লেবেল

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২০

আজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস।। শ্রদ্ধা ও স্মরণে - অশোককুমার লাটুয়া ।। Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।


  









ঈশ্বরের চেয়েও ঈশ্বরঃ
শ্রদ্ধা ও স্মরণে -  অশোককুমার লাটুয়া  




বিদ্যাসাগর প্রাতঃস্মরণীয় ক্ষণজন্মা পুরুষ। চরিত্রগৌরবে এখনও তিনি অনন্য এবং অদ্বিতীয়। কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে মধু কবি লিখেছেন- 


The man to whom I appealed has the genius and wisdom of an ancient sage, energy of an Englishman and the heart of a Bengalee mother. 

রবি কবির নিবেদন — 
' তিনি নবীন ছিলেন এবং চিরযৌবনের অভিষেক লাভ করে বলশালী হয়েছিলেন। তাঁর এই নবীনতাই আমার কাছে সবচেয়ে পূজনীয়, কারণ তিনি আমাদের দেশে চলার পথ প্রস্তত করে গেছেন।' 

তাছাড়া তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয়,

 ' ঈশ্বরচন্দ্রকে নতুন করে চিনতে হবে, দেশের তরুণ - তরুণীদের কাছে, কিশোর - কিশোরীদের কাছে নতুন করে চেনাতে হবে। বিদ্যাসাগর মানে মাতৃভক্তি নয়, বিদ্যাসাগর মানে বিধবা - বিবাহ নয়, বিদ্যাসাগর মানে দয়া - দাক্ষিণ্য নয়, বিদ্যাসাগর মানে  হল ইস্পাত, যে ইস্পাত দিয়ে তৈরী হয় জাতীয় জীবনের কাঠামো। ' 

বীরসিংহের সিংহশিশু বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মা ভগবতী দেবী। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু দারিদ্র্য হার মেনেছে তাঁর কঠোর কঠিন জীবনযুদ্ধের কাছে। ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর ' বিদ্যাসাগর ' উপাধির আড়ালে। সংস্কৃত সাহিত্য, ব্যাকরণ, ন্যায়, বেদান্ত, স্মৃতি, অলঙ্কার প্রভৃতি বিষয়ে পান্ডিত্যের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ' বিদ্যাসাগর ' উপাধি। 


মাত্র ২১ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সংস্কৃত বিভাগে অধ্যাপনাতে শুরু হয় তাঁর কাজের জীবন। কাজের কুশলি দক্ষতায় সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন তিনি। বিশেষ বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদেও নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। মতবিরোধের কারণে স্বাধীনচেতা বিদ্যাসাগর দুটি পদেই ইস্তফা দিয়েছিলেন একই সঙ্গে। ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি সমাজসংস্কার, শিক্ষাবিস্তার ও সাহিত্য সাধনায়। তাঁর সংবেদনশীল হৃদয়, গভীর দেশানুরাগ, আত্মমর্যাদাবোধ এবং স্বাজাত্যভিমান আমাদের মেরুদণ্ডকে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস। ঈশ্বরচন্দ্রের মূর্তিটি সামগ্রিক হয়ে ওঠে বিধবাবিবাহের নিরন্তর সংগ্রামে। তাঁর আন্তরিক চেষ্টায় ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দের ২৬ জুলাই ' বিধবা বিবাহ আইন ' পাস হয়। ১৮৫৬ — ১৮৬৭ পর্যন্ত এগারো বছরে বিদ্যাসাগর মোট ষাটজন বিধবার বিয়েতে নিজের রোজগারের বিরাশি হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। তিনি পরাশর সংহিতা থেকে-
 
' নষ্টেমৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ 
পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধিয়তে।। 'ইত্যাদি শ্লোক উদ্ধার করে প্রমাণ করেন যে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রানুমোদিত। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধেও সমাজশাস্ত্রীদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নারীমুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। 
স্ত্রী শিক্ষা নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রাথমিক শর্ত। রক্ষণশীলদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে মহানির্বাণ তন্ত্র থেকে নারীশিক্ষার পক্ষে উদ্ধৃতি তুলে ধরলেন — 
' কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষণীয়াতি যত্নতঃ। ' 
বিদ্যাসাগরের গাড়িতে এই মটো লেখা থাকত। এই মটো বিদ্রোহেরই নামান্তর। 
১৮৪৯ সালে বেথুন বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করলে বিদ্যাসাগর তার প্রথম সম্পাদক হলেন। শিক্ষাবিভাগের ইন্সপেক্টর পদের সুবাদে তিনি জেলায় জেলায় বালক বিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৫৭ — ১৮৫৮ সালের মধ্যে ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হন। কলকাতায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন, বীরসিংহ গ্রামে  মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত ভগবতী বিদ্যালয় শিক্ষানুরাগের পরিচয়। 
সংস্কৃতে পন্ডিত হয়েও ইংরেজি ভাষাতে দক্ষতা দেখিয়েছেন বিদ্যাসাগর। ইংরেজিতে লেখা তাঁর এডুকেশন রিপোর্টগুলি যেকোনো ইংরেজকেই ঈর্ষান্বিত করবে সন্দেহ নেই। ঠাকুর দেবতা সম্পর্কে উদাসী   

 হয়েও মানুষকেই দেবতা বলে  

 মনে করতেন দয়ার সাগর  
 
 বিদ্যাসাগর। 

বাংলা গদ্যের আলপথকে তিনি রাজপথে পরিণত করেছেন। তিনি গদ্যলেখক নন, গদ্যকে শিল্পের মর্যাদা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন গদ্যশিল্পী এবং বাংলা গদ্যের যথার্থ জনক। 

অনুবাদকরূপে আত্মপ্রকাশ তাঁর। ১৮৪৭ খৃষ্টাব্দে হিন্দি ' বৈতাল পচ্চীসী ' থেকে বাংলায় লিখলেন ' বেতাল পঞ্চবিংশতি '। এরপর কালিদাসের ' অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ ' নাটক থেকে বাংলায় অনুবাদ করলেন ' শকুন্তলা। ' ভবভূতির ' উত্তর রামচরিত ' নাটক এবং বাল্মিকী রামায়ণ অাশ্রয় করে লেখা হল সীতার বনবাস। শেক্সপিয়রের ' কমেডি অফ এরর্স ' নিয়ে লিখলেন ভ্রান্তিবিলাস। ভাবানুবাদে এই লেখাগুলি বেশ সরস এবং উপভোগ্য। 
অনূদিত পাঠ্যগ্রন্থগুলিও উল্লেখযোগ্য — মার্শম্যানের হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল অবলম্বনে তাঁর লেখা বাংলার ইতিহাস গ্রন্থটি একটি মাইলফলক। এছাড়া চেম্বার্সের রুডিমেন্ট অফ নলেজ এবং বায়োগ্রাফিক্স নিয়ে লেখা তাঁর গ্রন্থ দুটি হলো বোধোদয় আর জীবনচরিত। ১৮৫৬ তে ঈশপের ' ফেবলস্ ' নিয়ে লিখলেন কথামালা। অনুবাদ হলেও গ্রন্থগুলি যথার্থ মৌলিক গ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে। 
বিদ্যাসাগরের মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যাও কম নয়। সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য শাস্ত্র বিষয়ক প্রস্তাব বাঙালির লেখা সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস। সমাজসংস্কারমূলক রচিত দুটি গ্রন্থ হলো বিধবা বিবাহ চলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার এবং বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার। অভ্রান্ত যুক্তি ও তথ্যে গ্রন্থ দুটি সমৃদ্ধ। অত্যন্ত সংক্ষেপে লেখা তাঁর আত্মচরিতটির নাম বিদ্যাসাগর চরিত। বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা প্রভাবতীর অকাল মৃত্যুতে ব্যথিত বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন ছোট্ট একটি গদ্য 
' প্রভাবতী সম্ভাষণ '। তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপের যোগ্য জবাব দিতে কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য ছদ্মনামে  তিনি লেখেন অতি অল্প হইল, আবার অতি অল্প হইল এবং ব্রজবিলাস। এমন উচ্চাঙ্গের রসিকতা বাংলা সাহিত্যে বিরল। ১৮৮৬ তে উপযুক্ত ভাইপো সহচরস্য ছদ্মনামে বিদ্যাসাগরের আর একটি লেখা 'রত্নপরীক্ষা'। ১৮৫৫ তে লেখা বর্ণপরিচয় বাংলা গদ্যের সম্পদ। ' একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল ' — এ গল্প এবং 'জল পড়ে পাতা নড়ে ' চিরকালের শিশুমনের পৃথিবী। 


সহজ সাধুভাষা, সংস্কৃতপ্রধান গম্ভীরভাষা,রঙ্গকৌতুকের ভাষা, সরল সংলাপধর্মী গদ্য দিয়ে সাজানো বিদ্যাসাগরের লিখনশৈলী। বাংলা মায়ের গৌরব বিদ্যাসাগর ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু না, তাঁর মৃত্যু নেই — তিনি মৃত্যুঞ্জয়। তিনি তাঁর চরিত্রের যে অক্ষয় বটবৃক্ষ রোপণ করে গেছেন তার ছায়া আজ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। আগামী প্রজন্মের কাছে প্রেরণার দীপশিখা। তিনি ঈশ্বরের চেয়েও ঈশ্বর। 


আজ তাঁর ১৩০ তম প্রয়াণ দিবস। উত্তরসূরী হিসাবে কবির সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বলি — 
'সাগরে যে অগ্নি থাকে, কল্পনা সে নয়। 
চক্ষে দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।।'




ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনের অন্তিম দিনগুলিঃ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবদনে - সাহিত্যিক শিশিরকুমার বাগ











ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনের অন্তিম
দিনগুলিঃ
শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবদনে - সাহিত্যিক শিশিরকুমার বাগ  
    


জীবনের শেষ দিকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে বিদ্যাসাগর মহাশয় বেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ক্রমে ক্রমে তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, সভ্য মানুষদের, যাদেরকেই তিনি কোনো না কোনো ভাবে সাহায্য করেছেন, তারাই উল্টে তাঁর নিন্দা করেছে। নানা ভাবে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। ভ্রান্তিবিলাস গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “মানবজাতি নিরতিশয় কুৎসাপ্রিয়; লোকের কুৎসা করিবার নিমিত্ত কত অমূলক গল্পের কল্পনা করে এবং কল্পিত গল্পের আকর্ষণী শক্তির সম্পাদনের নিমিত্ত উহাতে কত অলঙ্কার যোজিত করিয়া দেয়। যদি কোনও ব্যক্তির প্রশংসা করিবার সহস্র হেতু থাকে,অধিকাংশ লোকে ভুলিয়াও সে দিকে দৃষ্টিপাত করে না; কিন্তু কুৎসা করিবার অণুমাত্র সোপান পাইলে মনের আনন্দে সেই দিকে ধাবমান হয়।”
কেবল পরিচিত বন্ধু-বান্ধব বা বাহিরের ভদ্র সমাজের লোকজনই নয়, আত্মীয়েরাও বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে নানা আচরণ করে তাঁকে বিব্রত করেছেন। ১৮৮১ সালে বিদ্যাসাগর প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার আত্মীয়েরা আমার পক্ষে বড় নির্দয়, সামান্য অপরাধ ধরিয়া অথবা অপরাধ কল্পনা করিয়া আমাকে নরকে নিক্ষিপ্ত করিয়া থাকেন।”



এই প্রকার মানসিক আঘাত ছাড়াও শারীরিক দিক থেকে তিনি জীবনের শেষ দিকে খুবই ভুগতে থাকেন। আমরা জানি উত্তরপাড়ার একটি বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে ঘোড়ার গাড়ির দুর্ঘটনার পর তিনি শারীরিক আঘাতে বেশ কাবু হয়ে পড়েছিলেন। এছাড়া বিদ্যাসাগর দীর্ঘদিন থেকে পেটের পীড়ায় ভুগতেন। কঠিন রক্তামাশায় রোগে প্রায়ই আক্রান্ত হয়ে পড়তেন। তার উপর ছিল শিরঃপীড়া। অসুস্থতার কারণে বার বার তিনি বায়ু পরিবর্তনের জন্য নানা স্বাস্থ্যকর স্থানে যেতেন। বর্ধমান, চন্দননগর, কার্মাটার ছাড়াও স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য তিনি কানপুর ও মথুরা পর্যন্ত গিয়েছিলেন। বায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি একাকীত্বের মধ্যে শান্তি খোঁজারও চেষ্টা করেছেন তিনি।
এই রকম একটি সময়ে তাঁর পত্নী বিয়োগ ঘটে। দিনময়ীর মৃত্যুর পর বিদ্যাসাগর নানাভাবে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকেন। বিদ্যাসাগর অনুভব করেন, পুত্রের কারণে স্ত্রীর প্রতি চরম ঔদাসীন্য দেখিয়েছেন তিনি। সন্তোষকুমার কুণ্ডু লিখেছেন, “স্ত্রীর প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান তিনি (দিনময়ী) পাননি। দিনময়ীর প্রয়াণের পর এই ভাবনা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে দগ্ধ করত। তিনি অনেক দিন থেকে অসুস্থ ছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর অসহায়তা অনেক বেড়ে গেল, অসুখও বৃদ্ধি পেল।”


অসুখ বৃদ্ধি পাওয়ায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী গঙ্গাতীরে ফরাসডাঙায় দুটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে জ্যেষ্ঠ কন্যা হেমলতাকে সাথে করে সেখানে কিছুদিন বসবাস শুরু করলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হল না। এ সময়ে বিদ্যাসাগরের ছোট ভাই ঈশানচন্দ্র জ্যোতিষীর কাছে বিদ্যাসাগরের কোষ্ঠী বিচার করালেন। জ্যোতিষীর পরামর্শ অনুযায়ী হেমলতা প্রায় সাত-আটশো টাকা খরচা করে বাড়িতে হোম-যজ্ঞ, শান্তি স্বস্ত্যয়ন করলেন। তাতেও কোন ফললাভ না হওয়ায় জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে  আবার সবাই কলকাতায় ফিরে এলেন। 
কলকাতায় এসে অ্যালোপ্যাথি ডাক্তার ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের সঙ্গে আবার পরামর্শ শুরু হল। তাঁরা বললেন, বিদ্যাসাগরের আফিম খাওয়ার পরিমান না কমাতে পারলে ঔষধে কাজ হবে না। তখন কলুটোলা থেকে শেখ আবদুল লতিব হাকিমকে আনা হল। তিনি ১৮ আষাঢ় থেকে আফিম ছাড়াবার চেষ্টা শুরু করলেন। কিন্তু দু-দিন ভালো থকার পর আবার হিক্কা আরম্ভ হল, সেই সঙ্গে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর। ২১ আষাঢ় জ্বর কমলেও হিক্কা প্রবল হয় এবং হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যেতে থাকে। ২৩ আষাঢ় রোগের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটলে এবং রোগীর লেবা রোগের উপসর্গ দেখা দিলে হাকিমের চিকিৎসা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই হাকিম ছিলেন উদার চরিত্রের মানুষ। তিনি আন্তরিক যত্ন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে চিকিৎসা করলেও জরুরী অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার ঔষধ বন্ধ করে ক্লোরোডাইন সেবন করানো হলে বেদনা ও হিক্কার কিছটা উপশম হয়। ২৪ আষাঢ় ডাক্তার হীরালালবাবু ও ডাক্তার অমূল্যচরণ বসু বিদ্যাসাগরকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে পরের দিন ডাক্তার ম্যাকোনেল সাহেবকে আনানোর কথা বলেন। ম্যাকোনেল সাহেব, বার্চ্চ সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্তে এলেন যে, উদরে ক্যানসার হয়েছে। 



অ্যালোপ্যাথিতে এ রোগ সারানো অসাধ্য। এ কথা শুনে পরের দিন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার সালজারকে আনানো হল। তিনি বললেন, ক্যানসার নয়, টিউমার। ৩১ আষাঢ় থেকে সালজার চিকিৎসা শুরু করায় প্রাথমিক ভাবে রোগের (বেদনা, হিক্কা, লেবা) কিছু উপশম ঘটলেও ক্রমে কোষ্ঠবদ্ধতা শুরু হয়। ডাক্তার সালজার প্রত্যহ তিন-চার বার করে দেখতে আসতেন। রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি চলতেই থাকল। একসময় হিক্কা বেড়ে যাওয়ায় রজনীগন্ধা ফুল বেটে খাওয়ানো হল। তাতে হিক্কা কমলেও ওই দিনই জ্বর বাড়তে থাকল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুখের দীপ্তি কমে আসছিল, তিনি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন। এ সময় পুত্রবৎ ডাক্তার অমূল্যচরণ বাবু দিনরাত বিদ্যাসাগরের কাছেই বসে থাকতেন। 
৪ শ্রাবণ থেকে বিদ্যাসাগর মহাশয় আর উঠতে বসতে পারছিলেন না। ডাক্তার সালজারও নিরাশ হয়ে পড়লেন। হাল ছেড়ে দিয়ে ৭ শ্রাবণ থেকে পূর্বের কিছু কিছু ঔষধ খাওয়ানো হচ্ছিল। ৯ শ্রাবণ কিছু পুরাতন মল নির্গত হওয়ায় ১০/১১ শ্রাবণ তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করছিলেন। ১০ শ্রাবণ “দ্য ইণ্ডিয়ান ম্যাসেঞ্জার” পত্রিকায় লেখা হল-
It is a matter of national anxiety that Pandit Iswarchandra Vidyasagar is still hovering between life and death. ”

১১ শ্রাবণ বিকেল থেকে জ্বর বাড়ছিল এবং নাড়ির গতি কমে আসছিল। একসময় লোকজনকে আর চিনতে পারছিলেন না। মায়ের ছবি যে ঘরে টাঙানো সে ঘরেই শয্যাশায়ী ছিলেন বিদ্যাসাগর।  এ সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। প্রায় অচেতন অবস্থাতেই বিদ্যাসাগরের মাথাটি ঘুরে গেল জননীর দিকে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। দু-চোখ বেয়ে অবিরাম জলের ধারা নেমে আসছে। ১২ শ্রাবণ মঙ্গলবার প্রায় সারাদিনই অচৈতন্য ছিলেন।
আবশেষে ১৩ শ্রাবণ ১২৯৮ বঙ্গাব্দ, ২৯ জুলাই ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ বুধবার রাত্রি ২টা ১৮ মিনিটে এক মহাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল। আমাদের পরম শ্রদ্ধার মানুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় আমাদের ছেড়ে পাড়ি দিলেন অমৃতলোকের পথে। 



তাঁর মরদেহ প্রথমে তাঁর সাধের প্রতিষ্ঠান মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে নিয়ে যাওয়া হল। শোনা যায় সেখানে পুত্র নারায়ণচন্দ্র বাষ্পাকুল লোচনে উচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন, “বাবা, এই তোমার সাধের মেট্রোপলিটন।” নিমতলা শ্মশানঘাটে তাঁকে দাহ করা হয়। মুখাগ্নি করেন তাঁর একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্র।
পরিশেষে একটাই কথা, আমরা বাঙালিরা, বিদ্যাসাগর মহাশয়কে মাঝেমধ্যে স্মরণ করি বটে,  কিন্তু তাঁকে অনুসরণ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করি না। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য।







২৯শে জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস।। ছোটোদের রেখায় বিদ্যাসাগর










ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস আজ। তাই তাঁর প্রতি  চিত্র ও তুলি দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছে   -     


















২৯শা জুুুুলাইতে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি