হারাতে হবে
বাতাসের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে ভেসে আসছে একটি শয়তান
সমস্ত সবুজ ঘাস , সমস্ত নক্ষত্র মুহূর্তে জ্বলে
গহন রাত্রির নিথর কঠিনতার ভেতর নির্জনতা
মানুষ হৃদয়কে অসাড় অন্ধকার কক্ষের ভেতর
রেখে, খুঁজে পাই বাতাসের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে ভেসে আসা শয়তানটি মানুষগুলোর রক্তের মধ্যে মিশে
আর ঘণ্টা , দিন নয়, সেকেন্ডর মধ্য শুষে নিচ্ছে শিরা, উপশিরা অস্থিমজ্জা
প্রাণ ঘাতক হয়ে মৃত্যুর স্তুপ করে নির্মাণ।
সেই দূরত্বকে ভেঙে দিচ্ছে নক্ষত্র গোধূলি , রাতের চাঁদ, ভোরের আকাশ
আমরা ঘরের মধ্যে জানালার ভেতর কক্ষে
সবুজ বাতাসে দস্যুবাহিনীর নৃত্য , যে উন্মাদ মহেশ্বর
আতঙ্ক এই জীবনের স্রোতে - শত, লক্ষ, কোটি জীবন যুদ্ধ সাথি
বাতাসের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে ভেসে আসা শয়তান - দস্যুবাহিনীকে হারাতে হবে
নির্দিষ্ট মানব কক্ষ থেকে।
২.
একদিন আসবে
জানি, তুমি আজ নেই আর -
তবে গোটা পৃথিবী জুড়ে কোথাও না কোথাও তুমি আছো
সে সান্ত্বনায় আমার বেঁচে থাকা
আমার প্রতিটি পাণ্ডুলিপিতে -তোমার সোনালী স্বপ্ন
তবুও আমার মনে বিস্ময়ের পর্দা
সরিয়ে নিয়ে যায় বৃষ্টির আশ্চর্য ছায়ায়
দূর অন্ধকারে দেশে শোনা যায়
কারা যেন মৃদুস্বরে কথা বলছে
রহস্যময় কথা আঁকাবাঁকা পথে সত্য হয়ে ওঠে -
তুমি আবারও একদিন আসবে।
২.
মৃত্যুরা খেলা করে
গৃহবন্দী যে কতদিন? সবার মনে প্রশ্ন
দেশে - বিদেশে বয়স্করা মারা যায়
ছিঁড়ে খায় ছিন্নভিন্ন শরীরী ফুসফুস
কত অদৃশ্য দানব সেনাবাহিনী
প্রতি রাতে স্বপ্নের মধ্যেচমকে উঠি
কত মৃত্যু ঢেউ ছুটে আসে
অগনিত ঘরে ঘরে
সোনালী সবুজ দেশে
মৃত্যুর শরীরে জ্যোৎস্নার আস্বাদ
গুটি গুটি নক্ষত্রেরা হাসির গান ছেড়ে
অন্ধকারে ডুবে যায়
প্রতিটি জীবনের আকণ্ঠ আলিঙ্গনে
মৃত্যুরা খেলা করে।
৩.
শরীর থেকে শরীরে
একজন, দুজন... দেখতে দেখতে
হাজার, লক্ষজন ছাড়িয়ে
এগিয়ে যাচ্ছি অনেকে মিলে, সামনে খাদ দেখি
সাবধান শুধু সাবধানে থাকার শব্দ
কালো মেঘে আর উন্মাদ বাতাসে
অনেকের সাথে মৃত্যু ভয়
বহুলোকের গাজন নষ্ট
আমার একার বিবাদ নেই
দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটি
অসময়ের চাপা শ্বাস, গোপন কামড়
শরীর থেকে শরীরে।
৪.
শিশুটি মৃত্যুর ভেতর হারিয়ে গেলেও...
অন্ধকার রাত্রি,চারদিকে মৃত্যুর গল্প -
সারা গ্রাম - শহর দিন -রাত শুনশান করছে
শুধু পাখিদের সময়
আকাশে - বাতাসে কোলাহল জুড়ে আনন্দের সুর তোলে
হঠাৎ একটা শিশুকে নিয়ে
মা ছুটে চলেছে
চোখে শুধু জল, বোবা মুখে
সন্ধ্যার ভিতর ছেঁড়া ছেঁড়া আলো তাও হারিয়ে যায়
তার মনে হয় শিশুটির ঘুমের প্রয়োজন ছিলো
প্রয়োজন ছিলো এই শান্তির
হাঁটতে থাকে গ্রামের অলিগলি পথ ধরে
অবাক চোখে সবাই চেয়ে
জীবনের শেষ আকাঙ্খা
পৃথিবীর পথে ভয়াবহ শিশুটির ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতা ধরা পড়ে
আমাদের মতো শিশুটিও দেশের মানুষ
তার হৃদয়ে নির্জন শান্তির আঘ্রাণ জাগিয়ে
মা ও রহস্যময় অন্ধকারে হারিয়ে যায়
শিশুটি, শিশুটির মা ও পৃথিবীর দেশের মানুষ
কত মা এক নিঃশব্দে সেতু বিছিয়ে রেখেছে
গভীর নিঃস্তব্ধতার মধ্যে কত শিশু সাদাকাপড়ে মোড়া
শুধু শিশু নয়,বয়স্কদের মৃত্যুর মিছিল মহাশ্মশানে
নীরবতা, আত্মত্যাগ ও সাহসে
বিচিত্র এই মহামারীর দিকে তাকিয়ে
আজকের এই কোলাহলময় পরিবেশ ছেড়ে গৃহবন্দী ক্যাম্পের অর্থ বুঝতে পারি
সে শিশুটিও সারাবিশ্বের নীরব দিন রাত্রির অর্থ বোঝে ছিল
বুঝতে পারি এক-একবার
দৃষ্টি পড়ে, কত চেনা মুখ হারিয়ে যায়
ঈশ্বরও নিঃস্তব্ধ, বিজ্ঞানও স্তব্ধ
চেয়ে দেখি আজ ঘাসের মতন শব্দহীন সারাবিশ্ব জুড়ে মানুষ গৃহবন্দী
অথচ যে শিশুটি মায়ের কোলে ছটপট ছটপট করে মারা গেল
সারা পরিবারেও আত্মঘাতী জ্বরেও
এই পৃথিবীর সুন্দর গহন রূপ ছেড়ে
শিশুটি মৃত্যুর ভেতর হারিয়ে গেলেও...
কত মৃত্যু আজ গীর্জা, মন্দির , মসজিদ পেরিয়ে
হাসপাতালের মর্গের ভেতরে।
৫.
ছেলেটা খেলা করে
আজ দুপুরে দেখলাম ছেলেটি ছুটছে
খোলা গায়ে আনন্দের ঢেউ চোখে মুখে
গ্রামজুড়ে সাবধানে থাকার প্রচার চলছে
মা ছুটে যায় হাসপাতালে ছেলের মুখ ঢেকে।
ছেলেটি মারা যায় আত্মঘাতী রোগে
মা বসে খোলা আকাশের নীচে কাঁদে
জীবনের আকণ্ঠ মৃত্যুর জোয়ার, যায় দেখে
কিন্তু তবু সে মৃত, খেলা করে শুধু চাঁদে।
বিশ্বাস হয়নি আমার, কয়েকদিন ঘরে বসে
রাতে ঘুমের মধ্যে জেগে উঠি মৃত্যুর আতঙ্কে
পৃথিবীকে আস্বাদ করি জীবনের শেষে
ছেলেটা আজও খেলে চলেছে জীবন অঙ্কে ।
৭.
করোনা কে আক্রমণ
মানুষের ভীড় নেই আর পথে পথে
ট্রেন, বাস, এরোপ্লেন বসে নিজের ঘরে
আক্রমণ আক্রমণ, শুধু করোনার সাথে
দেশ - বিদেশে শব শুধুই শব,চোখের জল ঝরে।
ডাক্তার , নার্স, হাসপাতাল আছে সময় মতো
দিনের আলোয় করোনাকে খুঁজে চলেছে
সচেতনতা গড়ে তোলাই, মানুষ করবে যত
করোনাকে আক্রমণ, সবাই ঘরে বসে করছে।
এই পৃথিবীর পথে মানুষের মুখ বদলায়
সবুজ অন্ধকারে অকপট হাসি মিলিয়ে
ঔষধের সংকট দিকে দিকে সময় পাল্টায়
করোনার আক্রমনে মানুষ মৃত্যুর দিকে তলিয়ে ।
আর নয় করোনা, ভয় করবো না তোমাকে
গৃহবন্দী আমরা, তুমি মৃত্যুর ভয়ে মরবে
আর মাত্র কুড়িদিন , তারপর খোঁজে বেড়াবে প্রিয়জনকে
ঈশ্বরের কাছে সবুজ নিবেদন, করোনাকে আক্রমণ করবে।
পৃথিবীর পাখিদের চোখ ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়
আমাদের পৃথিবীতে আচ্ছন্ন আশা জগতে জেগে
বিস্তৃতির ওপারে নীরবতার জন্য আর নয়
খুঁজে পাই অস্ত্র ঘরে থেকে আক্রমণ, করি আগে ভাগে।
৮.
ঘুম নেই চোখে
ঘুম নেই চোখে সারাদিন -রাত ঘরে বসে
পাখিরা ডানা মেলে ভেংচি কাটে জানালার পাশে
সকালের চায়ের উষ্ণতা ওরা নেয় সুঘ্রাণে
মিটিমিটি চেয়ে রসিকতা সুরে আঘাত দেয় মনে।
বাদামি, হলদে চকোলেট পাতার ভীড়ে
এক-একবার ছুটে আসে রহস্যময় ঘরে
বুঝতে পারি মৃত্যুর খবর ঠোঁটের ভাষায়
আমার চোখে কিছতেই ঘুম আসেনা বিছানায় ।
হলুদ বিকেলে আকাঙ্খা জাগায় আমার হৃদয়ে
তখনও জানালার পাশে আমি আর পাখিটি।
৯.
-ঘরে ফেরার পথে
বিমল মণ্ডল
এখনো হাঁটছে
পা থেকে রক্ত ঝরছে
ছেলে মেয়ে সহ সমস্ত পরিবার
হাজার হাজার মানুষ জীবন যুদ্ধে
হেসে খেলে দিন কাটায়
সহসা বৃষ্টি ঝরছে এক সাথে
সম্পূর্ণ পৃথিবীতে
খাদ্য, স্বাস্থ্য হাহাকার নিয়ে বৃষ্টি ঝরছে
পৃথিবীর সব সময় গিলে ফেলে
এখনো বৃষ্টি ঝরছে
বৃষ্টি ঝরছে বলেই সবাই আজ গৃহবন্দী
মাঝে মাঝে শিলা বৃষ্টিও ঝরছে
কাজ নেই, শিশুরা অভুক্ত , পরিবার আসুস্থ
পৃথিবীর সব প্রান্তে বসে
বৃষ্টির লম্বাজিভ চেটে খাচ্ছে
মানব মনের স্বাদ
অভাব টেনে নিয়ে যায় ফুটপাতে
সেখানেও বৃষ্টি ঝরছে
সংসার টেনে ফিরে যাবে নিজের বাড়ি
তাতে ও যন্ত্রণার বৃষ্টি
হাঁটছে শুধু হাঁটছে
পা থেকে রক্ত ঝরছে
শিশুদের পেট জ্বলছে
সারা রাস্তা জুড়ে বৃষ্টিও ঝরছে
এক, দুই, তিন কিলোমিটার... একশো , দু'শো... হাজার কিলোমিটার
শুধু হাঁটছে
ঘরে ফেরার পথে শুধু হাঁটছে
সারা রাস্তা জুড়ে আতঙ্ক আর ভয়
কতগুলো বিশ্রামের ছায়ায় বৃষ্টি ঝরছে
সারি সারি মৃত্যু
শ্মশানে আগুন
তাতেও বৃষ্টি ঝরছে
ঘরে ফেরার পথেও
আনন্দে বৃষ্টি ঝরছে ।
১০.
আবার ফিরে আসে মৃত্যুর শতাব্দী
কয়েক শতাব্দীর আগের গল্প
দিনের শুরুতে , সন্ধ্যায় মৃত্যু দাঁড়িয়ে
হাতছানি দেয় কলেরা, প্লেগ কালাজ্বর
বসন্তের বটবৃক্ষের আবছায়া বসে আছেন বিজ্ঞান
গাছের থেকে একে একে খসে পড়ছে তারা
বিস্তৃত পরীক্ষার সাক্ষী এই শতাব্দী
প্রশ্ন আসে মনে
কেন অসময়ে এই মহামারি? কেন এতো আতঙ্ক? কেন এই বিনাশ?
প্রশ্ন থেকে যায়, উত্তর নেই
জানতে চাওয়া কঠিন পাথর ঝলসে দেয়
এই শব্দ- স্বর
আমরা ঘিরে রয়েছি প্রতিটি মুখকে
সত্যতা খুঁজি শতাব্দীর শব্দ গুলোতে
তোলপাড় করে দেখি আমাদের স্পন্দে
আমাদের সুক্ষ্ম অনুভূতিগুলো জেগে ওঠে
স্বপ্নে
সচেতনতা গড়ে তুলি হৃদয়ে হৃদয়ে
তবে কেন এই শতাব্দী শুরুতেই মৃত্যুর ঢেউ?
নিরাপদ স্বরে বলছি, দেখছি, শুনছি
কি ভাবে মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে
অন্ধকার নেমে আসে চোখে
পায়ে পায়ে মৃত্যু প্রতিটি বাড়ির দরজায়
মূহুর্তে ঢুকে পড়ে নিজের ভেতরে
রুদ্ধশ্বাস শুধু প্রাণ থেকে প্রাণে
এক-একটা খবর কীভাবে উড়ে যাচ্ছে
এক-একটা মানুষ কিভাবে তারাদের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে
এই মৃত্যুর উৎসব ঘিরে ঘিরে নেচে উঠছে
এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ হিরো
যার চোখের দিকে তাকালে ঝলসে দেয় শরীর
পুড়ে যাচ্ছি আমরা সময়ের ধারাপাতে
আজ চারদিক নিঃস্তব্ধ
বাসায় ফেরা পাখিদেরও শব্দ নেই তেমন
আকাশ থেকে তারাদের জল ঝরে পড়ে
বাতাস ভুলিয়ে দিচ্ছে সংসারসীমা
ঘুমের মধ্যে শরীর লাল, নীল, সবুজ বর্ণ ধারণ করে
অন্ধকার জ্বলে উঠলো হাজার হাজার শব
তবুও বাঁচার লড়াই
এই অবোধ পৃথিবীতে
তুমি আমি -আমার, তোমার, -আমাদের সকলের জানি
তাই তুমি আমাকে, আমি তোমাকে বাঁচাবো বলে তাই একটু দূরে দূরে
ধুলোতে নামিয়ে দিয়েছে মৃতদের হাড়
আসুন, এই শতাব্দীর শুরুতেই আমরা গৃহবন্দী হয়ে থাকি
মৃত্যুর থেকে বাঁচবো বলে
একবার সবাই মিলে নিরব হয়ে দাঁড়াই।
১১.
আবদ্ধ ঘরে
লকডাউনে শিশুরা সব
থাকে আবদ্ধ ঘরে
কি করবে খুঁজে না পায়
সারা ঘরে দৌড় করে।
খেলার মাঠ শুনশান
কেউ কোথাও নেই
মুখোশ পরে ঘুরছে সবাই
আর নেই ভাই ভাই।
মায়ের বকুনি শুনতে শুনতে
ভালো লাগেনা মোটে
আবদ্ধ ঘরে কি করে কাটাবে
নেই শিশুদের ঘটে।
এটা খাবো, ওটা খাবো
করে শিশুরা বায়না
চারপাশে করোনার মারণ ব্যাধি
ও সব করা যায় না।
শিশুদের মনে বড়ো ব্যথা
কত দিন থাকবে এ ভাবে
কি করবে পায়না খোঁজে
দুঃখ শুধু খেলার অভাবে।
১২.
অঞ্জলি
সামনে শবের সারি, অদূরে সময় আতঙ্ক
অসংখ্য মানুষের ভীড়,অফুরান জিজ্ঞাসা
মুখোমুখি মাক্স মুখোশ্রীভরা, বাঁচার আশা
বিদেশ-দেশে ইশারা বাজায়, মেলেনা অঙ্ক।
কণ্ঠে বজ্রকঠিন মারণসম , দোটানা সংশয়
সাদা পোষাকে সেবক- সেবিকা, পরিচর্যায়
আয়ু গুনে পরিবার ভাবে সমাধান, খোঁজে উপায়
ত্রিভুবনে আর পথ নেই , তৈরি হয় সময়।
যেভাবে অন্ধকার গুটিগুটি হারায় শূন্যতাকে
তবুও ইষ্টদেবতার নাম, অঞ্জলি দেয় তাকে।
১৩.
জীবনের মানে
গ্রামার পাশে নদী -নদীতে নৌকা
আমি বসে আছি দুই কূল জুড়ে
সারি সারি ঝাউ আর -নদীর মাঝে দ্বীপ
অনেকটা হাঁটা পথ, যাই নৌকা চড়ে।
সকালের নরম আলো,স্বচ্ছ আয়না
মাঝি কবিতা পড়ে, নদীর পাতায়
বিকেলে সবুজ লাল আলো জ্বলে
আমি মানে খুঁজে বেড়াই জীবন খাতায়।
গ্রাম ঘিরে অন্ধকার আকাঙ্ক্ষার পানে
পেছনে গোলাপি ঘ্রাণ, পাই জীবনের মানে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন