ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা(পর্ব—৬)
পৃথিবীর উল্টো পীঠ
বিশ্বেশ্বর রায়
পরের কথাগুলো আগেই বলতে গিয়ে আমি ঘটনার পারম্পর্য কিছুটা ক্ষুণ্ণ করেছি৷ আবার আগের বিবরণে ফেরা যাক৷ আমাদের কলকাতার পাশের হুগলী নদী বা গঙ্গার মতো নিউইয়র্কের গা ধুয়ে বয়ে যাওয়া নদীর নামটি হাডসন৷ নদীর উপরের ব্রিজ পেরিয়ে কিছু পরে হাইওয়ে বা ক্রশকান্ট্রি রোড ধরে আমরা হু হু করে এগিয়ে চলেছি হার্টফোর্ডের দিকে৷ আমেরিকার পঞ্চাশটি স্টেট বা প্রদেশের অন্যতম কানেক্টিকাটের রাজধানী শহর হার্টফোর্ড৷ মুনিয়া বললো—'বাব্বা, যা চিন্তা হচ্ছিলো, তোমরা ঠিকঠাক পৌঁছোতে পারবে কি না মাদাম তুসোর মিউজিয়াম চিনে! তারপর বাসটা ধরতে পারবো কিনা তাই নিয়েও টেনসনে পড়ে গিয়েছিলাম৷ যাক, আর ঘন্টা দু'য়েক পরেই পৌঁছে যাব হার্টফোর্ড৷ জয়দীপ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকবে৷' তবে আমাদের নিশ্চিন্তির ভাবনার সঙ্গে অলক্ষ্যচারী অন্য কারও ভাবনার অঙ্কে কিছু গরমিল ছিল৷ ঘন্টাখানেকও হয়নি, হঠাৎ আমাদের বাসের গতি কমতে কমতে একেবারে থেমে গেল৷ একটু পরে জানা গেল সামনে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ যার কারণে সামনে অসংখ্য গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে৷ কতক্ষণে রাস্তা জটমুক্ত হবে বোঝা যাচ্ছে না৷ অত বিশাল চওড়া রাস্তা, আপ-ডাউন মিলিয়ে আট লেন, কিন্তু তাও গাড়ির জঙ্গলে গতি প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে৷ রাস্তার পাশে পাশে বিচিত্র, তীব্র আলো জ্বেলে পুলিশের গাড়ি সোল্ডারে দাঁড়িয়ে আছে৷ পুলিশ যান নিয়ন্ত্রণ করছে৷ অত্যন্ত ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের গ্রে হাউন্ড বাস৷ শুধু আমাদের বাসের কথা বলছি কেন, রাস্তার সমস্ত যান-বাহনের অবস্থা একই৷ আস্তে আস্তে অধৈর্য হয়ে উঠছি৷ কী বিপদে পড়া গেল রে বাবা! এখন প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে৷ ঠিকমতো চললে এতক্ষণে আমাদের প্রায় হার্টফোর্ডে পৌঁছে যাবার কথা৷ এখন যা অবস্থা তাতে কতক্ষণে যে পৌঁছবো তা ঈশ্বরই জানেন৷ নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল থাকার ফলে এবং এই দুর্ঘটনাজনিত উদ্বেগে আচ্ছন্ন থাকার কারণে আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম যে, ক্ষুধা-তৃষ্ণা বলে কোনো ব্যাপার থাকতে পারে৷ আমাদের হাতব্যাগে কিছু শুকনো খাবার, ফলও কয়েকটা আছে৷ কিন্তু তার কথা ভুলেই গিয়েছি৷ খেয়াল হল মুনিয়ার কথায়—'নানা টেনশনে একদম ভুলেই গেছি,g তোমাদের তো নিশ্চয়ই ভীষণ খিদে পেয়েছে? আমারও পেয়েছে৷ দাঁড়াও খাবারগুলো বের করি৷' ওর ব্যাগ খুলে কয়েকটা স্যাণ্ডউইচ, কলা আর মিষ্টি বের করল৷ খিদে যে সত্যিই পেয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া গেল হাতে হাতে৷ খাবারগুলো শেষ হতে বিশেষ দেরি হল না৷
বাস তো নড়েই না প্রায়৷ আমাদের বিজন সেতুর জ্যাম পেরোবার সময় বা কেষ্টপুর-বাগুইহাটির গাঁট পেরোবার সময় যে দশা হয় আমাদের এখনকার দশা তার থেকেও সঙ্গীন৷ সঙ্গীন শব্দটা লেখা মনে হয় যথাযথ হল না৷ কারণ, আমরা এ. সি. বাসের মধ্যে যথেষ্ট হাত-পা ছড়িয়ে আরামেই বসে আছি৷ এসব বাসে একজনও দাঁড়ানো নিষেধ৷ আর রাস্তা এতো মসৃণ যে ঝাঁকুনি একদম নেই৷ আর এখানে গাড়ির গতি যেহেতু বেঁধে দেওয়া এবং সবাই যার যার লেনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে গাড়ি চালায়, তাই হঠাৎ হঠাৎ দুম্ করে ঝাঁকিয়ে নেওয়া—এসব কিছুই একেবারে নাস্তি৷ তার উপরে আছে রাস্তার দু'পাশ জুড়ে চোখ জুড়োনো গাছের সারি৷ সারি না বলে বন বলাই যুক্তিযুক্ত৷ কারণ, সেই বন ভেদ করে নজর চলে না৷ শুধু সবুজের মেলা৷ এখানকার সবুজ আমাদের দেশের চেয়ে বেশি গাঢ়, কলচে৷ আমাদের দেশে পাহাড়ি পথে চলার সময় যে ধরণের গাছ-গাছালি দেখা যায় সেই ধরণেরই গাছপালা এখানে সর্বত্র৷ আমাদের দেশের সমতলে যে আম-জাম-জামরুল-কাঁঠাল-নিম-বট-অশ্বথ্থ-পাকুড়-কৃষ্ণচূড়া-নারকেল-তাল-খেজুর-লিচু-আতা-সফেদা-কুল-শ্যাওড়া-শিরিষ-বকুল-শিমূল-বাবলা ইত্যাদি গাছ সচরাচর দেখা যায় তার একটিও নজরে পড়ল না৷ তবে শুধু সেদিনই নয়, পরবর্তী সাড়ে চার মাসেও আমাদের দেশীয় গাছপালা প্রায় দেখতেই পাইনি কখনও৷ এমন কি আমাদের এখানকার চেনা ফুলের মধ্যে গোলাপ-গাঁদা-বোগেনভেলিয়া-ডালিয়া-কসমস এমনি হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া অন্য কোনও ফুল প্রায় চোখেই পড়েনি৷
দেরি হচ্ছিলো ঠিকই৷ কখন হার্টফোর্ড পৌঁছবো তারজন্য উদ্বেগও তৈরী হচ্ছিলো মনের কোণে, তাও সত্যি৷ তবে ওই যে সঙ্গীন অবস্থার কথা বললাম সেটা জ্যামে আটকে পড়ার সময়সীমার দীর্ঘতার পরিপ্রেক্ষিতে মনে এসে গেল৷ যাইহোক, এক পা এক পা করে চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত অকুস্থলে পৌঁছানো গেল৷ দেখা গেল একটি নয়, দু'টি গাড়ি ভেঙে তুবড়ে পড়ে আছে৷ মানুষজন মারা গেছে কিনা জানা গেল না৷ কারণ, ততক্ষণে গাড়ি দু'টি রাস্তার পাশে সোল্ডারে সরানো হয়ে গেছে৷ অ্যাম্বুলেন্স চোখে পড়ল না৷ এসে থাকলেও এখন আর নেই ঘটনাস্থলে৷ হয়তো আহতদের নিয়ে চলে গেছে হাসপাতালে৷ শয়ে শয়ে গাড়ির জঙ্গল সরিয়ে দেওয়ায় গাড়িগুলি আস্তে আস্তে গতি পেতে শুরু করেছে৷ ততক্ষণে প্রায় দু'ঘন্টা অতিক্রান্ত৷ কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করলাম এতো দেরী হচ্ছে, যাত্রীরা হয়তো ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, অধৈর্য হচ্ছেন, কিন্তু কোনো চিৎকার চেঁচামেচি নেই৷ বাস থেকে নামার প্রশ্নই ওঠে না৷ অকুস্থলেও মানুষের জটলা নেই৷ বেশ কিছু সংখ্যক পুলিশ আর ফায়ারব্রিগেডের কর্মী ছাড়া উৎসাহী দর্শক বা মানুষজন একটিও নেই৷ সহস্র গাড়ির জট সৃষ্টি হয়েছে বটে তবে কোনো আরোহী গাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নামেন নি৷ আর আগে যে বললাম—সাধারণ উহসাহী মানুষ দেখলাম না রাস্তায় তার কারণ, এখানকার হাইওয়েগুলোর পাশে হাঁটাচলার কোনো ব্যবস্থা নেই৷ একজন মানুষও রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটেন না৷ কারণ, গ্রাম বা শহর ছাড়া রাস্তার ধারে কোনো দোকানপাট বা ঝুপড়িজাতীয় কোনোকিছুই নেই৷ বস্তুত সারা দেশে কোথাও কোনো খড়ের ছাউনি দূর অস্ত্ টালি, টিন বা করোগেটের চালওয়ালা কোনো ঘর বা বাড়ি একটিও নজরে পড়ে নি৷ হাইওয়েতে তো দূরস্থান শহরের মধ্যে এবং ট্যুরিস্ট স্পটগুলো ছাড়া পদাতিক মানুষ প্রায় চোখেই পড়ে না৷ জানা গেল এখানে লোকসংখ্যার চেয়ে গাড়ির সংখ্যা খুব একটা কম নয়৷
আরও পড়ুন 👇👇👇
https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/04/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_14.html

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন