
'মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান’। লিখেছিলেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore)। ভানুসিংহের ছদ্মনামে ‘মরণ’ কবিতায় মৃত্যুর অনুষঙ্গে ‘শ্যাম’ তথা প্রেমকে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কর্কশতাকে অনুভব করতে হয়েছিল তাঁকে। মৃত্যুর মাঝে অনন্তের প্রবাহকে খুঁজে ফিরলেও আপনজনদের হারানোর শোক যে তাঁকেও আকুল করেছিল, তা বোঝা যায় তাঁর 'জীবন স্মৃতি ' নামক গ্রন্থে। বাঙালিরা রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন বলতে ২৫ বৈশাখই বোঝেন। দেখতে গেলে '২৫ বৈশাখ' বঙ্গসংস্কৃতির অন্যতম এক 'আইকনিক ডে'তে পরিণত। কিন্তু বহির্বঙ্গ তথা বহির্ভারতের কাছে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ২৫ বৈশাখ নয়, ৭ মে। কেননা, ১৮৬১ সালের এই দিনেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই মহাপ্রতিভাধর সন্তানটি।তবুও আমরা বাঙালি হিসেবে জানি ২৫শে বৈশাখ মানেই রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন।। আজ সেই দিন। সেই বিশ্বকবির আজ ১৬২-তম জন্মবার্ষিকীতে অঙ্কুরীশা-র কবিতাজ্ঞলি। তাই আমরা অঙ্কুরীশা-য় কবিতার মধ্য দিয়ে কবিকে জানাই কবি প্রণাম।।
সূচীপাতা
অজিত বাইরী
মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
অমিত কাশ্যপ
সমাজ বসু
সুনীল মাজি
শুভঙ্কর দাস
শুভ্রাশ্রী মাইতি
ফটিক চৌধুরী
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
সাতকর্ণী ঘোষ
গোবিন্দ মোদক
অশোক রায়
সজল বন্দ্যোপাধ্যায়
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
দুরন্ত বিজলী
দীপক বেরা
সৌম্য ঘোষ
সুদীপ কুমার চক্রবর্তী
স্মৃতি শেখর মিত্র
স্বপন নাগ
হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়
জুলি লাহিড়ী
অমিত চক্রবর্তী
সজীব মোহাম্মদ আরিফ
সেক আব্দুল মোক্তার
পরমেশ্বর গাইন
মলয় সরকার
মলয় কুমার মাঝি
শ্রীমন্ত দাস
রুহুল আমিন মন্ডল
দীপা কর্মকার
মালা ঘোষ মিত্র
কৃতিকণা
অনিন্দিতা শাসমল
অর্ণব বশিষ্ঠ
বিমল মণ্ডল
প্রচ্ছদ - পিনাকী রায়( কণিষ্ক)
কবি প্রণাম।। কবিতাঞ্জলি।।
নিবেদিত কবিতা
অজিত বাইরী
তুমি যেন অফুরান আলোর উৎস
অন্ধকারকে রেখেছ আড়াল করে।
কোন্ দূর-দূরান্ত থেকে আলো ফেল রোজ
আমাদের এই আটপৌরে জীবনে।
চক্ষে দেখি না তো, তবু প্রতিদিন
তোমার উপস্থিতি টের পাই, যখন
চারপাশে বেনোজলের মতো ধেয়ে আসে বিপন্নতা;
যখন দুঃখ-শোকে ভারাক্রান্ত,মুহ্যমান;
তখনই তোমার মুখ জ্বলে ওঠে উজ্জ্বল বর্ণে।
বুঝতে পারি, তুমি সেই আলোর উৎস
যার সতত উদ্ভাস আছে, বিনাশ নেই।
পঁচিশে বৈশাখের গল্প
মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া
হাওয়ার বৃত্ত পাক খায় চারপাশে
স্থবিরের মত নির্বাক হয়ে দেখি
নীল গম্বুজ নীচু হয়ে হয়ে আসে
পালক-পাখির ডানায় ভেসেছে সে কি
পুরোনো ছবির মায়াময় ফ্লাশব্যাকে
কিশোরীর গান পাড়ার জলসা থেকে
সাদা-কালো কোন হারমোনিয়াম রিডে
রিবনের আলো রঙিন বেঁধেছে,পঁচিশের বৈশাখে
ভাঙা সাইকেলে রোজ যে ছদ্মবেশী
বাঁশিওলা ঘোরে গীতবিতানের পথে
অভ্যেস আছে তারও কিছু কম-বেশী
মেঘলা আকাশ হাওয়া-যাপনের সাথে
মেঘের গলায় কৌতুক জিজ্ঞাসা
দেখি দেখি আজ কেমন সাজালি ছবি
সোনাঝুরি আর অমলতাসের ফুলে
স্মিত ভেসে যায়,কোনখানে তোর কবি..
নিয়ে চল হাওয়া,অপাপ নীলের যত
চরাচর-ছোঁওয়া নম্র স্রোতের টানে
'সুখের মত ব্যথা' বেজে ওঠা প্রান
কিশোরীর গানে নুয়েছে যেখানে কবি-প্রনামের মত...
সমর্পণ
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
চাতাল ফাটা রোদের এই দিনটায়
তোমার জন্মদিন না হলেও
আমাকে তোমার কাছে আসতেই হয়
রোজ। বারবার।
পঁচিশের আ - দ্যাখলা প্রীতি উৎসব
জানি তুমিও চাও নি
ছায়া সুনিবিড় বৃক্ষতলে তোমার লেখা
আজও ফেলে শেষ জন্মদিনের দীর্ঘশ্বাস
বিশ্ব জোড়া লোভ, হিংসায়
নিভে যায় আলো
দীর্ণ সমাজে তাকিয়ে দেখো
তোমার 'ওরা '
আজও কাজ করে।
পঁচিশের দিনভর অনুরাগ,ভক্তি
তবু জানতে চায় না কেউ কে তুমি
বারবার প্রশ্ন হয়ে আসে
এই জীবন, মুহূর্তের অনুভব ...
কেন আজও
একবারও ফিরে কেউ দেখে না
কে আমি?
ফিরে যাই
তোমাকে খুঁজি,
খুঁজি ছোট আমি' র বেড়া ভেঙে
আবিশ্ব চরাচর।
আজও তবু
তোমাকে চেনা হলো না।
প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ
অমিত কাশ্যপ
শান্ত ঘুমের পর সতেজ লাগে যেমন অনুভূতিতে
সেজেগুজে দিন হাজির হয় শোভনসুন্দর দরজায়
দিনের মধ্যে এখন কোনো ব্যর্থতা নেই, চমৎকার
কোথাও যেন বেজে উঠল, 'নব আনন্দে জাগো'
রাস্তার এ মুখ থেকে অন্যমুখ এখন কেমন নির্মল
রোজ জাগাও, রোজ খোল, অসূয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা
'নির্মল জীবনে' কোথাও কি চোখে পড়ে
দ্রুত বাস্তবতা ঢুকে আসে প্রাত্যহিকতায়
আজ পঁচিশে বৈশাখ ভাবলে তা অন্যদিনের মতোই
তবু কোথায় একটা আশ্চর্য সুর ধ্বনিত হয়
' অমৃতপুষ্পগন্ধ বহে আজি এই শান্তিপবনে'
উষ্ণ বৈশাখে এই হোক আমাদের প্রার্থনা কবিগুরু
আরো একবার
সমাজ বসু
আরো একবার লন্ঠন সন্ধে নেমে আসুক আমাদের ঘরে,
দু বিনুনি হারমোনিয়াম গেয়ে উঠুক—
আমার বেলা যে যায় সাঁঝ-বেলাতে কিংবা...
এভাবেই আজ বড় কৃত্রিম সুরের পাথরে ঝরে পড়ুক
গীতবিতানের কিছু শিউলি ফুল। শিউলি ফুলের গন্ধে ভরে উঠুক
আমাদের ঘর, উঠোন আর সুরহীন দিনযাপন।
আপনি আরো একবার আসুন গানের মাস্টারমশাই।
র
সুনীল মাজি
ঈ বলতে যদি ঈশ্বরচন্দ্র আর র বলতে যদি রবীন্দ্রনাথ বোধ করো
তবে 'তিনি' বলতে আকাশের ওপিঠে এক গানের দেশে যাওয়ার 'ছাড়পত্র' পাবে তুমি।
আমাদের কাছে বেঁচে থাকাটা একটা শর্ত ছিল---ছিল ভালোবাসা টা একটা শেকল,বন্ধন।
ভালোবাসার আগে যে বর্ণপরিচয় দরকার তা আমাদের ছিল না কোনও কালেই।
ভালোবাসার আগে যে সুর ও শব্দের মালা বদল দরকার--- আমাদের জানাও ছিল না।
আমরা মাটির ঘ্রাণ নিতে নিতে পেট মানে খাদ্য বুঝেছি---বুকের পিপাসার গুরুত্ব দিইনি।
আমরা মায়ার জঞ্জালে বেঁধেছি কেবল---ভালোবেসে মুক্তি দিতে চাইনি কোনও স্বর।
অতঃপর তিনি এলেন। তিনি আসতেই আমাদের পুতুলগুলো চলে গেল।
অতঃপর তিনি এলেন। আমাদের ভেতর থেকে মানুষগুলো বেরিয়ে এল।
আমরা এতদিন শরীরের শূন্যতায় কেঁদেছি--- জীবনের পূর্ণতার কথা জানা ছিল না।
তিনি আসতেই আমাদের প্রাণের আনাচে কানাচে যত ছিল রত্নাকর ভয়---সবাই গেল।
আমরা বহ্নিশিখা ত্যাগ করে আলো জ্বালাতে শিখলুম--- আলো বদল করার অভ্যেস হল আমাদের।
আমরা কেউ আর বৈদ্য কায়স্থ ব্রাহ্ম বৈষ্ণব হিন্দু মুসলমান থাকলাম না।
আমরা পরস্পর হাত ধরতে শিখলুম---হাত ধরে হাঁটতে শিখলুম গান গাইতে শিখলুম।
জন্মের কান্না থেকে মৃত্যুর কান্নার সেতু ভেঙে আমরা খুব গান গাইতে গাইতে পলাশ ফুলের মালা...
পৌষ আমাদের পিঠেপুলি ছিল--- গান মেলা ছিল না।
বৈশাখ আমাদের দাউ দাউ ছিল--- দহন ছিল--- সঙ্গীত বাসর ছিল না।
সীতা দময়ন্তি রাধা থেকে ভিন্ন এক গানের সুরের মতো নন্দিনী এল লাবণ্যের ভোর,
তখন আমরা পাগল পাগল বিশু--- পড়শির মুখেই দেখি আলোর উৎসব।
আমাদের হারানো প্রেম স্বর্গ হয়ে গেল।
আমাদের সব অতীত বর্তমান হয়ে গেল ।
সেই এক নতুন বাংলা ক্যালেণ্ডারে রবীন্দ্রজার্নি শুরু।
গণেশের বদলে এলেন তিনি---আগে দৌড় ছিল, পরিক্রমা ছিল না,
তখন আমরা পুতুল পারাপার করেছি গৌর নিতাই রাধে রাধে বলেছি,
নিজেদের পরিক্রমা করিনি।
আহা, তিনি এলেন--- সব নদী ঋতু পেল--- সব ঋতু কণ্ঠ পেল।
ভাঙা কণ্ঠে তুমি বলতেই পারো রবীন্দ্রনাথ নেই,
কিন্তু তিনি আছেন।
এই গাছপালা ছেড়ে পাখির ডাক ছেড়ে হয়তো বধির তুমি,
নদীর কাছে মেঘের গুনগুন গান যদি না শুনতে পাও,
তবে প্রতিদিনই তুমি কোলাহল নগর যুদ্ধের আগুন...
তোমার শরীরে তাই আর রবিরশ্মির স্পর্শ নেই।
তোমার হয়তো কোনও মধ্যরাতে বাঁশির ডাক শুনতে ইচ্ছে করবে না।
গড় গড় দিনগুলো পাথরের মতো গড়িয়ে যাচ্ছে আর তুমি উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে আছ ।
বিকেল গড়িয়ে রাত নামছে অথচ কোনও ট্রেন আসছে না।
কোনও অদৃশ্য কারণে যেন ট্রেনগুলো ক্যানসেলড,
তুমি ভাবছ তবে কি আগের কোনও স্টেশনে অবরোধ হয়েছে দাঙ্গার প্রতিবাদে ?
দাঙ্গা যে আছে প্রতিবাদ যে আছে ধর্ষণ যে আছে চুরি ডাকাতি যে আছে, তুমি জানো।
রিলস এন্ড স্টোরি তে ভালো ভালো পরিবারের মেয়েরা শরীর দেখিয়ে লাখ কোটি কামাচ্ছে।
মেয়েমানুষেরা জেনে গেছে কেমন করে বস্তা বস্তা বস্তু হতে হয়।
উচ্চবিত্ত রূপসী জানে, কোনখানটা ঢাকতে হয় কোনখানটা খোলা রাখতে হয়
কেমন করে বাথরুমে স্নান করতে হয় টাওয়েল ছাড়া তারা জানে
ফ্রিস ফ্রাই খেতে খেতে কেমন করে স্থলে বসে সাগরে রমণ করতে হয় জানে
তুমি বুক বলতে স্তন বোঝ বলেই বোধ হয়--- রবীন্দ্রনাথকে চেনা হবে না কোনও দিন।
মিহি কণ্ঠে তুমি বলতেই পারো পাথর বাজছে না তাই পাথরের গভীরে জল নেই।
তুমি তর্কের খাতিরে যদি বলো : যে মানুষ বাজে না সে মৃত।
আমিও বলতে পারি যে মানুষ কোনও স্বপ্ন দেখে না সে মৃত।
ধরো, গড় গড় করে ট্রেনটা চলে গেল যার কোনও নেমপ্লেট নেই।
তুমি একে মাল বলছ--- মানুষটিকে মাল বলছ--- অন্ন ব্যঞ্জন থেকে ভোগের সব সামগ্রীই মাল...
তুমি নিজেকে বিক্রি করতে খবরের কাগজের পাতা উল্টে যাচ্ছ।
যার সঙ্গে রোদের সম্পর্ক নেই সঙ্গীতের সম্পর্ক নেই ভিসা পাসপোর্টের সম্পর্ক নেই ?
আছে আছে--- শূন্যতা আছে।
এখানে এই বিরহের ভেতরে ভীষণ এক আকাশ--- তৃষ্ণার খোঁজে রবীন্দ্রনাথ চাও যদি,
তবে আমি খুব শব্দের কোলাহল থেকে তোমাকে বেরিয়ে আসতে দেখছি :
শোনো, রবীন্দ্রনাথ যেখানে বেঁচেছিলেন তার নাম কলতান---মহা ঋষির মন্ত্র,বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ যেখানে মরেছিলেন তার নাম কোলাহল--- বাজার, পাথর মুদ্রার নগরী।
বৈশাখ
শুভঙ্কর দাস
এখানে মেঘ অপেক্ষা করে যক্ষের জন্য, এখানে নদী অপেক্ষা করে ঈশ্বরী পাটনীর জন্য, এখানে চাঁদ অপেক্ষা করে সুকান্তের জন্য...
কাঁচাবাশের বেড়াটি ধরে রামপ্রসাদ অপেক্ষা করেন,তাঁর মেয়ের জন্য...
তেমনি বৈশাখ সারাবছর অপেক্ষা করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠার জন্য...
সেকথা প্রতিটি দিন আর প্রতিটি রাত জানে বলেই এতো দুঃখ পারানি হল গান,এতো মৃত্যু হল ফিরে আসাতে অফুরান...
তবু মনে রেখো...শুভ্রাশ্রী মাইতি
না, সেই আগুনে খাওয়া গোপন চিঠিখানি কেউ তুলে দেয়নি
তাকে হাতে ধরে...তবু, সে জানে, পোড়া ছাইয়ের ভেতর
লুকিয়ে থাকা দহন ব্যথা আর শুকিয়ে ওঠা চোখের জলের হিসেব...
ঐ তো কালো কালো অক্ষরের জানালা, হাট করে খোলা সবসময়,
আর কেউ জানুক না জানুক, সে তো জানে, এসব শুধু
অঝোর বৃষ্টি আর মেঘলা অভিমানের...আর জানে, ছাদের নয়নমনোহর নন্দনকানন
কতকাল যেন ঘুমিয়ে আছে ফুলগুলো আফিমের নেশায় ঝিমিয়ে
কাঁকন পরা শ্যামলী হাতে কেউ করেনি আদর, কতদিন, ভালোবেসে
গোধূলির খুরে খুরে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে, দ্যাখো, রাঙা রোদের ফরাস
রূপোর পেয়ালায় খটখটে শরবতী ফেরেস্তা, ফুরফুরে, ফিরোজা মেঘের...
নদীর ঘাট থেকে ভেজা পায়ে উঠে আসা
হু হু হাওয়ার দিকে মুখ করে বসেছেন রবি কবি
প্রতিটি অশ্রুত শব্দকে চিঠি, আর প্রতিটি চিঠিকে কবিতা
করে তুলবেন হৃদয়ের খোলা খাতায় চোখের জলে...
সাদা জোছনাপাতার ওপর রাতের রেশমের মতো উড়ে উড়ে যাচ্ছে
শলমা-জরির ঢাকাই আঁচল...তারাফুল...এক, দুই, তিন, জন্মজন্মান্তরের
বেহালার করুণ আবহে তৈরী হচ্ছে আশ্চর্য দৈবী গান এক----
‘যদি পড়িয়া মনে,ছলোছলো জল নাহি দেখা দেয় নয়নকোণে
তবু মনে রেখো'...
একটি কুঠারের গল্পফটিক চৌধুরী
সেই কাঠুরিয়ার গল্প
যার কুঠার নদীতে হারিয়ে গিয়েছিল
যেটা সত্যিই সোনার ছিল না
সততার প্রতীক হিসেবে সে পায়
রূপো ও সোনার কুঠার
আমাদের অতীতের দিনগুলো তো
রুপো আর সোনা দিয়েই মোড়া।
অতীত নিয়েই তো বেঁচে থাকি
'জল পড়ে পাতা নড়ে'র দিনগুলো
আমাদের সহজপাঠ
আমাদের সঞ্চয়িতা, গীতবিতান
কিংবা গীতাঞ্জলি
আর তীব্র দাবদাহেও পঁচিশে বৈশাখ
আমাদের একান্ত আপনার।
আমাদের শান্তিনিকেতন সব হতে আপন।
দুঃখবোধে যন্ত্রণায় প্রেমে অপ্রেমে
তাঁকেই তো স্মরণ করি।
আমাদের জীবন সেই কাঠুরিয়ার গল্প
রবীন্দ্রসায়র থেকে যেসব তুলে আনি
সেসবই সোনার কুঠার।
রবীন্দ্রনাথ ও আমি
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
মানচিত্রে চোখ যায় যখন, তখন একটা নদীর
ওপর অপার বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকি
সেই নদীর দিকে তাকালে এসে দাঁড়ায়
শিলাইদহ, ও আধখানা চাঁদের মতন
ছায়াঘন ভূমিখন্ড ও গড়াই নদী....
যেন একটা প্রকাণ্ড গাছের ডাল থেকে
শাখা ডালের জন্ম...
আর অসম্ভাবিত ভাবে আসো তুমি
আমাদের রবীন্দ্রনাথ
যখন তিনতলা কুটিবাড়ির ছবি দেখি
ভাবি ঐ তে তুমি ইজিচেয়ারে,বৈঠকখানায়
সামনে তোমার খাতা আর কলম
পদ্মার দুরন্ত স্রোতের মতন নেমে
আাসছে খাতার ওপর কবিতা আর কবিতা
গান আর গান বা গল্প আর গল্প...
বা তুমি চন্দ্রোলোকে ভেসে যাচ্ছ
প্রিয় বজরায় ঐ নদীও ওপর
এক অসীম আনন্দে...
আর তোমার দৃষ্টি যেন এক শূন্যের দিকে
তখন মনে হয় তুমি, রবী ঠাকুর এখনও
আছো আমার একান্ত অনুভবে...
পায়ের শব্দ শুনি
সাতকর্ণী ঘোষ
আর সব দিনগুলি বুঝি তোমার থাকবে, জন্মান্তর
সবুজঢাকা মাঠ, টলটলে জল ভরা পুকুর, পদ্মফুল
মাথার উপরে মেঘদূত, কথা চালাচালি কথা
পায়ের নীচে বুকঠোকা মাটি, হাটখোলা মন
তবুও শব্দ কাটাকাটি এ-জন্ম খেলা।
আর সব ফিরে যাওয়া রাতগুলিও তোমার থাকবে
করবীফুলের গন্ধে ভ'রে যাবে সমস্ত শয্যাঘর
চাঁদের উঁকিমুখ জানালার পাশে খুশি দাঁড়াবে
টা-টা জানিয়ে দিয়ে বেশ সময় খেলবে লুকোচুরি।
' সার্থক জনম আমার ' তুমি বলবে এ- মাটিকে আর পায়ে পায়ে যে সময়, রক্তে আলপনা দিচ্ছে যারা,
তারা গোলা-বারুদে ভরে তুলেছে তোমার মাটি,
রক্তকরবী মাটিতে তোমার খেয়া তরতর চলেছে ছুটে
অজস্র সোনার ভারে মহাকাল আসছে আর যাচ্ছে...
তখনও কী তুমি গাইব...
' যখন পড়বে না মোর
পায়ের চিহ্ন এই বাটে...।'
সবার তুমি রবিঠাকুর
গোবিন্দ মোদক
চারদিকেই দাবদাহ আর ঝলসানো প্রকৃতি
মনের মধ্যে তবু জাগে তাঁরই মধুর স্মৃতি।
তিনি আছেন ঋতু জুড়ে আছেন সবার বুকে
তাঁর কবিতায় মনটা জাগে দুখে কিংবা সুখে।
তিনি আছেন কুমোরপাড়ায় আছেন সহজপাঠে
তিনি আছেন পদ্মা নদীর ছোট্ট স্নানের ঘাটে।
তিনি আছেন জোড়াসাঁকোয় কিংবা শিলাইদহ
তিনি থাকেন সবার মনে — সদাই অহরহ।
তিনি থাকেন সব ভাবনায় সব চিন্তার মাঝে
তিনি থাকেন সকাল-বিকাল রাত্রি কিংবা সাঁঝে।
তিনি থাকেন দুঃখ-তাপে থাকেন আঁধার দিনে
তিনি থাকেন কাব্য জুড়ে থাকেন গানের বীণে।
তাঁর লেখাতে ছোট্ট নদী আজও বয়ে যায়
তাঁর কলমে আজও অমল ডাকে দইওয়ালায়।
তিনি আছেন বুকের মাঝে সমস্ত দিন-রাত
তিনি সবার রবি-ঠাকুর আমার রবীন্দ্রনাথ।।
ঠাকুর কবির দেশে
অশোক রায়
লিখনের জোয়ারে অপার বিশ্ব হয়েছিল বান ভাসি
বঙ্গ ভাষা জগৎ সভায় পেল শ্রেষ্ঠতর আসন
সেই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ হাত ধরে চলতে শেখালেন শুধু নয়, উৎকর্ষের চরম শিখরে পৌঁছে দিলেন
যেথা অবিরত প্রেমধারা রসপূর্ণ অমৃত কলস নোবেল
তুমি দেবতা তাইতো ১৬১ বছর পরেও আছ অম্লান
কাব্য গদ্য গল্প উপন্যাসে অথবা
অসংখ্য গানের গভীরে বয়ে চলেছ অবিরাম
১৬১ তম পর্বত গুহায় তপস্যারত ঋষি
জনমন অরণ্যে তুমি আজো মহিরুহ মহান
হে সাহিত্য সাধক স্বর্গ থেকে স্বপ্ন এনে
পরিয়ে দিয়েছ মর্ত্য মানব-চোখে
সৃষ্টির নাগপাশে আচ্ছন্ন রেখেছ বাঙালিকে আজও
তোমার গান হাজার লক্ষ মণিমুক্তো
ছড়ায় এখনও অনির্বচনীয় কথা ও সুরে
বহুযুগের ওপার হতে রোজ প্রভাতে রবির উদয়
আজো ধ্রুবতারার মত সত্য
হৃদয়ের মনিকোঠায় যেমন লেখনী বিচ্ছুরিত
শুধু মনে একটুকু জিজ্ঞাসা - এত কিছু পাবার পরেও
বাঙালি কেন মানুষ হল না!
কোথায় খুঁজি!
সজল বন্দ্যোপাধ্যায়
অনেকটা পথ পেরিয়ে এলাম
আর কিছুকাল বাকি
কোথায় তোমায় খুঁজবো ঠাকুর
সত্যি দিলে ফাঁকি !
গল্প গানে আর কবিতায়
খুঁজছি তোমায় কতো
কোথায় গেলে মিলবে খবর
করবো প্রণাম শত!
জানিনা তো কোন সে সুদূর
কোন সে দেশে বাস
সেখানে মেঘ বৃষ্টি ঝরায়
কিংবা সর্বনাশ!
জানিনা তো জীবনবোধ
শিখিনি তো কিছু
মানুষ হয়েই থেকে গেলাম
ভোগের পিছু পিছু!
তাইতো তোমায় খুঁজে বেড়াই
বুকের চারপাশে
রবি ঠাকুর ফিরে এসো
আমার সকল শ্বাসে।
.
রবি বন্দনা
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
নির্জন। ঘরে হালকা আলো। ধূপ জ্বলছে। মাঝখানে ঠাকুরদার নকশাকাটা চেয়ার।
উজ্জ্বল বসে আছো উদার।কৌতূহল জাগা চোখ,অথবা কৌতুক।ধ্যানে আছি।মিথ্যে বলা নয়,
তুমিই উপাস্য। প্রতিদিনের সংলাপমুক্ত হয়ে আজ তুমি ঘরের ঠাকুর।তোমার প্রবাদী নির্মাণের
ভাববিস্তারের ছলে কতদিন তোমাকে খুঁজেছি। হয়তো নাগালে ছিলে ক্ষণস্থায়ী,তারপর
সকৌতুক দূরত্বে আড়াল তুলেছো।বছরে দুটো দিন শুধু তুমি ও তোমার।নির্বিকল্প।
হালকা আলো চন্দনগন্ধ বেলকুঁড়িমালায় তুমি অনন্যসুন্দর।
তোমাকে কতটুকু জানি? প্রশ্ন আসে, নিজেকে নিজেই তুমি কতটা জেনেছো?
বিশ্বাস নেই।সেই ১৪০০ সালে লিখেছিলুম তোমার ভুল হিসেবের কথা,১৪২৯ যায় তুমি আরো
আলোময়।ঝুল- মরচের গল্প নেই তুমি জেগে আছো জীবনে,মননে।অমরত্ব।
তুমি জেগে থাকো যত ভাব ও ভাবনায় ধ্যানে গরিমায় চিরন্তন রবি ঠাকুর।
অবহেলায়
দুরন্ত বিজলী
অবহেলায় বসে আছি
আনত মুখ
সারাশরীরে ও মনে
দুঃখ অসুখ
অন্ধকার বড্ড বেশি
তাড়া করছে
দুর্বার নায়েগ্ৰা প্রপাত
হৃদয় ঝরছে
প্রকৃতি পরিবেশ সব যেন
আমার নয়
তাহলে কি মৃত্যু মহানাদ
অশনিময়
ডাকছে বারংবার ডাকছে
শেষ সীমান্তে
এখন হে রবিঠাকুর
এই একান্তে
আকুল হয়ে গুনগুন গুঞ্জনে
তোমায় গাইছি
মৃত্যুর থেকে পরিত্রাণ পেতে
ভিজতে চাইছি।
শান্তির কর্মযজ্ঞে রবিরশ্মিদীপক বেরা
পঁচিশে বৈশাখের ব্রাহ্মমুহূর্তের সন্ধিক্ষণে
তোমার সৃষ্টির পথ চেয়ে, তোমারই গান গেয়ে
তোমাকেই যেন চির নতুন করে পাওয়া!
জীবনের অন্ধকারে, সমস্ত বেদনা-গ্লানিতে
কী এক আশ্চর্য বিশ্বাসে তোমার স্পর্শ এসে লাগে।
তুমি বাঙালির প্রতিদিনের ভোরের উদয়রবি
জীবন পরিক্রমার শেষে গোধূলির অস্তরাগ
আলো আর অন্ধকার, চৈতন্য ও অচেতনার সঙ্গম।
আমাদের জীবনচর্যার গভীরে
রবীন্দ্রবীক্ষারই উজ্জ্বল আদর্শ ও দর্শন,
যা দৃঢ়তর সাহসী প্রত্যয়ে প্রসারিত হয়েছে
দেশের সার্বভৌমত্বের সামূহিক দুঃসময়ে;
বহুর মধ্যে একের সাধনায় সংরক্ত করেছে বারবার।
এই কালবেলায় তোমার প্রাণদায়ী রবিরশ্মি আজ
সারা পৃথিবীব্যাপী শান্তির কর্মযজ্ঞের শ্রেষ্ঠ সমিধ।
একান্তে
সৌম্য ঘোষ
একলা দুপুরে মনটা গুমরে উঠল
বসলুম গিয়ে পুকুরপাড়ে লেবুতলায়,
কাকপক্ষীও নেই
দুপুর রোদে ঝিমুচ্ছে ক্লান্ত তাল-সুপারির সারি
জলের ছায়া আয়নার মত স্বচ্ছ
আশেপাশে ছড়িয়ে কত শুকনো পাতা,
গাছের পাতা নড়ে না ।
দূরে বাঁধা গরু ডেকে ওঠে তেষ্টায়,
চোখের পাতা ভিজে আসে জলে
একটা ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল গালে
সামনে ভেসে ওঠে একের পর এক সব ছবি
ফেলে আসা শৈশব - কৈশোর,
মাথার ওপর দুপুর-রবি
আর আমার রবীন্দ্রনাথ ।
বৈশাখী ভাষা
সুদীপ কুমার চক্রবর্তী
বৈশাখের ভাষা বেশ রপ্ত হয়ে গিয়েছিল
রবীন্দ্র তপ্ত নিদাঘে।
খোঁপায় মালা জড়িয়ে সে আসতো
আরও রাবীন্দ্রিক হয়ে পূজারিনীর সাজে।
মায়াবন বিহারিণী হরিণীর চোখে ডাকতো ইশারায় -
আলোকের ঝর্ণাধারায়।
আগুনের পরশমণি ছুঁয়ে যেত হৃদয়।
তারপর ধরা দিত কি চমৎকার নাচের মুদ্রায়।
দরাজ গলায় একটার পর একটা আবৃত্তি শোনা যেত -
সোনার তরী - নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ - আফ্রিকা - হঠাৎ দেখা।
এখন সে সব জীবন স্মৃতি - স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকা।
এই কালবেলায় এখন কালবৈশাখী
উড়ে আসে তপ্ত নিঃশ্বাসে। তারপর -
গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষায়।
নিরুত্তাপ সেই দিনগুলো এখন ফিরে আসে
হাস্যকর অগভীর পর্যালোচনায়।
কবির প্রথম প্রেম
স্মৃতি শেখর মিত্র
হে কবি! তোমার প্রেমের পরশে অনেক রমণীই
ধন্য হয়েছে। "আমারে কে নিবি ভাই সঁপিতে চাই
আপনারে।" এই গানে যদিও তোমার জীবন
দেবতার উদ্দেশ্যে প্রেম নিবেদন করেছো ।
তবু তোমার সাহচর্য, তোমার প্রেমের আশায়
অনেক রমণী এসেছে বার বার তোমার সান্নিধ্যে।
তারা নিজেরাই তোমার কাছে নিজেদের সঁপেছে
বারে বারে।যে মেয়েটির কোলের উপর মাথা রেখে তুমি চুপটি করে শুয়ে থেকেছো বহুবার,
যে তোমার কোঁকড়ানো চুলে বিলি কেটে দিত
সে আর কেউ নয় তণ্বী ষোড়শী 'নলিনী' মারাঠি
বালিকা যার নলিনী নামটিও তোমারই দেওয়া
ভালবেসে।হে কবি! তুমি যতটা না তাকে ভালবেসেছিলে সে তার শতগুণ ভালবাসা
তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। জানিনা নলিনী
তোমার জীবনে ভালবাসার প্রথম রমণী কি না?
সেটা তুমি কবি একমাত্র বলতে পারো। তবে
গবেষণালব্ধ তথ্য ও আলোচনায় উঠে আসে
সেই মারাঠি বালিকাই তোমার জীবনের প্রথম
প্রেম। যে তোমাকে অকুণ্ঠ ভালবাসা দিয়ে সিংহাসনে বসিয়েছিল "হৃদয়ের রাজা" করে
তোমার প্রথম যৌবনে। তাই তুমি লিখেছো।
শুন নলিনী, খোল গো আঁখি
ঘুম এখনো ভাঙ্গিল না কি !
দেখ তোমারি দুয়ার - 'পরে
সখি এসেছে তোমারি রবি।
শেষের কবিতা
স্বপন কুমার নাগ
একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প...
পাহাড় থেকে ঝরনা হয়ে নেমে আসে মাটিতে
রঙমাখা আধুনিকতায় আস্কারা খোঁজে,প্রেম
প্রেম হয় অন্তর্মুখী,সুপ্তমনের নিকোনো দাওয়ায়।
পৌরুষে দাম্ভিক জীবন,চতুর্ভুজ-রসায়নে সিক্ত হয়,
অনুসারী আবেগের বর্ণিলছটায়...
বিরহ-বিচ্ছেদের গভীর দহনে থমকে দাঁড়ায়,সময়
কল্পনার রেখাচিত্রে,অধোমুখ বাস্তবের নিবিড় ছায়া-
দাগ রেখে যায়,আক্ষেপের জড়ানো শিকলে।
সম্মোহিত অভিমান,একলা কাঁদে,নীরবে...
ভাবনার গতিপথ বাঁক নেয়,আভিজাত্যের পুরুষাকারে....
মনের কোণে,ক্লান্তগোধূলির বাসা...
আত্মিকবন্ধনে ভালোবাসা খোঁজে,পরশপাথর;
হৃদয় খুঁড়ে চলে নিথরপলি,নিরুদক স্বপ্নের সন্ধানে।
ব্যক্তি-স্বাধীনতা এক হয়ে বাঁধা পড়ে,দ্বৈতসত্ত্বায়;
সময়ের কাছে ঋণ জমে,নতমস্তকে...
সুরের নামাবলি গায়ে,প্রেয়সী বিছিয়ে দেয়
মোহের আঁচল,হৃদয়ের আনাচে-কানাচে...
পরশ প্রাণে দিও
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
প্রখর দহন দিনে বৃষ্টি এলো। ছুটে বেরিয়ে গিয়ে মাখলাম তার কোমল পরশ। সারা শরীর জুড়ে তার আদর আবেশ। বৃষ্টিও কি তাই চাইছিল? এতোদিন পর ,এতো চাওয়ার পর এলে তার সম্ভাষণ তো অন্য রকম হতেই হয় ! বৃষ্টির কি দোষ তাতে !মন জুড়ে তখন " পুরানো সেই দিনের কথা......"!
সেদিন এরকম হঠাৎ বৃষ্টিতে তুমি পরম পাওয়া হয়ে আমায় ভিজিয়েছিলে।ছোট ছাতাটাও দুষ্টুমি করছিল ! এক ছাতার নীচে দুটো দেহ কখন এক হয়ে গেছিল খেয়ালই ছিল না। হঠাৎ গাড়ির আওয়াজে লজ্জা নেমে এলো তোমার মুখে।সরে গিয়ে সেই দুষ্টু চাউনিতে ! ভাবছিলাম , মাঝে মাঝে অন্ধকার বড়ো ভালো !
ফিরতে না চাওয়া দুজনকে এক সময় ফেরার সিদ্ধান্ত নিতেই হলো। সারা রাত তো এভাবে বৃষ্টির টুংটাং এর সাথে আদরভেজা হওয়া যাবে না ! হঠাৎ সামনে রিক্সা পেয়ে উঠে পড়লাম দুজনে। পর্দা ঘেরা রিক্সায় তখন বুকের ভেতর বৃষ্টি।কোন বৃষ্টি বেশি মাতাল ছিল সেদিন ? ভেজা জলের ওপর দিয়ে রিক্সার চাকার গতিকে মন যেন বারে বারে বলে উঠছিল,এই পথ যদি না শেষ হয়....!
কতোক্ষন একে অপরের হাত ধরে ছিলাম খেয়াল নেই। ভালোবাসার চলমান আবেশী অনুভব শুধু। শক্ত হাতে ধরে থাকা তুমি বড়ো বাঙ্ময় তখন ! আমারও তো মনের অলিগলিতে হাজার ঝাড়বাতির আখ্যান যেন। হঠাৎ গান ধরলে তুমি" ঝরঝর মুখর বাদর দিনে..."! চমকে উঠলাম। পথের দুপাশের চলমান আলোয় তোমার মুখে এক আলোর জ্যোতি যেন। সেখানে দেখতে পেলাম সেই দাড়িওলা মানুষটা একা হেঁটে চলেছেন বৃষ্টি সঙ্গী করে লাল মাটির পথ ধরে।
আমার রবীন্দ্রনাথ
হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়
আমাকে শুদ্ধ করে দাও,আমাকেঋদ্ধ করে দাও
আমাকে মুগ্ধ করে দাও হে ঈশ্বর
আলো পেয়ে বৃক্ষ লতা পেয়ে ফের অকস্মাৎ
স্মৃতির অতল থেকে হে সুদূর সায়াহ্নের দিকে
নিয়ে যাও ,কী করব যদি এখনো ডেকে নিয়ে যায় পাখি ,যাযাবর হেমকান্তি
আমার জীবন যায় হে সান্দ্র বিমূঢ়তা
আমি আর দৌড়াবো কার পিছনে
আমি কার চোখে দেখবো
বিনোদিনীর অধরা যৌবন ,তোমার আরোগ্য ছিল বহুমুখী আম্রকুঞ্জে বিচিত্র বোগেনভিলিয়ার লালে,কি যেন ছিল আজ আর নেই
মহর্ষির প্রাণের আরাম আত্মার শান্তি
তুলসী মঞ্চে জমে থাকা জলে...
আজ নি:শ্বাস বন্ধ করে বলি
প্রণয়ে পতিত হ ওয়া ভালো ,আর ওদিকে
জড়িয়ে ধরার মতো আলো
যদি থাকে গানে গানে ...এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ
কিংবা ...চৈত্র পবনে মম চিত্ত বনে...
আর ঐ মালঞ্চে দুই বোন ঘরে বাইরে
সোনার হরিণ চাও বলেই ছাড়া পায় ফিরে আসে
তখন পাত্র মধ্যে চন্দ্র সূর্য
অগ্নি বায়ু জল ও জলজদাম
আজও কান পাতলে শোনা যায় সারেগামাপার অনন্ত ধ্বনি, রাগে বলছে ...মোর লাগি করিও না শোক... আর ওদিকে শেষের কবিতার অমিত
সন্ধে থেকে তৈরী আছে ব্রীজের তলায়
তুমি তাকে নিয়ে যাবে ভুবনডাঙ্গায়...
চিত্রা চৈতালির কাছে
সেই প্রথম জন্মদিনে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে
হাততালি আর হরকায়
তখন বোলপুরে ঘুমন্ত জি আর পি
ঘটন অঘটন ছোটবেলার গানের কলি স অ ব...
আর ঠিক সেসময় প্রান্তিক স্টেশনে
নেমে এলো যারা তাদের মধ্যে দুদলের নারায়নী সেনা লাল গেঞ্জি ঝাকড়া চুল
অবশ্য বীরপুরুষ নয় কেউ
মুখে চাপ দাড়ি গালে কাটা দাগ ,আফ্রিকা...
দিয়ে গেছে কিছু দেনা
চেনবানানের ভুলের মতো যে আলো গিয়েছে নিভে মুখে তার অপমান ক্ষত...
এরপরেও যদি বলি আমাকে শুদ্ধ করে দাও
আমাকে ঋদ্ধ করে দাও
আমাকে মুগ্ধ করে দাও
রবীঠাকুর হে মানুষ বাড়িতে এলে যেন বলে যেতে পারে ঝুঁকে আছে মহাকাল
সারি সারি সূর্যের দেশ
শত শত অভিমুখ তার...
কুঞ্জবন
জুলি লাহিড়ী
শুকিয়ে গেছে কুঞ্জবন, ফোটেনা গোলাপ ফুল
মরা ঘাস হাওয়ায় দোলে, ওড়ে না এলো চুল।
কাদম্বরী-রবির ছোঁয়ায় বাগান পেতো প্রাণ
ভ্রমর এসে শুনিয়ে যেত ভালোবাসার গান।
গভীর রাতের পরী নামে, বাতাস বয়ে যায়
এক আঁচলা স্মৃতি কুড়িয়ে উধাও হয়ে যায়।
বৌঠান আর রবির কোলে আঁচল দেয় মেলে
ছুঁয়ে থাকে দুজনাতে গেছে যে সুখ ফেলে।
যাহা পেয়ে আপনার দৈন্য আর মনে নাহি পড়ে
অমিত চক্রবর্তী
এই সেই আমলকিতলা, যেখানে একদিন
বালকের বেশে আমি, রাজছত্র খুলে,
গমগমে অধিষ্ঠান –
আজ আবারও হাজির, পরাজিত যোদ্ধা,
অচল প্রাণ, সাষ্টাঙ্গে শুয়ে বন্দনা।
শীত আসবে কাল,
গাছটি জানে না, নিশ্চিন্ত হয়তো,
হয়তো ভেতরে একটা মৃদু কম্পন, সম্ভাবনা,
যে কম্পন তোমার ছবি দেখলে, যে কম্পন
ক্লাস পড়ানোর আগে, সেই সুশান্ত কাঁপ, জ্বরতপ্ত নয়।
এখনও জানে না গাছ, যুদ্ধের প্ল্যান
পাল্টে ফেলেছে শীত,
কালই চলে আসছে ঝটিকা আক্রমণে।
কাল তার পরাজয় হবে?
হয়তো বা।
আজ কিন্তু দু’টি ঘূর্ণি পাতা
নেমে আসতে থাকে নাচতে নাচতে – আহা সেই
আগ্রহ, ভেঙে পড়া মানুষটির জন্য দান,
মাটিতে শয়ান আমি
এত দয়া পাইনে কোথাও…
নোবেল হাসি
সজীব মোহাম্মদ আরিফ
চৈত্রের দাবদাহে পুড়ছিলো সাহিত্যাকাশ
জ্বলছিলো প্রতিটি সাহিত্যপ্রাণ অন্তর
নিরস খরায় বড় শুস্ক রুঢ় হয়ে পড়েছিলো
বঙ্গভাষা
বৈশাখী ঝড়ের মতো পঁচিশে বৈশেখে জন্ম নিল একটা তীব্র ঘুর্ণিঝড়
এলোমেলো করে দিল প্রতিটি অঞ্চল
গান কবিতা গল্প প্রবন্ধ উপন্যাস নাটক
পাল্টে গেল বাংলার ইতিহাস
বাংলা ভাষার ইতিহাস
অন্ধকার পেরিয়ে বাংলায় হাসলো নোবেল
হাসি
সমৃদ্ধ হলো গোটা অঞ্চল
একটা বটবৃক্ষ আগলে যেমন জন্ম নেয়
ছোট বড় অনেক গাছ
ঠিক তেমনি তারই বদৌলতে পক্ষে বিপক্ষে জন্ম নিলো বেশ অনেকগুলো সহ বৃক্ষ
পরিপূর্ণ বিকাশে বিকশিত হলো বাংলা সাহিত্য
রবি ঠাকুর তুমি শুধু কবি নয় তুমি নিজেই মহাকাব্য
তুমি শুধু গল্প নয় একটা পূর্ণ উপন্যাস তুমি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস।।
রবীন্দ্রনাথ
সেক আব্দুল মোক্তার
খোলো দুয়ার খোলো কপাট বলল একটি ছোট্ট আলো
সেই আলোটাই তেজ বাড়িয়ে বিশ্ব কেমন চমকালো !
দরজা গোড়ায় যে বসে রয় একলা পানে মুখটি চেয়ে
'ডাক শুনে তোর না আসে কেউ' বলল সে চল একলা ধেয়ে।
'ভূতের মতন চেহারাতে' কে দিল বল্ সবুজ প্রাণ
সূর্য থেকে ছিটকে আসা ওই আলোরই টুকরা খান!
'উপেনের মুখ' আজও সেই দুখ কে দেখাল কলম টানি
গীতাঞ্জলি বিশ্ব মাতায় সে যে মর্তের দিনমণি।
যুগ যুগান্তে তোমার 'প্রশ্নে' প্রাসঙ্গিক সে কথাগুলো
রাঙামাটির পথ চেয়ে আজ পিচ রাস্তাতেও মাখে ধুলো।
'জন্মান্তরে' নববঙ্গের চালকে কার অভিমান
তারই প্রবল আলো আবার ঘটায় 'সবুজ অভিযান'।
'ওরা আজও দাঁড় টানে বীজ বোনে ধান কাটে দেশ দেশান্তরে'
'আষাঢ় গগনে' কে বলে 'তোরা যাসনে ঘরের বাইরে' !
এসব কথার কমেনি ধার যুগের পরও যুগ বেয়ে
ঘাঁটছি পুঁথি নাড়ছি কেতাব হৃদনয়নে বিস্ময়ে !
চমকে দেখি কাব্য গীতে রং তুলি আর উপন্যাসে
নাটক গল্পে খোশমেজাজে সেই আলোতে পাথর হাসে।
কোন্ সে আলো বলছে হেসে সাহিত্য তুমি নও অনাথ
পুব আকাশে দ্যাখ না চেয়ে দাঁড়িয়ে ওই রবীন্দ্রনাথ।
সে দিনের পরপরমেশ্বর গাইন
একলা পথে চলা...
একটা কণ্ঠে গল্প বলা।
মানচিত্রের সব রেখায় রেখায়
সরল আঁকি বুকি
তারপর সহজপাঠ....
শেষের কবিতায়,গোরা নিরুপমা
গীতবিতানে আমি আমরা ওরা
তাঁরা ও খুলেছে জ্ঞানের কপাট।
পঁচিশে বৈশাখ...
ঠাকুর ঘরে রবীর আভায়
ধূপ দীপের বেজেছিল শাঁখ।
আকাশে সব তারা আলো ফেলে
ক্ষণিকের কোলে...
চাঁদ গেয়েছে কত গান
একক রাতের সাথে
অমাবস্যার উল্টো রথে।
বিশ্ববাসীর অঙ্গনে বিচিত্র চিত্রায়নে
যে ছবি ছিল --- আজ ও আছে,
রবে ও তা আমাজনে
অনন্ত যৌবনে।
শান্তিনিকেতনে
মলয় সরকার
শান্তি নিকেতনে
ধূলার ঝড় ওঠে বিকালের অস্তবেলায়,
গাছে গাছে সুর ওঠে বিষাদের ছন্দে তালে,
আশেপাশে হয়ত বা জগদীশ কাননে-
কখনও খোয়াই কাঁদে
ইতিহাস বুকে করে,
বুকের রক্তধারা গলে গলে বয়ে চলে নদী,
জানে সে হয়ত এই কান্নাই সঙ্গী নিরবধি।
দুলে ওঠে মাঝে মাঝে বিষাদের সুর
নিস্তব্ধ বিজন বনে,
শিরিশিরি বায়ু বয় চুপে চুপে,
ঝিম ধরা অবসন্ন বিষন্ন দুপুর-
পথিকের পদধ্বনি বাজে রাস্তায় লোকালয়ে,
অসংখ্য যাত্রীর ভিড়ে কোথায় হারায় তার শান্তির আকুলতা,
বিমূর্ত বেদনার ভাষা বুকে চেপে সয়ে,
খুঁজে ফেরে হারানো সে দিন -
ফেলে আসা পথ কতদূর-
কতদূরে ফেলে সে এসেছে তার প্রাণপাখি,
কবিগুরু রবীন্দ্র ঠাকুর।
অর্ধদগ্ধ চিরকূট
মলয় কুমার মাঝি
রবি ঠাকুর রবি ঠাকুর শোন হে মোর কথা,মরনের কোলেও লিখে গেছো কবিতা,গল্প,গান কত ব্যথা,দিয়ে গেছো সাড়া;পৃথিবী মুগ্ধ মাতাল পাড়া,দিকে-দিকে তোমার কথা নদী বুকের বাঁজে;স্রোতে গভীর টানে,
বুনো পাখির দল তোমার গান গায়,পাগল হাওয়া তোমায় খোঁজে বেড়ায়, চাষির লাঙ্গনে মাটি বুক চেঁড়া আর্তনাদ, তোমার গল্পের প্রিয়সী কাঁদে,কাক জ্যোৎস্না রাতে একলা; মাঝি গঙ্গার বুকে তোমার গান গায়,রেল লাইনের কামারায় এখনো ফাঁকা আছে,দেখতে পায় নি তোমার মতন কাউ কে!তোমার কথা ভাঁসে বরফ ঢাকা দেশে,দগ্ধ দাবাদহের কৃষ্ণচূড়ার মগ ডালে রঙ্গিন বাংলার আকাশে;তুমি রক্তের স্রোতে মিশে আছো,ভাবনার সঙ্গে খেলো,অন্ধ পথিকের তুমি দৃষ্টি,স্কুল,কলেজ পা রাখোনি, অপরিসীম জ্ঞানের ভাণ্ডার তুমি কাল জয়ী,বিশ্বজনের বিধাত্রী,তুমি সৃষ্টির পল্লব,যুগের পর যুগ নব প্রজন্ম আসবে,তুমি থাকবে;তোমাকেই পড়বে;তোমায় জানবে ;আর রেখে যাবে হাজার-হাজার প্রশ্নের ভিড়,কালের স্রোতে আমরাও চলে যাবো,তোমার আকাশে একটু জায়গা দিও কালো-সাদা ধোঁয়ার,মেঠো বাউলের একতারায়,অর্ধদগ্ধ চিরকূট বেখেয়ালি নাম না জানা কোন পথের প্রান্তে...
রবির দীপ্ত কিরনে
শ্রীমন্ত দাস
হে রবি তুমি চেতনাতে আছো
অবচেতনে ও ভাবি,
তোমার স্নিগ্ধ দীপ্ত কিরণে
আলোকিত হোক সবই।
ছোট গল্প উপন্যাস আর
নাটক নভেল যত,
কাব্য লিখলে গানে দিলে সুর
সবার মনের মত।
আজও ভুলিনি শৈশব স্মৃতির
অমল ও দই ওয়ালা,
দাগ কেটে গেছে স্মৃতির জগতে
মিনি ও কাবুলিওয়ালা।
শান্তিনিকেতনে ছতিম তলায়
মুক্ত শিক্ষাঙ্গনে,
শুরু করলে পঠন পাঠন
প্রকৃতি সৃষ্ট কোনে।
জন্মদিনে হে প্রিয় কবি
নমি তব চরণে,
সবার জীবন আলোকিত হোক
তোমার দীপ্ত কিরণে।
অঙ্গীকার
রুহুল আমিন মন্ডল
তোমায় অঙ্গীকার করেছিলাম, একদিন ফিরবই ,
মূঢ় মস্তিস্ক কোষে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে
সব মরা নদীর বুকে জ্যোৎস্নার ভরা জোয়ার আনবই একদিন...
পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়লে তোমার কাছে ফিরে এসেছি বারবার
স্তব্ধতায় নতজানু হয়ে দ্বার খুলে দেখেছি
স্থিতধী ভোর কোমর জলে দাঁড়িয়ে সূর্য স্তবে মগ্ন,
এমন মগ্নতা দেখিনি কখনো
কতবার প্ররোচনার অন্ধকূপ নগ্ন করেছে এ হৃদয়
কত পাখি টুপটাপ ঝরে পড়েছে,
হওয়ায় ওড়া ঝরা পাতায় উড়ে গেছে সম্ভ্রম ভাষা,
তবুও প্রাচীন পাথরের গায়ে জেগে ওঠেছে আগুণভরা রাত,
বর্শা ফলক ধারালো হয়ে ওঠেছে ক্রমশঃ...
উলম্ব পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে চলেছি
জানি, পতন অনিবার্য
তবুও আত্মহত্যার ডাকটিকিতে রক্ত তিলক এঁকে দিয়েছি ,
এই অনিবার্য প্রাণ সাধনায় রাত আসুক
আসুক ঘনঘোর গভীর বিপর্যয়
তবুও মশাল হাতে এগিয়ে যাবো বন্য, শ্বাপদ অন্ধকারে
তারপর একদিন স্থিতধী ঊষার আলোয় দাবানল হয়ে ফিরবোই
ঝরা পাতায় সঞ্চারিবে প্রাণ, দূর হবে ভয়
বিশুদ্ধ বায়ুতে ভরে উঠবে আকাশের উদার হৃদয়...
আমার রবি
দীপা কর্মকার
কলম কালির ভাসছি ভেলায়
আমার মনের সাগর কূলে
ভাব তরঙ্গে ডুব দিয়ে তাই
শব্দ রতন আনছি তুলে।
মানব রবি সাজবে আমার
রত্ন দ্যুতির শব্দমালায়
মানসপটে আঁকবো রবির
প্রতিচ্ছবি কালির ছড়ায়।
তার লেখনীর হীরকচ্ছটায়
বাংলা ভাষার বিশ্বজয়
তার গানের সুর লহরীর
সুরের মোহ বিশ্বময়।
"গীতাঞ্জলি "আনলো মুকুট
বিশ্বকবির শ্রেষ্ঠ মান
মানব রবি পেলেন ধরায়
বিশ্ব সেরা শ্রেষ্ঠ স্থান।
আকাশ রবি জাগায় আশা
নতুন দিনের , রাতের শেষে
মানব রবি হৃদয় গাঁথে
গল্প, গানে ভালোবেসে।
নতুন কিরণ
মালা ঘোষ মিত্র
গভীরতম হয় জীবনবোধ
সময় সুযোগে একা হয়ে যায়
জোনাকি ----
মাঝে মাঝে জলের ঝাপটা আসে
কালির অক্ষরে আঁকড়ে ধরে বাঁচি
বৃষ্টি হয় সংগীতের মতন
ভিতর বাইরে ক্রমশ ভিজে যায়।
ছাতিমের তলে একা
না তো রবিঠাকুর তো আছেন!
বয়ে যায় অতলের দিকে
দিশেহারা হয় কবিতা অক্ষররা
নতুন কিরণে বেঁচে ওঠে জীবন।।
নক্ষত্ররাত জ্যোৎস্না প্লাবনে ভাসে
প্রবাহমান নদীর কাছে আসি,
জীবন দেবতা এসে দাঁড়ান
তুচ্ছ এ জীবনকে
অমোঘ করে ----
ছন্দাসিক মায়ায়, ছন্দে দোলে।
হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে...
কৃতিকণা
হে চিরনবীন,
বড় শুভ দিন আজ।
মনে মনে তোমায় প্রণাম জানিয়ে,
গীতবিতানটা খুলে গুনগুন করতে করতে
কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছিল—
বুঝতে পারিনি।
জানালায় চোখ পড়তে দেখি,
এত্ত বড় থালার মত চাঁদ উঠেছে আকাশের কপালে।
একছুট্টে বাইরে এসে,
আমার প্রিয় একলা সাঁঝের ব্যালকনিটাকে
জ্যোৎস্নায় ভিজে হেসে লুটোপুটি খেতে দেখে
আনন্দে নেচে উঠল মন।
মনে হল যেন,
তোমায় অভিবাদন জানাতে কপালে চাঁদ জ্বেলেছে আকাশ।
"চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে,
উছলে পড়ে আলো।
ও রজনীগন্ধা,
তোমার গন্ধসুধা ঢালো।।"
গাইতে গাইতে কখন যে পোড়া চোখে জল এসে ঝাপসা করে দিয়েছে সব...!
হঠাৎ, রজনীগন্ধা আর ধূপের সুগন্ধে ভরে উঠল চারিদিক!
তাড়াতাড়ি চোখ মুছে তাকিয়ে দেখি—
তুমি এসে দাঁড়িয়েছ আমার পাশে ব্যালকনির রেলিং-এ ভর দিয়ে!
আকাশের দিকে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে জ্যোৎস্না মাখছ তুমি।
জড়িয়ে ধরলাম তোমার পা—
আরাম কেদারায় বসিয়ে চোখের জলে ধুয়ে
খোলা চুল দিয়ে সযত্নে মুছিয়ে দিলাম সে যুগলচরণ।
বললাম, "ঠাকুর, এ রিক্ত ভীষণ সময়ে
তোমায় অঞ্জলী দেওয়ার মত কিছুই যে নেই এ অভাগীর।"
মাথায় তোমার হিমশীতল হাতের স্পর্শ পেলাম। বললে—
"তোর চুলের সুবাস, আর তোর মনের সৌরভ দিয়ে বরণ কর আমায়।"
তারপর প্রাণখুলে হেসে বললে, "নে, খুব হয়েছে। একটা গান ধর এবার।"
কান্নায় ভেঙে আসা গলায় গাইলাম,
"নয়ন সমুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই—"
আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান—
তুমি জান নাই, তুমি জানো নাই,
তুমি জান নাই তার মূল্যের পরিমাণ।।
ধড়মড় করে উঠে বসলাম।
আমার মোবাইলের রিংটোন...!
হ্যাঁ ঠাকুর,
একলা ঘরে ঘুমের মাঝে, তোমার সাথেই, করলাম তোমার জন্মতিথি উদযাপন।
বিশ্বাস করো,কবিগুরু...
অনিন্দিতা শাসমল
আমি যখন আনন্দের কবিতা লিখতে যাই..
একটা বিষাদপাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে যায় চোখের সামনে দিয়ে ।
আমি যখনই একটু হাসতে চাই...
আচমকা একটা কালো মেঘ কোথা থেকে যেন ছুটে এসে আমার চোখের কোণে বৃষ্টি ফোঁটা হয়ে নেমে আসে।
আমি যখনই একটু ভালোবাসা পেতে চাই...
ঠিক তখনই দেখি , প্রখর সূর্যতাপে গাছের নরম পাতাগুলো শুকিয়ে হলুদ হয়ে যায় ; সবুজ অরণ্য হয়ে যায় রুক্ষ ,শুষ্ক ।
আমি যখনই নতুন উদ্যমে কাজ করবো ভাবি...
জানিনা কোথা থেকে আসা হতাশার গাঢ় অন্ধকারে ,ডুবে ডুবে যেতে থাকি ক্রমশ।
আমি যখনই জীবনের গান গাইবো বলে হারমোনিয়ামে সুর তুলি,
কে যেন দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলে---
আমি মৃত্যুদূত এসেছি , মরণের গান গাও।
গাও...
ঠিক তখনই---
আমার আকাশ বাতাস চরাচর জুড়ে ভেসে বেড়ায় , তোমার শ্বেতশুভ্র ছবি...
আর , চোখের সামনে দিয়ে উড়ে উড়ে যায় সঞ্চয়িতা, গীতাঞ্জলি ,গীতবিতান,
গল্পগচ্ছ, খেয়া ,কল্পনা, নৈবেদ্য,মানসী ,শ্যামলী ,
লিপিকা, শেষের কবিতা-র একটার পর একটা পাতা...
আবার নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে...
বিশ্বাস করো কবিগুরু ,
খুব ইচ্ছে করে...
আমার রবি ঠাকুর
অর্ণব বশিষ্ঠ
সূর্যের নামে তোমার উদয় হোক
কিরণ ছড়িয়ে পড়ুক দিকবিদিকে
মুছে যাক যত ক্ষুদ্রতার শোক
ভরিয়ে দাও তুমি নিখিল বিশ্বকে
ওগো আমার প্রাণের কবি, রবি ঠাকুর
তোমার কথায় সহজ হয় জীবনের জটিলতা
তোমার গানে ভাষা খুঁজে পায় আমার মনের কথা
গীতাঞ্জলির কথায় বাজে অনন্তের সুর
চিত্ত আমার শুদ্ধ করে করাও পুণ্যস্নান
"আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান..."
তুমি গুরু রবীন্দ্রনাথ
বিমল মণ্ডল
বৃষ্টি ভেজানো বিকেলের ছায়া নামল পথে সদরের জমিতে
সবুজের শোভা ঘিরে
জেগে ওঠে ফোঁটা ফোঁটা শিশির বিন্দু
আজ রবি ঠাকুর আসবেন প্রথম আলোর পথে
অমৃতময় গান পাখির মত গেয়ে উঠলো এই,
অরণ্য - পর্বত পথঘাটের পাশ দিয়ে আজ
সেখানেই ভাসছে যুবতীর কোমল পরশের গন্ধঃ
ঘুরে ঘুরে আসছে বারবার
কিছুটা সময় পরে বিষণ্ণ মেঘে বিদ্যুতের রাশ—
আবেগে চমকায়, দশমিক
এসবের ভিতরে তোমার যাত্রার ধুমধাম হাজার
কবিতার আলোতে প্রাঙ্গন—
ধুলোবালি মাড়িয়ে আমরা উৎসবে মিশি,অভাবনীয়
সেই সুর মনের ভেতর বেজে চলেছে
উৎসবে উৎসবে জড়িয়ে আলো জ্বলে ওঠে —
লোকেরা দলে দলে ভিজে ভিজে আসে
প্রতিক্ষায় ভিড় করে আসার সহজ অনুভূতি আবেগে অক্ষরে
অক্ষরে পূর্ণ হয়ে এল
বাতাসের ঝিলিকে বৃষ্টিতে ভিজে
কারা যেন কবিতার ফাঁকে রবীন্দ্রগানে মেতেছে সুরের স্পন্দন তুলে
হৈ হৈ জনতা - তখন হাতে হাতে পায়ে আর গলায় ফুল ছড়িয়ে দেয়
তোমার কবিতায় তখন উজ্জ্বল আলো ভেসে ওঠে
আমার চোখে সেই আলো,তুমি গুরু রবীন্দ্রনাথ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন