ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা ( পর্ব- ৪)
পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়
আমরা তখনও একটু ইতস্তত করছিলাম৷ কারণ, জয়দীপ-মুনিয়ারা হলুদ ট্যাক্সি নিতে বলেছিল৷ যার ভাড়া মাদাম তুসো মিউজিয়াম পর্যন্ত মোটামুটি ৫০-৫৫ ডলার মতো হয় এটাও বলে দিয়েছিল৷ কিন্তু তখন আর এসব ভাবার সময় নেই৷ ঘড়ির কাঁটায় বারোটা বেজে পঁচিশ৷ গাড়িতে উঠেও আমরা বললাম—'আমরা শুনেছি যে, মাদাম তুসোর মিউজিয়াম পর্যন্ত মিটার ট্যাক্সিতে ৫০-৫৫ডলার ওঠে৷ কিন্তু আপনার তো মিটারই নেই৷ সেক্ষেত্রে কত দিতে হবে বুঝতে পারছি না৷' উনি আমাদের আশ্বস্ত করে বললেন—'আমার কাছে রেট চার্ট আছে৷' রাস্তায় যেতে যেতে তিনি নানা কথা বলতে লাগলেন৷ বললেন—'এটাই আমার প্রফেশান৷ আমি অন্য কোনো চাকরি করি না৷' চলতে চলতে আমরা অজস্র সুউচ্চ অট্টালিকা দেখতে পাচ্ছিলাম৷ উনি বলতে লাগলেন—'ওটা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, ওই দু'টো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নতুন বিল্ডিং৷ আরও এক-দু'বছর লাগবে সম্পূর্ণ হতে৷' ইত্যাদি৷ রাস্তা দারুণ মসৃণ এবং চার বা ছয় লেনের৷ সমস্ত যানবাহন চলছে আমাদের কলকাতার দ্বিগুণ বা তারও বেশি গতিতে৷ রাস্তার পাশে একটু দূরে দূরেই লেখা ৪৫,৫০,৫৫,৬০ ইত্যাদি৷ জিজ্ঞাসা করে জানা গেল ওগুলি যানবাহনের গতি-নির্দেশক৷ অবশ্য এদেশে এখনও মাইলেই গতিবেগ হিসেব করা হয় বা দূরত্ব মাপা হয়৷
নিউইয়র্ক সিটির কেন্দ্রস্থলে টাইম স্কোয়্যার৷ বিশাল বিশাল সুউচ্চ প্রাসাদ চারিদিকে৷ প্রশস্ত ঝকঝকে রাস্তা৷ টাইম স্কোয়্যারের কাছাকাছি ৪২ নম্বর স্ট্রিট৷ আমরা সেখানে পৌঁছে গেছি৷ সামনে বাঁদিকে দেখতে পেলাম মাদাম তুসোর মিউজিয়াম৷ ২৩৪ নম্বর বাড়ি৷ ভদ্রলোককে আমরা ওখানেই থামতে বললাম৷ চল্লিশ মাইল রাস্তা ঠিক চল্লিশ মিনিটে পৌঁছাল৷ ভাড়া দেবার সময় বিশ্বের ধনীতম দেশের সুভদ্র গাড়ির মালিকের কাছ থেকে পেলাম আমাদের দেশের ট্যাক্সি ড্রাইভারের মতই ব্যবহার৷ উনি একটা ভাড়ার তালিকা দেখিয়ে বললেন—'এই দেখুন, আমি আপনাদের ঠকাচ্ছি না৷' দেখলাম তালিকায় দেখানো আছে টোলট্যাক্স ইত্যাদি মিলিয়ে ৯০ ডলার৷ আমরা প্রতিবাদ করে বললাম যে, এ পর্যন্ত ভাড়া ৫৫ ডলারের বেশি হবার কথা নয়৷ আমরা সেকথা বলেই গাড়িতে উঠেছি৷ আপনি এখন অযথা আমাদের চাপ দিচ্ছেন৷ যাইহোক, কোনো যুক্তিতেই কোনো কাজ হল না৷ ৯০ ডলার নিয়ে তবেই উনি গাড়ির দরজা খুললেন এবং লাগেজ নামিয়ে দিলেন৷ আমরা হয়তো আরও তর্কাতর্কি করতে পারতাম বা পুলিশের কাছে যেতে পারতাম, কিন্তু এদিকে ঘড়িতে একটা দশ বাজে৷ মুনিয়ারা কোথায় আছে খুঁজতে হবে৷ তারপর গ্রে হাউন্ড বাস ধরতে হবে৷ জয়দীপরা তখনও গাড়ি কেনে নি।
মাদাম তুসো মিউজিয়ামের সামনে বেশ ভিড়৷ এদিক ওদিক একটু খুঁজতেই মুনিয়াকে দেখতে পেলাম৷ আমাদের দেখেই ও প্রায় কোনো কথা না বলেই একটা লাগেজ ছিনিয়ে নিয়ে প্রায় ছুটতে শুরু করল আর আমাদের বলল—'আমাকে অনুসরণ করো৷' আমরাও কথা না বাড়িয়ে ওর পিছন পিছন ছুটতে শুরু করলাম৷ গ্রে হাউন্ড বাস টার্মিনাসে পৌঁছাতে প্রায় ছ'-সাত মিনিট লাগল৷ তিরাশি নম্বর গেটের কাছে পৌঁছাতে তিনবার এসকেলেটরে নামতে হল৷ দেখলাম তখনও গেট বন্ধ হয়নি৷ ড্রাইভারের হাতে টিকিটগুলি দিতে উনি সেগুলি পরীক্ষা করে আমাদের বাসে উঠতে বললেন৷ ড্রাইভার একজন বিপুলদেহী কালো মানুষ৷ বাসে উঠে দরজা বন্ধ করে উনি মাইক্রোফোনে ঘোষণা করলেন প্রথমে নিজের নাম(নামটা অবশ্য মনে নেই)৷ তারপর গন্তব্য—হার্টফোর্ড৷ সময় লাগবে দু'ঘন্টা পনেরো মিনিট৷ দূরত্ব একশো দশ মাইল৷ মাঝখানে মাত্র একটা জায়গায় বাসটা থামবে যাত্রী ওঠানামার জন্য৷ সময় বরাদ্দ পাঁচ মিনিট৷
বাসে উঠে বসার পরই বুঝলাম মুনিয়ার লাগেজ নিয়ে ছোটার কারণ৷ আর মাত্র দু'তিন মিনিট দেরী হলেই বাস ছেড়ে যেতো৷ এবার মুনিয়া বলল—' আমি আর জয়দীপ ঠিক করি যে, বারোটা নয়, একটা পনেরোর টিকিট কাটা হবে৷ কারণ, ইন্টারনেটে আমরা ট্র্যাক করে দেখলাম যে, তোমাদের ফ্লাইট সরাসরি নিউইয়র্ক আসছে না, প্যারিস হয়ে আসছে৷ আর জে. এফ. কেনেডিতে এগারোটার আগে ল্যান্ড করবে না৷ তাও যদি আর দু'চার মিনিট দেরী হতো তাহলে এই বাসটাও ধরা যেতো না৷'
জে. এফ. কেনেডি বিমানবন্দরে স্থানীয় সময় ৭.২৫ মিনিটে আমাদের ফ্লাইট নামার কথা ছিল৷ কিন্তু ভ্রমণপথ বদল করার ফলে পৌঁছাল ১১.১৫ মিনিট নাগাদ৷ ফ্লাইটে বসে বসেই আমরা ভাবছিলাম জে. এফ. কেনেডি বিমানবন্দরে নেমে কতক্ষণে মুনিয়ার কাছে পৌঁছোতে পারবো৷ ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁতেই দুর্ভাবনা শুরু হল৷ কারণ, জানা গেল এগারোটার আগে বিমান কোনমতেই জে. এফ. কেনেডি বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারবে না৷ অথচ জয়দীপ-মুনিয়ার সঙ্গে কথা বলা আছে ওরা ম্যানহাটনে মাদাম তুসোর মিউজিয়ামের সামনে গ্রে হাউন্ড বাসের বারোটার টিকিট কেটে দাঁড়িয়ে থাকবে৷ ওরা আরও বলেছিল যে, বিমানন্দর থেকে ম্যানহাটনে পৌঁছোতে খুব তাড়াতাড়ি হলেও চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে ট্যাক্সিতে৷ দূরত্ব চল্লিশ মাইল৷ ফলে স্বভাবতই দুর্ভাবনা ও রক্তচাপ উত্তরোত্তর বাড়তেই লাগল৷
ইমিগ্রেশন কাউন্টারের আমেরিকান ভদ্রলোক জানতে চাইলেন আমরা কতদিন ওদেশে থাকব৷ আমাদের উত্তর শুনে উনি আমাদের পাসপোর্টে ছমাসের জন্য ওদেশে থাকার মেয়াদে সিলমোহর মেরে দিলেন৷ ওঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা সিকিউরিটি চেকিং-এর জন্য আবার একটি লাইনে দাঁড়ালাম৷ 'সঙ্গে মুগডাল, মশলাপাতি, মটন, সন্দেশ এসব আছে তো?' হঠাৎ নির্জলা বাংলায় এমন প্রশ্ন শুনে সিকিউরিটির ভদ্রলোকের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি তাঁর বুকে লটকানো কালো ব্যাজটায় লেখা আছে HALDER. দেখি তাঁর মুখে স্মিত হাসি৷ আমরাও হেসে উত্তর দিলাম—'আরে, আপনি বাঙালি! আগে লক্ষ্য করিনি৷' তারপর তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তরে পাল্টা জিজ্ঞাসা করলাম—'ওসব জিনিস আনার কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?' উনি বললেন—'অধিকাংশ বাবা-মা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের জন্য এসব জিনিসই নিয়ে আসেন৷ ভাবেন, এদেশে ছেলেমেয়েরা এসব জিনিস খেতে পায় না, ক'টা দিন একটু আরাম করে খাবে৷' কিছু মশলাপাতি এবং শুকনো ফলটল যে আমরাও নিয়ে এসেছি তা জানাতে আর লজ্জা পেলাম না৷
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বারোটা বাজতে আর দশ মিনিটও বাকী নেই৷ ট্যাক্সি স্ট্যান্ডটা কোনদিকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর দু'এক জনকে জিজ্ঞাসা করছি৷ হঠাৎই একজন ধোপদুরস্ত মার্কিন ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন—'আমার সঙ্গে আসুন৷' আমাদের তখন ভীষণ তাড়া৷ তার উপর আমাদের মোলাইল-এ ওখানকার মোবাইল কোম্পানি AT&T-র রেজিস্ট্রেশন কিছুতেই করাতে পারলাম না৷ ফলে ভাগ্যে যা আছে হবে, এরকম ভাবতে ভাবতে ওই ভদ্রলোককে অনুসরণ করলাম৷ ভদ্রলোককে দেখে আমরা প্রাথমিকভাবে ভেবেছিলাম উনি এয়ারপোর্টেরই কোনো দায়িত্বশীল আধিকারিক৷ সুন্দর চেহারা, সুবেশ এবং ভীষণ মার্জিত ব্যবহার৷ ভেবেছিলাম উনি বোধহয় আমাদের ট্যাক্সিস্ট্যান্ডটা কোন্ দিকে সেটাই বুঝি দেখিয়ে দেবেন৷ কিন্তু ভুল ভাঙলো যখন উনি আমাদের নিয়ে হাজির হলেন প্রাইভেট কার পার্কিং-এ৷ আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে উনি অদূরে রাখা এক বিশাল শেভ্রলে গাড়ি নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হলেন এবং নিজেই আমাদের লাগেজগুলো গাড়ির ডিকিতে তুলে বললেন—'আসুন৷'

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন