ধারাবাহিক প্রেমের উপন্যাস(পর্ব- ১৮)
... এবং ইরাবতির প্রেম
গৌতম আচার্য
গাড়ি এগিয়ে চলেছে।। গাড়ি এগিয়ে চলার ছন্দে মন খারাপ বেড়ে চলেছে সত্যেন এর।। সত্যেন যে প্রতিটি মূহুর্তে ইরাবতির থেকে ক্রমশ আরও অনেক অনেক দূরে চলে যাচ্ছে, সেটি সত্যেন অনুভব করছে প্রতিটি মূহুর্তে।। বুকের ভিতরে কি একটি তীব্র মোচড় কাজ করছে।। এইভাবে ইরাবতিকে ছেড়ে চলে যেতে তার মন চাইছে না।। তার মনে হচ্ছে ইরাবতি যেন তার যুগ যুগান্তরের সাথী।। ইরাবতির গাঢ় আলিঙ্গন, দ্রুত নিঃশ্বাস- প্রশ্বাস আর তীব্র হাতছানি সত্যেনকে পিছে থেকে টেনে ধরে রেখেছে।। প্রতিটি ক্ষণে পাগল করে তুলছে।।
দিশাহারা সত্যেন কল করে ইরাবতিকে।। অন্য প্রান্ত থেকে ইরাবতি বলে ওঠে, হ্যা এই বাড়িতে ঢুকে পড়ে সবে জুতো ছেড়েছি।। উদগ্রীব সত্যেন আকুল স্বরে বলে ওঠে, খুব কষ্ট হচ্ছে গো।। তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।। ইরাবতি বলে, একটু দাঁড়াও, আমি ফ্রেস হয়ে তোমাকে ফোন করবো।।
মূহুর্তে সত্যেন এর মনের গভীরে ভীষণ মোচড় দিয়ে ওঠে।। সত্যেন যে কি অপরিসীম আকুলতা, অন্তহীন যন্ত্রনার আর্তিতে ছটফট করতে করতে ইরাবতিকে ফোন করেছে, ইরাবতি সেটি বোধহয় অনুভব-ই করে উঠতে পারে নি।। ইরাবতি কে ছেড়ে আসবার অসীম যন্ত্রনা প্রতিটি মূহুর্তে বিদ্ধ করছে সত্যেন কে।। বুকের ভিতর কেমন একটি শূন্যতা গিলে খাচ্ছে।। ইরাবতি কে যে সত্যেন চিরদিনের মতো সবসময় কাছে কাছে পেতে চায়।।
মাত্র দুটি রাত।। সত্যেন এর জীবনের সমীকরণ টাই বদলে দিয়েছে।। অপরিসীম এক অদৃশ্য আকর্ষণ যে আষ্টেপৃষ্ঠে তাকে বেঁধে ফেলেছে, ইরাবতি হীন প্রতিটি মূহুর্তে তা অনুভূত হচ্ছে সত্যেন এর মনের ভিতরে।। যেন সত্যেন এর মনের মরুদ্যানে শীতল ছায়া নেমে এসেছিলো ইরাবতির উষ্ন উপস্থিতিতে।। আজ এই বিদায় মূহুর্তে সত্যেন এর বুকের ভিতরটি অনন্ত এক যন্ত্রনায় ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।। ইরাবতি র অভাব প্রতি মূহুর্তে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।।
বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে সত্যেন।। অপেক্ষা, কখন ফোন করে ইরাবতি।। কুড়ি মিনিট হয়ে গেছে, কিন্তু ইরাবতি ফোন করে না।। তার বুকের মধ্যে
যে উত্তেজনার আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে ইরাবতিকে নিয়ে, তা কি তাহলে একতরফা? ইরাবতি কি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সব ভুলে গেছে মূহুর্তে? তা নাহলে এখনও কেন ফোন করছে না ইরাবতি?
দ্বিধা দ্বন্দের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সত্যেন এক বিরহের সুর শুনতে পাচ্ছে।। সুতীব্র অভিমানের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘতর হতে হতে বিরহের বেহাগ হয়ে ঝরে পড়ছে তার অভিমানী মনের ভিতরে।। সত্যেন তার মনের অতল গভীরে ডুব দিয়ে খুঁজে ফিরছে ইরাবতি কে।। বিট্টু প্রশ্ন করলো, "সাব্ চা-ই পিনা হ্যায় ক্যা"? ইচ্ছে করছে না সত্যেন এর।। তবু অনেকক্ষন চা খাওয়া হয় নি, আর তার ট্রেন তো সেই সন্ধ্যা বেলা।। যদিও তার কাছে ফেরার টিকিট নেই।। এনজিপি গিয়ে টিটি সাহেব কে ধরে ম্যানেজ করতে হবে।। কিন্তু এ্যতো তাড়াতাড়ি গিয়ে লাভ কিছু নেই।। তার থেকে এভাবে চা খাওয়ার অছিলায় যতোটুকু সময় কাটানো যায় ভেবে সত্যেন বললো, "হ্যা পিনা হ্যায়"।।
কোন উত্তর দিলো না বিট্টু।। কয়েক মিনিট নিঃশব্দে গাড়ি চালিয়ে থামলো একটি ধাবায়।। ইরাবতি যদি ফোন করে- এই ভাবনায় মোবাইল ফোন হাতেই রেখে দিয়েছে সত্যেন।। প্রায় এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে, ইরাবতি এখনও পর্যন্ত ফোন করেনি।। হতাশ হয়ে পড়ছে সত্যেন।। আসলে উত্তর বাংলার লোক গুলি বোধহয় এমনি।। যতোক্ষন সামনাসামনি আছে ততোক্ষন গাঢ় বন্ধুত্ব।। তার অভিজ্ঞতা আছে, পশ্চিম বঙ্গ পুলিশের ব্যানার্জী দা।। যতোক্ষন ব্যানার্জী দার পোস্টিং ছিলো লাটবাগানে, সত্যেন এর সঙ্গে চূড়ান্ত বন্ধুত্ব ছিলো তার।। বাড়িতে আসা যাওয়া, একসাথে সিনেমা, খেলা দেখতে যাওয়া-- সবকিছু।। যেদিন সে তার হোমটাউন জলপাইগুড়িতে পোস্টিং পেলো, সব বন্ধুত্বের ইতি।।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সত্যেন ভাবে, ইরাবতি তো আর ব্যানার্জী দা নয়।। ইরাবতি- র সঙ্গে তার সম্পর্ক তো অন্য।। দুজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক।। সত্যেন ভাবে এখন না হয় লোকে লাভ ম্যারেজ করে।। কিন্তু আজ থেকে কিছু বছর আগেও তো বাবা- মা পছন্দ করে এক অজানা- অপরিচিত ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে নিজের মেয়ে বা ছেলের বিয়ে দিতেন।। কেউ আগে কাউকে কখনো দেখেনি, জানেনি সে কেমন, তবুও বিয়ের পর দুজন দুজনের জন্য জীবন বাজি রাখতে দ্বিধা করতো না।। শারিরীক সম্পর্ক যে এই অজানা, অপরিচিত সম্পর্ককে কতোখানি অনুভবি, কতোটা একের জন্য অন্যকে আত্মত্যাগী করে তুলতে পারে, সেটি দৃঢ় অনুভব করে সত্যেন।।
ইরাবতি তো তার সঙ্গে শারীরিক ভাবে মিশে গেছে।। তার মনে কি কোন রেখাপাত করে নি সেই অপূর্ব সুন্দর সম্পর্ক? মনের ভিতরে আকুলতা কি কেবল একতরফা তার? নিজেকে প্রশ্ন করে কোন উত্তর খুঁজে পায় না সত্যেন।। চায়ের দোকানে বেশ কিছুটা অনর্থক সময় কাটিয়ে আবার গাড়িতে ওঠে সত্যেন।। গাড়ি পৌঁছে যায় এনজিপি ষ্টেশনে।। এ টি এম কাউন্টার থেকে টাকা তুলে বিট্টুকে গাড়িভাড়া আর টিপস্ মিটিয়ে দেয় সত্যেন।। বিট্টু সেলাম জানিয়ে ফিরে যায় নাগরাকাটার উদ্দেশ্যে।। তখনও ইরাবতি ফোন করে না।।
চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন