লেবেল

শনিবার, ২০ মার্চ, ২০২১

রবিবারের গল্প ।। মুক্তি দাশ।। Ankurisha।। E. Magazine ।। Bengali poem in literature ।

 







রবিবারের গল্প 


ভোটের লাগিয়া

মুক্তি  দাশ 



ভোটের বাজনা সেই কবেই বেজে গেছে। এখন রাস্তা-ঘাটে, ট্রেনে-বাসে, অফিস-আদালতে, চায়ের ঠেকে দিনরাত শুধু একটাই আলোচনা। ভোট আর ভোট। ভোটাভুটি নিয়ে গরমাগরম তর্ক আর আলোচনা। যেন এটা ছাড়া ভূ-ভারতে আর কোনো টপিক নেই।

শাম্ব আর কুশলদের ট্রেনের কামরায়ও মাসখানেক ধরে এই ভোটযুদ্ধ চলে আসছে। ভোট নিয়ে চাপান-উতোর। শাম্বরা খড়্গপুর-হাওড়া সেকশনে লোক্যাল ট্রেনের ডেইলি প্যাসেঞ্জার। আসলে ওরা চারজনের একটা গ্রুপ। প্রথমে একেবার খড়্গপুর থেকেই শাম্ব ওঠে। ট্রেনের পেছন থেকে গুনে গুনে পাঁচনম্বর কামরার দ্বিতীয় দরজা দিয়ে উঠে বাঁ দিকের সিট। এরপর বালিচক থেকে কুশল উঠবে। কুশল কোলকাতার একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার। শাম্ব সাঁতরাগাছিতে একটা কারখানার সুপারভাইজার। মেচেদায় উঠবে রাহুল। স্কুলে পড়ায়। আর সবার শেষে বিপিনদা উঠবে বাগনান থেকে।

আজ প্রথম থেকেই ভোট নিয়ে আলোচনা-যুদ্ধ তুঙ্গে। অন্যান্য যেকোনো টপিক নিয়ে আলোচনা হলে তা হয়তো নিজের গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ভোট আর খেলা নিয়ে আলোচনা বড় ছোঁয়াচে। নিমেষের মধ্যে সারা কামরায় ছড়িয়ে পড়ে। কিচ্ছু করার নেই। নানা জনের নানা গায়েপড়া মন্তব্য। আবার তার জবাবও সময়বিশেষে দিতে হয়।

কুশল বিজ্ঞের মতো বলল, ‘সে তোমরা যাই বল, এইযে যখন-তখন দলবদলের ব্যাপার -এটা কিন্তু একেবারেই অনৈতিক। একধরণের বিশ্বাসঘাতকতাও বটে। কারণ দেখ, লক্ষ লক্ষ মানুষ একটা পার্টির ওপর আস্থা রেখে মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিল, তিনি এমএলএ বা এমপি হয়েও গেলেন। তারপর বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন না বলে, বলা নেই কওয়া নেই দুম করে একদিন রেজিগনেশন দিয়ে সুযোগ বুঝে অন্যপার্টিতে চলে গেলেন! মামদোবাজি? এটা জনসাধারণের সংগে প্রতারণা নয়? এর নাম রাজনীতি? ছ্যাঃ ছ্যাঃ…’

রাহুল শিক্ষক। অতএব তার সবজান্তা হবার নৈতিক অধিকার আছে। সে বলল, ‘ওসব ছাড়ো দেখি গুরু, বেশি সতীপনা দেখিও না। দলবদল কি আজকের, অ্যাঁ? রামায়ণ পড়েছ? রামায়ণ? সেই রামায়ণের যুগ থেকেই দলবদল চলে আসছে, সে খবর রাখো? বিভীষণ নিজের দাদা রাবণের দল ছেড়ে রামের দলে এসে যোগ দেয়নি? বড় বড় কথা বলছ? তোমরা যে মানুষদের বোকা বানিয়ে দিনের পর দিন ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছ, এটাই বুঝি সাচ্চা রাজনীতি? আমাকে রাজনীতি শেখাতে এসো না বুঝলে?’

আগেই বলেছি, ভোটের আলোচনা খুবই ছোঁয়াচে। এই আলোচনা বা তর্কাতর্কিও স্বভাবতই আর ওদের নিজেদের গন্ডির মধ্যে রইল না। পাশে এক নাদুসনুদুস প্রৌঢ় ভদ্রলোক এতক্ষণ ঝিমুচ্ছিলেন। হঠাৎ সজাগ হয়ে বলে উঠলেন, এইজন্যেই…ঠিক এইজন্যেই আমি রাজনীতি করা ছেড়ে দিলাম, জানেন?

শাম্ব কৌতূহলী। জিগেস করল, ‘আপনি রাজনীতি করতেন বুঝি?’

‘করতাম মানে?’ নাদুসনুদুস বললেন, ‘সেভেনটি সেভেনে জিতে এমএলএ-ও হয়েছিলাম। তখন তো সব লালে লাল। এখন সব ছেড়েছুড়ে দিয়েছি ভাই। দিব্যি আছি জানেন! কোনো ঝামেলায় নেই। সাতে-পাঁচে নেই। তবে মানতে হবে, তখনকার রাজনীতির মধ্যে এমন খেয়োখেয়ি, হ্যাংলামো ছিল না। রাজনীতির দস্তুরমতো একটা ইজ্জত ছিল, পরিচ্ছন্নতা ছিল!’

বিপিনদা সিটের কোনের দিকে এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল। হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘তাহলে ছাড়লেন কেন?’

নাদুসনুদুস এবার এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে সন্তর্পনে বললেন. ‘ছেড়েছি কি্ আর সাধে রে ভাই!’ বলে ঈষৎ ঝুঁকে মুখটা এগিয়ে নিয়ে এসে ফের বললেন, ‘আসলে কি জানেন তো, আজকাল রাজনীতির মধ্যেও পলিটিক্স ঢুকে গেছে!’

‘অ্যাঁ! বলেন কী! রাজনীতির মধ্যেও…?’

‘তবে আর বলছি কী!’ যেন প্রশ্রয় পেয়ে নাদুসনুদুস বললেন, ‘আর নেতারাও হয়েছে তেমনি। এক-একটা আস্ত চোর। চুরি-চামারি যে আগে হতো না, তা বলছি না। তখনও হতো। তবে লুকিয়ে-চুরিয়ে। আর এখন তো প্রকাশ্য দিবালোকে!

সিড়িঙ্গে চেহারার খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা, মাথায় ক্যাপ-পরা একটা লোক পাশেই কোথাও একটা সিটে বসেছিল হয়তো। কেউ তেমন একটা নজর করেনি। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে নাদুসনুদুসের দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বেশ দৃঢ় গলায় বলল, ‘দেখুন, সব সম্প্রদায়ের মধ্যে্ ভালোমন্দ দুই-ই আছে। কেউ ভালো, কেউ খারাপ। তাই বলে কোনো একজনের কার্যকলাপের মাপকাঠিতে আপনি পুরো একটা সম্প্রদায়ের বদনাম করতে পারেন না! এটা রীতিমতো অন্যায়…'

নাদুসনুদুস মনে হয় একটু ক্ষুণ্ন হলেন। বললেন, ‘আপনার এত গায়ে লাগছে কেন, মশাই? আপনি রাজনীতি করেন বুঝি?

সিড়িঙ্গে তেমনি দৃপ্তভঙ্গিতে বলল, 'আজ্ঞে না। আমি একজন চোর।'






আরও  পড়ুন 👇👇👇


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/03/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_19.html







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন