লেবেল

রবিবার, ৮ মে, ২০২২

আজ ২৫শে বৈশাখ।। প্রকাশিত হল... কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মদিনে অঙ্কুরীশা-র পাতায় গদ্যে রবি শ্রদ্ধার্ঘ্য।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

            প্রচ্ছদ - পিনাকী রায়( কণিষ্ক) 



আজ ২৫শে বৈশাখ।। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  ১৬১-তম জন্মবার্ষিকী। এই জন্মবার্ষিকীতে জানাই  গদ্যে  অঙ্কুরীশা- র কবি প্রণাম।


কলমে—
অরুণ চট্টোপাধ্যায় 
দুর্গাদাস মিদ্যা
তপন  তরফদার
সুবীর ঘোষ




জালিয়ানওয়ালা বাগ ও রবীন্দ্রনাথ
অরুণ চট্টোপাধ্যায়

১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল অবিভক্ত বৃটিশ শাসনাধীন ভারতে পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালা বাগে তৎকালীন ইংরেজ সেনানায়ক জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে এক বীভৎস নরহত্যা সংঘটিত হয়। অর্থাৎ সেকালের রক্ষককেই ভক্ষকের আকারে দেখা গিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় এই ছিল যে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল সেদিন। এই বীভৎস গণহত্যাটি শুধু অবরুদ্ধ অবস্থায় অসংখ্য মানুষকেই হত্যা করে নি, সেই সঙ্গে হত্যা করেছিল মানবিকতাকেও। মানুষকে পশুর থেকেও অনেক নিচু স্তরে নামিয়ে এনেছিল তারা। হত্যা করেছিল সুস্থ বিবেচনা ও বিবেক বোধকেও।

হত্যাকান্ডের পটভূমিঃ ১৭৫৭ সালে বাংলার পলাশীর যুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয় আর ভারত বৃটিশ শাসনাধীন হয়। একশত বছর পর ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ প্রোথিত হয়। আকস্মিক এই আন্দোলনের ফল এতই ভয়ানক হয়েছিল আর ফলশ্রুতিতে ইংরেজরা এতই নৃশংস হয়ে উঠেছিল যে তারা আর বিদ্রোহীদের ভারতের মূল ভূখন্ডে রাখতে রাজী হয় নি আর অভিযুক্তদের তারা মহাসাগরের বুকে বিভিন্ন দ্বীপে স্থানান্তরিত করতে থাকে। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে সমুদ্রের বুকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে স্থাপিত হয়েছিল কলঙ্কিত সেলুলার জেল। এরপর অবশ্য ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজ ব্যাপৃত হয়ে পড়ে আর ব্যাপক হারে ভারতীয়দের এই যুদ্ধে নিয়োগ করে বা করতে বাধ্য হয়। শর্ত অবশ্য একটা ছিল। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে আর বৃটিশ জিতলে পরাধীন দেশগুলির স্বায়ত্ত শাসনের বিষয় ভাবা হবে। ১৯১৯ সালে এই যুদ্ধের অবসান হয় আর অক্ষশক্তিকে হারিয়ে মিত্রশক্তি অর্থাৎ ইংরেজ জয়লাভ করে। কিন্তু কূটবুদ্ধি ইংরেজ এই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যায়। আর তখন ভারতীয়দের মধ্যে বিক্ষোভের চারা আবার বাড়তে থাকে। ইংরেজরা বিদ্রোহীদের ছত্রভঙ্গ করে। অনেককে কারারুদ্ধ করে আর সমস্ত রকমের সমাবেশকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। প্রবর্তন হয় ‘রাওলাট আইন’ নামের এক নিষ্ঠুর আইনের। বিক্ষুব্ধ ভারতীয়দের অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রথায় শাস্তি দেবার বিধান ছিল এই আইনে। প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী যে সত্যাগ্রহ আর অহিংস আন্দোলন চালাচ্ছিল তার প্রেক্ষিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আবার এই গ্রেপ্তারীর প্রতিবাদে বিশেষ পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ গুজরাট, পাঞ্জাব এই অঞ্চলের মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।

কীভাবে ঘটেছিল এই হত্যাকান্ডঃ নিছক নিরীহ এক বৈশাখী মেলার অনুষ্ঠান। ‘বর্ণ বৈষম্যপ্রিয় বিদেশী বৃটিশরা ভারতীয়দের তখন নেটিভ ‘কালা আদমি’ নামেই ডাকত আর এই দৃষ্টি দিয়েই দেখত। তাই তাদের ঔদ্ধত্য বরদাস্ত করতে পারেন নি জেনারেল ডায়ার। উঁচু পাঁচিলঘেরা সেই মাঠের প্রবেশ আর প্রস্থানপথগুলি আটকে তার সৈন্যরা গুলি চালায়। বিধ্বস্ত হতভম্ব সাধারণ জনগণ পালাবার পথ না পেয়ে বিশাল এক কুয়োয় ঝাঁপ মারে। কিন্তু হত্যালীলায় মত্ত ডায়ারের সৈন্যরা সেই কুয়োয় পাথর ছুঁড়ে বন্ধ করে দেয় পালাবার পথ। কথিত আছে দশ মিনিটে নাকি ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চলেছিল।

কেন সেই হত্যাকান্ডঃ জেনারেল ডায়ার নাকি তাঁর ডায়রিতে লিখেছিলেনঃ “দেশীয়দের মাথা নত করার জন্যই আমি এক অভিনব পথ বের করি। আমি জানতাম, শহরের কাঁড়েওয়ালা গলিতে অসংখ্য লোক বাস করে। তাছাড়া অন্য আর একটা সুবিধাও রয়েছে। গলির মহিলাদের খাবার জল আনতে হয় গলির বাইরে একটা জলের কল থেকে। গলির মধ্যে জল পাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। আমি স্থির করলাম, যে নেটিভরা মাথা উঁচু করে চলতে চেয়েছে, যারা জালিয়ানওয়ালাবাগে একত্রিত হয়েছে আমাদের এক হাত দেখিয়ে দিতে, তাদের আত্মীয়-স্বজনদেরও উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া উচিত। তাই গলির দু পাশ বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করলাম। সামান্য একটা ছিদ্রপথ রাখা হলো। এই ছিদ্রপথে যাওয়ার সময় মাথা অবশ্যই নত করতে হয়। অধিবাসীরা ব্যবহার করতে বাধ্য হলো আমার উদ্ভাবিত পথ।”

হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়াঃ এই বিশাল হত্যাকান্ডে যাতে প্রায় দেড় হাজারের ওপর মানুষ ঠান্ডা মাথায় খুন হয়, বিশ্বময় প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে এর বিরুদ্ধে। এমন কী স্বয়ং বৃটেনের কমনস সভার বেশ কিছু সদস্যরাও প্রতিবাদে মুখর হলেন। কিন্তু বৃটিশ শাসক অনড়। ডায়ারের পক্ষে তারা নীরব সমর্থন করে গেল।

সবচেয়ে বড় প্রতিবাদঃ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথা ঠাকুর এর ছ বছর আগে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। গীতাঞ্জলী রচনা আর অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর লেখনী-পরিচয় পৌঁছে গিয়েছিল সারা বিশ্বের দরবারে। তাছাড়া স্বয়ং বৃটিশ সরকার তাঁকে নাইট হুড উপাধিতে ভূষিত করেছেন। সেই রবীন্দ্রনাথের মন কেঁদে উঠল নিরীহ দেশবাসীর নৃশংস হত্যাকান্ডে। এতবড় অন্যায় আর অত্যাচার বিনা প্রতিবাদে মেনে নেবার লোক তিনি ছিলেন না। বিনা প্ররোচনায় এত বড় হত্যাকান্ড সারা বিশ্বকে চমকে আর থমকে দিয়েছিল সত্য, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছে থেকে এল সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। চার বছর আগে অর্থাৎ ১৯১৫ সালে  ইংরেজদের দেওয়া নাইট হুড উপাধি তিনি সেই বছর মানে ১৯১৯ সালের ৩০শে মে পরিত্যাগ করলেন। মতান্তরে এই প্রত্যাখ্যান হয়েছিল সেই বছর ২৯শে এপ্রিল।

স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনঃ জালিয়ানওয়ালা বাগের ক্ষেত্রটিকে আর পাশের যে দেওয়ালগুলিতে বুলেটের চিহ্ন আছে সেগুলি সেভাবেই সংরক্ষিত রেখে নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হয়। ১৯৬১ সালের ১৩ই এপ্রিল স্বাধীন ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ এর উদ্বোধন করেন। যারা পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে বেড়াতে যান তাঁরা জালিয়ানওয়ালা বাগে অবশ্যই একবার ঘুরে আসেন এই শহীদ সৌধটি দেখতে। দেওয়ালে বুলেটের চিহ্নগুলি আজও দেখা যায়। সেখানে রবীন্দ্রনাথের একটি মূর্তিও স্থাপিত আছে শ্রদ্ধা ও ত্যাগের নিদর্শন হিসেবে। একজন বাঙ্গালী হিসেবে আমাদের আমাদের গর্বে বুক ভরে ওঠে।

আজ ২৫শে বৈশাখে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে এই মহান আর মানবতাবাদী আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষটিকে আমরা জানাই অকুন্ঠ শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। সমাজে তাঁর অবদান যেন মনে রাখতে পারি চিরকাল।  





‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতায় রবীন্দ্র-দর্শন
দুর্গাদাস মিদ্যা

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ অচল এই অভিমত অনেকের। কিন্তু তাঁর কবিতা মানবিক দর্শনে  সমৃদ্ধ। শুধু হাল্কা আবেগ নয় রীতিমত আন্তরিক সত্য প্রকাশিত। ‌‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে এই   কবিতাটি যা পড়তে পড়তে আমি শুধু অভিভূত নই চমৎকৃতও বলা যায় তাঁর বলিষ্ঠ মানবিক উচ্চারণে। ২৯ ফাগুন ১৩০০ বঙ্গাব্দে রচিত এই কবিতা আজও আগুনের মতো সত্য উজ্জ্বল এবং বাতাসের মতো বাস্তব এবং চলমান। উদ্ধৃতি দিলে তবে তাঁর মানবিক ভাবনার মানসিক রূপের পরিচয় পাওয়া যাবে। আজ থেকে ১২৮ বছর আগে রচিত এই কবিতা মানবপ্রেমের জ্বলন্ত দলিল। উদ্ধৃতি—‌‘স্ফীতকায় অপমান অক্ষমের বক্ষ হতে রক্ত শুষি করিতেছে পান লক্ষ মুখ দিয়া! বেদনারে করিতেছে পরিহাস স্বার্থোদ্ধত অবিচার!’ কী মনে হয় একি আজকের সমাজচিত্র নয়? নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনা কি এর সাক্ষ্য বহন করছে না বর্তমান সময়ে বা কালে? এই কবিতায় ছত্রে ছত্রে কবির মানবিক রূপ প্রকাশ পায়। অথচ এই কবি নাকি সমকালীন কবি নয়। কবি যখন বলেন—এইসব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা, এই সব শ্রান্ত, শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা, যখন বলেন—মুহূর্তে তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে, যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে’ তখন কি মনে হয় এই কবি শুধুমাত্র বুর্জোয়াদের হয়ে জয়গান গেয়েছেন, নাকি শুধু ভাববিলাসে ভাবনার তরী ভাসিয়েছেন বাস্তববোধ বাদ দিয়ে? আমরা অর্দ্ধশিক্ষিত নিম্নরুচিসম্পন্ন একপেশে দেখা মানুষ তাই এই নির্মম সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাই যে তিনি নিপীড়িতের কবি। পড়তে পড়তে স্তম্ভিত হই যখন পড়ি—অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, মুক্ত বায়ু চাই আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু। সাহসবিস্তৃত বক্ষপট। এর চেয়ে মানব কল্যাণে মানব জাতির আর কি চাওয়া থাকতে পারে? শুধু খেয়ে পরে বেঁচে থাকা নয় সাহসের সাথে বেঁচে থাকার কথাও তিনি বলছেন সাথে সাথে, না হলে আত্মসম্মান বোধ গড়ে উঠবে না এসব ঋষি কবি, সত্যদ্রষ্টা কবি রবীন্দ্রনাথ জানতেন এ এক জীবন জারিত সত্য কথা। তিনি এই কবিতায় এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করেছেন—স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে; এই চরম স্বার্থপরতাই—বর্তমানকালে সংকটের কারণ এর থেকে মুক্তি পেতে হলে স্বার্থপরতাকে ঝেড়ে ফেলে বৃহৎ সমাজের অংশীদার হতে হবে তবেই বিকশিত হবে সমাজ। এই সমাজকল্যাণের চিন্তা আমরা ভুলে গেছি বলেই আমাদের এত দুর্দশা সভ্যতার অগ্রবর্তী সত্ত্বেও। আমরা সুর করে গান গাই—মানুষ মানুষের জন্য আর কাজে ও কর্মে সেই মানুষকেই দূরে ঠেলে বেঁচে থাকি পিঞ্জরাবদ্ধ বেবুনের মতো। এই একটি কবিতাই যদি আমাদের জীবন বেদ হতে পারত তবে আমাদের সমাজ জীবনের চালচিত্র সম্পূর্ণভাবে বদলে গিয়ে এক সুখী সমৃদ্ধ জীবনযাপনে আমরা অভ্যস্ত হতে পারতাম।

 

    


কবীন্দ্র  রবীন্দ্রর  গাঁটছড়া
তপন  তরফদার
 

কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ আমাদের মননে, আমাদের জীবনের  সর্বস্তরে জড়িয়ে আছেন। আমাদের ঋদ্ধ করে চলেছেন। স্বাভাবিক ভাবে আমাদের মনে উঁকিঝুঁকি মারে একটি বিষয়ে, উনি গাঁটবন্ধনে, অর্থাৎ প্রজাপতির নির্দেশে কি ভাবে সাতপাকে বাঁধা পড়েছিলেন।       

     মনে রাখতে হবে, রবির বিয়েতে রবির কোনো ইচ্ছাকে ধারে কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। তখনকার দিনে বাড়ির অভিভাবকরা যা বলবেন তাই বিধাতার নির্দেশ। একটু খোঁজ নিয়ে দেখা যাক রবির বিয়ের ফুল ফুটলো কীভাবে।

     রবীন্দ্রনাথের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছে। সাধারণ জ্ঞান বলে রবীন্দ্রনাথের জন্য পাত্রীর বাবারা জোড়াসাঁকোর বাড়িতে লাইন লাগিয়ে দেবে। সুদর্শন যুবক, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি এবং কবি  হিসাবে কলকাতায় পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু  বাস্তবে ঠিক তার উল্টো, রবীন্দ্রনাথের জন্য পাত্রীরা তো দুরের কথা, দুরবিন দিয়ে পাত্রীর বাবারাও পাত্তা দেয়না। বাংলাদেশে এটা সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। কারণ ঠাকুরেরা ছিলেন  ব্রহ্মাণ। কিন্তু  ব্রাহ্মণদেরও অনেক বিভাগ, উপ-বিভাগ আছে। ঠাকুররা ছিলেন পীরালি ব্রাহ্মণ। পীরালি ব্রাহ্মণ পরিবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সুন্দরী পাত্রী তো দূরের কথা।

       সতেরো শতকের শেষ দিকের ঘটনা, এক বিদেশি জাহাজ মালপত্র খালাস করার জন্য নোঙর করে। জাহাজের সাহেবদের রসদ জোগাড় করে দেওয়া ওদের ফাইফরমাশ খাটায় বেশি লাভ। ওরা বেশি টাকা বকশিশ দেয়। নবাবের মুনশির থেকে সহজ ও লাভ জনক কাজ ইংরেজদের ফরমাশ খাটা। মূলত এই সময়েই তাদের আদি পদবি কুশারি থেকে টেগর বা ঠাকুরে পরিবর্তিত হয়। পঞ্চানন কুশারি বা ঠাকুরের জেষ্ঠপুত্র জয়রাম। জয়রামের পুত্র নীলমণি ঠাকুর ১৭৮৪ সাল থেকে জোড়াসাঁকোয় বসবাস আরম্ভ করেন। নীলমণির পুত্র রামলোচন। রামলোচনের দত্তক পুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬)ও দিগম্বরদেবীর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথ (১৮১৭- ১৯০৬)ও সারদা দেবীর পুত্র রবীন্দ্রনাথ। জন্ম ৭ই মে ১৮৬১-মৃত্যু ৭ই আগস্ট  ১৯৪১। বিবাহ ৯ই ডিসেম্বর ১৮৮৩ সাল।

     বিয়ে তো হল। কি করে বিয়ে হল সে বিষয়ে একটু  খোঁজখবর নেওয়া যাক।

     পীরালি ব্রাহ্মণের মেয়ে দরকার, আর পীরালি ব্রাহ্মণ খুবই অপ্রতুল। ওই যশোর জেলার নরেন্দ্রপুরের পীরালি পরিবারের শাখা প্রশাখা থেকেই খুঁজে বার করতে হয় মেয়ে।

     আবার  অন্য দিকে ঠাকুর পরিবারের জামাই মানে ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে, খুব গরীব ঘরের ভালো ছেলেদের চোখেচোখে রাখা হত। সময় বুঝেই পাকড়াও করে ঠাকুর পরিবারের ঘরজামাই করা হত।

     বনেদি পরিবারের যা হয়, পাত্র বিয়েতে রাজি থাকে না। গুরুজনদের পীড়াপীড়িতেই বিয়ে করতে রাজি হয়। রবীন্দ্রনাথ শুধু  ঘাড়টা একটু  হেলিয়েছেন। ব্যাস মেয়ে খোঁজার দল তৈরি। এই দল প্রায় একটা ফুটবল দল। অধিনায়িকা জ্ঞানদানন্দিনী। জ্ঞানদার মেয়ে ইন্দিরা, ছেলে সুরেন্দ্রনাথ, কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। সত্যেন্দ্রনাথের শ্বশুর বাড়ি থেকে মেয়ে দেখার কাজ শুরু। সত্যেন্দ্রনাথের শ্বশুর বাড়ির লোকজন আশেপাশের গ্রাম চেঙ্গুটিয়া, দক্ষিণডিহি, ফুলতলি সব চষে ফেলা হল। শেষে পুলতলি গ্রামের দশ কি গারো বছরের মেয়ে ঠিকমতো শিব ঠাকুরের ব্রত করার পূণ্যির ফলে ঠাকুর পরিবারের বধূ  হয়ে গেল ‘ভবতারিনী’। মহর্ষি দিনক্ষণ ঠিক করে আশীর্বাদ করে গেলেন।।

     বিয়ের ব্যপারে বরের কোনো রা নেই। গুরুজনরা যে ফল র্ঠিক করে দেবে সেই ফল নিয়েই সারাজীবন ফলভোগ করে যেতে হবে। সব দিক দিয়ে ভালো। এখনকার মতো প্রবঞ্চনার স্থান ছিলনা। উদার পাত্র পাত্রীকে পছন্দ করে আবার যৌতুক আদায় করতে ভুল করেনা। যৌতুকের সময় পাত্র আড়ালে থেকে কৌতুক করে অভিবাভকদের আবদার বলে পার পেয়ে যায়। তখনকার দিনে যৌতুক নিয়ে লুকোচুরি ছিলনা।

      শুধু পীরালি ব্রাহ্মণ ছাড়া দুই পরিবারের কিছুই মিল নেই। ভবতারিনীর বাবা গোমস্তা, মাইনে কুড়ি টাকা। গ্রামের নিস্পাপ বালিকা জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। এতো বসে আছে এরই হবুশাশুড়ি ঠাকুরনকে সাত বছর বয়সের বালিকাকে কাধেঁ তুলে এনে এই ঠাকুর বাড়িতে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

      রবীন্দ্রনাথ নিজের বাড়িতেই বর সেজে বসে আছেন, বিয়ে করবেন। দিনটা হল ৯ ই ডিসেম্বর ১৮৮৩। ভবতারিনীর বিয়ের সব খরচ বহন করবে ঠাকুর বাড়ি। মোট খরচ হয় সাড়ে তিন হাজার টাকা। হার ১৭০0 টাকার, চেলি ৭০ টাকার,শাল ১৭৫ টাকা, গরদ ৩০ টাকা। গাঁটছড়া বাধাঁর জন্য পুরোহিতের দক্ষিণা ৮ টাকা।

      বিয়ের জৌলুস হৈ চৈ কিছুই হলো না। ভাবা যায় রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করছেন, নিজেই কয়েকজন একান্ত প্রিয় বন্ধুদের নিমন্ত্রণ পত্র লিখলেন। এক ঐতিহাসিক নিমন্ত্রণ পত্র। দেখা যাক পত্রটি-

প্রিয় বাবু,

     আগামী রবিবার ২৪ শে অগ্রহায়ণ তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ বিবাহ হইবেক।

     আপনি তদুপলক্ষে বৈকালে উক্ত দিবসে ৬ নং জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহদি সন্দর্শন করিয়া আমাকে এবং আত্মীয়বর্গকে বাধিত করিবেন। 

