লেবেল

শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১

রবিবারের গল্প ।। প্রেমিকার সাক্ষাৎকার — তপনজ্যোতি মাজি।।Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 





রবিবারের গল্প



প্রেমিকার সাক্ষাৎকার 

তপনজ্যোতি মাজি




জমিয়ে শীত পড়েছে কদিন। সন্ধেবেলায় তীব্রতা একটু বেড়ে যায়। শীতের তীব্রতা না পসন্দ কথাকলির। কেমন একটা শ্লথতার শিকার হতে হয়। বেড়ে যায় পোশাকের সংখ্যা ও স্তর। ক্রিম , লোশন ও ময়েশ্চারাইজাররের পৌনঃপুনিক ব্যবহার। হালকা শীতে হালকা পোশাক সেই সঙ্গে হালকা ক্রিমবা ময়েশ্চারাইজার। ওর পছন্দ। ওষ্ঠের মসৃণ ব্যালকনিতে রুপোলি রোদের মতো এক চিলতে হাসি ছড়িয়ে গেল। সে চাইলেই তো হবেনা। হয় না সব কিছু যেমনটা মানুষ চায়। তবু এই সব চাওয়ার মধ্যে বোধকরি একটু কল্পনা কিংবা রোমান্টিকতা থাকে। এই যেমন এখন এই শীতের সন্ধ্যায় রুদ্র , তার প্রেমিক তার ইন্টারভিউ নিতে আসছে। হালকা প্রসাধনে নিজেকে রেডি করে লিভিং রুমে বসে পাক্ষিক ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিলো কথাকলি। 


রুদ্র , রুদ্রদীপ তার প্রেমিক, বন্ধু এবং স্বপ্ন পুরুষ। কথাকলি তার এই প্রেম সমন্ধে যেমন সাবলীল তেমনি সহজ তার বাবা মা। কাজেই এই বাড়িতে রুদ্রের আসা যাওয়া প্রায় নিয়মিত। তবে আজকের আসাটা একদম অন্য কারনে। তাই  স্মার্ট কথাকলি যেন কিছুটা অন্যমনস্ক।রুদ্র একটি বহুল প্রচারিত সংবাদ দৈনিকের সাংবাদিক এবং একাধিক বাংলা ম্যাগাজিনে নিয়মিত ফিচার লিখে থাকে। তার ফিচারের বিষয়বস্তুতে সব সময় প্রথা ভাঙার প্রবণতা কাজ করে। বিষয় নির্বাচন থেকে ব্যক্তি নির্বাচন ,অভিনব আকর্ষণ থাকে তার ফিচারে। ঠিক যেমন আজকের নির্বাচন। একটি মাসিক পত্রিকায় প্রেম ও প্রেমিকা সম্বন্ধীয় স্পেশাল সংখ্যায় তার ফিচারের বিষয় প্রেমিকার সাক্ষাৎক্ষর। এই ফিচারের জন্যে রুদ্রদীপ নির্বাচন করছে তার নিজের প্রেমিকা  কথাকলিকে। এই উদ্দেশ্যেই আজ সন্ধ্যায় রুদ্র আসছে।সক্ষাৎকার নেবে কথাকলির। তাই কথাকলি একটু অন্যমনস্ক।


কথাকলি ও রুদ্রর প্রেম শুরু থেকেই স্রোতস্বিনী। ধীর ও প্রসন্ন তার প্রবাহ।উদ্বেল ঢেউ নেই, তরঙ্গের বিস্ফোরণ নেই। আছে বিশ্বাস, আস্থা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। তাদের সম্পর্কের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে বকুল সুগন্ধ।একজন আর একজনকে সুন্দর করে বোঝে। সব সম্পর্কের মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। সেটা বাস্তব বোধ দিয়ে বুঝে নিতে হয়। এই ব্যাকরণের  কোনও প্রথাসিদ্ধ নিয়ম বা নির্মিতি নেই।পৃথিবীতে দুটো মানুষের সম্পর্কের রসায়ন তাদের নিজেদের মতো। কারও সঙ্গে মেলেনা। কথাকলি এবং রুদ্রদীপ সেটা জানে।শুধু জানে তাই নয়, বিশ্বাস এবং আচরণে মেনে চলে। তাই তাদের সম্পর্কের ভিত্তি সুন্দর এবং সাবলীল।


ঠিক ছ টা চল্লিশে রুদ্র এলো। সন্ধ্যা তখন মন্থর পায়ে এই মফস্বল শহরে শামিয়ানা বিছিয়ে দিচ্ছে রাত্রির। শঙ্খ এবং আজানের ধ্বনিতে সন্ধ্যা যেন কিছুটা স্পিরিচুয়াল হয়ে যায়। কথাকলির মনে ধর্ম বিষয়টা যতখানি আচার এবং প্রতিষ্ঠান নির্ভর তার থেকে অনেক বেশি বোধ নির্ভর। তাই সে, ধর্মপ্রাণ হয়েও সংস্কারহীন এবং মানবিক।


রুদ্রের মেজাজও  আজ তন্ময়। দৃষ্টির মধ্যে ডুবুরীর একাগ্রতা। যেন কোনও সেলিব্রিটির সাক্ষাৎকার নিতে এসেছে। কথাকলি তার প্রেমিকা ,এই সত্যটা মন থেকে মুছে দিয়েছে পেশাদারীত্বের সাবলীল দক্ষতায়। লাল চা নীল কাপে। নো স্ন্যাকস। প্রস্তুত হয়ে আসতে বললো কথাকলিকে। কথা বলতে হবে কথোপকথনের ভঙ্গিমায়।কথাকলি বসার ঘরে এলো সাতটা পাঁচে। শুরু হলো  এক প্রেমিকার সক্ষাৎকার।

- নমস্কার। শুভসন্ধা। আপনি  কথাকলি। আমাদের নির্বাচিত প্রেমিকা।আপনার সক্ষাৎকার নিতে ' বিনোদন ' পত্রিকার পক্ষ থেকে আমি রুদ্রদীপ।আপনি একজন প্রেমিকা। এই পর্যবেক্ষণে আপনার কোনও অস্বস্তিবা আপত্তি নেই আশাকরি? কথাকলির মনে হলো এই রুদ্র অন্য রুদ্র।নিজেকে গুছিয়ে নিল এক মুহূর্তেই। উত্তর দিল,

- না একেবারেই না। আমার সে রকম কোনও সংকোচ নেই। থাকার কারণও নেই। আমার প্রেমিক স্তিতধী এবং দায়িত্বশীল। আপনি দ্বিধাহীন প্রশ্ন করতে পারেন।

- সুন্দর। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার প্রেম সম্মন্ধে কি রকম উপলব্ধিএবং বিশ্বাস যদি বলেন?শীতের রোদ্দুরের মতো লাজুক হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়লো কথাকলির দুই ওষ্ঠের প্রান্তসীমানায়। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বললো,- ঠিক বলতে পারছি কিনা জানিনা। তবে উপলব্ধিটুকু বলাই যায়। আমার দৃষ্টিতে প্রেম মানে সমন্বয়, শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস। চিত্ত, আচরণ ও অভ্যাসের সমন্বয় ঘটলে প্রেমর সুসংবদ্ধ বিকাশ ঘটে। সাধারণ অর্থে লোকজ কথাবার্তায় যে প্রেমের কথা বলা হয়, সেটা কতখানি প্রেম সে সম্মন্ধে আমার গভীর সংশয় আছে , তবে বিরোধ নেই, অবজ্ঞা অথবা উন্নাসিকতাও নেই।বহুত্ববাদী সমাজে সব কিছুই চলে, চলে যায়। তবে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছাড়া প্রেম সোনার পাথরবাটি কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে থামলো কথাকলি। দৃষ্টিতে জোস্নাভেজা রাত্রির স্নিগ্ধ প্রসন্নতা। এই দৃষ্টি পড়তে পারলনা রুদ্রদীপ। নিজেকে ইন্টালেক্টচুয়াল   ভাবার অনুগ্র অহংকার  ভিজে গেল এক নিমেষেই। এ এক অন্য কথাকলি। তার প্রেমিকা । কিন্তু অন্য মনের অন্য নারী। সব লঘু আবেগ মুছে গেল। মুহূর্তে পাল্টে গেল পরিসর। মনের ভাঁজে ভাঁজে গুছিয়ে রাখা প্রশ্নগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। এতদিনের পেশাদারিত্ব ও ক্ষুরধার প্রশ্ন করার খ্যাতি টলোমলো।দ্বিধা  নাকি অস্বস্তি ? ঠিক বুঝতে পারল না রুদ্রদীপ। কিন্তু ভিতরে যে শুরু হয়েছে ভাঙন  সেটা স্পষ্ট অনুভব করলো। 


পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজ কাঠামোতে নারী জীবনের সব কিছুই কি পুরুষ নির্ধারিত? পোশাক থেকে সামাজিক মেলামেশা সব কিছুতেই পুরুষের খবরদারি। যেন পুরুষই সব বোঝে , সব জানে। এ কথাই কি বলতে চাইলো কথাকলি। দুরকম অনুভব নীরবে সঞ্চারিত হলো। প্রথমটা মস্তিষ্কে। দ্বিতীয়টা মস্তিস্ক হয়ে হৃদয়ে। প্রথমটায় লালিত পৌরুষে যেন দংশন যন্ত্রনা অনুভূত হলো। এক জন নারী কি পারে এমন মুক্তমন হয়ে ব্যক্ত করতে তার অভিব্যক্তি। এমন গভীর অনুভব।এমন সমাজ মনস্কতা। কতটুকুই বলেছে কথাকলি! কিন্তু যেন অনেক বেশি বলে দিয়েছে। যারা এক অর্থে নারীবাদী , উচ্চ স্বরে এর থেকে অনেক বেশি অভিযোগ ও অবহেলার কথা বলেন। কিন্তু লঘু স্বরে এমন উপলব্ধির কথা , জাস্ট অবিশ্বাস্য।  সে নিজেও তো পুরুষ। সে নিজে কি পুরুষ তন্ত্রের প্রতীক?

নিজের ওপর ক্রোধ হলো তার। ঠিক তখনই কথাকলির জন্যে হৃদয়ে অনুভব করলো সুতীব্র অন্তরঙ্গ টান। মনে হলো ভুল হয়নি তার। রাদার , ভুল হয়নি তাদের দুজনেরই।রুদ্রদীপ  নিজেকে স্বভূমিকায় ফিরিয়ে নিল মুহূর্তেই। ভুললে চলবেনা এইসাক্ষাৎকার নেওয়ার উদ্দেশ্যের কথা। নির্মোহ হতেই হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্কেরউর্ধে উঠে নিতে হবে এই সাক্ষাৎকার। সুতরাং  পরের প্রশ্নের জন্যে প্রস্তুত করলো নিজেকে।

- প্রেম , সংসার এবং স্বাধীনতা , এক সাথে কতটা  এগোতে পারে?

- বাহ! বেশ প্রশ্ন করেছেন। একটু কঠিন। কিন্তু উত্তরাতীত নয়। প্রেমের 

  সাধারণ এবং সামাজিক গন্তব্য সংসার। অধিকাংশের মত সেরকমই। ভুল কিছু নয়। বস্তুত, সংসার এই শব্দটাকে আমি রেসপেক্ট করি। কারণ , সংসারআমাদের সভ্যতাকে , ইনফ্যাক্ট, জীবনকে অনেক অনেক কিছু দেয়। স্বস্তি ,নিরাপত্তা এবং দায়িত্ববোধ। প্রেমও দেয় কিন্তু। তবে সেটা অনুভব করতে হয় ভিন্ন ব্যঞ্জনায়। 

- তাই?  একটু ব্যাখ্যা করবেন?

- চেষ্টা করতেই পারি। দেখুন প্রচলিত বিশ্বাস বলে প্রেম সংসারে এসে হারিয়ে ফেলে তার স্বপ্ন। প্রত্যহিকতা নষ্ট করে দেয় রোমান্টিকতা। হয়তো ঠিক। আবার হয়তো ঠিক নয় এরকম কোনও সিদ্ধান্ত। আসলে, এটা নির্ভর করে দুটো মানুষের মনের নমনীয়তা ও  পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর। প্রেম এবং সংসার উভয় ক্ষেত্রেই হতে হবে প্রত্যাশাশূন্য।  কিন্তু তার অর্থ দায়িত্বহীনতা নয়। এক জন আর একজনের কাছে প্রত্যাশাশূন্য  আবার দায়িত্বশীল থাকত হবে। এই রসায়ন এমন জটিল, এমন সুক্ষ যে সুর বা ছন্দ নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকেই যায়। বাস্তবে হচ্ছেও তাই।কথাগুলো বলে রুদ্রদীপের দিকে তাকাল কথাকলি। দেখল বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে রুদ্রদীপ। একটু অস্বস্তি হলো। ঠিক বলতে পেরেছে তো তার কথা। আসলে এই কথাগুলো নতুন কিছু নয়। কিন্তু তবুও গুছিয়ে বলতে গেলে,  ছন্দ ঠিক রাখতে গেলে সতর্ক থাকতে হয়।  সে আর রুদ্রদীপ প্রেম পর্যায়ে আছে। সংসার এখনও হয়নি।  তাই মনের মধ্যে দু একটা বুদবুদ।

 

 রুদ্রদীপ নিজেও যেন ' ন এন্ট্রি পয়েন্টে ' এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। যেন গন্তব্যে পৌঁছনার আগেই 'নো এন্ট্রি 'বোর্ড। কি ভাবে পরের প্রশ্নে যাবে ,  কিংবা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করবে কিনা ভাবতে লাগলো। জীবনের চেনা ছক কি ভাবে যে পাল্টে যায় , কে জানে! কথাকলির ভিতরে এতো গভীর বোধ থরে থরে  সাজানো আছে , যেন তার চিন্তার অতীত। এমন সময় রিং হলো তার ফোনে। সরি, বলে সোফা ছেড়ে দরজা পার হয়ে ঝুল বারান্দার এলো।ফোনের ও প্রান্তে কবি দময়ন্তী সেন। বলুন , স্মার্ট ফোনটা কানের কাছে নিল রুদ্রদীপ।ডিজিটাল ক্লকে সময় সাতটা চল্লিশ।





আরও  পড়ুন 👇👇👇

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন