লেবেল

বুধবার, ২১ এপ্রিল, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব—৭)।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 





ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব—৭)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ

বিশ্বেশ্বর রায়


হার্টফোর্ডে পৌঁছানোর সময় ছিল মোটামুটি বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে পৌণে চারটের মধ্যে৷ কিন্তু পৌঁছানো গেল প্রায় সাড়ে ছটার সময়৷ তখনও অবশ্য সন্ধে হতে দেরী আছে৷ এখানে এখন মোটামুটি প্রায় আটটার দিকে সূর্যাস্ত হয়৷ পরে জেনেছি হার্টফোর্ড সহ ইষ্ট জোনে বছরে দু'বার সময়-সারণী পরিবর্তিত হয়৷ 'ডে টাইম' বা দিনের সময়টাকে বাড়াবার জন্য নাকি এমন ব্যবস্থা৷ এখন ভারতের সঙ্গে এখানকার সময়ের ব্যবধান সাড়ে ন' ঘন্টা৷ অর্থাৎ এখানে এখন বিকেল সাড়ে ছ'টা হলে ভারতের সময় ভোর চারটে৷

     বাস থেকে নামার সময়ও একই দৃশ্য৷ ড্রাইভার ভদ্রলোক বাস থেকে নামার সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকটি যাত্রী নামার সময় টেপ রেকর্ডারে বাজার মতো একটানা বলে চলেছেন—'watch your step, watch your step'. শেষ যাত্রীটি নামা পর্যন্ত তিনি এই কর্মটি সুচারুরূপে পালন করে এবার তিনি বাসের গর্ভস্থ  'লাগেজ স্টোর' থেকে প্রত্যেকের লাগেজগুলি বের করে দিলেন ওই বিপুল শরীর নিয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে৷ কোনো বিরক্তি নেই৷ ওটা তাঁর কর্তব্য৷ শেষে প্রায় সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এবং আমাদের মতো বহিরাগতদের সঙ্গে করমর্দন করে হাসিমুখে কর্তব্য সম্পাদন করলেন৷ এবার তাঁর শেষ গন্তব্য বস্টন৷ আমরাও তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে পাশেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ালাম৷ তখনই এক মধুর অভিজ্ঞতার স্বাদ পেলাম৷ প্রায় পাঁচ ঘন্টা বাস জার্নি করে, তার আগে চোদ্দ-পনেরো ঘন্টার ফ্লাইট জার্নি—সব মিলিয়ে আমাদের শরীরের এক বিধ্বস্ত অবস্থা৷ এছাড়া সুমিত্রা পরে এসেছে পিওর সিল্ক শাড়ি৷ সেই শাড়ি এই দীর্ঘ ধকলে বোধকরি কিছু অসংবৃত হয়ে গিয়েছিল৷ ফলে আঁচল সমেত শাড়ির কিছু অংশ পথে লুটাচ্ছিল৷ হঠাৎ পিছন থেকে—'শাড়ি সামালকে, আন্টিজী!' শুনে পিছন ফিরে দেখি দু'জন স্থানীয় কালো মানুষের পাশ থেকে একজন তামাটে বর্ণের মাঝবয়সী মানুষ হাত উঁচু করে সুমিত্রাকে সাবধান করছেন৷ ওরা সকলেই হার্টফোর্ডের ট্যাক্সি ড্রাইভার৷ যে লোকটি সুমিত্রাকে সাবধান করেছিলেন তাঁর ট্যাক্সিতেই আমরা উঠলাম৷ তাঁর নামও জানা হল—রিয়াজ, বাংলাদেশের মানুষ৷ এখানে ছাড়াও নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, বস্টন, ওয়াশিংটন তো বটেই আরও দূরবর্তী বহু শহরে অনেক ভারতীয়, বাংলাদেশী, পাকিস্তানী ট্যাক্সি চালান বা হোটেল-রেস্টোরেন্টে কাজ করেন৷ সংখ্যাটা নেহাত কম নয়৷ জীবন-জীবিকার সন্ধানে কত এশিয় মানুষাযে এদেশে এসে আস্তানা গেড়েছেন তার ইয়ত্বা নেই৷ রবীন্দ্রনাথ একদা তাঁর কবিতায় আক্ষেপ করে লিখেছিলেন—'সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী/রেখেছ বাঙ্গালী করে, মানুষ করোনি,' তারপরেই যে সত্যবনী উচ্চারণ করেছিলেন বাঙালিকে মানুষ করার জন্য বা মায়ের আঁচলের আশ্রয় ছেড়ে বেহ হবার জন্য—'দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া করে'—তাঁর বানীকে মর্যাদা দিয়ে বাঙালি আজ গৃহ ছেড়ে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে৷ তবে তা লক্ষ্মীছাড়া হবার জন্য নয়, লক্ষ্মীর আরাধনায়, লক্ষ্মীকে পাবার অভীপ্সায়৷ তাই পৃথিবীর এই উল্টো পিঠেও হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ভাগ্যান্বেষণে গৃহছাড়া হয়ে হাজির হয়েছে৷ ঋষিকবি এসব দেখলে নিশ্চয়ই খুশি হতেন৷


হার্টফোর্ড বাস টার্মিনাস থেকে ১৭-১৯ ফ্রেডেরিক স্ট্রিটে জয়দীপদের অ্যাপার্টমেন্টের দূরত্ব মেরেকেটে দু'মাইল৷ মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম৷ শরীরের অবস্থা প্রচণ্ড কাহিল৷ ভেবেছিলাম যা হোক কিছু খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে টেনে ঘুম লাাবো৷ কিন্তু কোথিয় ঘুম! রান্না করে মুনিয়া সবকিছু ফ্রিজে রেখে গিয়েছিল৷ সেগুলো শুধু গরম করে আর একটু ভাত ফুটিয়ে খেয়ে শুয়েও পড়া গেল তাড়াতাড়ি৷ কিন্তু ঘুম তো আসে না চোখের পাতায়৷ উল্টে শুয়ে শুয়েই যেন ভাসতে লাগলাম আকাশে৷ জেট ল্যাগ৷ তাছাড়াও সময়ের হেরফের৷ এখানকার রাত্রি ন'টা মানে কলকাতার সকাল সাড়ে ছ'টা৷ এখন তো ঘুম থেকে ওঠার সময়, কাজেরাসময়৷ ফলে নিদ্রাদেবী আমাদের সঙ্গে খেলা শুরু করে দিলেন৷ সারা রাত্রে তিনি প্রায় অধরাই রয়ে গেলেন৷




আরও  পড়ুন👇👇


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/04/blog-post.html




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন