বইমেলা সংখ্যার গল্প
কন্ডাকটর
গৌতম বাড়ই
- কী নাম?
- হ্যাঁ স্যার?
- বলি পেশেন্টের নাম কী? ডাক্তার এবার উঁচু-গ্রামে কথা বললেন।
- ও! রাজু,রাজু গাঙ্গুলী। রাজুর বৌ এই বলে ডাক্তারের দিকে তাকালেন।
- সমস্যাটা কী? কী?
রাজুর বৌ মাধুরী ফিরিস্তি দিতে শুরু করলেন।
ডাক্তার আবার যে সে কেউ নন, শহরের একজন নামজাদা মনের ডাক্তার। সাইক্রিয়াটিস্ট। গালে হাত দিয়ে মাধুরীর দিকে তাকিয়ে শুনতে লাগলেন। রাজু মাথা নিচু করে বসে আছেন। চুপচাপ।
কদিন ধরেই মাঝ-রাতে ঘুম ভেঙ্গে চিৎকার করতে থাকে- পিজি-পিটিএস- ভিক্টোরিয়া- চিড়িয়াখানা- কোঠারী- বিএমবিড়লা- ইকবালপুর, আবার কখনো বা বেহালাচৌরাস্তা- মাঝেরহাট- মিন্ট- তারাতলা- ম্যান্টন- পাঠকপাড়া এইসব। দু- তিন মিনিট পর-পর। এইভাবে ভোর পর্যন্ত চলে, তারপর ঘুমোয়। আবার জেগে উঠেও তাই। কাঁহাতক আমরা বাড়ির লোকেরা টিকতে পারি বলুন?
ডাক্তার মানস রায়, মাধুরী অর্থাৎ রাজুর বৌ- কে জিগ্গেস করেন- উনি কী বাস কন্ডাক্টরের পেশায় ছিলেন?
- হ্যাঁ স্যার। এই লক- ডাউনের আগে পর্যন্ত। চাকরি তো গেলই। আর আমাদের এখন সর্বস্বান্ত অবস্থা। আমাদের পরিবারের ছেলেমেয়েদের মনের অবস্থাও তো ভাল নেই। বুঝতেই পারছেন। আর পারছি না স্যার-- বলেই মাধুরী ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
এবারে ডাক্তারবাবু রাজুর দিকে তাকিয়ে বললেন- আপনি কিছু বলবেন?
রাজু মুখ না তুলেই বললেন- হাঁ। তা আমার প্রচুর কথা আছে।
- বলুন। তা তো বেশ! বলুন, বলুন।
-- আমার বৌ মাধুরী মনে করে আমি পাগল হয়ে গেছি, তা কিন্তু নয়। হাওড়ার ঘুসুরির লোহার ছাঁট মালের ব্যাপারী রতনলালের দোকানের পেছনে যে বস্তি ওটায় আমরা থাকি। মাধুরী তো চুটকি। ডাক-নাম। আমার পড়াশোনা বেশি না। এইট। খালি একটা গাল ভরা পদবী ছিল। গঙ্গোপাধ্যায়। শালা ওটার ছোটটা নিলাম। গাঙ্গুলী। বস্তিতে সব সমান। জাত-পাত মাড়ায় না কেউ ওখানে। পেছনে লাগত বন্ধুরা। গঙ্গোপাধ্যায় নিয়ে কী সব, গন্দো পাদ--- এইসব ছাড়তো। তো ছেঁটেই দিলাম। নিলাম ছোটা।বাবা বলতেন খালি- আমরা উঁচু জাত। ধুস। গ্যারেজে কাজ করতে করতে কবে যেন বাস- কন্ডাকটর হয়ে গেলাম। তবে যা ধরেছি তা মনে- প্রাণে। চুটকিকে যেমন। আমার বাসের কালেকশন অন্য বাসের থেকে বেশি। কলকাতার রাস্তায় লোকজন দেখতে না পেলে মাথা খারাপ হয়ে যেত। প্রতিদিন কতশত লোকের গাল খেয়ে- খেয়ে একদম কানের সাথে মাথার বন্দোবস্ত করে নিয়েছিলাম। আমি প্যাসেঞ্জার ভরবোই। গাল খেয়ে বাসে তুলতাম ডেকে-ডেকে। বাস মালিকদের নিজেদের মধ্যে গন্ডগোল। বাস অচল। তাই আমি ঘুমিয়ে- ঘুমিয়ে প্যাসেঞ্জার তুলি। এটা অন্যায়? ডাক্তারের দিকে এত কথা বলবার পরে আঙুল তুলে দেখালেন।
-- না, একদম অন্যায় নয়। তুলবেন। প্রতিদিন। বাস খালি রাখলে তো চলবে না। যে যাই বলুক।
মানসিক রোগীর ডাক্তার মানস রায়ের এই ধৈর্য আছেই। পেশা এবং নিজের ভালবাসা। তাই ঠাণ্ডা মাথায় বললেন রাজুকে।
-- তাহলে আমি পাগল নই স্যার। চুটকি বা মাধুরীর দিকে ইশারা করে উঠে পড়তে বললেন।
ডাক্তার মানস এবারে রাজুকে বললেন- ভিজিট লাগবে না। একটু শুনুন। তবে আপনি দুটো এই সামান্য অল্প- দামের ওষুধ দিচ্ছি নিয়ম করে খাবেন। একটা প্রেশারের। তারপর ইচ্ছে হলে একবার দেখা করে যাবেন।
রাজু দুই হাত জোড়ে নমস্কার জানালেন ডাক্তার মানস রায়কে। বাইরে বেরিয়ে এসে বললেন মাধুরীকে- যা টাকা ধার করে এখানে ডাক্তার দেখাতে এসেছো, তাতে কয়েকদিন চলবে। আমি এর মধ্যে একটা হিল্লে করে নেবো।চলো।
বাসে পাশে বসিয়ে মাধুরী যখন রাজুকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, রাজু সারাটা রাস্তা চেল্লাতে-চেল্লাতে গেল- হাওড়া- হাওড়া, বড়াবাজার- ডালহৌসী- বেন্টিঙ্ক স্ট্রীট। শ্যালদা- মাণিকতলা বলে বাসে চাপ্পড় মারছিল। মাধুরী চুপ করাচ্ছিল। বাসের কন্ডাকটর এগিয়ে এসে বললেন- বৌদি কোন রুটের ছিলেন?
মাধুরী বললেন- সখেরবাজার- হাওড়া ময়দান। এই বলে কন্ডাকটরকে ভাড়া দিতে গেলেন।
কন্ডাকটর বললেন-- না, লাগবে না। লকডাউনের পর এই নিয়ে দুটো কেস পেলাম।
মাধুরী হাওড়া ব্রীজের ফাঁক- ফোঁকড় দিয়ে নিচে গঙ্গানদী দেখবার চেষ্টা করছিলেন।
----------------------------------------------------------------------আপনিও মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান।
মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
----------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন