লেবেল

বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস ( শেষ পর্ব )। অষ্টভুজ রহস্য - অলোক চট্টোপাধ্যায়

 

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস   ( শেষ পর্ব )   

অষ্টভুজ রহস্য 

 অলোক চট্টোপাধ্যায়

 

 

গাড়ি চলতে শুরু করল হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে আবার দত্তবাড়িতে ফিরে গেলেন সুগত বাগচি কুনাল একটু অনুযোগের সুরেই বলল – স্যাররাজিন্দার যে আসলে ছদ্মবেশী পুলিশ অফিসার সেটা আমাদের আগে বলেননি কেন?

রজতস্যার হাসলেন - যখন উনি ছদ্মবেশ ধরেছেন তখন নিজের পরিচয় লুকোনোর জন্যেই সেটা করেছেন তোরা সেটা জেনে গেলে তোদের কথাবার্তা বা আচার ব্যবহারে সেটা প্রকাশ পেতেই পারত সেটা ভেবেই ও সেটা তোদের জানাতে বারণ করেছিল কিন্তু এটা ছাড়া তোদের মনে কি আর কোনো প্রশ্ন নেই?

-আছে তো  পলাশ বলল এবার - আর অনেক প্রশ্ন

-বেশএকএক করে বল

-আপনি বিজয়বাবুকে বললেন যে আপনার পর্ব এখানেই শেষ এরপরেও যদি কিছু থাকে সেটার দায়িত্ব অন্য কেউ নেবেন অন্য কেউ বলতে নিশ্চয়ই সুগত বাগচিমানে পুলিশ কিন্তু সেই পরের ব্যাপারটা কিকুনাল তার প্রশ্ন পেশ করল

-আর আপনি এটাও বললেন যে বিজয়বাবুকে হয়ত আরো কিছু অপ্রিয় সত্যের সামনে পড়তে হবে তার মানে কি আপনি যে ব্যাখ্যাটা দিলেন সেটার পরেও আরো কোনো রহস্য বাকি রয়েছেকুনাল জিজ্ঞাসা করল

রজতস্যার কিন্তু সরাসরি উত্তর দিলেননা বললেন – ঘটনাটা শুনে আমার একটা জায়গায় খটকা লেগেছিল তোদেরও লাগা উচিত ছিল ধরা যাক সুজয়বাবু তার বাড়ির কেয়ারটেকারকে হঠাৎ ফোন করে বললেন তার দাদা সন্ধ্যে নাগাদ ঐ বাড়িতে পৌঁছোলে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে ফেলতে হবে হাতে সময় বড় জোর ঘন্টাখানেক ছোটো একটা গ্রাম কোনো লোক কিভাবে ঐ অল্প সময়ের মধ্যে সেই ওষুধ জোগাড় করবে বা সঠিক মাত্রায় সেটা দেবে যাতে দু-তিন ঘন্টার জন্যে তার দাদাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়একটাই সম্ভাবনাযাকে কাজটা করতে বলা হচ্ছে তার কাছে ওষুধটা আছে আর প্রয়োগ করার ব্যাপারেও তার অভিজ্ঞতা আছে এবং সেটা সুজয়বাবুদের জানাও আছে

পলাশ আর কুণাল মাথা নাড়ল এ ব্যাপারটা তারা ভেবে দেখেনি

-তাছাড়াও আরো একটা পয়েন্ট রজতস্যার বললেন, - কফিতে চুমুক দেবার পরেই বিজয়বাবুর মাথা ঘুরতে শুরু করে তার পরেই তিনি ভুল দেখতে বা শুনতে শুরু করেন যাকে বলে হ্যালুশিনেশন যেহেতু তার মনের মধ্যে আগে থেকেই পুরোনো স্মৃতি ভিড় করে ছিলসেই হ্যালুশিনেশনের ঘোরে তিনি নিজের দাদুসুবলদা বা জীবনদাদুকে প্রায় প্রত্যক্ষ দেখতে বা তাদের গলা শুনতে পাচ্ছিলেন সুবলদার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম হতে পারে কিন্তু কথা হচ্ছেএত সব কান্ড কি সাধারণ ঘুমের ওষুধে আর এত তাড়াতাড়ি হতে পারে?

-নারকোটিক জাতীয় ওষুধকুণাল বলল

-ঠিক তাই সেদিন সুজয়বাবুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুগতর সঙ্গে ঘটনাটা নিয়ে আলোচোনা করতে গিয়ে এই সন্দেহটা প্রকাশ করতেই সে লাফিয়ে উঠল পুলিশের কাছে খবর ছিল যে সাউথ চব্বিশ পরগণায় কোকেন জাতীয় মাদক পাচারকারী একটা দল কাজ করছে কিছুতেই তাদের ধরা যাচ্ছিল না তখনই ঠিক করা হয় ও ড্রাইভারের ছদ্মবেশে আমাদের সঙ্গে যাবে

-ছদ্মবেশে কেনপ্রশ্ন করল কুণাল

-নাহলে সুজয়বাবুরা সতর্ক হয়ে যেতেন ওদের চট করে ধরা যেতনা হতে পারে সঙ্গে পুলিশের লোক যাচ্ছে জানলে  দাদাকে কোনোমতে রাজি করে যাওয়াটাই বন্ধ করে দিত একজন স্কুলটীচার আর দূজন ছাত্র যাবে জেনে নিশ্চিন্তে রাজি হয়েছিল সেজন্যেই ঐ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যদিও সেটা পুরোটাই আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে তারপর অবশ্য দেখা গেল আমার অনুমানটা সঠিক ছিল

একটু থেমে রজতস্যার আবার বললেন – আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম অষ্টভুজ ঘরটার ডুপ্লিকেট আবিষ্কার করে তারপরেও সেটাকে কাছ থেকে দেখতে না দেওয়ায় বা বাগানের গেট টপকে ভেতরে গিয়ে আরো অ্যাডভেঞ্চার করতে না দেওয়ায় তোরা সেদিন বেজায় মনঃক্ষুন্ন হয়েছিলিস সত্যি বলতে কি আমারও যে সেরকম ইচ্ছে হচ্ছিলনা তাও নয় কিন্তু সুগতর সন্দেহটা ঠিক হলেআমাদের বাড়তি কৌতুহল জানাজানি হয়ে গেলে ওদের আর ধরা যেতনা কিছুমাত্র সন্দেহ হলে ওরা উধাও হয়ে যেত

-সেটা ঠিক স্যার পলাশ স্বীকার করে নিল - আমরাও ভাবছিলাম ঐ ঘরটা খুঁজে পেয়েও আপনি কেন আরো নিশ্চিত হবার জন্যে কোনো ছুতোয় বাড়িটার ভেতর ঢোকার চেষ্টাও করলেন না

-আসলে একটা কথা মেনে নিতেই হবেআমরা পেশাদার গোয়েন্দা নই আমাদের মূল উদ্দেশ্য কোনো অলৌকিক ঘটনার লৌকিক কারণ খুঁজে বার করা আমার পদ্ধতি হল ঘটনার সম্ভাব্য কয়েকটা ব্যাখ্যা তৈরি করে তার স্বপক্ষে কিছু প্রমাণ খুঁজে বার করা এক্ষেত্রে সেটা পাওয়া গেল ছবির পেছনের দেওয়ালে ধুলো ময়লার উপস্থিতি বা জলাজমির ওপর কাঠের পাটাতনের দাগ ইত্যাদির মধ্যেযেগুলো ব্যাখ্যাটাকে মজবুত করেছে কিন্তু সুগত বাগচির উদ্দেশ্য অন্য তার অভিজ্ঞ পুলিশি চোখ এরই মধ্যে বাড়ির পেছন দিকের জমিতে নিয়মিত লোক চলাচলের চিহ্ন দেখে নিয়েছে ভাঙা দেওয়ালের পাশের রাবিশের স্তুপের ওপর দিয়ে বস্তা জাতীয় ভারি কিছু টেনে নিয়ে যাবার চিহ্নও তার চোখে পড়েছে আমরা যখন চায়ের দোকানে বসে কথা বলছি সে তখন হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দূরবীন দিয়ে ভাল করে অষ্টভুজকে জরীপ করে ফেলেছে ড্রাইভার সেজে সে চুপচাপ তার নিজের কাজ করে গেছে , কেউ খেয়ালও করেনি কিন্তু আমরা যদি ওই বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে কোনোভাবে ওদের সন্দেহ জাগিয়ে ফেলতাম তাহলে ওর সব প্ল্যান ভন্ডুল হয়ে যেত

পলাশ আর কুণাল মাথা নাড়ল স্যার ঠিকই বলেছেন

-আমরা যখন লাইন হোটেলে লাঞ্চ করছিলাম তখন সুগত তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা বলে লোকাল থানার আউটপোস্টে গিয়ে সব কিছু জানায় আর লালবাজারে কথা বলে ওখানে রেড করার ব্যবস্থা করে আমরা দ্বিতীয়বার কদমফুলি যাবার পরেপরেই পুলিশ গোটা জায়গাটা ঘিরে ফেলে আমাদের ক্যানিং স্টেশনে নামিয়ে সুগত নিজেও চলে যায় ওখানে ভোররাতে অতর্কিতে হানা দিয়ে ওখানকার মালি,চৌকিদারকেয়ারটেকার সবাইকে গ্রেফতার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে যদিও ওদের মোবাইল ফোনগুলোও সীজ করায় সে খবর এখনো সুজয়বাবুদের কাছে পৌঁছোয়নি তবে কিছু একটা বিপদের আশঙ্কা যে ওরা করছিলেন সেটা ওদের ঘন ঘন মোবাইলে কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা দেখে মনেই হচ্ছিল তবে মনে হয় এতক্ষণে সুজয় আর অজয়ও অ্যারেস্ট হয়ে গেছে

-মানে আপনার কথা অনুযায়ী বিজয়বাবু আরও কিছু অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন পলাশ বলল

-রেড করে কিছু পাওয়া গেছেরুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করল কুণাল

-পুরোনো বাড়ির ভেঙে পড়া ঘরগুলোর তলায় মাটির নিচে একটা পাতাল ঘরের মধ্যে প্রচুর বেআইনি মাদক পদার্থ পাওয়া গেছে বস্তা ভর্তি সাদা সাদা পাউডার সম্ভবত কোকেনল্যাবোরেটরিতে পরীক্ষার পরই নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে

-এইসব নিষিদ্ধ জিনিষগুলো নিশ্চয়ই জলপথে ওখানে আসত পলাশ বলল, - সেইজন্যেই খাল পাড়ে নৌকোয় লাগাবার পাটাতনগুলো রাখা ছিল

-খুবই সম্ভব আবার ঐ রকম পাটাতন পেতেই জলা পেরিয়ে পুরোনো বাড়িতে জিনিষগুলো আনা হত রজতস্যার বললেন - খুব সম্ভবত বাংলাদেশ বা ময়নামার থেকে চালান আসত আর ওখান থেকে নানা জায়গায় সাপ্লাইএর ব্যবস্থা হত

একটা কথা অনেকক্ষন থেকে কুণালের মাথায় ঘুরছিল সে এবার প্রশ্ন করল – স্যারআপনি হ্যালুশিনেশনের কথা বলার সময়ে বলেছিলেন বিজয়বাবুর সুবলদাকে দেখাটা অন্যরকম হতে পারে তার মানে কি সুবলদাকে দেখাটা ওনার হ্যালুশিনেশন নয়সে বেঁচেই আছেঅপঘাতে মারা যায়নিকিন্তু তাহলে তো তার অনেক বয়স হওয়া উচিত

-কথাটা ঠিক খেয়াল করেছিস তো  মুচকি হাসলেন রজতস্যার - আসল ঘটনাটা ঠিক তা নয় ভেবে দেখতাকে প্রথম দেখেই বিজয়বাবুর সুবলদার কথা মনে হয়েছিল কফি খাবার অনেক আগেই অ্যারেস্ট করার পর তার পরিচয়টা জানা গেছে সে হল বিমল সুবলদার ছোটো ছেলে সুজয়ের ছোটোবেলার বন্ধুতার উচ্ছন্নে যাবার সঙ্গী তার বাবা তাকে অনেক আগেই বাড়ি থেকে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল সুবল মারা যাবার পর সুজয়ই তাকে ফিরিয়ে আনে সে-ই ভুতের ভয় দেখিয়ে নিজের মা আর দাদার পরিবারকে ঐ বাড়ি থেকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করে ভুতুড়ে কুখ্যাতি পাওয়া বাড়ির ধারে কাছে কেউ ঘেঁষবে না এই মতলবেই হয়তো ভেবেচিন্তে কাজটা করেছিল সে মনে হয় তার বাবার সঙ্গে তার চেহারার একটা স্বাভাবিক মিল আছে যেটা প্রথম দর্শণেই বিজয়বাবুর চোখে পড়েছিল বড় হবার পর তাকে বিজয়বাবু আর দেখেননি বলে চিনতে পারেননি কিন্তু সুবলদার সঙ্গে মিলটা চোখে পড়েছিল

-আমার ধারণা ড্রাগ চক্রের মূল পান্ডা ওই বিমলই একটু থেমে আবার বললেন রজতস্যার - সুজয় আর অজয়কে সেই মনে হয় সেই এরমধ্যে টেনে এনেছে ভুতুড়ে বাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে ওদের ট্রান্সপোর্টের ব্যবসাটাও হয়ত ড্রাগ পাচারের কাজে লাগে তবে সেসব দেখা পুলিশের কাজ আমাদের যেটুকু কাজ ছিলমানে ভৌতিক ঘটনাটার একটা ব্যাখ্যা খুঁজে বার করাসেটা আমরা ঠিকঠাক করে ফেলেছি আরও একবার প্রমান করা গেল যে কোনো অলৌকিক ঘটনাকে ঠিকমত বিশ্লেষণ করলে একটা যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় আমাদের পক্ষে সেটাই যথেষ্ট

 

(সমাপ্ত)



-----------------------------------

এই ধারাবাহিক রহস্য 

উপন্যাসটি পড়ুন ও 

পড়ান।      


মতামত জানান। 

ankurishapatrika@gmil

.com 


-----------------------------------  

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটির সবগুলো পর্বের নীচের লিঙ্ক ক্লিক করে পড়ুন।           


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_3.html



https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_10.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_18.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/11/blog-post_39.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_83.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_9.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_16.html


blogspot.com/2020/12/blog-post_23.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2020/12/blog-post_30.html

 

https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_6.html


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/01/blog-post_13.html

 




 





1 টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগলো। তবে রহস্য গল্প না গোয়েন্দা গল্প এ ব্যাপারে প্রশ্ন উঠলেও কিচ্ছু যায় আসে না।

    উত্তরমুছুন