 ইতি  —
অনুগত,
 শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

     রবীন্দ্রনাথ টোপর পরে শঙ্খ-উলু ধ্বনির মাধ্যমে বসার ঘর থেকে বিয়ে করতে নিজের অন্দরমহলেই ‘বাসরঘরে’ আসলেন। বিপক্ষ বাহিনীর বর ঠকাবার কেউ নেই। সাজসজ্জা এবং আচরণে একেবারেই রাজার মতন। বিয়ের বাসরে কে গান গাইবে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নিজেই উপস্থিত। কাকিমা ত্রিপুরা সুন্দরীর অনুরোধের সঙ্গে সঙ্গেই গেয়ে উঠলেন- ‘আমার লাবন্যময়ী, কে ও স্থির সৌদামিনী, পূর্ণিমা জোছনা দিয়ে মর্জিত বদন খানি।‘

       বিয়ের পর্ব শেষ হয় দ্বিরা গমন দিয়ে। এখানে দ্বিরা গমনের ব্যবস্থা নেই। রোমান্স জমে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ গাইছেন – ‘ধীরে ধীরে আমার প্রাণে এসো হে মধুর হাসিয়ে ভালোবাসো হে। হৃদয় কাননে ফুলফোটাও, আধো নয়নে সখি চাও।‘

      ভবতারিনীর নাম বদলে বিয়ের দিনই নতুন নাম মৃণালিনী রাখা হয়। মৃণালিনী দেবীকে লরেটৌ স্কুলে  পাঠানো হত ইংরাজি শেখার জন্য। সংস্কৃত, বাংলা  এবং  বিভিন্ন বিষয় শেখবার জন্য পন্ডিতরা আসতেন ঠাকুর বাড়িতে। ঠাকুর বাড়ির ঐতিহ্য পরিবারের সবাই মিলে নাটক  গান বাজনা করার।মৃণালিনী দেবী পিছিয়ে পড়েনি। রাজা ও রানী নাটকের অভিনয়ে সাবলীল ভাবে অভিনয় করেন নারায়ণীর ভূমিকায়। নাটকে মেজ ভাসুর সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন দেবদত্তর ভূমিকায়।

    কিছুদিনের মধ্যেই কবি পত্নী  বুঝতে পারেন সংসার নৌকা সঠিকভাবে বইতে গেলে তাকেই হাল ধরতে হবে। কবি পত্নী সুকুমার শিল্পের চেয়ে সংসার শিল্পের অর্থাৎ রান্নাবান্নার  উপর নজর দিতে  শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের ভবসংসার সঠিক পরিচালনার জন্য ভবতারিণীই হয়ে যান মৃণালিনী দেবী।




আমার রবীন্দ্রনাথ
সুবীর ঘোষ

 
তিনি জিগ্যেস করলেন ---রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড় ?বাক্যে উক্ত কালনির্ণয়কে একটু ঘুলিয়ে দিতে চেয়ে বললাম--- পড়েছি তো , স্কুলের বইয়ে ছিলদুই বিঘা জমি, পুরাতন ভৃত্য।
---বড় হয়ে পড়নি?
---পড়েছি , শেষের কবিতা।
---সে তো উপন্যাস।
--- না মানে ঐ শেষের কবিতাগুলো থেকেই তো বান্ধবীকে চিঠি লিখবার সময় লাইন টুকে দিতাম ।
---আর কোনো উপন্যাস?
---সিনেমায় দেখেছি --চোখের বালি , নৌকোডুবি।
--গল্প?
---সে-ও সিনেমায় দেখেছি-- কাবুলিওয়ালা, ক্ষুধিত পাষাণ , নষ্টনীড় ।
---প্রবন্ধ কিছু পড়া আছে না কী?
---না স্যর , ঐ দিকে দাঁত ফোটাতে পারিনি।
---নাটক ব্যাপারে কিছু?
---ছোটোবেলায় পাড়ায় দেখেছি --বিসর্জন , রথের রশি।
---রবীন্দ্রনাথের গান পড়েছ না কি?
---গান পড়া? গান শুনেছি। তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে থেকে খোল দ্বার খোল… সে অনেক গান।
---এবার থেকে গান পড়ে দেখো।
--- দেখব স্যর , আপনি বলছেন যখন । ছোট ছোট গান তো। একদিনেই অনেকগুলো পড়া হয়ে যাবে।

 
 

                          

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন