লেবেল

বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২০

একগুচ্ছ কবিতা /বিমল মণ্ডল


১.
খবর



হাইরোড়ের  ধারে রোদ্দুর  মাথায় শুয়ে
এলোমেলো কয়েকটি  মুড়ি চারদিকে  ছড়িয়ে 
ভি আই পি গাড়িতে কয়েকটি লোক চলে যায়
ফুটপাত কাঁদে লোকটার খবরের আশায়। 


আমিও  সব দেখতে  থাকি, তখনও  অসহায় 
অযত্নে  মানুষের  কর্তব্য দাঁড়িয়ে  রাস্তায়
হঠাৎ খবরে  কয়েকটি সদস্য কাঁদছে  শোকে
ভাবতে  থাকি নিয়তি কাঁদে দুঃখে ও সুখে।




২.
ফাগুন মনে



ফাগুনের বনে রাত জ্যোৎস্না আনে
আজ আমি একা শুধু উজ্জ্বল মনে
বসন্ত প্রেম লাগে নদীটার পাশে
কত পাখি উড়ে যায় ধানসিঁড়ি শেষে। 

আজ তবু অদ্ভুত জিজ্ঞাসা  আনে
ফাগুনের  হাওয়ায়  ভাসে তার প্রাণে
পলাশের বনে বনে কত রঙ ধরে
ফাগুনের  প্রেম শুধু  মানুষের  তরে।







৩.
পরদেশী 


ভোরের আলোর পাশে দাঁড়িয়ে  
পরদেশী  সূর্য 
দরজার  বাইরে একমুঠো  স্বচ্ছতা
ছড়িয়ে ঠিক সত্যের  মধ্যে 
যা কিছু টান তা সহজ শব্দে 
বাতাসের মতো  ভাসমান  আমি
নিষিদ্ধ  শরীরজ্যোতি  ছুঁয়েছে  
সত্যের চেয়ে বেশি

আমি সেই ভোরের আলোর পাশে
দেখেছি এক ষোড়শী কন্যা  
রূপ-লাবণ্যে  আকৃষ্ট  পরদেশী





৪.
মা


রাতের তারারা কথা বলে গোল  করে
কতগুলো  ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ায়
গ্রাম পথ স্বচ্ছ আলোয় থাকে আনন্দ সুরে 
মায়ের চারপাশে কত আলো খেলা করে। 

এপাশে -ওপাশে যাওয়া-আসা   কত তারা করে
অফুরান  হাসির শব্দ আমায় দেখতে পেয়ে
মায়ের অভাব দূর  হয় তারাদের ঘরে
কপালে  আলতো চুমু বিছানার পরে। 

সব আদর মুছে যায় ভোরের আলোয়
মায়ের  কথা শুধু সারা জীবন মনেতে রয়।


৫.
প্রকৃতি 



উন্মুক্ত  বারান্দায় 
কয়েকটি  চেনা মানুষ 
হেঁটে  যাচ্ছে আনমনা হয়ে
হঠাৎ  এক প্রকৃতির রূপ-লাবণ্যে 
স্বচ্ছ  আলো ছড়িয়ে পড়ে
কয়েক জনের চোখেমুখে 

প্রকৃতি চুপিচুপি  হাসে
করুণা  করে 
হঠাৎ  দমকা  হাওয়ায় 
মানুষগুলো  বাসস্থান  খোঁজে 
একে অপরের দিকে আঙুল  দেখায়

প্রকৃতি  আবারও  হাসে
শান্ত স্নিগ্ধ প্রকৃতির  দিকে
হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো 
শুধু  তাকিয়ে থাকে।




৬.
 মধ্যবিত্ত  তারার আদলে 



 কোনো কিছু  তোমাকে সে ভাবেই বলিনি
ঠিক বলা হয়ে ওঠে  নি
ভাঙা বৃষ্টির গন্ধ, আলসে সূর্যের  শয়ন
ফোঁটা  ফোঁটা জলের টীকা 
আবছায়া নিমন্ত্রণ 
হাল্কা বাতাসে ভাসে  আধটু ভালোবাসা 
বারান্দা আর উঠানের  মাঝখানে নির্জন  রাত্রি 

ঠিক যেন সাজানো  মধ্যবিত্ত  তারার  আদলে।




৭.
বিষণ্ণ  হাতে




দীর্ঘদিন  তেমন  কোনো  কথা বলছি না
কেন তা হয়তো  সবাই জানে। হাসপাতালে বুকের ব্যথারা ব্যস্ত  ছিলো 
তুমি হয়তো  কয়েকদিন ধরে মুখ ফিরিয়ে নিলে। 


প্রতিটি  রাত ছিলো  মৃত্যুর  পরোয়ানা 
নিজেকে  খুঁজে পাইনি  এক মুহূর্ত   হলেও 
ভুলে  গেলে  তোমার গড়া  এই সম্পর্ককে
বেঁচে  যখন  ফিরি ভেবেছিলাম  সঙ্গী পাবো তোমাকে। 

অর্ধেক  বিষণ্ণ হাতে দাঁড়িয়ে  তোমার  পায়ের কাছে
কিছুটা সংশয় মনে, তবুও তোমার স্নেহ  এখনো মনে আছে।



৮.
বোধ 



টাপুর টুপুর বৃষ্টি  পড়ে
    এই ঝড়েতে  রিক্সা  আসে
বৃষ্টির মধ্যে মহিলা যাত্রী 
      রিক্সার সীটে  উঠে বসে। 

বৃষ্টির গতি বেড়েই চলে
    ভিজতে থাকে রিক্সাচালক
ছাতা ধরে এগিয়ে বলে
     ছাতার মধ্যে  ধীরে  চালক।

চালক আনন্দে গান ধরে
     বৃষ্টিতে মহিলাটি ছাতা ধরে
এই বোধ  আসুক সবার চাই
     মানবিক বোধ যেন সবার ফিরে।



৯.
জীবনছবি

না যদি তোমাকে মেনে চলি
নিশ্চিত তুমি মেনো না 
দিন আনি দিন খাই তাও বলি
আমার চাওয়াটা নিশ্চয়ই জানা। 

তোমার সংকোচে  ভেঙ্গেছে মন
সংশয় শুধু প্রশ্ন করার
কত-শত অভিমান পেয়েছি যখন 
স্নেহের ময়দানে দেখি আবার। 


আমি তোমার প্রহরী  হতে চেয়েছি
রাত কিংবা  দিনে পাই স্নেহময় ছায়া
জীবনছবি তে তোমাকে তুলিতে এঁকেছি
উন্মুক্ত হৃদয়ে পেয়েছি তোমার মায়া। 


কতদিন  কাটবে না এই সংশয়? 
 তোমার জীবনছবি আমারই মতো  হয়।




১০.
নদীর গান




নিশিযাপন  নদীর জলে গান
ধ্রুপদী নৌকো বুনে চলে সময়
জলের খেলায় মাতে জ্যোৎস্না যান
নৈঃশব্দ্য  রাত্রি ছড়ায়  আলোয়। 


মাঝিরা কোলাজের সংকেত পায়
নদীর  স্রোতের প্রতিটি ইশারা 
সুমধুর ঢেউ খেলা স্বচ্ছ আলো চায়
তুমুল জলের দ্বন্দ্ব, মাঝিরা দিশাহারা। 


 রাত্রির  কোলে প্রভাত আয়না 
নদীর জলে কত সুর তোলে বাজনা।



১১.
সংকেত

স্ব-শরীরে তুলে তুলে নেয়  বর্ণমালা 
আকাশ যাপন  তখন করছে শেষবেলা
শব্দের ঢেউ ঢেউয়ের  ঠোঁটে ঠোঁট  চুম্বন 
কবিতার ঘরে হলুদ বিকেল সন্ধ্যায় পণ। 

পাতাঝরা গাছে পাখিরা শব্দের ঘর বুনে
অক্ষর অক্ষর  ঠোঁটে  কত শব্দ  আনে
ভিজে যাওয়া নদী  ঢেউ তুলে  করে প্রেমালাপ 
সংকেত তার শব্দমুখর আয়োজনে আলাপ। 

বর্ণের গায়ে সাদামাটা  শব্দের  ব্যবহার 
ছোটো ছোটো কথা সংকেতে আসে বলার।



১২.
ঠিক ততটা  ভাবিনি 


কবিতার গঠন থেকে দূরে সরে এসেছি 
সবার ভালোলাগার কথা লুকিয়ে শুনেছি
অসম্ভব বিশ্বাসে  সমালোচনায় বেঁচে আছি
কতটা স্তিমিত হয়ে শুয়ে শব্দ শব্দ খেলছি। 

ঠিক যতটা  খারাপ  ততটা  ভাবনায়  আসেনি 
অপূর্ব বিন্যাস জালে অক্ষর অক্ষর পোশাক 
আমি স্পষ্ট শুনতে পাই পাখিরা ডাকেনি 
কি জানি কতটা সময় আমার জন্য ঠিক। 

শুধু  কলম সৌখিনতা, আবোল -তাবোল বলে
মনের আঙ্গিকে ঠিক যতটা ভাবিনি, ততটাই  চলে।



১৩.
নদীসঙ্গম



রোজ রোজ নদীর  মানচিত্র পাল্টায়
আপেক্ষিকতা  নদীর  নাচমুদ্রা
কখনও  আসে ফণা তোলে ঢেউ চুম্বন নৌকায় 
খেয়ালের বসে সংগোপনে প্রেমালিঙ্গণ । 

নরম  শরীর স্থিতি নয় মনের গভীরে  যাই
কত মুক্তো দেখার লোভে মুক্ত অরণ্যে  ডুবি
তরী-ভরা মুক্ত  তুলে তোমারই  প্রেমাসক্ত হই
প্রবাহমানতা সারা নদী জুড়ে উত্তাপে উত্তাপে । 

মুগ্ধ প্রেম, নদীসঙ্গম সারা নদী  জুড়ে 
মাছেরা উলঙ্গ শরীরে নদীর  কামনা ঘিরে
ব্যভিচারের  শেষ  অঙ্ক  নদীর  শরীরে 
কতশত  সঙ্গম দাগ ধুয়ে যায়,  হয় মাধবী ।




১৪.
 রোদ কোলাজ



আকাশের  সাথে মিলের বিশ্বাস 
মেঘেরা সাদা বেলুনের মতো উড়ে 
রোদের গায়ে কলঙ্কহীন, ছাড়ে নিশ্বাস
তবুও  কোলাজ বুনে সকাল , দুপুরে। 

আদি- অন্ত সবিনয়  নিবেদন  ঘিরে
শান্ত - দুষ্টু  রোদ পোশাকের  আড়ালে
কতকথা  মেঘ আর আকাশ চুপচাপ সারে
ঝড়ের শিল্পী  রোদ ঢেকে নাচে তালে তালে । 

রোদ খেলা  শুরু  হয় ঝড়ের ছন্দে 
কোলাজ বুনে যায় সময়ের রোদে।




১৫.
- প্রার্থনা 



গোছানো  হয়নি ঘরে বাইরের সমস্ত কাজ
সময়ের  আতঙ্কে ঘরে বাইরে সাবধান 
সর্বত্র খুঁজে পায় আমি, আমি নামক কাজ
পরীক্ষার আয়োজনে আলাপ শুধু ব্যবধান । 

দেশ, রাষ্ট্র সামগ্রিক বাঁচার প্রার্থনা 
ভাইরাস মুক্ত  করার কর্তব্য সমাজে  সবার
চারদিকে  হাহাকার ভাসে, দেখে আয়নায় 
মারণ রোগ থেকে  বাঁচতে  প্রার্থনা এবার । 

শিশু থেকে  বৃদ্ধ করে আয়োজন 
সারি সারি মৃত্যু মিছিলে, ঈশ্বর তোমাকে  প্রয়োজন। 




১৬.
সুখ


বিশ্ব সুখ দিবসে সুখ কিনেছি
ছোট্ট  পরিবার তৈরি  করেছি
সুখ পেয়েছি মনের আয়নায় 
ছেলে - মেয়ে আর দু'জনায়। 

আকাশ ছোঁয়া আনন্দে  মেতে 
সুখী দিবসে সবাই চাই সুখী  হতে
হাসি খুশিতে  আমরা  সবাই
ছোট্ট  পরিবার  বিশ্বে যেন চাই।



১৭.
আপন করে নিও


আমি সাজিয়ে কথা বলতে পারিনা 
হৃদয় টুকু আছে
যা দিয়ে ভালোবাসতে পারি
কতগুলো  সময় ঢেউ খেলে
অপূর্ব  বিরহের গন্ধ 
আমার শরীর  জুড়ে 

তোমার অপত্যস্নেহে বশীভূত 
কত শব্দকথা আঁকি
হারানো  মনে ফিরে পাওয়ার  আশ্বাস 
বেঁধে  রেখেছো প্রেমে
তোমার রক্তের দাগ নেই 
আমার শরীরে 

তবুও  মন ছুঁয়ে যায়  
আত্মার  অস্তিত্বে 

এ এক বিরাট পরিচয়
যে ভাবে আপন করে নিও
তা যেন তোমার  আশীর্বাদ। 








১৮.
 বিদ্যালয়ের  চায়ের বাগান 


আমার বিদ্যালয়ে দার্জিলিঙের  চায়ের বাগান  বসিয়ে
সমস্ত গ্রামের থেকে  আসা  মানুষের  কোলাহল 
আনন্দে  গান ধরে ছোটো ছোটো  ছেলেমেয়েরা 

যে কোনো  দিন গ্রাম ঘেরা বিদ্যালয়ে 
আনন্দ সমাগমে চা শ্রমিক  হয়ে
একদিন চা পাতা তুলতে  থাকবে... তুলতে থাকবে

সারি সারি ছেলে - মেয়েরা  দাঁড়িয়ে  পড়বে
বিদ্যালয়ের  ক্লাসের বেল পড়ার সাথে সাথে গ্রাম সড়ক ধরে

হলদি  নদী জলজ চুড়িদার পরে
তেরপেখ্যা থেকে  আমার বিদ্যালয়ে  চা বাগানের  দৃশ্য পট দেখবে
শিক্ষকগণ চা শ্রমিক  সেজে
চা পাতা নিয়ে যায় ঘরে

পুকুরের  মাছ জলে ভেসে 
জল গহনা পরে
পুরনো  ফুলের  বাগানে  নানান ফুলের  বাহার

খেলার মাঠে গজিয়ে  উঠে  কচি কচি সবুজ ঘাস
সবার থেকে  বেরিয়ে  আসা
শীতার্ত  সন্ধ্যায় আবছা কুয়াশায় ঢেকে যায়
অনন্য মায়াবী জালে 
আমার বিদ্যালয়।



১৯.
কবিতা  কেন লিখি




কবিতা  লিখি 
তা কেন লিখি?
এই প্রশ্ন  প্রতিক্ষনে মনে পড়ে
আমার শৈশব , কৈশোর  খুঁজে বেড়াই 
শুধু  আমার কবতায়
মায়ের আঁচলের  দাগ 
এখনো  আমার মনে

আমাকে মনে করায়
ভালোবাসা , সমাজনীতি , রাজনীতি আর প্রেমের  বাস্তবতা 
যে মেয়েটি  ধর্ষিতা , শত ছিন্নভিন্ন  শরীরে  শুয়ে
তার কথা লিখি
আমার কবিতা প্রতিবাদী  হয়ে  উঠে তখন 
যখন  সমাজে অন্যায়ের  ছবি ফুটে ওঠে 
আমি যখন  একা থাকি 
কবিতা  আমার প্রিয়তমা  হয়

আমার দারিদ্র্য, আমার যৌবনের  স্মৃতি 
লিখে  যায় যৌবনের  অসহায় দিনগুলো 

আমি লিখে  যাই 
আমার ভালোলাগা আর ভালোবাসার কথা।


২০.
বিশ্বাস  কর


তুই বিশ্বাস  কর মনে পড়ে নানা কারণে 
আমার হাতের মুঠোয়  শূন্যতার ঝুলি
তোর চোখে নব নক্ষত্রের  আলো জ্বলে
আপাদমস্তক  প্রেমের  শৈলীতে

যেন আমার  জীবনে  এখুনি  নেমে আসবে শেষ  ভূমিকম্প 
আমার দু'চোখে  চিরকাল  বিষণ্ণ   শবের সমাধি 

হঠাৎ  তোর নরম  শরীরে উইপোকার  মতো  ছড়িয়ে করোনা 
পবিত্র পাথরের  মতো নিশ্চুপ  ভালোবাসা 

তুই বিশ্বাস কর 
একমাত্র  উপায়  আমার প্রার্থনা 
তবুও  যেন আমার চেয়ে সুখী  লোকের  মতো  হেঁটে  যেতে পারিস। 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন