্পষ্ট।
হাজার অঙ্কের ভুল আজও
আঁকিবুকি কাটে বালুচরের বুকে।
কিছুটা অপেক্ষাও বটে।
সহসা আবার আসবে এক জোয়ার,
ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এই শুষ্ক বালুচর;
নতুন ছন্দে আবার যাবে বইয়ে,
মোহনা শেষের দিশারী হয়ে।
২.
ক্ষনিকের অবসর
হিমেল এই সন্ধ্যের রাত...
আকাশের মেজাজটাও কেমন যেন ভারী।
মেঘের ওপর হাজার অভিমান বেশ স্পষ্ট;
চাঁদও তার মুখ লুকিয়েছে মেঘচ্ছায়াই;
চারপাশে মানুষজনের ভিড়ও বেশ কম,
হয়তো মেঘের হঠাৎ বর্ষনের শঙ্কা।
আলো অন্ধকার লুকোচুরি খেলায় ব্যস্ত সবুজ মাঠে,
স্নিগ্ধ শীতল বাতাস ছুটে যায় মাঠের এপার ওপার;
ঘাসেরাও স্নান সেরেছে শিশির জলে।
একাকী হেঁটে চলেছি শিশিরভেজা ঘাসের ওপর,
অন্ধকারের গভীর মায়া আসক্ত করছে ক্রমশ।
নিস্তব্ধতা আলগা করছে মরচে ধরা মনের শিকল।
প্রতিটা মুহূর্ত বড় কাছে টেনে আপন করে নিচ্ছে।
বন্ধুত্ব বেশ ঘনীভূত বাইরের আর অন্তরের;
মনের আবডালে কালো পর্দা টেনেছিল যে তৃষ্ণা,
সেও তৃপ্ত করছে নিজেকে অন্ধকারের মোহে।
হাজার অদৃশ্য তেজ উদ্দীপ্ত করছে মনের আঙিনা,
গাড় কালোর ছায়া ছেড়ে উদ্ভাসিত হয়েছে মন।
ঘড়ির কাঁটা তার ছন্দেই ছুটে চলছে অবিরাম,
রাতের গভীরতা ক্রমে ক্রমে বেড়ে চলেছে;
দূর হাইওয়ে থেকে আসছে ধাবমান গাড়ির শব্দ।
এবার ফিরতে হবে ইঁট পাথরের নগর জীবনে,
ক্ষনিকের অবসর পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছি..
গতিশীল,কংক্রিটে ঘেরা সেই নিয়মবাধা জীবনে।
৩.
অন্য বসন্ত
মেতেছো এক কঠিন লুকোচুরি খেলায়
যেখানে খেলার সাথী হয়েছো নিজেই।
ফাগুন হাওয়ায় গা ভাসিয়েও
পারনি প্রেমিক হতে,
হারিয়ে যেতে চাও অচেনা নদীর তীরে।
ব্যাস্ত বড় তুমি নিজের খেলায়,
মত্ত হয়েছ এলোপাথাড়ি ভাবনায়।
ফিরে দেখতে ভুলেই গেছ
কুয়াশা জড়ানো সেই সন্ধ্যেটাও ছিল তোমারই গল্প।
বসন্ত কিন্তু আজও আছে আমার দেশে বেঁচে
দক্ষিণ হাওয়া দোলা লাগায়
আজও প্রানের পরে।
খোয়াই বন অপেক্ষারত গানের ঝুলি নিয়ে
পড়ে থাকে শুধু ঝরা পাতা বুকের ব্যামো নিয়ে।
একদিন এই বসন্ত হবে দুরন্ত
বনে বনে জেগে উঠবে দক্ষিনা ঝড়
কোকিল যাবে চিরনিদ্রায়
বেড়া ভাঙবে স্বপ্নমোড়া অপেক্ষারা
গলা ফাটিয়ে জানাব সেদিন তোমায়
এই কাঠফাটা রোদে চাপা পড়ে যাওয়া
এক অন্য বসন্তের কাহিনী।
৪.
বসন্তপ্রেম
কথা ছিল আবার দেখা হবে
একমুঠো রঙিন আবির হাতে,
সোনালী বসন্তের সকালে।
সোনাঝুরির বনে যখন বয়ে যাবে বসন্ত
এলোপাতাড়ি ভালোবাসাগুলো ছাড়বে নিঃশ্বাস।
বাউল গানের সঙ্গী হয়ে,
ভেসে যাব দুজন প্রেমের স্রোতে।
আদিবাসী রমণীর নাচের ছন্দে ছন্দে
বয়ে যাবে বেলা।
ঈষৎ উষ্ণ রৌদ্রস্নানে ভিজবে শাল বৃক্ষমালা
পাতাদের সাথে চলবে রোদের লুকোচুরি খেলা।
তারপর?
কোপাই নদীর পাড় বরাবর
হাতে হাত রেখে হাঁটব দুজন অজানার উদ্দেশ্যে। মৃদু বাতাস এলোমেলো করবে আমার এলোচুল।
সন্ধ্যে নামবে লাল খোয়াই এর বুকে,
বসব দুজন কোপাই নদীর ধারে।
লাল পলাশের কুঁড়িতে সাজিয়ে দেবে খোলাচুল।
পূর্ণিমার আলো ঢেউ খেলে যাবে আমাদের ওপর।
বসন্তের রঙের ছটায় রঙ্গিন হবে দুই হৃৎপিন্ড
দিশাহীন দুচোখ নির্বাক হবে দুচোখের সামনে
কোপাই নদী আর পূর্ণিমার চাঁদ তখন নীরব দর্শক
এই গল্পই হোক যেন আমাদের হাজার বসন্ত জুড়ে।।
৫.
উষ্ণ তিমিরে
তোমার পরশে উঠব জেগে হঠাৎ
নিস্তব্ধ সে পূর্ণিমার রাতে।
যেখানে জোয়ার আসে আকাশের কোলে
একের পর এক বয়ে যায় মেঘেদের ঢেউ।।
তখনও হয়তো ঘুম জড়ানো চোখ
কিছুটা আহ্লাদ মাখাও বটে,
জাপটে ধরে বুকের মাঝে
খুঁজছে সুখের আশ্রয়।।
বাড়ছে রাতের গভীরতা,
মেঘেদের আড়ালে চাঁদও গিয়েছে ঢেকে।
অন্ধকারের গাড়ত্বও বেড়েছে ক্ষণিক
ঝিঁঝি পোকাগুলোও হয়েছে অবাধ্য।
ক্রমে ক্রমে বাড়ছে পারদের স্কেল,
উষ্ণ নিঃস্বাস পড়ে ঠোঁটের পরে
ব্যস্ত রাত বাড়িয়ে চলছে তার ব্যাসার্ধ,
বাড়ছে দ্রুতি দুই হৃদস্পন্দনের।
আরও পড়ুন 👇👇
https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_31.html

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন