লেবেল

বৃহস্পতিবার, ২০ মে, ২০২১

ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব-৪) ।। ছায়া-ছায়া অন্ধকারের আড়ালে — অনন্যা দাশ।। Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 





ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব-৪)

ছায়া - ছায়া অন্ধকারের আড়ালে

অনন্যা দাশ


রবিবারদিন বিকেলবেলা একা একা বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না তাই একটু হাঁটতে বেরলাম। আজ দিনটা বেশ ভালো, তত গরম নেই তাই অনেকেই বাইরে বেরিয়েছে। কেউ কুকুর নিয়ে কেউ বাচ্চা নিয়ে। ঐশীর অফিসে খুব কাজের চাপ তাই ওকে শনি-রবিবারও অফিস যেতে হয়েছে। কাল মানে সোমবার আমার আবার ডাঃ মিত্রর সঙ্গে দেখা করার কথা। ওনাকে এবার বলতে হবে রজারের কথা। আমি সব কাজগুলো করলাম আর পেপারে কিনা আমার নামটা তৃতীয় স্থানে হয়ে গেল! নিজে ফার্স্ট অথার আর সেকেন্ড অথার করেছে নিজের পছন্দের একটা চিনা মেয়েকে! সেই মেয়ে বুক আর পা দেখানো ছাড়া আর কিছুই করে না ল্যাবে তাও ওর ওই দুটো গুণের জন্যে সে রজারের বিশেষ প্রিয়পাত্রী! সেই আহ্লাদ দেখাতেই ওই মেয়েটাকে দ্বিতীয় অথার করে দিয়েছে! রাগে আমার সমস্ত গা রি রি করছিল কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না। আমি যে ভিসাতে এসেছি! সেটাকে ক্যান্সেল করে দিলে আমাকে দেশে ফিরে যেতে হবে! সেটা এমনিতে খারাপ কিছু নয় কিন্তু পি এইচ ডি শেষ না করে ফিরে গেলে যে লজ্জার একশেষ! শুধু আমার তো নয় আমার মা-বাবারও মাথা হেঁট! সব আত্মীয়স্বজনরা আড়ালে হাসাহাসি করবে যে চিন্ময়দা আর বৌদি মেয়েকে বিয়ে টিয়ে না দিয়ে বিদেশে পড়তে পাঠালেন আর সেই মেয়ের কিনা এই দশা! পাঁচ বছর ওখানে থেকেও কিছুটি করতে পারল না! নাহ, ওই সব আমি শুনতে পারব না! আমার বুক ফেটে যাবে! তার চেয়ে বরং মুখ বুজে কিছুদিন রজারের অত্যাচার সহ্য করে নেব তাও ভালো!”   


 আসলে বিয়ে যে আমি করতে চাইনি তা নয়, ঠিক হয়ে ওঠেনি আর কী। আসলে আমি হয়তো একটু বেশিই ভাবুক বা ইমোশানাল প্রকৃতির, বড্ড বেশি ভেবে টেবে বসে থাকি তাই যত ঝামেলা হয়। কলকাতায় এম এস সি করার সময় রজতের সঙ্গে একটু বেশিই জড়িয়ে পড়েছিলাম। রজত ছেলেটা এমনিতে ভালোই ছিল কিন্তু ওর ঘাড়ে বড্ড বেশি দায় দায়িত্ব ছিল। বাড়িতে দুটো ছোট্ট ছোট বোন, একটা ছোট ভাই, এদিকে ওদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল সে কিন্তু পরিবারের চাপে এম এস সি শেষ করতে না করতেই চাকরি নিতে বাধ্য হল। কোথায় ওর পি এইচ ডি করার কথা তা না আমি করছি! চাকরিটা নেওয়ার পর থেকেই রজত কেমন যেন আমার থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। আমিও ভেবে দেখলাম যে ওর বাড়ির ওই অত দায়িত্ব আমি আমার মাথায় ঠিক নিতে পারব না। ওর মা-বাবার শরীরও ভালো থাকে না প্রায়ই, ছোট ভাইটা বখে যাচ্ছে। আমার যেন মনে হচ্ছিল কেউ আমার গলায় একটা দড়ির ফাঁস পরিয়ে দিয়ে তাতে টান দিচ্ছে! ব্যস আমি ছিটকে গেলাম! রজতের অবশ্য তাতে বিশেষ মন টন খারাপ হয়নি কারণ শুনলাম আমাদের ছাড়াছাড়ির কয়েকমাস পরেই সে নিজের অফিসেরই একটা মেয়েকে বিয়ে করে বসল। তার পরই আমি এদেশে চলে আসি। রজতের সঙ্গে আমার আর কোন যোগাযোগ নেই। ওই সম্পর্কটাকে আমি ‘ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে’ খাতায় লিখে ফেলেছি। তবে ইদানীং পলাশদাকে বেশ লাগছে আমার। বেশ সুপুরুষ দেখতে পলাশদাকে, আর সবার জন্যে ভাবে। খুব ভালো মানুষ। পলাশদারও মনে হয় আমাকে ভালোই লাগে। আসলে আমি দেখতে তো খারাপ না, আর শাড়িটাড়ি পরলে আমাকে ভালই দেখায় জানি। দেখি কতদূর টেনে নিয়ে যাওয়া যায় ব্যাপারটাকে।    


সন্ধ্যে হয়ে আসছে দেখি বাড়িমুখো হলাম। কাপড়গুলো কাচতে হবে। কাল থেকে আবার যুদ্ধ শুরু! ময়লা কাপড়ের ঝুড়িটা আর কাপড় কাচার সাবান সঙ্গে নিয়ে নিচে বেসমেন্টে গেলাম। আমাদের বাড়িটা চার তলা। আমি আর ঐশী তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে থাকি। বেসমেন্টে কাপড় কাচার মেশিন আর ড্রায়ার আছে। পয়সা দিয়ে কাচতে হয়। যাক মেশিনগুলো খালি, কেউ নেই দেখে আমি খুশি হলাম। কেউ থাকলে আবার লাইন দিতে হয়, নয়তো আবার পরে সব টেনে নিয়ে এসো! আমি ঝুড়ি থেকে জামাকাপড়গুলো বার করে করে মেশিনে ভরতে লাগলাম। ওমা এটা কী! আমার যে জামাটা ঐশী পরেছিল ধার নিয়ে তাতে দেখি লাল লাল ছোপ! দেখে অবিকল রক্তের মতন মনে হল! বেশ ভয় পেয়ে গেলাম আমি! কী করেছে মেয়েটা? আজ ফিরলে ওকে জিজ্ঞেস করতে হবে! তাছাড়া তুই যা করার কর কিন্তু আমার জামা পরে করতে হবে কেন তোকে?   

কাপড় কেচে শুকিয়ে বাড়ি ফিরে ডিমের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে হাত ধুচ্ছি এমন সময় ঐশী এসে হাজির। দেখে মনে হল কিছুটা মদ খেয়েছে!

“কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
“প্রথমে তো অফিস তারপর ঠিক হল সেখান থেকে একটা বারে যাওয়া হবে তাই সেখানে গেলাম। ওই একটু খাওয়া দাওয়া আর নাচানাছি! অবশ্য খাওয়াটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। টুকটুক করে খেতে খেতে, আজ আর ডিনার করতে পারব না!”

আমি শুধু বললাম, “হুঁ!”ও ফ্রিজ থেকে একটা জলের বোতল বার করে জল খেল। আমি এবার বললাম, “আচ্ছা গত সপ্তায় তুমি আমার একটা জামা পরে গিয়েছিল না?” 

“হ্যাঁ, সরি তোমার অনুমতি নেওয়া হয়নি!   

“সে ঠিক আছে কিন্তু আজকে আমি জামাটা কাচতে গিয়ে দেখলাম সেটাকে লাল লাল ছোপ লেগে রয়েছে! কী করছিলে জামাটা পরে?” 

ঐশীর ভালোই নেশা হয়ে রয়েছে। সে ঘাড় কাৎ করে ভাবল তারপর খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, “কী করছিলাম, কী করছিলাম?” 

শেষমেশ বলল, “ও মনে পড়েছে! ওয়াইন গ্লাসটা উলটে রেড ওয়াইনটা জামায় পড়ে গিয়েছিল, ব্যস আর কিছু না। কুনালের সঙ্গে ছিলাম। ছেলেটা ভারি বোকা আর অসভ্য!” বলে হ্যা, হ্যা করে হাসল।

আমি চুপ করে রইলাম। এই অবস্থায় ওর সঙ্গে কথা বলাও বেকার! তবে এটা পরিষ্কার যে ঐশী কিছু একটা লোকাবার চেষ্টা করছে। তা লোকাক! আমার জামা পরে উলটো পালটা কিছু না করলেই হল!

আমি গম্ভীর স্বরে বললাম, “দেখো এর পর থেকে আমার জামাকাপড় আমার অনুমতি ছাড়া না নিলেই আমি খুশি হব!” 

ঠোঁট উল্টাল ঐশী তারপর জামাটা খুলতে শুরু করল! কী অসভ্য মেয়ে রে বাবা! আমি বিরক্ত হয়ে বাইরের ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

পরদিন সকালে ঐশীকে দেখতে পেলাম না, সেটাই স্বাভাবিক। মেয়েটা দিন দিন উচ্ছন্নে যাচ্ছে। এমনিতেও সে দুপুর বারোটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না! তবে যা সব করছে মনে হচ্ছে আগের রুমমেটগুলোর মতন একেও তাড়াতে হবে! 

কোন রকমে ল্যাব সেরে ডাঃ মিত্রর কাছে গিয়ে হাজির হলাম। আমাকে দেখে উনি বেশ খুশি হলেন মনে হল। এবার উনি নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন আমাকে। কোন কোন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন মনে হচ্ছিল। যাই হোক ওনার প্রশ্নের পালা শেষ হতে ওনাকে রজারের কথা বললাম আমি। উনি নানা রকম উপদেশ দিলেন। পৃথিবীতে ওটাই নাকি নিয়ম, সবাই ওই রকম করে ইত্যাদি অনেক কথা আমাকে বোঝালেন। আমি কিছুটা বুঝলাম আবার কিছুটা বুঝলামও না!

সেশান শেষ হতে যখন আর মিনিট পাঁচেক বাকি তখন উনি বললেন, “আরে তুমি আমাকে তোমার রুমমেটকে নিয়ে বলবে বলেছিলে, তাকে নিয়ে তো আর কথা হল না!”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, আর পাঁচ মিনিট বাকি আছে তাতে কিছুই হবে না, ঐশী যা জিনিস ওকে নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা গোটা সেশানও যথেষ্ট নয়!”

ডাঃ মিত্র মুচকি হাসলেন, “ঠিক আছে, তাহলে পরের বার!”









1 টি মন্তব্য: