লেবেল

শনিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২১

রবিবাসরীয় বিভাগ-২৫।। আজকের গল্প।। দীধিতি — দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 





রবিবাসরীয় বিভাগ-২৫


আজকের গল্প 



দীধিতি

 দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়



    অল্পবয়সেই সায়ন বেশ উঁচু পদে।নামী বহুজাতিক কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর।এম বি এর ডিগ্রির সাথে শানিত মেধা ও কাজের একাগ্রতা ওকে আজ এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। বাবার কথাটা সব সময় মাথায় রাখে ও:"রোদ থাকতে ধান শুকিয়ে নেওয়া ভালো"। তাই কাজ ছাড়া আর কিছু বোঝে না । প্রতিদানে পেয়েছেও প্রচুর।দামী ফ্ল্যাট,দামী গাড়ি, বিলাসবহুল জীবন। তবুও কোথায় যেন এক শূণ্যতা। দিনের শেষে ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর মেলে ধরার মতো কোন নরম আশ্রয় নেই।ইলিজিবল ব্যাচেলর। চারিদিকে প্রলোভনের মাঝেও নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারেনি। অফিসের বেশ কিছু সুন্দরী সহকর্মী কাছে আসতে চায়।মেলে ধরতে চায় ওর সামনে।ও বোঝে এসব শুধু প্রমোশনের চাহিদায়। ওদের শরীরে মন বলে কিছু নেই। সৌন্দর্য্যকে ব্যবহার করো ওপরে ওঠো। অফিসে তাই মহিলা সহকর্মীদের এড়িয়ে চলে ও। কিন্তু এক জায়গায় এসে আটকে যায়। জিন্স টপস্ আর গোল গোল দুটো গভীর চোখে। চুম্বকের আকর্ষণ ! সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার রিয়া তাই ওর মন জুড়ে সব সময়। বিভিন্ন ভাবে সায়ন ওর ভালোলাগা প্রকাশ করেছে। কিন্তু রিয়া যেন নির্বিকার।মন বলে যেন ওর কিছু নেই। নাকি বুঝেও খেলে চলেছে সায়নকে নিয়ে। মেয়েদের মন বোঝা লাভ ক্ষতির হিসেবের থেকেও ভীষণ জটিল।সাধে বলে :দেবা ন জানন্তি,কুতো মনুষ্যা।
           সুযোগ এলো একদিন। একটা বড়ো প্রজেক্টে  কোম্পানির সাফল্য এলো। সৌজন্য রিয়া।তাই বস হিসেবে রিয়ার সাফল্য উদযাপন করতে কফি খাওয়াতে নিয়ে গেল গোলপার্কের ক্যাপুচিনো কফিশপে। সেদিন রিয়া যেন অনেকটাই খোলামেলা। অফিসের গাম্ভীর্যের মুখোশ উধাও।ওর অকারণ হাসি ও খুশি খুশি আচরণ সায়নকে সাহসী করে তুললো।বলেই ফেললো অতোদিনের না বলা বুকে পাথর হয়ে বসে থাকা কথাটা।ভালোবাসি,ভালোবাসি। শুনে রিয়া তো হেসেই খুন। কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেছিল সেদিন।সায়নের বুকের পাথরটা যেন আরো ভারী হয়ে ফিরে এলো বুকে একরাশ মনখারাপের দোলাচল নিয়ে।
         ঘটনাটা ঘটলো এর ঠিক কিছুদিন পর। সকাল থেকেই যেন " ঝরঝর মুখর বাদর দিনে" !অফিস ছুটির সময় রাস্তাঘাট সব জলে থইথই। হঠাৎ রিয়া ওর কেবিনে এসে প্রস্তাব দিল আজ ওকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার।একই পথের পথিক ওরা। রিয়া থাকে ঢাকুরিয়া আর সায়ন যাদবপুরে।আগে অনেক বার সায়ন প্রস্তাব দিলেও রিয়া এড়িয়ে গেছে। তাই সায়ন আজকের প্রস্তাবে হাতে চাঁদ পেল যেন। বেড়িয়ে পড়ল রিয়াকে পাশে নিয়ে।সব রাস্তাই যেন আজ নদী। জলের বুক চিরে গাড়ি ছুটছে।সায়ন চালিয়ে দিয়েছে ওর প্রিয় গানটা :" রিমঝিম গিরে শাওন..."!রিয়ার সারা মুখে আজ যেন প্রশ্রয়ের হাসি। তবে কি আজ...?ভাবনাটাকে আর এগোতে দিল না সায়ন। আজকের এই আনন্দ ওর জীবনে সুখ স্মৃতি হয়েই থাক।
         ঢাকুরিয়া ব্রিজ পেরিয়ে বাঁদিকে গলি তস্য গলি পেরিয়ে একসময় রিয়ার বাড়ি পৌছাল। আশপাশের কৌতুহলী মুখ। রিয়া সায়নকে নিয়ে ভেতরে গেল। বাড়ির ভেতর ঢুকেই চমকে গেল সায়ন। চারিদিকে দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট । ঘরের প্লাস্টার খসে পড়েছে এদিকে ওদিকে।ভেতর ঘরে ঢুকেই অল্প আলোয় দেখল বিছানায় শুয়ে অস্থি চর্মসার এক বৃদ্ধা। রিয়া পরিচয় দিল, ওর মা।আগে রিয়া কখনো বলে নি তো ওর মায়ের কথা? বড়ো চাপা স্বভাবের মেয়েটা। নিজের কষ্ট বুকে চেপে মুখে সবসময় হাসি ওর। ভদ্রমহিলা রিয়াকে ডেকে কানে কানে কি বললেন। রিয়া হাসতে হাসতে রাতে ওদের বাড়ি খেয়ে যাবার প্রস্তাব দিল।চোখে চপল ইশারায় জানাল,মেনু ডিমভাজা আর খিচুড়ি। ধাক্কা খেল সায়ন।ওর প্রিয় খাবারের কথাটা মনে রেখেছে রিয়া। কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে কিচেনে গেল ও।সায়ন দেখলো ওর মায়ের মুখে প্রসন্ন হাসি। ভদ্রমহিলা চোখ বুজতেই দুচোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।বুঝছে, সায়ন সব বুঝছে। তাহলে কিছুই হারায় নি। রাতের সব তারাই ছিল দিনের আলোর গভীরে।সায়নই শুধু বুঝতে পারে নি। মনের মধ্যে আবেগের বিস্ফোরণ।চুপ করে বসে রইল একরাশ ভালোলাগা নিয়ে।
            ফেরার পথে মায়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগলো সায়নের। আজকে রিয়ার মায়ের চোখের জল ওর ভেতর ঘরে প্রবল বাতাস হয়ে ঢুকে পড়েছে। তোলপাড় করে দিচ্ছে সব।আজ বুঝেছে ওর প্রস্তাবে রিয়ার সম্মত না হওয়ার কারণ ওর মা। স্বার্থপরের মত মাকে ফেলে  কোথাও যেতে চায় না ও।রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধায় সায়নের মাথা নত হয়ে এলো।ও সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো,মা মেয়েকে নিয়ে ওর ফ্ল্যাটে চলে আসবে শীঘ্রই। সায়নের প্রতি রিয়ার ভালোবাসা আজ দিনের আলোর মত পরিষ্কার। ওদের সম্পর্ককে পূর্ণতা দিতে হবে। বুকের পাথরটা উধাও। সেখানে শুধু ভালোবাসার সংলাপ এখন। হঠাৎ একরাশ ঠান্ডা হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল সায়নের শরীরে।












২টি মন্তব্য: