লেবেল

শনিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২১

রবিবাসরীয় বিভাগ—২১।। আজকের গল্প — পরিচয় কৃতিকণা।। Ankurisha ।। E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 





রবিবাসরীয় বিভাগ—২১


আজকের গল্প 


পরিচয়

কৃতিকণা



আজ রবিবার। অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে অভীক চায়ের কাপটা নিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। অনেকদিন মায়ের ঘরের এই জানালাটা খোলা হয়নি। আজ খুলে দিতেই পূবের শেষ রোদ এসে অভীকের গায়ে হাত বুলিয়ে দিল, যেন মায়ের হাতের উষ্ণ স্পর্শ। জানালার বাইরে, মায়ের সাধের একফালি বাগানটা আগাছায় ভরে গিয়ে ঝোপ জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অপরিচর্যায় গন্ধরাজ- কামিনী- হাসনুহানা- কুন্দ গাছগুলো, জংলা লতার বাঁধনে সব মিলেমিশে একাকার। শুধু জবা গাছগুলো সমস্ত অযত্ন উপেক্ষা করে তাদের লাল ফুলের পতাকা উড়িয়ে স্বতন্ত্র অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। একঝাঁক ভোরুই লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে উড়ে ফড়িং ধরছে, আর খুব কিচিরমিচির করছে। ওরা যত না ওড়ে, তার থেকে বেশি লাফায় আর চেঁচায়। 

একটা ছোট্ট কুকুরছানা অনেকক্ষণ ধরে কুঁই কুঁই করে কেঁদেই চলেছে। বোধহয় খিদে পেয়েছে, কিন্তু মাকে খুঁজে পাচ্ছে না। অভীক জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল। দেখল, ছোট্ট বলের মত কুন্ডলী পাকিয়ে পাঁচিলের ধারে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে কুকুরছানাটা। নিশ্চয়ই ড্রেনে পড়ে গিয়েছিল, গা ভর্তি পাঁক। অভীক মুখে চুক্ চুক্ আওয়াজ করতেই, লেজ নাড়তে নাড়তে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে নরম করে জানালার বাইরে ছুঁড়ে দিল অভীক। কিন্তু ভিজে থ‍্যাসথ‍্যাসে হয়ে যাওয়ায় বিস্কুটটা বেশি দূর গেল না। থপাস করে জানালার পাশেই পড়ে গেল। কুকুরছানাটাও ওখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। একবার অভীককে দেখছে, একবার বিস্কুটটাকে। এদিকে মুহূর্তের মধ্যে কার্নিশে আর পাঁচিলের উপর গোটা চারেক কাক কোথা থেকে এসে হাজির হয়ে গেছে। এক্ষুনি হয়তো বিস্কুটটা ছোঁ মেরে নিয়ে চলে যাবে। কুকুরছানাটাও এতই ছোট, বেঁচে থাকার লড়াইটা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। 

বিস্কুটটা ঠিক কোন জায়গায় পড়েছে, জানালা দিয়ে নজরে আসছে না অভীকের। পা উঁচু করে দেখতে গিয়ে হাত লেগে চায়ের কাপটা উল্টে গেল। 

কাপটা বাঁচাতে পারলেও, চা টা পুরোটাই পড়ে গেল জানালার বাঁ দিক ঘেঁষে রাখা মায়ের পুরোনো ট্রাঙ্ক টার উপর। ট্রাঙ্কের উপর ঢাকা দেওয়া মায়ের হাতের সুতোর নকশা করা টেবিল ক্লথটা বিশ্রী ভাবে ভিজে গেল। এক্ষুনি ওটাকে জলে না ডোবালে চায়ের দাগ ধরে যাবে। তাড়াতাড়ি সেটা তুলতে গিয়ে, ট্রাঙ্ক টার দিকে নজর পড়ল অভীকের। নীল রঙের উপরে সাদা আর লালের আলপনা আঁকা। কি আছে ওটাতে? মা মারা যাওয়ার পর আজ দু'বছরে এ কথাটা একবারও মনে হয়নি কেন তার? 

অনেক সময় চোখের সামনে এমন অনেক কিছুই থাকে, যা আমরা দেখেও দেখতে পাই না। দীর্ঘ দিন চোখের সামনে পড়ে থাকতে থাকতে, ওই পড়ে থাকাটাকেই আমাদের চোখ আর মন স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়।


মা চলে যাওয়ার পর প্রথম এই কথাটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল অভীক। মা ছাড়া এই শূন্য ঘরে ঢুকতেই ভাল লাগত না। অফিস থেকে ইচ্ছে করেই অনেক দেরি করে বেরোতো। বাস থেকে নেমে বাড়ি না এসে, সারাদিনের ঘেমো জামাকাপড় পরেই মোড়ের মাথার চায়ের দোকানটায় কাটিয়ে দিত ঘন্টার পর ঘন্টা। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে, আলনায় ঝোলানো মায়ের শাড়ির গন্ধ শুঁকতো। মনে হত রান্নাঘর থেকে মা ডাকছে, "তাড়াতাড়ি গা ধুয়ে খেতে আয় বাবু। তোর পছন্দের ধোঁকার ডালনা করেছি আজ।" 

— "আসছি মা।" বলেই চমকে উঠত অভীক। দৌড়ে চলে যেত রান্নাঘরে। ছোট্ট ছেলের মত সারা বাড়িতে খুঁজত মাকে। যেন ছেলেবেলার লুকোচুরি খেলার মত কোথাও লুকিয়ে আছে মা। এক্ষুনি বেরিয়ে এসে বলবে, "ধাপ্পা।" আর ভয় পেয়ে চমকে উঠে অভীক মাকে জড়িয়ে ধরবে। 

মাঝে মাঝে মাঝরাতে মায়ের খোলা চুলের গন্ধে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসত অভীক। ভোম হয়ে বসে থাকত কিছুক্ষণ। তারপর ঘুমের ঘোরটা কেটে গেলে বুঝতে পারত জানালা দিয়ে বেল-জুঁই-গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ আসছে।

এখন অবশ্য একা থাকার অভ‍্যেস হয়ে গেছে তার। ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরে স্নান করে মায়ের আদরের নাড়ু গোপালকে ফুল জল দেয়। ধূপ দেখায়। প্রদীপ জ্বালানোর অনেক হ‍্যাঁপা। তেল দাও রে, সলতে পাকাও রে, পিলসুজ মাজো রে! তাছাড়া, তেল গড়িয়ে জায়গাটা বড় চটচটে হয়ে যায়। সেটা পরিষ্কার কর রে! অনেক ঝামেলা। তাই প্রদীপের তেল দেওয়ার জায়গায় একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসিয়ে দেয়।


জ্ঞান হওয়া অবধি ট্রাঙ্কটাকে ওখানেই পড়ে থাকতে দেখেছে অভীক। মাঝে মাঝে মা ওটার বাইরেটা ঝেড়ে মুছে আবার ঢাকা দিয়ে রাখত। কিন্তু ওটার ভিতরে যে কি আছে, মাও কখনো দেখায়নি, আর অভীকও কখনো দেখতে চায়নি। একটা ছোট্ট টেপা তালা ঝুলছে তাতে। বিশেষ দামী কিছু যে নেই, সে ব‍্যাপারে অভীক নিশ্চিত। তার গরীব মায়ের গায়ে এক টুকরো গয়নাও কখনো ছিল না।

তবুও, কি আছে ওই ট্রাঙ্কটাতে? আজ জানতেই হবে তাকে। তালাটার চাবি খুঁজে পাওয়া যাবে বলে তো আর মনে হয় না। রান্নাঘর থেকে নোড়াটা নিয়ে এসে এক ঘা দিতেই খুলে গেল তালাটা। 

ভিতরে ছোট্ট ছোট্ট জামাকাপড়, সোয়েটার, মোজা, খেলনা। একটা প্লাস্টিকের পাউডার কেসের মধ্যে ছোট ছোট দু'গাছা রুপোর বালা, পায়ের মল, কোমরের গোট। সব অভীকের ছোটবেলার স্মৃতি। গরীব মায়ের সযত্নে তুলে রাখা অমূল্য ধন। 

আর আছে কিছু কাঁসার বাসনকোসন। বাসনগুলো সরাতেই নিচ থেকে বেরোলো একটা পুরোনো রংচটা ডায়েরি। ডায়েরিটা খুলে দেখতে গিয়ে একটা খাম ঝুপ করে মেঝেতে পড়ল। খামটার ভিতরে বেশ কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া ছবি। প্রথম ছবিটায় হালকা গোঁফের রেখাওয়ালা অভীক মায়ের কাঁধটা জড়িয়ে ধরে আছে হরিদ্বারের 'হর কি পৌড়ির' ঘাটে।


অভীক তখন ইলেভেনে পড়ে। মা'র সাথে দুন এক্সপ্রেসে চড়ে হরিদ্বার হৃষিকেশ দেরাদুন মুসৌরি বেড়াতে গিয়েছিল। শেষ ডিসেম্বরের শীত। মা নিজের মনে উল বুনছে। চুপচাপ বসে থাকতে পারত না মোটে। হাতে কোনো না কোনো কাজ চাই সর্বক্ষণ। 

ট্রেনটা তখন মুঘলসরাই জংশনে দাঁড়িয়ে আছে। প্ল‍্যাটফর্মের বড় ঘড়িটা জানান দিচ্ছে, সকাল সাড়ে নটা। কামরায় তখন চা বিক্রেতা, আর খাবার বিক্রেতাদের ঠেলাঠেলি। চা বিক্রেতাদের 'অ‍্যায় চায়ে, গরম চায়ে' কথাটার একঘেয়ে সুরে একটা অনাবিল আনন্দ আর উদ‍্যম ছড়িয়ে পড়ছে যাত্রীদের মনে। 

এমনসময় হকারদের ধমক আর ধাক্কা খেতে খেতে এক অসীতিপর বৃদ্ধা উঠলেন ট্রেনে।

— "ক‍্যায়া মাজি, তুমকো ভি অভ্ভি চড়না থা।"

বৃদ্ধার পরনে আধ ময়লা সাদা থান। অতি সঙ্কোচে হাত পাতছেন সবার কাছে। তিনি আমাদের কাছাকাছি আসতেই ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল। বৃদ্ধা টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলেন। মা জড়িয়ে ধরল। যত্ন করে নিজের জায়গায় বসিয়ে চা বিস্কুট খাওয়ালো। বৃদ্ধা শীতে এবং বয়স জনিত শারীরিক দুর্বলতায় থরথর করে কাঁপছিলেন। মা নিজের একমাত্র শালটা গা থেকে খুলে তার গায়ে জড়িয়ে দিল। কাশী স্টেশনে বৃদ্ধা নেমে যাওয়ার আগে তাঁর হাতে একশো টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে, হাত ধরে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এল।

সেদিন গর্বে ভরে উঠেছিল অভীকের মনটা। পুরো কম্পার্টমেন্টের লোক মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু মা'র সে দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। আবার হাত চলতে শুরু করেছিল উল কাঁটায়। চোখটা অবশ্য ছিল জানালার বাইরে। না দেখে যে মা কি করে বুনতো!

সাধ‍্য ভীষণই কম থাকা সত্ত্বেও, মায়ের মনটা ছিল সমুদ্রের মত— যে শুধু দেয়, নেয় না। অভীক আজও ভেবে কূল পায় না, কি করে পারত মানুষটা? ওই একশো টাকার নোটটা মা'র যে কতটা পরিশ্রমে অর্জিত ছিল, তা শুধু অভীকই জানে। আর ওই শালটা? ওটা ছাড়াই, ভরা পৌষ মাসে, হরিদ্বারের গঙ্গার ওই কুলকুলে ঠান্ডা হাওয়ায় শুধুমাত্র আঁচল গায়ে দিয়ে কিভাবে যে হাসিমুখে কাটিয়ে দিয়েছিল মা, আজও সেকথা ভাবলে গা শিরশির করে ওঠে অভীকের। 

অভীক রাগ করে বলেছিল, "টাকা দিলে, দিলে। শালটা দিতে গেলে কেন?"

মা অভীকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিল, "মেয়েদের সারাটা জীবন বড় কষ্টের রে। প্রথমে বাবার অধীন, তারপর স্বামীর, শেষে ছেলের। আজীবন পরাধীন এই মানুষগুলোকে শেষ বয়সে হঠাৎ তার চেনা গন্ডি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলে, বড় অসহায় হয়ে পড়ে এরা। অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের কষ্টের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায় আপনহারার কষ্ট। কখনো কোনো বুড়ি মা তোর কাছে যদি হাত পেতে এসে দাঁড়ায়, সাধ‍্যমত সাহায্য করিস বাবা। শুধু মনে রাখিস, তোর আবার হবে। কিন্তু তার আর নতুন করে হওয়ার কিছু নেই।"

ভারত সেবাশ্রম সংঘে উঠেছিল ওরা। প্রতিদিন সন্ধ্যা আরতি দেখে ফেরার সময় মাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে আসত অভীক। ভয়ঙ্কর ঠান্ডায় মা'র রোগা পাতলা শরীরটা তখন ওর বুকের মধ্যে ভিতু পাখির মত তিরতির করে কাঁপত।

মায়ের স্বপ্ন ছিল, আই এ এস অফিসার হবে অভীক। কেন যে মা এমন স্বপ্ন দেখত, তা অভীকের জানা নেই। কিন্তু বড় হতে হতে মায়ের স্বপ্ন, আর অভীকের স্বপ্ন আলাদা হয়ে গিয়েছিল। অভীক বুঝেছিল, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারলে অনেক তাড়াতাড়ি মাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া সম্ভব। মায়ের স্বপ্ন পূরণের চেয়েও, মাকে ভাল রাখা অনেক বেশি জরুরি। অভীকের দুর্ভাগ্য, সে সুযোগটুকু মা তাকে দেয়নি। 


একটা ছবিতে মা বসে আছে একটা চেয়ারে। মায়ের বাঁ দিকে হাফ প্যান্ট পরা অভীক দাঁড়িয়ে আছে। আর ডানদিকে, ফ্রক পরা, মাথার দুদিকে ঝুঁটি বাঁধা শিল্পী, আদুরে আদুরে মুখ করে দুহাতে মায়ের গলাটা জড়িয়ে ধরে আছে। মা বড় ভালবাসত শিল্পীকে। অভীকের মাঝে মাঝে মনে হত, মা বোধহয় তার থেকেও শিল্পীকেই বেশি ভালবাসে। অভীক যখন শিল্পীর বেণী ধরে টানত, তখন মা তাকে চোখ রাঙাতো। কিন্তু শিল্পী যখন অভীকের পিঠে ধড়াম করে পঁচাশি সিক্কার চড় কষাতো, তখন মা মাথা নিচু করে হাতের কাজ সারতে সারতে মিটি মিটি হাসতো।

শিল্পী অভীকের ছোট্টবেলার বন্ধু। প্রাইমারি স্কুল থেকে এইচ এস পর্যন্ত একসাথে পড়াশোনা। স্কুল শেষে দুজনেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল। আলাদা আলাদা কলেজ, আলাদা আলাদা স্ট্রিম। তারপর শিল্পীর এম টেক, অভীকের এম বি এ। কিন্তু মন দুটো আর আলাদা হল না। পরিবর্তন শুধু একটাই হয়েছে, তুই থেকে তুমি হয়েছে দুজনে।

ইদানিং অভীকের মনে হয়, শিল্পী বোধহয় ওর মনের ভিতরটা পরিষ্কার দেখতে পায়!


মায়ের স্বভাবের সাথে শিল্পীর অনেক মিল খুঁজে পায় অভীক। বছর দুয়েক আগে একবার একটা কনফারেন্সের জন্য দিল্লি যেতে হয়েছিল শিল্পীকে। অভীক সঙ্গে গিয়েছিল। একটি বাচ্চা ছেলে ট্রেন কম্পার্টমেন্টে ঝাঁট দিয়ে হাত পেতে পয়সা চাইছিল। বাকি সকলের মত অভীকও পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করে ছেলেটির হাতে দিল। শিল্পী ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, "কি নাম তোর?"

— "আব্বাস।"

— "কোথায় থাকিস?"

— " ইষ্টিশানে।" 

আব্বাস হাত পেতেই আছে।

— "পড়াশোনা করিস?"

আব্বাস চুপচাপ। হাত সরিয়ে নিয়ে এবার মাথা নিচু করে ঝাঁটার বাঁধন ঠিক করতে ব‍্যস্ত। মনে মনে বোধহয় মাপছে, এই দিদিটা আদৌ টাকা পয়সা কিছু দেবে কিনা। বয়সে ছোট হলেও, পরিস্থিতি ওদের পোড় খাইয়ে দেয়।

— "আব্বাস, ফটো তুলবি?"

এমন কথা ছেলেটি আগে কখনো শুনেছে বলে মনে হল না। অবাক চোখে তাকাল শিল্পীর দিকে। অমনি শিল্পী কচ্ করে একটা ফটো তুলে নিল মোবাইলে। সেটা দেখাতেই, আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আব্বাসের মুখ। শিল্পী ওর নোংরা হাতটা চেপে ধরে মেঝে থেকে তুলে পাশে বসিয়ে কয়েকটা সেলফি তুলল ওর সাথে। তারপর হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে, ছবিগুলো দেখাতে লাগল ওকে। অভীক চারিপাশে তাকিয়ে দেখে, সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শিল্পীর দিকে। শিল্পীর কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। ততক্ষণে সে আব্বাসের কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে গান শোনাচ্ছে, আর বিস্কুটের প‍্যাকেট খুলে নোংরা হাতেই বিস্কুট খাচ্ছে দুজনে। যেন আব্বাস শিল্পীর সহযাত্রী এবং পরিচিত জন। অভীকের চোখে চোখ পড়ায় দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে চোখ মারলো।

অভীক ভেবেই অবাক হয়, মেয়েরা কি আশ্চর্য দক্ষতায় নিপুণ এবং আন্তরিকভাবে একই সঙ্গে অসংখ্য রোল প্লে করতে পারে!

আব্বাস নেমে যাওয়ার আগে তার ছেঁড়া জামার পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দিতে দিতে শিল্পী বলেছিল, "মাকে বলিস, একটা নতুন জামা কিনে দিতে।"



মা যা পারতো, যা শিল্পী পারে, অভীক কেন তা পারে না! কেন এসব কথা তার মাথাতেই আসে না! অমন মায়ের সন্তান হয়ে, এমন মেয়ের বন্ধু হয়ে, তার তো আরও অনেক বেশি উদার হওয়ার কথা ছিল! তবে কি ওসব গুন সহজাত?— যা অভীকের নেই! মনটা খারাপ গেল। নিজেকে বড্ড হীন মনে হল।

বাকি ছবিগুলো উল্টে পাল্টে দেখে ডায়েরিটা খুলে বসল এবার। পাতাগুলোও সব ঝুরঝুরে হয়ে খুলে আসছে। রোজকার সামান্য সামান্য কথাও লিখে রাখত মা। অনেকটা 'ফুল্লরার বারোমাস‍্যা'র মত। অভীক কবে প্রথম 'মা' ডাকল, কবে প্রথম স্কুলে গেল— এইসব। একটা পাতা খুলে হাতে চলে এল। অভীক সেটা ডায়েরির মধ্যে গুঁজে রাখতে গিয়েও কি মনে করে পড়তে শুরু করল।


— "আজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাড়ির ঘুলঘুলি গুলোতে অসংখ্য চড়ুই পাখি বাসা করেছে। একটা চড়ুইপাখি উড়ে ঘরে ঢুকতেই চলন্ত পাখার ব্লেডে ধাক্কা খেয়ে মশারির ছাদে এসে পড়ল। আর তাই দেখে বাবুর কান্না আর থামানো যায় না। মশারির কোণটা খুলে দিতেই, পাখিটা গড়িয়ে গিয়ে বাবুর কোলের কাছে পড়ল। ডানাটা কিছুটা কেটে গেছে। ছোট্ট নরম তুলতুলে ভেলভেটের  মতো শরীরটা মাঝে মাঝে থরথর করে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

দেখি, বাবু চোখের জল মুছতে মুছতে হোমিওপ্যাথি ওষুধের কাঠের বাক্সটা তাক থেকে পেড়ে এনে পাখিটাকে হাতে তুলে নিল।  এ বাক্সের অনেক ওষুধই ওর চেনা। বিশেষ করে আর্ণিকা। রোজই কিছু না কিছু কাটা-ছড়া-পড়া লেগেই থাকে ওর, তাই। তাড়াতাড়ি কাঁচের ছোট্ট সরু শিশিটা থেকে দুটো দানা বের করে চড়ুইটার ঠোঁটের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। তারপর পাখিটাকে খাটের তলায় ঝুড়ি চাপা দিয়ে রেখে স্কুলে চলে গেল। 

স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাকে প্রশ্নে প্রশ্নে অস্থির করে দিল। পাখিটা এখন কেমন আছে, পাখিটা কিছু খেয়েছে কিনা— আরও কত শত প্রশ্ন। বাড়ি ফিরে খাটের তলায় ঢুকে ঝুড়িটা তুলতেই নড়ে নড়ে বেরিয়ে এসে, দু-একবার ডানাটা ঝাপটিয়েই ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল পাখিটা। 

আমি ভাবলাম, পাখিটা উড়ে যাওয়ায়, বাবু বুঝি খুব কাঁদবে। কিন্তু দেখি, খুশিতে ঝকমক করে উঠল আমার বাবুর মুখ। গর্বে আমার বুক ভরে গেছে আজ। এই এতটুকু বয়সেই ও নিজের আনন্দ ভুলে অন‍্যের সুখের কথা ভাবতে শিখে গেছে! তুমি ওকে দেখো ঠাকুর, সারাজীবন ও যেন এমন বড় মনেরই থাকতে পারে। অভীক কথার অর্থ ভয়শূন্য। ওর এ নাম সার্থক করো ঠাকুর। চিরদিন ও যেন নিজের মনের ভয়কে জয় করে নিঃস্বার্থে অন‍্যের ভাল করতে পারে।"


আজ মায়ের পুরোনো ট্রাঙ্কটার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল অচেনা এক অভীক। মুহূর্তে হীনমন্যতার সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে মায়ের লেখা বর্ণনায় নতুন করে আত্মপরিচয় ঘটল তার। লোভহীন, গ্লানিহীন, নির্ভিক অভীক।










৬টি মন্তব্য:

  1. বাহ্! খুব সুন্দর মানবিক আদর্শে ভরা একটি গল্প
    পড়লাম। গল্পটির গঠনশৈলী খুব সুন্দর। অভীকের
    মায়ের ও অভীকের বান্ধবী শিল্পী খুব উদার মনের
    আদর্শ ভারতীয় মহিলা। এছাড়া অভীকের কিয়ৎক্ষণ
    নিজের সম্পর্কে যে হীনমন্যতা পেয়ে বসেছিল তাও
    তার মায়ের পুরনো ডায়েরী পড়ে নিজের শৈশবের
    একটি ঘটনায় কিরূপে একটি চড়াই পাখির জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছিল জেনে তাঁর মনের সমস্ত হীনমন্যতা দূর হয়। গল্পটি পড়ে খুব ভালো লাগলো।




    উত্তরমুছুন
  2. অন্তহীন হৃদয় তরঙ্গে
    ঐশ্বরিক প্রেম মিশে
    সৃষ্টি হয় মনুষত্ব,
    কদাচিৎ রিপু সমূহের প্রভাবে
    যা নিস্পৃহ হয়ে উঠে
    মস্তিষ্কে পশুত্বের জন্ম দেয়,
    অতঃপর জীবন মার্গের কোনো বাঁকে
    চেতনা আর বিবেক অকস্মাৎ মুখোমুখি হয়,
    সেথায় মানবিকতার প্রদীপ হাতে
    পুণর্জাগ্রত অন্তরাত্মা বিশ্বপ্রেমের আহ্বান জানায় ।।

    -------------------------- ঋষি অভ্রতনু ।।

    উত্তরমুছুন
  3. অসাধারণ একটি গল্প পড়লাম। সন্তানের মধ্যে মনুষত্ব্যের বীজ বাবা মাই বপন করেন। তবে সেটাকে মহীরুহে পরিণত করার দায়িত্ব সন্তানেরই। খুব সুন্দর রচনা

    উত্তরমুছুন
  4. পড়লাম, যেন এক ছবি, আদর্শ মায়ের সন্তান গড়ে তোলার অভিপ্রায় সার্থক যেখানে সেখানে কলমও সার্থক,শুভেচ্ছা অফুরান,,,

    উত্তরমুছুন
  5. কি সুন্দর লিখেছো চিনিজী। অপার মুগ্ধতা বিরাজ করলো গো। মনের মত গল্প।

    উত্তরমুছুন