প্রতিদিন বিভাগে
অণুগল্প -৫
জোনাকি
শ্রাবণী বসু
অকালে মা মারা গেল। কারখানায় শিফ্ট ডিউটি করে ছেলের খেয়াল রাখা সম্ভব হচ্ছিলনা অলোকের। বন্ধুর পরামর্শে আত্মীয় স্বজনের সাথে আলোচনা করে ছেলেকে হোস্টেলে রেখে এল অলোক।
যে বয়সে ছেলেরা মাকে বন্ধু মনে করে সেই বয়সে মাকে হারানোর শোক সামলে উঠতে পারেনি কুশল।তার ওপর নতুন জায়গা, কলকাতা শহর। এতকাল নামটাই শুনেছে। শহরটাকে অদ্ভুত লাগে কুশলের । কেউ কারো জন্য ভাবে না। গাদাগাদি করে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে বিস্তর দূরত্ব।
নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, শিক্ষক নতুন,বন্ধু নতুন, হোস্টেল নতুন, এলাকা নতুন।উফ, এত নতুনের সাথে কী করে সে তাল মেলাবে ভেবেই পায়না।কুশলের কান্না পায়।
বাবা ফোন করে রোজই , তাও... বড় শূন্য শূন্য লাগে।মা বলত, ধেড়ে ছেলে ,খাইয়ে না দিলে খেতে পারেনা। আমি মরলে কী করবি?
মা যদি জানত, নিজে নিজে খাওয়া কেন ,মাঝে মাঝে ভাতের ফ্যান ঝরাতেও হয়। হাত পুড়লে জ্বালা সহ্য করতেও হয়।
প্রথমটা দুচোখ জলে ভরে যেত,এখন সেটা আর হয়না।কেবল দলা পাকানো কষ্ট গলার কাছে পাক খায়।এক একদিন বাবার ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে হতাশ হতে হয় । হয়ত বাবা কিছুটা নিশ্চিন্ত এখন।হয়ত ভাবছে, মানিয়ে নিতে শিখে গেছি। ।সব ফেলে বাবার কাছে চলে যেতে ইচ্ছে করে।জানি, বাবার কাজের চাপ আছে। মাকে হারিয়ে বাবারও মন ভালো নেই।
কিন্তু এখানে আপনার জন বলতে যে কেউ নেই। সারাদিন খাবার না খেলেও কেউ কিচ্ছু বলেনা। জল কম খেলে জোর করে কেউ খাইয়ে দেয়না। পড়তে না বসলে কেউ বকাবকি করেনা। কেউ বলেনা, কাল রাতে কেন মশারি টাঙাস নি। দরজায় খিলটা ঠিক করে তুলিস।অঙ্কে ফুল মার্কস পেলে কেউ বলেনা, বাহ,কুশল, আজ একটা ক্যাডবেরি কিনে দেবো।
বাবা হয়তো মাঝে মাঝে ভুলে যায় ,আমি এখানে একা আছি,এক্কেবারে একা। মায়ের ওপরে অভিমান হয়, এমন করে কেউ যায়! আমি এখনও বড় হয়নি। মা আমাকে একটুও ভালোবাসে না। একদিনের জ্বরে কেউ অমন মরে যায়? কালুর মা তিনমাস জ্বরে ভুগেও বেঁচে আছে। কালুকে কতো ভালোবাসে।তাই বাবাকে একবার ফোন করে মায়ের কথা বলবো? সেটা কি উচিৎ হবে?
বাবা যদি চুপি চুপি কাঁদে! কষ্ট পায় যদি? বাবা তো বলতে পারবে না কিছু। কুশল মুঠো আলগা করে ফোনটা আলতো করে টেবিলের ওপর রেখে এসে বাইরের বারান্দায় দাঁড়ালো। বাইরে অন্ধকারের মধ্যে থোকা থোকা জোনাকির আলো নক্ষত্রের মতো জ্বলছে নিভছে।কুশল ঐদিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
✍🏾আপনিও এই বিভাগে লেখা পাঠান ✍🏾

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন