রবিবারের অনুবাদ গল্প
ফিনিক্স পাখির জন্ম
মূলভাষা - অসমীয়া
ভাস্কর ঠাকুরিয়া
ভাষান্তর-বাসুদেব দাস
অরণ্যটা দপ দপ করে জ্বলছে।
আর জ্বলছে ফারুক এবং নিরঞ্জনের মন।
‘এই ধরনের আগুন আমরা আগেও অনেক দেখেছি, কিন্তু এই ধরনের নিচু প্রবৃত্তির মানুষ যে আমরা আগে দেখিনি।’ রাগে ফারুক ফুঁসছিল। দাবানল বন্ধ করতে যাওয়া একজন গাইড ওদেরকে ডাকতেই ফারুক উত্তর দিল।
‘মতি’র জন্য তার মগজ এমনিতেই গরম হয়ে রয়েছে, তার মধ্যে কাটা ঘায়ে নূনের ছিটের মতো কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া ঝগড়া এবং মানুষগুলির উৎপাতে ফারুক সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। সে মনে মনে ভাবছিল রাতেই পর্যটক তিনজনকে উঠিয়ে নিয়ে করবেটের গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দেবে। বাঘ বের হওয়ার আগেই মলমূত্র ত্যাগ করে যখন হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে ওপারে চলে যাবে তখন টের পাবে অরণ্য কত ভয়াল, তার নিয়ম কত কঠোর। অন্যদিকে নিরঞ্জনের মনে রাগ করার মতো শক্তিও ছিল না। বারবার সে প্রমাণ পেয়ে এসেছে নতুন করে উপলব্ধি করা নতুন সত্যটা- মানবতার কবেই মৃত্যু হয়েছে। এমনকি তার প্রিয় অরণ্যেও সে তার ব্যতিক্রম দেখতে পেল না। সেই কথাগুলি ফারুকের সঙ্গে বলার জন্য ইচ্ছা করছিল যদিও ফারুকের মন বুঝে নিরঞ্জন আর কিছুই বলল না। সমগ্র জীবন জঙ্গলে কাটানো ফারুক তার দর্শনের তাত্ত্বিক তথ্যের কীভাবে আভাস পাবে? নিরঞ্জনের শিক্ষিত কর্পোরেট সঙ্গীরা তার কথা শুনে মুখ ভেংচে উঠে।
‘তোর আসলে পেশাদারী এপিটাফ লেখক হওয়া উচিত ছিল। জাহ্নবী আমেরিকান প্রজেক্ট হেড করার জন্য তোকে লাথি মারল, তাই পৃথিবী থেকে প্রেম জিনিসটাই নাই হয়ে গেল! প্রজেক্টের সমস্ত কাজ তোর করা জেনেও বস জাহ্নবীকেই ব্যাক করল, তাই সততার মৃত্যু হল!! জাহ্নবী তার প্রেমিকার নাম যে কয়েকদিন আগে একটি লোভনীয় পদোন্নতির জন্য তাকে বেশ ভালো করে ঠকিয়ে একটি আমেরিকান গ্রীন ভিসার অধিকারী হয়েছে। বন্ধু বিজয়ের মতে সে এত বড় প্রতারণার প্রতিবাদ না করাটা নিরঞ্জনের মহা মূর্খামির পরিচায়ক। যখন চাকরিটা ছেড়ে তার মনের কথা নিরঞ্জন বিজয় কে বলেছিল তখন বিজয়ও নিরঞ্জনকে দোষারোপ করেছিল।
‘সিনেমাটা তোর ভালো লাগল না, তাহলে সিনেমারই মৃত্যু হল, মানুষ বই পড়ে না, তাই প্রিন্ট মিডিয়ার মৃত্যু হল- যাকে পাবে তাকে মারতে যাবে। আর আজ বলছিস মানবতার মৃত্যু হয়েছে। যুগধর্ম ও মানতে পারিস না আর কেউ একজন ডারউইনের সূত্র মেনে এগিয়ে গেলেও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরিস। এই ধরণের মিথ্যা দম্ভ আদর্শের আজকের যুগে কোনো কাজ নেই। তাই আসলে সমস্যাটা তোরই।’
কে জানে বিজয় হয়তো সত্যি কথাই বলেছিল। তাই শহরের কাউকে নিরঞ্জন তার মনের কথা খুলে বলে না। বেশিরভাগেরই সময় নেই। আর তা নাহলে সেই সব বিষয় নিয়ে ওরা বিন্দুমাত্র সংবেদনশীল নয়। প্রত্যেকেই যোগ্য ভোগ্য বসুন্ধরার মতো আদর্শের দোহাই দিয়ে প্রতি মুহূর্তে মানবতাকে হত্যা করে চলেছে। সেই জন্যই নিরঞ্জন সবকিছু ছেড়ে করবেটে চলে এসেছিল- দরকার হলে প্রাইভেট গাইডের কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করবে বলে। মহানগরের মানুষগুলির জংলী মতলব গুলি বুঝতে না পারলেও অরণ্যের আদব কায়দার সঙ্গে নিরঞ্জনের বহু দিনের পরিচয়। সময় পেলেই বনানীর সান্নিধ্যে সে কয়েকদিনের জন্য দৌড়ে আসে। সেখানে মাচানে উঠে পাখি দেখে, না হলে রামগঙ্গা নদীর তীরে বসে কুমিরের ফটো নেয়, না হলে ফারুকের সঙ্গে মতির পিঠে উঠে বাঁদর, পাখি পশুর পর্যবেক্ষণ করে। বাঘের সন্ধানে বের হওয়াটা তার অত্যন্ত প্রিয়। ভুলে যায় তার কর্পোরেট অবসাদ গুলি। করবেট তার সবচেয়ে প্রিয় অরণ্য। যেভাবেই হোক না কেন বছরে দুই তিনবার করবেটে সে আসবেই। যার জন্য করবেটের বনকর্মী, গাইড ইত্যাদি থেকে শুরু করে রামনগরের দোকানি পর্যন্ত সবাই নিরঞ্জনকে জানে এবং কেবল মানুষ কেন দু-একটি জীবজন্তুর সঙ্গেও নিরঞ্জনের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব রয়েছে। ‘মতি’ও নিরঞ্জনের প্রিয় সখা- সেকথা ডিকালা বা হেডকোয়ার্টার রামনগরের জনগণও জানে। তার জীবনে এতগুলি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে জঙ্গলই যে তার একমাত্র শান্তির জায়গা বলে নিরঞ্জন করবেটে এসেছিল। কিন্তু এখানে পা রেখেই সে সম্পূর্ণ বিপরীতটাই অনুভব করল।
সারাটা দিন গাড়ি চালিয়ে সন্ধ্যেবেলা যখন সে রামনগর এসে পৌঁছায় তখনই ডিকালার মানুষগুলি খবর দেয় ‘মতি’হারিয়ে গেছে। ‘মতি’ নিরঞ্জনের প্রিয় হাতি- বন্ধু ফারুকের প্রাণ। কেউ বলছে সেদিন নাকি ওরা তাকে একা একা করবেটের ঘোর জঙ্গলের দিকে যেতে দেখেছে। সেখানে বন্য হাতির দল পেলে যে তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে সেটা নির্ঘাত। এত বছর মানুষের মধ্যে মানুষের আদব কায়দায় থেকে জঙ্গলে একা কতক্ষণ ‘মতি’ কাটাতে পারবে সেটা সন্দেহ। তারমধ্যে নদীর অঞ্চলের দাঁতাল হাতি একটা নাকি পাগল হয়ে গেছে, যাকে পায় তাকেই কয়েকদিন ধরে মেরে ফেলছে। ঘোর অরণ্যের মধ্যে একা কীভাবে সামলাচ্ছে সেটা সন্দেহ। কিন্তু সে গেল কোথায়? মাহুতের কাছে তার হাতিটাই সর্বস্ব এবং আজ পাঁচ দিন হল ‘মতি’র কোনো খবর নেই।
কেবল ফারুকের জন্যই নয়, ‘মতি’র সঙ্গে নিরঞ্জনেরও সম্বন্ধে বহু বছরের। প্রতিবার সে এখানে এলেই ফারুক এবং ‘মতি’অপেক্ষা করে থাকে নিরঞ্জনের সঙ্গে জঙ্গলে বেড়ানোর জন্য। জন্তু-জানোয়ারের ব্যবহারের জ্ঞান নিরঞ্জনের আছেই, কিন্তু ‘মতি’ অন্যান্য জ্ঞানী হাতির চেয়েও একধাপ এগিয়ে। ফারুকের প্রতিটি কথাই সে মেনে চলে, কিন্তু অনেক সময় ফারুককে ছাড়িয়ে স্ত্রী মেহজবনিসার আদেশ মেনে চলে। গতবছর নিরঞ্জন এখানে আসার সময় অরণ্য ভ্রমণে বেরিয়ে যাবার জন্য সে ফারুকের কোয়ার্টারে সকাল বেলায় এসে উপস্থিত হয়েছিল। তখন পর্যন্ত মেহজবনিসার চা জলখাবার হয়নি।
‘আমার ক্ষুধা নেই,ফিরে এসে খাব’- নিরঞ্জনকে দেখে ফারুক দ্রুত বেরিয়ে এসে ‘মতি’কে প্রস্তুত হওয়ার আদেশ দিতে লাগল।
‘মতি বস বস, সাহেবকে কিন্তু আজ বাঘ দেখাতে হবে।’ মতি মাথা নেড়ে বসে পড়ল। ওরা দুজন উঠতে যাচ্ছিল মাত্র, ভেতর থেকে মেহজবনিসা চিৎকার করে উঠল-‘ মতি,কিছু না খেয়ে ওদের কোথাও নিয়ে যাস না।’মেহজবনিছা চিৎকার করল। মতি ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। সে যাবে না মানে যাবে না। অবশেষে ফারুক এবং নিরঞ্জন যখন চা টা খেয়ে উঠল তখন মতি তৈরি হল ওদেরকে অরণ্য দেখানোর জন্য।মাহুতের বাধ্য হাতি নিরঞ্জন হয়তো অনেক দেখেছে, কিন্তু এই ধরনের ঘরোয়া নিয়ম মেনে চলা ঘরের সদস্য হাতি হয়তো একমাত্র মতি।
অনেক সময় মতি নিরঞ্জনের কথাও মেনে চলে। একবার বেরিয়ে যাওয়ার সময় সামনে দেখল শিকার (কিল)একটার উপরে বসে বনের রাজা আহার গ্রহণ করছে। ওদের দেখে বনের রাজা কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে তাকালো। অন্য হাতিরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত কিছুটা বিব্রত হয়, ইতস্তত করে, না হলে সেই জায়গা ত্যাগ করে। নিরঞ্জন তার টেলিফোটো লেন্স বের করে বলল-‘মতি একটুও নড়াচড়া করিসনা,ফোটো খারাপ হয়ে যাবে।’ ব্যস,মতি ট্রাইপাদের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। নিরঞ্জন বিন্দুমাত্র শব্দ না করে ইচ্ছামত ফটো উঠিয়ে তবেই সেই জায়গা ত্যাগ করল।
সেই মতিই নাই হয়ে গেছে। এই অবস্থায় নিরঞ্জন কীভাবে ফারুকের মুখোমুখি হবে তা বুঝতেই পারছিল না। সে নিজেই ভারাক্রান্ত, এইসব কথা মনে নিয়ে নিরঞ্জন যখন এসে ডিকালায় প্রবেশ করল- অরণ্যের বিপরীত রূপ দেখে সে অস্বস্তি অনুভব করল। অরণ্যটা দেখছি বাজার হয়ে পড়েছে। দিল্লি থেকে একটা দল এসে পর্যটক গৃহের পাশের খালি জায়গাগুলিতে জোরে জোরে গান লাগিয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছে। নিয়ম মতে এই সময়ে কেউ কাঁটাতারের বাইরে যাওয়া নিষেধ। এমনকি নির্ধারিত সময়ে গাইড ছাড়া বাইরে বেরোনো নিষেধ। এবং জঙ্গলের ভেতরে জিপ থেকে নেমে মাটিতে পা দেওয়াটা কী হতে পারে ওরা বুঝতে পারেনি। তারমধ্যে জরিমানা রয়েছে। চিফ কনজারভেটর বিশেষ বন্ধু, যা করার করে নে। বনকর্মীরা বাধা দিতে চাওয়ায় ওরা উল্টে ঝগড়া করার জন্য এগিয়ে এল।
‘আমরা জানি আপনি চিফ কনজারভেটরের খাস মানুষ,বন্য বাঘেরা তো আর জানে না। কোনো একজনকে উঠিয়ে নিয়ে গেলে তখন কি হবে?’
‘বাঘ কোথায় হে- তিন দিন সকাল-বিকেল চক্কর লাগাচ্ছি, বাঘের ছায়াটাও দেখতে পাইনি দেখছি।’ পার্টি কিন্তু নাছোড়বান্দা। ওরা এটা বুঝে না যে ঢাক ঢোল বাজিয়ে অরণ্যে ঘুরে বেড়ালে বাঘ কেন হরিণও ওরা দেখতে পাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।
এদিকে ফারুক এবং মেহজবনিছার অবস্থা শোচনীয়, মতি নেই মানে ওদের বড় ছেলে নেই। ঘরের উনুনে এই কয়েকদিন আগুন জ্বলেনি। আজ দুটো প্রজন্ম ওরা মাহুতের কাজ করে আসছে।ডিকালায় এসে নিরঞ্জন বেশিরভাগ সময় ফারুকের কোয়ার্টারে কাটাল,পর্যটকদের উৎপাতে অতিথিশালার দিকে তার যেতে ইচ্ছা করল না। অতিথিশালায় আরও দুইজন বুড়ো এসেছে। রাজনীতির মানুষ না গ্যাংস্টার টের পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু অত্যন্ত সন্দেহজনক আচার-ব্যবহার। ওদের সঙ্গে দুজন অত্যন্ত কম বয়সী বেপরোয়া মেয়ে। ওদের আবার হাতি ঘোড়ায় মোটেই আগ্রহ নেই। ঘরের সামনে বার খুলে বসে গেছে চারজন এবং এরকম একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেন ওরা নিজেদের ফার্ম হাউসে এসেছে।
‘এই ধরনের মানুষকে অরণ্যের ক্ষেত্রে কেন ঢুকতে দেওয়া হয় আমি বুঝতে পারি না।’ ফারুক তাকে বলছিল।
‘সত্যি কথা,ওরাই আগুন লাগিয়েছে নাকি? রুবুল গাইড মত প্রকাশ করল।ডিকালায় বিকেল হলে ফার্লে,রুবু,গাইড,ইন্টেকাপ ক্যান্টিনের কার্লা ইত্যাদি প্রত্যেকে নিজের নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আড্ডায় বসে যায়। আর কিছুই করার নেই সেখানে,মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই, টিভি নেই,এফ এম নেই, তাই একে অপরের অভিজ্ঞতায় রস লাগিয়ে সময় কাটায়। সেই জন্য অরণ্যের প্রতিটি মানুষই বাকপটু, গল্প বলায় দক্ষ এবং প্রত্যেকের কাছেই হাজার খানেক রূপকথা থাকে। আজ অবশ্য রসাল আড্ডা বসেনি। মতিকে নিয়ে সবাই চিন্তিত, তাই প্রত্যেকেই ফারুকের ঘরে বসেছে। নিরঞ্জনও এসেছে বহুদিন পরে। ফারুকের মন খারাপ এবং এইবারের ডিকালার অতিথিদের রূপ দেখে প্রত্যেকেরই মাথাটা গরম হয়ে রয়েছে।
‘ আগুন, কোথায় লেগেছে?’- নিরঞ্জন জিজ্ঞেস করল। দাবানলের খবরটা সেদিন বিকেলে এসে পৌঁছেছে যেদিন নিরঞ্জন এসে ডিকালা পৌঁছেছে।
‘ও আপনি জানেন না, পশ্চিমাঞ্চলের কোর ফরেস্টের গ্রাছ ল্যান্ডে দাবানল আরম্ভ হয়েছে। ফরেস্টের মানুষগুলি তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গেছে’। রুবুল জানাল।
‘হতে পারে, চারপাশে শুকনো পাতায় অরণ্যটা এমনিতেই বারুদ হয়ে রয়েছে, তার মধ্যে এই শুকনো বাতাস, বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। অরণ্যটা গ্রাস করার জন্য একটা স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট। এবং বাধা দেওয়ার পরেও অরণ্যের ভেতরেও ওদের হাতে হাতে সিগারেট।’
‘যেন এটা করবেট নয়,ওয়ার্ডেন বিহীন কলেজ হোস্টেল। গতবারের মতো একটাকে ধরে উত্তম-মধ্যম কিছু দেব নাকি? যদি কিছুটা শিক্ষা পায় পাক।’ ইন্টিকাব বলল।
গতবছর একটা কলেজের দল এসে এভাবেই উৎপাত করছিল,ওরা সবাই মিলে এমন শিক্ষা দিল যে বেচারারা বাঘের ভয়ে খরগোশের মতো দৌড়া দৌড়া করে করবেট গেটের বাইরে বেরিয়ে গেল। তারমধ্যে রামনগরের বাস স্টেশনে একটা গাইডের দল ওদের কাণ্ডের কথা জানতে পেরে উত্তম-মধ্যম দেবার ব্যবস্থা করল।
‘অবশ্য এই সময় একটু আগুন খারাপ নয়, মতিও জেগে উঠে।’ কার্লাজী বলল। সে কথাগুলো একটু ভেবেচিন্তে বলে।
‘ জেগে ওঠার আগেই যদি সমগ্র অরণ্য ছাই হয়ে যায়?’ ইন্টিকাব গড়গড় করে উঠল। সাধারণত জঙ্গলের মধ্যে আর্দ্রতা বেশি হওয়ার জন্য দাবানল চটকরে লাগেনা। বনরক্ষীরা আজকের মধ্যেই আগুন নেভাতে সক্ষম হবে। আর কোর ফরেস্টের ভেতরে টুরিস্ট কী করবে? ওদের তো তার কাছে যেতে দেওয়াই হয় না।’
‘এই পর্যটকদের কোনো ভরসা নেই, আমার তো চোরাশিকারি এবং টুরিস্ট দুটিকে একই মনে হয়। যাই হোক না কেন, আগুন দ্রুত কমে গেলে হয়।’ রুবুল তার মনের কথা বলল।
সেটাই সবাই আশা করেছিল। গ্রীষ্মকালে এমন দু-একটি দাবানোল করবেটে লেগেই থাকে। আর নিজে নিজেই কমে যায়।
কিন্তু সেটা হয়ে উঠল না।
পরের দিন, মানে আসল ঘটনার দিনটি সকালে সবকিছুই ঠিক ছিল। পর্যটকরা সকালে উঠে চারপাশে বেরুতে শুরু করেছিল। নিরঞ্জন এবং ফারুক রুবুল গাইডের জিপে করে মতির সন্ধানে বেরিয়েছিল। ফরেস্ট গার্ডের ওয়ারলেস রেডিও মেসেজ এসেছিল- ওই এলাকায় গত রাত্রে একটা নিঃসঙ্গ হাতি দেখা গিয়েছিল।ওরা সেই জায়গায় উপস্থিত হল। কে জানে সেই হাতিটাই হয়তো মতি। এগিয়ে যেতে যেতে ওরা আগেরদিন দাবানল লাগা জায়গাটিতে উপস্থিত হল। আগুন তখন এগিয়ে গিয়েছিল যদিও উত্তাপ মিলিয়ে যায়নি। এই আবহাওয়ায় এই অঞ্চলে এমনিতেই উত্তপ্ত চুয়াল্লিশ ডিগ্রি থাকে,তারমধ্যে আগের দিন জ্বলে ওঠা অঙ্গারের উত্তাপ মিলে সেই জায়গা সহ্যের বাইরে গরমের সৃষ্টি হয়েছিল। এর আশেপাশে কোনো জীবিত প্রাণী থাকাটা সম্ভব নয়। চারপাশে ছাই, ধূলি এবং পোড়া জন্তুর মিশ্রিত একটা বিকট গন্ধ বেরিয়েছিল। অরণ্যের মধ্য দিয়ে জিপে করে ঘুরে শরীরে স্তরের পর স্তর ধুলো জমা হয়েছিল। এখানে এসে পৌঁছানোর পরে বাতাসে উড়ন্ত ছাই সবার মুখ কালো করে দিল।
‘দাঁড়াও দাঁড়াও।’ তখনই ফারুক চিৎকার করে করে গাড়িটা রাখতে বলল। অরণ্যে কিছু একটা দেখার জন্য ওদের প্রত্যেকেরই প্রতিটি ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সক্ষম। বাতাসে গন্ধ শুঁকে অথবা দূরের পাখির ডাক শুনে বলে দিতে পারে যে বাঘ কত দূরে, কোন ঝোপের আড়ালে থাকতে পারে। সেই সময় ওদের জিপটা বেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল দাবানলে পুড়ে যাওয়া ঘাস বনের সমান্তরালভাবে। তখনই রুবুল দূর থেকে পোড়া গাছের ডালে কিছু একটা দেখে। জিপ থেকে নেমে তারা ছাই ভেঙ্গে এগিয়ে এগিয়ে এসে দেখে যে একটা জন্তু একটা গাছের ডালে ঝুলে রয়েছে। ওরা আগের দিন পুড়ে শেষ হওয়া ঘাসের ছাইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেল। আগুনে অরণ্যের সেই অংশটুকু পুরোপুরি ভষ্মীভূত হয়েছিল। দাবানলের গতি কখনও কখনও এত তীব্র হয় যে সে দৌড়াতে থাকা চিতাকেও গ্রাস করতে পারে। গাছটার কাছে গিয়ে দেখে যে একটা হরিণ গাছের ডালে মরে পড়ে আছে। আগুনে পুড়ে চামড়া কালো হয়ে গেছে, কে জানে হঠাৎ বেড়ে ওঠা আগুনের গতিবেগ তাকে পরাস্ত করে পুড়ে রেখে গেল। চোখদুটি মেলে দূরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দুঃখজনক দৃশ...
‘হগ ডিয়ার’- নিরঞ্জন বলল।আজকাল বিপন্ন প্রাণী বলে সরকার ঘোষণা করেছে। খুবই নিরীহ প্রাণী।
হরিণ নয়,হরিণী! দেখুন শিং নেই। বলে উঠল। সাধারণত পুরুষ হরিণের দীর্ঘ শিং থাকে। নিরীহ প্রাণী, নিরীহ মৃত্যু।’ নিরঞ্জন বলে উঠল। হ’গ ডিয়ারটার অবস্থা দেখে ফারুক একটি ছোট্ট ছেলের মতোই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। সাহস এবং ক্রোধের জন্য বিখ্যাত করবেটের বনকর্মীদের আবেগিক দিকটা এই ধরনে সাধারণত সবাই দেখতে পায় না, কিন্তু যে কোনো অরণ্য প্রেমীর জন্যই এটা একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এমনিতেই সে মতির চিন্তায় পাগল হয়ে আছে। কয়েক বছর আগের কথা- এভাবেই তারা গভীর অরণ্যের মধ্যে প্রতি রাতে ধোঁয়া বের হতে দেখে ওদের কয়েকজনের সন্দেহ হল। অরণ্যের মাঝখানে গিয়ে সেই সেই ধোয়ার খবর করতে ওরা কয়েকজন রাতে বেরিয়ে পড়ল। ঘন জঙ্গলে দিনের বেলাতেই পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ। রাতে তো কোনো অঞ্চলেই কেউ যেতে পারে না, তাহলে সেই ধোঁয়া নিশ্চয় কোনো চোরা শিকারিই সৃষ্টি করতে পারে।গিয়ে দেখে যে একটা দাঁতাল হাতি মরে পড়ে আছে এবং তার নিচে দিয়ে রক্তের নদী বয়ে চলেছে। আর চোরাশিকারি তার দাঁতগুলি কেটে বের করে নিয়ে গেছে এবং সেই ধোঁয়া চোরা শিকারিরা সেখানে বসে থেকে রান্না করে খাওয়া থেকে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু চোরাশিকারি কয়েকজন হাতির দাঁত নিয়ে ওরা পৌঁছানোর আগেই উধাও হয়ে গেল। সেদিন ফারুক এবং রুবুল হাউ হাউ করে কেঁদেছিল এবং মতির পিঠে উঠে সবাই চোরা শিকারিদের করবেটের প্রতিটি সম্ভাব্য পথে খুঁজে বেড়িয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল। সে বার ওরা কাঁদতে কাঁদতেই দুঃখের নিবৃত্তি করেছিল।সেদিনও ফারুক এভাবেই কাঁদতে শুরু করে।
‘ যা হয়েছে হয়েছে আর…এটাতো কোনো চোরাশিকারির কাজ নয়। অরণ্যের জিনিস, অরণ্য নিয়ে গেল। তাতে আমাদের করার কিছু নেই।’ নিরঞ্জন সান্ত্বনা দেবার জন্য বলল-‘ চল যাই, দেরী হয়েছে, বিকেলের দিকে তো আসবই আবার।’
ভগ্ন মনে প্রত্যেকেই ডিকালার অতিথিশালায় ফিরে এল। ততক্ষণে অন্য পর্যটক দলগুলিও ডিকালায় এসে পড়েছে। প্রত্যেকের মুখেমুখে হয় দাবানলের খবর, নয় তো মতির কোনো খবর আছে কিনা তার খবর। মতির বিশেষ কোনো খবর নেই এবং দাবানল বেড়ে চলেছে। বন বিভাগ সমস্ত অতিথিকে ডিকালা খালি করার জন্য আদেশ জারি করেছে এবং যারা থাকবে তাদেরকে নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে হবে। এই সতর্কবাণীও জানিয়ে দিয়েছে। কেবল অরণ্য কর্মীরা এবং বন বিশেষজ্ঞরা থাকতে হবে বলে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা জারি করেছে। পর্যটকরা বাড়িমুখো হয়েছে।দুই একজন সাহস করে থেকে গিয়েছে। নিরঞ্জন ফিরে যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যদিও কোনো সরকারি অফিসার নয়, করবেটের প্রায় প্রতিটি অভিযানের সঙ্গে সে জড়িত। রয়েল বেঙ্গল টাইগার সেনসাস হোক বা অরণ্যের বাফার জোনের মানুষগুলোকে সংস্থাপিত করার অভিযানই হোক বা রামগঙ্গা নদীতে কুমিরের কৃত্রিম প্রজননের প্রযুক্তিই হোক- প্রতিটি অভিযানের সঙ্গেই নিরঞ্জন থাকে। তাই সেদিন যখন দাবানল বেড়ে চলল, আগুন কমানোর জন্য গাট্টা দেওয়া দলগুলির একটা দলের সদস্য হওয়ার জন্য সে এগিয়ে এল।গাট্টা দেওয়া মানে ‘কাউন্টার ফায়ার’, করবেটের স্থানীয়রা তাকে গাট্টা দেওয়া বলে। কাজটা হল আগুনলাগা অঞ্চলটিকে ঘিরে নিয়ে দূরের শুকনোপাতা ইত্যাদি জমা করে রাস্তার মতো একটা ঘের বানানো, তার দুপাশটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার, তাই আগুন এগিয়ে যেতে পারে না। তারপরে সেই পথটা ওরা জ্বালিয়ে দিয়ে একটা ‘ফায়ারলাইন’ প্রস্তুত করে। যখন দাবানোল এগিয়ে এসে সেখানে পৌঁছায় তখন ‘ফায়ার লাইন’ এর শুকনো বন ইত্যাদি আগেই পুড়ে শেষ হওয়ার জন্য আগুন আর এগিয়ে যেতে পারেনা। ইন্টিকাব প্রথমবারের জন্য গাট্টা দিতে বেরোনো কয়েকজনকে জিনিসটা কী এবং তাদের কী কী করতে হবে তাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল।
‘ কিন্তু যদি আগুন আমাদের দিকে তেড়ে আসে আমরা তো জায়গাতেই মরে যাব।’একজন জিজ্ঞেস করল।
‘না, দাবানলের দিকে ‘এয়ার প্রেসার’ এত হয় যে আমরা জালানো কৃত্রিম আগুন আমাদের দিকে না এসে দাবানল থাকা দিকে গতি করে। বিপরীত দিকে আগুন গতি করেনা। তাই চিন্তা নেই, আমরা বহু বার গিয়েছি কেবল বেশি উৎসাহ দেখাতে যাবে না।দূর থেকে আমরা যা করতে বলব তা করে যাবে। কোনো বিপদ হবে না।’ ইন্টিকাব ওদের ভরসা দিল।
গাট্টা দাবানল রোধ করার জন্য এক উপযোগী মাধ্যম। কিন্তু অনেক সময় এটা কাজে আসে না, কারণ দাবানল কীভাবে এগোবে তার পূর্বানুমান করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আর অনেক সময় একই জায়গায় আগুন শেষ হয় আর দুই এক জায়গায় নতুন করে আরম্ভ হয়।
কখনও ঘের দিতে দিতে আগুন এসে ‘ফায়ার লাইন’ পর্যন্ত পৌছে যায়। তখন পালানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা। অসহ্য গরম এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় গাট্টা দিতে যায় বলে প্রত্যেকের বেঁচে থাকার সম্বল হিসেবে জল এবং গুড়, আর শুকনো বুট সঙ্গে নিয়ে যায়।
সেই সময় রুবুল গাট্টা দিতে বেরোনো প্রত্যেককে গুড় এবং চানা বিতরণ করে যারা প্রথমবারের জন্য বেরিয়েছে তাদের কী করতে হবে, কী করতে হবে না, কে কার দলে থাকবে ইত্যাদি বুঝিয়ে দিচ্ছিল। তখনই ঘটনাটা ঘটল।
ঘর্ঘর করে একটা জিপগাড়িতে একদল পর্যটক দল পর্যটককে অট্টহাস্য করে অতিথিশালায় প্রবেশ করল। যেন কোনো ফুটবল ম্যাচ জিতে এসেছে। এসেই তারা ক্যান্টিনে হুলুস্থুল আরম্ভ করেছে।
‘ একটা দা এবং নুন চাই এখনই’। একজন ক্যান্টিনের ক্লার্ক আদেশ জারি করল। সেই সময় ক্যান্টিন বন্ধ করে প্রত্যেকে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
‘আচ্ছা দেব! দা এবং নুন দিয়ে কী করবেন? কার্লাজী জিজ্ঞেস করল। সাধারণত কখনও কখনও মানুষগুলি কিছু খাওয়ার জন্য পিঁয়াজ লঙ্কা ইত্যাদি তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যায়। ‘রোস্টেড ডিয়ার…’ পর্যটক বীরদর্পে হেসে উত্তর দিল।
উত্তর শুনে কালার্জি এবং ফারুক ওদের জিপের দিকে দৌড়ে গেল। হ্যাঁ, দাবানল পুড়ে ফেলা হগ ডিয়ারটাকে ওরা জিপের পেছনে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে। এবং এখন দা দিয়ে কেটে ভোজ- ভাত খাওয়ার আয়োজন করেছে।
‘বে’ ফারুক আর অপেক্ষা করতে পারল না। অত্যন্ত অশ্লীল একটা গালি জোরের সঙ্গে চিৎকার করে সে ক্যান্টিনের ফালাকাঠ একটা হাতে তুলে নিয়ে তাদের প্রত্যেককে কোনো দিকে না তাকিয়ে পেটাতে শুরু করল। রুবুল এরকম একটা কিছুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে-ও গিয়ে ফারুকের সঙ্গে যোগ দিল।
ঝগড়া বন্ধ করার জন্য কালার্জি এবং নিরঞ্জন দুজনকে জড়িয়ে ধরে রেখেও আটকাতে পারছিল না।এই ধরে আর বোঝানোর চেষ্টা করে এবং ওরা উজার মেরে যায়। অবশেষে বনবিভাগের আরক্ষী এসে ঝগড়া মেটাতে সক্ষম হল। যতক্ষণে পর্যন্ত ঝগড়া মিটে যায় ততক্ষণে অন্য সবাই গাট্টা দিতে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল।মাটিতে লুটোপুটি হয়ে থাকা মানুষ কয়েকজন কে সরিয়ে দেবার জন্য ওদেরও যথেষ্ট চেষ্টা করতে হল। সবাইকে ছিনিয়ে সরিয়ে এনে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে ঝগড়া করা একজনকেও তারা গাট্টা দেবার জন্য নিয়ে যাবে না।
আঃ হগ ডিয়ার খাওয়া নরখাদক কয়েকজনের জন্য আমাকে কেন ছেড়ে যাবি?’রুবুল ওদেরকে ঘিরে ধরল।ডিকালার প্রত্যেকেই দাবানল রোধ করার জন্য যাবে এবং সে শুয়ে বসে থাকবে, সে কথা সে ভাবতে পারে না। ফারুক কিন্তু তখনও অশান্ত। তাই ইন্টিকাব যখন তাকে আমরা যাই বলে জানাল সে মুখ ভেংচে উঠল-‘এই ধরনের আগুন আমরা আগেও অনেক দেখেছি কিন্তু এরকম নিচ মানুষ আমরা আগে কখনও দেখিনি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের ছেড়ে অন্য সবাই চলে গেল। নীলাঞ্জন এর উপরে যাবার কোনো বাধা-নিষেধ ছিল না। কিন্তু মানুষগুলির কান্ডকারখানা দেখে তার মনটা এত খারাপ হয়েছিল যে তার যেতে ইচ্ছা করল না। শহরের মানুষগুলির ঘৃণ্য স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা দেখে সে অরণ্যে সে শান্তির খোঁজে পালিয়ে এসেছিল। নিরঞ্জন ভেবেছিল অন্তত তার করবেটের বিশাল হৃদয়ের হেরফের হতে পারে না। হয়তো করবেটের হৃদয় এখনো বিশালই রয়েছে, কিন্তু মানুষগুলি তাকে আর বেশিদিন অরণ্য হয়ে থাকতে দেবেনা। তার চোখের সামনেই দেখে এসেছে কীভাবে অরন্যটা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে।এখন সে কোথায় যাবে?কী করবে?
ডিকালায় তখন আর কেউ ছিল না। বেশিরভাগ পর্যটকই ইতিমধ্যে করবেট ছেড়ে বাড়ি পৌঁছে গেছে। এবং অন্যরা গিয়েছে দাবানল রোধ করার জন্য। সেখানে ফারুক, নিরঞ্জন আর ‘রোস্টেড ডিয়ার’খাওয়ার জন্য কয়েকজন পর্যটক ছিল। হয়তো দুই একটি স্টাফ কোয়ার্টারে কোনো কোনো পরিবারের লোকজন ছিল। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।নেমে আসা অন্ধকারে নিরঞ্জন ঘাসে একটা চেয়ার পেতে দূরের অরণ্যের দিকে তাকিয়ে তার নিজের এবং অরণ্যের কথা ভাবছিল। নিরঞ্জন এবং অরণ্য দুজনকেই আজকের মানুষেরা ক্ষতবিক্ষত করে নিঃশেষ করার জন্য এগিয়ে এসেছে এবং তারা নিজেকে রক্ষা করার জন্য সমাজের চাহিদা মতে ওরা বিন্দুমাত্র অক্ষমণীয়ভাবে কঠোর হতে পারেনা। আজ সকালের দিকে ফারুকের মতো কাঁদতে নিরঞ্জনেরও খুব ইচ্ছা করছিল। কিন্তু সে কাঁদতেও পারছে না।
তখনই রোস্টেড ডিয়ার খাওয়ার জন্য বেরিয়ে আসা দলটি ভয়ে চিৎকার করতে লাগল, ‘ম্রলাম!বাঁচাও!হাতি!হাতি!
ডিকালার তিনদিকে বিদ্যুৎ সরাবরাহকারী কাঁটাতার আছে এবং একটা দিকে উঁচু সিমেন্টের দেওয়ালের ঠিক নিচেই খাদ।এখন গ্রীষ্মকাল,তাই ওতে জল নেই। কিন্তু বন্যহাতি সেই দেওয়াল ভেঙ্গে অতিথিশালায় প্রবেশ করাটা অসম্ভব। তাছাড়া প্রকাণ্ড গেইটটা সবসময় বন্ধ থাকে। বন্য হাতি প্রবেশ করার কোনো অবকাশ কোনোদিকেই নেই। তবু কী হয়েছে দেখার জন্য নিরঞ্জন এগিয়ে এল।
হ্যাঁ, একটা হাতি ডিকালার কাঁটাতারের বাইরে ঘুরে ফিরে অতিথি গৃহের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে। যদিও করবেট বাঘের জন্য বিখ্যাত, অরণ্যের মানুষ কিন্তু ভয় করে হাতিকে। বাঘ সাধারণত মানুষের সংস্পর্শে আসে না। কখনও দুর্বল হয়ে শিকার করতে না পারলে পোষা জন্তু বা কদাচিৎ মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু হাতির ব্যবহার বোঝা যায়না। দলবদ্ধভাবে থাকলে ওদের ব্যবহার আলাদা,সঙ্গে বাচ্চা থাকলে হাতির ব্যবহার কিছুটা উগ্র এবং গাড়ি ইত্যাদির শব্দে তাকে বিরক্ত করলে বা সঙ্গমের সময় অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। তাই মৃত্যুর ভয় হাতির থেকেই বেশি।
কোথা থেকে যেন ফারুকের স্ত্রী মেহজবনিছা হাতিটাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল-‘মতি!’
হাতিটা ‘উ…উ…আহা করে চিৎকার করে উঠল। চিৎকার শুনে মেহজবনিছা আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে নানা কসরত করে দীর্ঘ সিমেন্টের দেওয়ালে উঠে নিচের খাদে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
‘যেও না’,তার দিকে তাকিয়ে নিরঞ্জন চিৎকার করে উঠল। হাতিটা যদি মতি না হয় তাহলে মেহজবনিছাকে এক আছাড়ে মেরে ফেলবে, সেটা নির্ঘাত। এমনিতেই অরণ্য ভেঙ্গে ডিকালার প্রাচীর ভাঙ্গার জন্য চেষ্টা করা হাতি গুলি উগ্র বন্য হাতিই হয়। কিন্তু নিরঞ্জনের চিৎকারে সে গুরুত্বই দিল না।মাটিতে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে সে এগিয়ে গেল।হাতিটা তখন তার থেকে ১০ ফুট দূরে।
‘মতি বস,বস।’ সে চিৎকার করল।
হাতিটা তার দিকে এগিয়ে গেল।পুনরায় একটা চিৎকার করে হাতিটা মাটিতে বসে পড়ল।
হাতিটা তার কাছে বসে নিয়ে…মেহজবনিছাকে তার শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরল।
ততক্ষণে ফারুক সেই জায়গায় পৌঁছে গেছে। সেও এক লাফে দেওয়ালটা পার হয়ে ওদের কাছে পৌঁছে গেল।
ওটা মতি।
ফারুক বিশ্বাস করতে পারে নাই যে তার মতি সশরীরে আবার তার কাছে ফিরে এসেছে। তার অঙ্কুশ দিয়ে ফারুক মতির কাছে গিয়ে তাকে জোরেজোরে আঘাত করতে লাগল।
‘ কোথায় গিয়েছিলি বল, আমাকে ছেড়ে… কেন গিয়েছিলি বল…ফারুক এবং মেহজবনিছা সবকিছু ছেড়ে সর্বশক্তিতে মতিকে মারতে লাগল। মতি বারবার ফারুক এবং মেহজবনিছাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে যেন মনে হতে লাগল। কিন্তু ওদের আবেগ অপ্রতিরোধ্য।
একটি পরিবারের পুনর্মিলন। তিনজন অনেকক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকল। দৃশ্যটা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।
দৃশ্যটি নিরঞ্জনের ভগ্ন হৃদয়ের কোনো এক কোণে স্পর্শ করেছিল, এমনকি কিছুক্ষণ আগে ফারুকের হাতে মারধোর খাওয়া দলটিও যেন আবেগিক হয়ে পড়েছে দেখা গেল।‘রোস্টেড ডিয়ার’ কাটার জন্য দা-এর খোঁজ করা ছেলেটির দুচোখেও আর্দ্রতার প্রলেপ দেখতে পেল নিরঞ্জন। তার মনে হচ্ছিল যেন আকাশের এক টুকরো মেঘ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।
------
লেখক পরিচিতি -১৯৭৬ সনে অসমের গুয়াহাটি শহরে ভাস্কর ঠাকুরীয়ার জন্ম হয়। পেশায় চিকিৎসক শ্রী ঠাকুরীয়া বর্তমানে অল ইণ্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পাটনার মাইক্রো বায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক।‘যাত্রা’লেখকের অন্যতম গল্প সংকলন।‘সিংহদ্বার’ উপন্যাসের জন্য শ্রী ঠাকুরীয়া মুনীন বরকটকী পুরস্কার লাভ করেন। অসমের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখকের গল্প প্রকাশিত হয়ে সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
------------------------------------------------------------------
মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
----------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন