লেবেল

বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

শুক্রবারের গল্প।। ভালোবাসা দিবস — দীপক বেরা




                      

            ভালোবাসা দিবস

              দীপক বেরা
                  


আজ, ১৪ই ফেব্রুয়ারি, "বিশ্ব ভালোবাসা দিবস"। তাই, বেসরকারি অফিসটাতে উপস্থিতির হার বেশ কম। অমলেন্দু বাবু এই অফিসে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে আসছেন। মাসখানেক বাদেই রিটায়ারমেন্ট। বছরের পর বছর ধরে অফিসের এই বিশেষ দিনটির দৃশ্য দেখে দেখে তাঁর একপ্রকার গা-সওয়া হয়ে গেছে। আজকের দিনে অফিসের কম বয়সী ছেলেমেয়েরা খুব কমই আসে। আবার, নেহাত আসলেও, তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে যায়।

"মুশকিল হল তো, সুবিমলটাও আজকে এলনা। কম্পিউটার থেকে একটা প্রিন্ট-আউট বের করতে হত, কী যে করি এখন? কাজের অনেকটা দেরি হয়ে যাবে, সাহেব আবার রাগারাগি করবেন", .. রাগে গজগজ করতে থাকেন অমলেন্দু বাবু। পুরনো দিনের কর্মচারী তিনি, কম্পিউটারের কাজ টাজ বিশেষ বোঝেন না। তাই, নিজের প্রতি নিজের একটু সঙ্কোচ বোধও হয় অমলেন্দু বাবুর। 

"আরে বাবা, আজকে ওকে পাবেন কোথায়, অমলেন্দু বাবু। সুবিমল তো এখন পার্কে বসে প্রেম নিবেদনে ব্যস্ত। জানেন না, আজকে "বিশ্ব প্রেম দিবস" বলে কথা। আজকের দিনে প্রেম নিবেদন না করলে নাকি, সারাবছর আর প্রেম-ট্রেম করা হবেনা, বুঝলেন মশাই। ওঃ, কি আর বলি, যত্ত সব ন্যাকামি!"... একরাশ বিরক্তি উগরে দিয়ে সুধাংশু বাবু নিজের কাজে মন দিলেন।

" হ্যাঁ শুনেছি, তার আগে আবার 'চকোলেট দিবস', 'গোলাপ দিবস'.. কিসব যেন হয়",.. বলেই অমলেন্দু বাবু একটু লজ্জা পেয়ে যান।

"হ্যাঁ, যতসব আদিখ্যেতা আর কি, বুঝলেন মশাই। দেখুন গিয়ে আজকে, জোড়ায় জোড়ায় কতশত ছোঁড়া-ছুঁড়িরা সব পার্কে বসে ঢলাঢলি করছে। পাশে যে কেউ আছে, সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত নেই ওদের। লজ্জা-শরম বলে কিচ্ছু নেই? কী যে হল দিনকাল! পশ্চিমী দেশকে নকল করছে সবাই। আমাদের দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি সব একেবারে জলাঞ্জলি দিতে বসেছে".. সুধাংশু বাবু যেন ক্ষেপে ওঠেন। 

"তা যা বলেছেন, সব রসাতলে গেল",.. অমলেন্দু বাবুও সুর মেলান। 

শুধাংশু বাবু একটা ফাইলে চোখ বোলাতে বোলাতে বলেন, "শুনুন শুনুন, বিয়ের আগেই ওদের যতসব আদিখ্যেতা। আর, বিয়ের পর তো দেখি যত ঠোকাঠুকি, ঝগড়াঝাটি। তারপর দু'দিন কাটতে না কাটতেই ডিভোর্স! ছাড়ুন তো ওদের ওইসব লোকদেখানো 'ভালোবাসা দিবস' এর কথা"। 

"কি জানি বাপু, বুঝতে পারিনা!".. বলেই অমলেন্দু বাবু আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে যান। 
"আচ্ছা, সবই কি লোকদেখানো, নারী-পুরুষের মন দেওয়া-নেওয়া বা প্রেম ব্যাপারটার মধ্যে কি কিছুই নেই?".. অমলেন্দু বাবু নিজের মনের গভীরে ডুব দেন, খুঁজে দেখেন নিজের দীর্ঘ জীবনে নিজের প্রশ্নের উত্তর। 

প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেল চাকরি করছেন। সরমাকে  বিয়ে করেছিলেন প্রায় তিরিশ বছর বয়সে। বাবা-মা প্রায় জোর করে বিয়েটা দিয়ে দিয়েছিলেন। 
বিয়ের আগে বাবা বলেছিলেন, "খোকা, এবার বিয়েটা করে ফেল। আমাদের বয়স হয়েছে। তোর মাও তো আজকাল চোখে কম দেখে, কতদিন আর হাত পুড়িয়ে রান্নাবান্না করবে? তাছাড়া, তাড়াতাড়ি বিয়ে করলে ছেলেপুলে মানুষ করতে সময় পাওয়া যায়, সংসারটাও গুছিয়ে নিতে পারবি"। 
যাইহোক, বিয়ের পর সরমা এসেই বাড়ির হাল ধরে, সব দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। আজ পর্যন্ত কোনও অভিযোগ করেনি। 

বিয়ের পর থেকেই হাতা-খুন্তি হাতে তুলে নিয়েছে। রান্নাবান্না থেকে মা-বাবার দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নিয়েছে। আজ পর্যন্ত এই অমলেন্দু বাবুর অফিসের টিফিন দিতে কোনওদিন ভুল করেনি। তারপর ধীরে ধীরে সরমার কোল আলো করে বাবু, টোয়া এল পরিবারের নতুন সদস্য হয়ে। তাদের বড় করা, পড়াশুনো করানো, স্কুলে পাঠানো সব কাজ মুখ বুজে করে যাচ্ছে সেই থেকে আজ অবধি। 
এই ভদ্রলোক তো সারাজীবন শুধু অফিসই করে গেলেন। আর নিদেন পক্ষে রবিবার বা কোনও ছুটির দিন একটু আধটু বাজার করেছেন মাত্র। বছরের আর বাকি দিনগুলোতে সবজি, মাছ কোথা থেকে এল, কিভাবে এল কোনওদিন খোঁজ নিয়ে পর্যন্ত দেখেননি। নির্বিকার চিত্তে রসনা তৃপ্তি করে গেছেন শুধু। ঝগড়াঝাটি যে একেবারে হয়নি তা নয়, বিস্তর হয়েছে। কিন্তু, সেটা সরমার দিক থেকে দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে বা দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও রকম বাধা বা অন্তরায় হয়নি কখনও। 
বিয়ের পরে প্রতিটি বছর বিবাহবার্ষিকীর দিন সরমা ঘরটাকে কী সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। নতুন শাড়ি পরে মন্দিরে পুজো দিয়ে সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনায় কপালে পুজোর ফুল ঠেকিয়ে আসছে। অমলেন্দু বাবু হয়ত অফিস ফেরত কিছু গোলাপ বা রজনীগন্ধা এনেছে, শুধু ওইটুকুই। কিন্তু, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুলেই গেছেন বিশেষ দিনটির কথা। কিন্তু, সরমা এত ব্যস্ততার মাঝেও কোনও বারই ভুলে যায়নি জীবনের বিশেষ দিনটির কথা, ঠিক নিয়ম করেই করে আসছে। 
এগুলো কি তার প্রতি বা তার সংসারের প্রতি সরমার ভালোবাসা নয়? কী তাহলে? প্রেম আর ভালোবাসা কি তবে আলাদা? আলাদা বলেই মনে হয়। কারণ, ভালোবাসা তো সবার ক্ষেত্রে হতে পারে। বাবা, মা, ভাই, বোন, বন্ধু সবার ক্ষেত্রে। সেখানে আর নির্দিষ্ট পাত্র নির্বাচন করতে হয়না। 
তাহলে, সরমার মত মেয়েরা কেন, কিসের স্বার্থে এত নিরলস নিঃসংশয় ভালোবাসা দিয়ে যায় উজাড় করে সারাজীবন ধরে একজন বিশেষ মানুষকে? 

আজ, অমলেন্দু বাবু বেশ বুঝতে পারেন, একটা মানুষকে অন্তর দিয়ে, হৃদয় দিয়ে না ভালোবাসলে, তার জন্য, তার সংসারের জন্য এতখানি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কেউ আজীবন দিয়ে যেতে পারেনা,.. আর এটাই বোধ হয় সেই অনন্য, অনির্বচনীয় ভালোবাসা, যার নাম 'প্রেম'! 
আজ, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে "ভালোবাসা দিবস" - এর এই বিশেষ দিনে ভালোবাসা আর প্রেমের পার্থক্য খুঁজতে গিয়ে তাঁর প্রতি সরমার প্রেম, আর, সরমার প্রতি নিজের প্রেম আবিষ্কার করে ফেলেন অমলেন্দু সরকার। নিজের মনের গভীরে হারিয়ে ফেলেন নিজেকে। 

হঠাৎ শুধাংশু বাবুর ডাকে সম্বিত ফেরে অমলেন্দু বাবুর। 
"কী ব্যাপার! কী হল আপনার? আজকে কি টিফিন খাবেন না নাকি, অমলেন্দু বাবু? বৌদি কত ভালোবেসে আপনার জন্য টিফিন বানিয়ে পাঠিয়েছেন। আরে আসুন তো, আসুন এদিকে। বাক্স খুলে দেখুন, বৌদি কী টিফিন পাঠিয়েছেন আজকে?".. শুধাংশু বাবু, অমলেন্দু বাবুকে কাছে ডাকেন।
অমলেন্দু বাবু, শুধাংশু বাবুর কাছে এসে টিফিন বক্স খুলে দেখেন, তাঁর অতি প্রিয় লুচি আর আলুর দম। খাবারের ম ম গন্ধে অমলেন্দু বাবুর খিদেটা যেন আরও বেশি করে চাগাড় দিয়ে ওঠে। আর দেরি না করেই দুই সহকর্মী বন্ধু মিলে মহানন্দে পরস্পরের টিফিন ভাগ করে খেলেন।

আজ, অফিস ফেরত অমলেন্দু বাবু এক অন্য মানুষ, তাঁর মনের বারান্দায় যেন ফাগুনের ফুরফুরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে! "বিশ্ব ভালোবাসা দিবস" এর এই বিশেষ দিনে জীবনের বেলাশেষে, তিনি নিজের দাম্পত্যজীবনের এক অনন্য ভালোবাসা, হারানো প্রেম আবিষ্কার করে ফেলেছেন। 
তাই, তিনি স্টেশনে নেমেই আগে বাজারে গিয়ে এক তোড়া গোলাপ ফুল কিনে ফেললেন। তারপর, কিভাবে সরমাকে প্রেম নিবেদন করবেন, তা নিয়ে সারা রাস্তা চিন্তা করতে করতে বাড়ি ফিরলেন। 
বাড়িতে এসেই ঘরের ভেতরে গিয়ে একটু ইতস্তত করতে লাগলেন। তারপর, সরমার হাতে গোলাপের তোড়া দিয়েই সাহস করে বলেই ফেললেন, "শুভ ভালোবাসা দিবস, আই লাভ ইউ!"...... 
অপ্রত্যাশিত এই ঘটনার আকস্মিকতায় সরমা প্রাথমিকভাবে হকচকিয়ে যান। 
তারপর, সরমাদেবী নিজেকে সামলে নিয়ে এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে অমলেন্দু বাবুর দু'টি চোখের দিকে চোখ রেখে তাকিয়ে রইলেন অপলকে,.. বেশ কিছুটা সময়,... অনেকক্ষণ!




----------------------------------------------------------------------------------------
মতামত জানান    

শুক্রবারের গল্পের জন্য মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। 

ankurishapatrika@gmail. com

___________________________        
    

        

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন