এক শূন্য দশকের কবির বিশ্বাস চেতনা
জ্যোতির্ময় দাশ
কবি জন্মের জন্য একজন কবির প্রাথমিক কিছু শর্ত পূরণের প্রয়োজন হয়। সেই শর্তগুলি হল—ভাষা জ্ঞানের সঙ্গে বাক্ বিন্যাসের ক্ষমতা, ছন্দ ও অলঙ্কার ব্যবহারের ওপর দখল, প্রতীক ও চিত্রকল্প নির্মাণের পটুত্ব,কিন্তু সর্বোপরি প্রকৃত কবির থাকা চাই কাব্য চেতনা। এই চেতনা থেকে জন্ম নেয় কবির দর্শন ; যা তাঁকে সাধারণের থেকে অন্য এক নিভৃত ভুবনের নাগরিক করে তোলে। শূন্য দশকের কবি বিমল মণ্ডলের পঞ্চম একক কাব্যগ্রন্থ 'বিশ্বাসের চুপকথা'(প্রকাশঃ বইমেলা ২০২০) পাঠ করার পর মনে হল তিনি এই সকল শর্তের অধিকারী — তাঁর দর্শন হল বিশ্বাস, এক নিঃশর্ত বিশ্বাস, যে বিশ্বাস বোধের মধ্যে আছেঃ নিশ্চয়তা- সংস্কার- শ্রদ্ধা-ধর্মগতগুণ। এই বিশ্বাসবোধ উঠে আসে অন্তরের নিভৃত উপলব্ধির জগৎ থেকে। 'বিশ্বাসের চুপকথা' কাব্য সংকলনে নানা অনুষঙ্গে তা আমরা দেখতে পাই। একটু পরিচয় নেওয়া যাকঃ কবিতার শিরোনাম 'বিশ্বাস'।
রোজ রোজ মেঘের দিকে চেয়ে
কৃষকেরা যাত্রা শুরু করবে
তখনও বিশ্বাস থাকবে
ঝোড়ো হাওয়ায় ঝাউগাছ দুলিয়ে যাবে
আকাশে তারারা গোপন কথা বলে
চারদিকে চিন্তার ছায়া
তখনও বিশ্বাস থাকবে
হাল্ককাপনা বৃষ্টি
চারপাশে সবুজ শুকিয়ে
আকাশে মেঘেরা গম্ভীরা গান ধরে
তখনও বিশ্বাস থাকবে
বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি ঘাসের আগায়
সারি সারি মেঘ
আকাশে ঘুরে বেড়ায়
সমস্ত বিশ্বাস তোমারও বিশ্বাসে
তখনও বিশ্বাস থাকবে
যতক্ষণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।
সম্পূর্ণ কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করা হল এই কারণে যে কবি বিশ্বাসের নানা প্রেক্ষিতের উপস্থাপনা করতে করতে শেষ অমোঘ উচ্চারণে বিশ্বাসের শাশ্বত সংজ্ঞাটির কথা আমাদের জানালেনঃ 'তখনও বিশ্বাস থাকবে /যতক্ষণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।' বিশ্বাস না রাখলে বিশ্বাসের অস্তিত্ব নেই।প্রকৃত কবিতার মধ্যে প্রায়শই একটা জাদুচরণ বা ম্যাজিক পংক্তি থাকে যেটা কবিতাটিকে কবিতা হয়ে উঠতে সাহায্য করে। এখানে সেই জাদুচরণটি হল,'যতক্ষণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।'
এ ধরনের জাদুচরণ শ্রী বিমলের কাব্যগ্রন্থে অজস্র পাওয়া যায়, সে প্রসঙ্গে পরে আবার আসবো, তবে আগে আমি উল্লেখ করেছি 'বিশ্বাসের চুপকথা' কবির পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। ফলে দায়িত্ব এসে যায় পূর্বসুরিদের উল্লেখ করা, সেই সঙ্গে কবি পরিচিতি এবং কবির মূল কাব্যচেতনার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করবার। কবি বিমল মণ্ডলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ'অর্পণ'প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে,যখন কবি ২৩ বছরের যুবক মাত্র এবং কবিতা লেখা শুরু করার পাঁচ বছর পরে। অতঃপর পাই 'ফিরে পাওয়া কবিতা'(২০১১); 'শিরোনাম নেই' (২০১২),'আকাশ তুমি জানো'(২০১৪); বিশ্বাসের চুপকথা'(২০২০)। আলোচ্য গ্রন্থের পরেও কবির এই একই সময়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম কাব্যগ্রন্থ 'বৃষ্টি আজ মেঘের আড়ালে'(২০২০); 'সরোবরের ভেতর চাঁদ'(২০২০) প্রকাশিত হয় এবং তাঁর একটি প্রবন্ধগ্রন্থ 'কাজী নজরুল ইসলামঃ কবি ও কাব্য'(২০১৩) প্রকাশ পায়। তা ছাড়া তিনি ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ লেখেন নিয়মিত। তারও প্রকাশিত সংকলন আছে। সেই সঙ্গেই 'অঙ্কুরীশা' নামে একটা অভিজাত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক তিনি।কবিতা লেখা, কবিতা নিয়ে সংগঠন, কাব্য সংকলন;এককথায় কবিতা নিয়ে চলে তাঁর মনে অন্তহীন স্পন্দন।
কবি বিমল তাঁর প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থেই পাঠকমহলের স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছিলেন,সেই সঙ্গে বিদগ্ধ সমাজেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তাঁর প্রাথমিক কাব্য প্রয়াস। তেমন কয়েকজনের মন্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারেঃ-
১. 'অভাব আর দারিদ্রের মানচিত্র যেন এই কবির কবিতায়।'
—কবি শঙ্খ ঘোষ
২. 'এই কবির কবিতায় অন্ত্যজ মানুষের স্পষ্ট ভাষা উজ্জ্বল।প্রকৃতি প্রেমিক যেন অনবদ্য ধার তাঁর কবিতায়।'
— কবি শ্যামলকান্তি দাশ
৩. 'বিমলের কবিতার মধ্যে মাটির গন্ধ ছড়িয়ে। তাঁর মায়ের অভাব যেন কবিতার প্রাণ হয়ে উঠেছে।'
—কবি সাহিত্যিক নলিনী বেরা
৪.বিমলের কবিতায় বিষাদ জয়ের আনন্দ প্রকাশিত। দুঃখের কবিও বলা যেতে পারে।'
— কবি বিভাস রায়চৌধুরী
এসব তো হল বিদগ্ধ মানুষজনদের অনুভব—কিন্তু কবি নিজে কী ভাবেন তাঁর কবিতা প্রসঙ্গে সে কথাও এরপর শোনা যেতে পারে। 'বিশ্বাসের চুপকথা'র ভূমিকা থেকে একটি অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলঃ
''প্রাত্যহিক পৃথিবীর গতানুগতিক বেঁচে থাকার পাথর সরাতে সরাতে ঋতুবতী সময়ের করিডরে খুঁজে পেতে চেয়েছি ( মহানুভব আলোর আত্মীয়তা, ছুঁতে চেয়েছি) নদীর গান—শিশিরে ভেজে যেমন দুবেলা ধান। এভাবেই সন্ধানী হৃদয়ে পেয়েছি শব্দ ও শব্দের চুম্বন। শব্দ যখন আগুন হয়,অভিমানী হয়, আক্ষেপে অনুরাগী হয় তখন জাগে বোধ আর বোধনের;মন আর মননের কথকতা। শব্দ যখন নিবিড় হয় সন্ধ্যা পাখির ডানায়,শব্দ যখন ভালোবাসা হয় কবিতার ফুল ঠোঁটে নিয়ে, তখন নতজানু হই দ্বিতীয় ঈশ্বর সৃষ্টিশীল মানুষের কাছে । বেজে ওঠে শব্দের জলতরঙ্গ সময়ের হাত ধরে ।
মানুষের হয়ে মৌলিক কবিতা আস্বাদনের লোভে আশ্রয় নিই কবিতায়। আর তখনই শব্দ হয়ে ওঠে আমার জন্মান্তরের জন্মভূমি।"
অসাধারণ এই আলেখ্যটি — অত্যন্ত সহজ ও সরল ভাষায় কবি তাঁর কবিতা – সম্পর্কিত অনুভূতিটি প্রকাশ করেছেন।কিন্তু এই গদ্যাংশটি আমার অনবদ্য একটি বিশুদ্ধ কবিতা বলে মনে হয়েছে।
বাংলা কবিতার প্রাণকেন্দ্র কলকাতা থেকে বহুদূরে মফস্বলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বড়ো হয়ে ওঠা কবি বিমল প্রকৃত অর্থে এক গ্রাম্য কবি কিন্তু তাঁর চেতনায় কবিতার সকল অলঙ্কার এবং অহংকার,তাঁর দুঃখবোধ, তাঁর মাতৃ দর্শনের বিষণ্ণতা ও বিপন্নতা যেমন বিমূর্ত হয়ে ধরা পড়েছে,তেমনই দেখতে পাওয়া যায় প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় রূপকল্পের উদ্ভাস। কিন্তু আগেই উল্লেখ করেছি 'বিশ্বাসের চুপকথা'র অন্তর্লীন স্রোতধারা যদি বিশ্বাস হয় তাহলে আপাত অদৃশ্য ফল্গুধারায় বহমান বয়েছে কবির জীবনে মায়ের
স্নেহছায়ায় অভাববোধের এক তীব্র আর্তি। মা- কে নিয়ে তেমনই মর্মস্পর্শী একটি কবিতা 'দাগ':
সারা বাড়িময় সান্ধ্য দাগ
পরিচিত ও অপরিচিত শব্দমালা অসীমের আড়ালে
দুঃখ নেমে আসে
ক্রমশ অন্ধকারের ভেতর
মাটির উঠানে মায়ের বর্ণমালার দাগ
যা আজও সারা বাড়িময়।
মাত্র ছয় পংক্তির এই কবিতায় মাতৃস্মৃতি তর্পণের এক অনিন্দ্য বাঙ্ময় চিত্র ফুটে উঠতে দেখতে পাই যা পাঠক মাত্রকেই স্মৃতি মেদুর করে তোলে। এই ধরনের অন্য আর একটি স্মৃতি ভারাক্রান্ত মাতৃবন্দনার নিদর্শন আমরা পাই 'মন খারাপের ছায়া' কবিতার আঙ্গিকে—
তুমি আমার অনন্ত হৃদয় গভীরে
তবুও বুকের পাশে শূন্য দুয়ার
অজস্র গানের সুর
আনন্দ কোলাহলে বাজে
আরশিতে হেঁটে যেতে যেতে
তোমাকে জড়াতে চায়
মন খারাপের ছায়া।
এই সব আবেগময়তার মধ্যে বিচরণ করার প্রক্রিয়ায় নিমগ্ন থাকার পরও কবি বাস্তবতা বিমুখ নন। 'ক্ষত' কবিতায় কবির রাজনৈতিক মনস্কতার ছাপ দেখতে পাওয়া যায়—'তবুও ক্ষত থাকে শরীরে/যে ভাবে সমাজে কাটমানির ক্ষত থেকে যাবে চিরকাল।' কবির এই উপলব্ধির মধ্যে কোনও অহেতুক শ্লেষ, কটুক্তি বা রাজনীতির শ্লোগান নেই—এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ আক্ষেপ হয়ে ঝরে পড়ে।
আবার 'হাঁটি' কবিতায় উপনিষদের শাশ্বত দর্শনের অভিব্যক্তির প্রকাশ ফুটে ওঠে:'হেঁটেছি কতশত পথ/অলিগলি পেরিয়ে/এসো হাঁটি জীবন অবধি।' উপনিষদ আমাদের শিক্ষা দিয়েছে থেমে থাকাই জড়ত্বের লক্ষণ। জীবনের লক্ষ্য হবে এগয়ে চলা -চরৈবেতি।
আমরা এর আগে কবিতায় জাদু চরণের কথা বলেছি।এই জাদু চরণ একটি সাধারণ কবিতাকে অসাধারণত্বের ভুবনে উত্তীর্ণ করে— পাঠককে উদ্বেলিত করে, তার হৃদয় মস্তিষ্ক, উভয় স্তরে স্পন্দন তোলে। তেমন কিছু জাদুচরণের উল্লেখ আমি নীচে বিনা মন্তব্যে সাজিয়ে দিলাম। পাঠককে তার নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার ভার অর্পণ করেঃ
এক। আকাশের ডানায় দাঁড়িয়ে তুমি/বাতাসে ভেসে যাচ্ছ আমার অপেক্ষায়। (স্পর্শ)
দুই। অমাবস্যার তপোবনে নিরবধি / অসহায় ভাবে কাঁদি/ সংকল্পহীনতায় বিকিয়েছি জীবন। (আদেশ)
তিন। সমস্ত বর্ণমালা ধরা দেয় /আমার কবিতার শরীরী প্রেমে। (শরীরী প্রেম)
চার। আসলে মানুষের শ্রেণিভেদ মানুষকে হত্যা করে।(ইতিহাস)
পাঁচ। দুঃখের দ্রবণ থেকে জনক জীবন তৈরি হয়। (জন্ম যদি দাও)
ছয়। মাটির উঠানে মায়ের বর্ণমালার দাগ। (দাগ)
সাত।সবুজের গায়ে স্তব্ধতা আসে শব্দহীনতায়/কোমল স্পর্শের আনন্দ ছুঁয়ে বৃষ্টির পরে।(বৃষ্টির আগে)
আট। রাত্রির গোলাপ গাছে শিশিরেরা রেখে যায় আলো। (অচেনা মায়া)
'বিশ্বাসের চুপকথা' কাব্যগ্রন্থের মোট ৫১টি কবিতায় এধরনের জাদুচরণের অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে কবিতা প্রেমিকদের ভালোলাগার অপেক্ষায়।
জীবন সংগ্রামের দরিদ্রতম স্তর থেকে কবি বিমল তাঁর যাত্রা শুরু করে সাফল্যের সোনার কাঠিটি স্পর্শ করেছেন বলে, তাঁর অর্জনের মধ্যে কোনও সংশয়ের কুয়াশার মালিন্য নেই —তাঁর অভিজ্ঞতায় কোনও আভিজাত্যের খাদ নেই। তাই তাঁর কবিতার শরীরে ভোরের সূর্যকিরণ ধরা দেয় শুদ্ধতার প্রেক্ষাপটে। দীর্ঘ পরিশ্রমে বিমল কবিতার কৃৎকৌশল আয়ত্ত্ব করেছেন। — তাই পাঠক হিসেবে তাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাশা গভীর। শূন্য দশককে তিনি ভরিয়ে তুলবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস।
আলোচিত কাব্যগ্রন্থ:
বিশ্বাসের চুপকথা: বিমল মণ্ডল।
বাতায়ন :বনগাঁ,উত্তর২৪ পরগণা
প্রচ্ছদ:অশোক গড়াই
মূল্যঃ - একশো টাকা মাত্র


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন