লেবেল

বুধবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব—৮)।। পৃথিবীর উল্টো পীঠ — বিশ্বেশ্বর রায়।।Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব—৮)

পৃথিবীর উল্টো পীঠ 

বিশ্বেশ্বর রায়


অঙ্গরাজ্যের নাম কানেক্টিকাট৷ রাজধানীর নাম হার্টফোর্ড৷ খুবই ছোট্ট এই শহরটি৷ মাত্র ১৮স্কোয়ার মাইল৷ আর জনসংখ্যা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের ছোট ছোট পৌরসভার মত৷ অর্থাৎ বারাকপুর, বারাসাত, বারুইপুর, দমদম—এসব শহরগুলিতে যেমন জনসংখ্যা প্রায় ততই৷ মাত্র এক লক্ষ চব্বিশ হাজার৷ তবে শহরটা ছবির মতই সুন্দর৷ প্রতিটি রাস্তার দু'ধারে বাঁধানো সুদৃশ্য ফুটপাত৷ ঝকঝকে তকতকে রাস্তা৷ কোথাও একটু ধুলো-কাদা নেই৷ রাস্তার গাড়িগুলো দেখলে মনে হবে বুঝি এক্ষুনি শোরুম থেকে বেরিয়েছে৷ চাকা থেকে শুরু করে সারা গায়ে কোথাও একবিন্দু ধুলো-ময়লা বা কাদা নেই৷ সাঁ সাঁ করে চলছে গাড়িগুলি৷ আমাদের দেশে গাড়ির পিছনে লেখা থাকে 'হর্ণ প্লিজ' বা 'আওয়াজ করো' ইত্যাদি৷ সেই অনুসারে আমাদের দেশের গাড়ির চালকরা মনের সুখে হর্ণ বাজিয়ে চলে অকারণে৷ সামনে যানজট, সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সব দেখেও চালকরা হর্ণ বাজিয়েই চলে তারস্বরে! কিংবা বাসচালক সারা রাস্তা অকারণেই হর্ণ বাজিয়েই চলে লাগাতার৷ বিশেষত গন্তব্যের শেষের দিকে হলে তো কথাই নেই৷ তখন মনে হবে সে বুঝি রাষ্ট্রপতির গাড়ি চালাচ্ছে বা মুমূর্ষু রোগীর অ্যাম্বুলেন্স৷ একবার এ লেন একবার ও লেন করতে করতে পাগলের মত চালাতে থাকে আর সঙ্গে সঙ্গে হর্ণও বাজিয়ে চলে৷ এমন কি হাসপাতালের সামনে, যেখানে হর্ণ বাজানো নিষেধ, সেখানেও বিরাম থাকে না৷ আর ওদেশে হর্ণ কেউাবাজায় না৷ ভুলক্রমেও না৷ আর বাসগুলি তাদের নির্দিষ্ট লেন ছেড়ে কখনও এদিক ওদিক করে না৷ করতে হয়ও না৷ কারণ, চালক সারা রাস্তা নির্দিষ্ট গতিতেই বাস চালান৷ তাই গন্তব্যের কাছাকাছি এসে তাড়াহুড়ো করতে হয় না৷


ওখানে সিগন্যালের ব্যবস্থা এতো উন্নত এবং সবাই তা এতো সুচারুভাবে পালন করে যে, তারজন্য রাস্তায় কোনো ট্র্যাফিক পুলিশের দরকার পড়ে না৷ অনেক ক্ষেত্রে রাস্তায় কোনো ট্র্যাফিক সিগন্যাল থাকে না৷ শুধুমাত্র লাল রঙে STOP লেখা একটি খুঁটি পথিপার্শ্বে একাকী নীরবে  দণ্ডায়মান৷ এগুলি দেখেছি কোনো অপেক্ষাকৃত নির্জন রাস্তার বাঁকের মুখে বা কম জনবসতিপূর্ণ লোকালয়ের আগে৷ অথবা স্কুল বা হাসপাতালের অদূরে৷ তখন দেখেছি—সামনে কোনো মানুষ রাস্তা পারাপার করছে না বা কোনো গাড়ি সামনে দাঁড়িয়েও নেই—তবু প্রত্যেকটি গাড়ির চালক কমপক্ষে এক-দু'সেকেণ্ড গাড়ি দাঁড় করিয়ে তবে অগ্রসর হন৷ এ অভ্যাস ওঁদের সহজাত, ভুলেও কেউ না থেমে হু হু করে বেরিয়ে যান না, যতই তাড়া থাক৷ এছাড়া যতই সিগন্যাল খোলা থাকুক ডাইনে-বাঁয়ে ঘোরার সময় মোড়ের মাথায় গতি কমিয়ে ডাইনে-বাঁয়ে দেখে নিয়ে তবে গতি বাড়ান চালক৷ যে অভ্যাস আমাদের এখানে আশা করা বাতুলতা৷

     আর একটি জিনিস ওখানে দেখেছি যা আমাদের দেশে কোনো নগরে-শহরে নেই৷ সেটা হল পথচারিদের ব্যবহারের জন্য সিগন্যালের বোতাম৷ রাস্তা পারাপারের সময় সেই বোতামে চাপ দিয়ে একটু অপেক্ষা করতে হয়৷ তখন গাড়ি চলাচলের সিগন্যাল লাল হয়ে যায় এবং পথচারীদের রাস্তা পারাপারের সিগন্যাল সবুজ হয়ে যায়৷ পথচারীরা রাস্তা পার না হওয়া পর্যন্ত একটি গাড়িও চলা শুরু করে না৷ আবার কেউ রাস্তা পেরোবার সময় মাঝরাস্তায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতে গাড়ি চলাচলের সিগন্যাল খুলে গেলেও গাড়িচালক গাড়ি থামিয়ে হাতের ইশারায় পথচারীকে রাস্তা পেরোতে ব'লে অপেক্ষা করেন৷ তবে রাস্তায় পথচারীর সংখ্যা নিতান্তই নগন্য৷ প্রায় প্রত্যেকেরই গাড়ি আছে, প্রতিটি পরিবারের তো বটেই৷ গাড়িগুলি সবই প্রায় আকারে বড়৷ মারুতি-৮০০, জেন, অলটো, স্যান্ট্রো, ফিয়েট বা ন্যানোর মত ছোট গাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে৷

জয়দীপ-বিপাশারা যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকে সেটা হার্টফোর্ডের ডাউনটাউনে অবস্থিত এবং ক্যাপিটাল থেকে মাত্রই দেড়-দু' কিলোমিটার দূরে৷ ওদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটাপথের দূরত্বে আমেরিকার বিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের বাড়ি, যা এখন মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত৷ আমরা হেঁটে ওখানে গেলাম বিকেলে বেড়াতে বেরিয়ে৷ দিনটা রবিবার বলে মিউজিয়াম বন্ধ, লোকজনও প্রায় নেই৷ মার্ক টোয়েনের বাড়ির অদূরেই তাঁর ভাইঝি, 'আঙ্কেল টমস্ কেবিন'-এর লেখিকা হ্যারিয়েট বীচার স্টো-র বাড়ি৷ দু'টি বাড়িই অপূর্ব স্থাপত্যের নিদর্শন৷ বাড়ি দু'টি ঘিরে সুন্দর বাগান৷ মোরেম বিছানো রাস্তা৷ নানা ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো বাগান এবং রাস্তার দু'ধার৷ যেন ঠিক তপোবনের মত৷ শান্ত, সমাহিত৷ অবশ্য শুধুমাত্র ওই বাড়ি দু'টিই নয়, হার্টফোর্ড শহরের সব ব্যক্তিগত বাড়িগুলিও খুবই শান্ত, সুন্দর, কোলাহলশূন্য৷ প্রত্যেক বাড়ির সামনে কিছুটা লন এবং ফুলের বাগান৷ লোকালয়গুলি এতো শান্ত যে, লোকজন বিশেষ আছে বলে মালুম হয় না৷ সকালের দিকে কয়েকজন বাচ্চা স্কুলের ব্যাগ কাঁধে বের হয়, কেউ কেউ অফিসে বের হন৷ প্রায় সবাই তাদের বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়েই গাড়িতে উঠে সাঁ করে বেরিয়ে যান৷ ছোট গাড়ির চালক প্রায় অর্ধেকই নারী৷ দুপুরের দিকে সামনের ২২ নম্বরের এক স্থুলকায়া কৃষ্ণবর্ণের নারী প্রায় প্রতিদিনই বাড়ির সামনের ফুটপাতে বা রক মতো ছোট্ট একটু বসার জায়গায় বসে একটানা চার-পাঁচটি সিগারেট ফুঁকে চলেন আপনমনে৷ সঙ্গে  চলে ফোনে কথোপকথন৷ আর বিকেলের দিকে বাড়ির সামনের লনে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলাধুলো করে৷







চলবে...




আরও  পড়ুন 👇👇


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/04/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_58.html



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন