মঙ্গলবারের গল্প
নিমগাছটার কাহিনি
রত্নোত্তমা দাস বিক্রম
মূল ভাষা- অসমিয়া
ভাষান্তর -বাসুদেব দাস
নিমগাছটার কাহিনিটা একদিন বলতেই হবে বলে আমি জানতাম। কারণ, যে করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে নিমগাছটা তার কাহিনিটা আপনাদের বলতে হবে বলে আমাকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছিল সেই দৃষ্টির জন্যই সেই শপথ আমাকে রাখতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে কাতর এবং হৃদয়ভেদী ছিল সেই দৃষ্টি। কিন্তু ধন অর্জন করা, ধন সঞ্চয় করা এবং ধন খরচ করার হাজার ব্যস্ততার মধ্যে আমি নিমগাছটাকে দেওয়া শপথ যখন ভুলে থাকি, তখন আমি নিজেকে সমালোচনা না করে নিমগাছটিকে দোষ দিতে ভালোবাসি। হ্যাঁ, হয়তো, আমি তো জানতাম সে কথা, নিমগাছটা এত কাতরতার সঙ্গে আমার দুহাত ধরে আমাকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছিল যদিও আমাকে কিন্তু সম্পূৰ্ণ ভাবে বিশ্বাস করত না। আমাকে সম্পূৰ্ণভাবে বিশ্বাস করতে না পারা একটা বুড়ো নিমগাছের কথায় আমি কেন গুরুত্ব দেব? আমার এমন কি গরজ পড়েছে যে নিম গাছটার জন্য রাতের বাতির তেল পুড়িয়ে, আমার মূল্যবান ঘুমের ক্ষতি করে আপনাদের নিমগাছের কাহিনি বলব। যে যাই বলুক না কেন, নিমগাছটা আমাকে সম্পূৰ্ণ বিশ্বাস করতে পারেনি। আমি বিশ্বাসের পাত্ৰ হতে পারার যোগ্য কিনা নিম গাছটার হয়তো সেই বিষয়ে তখন পর্যন্ত সন্দেহ ছিল।যেখানে বিশ্বাসই থাকে না, সেখানে স্বপ্নের কী মূল্য ? তাতে আবার এই ঘনঘোর কলিকালের শপথ। কিন্তু, নিমগাছের সেই দৃষ্টিটা, সেই হৃদয়ভেদী করুণ-কাতর দৃষ্টিটা . . . সেই দৃষ্টিটা কখনও কখনও স্বপ্নে জাগরণে মনে করিয়ে দেয় আমাকে, আমার একটি গল্প বলার আছে। নিমগাছটার কাহিনি।
আমি মানুষটাকে এখন দেখলে অনেকে বিশ্বাস করবে না যদিও কথাটা সত্য। একটা সময়ে আমি কবিতাও লিখতাম। এখনও কখনও কখনও কবিতা যে উঁকি মারে না তা নয়।
না,না কিন্তু আমার বুকের ভেতরের ঘরটার রুমগুলি আমি খুব মেপে- জুখে ভাগ করে নিয়েছিলাম। তারই বেশ বড়-সড় দেখে একটা রুম আমার গল্পগুলির জন্য রেখেছিলাম। কিন্তু মূল ঘরটা ভরে ছিল আমার হিসাব-নিকেশের খাতা এবং মোটা মোটা ফাইলে ভর্তি আলমারিগুলি দিয়ে । আমার পদোন্নতিতে সাহায্য করার মতো এবং দশজন সমীহ করা পণ্ডিত বলার মতো ভারী ভারী প্ৰবন্ধ এবং গবেষণাপত্ৰ গুলির জন্য ভালো দেখে একটি ঘর একেবারে আলাদা করে রেখেছিলাম। কিন্তু কবিতার জন্য জায়গা রাখলাম বাইরের বেলকনিতে। আমার দিক থেকে যে তার কারণ ছিল না তা নয়। না, না, কবিতাকে আমি আমার বুকের ঘরের বাইরে বের করে দিতে চাইনি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, কবিতা মানেই কবিতা-কবিতা। কবিতা মানেই নদীতীরের বাতাস। কবিতা বেলকনিতে বসে রোদ এবং মেঘের ছায়ায় খেলারঙের খেলাটা দেখতে ভালো বাসে। একাই হোক বা সঙ্গী সাথী নিয়েই হোক। আমি কি আর কবিতাকে জানি না? বাড়ির ভেতরের ঘরে ঢুকে থাকার চেয়ে কবিতা বেলকনিতে বসে বৃষ্টি দেখতে ভালো বাসবে। কিন্তু মুশকিলটা হল, আমারই বেলকনিতে বসে রোদ এবং মেঘের রঙগুলি এবং রূপোলী বৃষ্টি দেখার জন্য অবসরই রইল না। তাই আজ-কাল কবিতার সঙ্গে আমার দেখা-দেখি কম হয়। কম হয় না বলে , হয়না বলা যেতে পারে। কবিতা আমার বুকের ঘরের বেলকনিতে থাকে। আমি ঘরের ভেতরে থাকি। কখনও কবিতার প্রতি ঈৰ্ষা হয়। বেলকনিতে বসে আশ মিটিয়ে ঋতুর রং এবং বাধাহীন বাতাস উপভোগ করতে পারব যে।
আমার পত্নীর নামও কবিতা। তাকেও আমার ঈৰ্ষা হয়। এই একটা কারণে যে এত সুখ, এত বৈভবের মধ্যে থেকেও সে কীভাবে এভাবে হেসে থাকতে পারে? প্ৰায়ই ভাবি, সে সত্যি সত্যিই হাসে কি? অনেক যত্নে মসৃণ করে রাখা তাঁর বিকেল বেলার মুখে সাজিয়ে রাখা ওটা তাঁর সত্যি হাসি কি? সে ব্যস্ত তার নিজের দুনিয়ায়। তাঁর দুনিয়ার এককোণে আমি এক গৌণ অস্তিত্ব বলে জেনেও না জানার ভাব করি। সে বা কীভাবে জানার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু এই যে সে এখনও আমাকে কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া বলে দেখায়, তাতেই আমি সন্তুষ্ট হতে বাধ্য। আমার প্ৰাসাদোপম ঘরটির সামনে, কাছে,শোবারঘরের সংলগ্ন করে,এভাবে বেলকনি কয়েকটি ও সন্ধ্যার ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপ খাওয়ার। একদিন কোনো অতিথির সামনে পত্নীকে বলতে শুনেছিলাম, আমার এর কথা আর বলবেন না ! রাইটাৰ মানুষ যে, কথাগুলি একটু আলাদাই। সবসময় নিজের প্ৰাইভেট বেলকনিতে বসে লিখ্তে বসে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লিখতে থাকবে, কয়েক কাপ আৰ্ল গ্ৰে’ চা খাবে। ইনি লেখার সময় বার্ণি ঘেউঘেউ করলেও খারাপ পায় বুঝেছেন। আগে লেখা টুকরো কাগজে পুরো বেলকনি ভরে থাকত। তরু ঝাড়ু দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত। তবে আজকাল তিনি মেকবুক এয়ারে লেখেন বলে সুবিধা। কাগজ-কলমের দিন গেল আর কী।
ইস্, তারমানে এখনও আমার পত্নী আমার লেখক পরিচয় নিয়ে গৌরব করে। এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই তো আমাদের সম্পৰ্কের সূত্ৰপাত ঘটেছিল। তবে এই যে তিনি কথা প্রসঙ্গে উল্লেখ করলেন, প্ৰাইভেট বেলকনি, আৰ্ল গ্ৰে’ চা, মেকবুক এয়ার লেপটপ, এইসমস্ত কিছুর উল্লেখে তিনি পরিষ্কার ভাবে আমাদের বলে এবং দেখিয়ে ভালো লাগা স্ট্যটাসটা তুলে ধরলেন না কি? বাৰ্ণি আমাদের পোষা কুকুর। ইংলিশ বুলডগ। যার-তার এইধরনের অভিজাত কুকুর কেনার এবং কিনে প্রতিপালন করার সামৰ্থ্য থাকে না। কবে যে এই অভিজাত শব্দগুলি আমার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে পড়ল আমি নিজেও জানতে পারিনি। কিন্তু চড়া দামের আৰ্ল গ্ৰে’তে চুমুক দিয়ে আমার ঘরের সংলগ্ন বেলকনিটায় কখনও আমি লিখি কি? শেষবার কখন আত্মবিভোর হয়ে কিছু একটা লিখেছিলাম? তাহলে কবিতা এভাবে বলল যে? মানে কবিতা মিথ্যা কথা বলল? মানে আজ-কাল আমি লিখতে না পারাটাকে নিয়ে সে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নয়? কে জানে তার হয়তো মনেই নেই যে আমি অনেকদিন ধরে লেখালিখি করছি না।
বহুদিন হ’ল লিখছি না । লিখতে পারছি না। কিন্তু নিমগাছটার কাহিনিটা যে আমাকে বলতেই হবে। এখনও যদি আমি মানুষটার মধ্যে সামান্য হলেও সততা বেঁচে থাকে, তাহলে সেই সততার নামে আমাকে নিমগছটার কাহিনিটা বলতেই হবে।
আমাদের এই প্ৰাসাদোপম ঘর,এই ঐশ্বৰ্য বৈভব, আমার উজ্জ্বল বর্ণের সুন্দরী স্ত্রী, দূরের ধনী আবাসিক শিক্ষানুষ্ঠানে আমার উজ্বল সন্তান, আর তারই মধ্যে সভায় সমিতিতে সদাব্যস্ত , সদাহাস্যমুখর আমি। আমার স্তাবকের অভাব নেই। আমিও জানি, ওরা কেবল স্তাবক। কিন্তু আমি ওদের কাছ থেকে সরেও আসব না, ওদেরকেও দূরে ঠেলে পাঠাব না। আমার একটা নিম্নমানের লেখারও ওরা প্ৰশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতে দেখে আমি ভুয়া এবং গহীন একটা হাসি হেসে সেই মূল্যহীন, কৃত্ৰিম বাহবাগুলি সামলে সুতরে কোটের পকেটে ভরিয়ে নিই। আমার দুৰ্বল কাঁধ এবং মেরুদণ্ডেৰ ওপরে বাদুরের ডানার মতো ফিটফাট আমার কোট, দামী। ক্লান্ত কুকুরের জিহ্বার মতো ঝুলতে থাকা আমার ডিজাইনার টাই, দামী। য়ুনিফৰ্ম পরা, আজ্ঞাবাহী ড্ৰাইভার চালানো আমার লনি গাড়ি, দামী। এই সবকিছু দামীর বাহার দেখে কে বলবে আমার মাঝখানের মানুষটা যে প্ৰতিদিন বুড়ো একটা নিম গাছের, সেরকমই কমদামী জরাজীর্ণ একটা কাহিনি বুকে বহন করে ঘুরে বেড়াই। নিম গাছটাকে কে কবে দেওয়া একটা শপথ এখন পর্যন্ত না রাখার গ্লানি বহন করে বেড়াই।
শীত বিদায় চাইছে কি । বসন্তের মৃদু টোকর পড়েছে। চারপাশে এখানে সেখানে ফুল ফোটার এবং গাছগুলির সবুজ হয়ে উঠার সংকেত। কিন্তু নিমগাছটা যে এমনিতেই হলদে হয়ে আছে । তখন পর্যন্ত কোথাও সবুজের রেশ মাত্র নেই। কোথাও একটু আছে যদিও সেটা হলদের আঁচলে ঘিরে রেখেছে। ফাল্গুন-চৈত্রের ঝির ঝির করে বয়ে চলা বাতাসে হলদে নিমপাতগুলি ঝরে পড়ছে। বাতাস উড়িয়ে নিয়ে পুরো জায়গাটা নিমপাতাময় করে তুলেছে। তা দেখে আমার কেমন তিতো তিতো ভাব একটা এসেছে। আমি দ্রুতপায়ে পার হয়ে যেতে চাওয়া তিতো-তিতো ভাবটা মাতাল করে তুলল। বহুদূরি পর্যন্ত আমি থু থু ফেলতে থাকি। মুখটা তিতকুটো হয়ে রয়েছে। কবিতা জিজ্ঞেস করে , কী হয়েছে তোমার? বেসিনটাতে এভাবে থু থু ফেলছ যে?
ইস, কবিতা যে লক্ষ্য করেছে, জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু আসলে সে সুদৃশ্য ইটালিয়ান মাৰ্বেলের চকচকে বেসিনটা নোঙরা হওয়ার ব্যাপারটা লক্ষ্য করেনিতো ? নাকি ধীরে ধীরে প্ৰৌঢ়ত্বের দিকে এগিয়ে চলা আমি মানুষটার স্বভাবে বুড়ো মানুষের বিরক্তিকর কিছু স্বভাব বাসা বাঁধতে লক্ষ্য করেছেন ? কোনো কারণ ছাড়াই বার বার চারপাশে থু থু ফেলতে থাকি আমি। কিন্তু কী করব, আমার মুখের ভেতরটা যে সময় তিতো লাগতে থাকে। কবিতার চোখের আড়ালে এবার আমি ঘরের যেখানে সেখানে, মেঝেতে-সিঁড়িতে,সাজিয়ে রাখা ফুল এবং পাতার গামলাগুলিতে থু থু করতে লাগলাম।
একদিন কবিতা চিৎকার করে উঠল, ছিঃ ছিঃ! এসব কী? টবের এরিকা পাম চারায় থু? ছিঃ! চোখ দুটি বড় বড় করে সে আমার দিকে অপরিচিতের মতো তাকিয়েছিল। দুচোকহে কী বা ছিল । ঘৃণা না ত্ৰাস? আমি গভীরভাবে না দেখার ভান করে সেখান থেকে সরে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে ভেবেছিলাম, এই যে চিনতে নাপাওয়ার মতো হলেও কবিতা আমার দিকে তাকিয়েছিল তো। সে যে আমার দিকে তাকিয়েছিল, আমার চোখের নিচে কালো পড়ে যাওয়াটা দেখেছিল কি? না, দেখেনি বোধহয়। নাহলে কি এতবছর একই পাটি, একই চালা ভাগ করে নেওয়া আমার সঙ্গী আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠত না কি? জিজ্ঞেস করত না , আমার কী হয়েছে ? আমি যে মানুষটা দিন দিন একটা নিমগাছের মতো হয়ে যাচ্ছি সে কথা কি কবিতা বুঝতে পেরেছিল? আর আমি নিজে কিছু না বললে সে কি বুঝতে পারবে? কি টের পাবে ? আমি তার সঙ্গে করা প্ৰতারণার কথাই সে কখনও বুঝতে পারল না। তার চোখে ধুলো দিয়ে আমি যে তারই একান্ত ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে. . . কবিতা কিছুই আন্দাজ করতে পারেনি।এখন সেই সাময়িক অধ্যায় অতীত। চোখ বুজলেও কবিতা সেই অধ্যায়ের একটা শারিও জানবে না। সেই সময়ে আমার বিবেক আমার কাজের বিরুদ্ধে দুৰ্বল হলেও যে কোনো প্রতিবাদ করেনি, তা নয়। কিন্তু আমি বিবেককে খুব সহজে বুঝিয়ে রেখেছিলাম, এইসব কথা কোনো কথাই নয়। ফ্ৰিডা সিনেমাটা মনে নেই? সেই যে ফ্ৰিডার প্ৰতারক পতি ডিয়েগ’ই পরনারী গমনের পরে ফ্ৰিডাকে বলেছিল, It’s just like a handshake! কেবল Handshake? করমৰ্দন? কবিতার সেই বান্ধবীর ডালিমের মতো বুক মৰ্দনের উত্তপ্ত স্মৃতি বেশ কিছুদিন আমাকে দহন করেছিল । কিন্তু তার পরেও আমি আমাকে বলছিলাম, এসব কিছুই নয়। আমরা পুরুষদের কাছে এইসব বিছানার সম্পৰ্কের উৰ্ধে কিছুই থাকে না। শরীর, কেবল শরীর। এই দিনে দিনে খসে পড়তে থাকা দেহ-দালান। কে মনে রাখে দুদিনের অভিসার, দুদিনের দেহ-দাহনের নিৰ্বাপন।কিন্তু তার পরেও আমি আমার ধৰ্মপত্নীর সঙ্গে প্ৰতারণা করেছিলাম। প্ৰথমবারের সংকোচ এবং পাপবোধ তখন পর্যন্ত আমাকে আর ডাকতে পারছিল না। আমি পুরুষ। তার মধ্যে ধনী-মানী পুরুষ। তার মধ্যে আবার লেখালিখির জগতের মানুষ। লেখা-লিখি করা খেয়ালি সৃষ্টিশীল মানুষের একটু-আধটু এই ধরনের বাতিক থাকে বলেই আমারও নিজের সপক্ষে বলার থাকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথাটা হল আমি নিজেকে আরও একটা মনগড়া সাংঘাতিক কথা নিজেকে বলতে আরম্ভ করেছিলাম। কী ঠিক কবিতা যে আমাকে প্ৰতারণা করে নি বা করবে না, তার কী ভৰসা? অৰ্থাৎ, কোনো আধার ছাড়াই আমি কবিতাকে সন্দেহ করেছিলাম, সঙ্গে, আমার দোষের জন্য উলটে কবিতাকে দোষী সাজানোর জন্য কাপুরুষের চেষ্টা একটা করেছিলাম। কারণ আমি নিজেকে এভাবেও বলতে আরম্ভ করেছিলাম, কবিতা আমাকে আগের মতো সন্তুষ্ট করতে পারছে না । কবিতার উদাসীনতার জন্যই আমাদের মধ্যে একঘেয়ামি এসেছে।
এই সমস্ত কিছুর মধ্যে সত্যিই একদিন কবে যে কবিতা একজন পাৰ্থিব সুখ-ঐশ্চৰ্যে নিমজ্জিত হয়ে থাকা শেষযৌবনা অথচ হিঙুল বর্ণের রঙীন লাস্যময়ী হয়ে যেতে থাকল আমি নিজেও জানতে পারলাম না। আজ-কাল নিজেকে একটা বুড়ো নিমগাছের মতো হয়ে যেতে থাকাটা অনুভব করে মাঝরাতেও চমকে উঠি। প্ৰায়ই ভাবি, ভাবতে ভাবতে ভ্যাবাচেকা লেগে বসে থাকি, কেজানে যে শপথটা করেছি, নিম গাছের কাহিনিটা বলে ফেলতে পারলেই শান্তির সঙ্গে নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে যেতে পারব। নিমগাছের আশেপাশের বাতাস নাকি বড় বিশুদ্ধ, বড় শীতল।
কিন্তু এখন পর্যন্ত নিমগাছটার কাছে করা আমার শপথ রাখা হয় নি। নিমগাছটার কাহিনিটা বলা হয়নি।কাহিনিটা বলার মতো আমার অবসর কোথায়? যে সাম্ৰাজ্য আমিই একদিন সম্প্ৰসারিত করেছিলাম, সেই সাম্ৰাজ্যের হাজার জটিলতা আমাকে আঁটোসাঁটো বাঁধনে বেঁধে রাখে। তাতে কী হয়েছে, সাম্ৰাজ্যের অধীশ্বর রাজকুমার –রাজকুমারী না হলে আজ আমার আর কবিতার পুত্ৰ-কন্যা এত উদার হতে পারতাম কি? আমার এই ঈৰ্ষণীয় সাফল্যের ফল আমার পত্নী-পুত্ৰ-কন্যা ভোগ করছে বলে আমার গৰ্ব হয়, আমার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সন্তুষ্টির হাসি ছড়িয়ে পড়ে। এই সাফল্য, এই সাম্ৰাজ্য একদিন-একরাতে আমার হাতে আসেনি। তার জন্য আমাকে অনেক বাঁকা পথে চলতে হয়েছিল। সেই বাঁকা পথ কখনও মসৃণ ছিল না। কিন্তু আমি সব সময় নিজকে বলতাম , এই পথে আমি কেন চলেছি? আমার পত্নী-পুত্ৰ-কন্যার জন্যই তো। পিতা-মাতাকে কবেই অগ্রাহ্য করতে শুরু করেছিলাম অগ্রাহ্য না করে আমার কীই বা করার ছিল? এত গোঁয়ারগোবিন্দ ছিলেন যে চিরকাল কেবল নিজেরটাই আঁকড়ে ধরে রইলেন। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে সন্তানের ধাপে ধাপে উন্নতি দেখেও সুখী হতে না পারা আশ্চর্য ধরনের মানুশ ছিলেন আমার মাতা-পিতা। আগে আমার পড়া -শোনা, লেখা-পড়া নিয়ে তাঁরা গৌরব করতেন । কিন্তু পরবর্তীকালে আমি তাদের মোটেই সুখী করতে পারিনি। মানুষ দুজনকে পাকে-প্ৰকারান্তরে কত বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, কেবল ডিগ্ৰী এবং প্ৰকাশিত লেখাগুলির প্রশংসা নিয়ে বাড়ি –গাড়ি হাসিল করা যায় না,কিন্তু বুঝতে চাইলেন না। না বুঝেই মানুষদুটি আগে পরে ছলে গেল। এখন শীৰ্ণ অথচ দৃঢ় চেহারার পিতা এবং শান্ত মুখের মাকে প্ৰায়ই স্বপ্নে দেখি। দেখি, তারা দুজনেই একটা নিমগাছের ছায়ায় বসে আছে আর দুজনেই পরম তৃপ্তিতে একমুঠো পাকা হলদে নিমগুটি ভাগ করে খাচ্ছে। নিমগুটিগুলি চিবোনোর সময় প্ৰতিবারই দুজনের চোখ কী যেন এক অমৃত স্বাদে বুজে যাচ্ছে। নরক যেন তিতো নিমগুটিগুলি মা-বাবা কেন চিবোচ্ছে বলে ক্রোধ এবং বিরক্তিতে আমি ঘুমের মধ্যেই গরগর করে উঠেছিলাম। আধো ঘুমে আমি বিড়বিড় করছি, এই গোঁয়ার গোবিন্দ মানুষ দুটির হাত থেকে আমার শান্তি নেই। আধো ঘুমের মধ্যে আমার বন্ধ দুই চোখের সামনে আসা যাওয়া করে পুরোনো কিছু দৃশ্য। বাড়ির সামনে থাকা নিমগাছটা মা-বাবা কিছুতেই কাটতে দেয় না। সেই গাছের নিচে নাকি বাবার বিয়ের সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেইগাছের নিচে আমি খেলাধুলো করে বড় হয়েছি। এবং সেই গাছটার জন্যই নাকি বাড়িতে অসুখ বিসুখ নেই, কীট-পতঙ্গের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।এই গাছটা না থাকলে বাবার তৈরি পুরোনো বাড়িটার বারান্দায় ভর দুপুরবেলা ছায়া পড়ত না। তখন মা-বাবা কীভাবে সেখানে বসে সংসারের পুরোনো গল্পগুলি করবে ? মা-বাবা এই গাছের পাতা ভেজে খায়, ডাল দিয়ে দাঁতন করে। ইস,এই সমস্ত অৰ্থহীন কথার জন্য আমার বৃহত্তর স্বপ্নগুলি বিসৰ্জন দিতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বাড়ি-মাটি বিক্রি করে সেই জায়গায় বিল্ডারকে ফ্লেট তৈরি করতে দিলেই আমার মোটা-সোটা লাভের অঙ্কটা মিলে যায়। কিন্তু পুরো ভিটের মাটির সঙ্গে ঘরটাও বিক্রি করে দিলে মা-বাবা কোথায় থাকবে ? কেন, গ্রামের বাড়িতে চলে গেলে ক্ষতি কোথায় ? এখানে কাকার গোটা পরিবার থাকে। কাকাকে কে পড়িয়েছিল কে? আমার বাবা। বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল কে ? আমার বাবা? তাহলে? এখন পিতার অবসরের পরে মা এবং বাবার জন্য সেইবাড়িতে থাকার জন্য একটা রুম কেন জুটবে না? প্রয়োজনে আমিই একটা নতুন ঘর তৈরি করে দেব। মাসে –পনেরো দিনে ছোট কাকার ছেলের হাতে , মানে অনিলদার খরচ তো না দিয়ে থাকি না। উদার হৃদয়ের লেখক মানুষ আমি। আমি কি মানুষের আবেগ-অনুভূতি বুঝতে পারি না ? কিন্তু মা-বাবা যে ছিল চিরকালের অসন্তুষ্ট, গোঁয়ার গোবিন্দ। আমার টাকা নাকি লাগবে না। বাবার পেনশনের টাকা দিয়েই নাকি চলে যাবে। কিন্তু এত গোয়ার্তুমি করলেও শেষ পর্যন্ত গিয়ে আমার কথাই বজায় রইল। শহরের বড় সুবিধজনক জায়গায় থাকা আমাদের মাটিটা আমার চাওয়া অনুসারে বিল্ডারকে বিক্ৰি করে দেওয়া হ’ল। বয়স এবং সময়ের কাছে নতজানু আমার মা এবং বাবা ছোট কাকার গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিল। আমার হিসেব ঠিকই মিলে যাচ্ছিল।আর নিমগাছটা ? কামলা লাগিয়ে সেইগাছটা কাটানোর সময় আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সেদিন হঠাৎ মনে হয়েছিল, বাইরের কালো, খসখসে ছালের আড়ালে নিমগাছটার ভেতরটা কেমন মাখন রঙের, কেমন মসৃণ। অনেকক্ষণ ধরে আমি সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে সেই কাটা নিম গাছটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
এখন সেই ঘটনাও অতীত হয়ে যাওয়ার অনেকদিন হয়ে গেল। এখন মনে হয় সেই নিমগাছটাকেই তার কাহিনি বলব বলে কথা দিয়েছিলাম নাকি? সেই নিমগাছটাই আমার দুইহাত খামচে ধরে আমার দিকে পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ এবং সবচেয়ে হৃদয়ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল নাকি, তুই আমার শপথ খেয়ে বল , আমার কাহিনিটা বলবি বলে . . .
জনজাতীয় একটা মীথের মতে নিমগছ নাকি আদিতে স্বর্গের গাছ ছিল। এবং নিমগাছের ছাল-পাতা-গুটি এই ধরনের তিতোও ছিল না। নিমগাছে রসাল, সুমিষ্ট ফল হত। ফুলের সুগন্ধ দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু নিমগাছ নাকি কী পাপ করেছিল। সেই পাপের ফলে নিম মর্ত্যে নির্বাসিত হল এবং যত দিন যেতে লাগল ততই বেশি তিতো হয়ে যেতে লাগল। কিন্তু তিতো হলেও মানুষ নিমগাছকে অনাদর করল না। কারণ মানুষের জন্য নিমগাছ প্রয়োজনীয় ,উপকারী। নিজের দরকারের জিনিস মানুষ জাতি অবহেলা করে না। কোনো দরকার না থাকিলে মুহূর্তের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।এককালে স্বর্গের বৃক্ষ ছিল বলেই হয়তো নিমগাছের সৌন্দৰ্যও বেঁচে রইল।
শৈশবে আমার দেহে বসন্ত দেখা দিয়েছিল। বড় কষ্ট পেয়েছিলাম। মায়ের হাতটা শরীর স্পর্শ করলেই যে কী শীতল শান্তি পাই। বাবা নিমপাতা এনে মুঠো মুঠো করে আমার বিছানার চারপাশে রেখে দিত। আমি থাকা ঘরের দরজায় রেখে দিত মুঠো মুঠ নিমপাতা। কথাগুলি যে আমার মনে ছিল,তা আমি ভাবতেই পারিনি। মনে রাখার মতো কথা বলেও কোনোদিন ভাবিনি। কিন্তু সেদিন হঠাৎ আমার বিছানায় একগুচ্ছ নিমপাতা পড়ে থাকতে দেখে কথাটা মনে পড়ে গেল। ‘বিছানায় এইসব? কে এনে রেখেছে?’ কবিতা কাছাকাছি ছিল না। তরু সেখানে সাজিয়ে রাখা পোর্সিলিনের পাত্ৰগুলির ধুলো মুছছিল। আমার কণ্ঠস্বরে সে চমকে উঠল।
তরু এবং কবিতার মতে বিছানায় নিমপাতার মুঠো দূরের কথা, কোথাও থেকে উড়ে আসা ঝরে পড়া একটা নিমপাতাও নেই। আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম, আমার বিছানায় মুঠো মুঠো নিমপাতা। ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে সাটিনের বিছানার চাদরটা তরু আবার একবার ঝেড়ে ফেলে তখুনি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সে পোর্সিলিনের পাত্ৰগুলির ধুলো মুছতে থাকা কাপড়টা সেখানটাতেই সেভাবে পড়েছিল।
সেই শুরু। তারপর থেকে প্রায়ই দেখি, সকাল বেলায় আমার বালিশ এবং বিছানায় নিমপাতা। আমি ছুঁয়ে দেখি। সত্যি। তরুকে বললে সে আবার চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাবে। কবিতাকে বললে হয়তো এবার আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার কথা বলবে। কিন্তু সত্যিই যে আমি বিছানায় ঝরে পড়া কিছু নিমপাতা দেখেছি। আমার মুখটা পুনরায় তিতো তিতো লাগে। পুনরায় আমি অনেকক্ষণ পর্যন্ত থু থু করতে থাকি।
বাথরুমের দরজা বন্ধ করে ভেতরের বেসিনটাতে থু থু করে চোখে-মুখে জলের ধারা মেরে আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। আমার সমান আকারের বেলজিয়াম কাঁচের সুদৃশ্য আয়নায় আমি আমার পুরো মানুষটাকে দেখতে পেলাম। কতক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে দেখছিলাম আমি জানি না। আয়নায় দেখছি আমার হাত নেই। আছে ডাল। ডালে পাতা। আমার বুক, পেট নেই। আমার পায়ের তলা নেই। আছে গাছ-শরীর। আমার পায়ের তলা থেকে গজে উঠা শিকড় বাথরুমের মাৰ্বেল-মেঝে ভেদ করে চলে গেছে। চোখ ছোট করে আমি পিট পিট করে তাকাচ্ছি,এটা কী গছ ? ইস, এটা তো দেখছি নিমগাছ। নিমগাছটাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম , তোমার কাহিনিটা বলব বলে আমি কবেই তোমাকে কথা দিয়েছিলাম নাকি?
আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন কি? অবিশ্বাসী নিম গাছ মুখে টু শব্দ করল না। দৃষ্টি ছিল একেবাৰে শূন্য। কোনো কারুণ্য, কোনো কাতরতা তাতে ছিল না। কিন্তু কীযেন আমার কলজেয় আমার বিঁধছিল। বুকটা খামচে ধরতে গিয়ে খসখসে নিমগাছের ছালে হাত লাগল। এটাই কি সেই নিম গাছ ছিল কি, যাকে আমি সেইসময় কথা দিয়েছিলাম, তার কাহিনিটা বলব বলে ?

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন