উন্মুক্ত কবিতা -১০
জয়শ্রী সরকার-এর কবিতা
১.
জীবনটা ঠিক নদীর মতো
জীবনটা ঠিক নদীর মতো ঢেউয়ের পরে ঢেউ
দুঃখ-সুখে লেপটে থাকে বাঁধতে পারে কেউ ?
মন-নদীতে উথাল-পাথাল নিত্য ঢেউয়ের চলা
ধরতে পারি কতই বা আর, যায় না কিছুই বলা !
ভাঙা-গড়ার লীলাখেলা ঢেউ নিয়ে যায় বুকে
পাড় ভেঙে দেয় কোথাও বা সে, কোথাও সবাই সুখে !
দুঃখ-সুখের ভেলায় ভেসে ঢেউয়ের নিত্য খেলা
ঢেউ চলে যায় আপন বেগে সাঙ্গ করে বেলা !
এই অবেলায় নিত্যনূতন ঢেউয়ের আনাগোনা
আগামীর সেই শুভবার্তায় স্বপ্নের জাল বোনা !
এমনি করেই জীবন-তরী অজস্র ঢেউ গুনে
সাঙ্গ করে ভবের খেলা ওপারের ডাক শুনে !
২.
আগমনীর আবাহনে
বাজলো তোমার আলোর বেণু শরৎরানি হাসে
আকাশ মাঝে নীলপরিরা সুখসায়রে ভাসে !
মৃণ্ময়ী মা বিশ্বজননী, চিন্ময়ী মা ঘরে ঘরে
দুঃখ-সুখের অশ্রু-সাজিতে অঞ্জলি দেয় প্রাণ ভরে !
আগমনীর শেষ বিকেলে নয়নলোভন শোভা
পাপড়ি মেলে কাশফুলেরা সত্যি মনোলোভা !
ভোরের বেলায় শিউলিতলায় আগমনীর গন্ধ
জোনাকজ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝিঁর ডাকের ছন্দ !
দীর্ঘ দিনের প্রতীক্ষা শেষ, সবার মুখে হাসি
দুগ্গা বলে, শরৎ আকাশ বড্ড ভালোবাসি !
দুগ্গা আসুক সবার ঘরে খুশির খবর নিয়ে
সবহারাদের দুঃখ ঘুচুক সুখের পরশ দিয়ে !
৩.
ঈশ্বর-মানব
তোমাকে সূর্যের পাশে বসিয়েছি -------
তুমি পলকে দাহ্য হয়ে যাওনি, ভাস্বর থেকেছ !
তোমাকে আকাশের নীলে মিশিয়েছি -------
তুমি মেঘে ঢেকে যাওনি, মুক্তি খুঁজেছ !
তোমাকে ঝরণার কাছে রেখেছি -------
তুমি ধারা হয়ে বওনি, স্বচ্ছতাকে ধরেছ !
তোমাকে বন-বাংলোয় দেখেছি -------
তুমি ফুলটবে শুধু ফোটনি, সৌগন্ধ বিলিয়েছ !
তোমাকে অক্ষরমালায় গেঁথেছি ------
তুমি সংকীর্ণতায় হাঁটোনি, অসীম ঔদার্যে মিলেছ !
তোমাকে মনন-তুলিতে এঁকেছি ------
তুমি কর্মকে ভোলোনি, জীবনসমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছ !
তোমাকে মহামানব ভেবেছি ------
তুমি আপ্লুত হওনি, বর্ণমালায় সাঁতার কেটেছ !
তোমাকে আরাধ্যের আসনে বসিয়েছি ------
তুমি অমরত্বের আশ্বাস দাওনি, মানুষের কথা বলেছ !
৪.
লাঠি একটা রূপক মাত্র
মনটা যে এক মস্ত লাঠি, শক্ত করে ধরো
চলতে পথে ওই লাঠিতেই শক্তিটাকে ভরো।
শিরদাঁড়াটা সোজা রেখো টাট্টুঘোড়ার মতো
দেখবে জীবন, ভু্লছে সবই দুঃখ-দৈন্য যত !
ছোট্টবেলার লাঠি ছিল আমার মা ও বাবা
নেই ওঁরা আজ, তাই মনে হয় --- শূন্যতা এক থাবা !
বাবা ছিলেন ভরসারই ছাদ, শক্ত লাঠির মতো
মায়ের স্নেহ-সুধা পানে মনের আদর তত !
বিদ্যারম্ভে এই লাঠিটাই ভীষণ কাজে লাগে
প্রশ্রয় পেলে কোনো শিশুই আসবে না তো বাগে।
শাসন করা তাদের সাজে সোহাগ করে যারা
অন্যায়েতে লাঠির ঘাও সইবে ঠিকই তারা !
লাঠি লাগে অনেক কাজেই, বিপদ থেকে মুক্তি
কুকুর-বিড়াল তাড়ানোটাও অকাট্য এক যুক্তি।
লাঠি খেলার চল ছিল তো শক্তি পরীক্ষাতে
এখন যে তা উঠেই গেছে কালের অভিঘাতে !
লাঠি একটা রূপক মাত্র, জীবন থেকে বুঝি
অক্ষমতা আসলে মানুষ সেই লাঠিকেই খুঁজি।
কালের ফেরে বৃদ্ধ হলে সন্তানই হয় লাঠি
সেই লাঠিতেই ভর করে তো জীবন পথে হাঁটি !

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন