ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব-৩)
পৃথিবীর উল্টো পীঠ
বিশ্বেশ্বর রায়
নির্দিষ্ট সময়ে বিশাল বোয়িং ৭৭৭ আকাশে ডানা মেলে উঠে গেল৷ তার আগে বিমানে ঢোকার দরজার মুখে
প্রতিমার মত নিশ্চল সহাস্য মুখে করজোড়ে উড়ান-কন্যা সকলকে অভিবাদন করলেন৷ অন্যান্য কন্যারা বিমানের অভ্যন্তরে কোন্ পথে এগোলে সবাই নির্দিষ্ট আসনে সহজে পৌঁছোতে পারবে তার দিঙনির্দেশ করছিলেন৷ সঙ্গের ব্যাকপ্যাক আর ছোট লাগেজ দু'টি মাথার উপরের রাকে রেখে আসনে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নেওয়া গেল৷ সবিস্ময়ে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম—প্রায় একশো মিটার লম্বা আকাশযানটি ন্যূনাধিক সাড়ে চারশো যাত্রী, তাদের লাগেজ,ক্রু, এয়ারহোস্টেজ, পাইলট, জল, খাবার-দাবার এবং জ্বালানি মিলে কয়েকশো টনের ওই বিশাল পাখিটি কী অবলীলায় প্রবল গর্জনে মুহূর্তে আকাশের প্রায় দশ হাজার মিটারের উপরে উঠে ঘন্টায় প্রায় আটশো কি.মি. বেগে উড়ে চলেছে! শুধু একটানা গোঁ গোঁয়ানি এবং মাঝে মাঝে একটু উপর-নীচ ঝাঁকানি(পরিভাষায় যাকে বাম্পিং বলে) ছাড়া বোঝাই যায় না যে সেটি সচল৷ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেও বোঝা দুষ্কর তার গতির রহস্য৷
মেয়ে তো আমাদের ঘুমিয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েই খালাস৷ কিন্তু কোথায় ঘুম! দূর ভ্রমণের সময় বাসে তো বটেই এমন কি ট্রেনেও আমার ঘুম হয় না৷ শুধু কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে রাতটা পার করা৷ এখানে তো আরও দুরূহ ব্যাপার৷ কারণ, ট্রেনের মত এখানে শোয়ারও সুবিধে নেই৷ শুধু বসার আসনটিকে একটু পিছনে হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে থাকা৷ এর মধ্যেও ওই অবস্থাতেও অনেকের নাসিকা গর্জন শোনার সৌভাগ্য হচ্ছিল৷ আমার পোড়া চোখে ঘুম নেই৷ বাসে ভ্রমণ বা ট্রেনে ভ্রমণকালেও লক্ষ্য করেছি মানুষজন কেমন অকাতরে ঘুমিয়ে পড়ে৷
কতক্ষণ ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করে থাকা যায়! ফলে সামনের টি ভিটা খুলে তার পর্দায় নজর চালালাম৷ সেখানে মাঝে মাঝেই ভেসে উঠছে উড়ানটির গতিবেগ, কত উচ্চতায় উড়ছে, তাপমাত্রা, গন্তব্যের দূরত্ব, কত মাইল বা কি.মি. পাড়ি দিয়েছে তার হিসাব, কখন গন্তব্যে পৌঁছোবে এবম্বিধ তথ্য৷ সেখান থেকেই প্রথম জানতে পারলাম যে, আমাদের উড়ানটি সরাসরি জে. এফ. কেনেডি বিমানবন্দরে যাচ্ছে না৷ ভায়া প্যারিস সেখানে যাবে৷ স্থানীয় সময় ছটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে প্যারিস বিমানবন্দরে এসে আমাদের উড়ান থামলো একটানা আট ঘন্টা চলার পর৷ প্যারিসে নামার অনেক আগে থেকেই জানালার সার্টার তুলে দেখছিলাম অপূর্ব দৃশ্য! আমাদের বিমানের অনেক নীচে সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘ স্থির হয়ে ভেসে আছে৷ তাদের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে আমাদের আকাশযান৷ উড়ে যে চলেছে তা বোঝা যায় টি ভির পর্দায় চোখ রাখলে তবেই৷ নইলে মনে হবে আমাদের বিমানটিও ওই মেঘেদের মত নিশ্চল, স্থানু৷ যতদূর দৃষ্টি যায় উপরে সুনীল আকাশ আর নীচে সাদা মেঘের সমুদ্র৷ হয়তো কদাচিৎ চোখে পড়ে বহু দূর দিয়ে অন্য কোনো বিমানের উড়ে চলা৷ প্যারিস পৌঁছবার বেশ কিছু আগে থেকে নীচে সবুজের আভাস এবং খেলনার মত বাড়ি-ঘর, রাস্তা, ফসলের ক্ষেত, নদী, রাস্তায় চলা গাড়ির সারি চোখে পড়ছিল৷ ফসলের ক্ষেত, বন-জঙ্গল, শহর, গ্রাম, মাঠ-ঘাট যা চোখে পড়ছিল তাদের চৌহদ্দি যেন স্কেল দিয়ে মেপে মেপে চিহ্নিত করা৷ আর সবই একই সমতলে৷ আসলে পরে জেনেছিলাম যে, অত উপর থেকে সব দেশের ভূ-প্রকৃতিই অমন সুন্দর মাপ-জোক করা বলেই মনে হয়৷ দেখতে দেখতে আমাদের বিমানটি নীচে আরও নীচে অবতরণ করতে লাগল৷ নীচের বাড়ি-ঘর, মাঠ-ঘাট, গাছপালা, রাস্তা, গাড়ি-ঘোড়া সবকিছুই আস্তে আস্তে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসছিল৷
বিমানের আসনে বসেই জানালা দিয়ে প্যারিস বিমানবন্দরটিকে যতটুকু দেখা যায় তা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হল৷ কারণ, বিমান অবতরণের আগেই ঘোষণা হল—'কেউ আসন ছেড়ে উঠবেন না বা বিমান ছেড়ে নীচে নামবেন না৷' প্যারিসে শুধুমাত্র কিছু যাত্রী ওঠানামা করলেন৷ খাবার-দাবার, অন্যান্য রসদ, জ্বালানি ইত্যাদি সংগ্রহ করে আড়াই ঘন্টা পরে আবার আকাশে পাখনা ছড়াল এ. আই—১০১৷ থেমে থাকার সময় যখন ওইসব কর্মকাণ্ড চলছিল সেই সময়েই আমেরিকান পুলিশের একটি দল আমাদের বিমানে উঠে প্রত্যেকটি যাত্রীর কেবিন লাগেজ পরীক্ষা করতে শুরু করল৷ ইউ. এস. এ.তে ঢোকার আগে এই সিকিউরিটি চেকিং ওরা করে থাকে৷ পাছে কোনো সন্ত্রাসবাদী কোনো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওদের দেশে ঢুকে পড়তে না পারে৷ জানি না এ ধরণের চেকিং সব দেশের ক্ষেত্রে করা হয় কি না, না কি শুধুমাত্র ভারতীয় বিমানের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।
চলবে...
আরও পড়ুন 👇👇👇
https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/03/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_19.html

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন