ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব-২)
পৃথিবীর উল্টো পীঠ
বিশ্বেশ্বর রায়
২.
এত যে হাজার রকমের নথিপত্র নিয়ে আমরা সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হলাম তার কিছুই প্রায় প্রয়োগ করার প্রয়োজন হল না৷ প্রায় নামমাত্র যুদ্ধেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল৷ প্রথমে একটি কাউন্টারে শুধুমাত্র আমাদের নাম-ধাম জিজ্ঞেস করলেন এক বঙ্গতনয়৷ তারপর পার্শ্ববর্তী কাউন্টারে এক মার্কিনীর মুখোমুখি হওয়া গেল৷ ভাবলাম এবার বুঝি আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ জেরা করা হবে৷ কারণ, শুনেছিলাম আমেরিকার ভিসা-সাক্ষাতকার ভীষণ কড়া৷ ওদের দেশে যাতে হাভাতে, হাঘরে মানুষ গিয়ে গেড়ে না বসতে পারে সেদিকে ওদের শ্যেন দৃষ্টি৷ বহু লোককে ওরা সাক্ষাতকারের সময় বাতিল করে দেয়৷ আমাদেরও মনে মনে সেই ভয় ছিল৷ তাই মার্কিনীর মুখোমুখি হয়ে বেশ কিছুটা অপ্রতিভ বোধ করতে লাগলাম৷ কিন্তু প্রথমেই তিনি শুভেচ্ছা বিনিময় করে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমরা বিবাহিত দম্পতি কি না৷ হ্যাঁ সূচক উত্তর শোনার পর মাত্র দু'তিনটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন৷ যাদের কাছে যাচ্ছি তারা আমাদের কে হয় এবং তাদের কোনো বাচ্চাকাচ্চা আছে কি না৷ এছাড়া তাদের বসবাসের ঠিকানা এবং আমরা শুধুমাত্র বেড়াতে যাচ্ছি কি না—এটুকু জেনেই আমাদের নিষ্কৃতি দিলেন৷ এরপর সেই বঙ্গতনয় আমাদের পাশের কাউন্টারে ডেকে জানতে চাইলেন আমরা ভিসা ওখানে গিয়ে সংগ্রহ করবো কি না৷ আমরা 'না' বলায় এবার আমাদের ডাক-ঠিকানা জানতে চাইলেন এবং পাসপোর্ট রেখে দিলেন৷ আমরা নিশ্চিত হলাম যে, আমাদের ভিসা মঞ্জুর হয়েছে৷ কারণ, আমরা আগেই জেনেছিলাম যে, যাদের ভিসা মঞ্জুর করা হয় না তাদের পাসপোর্ট সঙ্গে সঙ্গে ফেরত দেওয়া হয়৷
তিন-চার দিন পরে ডাকযোগে আমরা আমাদের পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম এবং সঙ্গে দশ বছর মেয়াদি মঞ্জুরিকৃত ভিসা৷ এবার টিকিট কাটা এবং গোজগাজের পালা৷
৩.
সিকিউরিটি গার্ড টিকিট এবং পাসপোর্ট-ভিসা পরীক্ষা করে ভেতরে ঢুকতে দিলেন৷ ঢোকার পরে লাউঞ্জে বসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে ঘোষণা শোনা গেল যে, বোর্ডিং ও ইমিগ্রেশনের জন্য গেট খোলা হয়েছে৷ আবার লাইন দিতে হল একটি কাউন্টারের সামনে বোর্ডিং পাস নেবার জন্য৷ আমাদের পাসপোর্ট-ভিসা এবং টিকিট নিয়ে কাউন্টার ক্লার্ক জানালেন যে, আমাদের টিকিট নাকি কনফার্ম নয়,স্ট্যান্ডবাই! অবাক হলাম ওকথা শুনে৷ কারণ, আমাদের টিকিটে নির্দিষ্টভাবে সিট নম্বর ইত্যাদি যথাযথভাবে লিখিত ছিল৷ তাহলে! কাউন্টার ক্লার্ক বললেন—'একটু সময় লাগবে আপনাদের কনফার্ম টিকিট এবং বোর্ডিং পাস পেতে৷' ফলে পাঁচ মিনিটের পরিবর্তে প্রায় এক ঘন্টা লেগে গেল বোর্ডিং পাস পেতে৷ লাইনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিলাম পাশের কাউন্টারগুলোতে দণ্ডায়মান যাত্রীরা ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করছেন৷ আমরাও ইমিগ্রেশন ফর্ম চাইলাম৷ কিন্তু কাউন্টার ক্লার্ক বললেন যে, আমাদের ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করতে হবে না৷ এরপর আমাদের করণীয় কী ভাবতে ভাবতে আমরা ইমিগ্রেশনের লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ হঠাৎ দেখি একজন কর্মচারী হন্তদন্ত হয়ে এসে আমাদের ডেকে বললেন—'আপনাদের ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়াতে হবে না৷ সিকিউরিটি চেকিং-এর লাইনে দাঁড়ান৷' তাঁর কথামত আমরা সিকিউরিটি চেকিং-এর লাইনে দাঁড়ালাম৷ বিশেষ সময় লাগল না এসব সারতে৷ সবকিছু সেরে অবশেষে লাউঞ্জে গিয়ে আবার অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন ডাক পড়ে উড়ানের৷ আমাদের যাত্রা ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে, ভায়া দিল্লি, নিউইয়র্ক৷
দিল্লি পৌঁছুলাম রাত সোয়া দশটায়৷ ওখানে ফ্লাইট বদল করে অন্য ফ্লাইটে দীর্ঘ উড়ান শুরু হবে মাঝরাত পেরিয়ে রাত পৌণে দু'টোয়৷ দিল্লি এয়ারপোর্ট বিশাল এবং অত্যাধুনিক৷ সমগ্র করিডর, লাউঞ্জ, সপিং এরিয়া দামি কার্পেটে মোড়া৷ আমরা অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে প্লেন থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি৷ উদ্দেশ্য লাউঞ্জে বসে হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া৷ কারণ, তিন ঘন্টার উপর অপেক্ষা করতে হবে৷ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই আমরা এক বিস্ময়ের সম্মুখীন হলাম৷ দেখি আমার ও সুমিত্রার নাম লেখা দু'টি প্ল্যাকার্ড হাতে দু'টি অল্পবয়সী ছেলে-মেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ দেখে তো আমরা অবাক! মনে মনে ভাবছি এখানে আমাদের রিসিভ করতে এরা দাঁড়িয়ে কেন! কিছু কি অঘটন ঘটল! ছেলে-মেয়ে দু'টির কাছে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিতেই জানতে পারলাম সত্যিই অঘটন ঘটেছে৷ কলকাতা অফিস আমাদের ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ না করিয়েই শুধু বোর্ডিং পাস হাতে ধরিয়েই ছেড়ে দিয়েছিল৷ ইমিগ্রেশন সার্টিফিকেট ছাড়া তো দেশের বাইরে যাওয়াই সম্ভব নয়৷ ওরা বলল—'স্যার, ম্যাম আমাদের সঙ্গে আসুন৷ আপনাদের ইমিগ্রেশন সার্টিফিকেট নিতে হবে৷ কলকাতায় আপনারা ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করেন নি৷' তারপর বেশ মজা করে বলল—'এতো টাকা খরচ করে ইউ এস এ-তে বেড়াতে যাচ্ছেন, কিন্তু ইমিগ্রেশন সার্টিফিকেট ছাড়া তো আপনাদের ওদেশে ঢুকতেই দেবে না! এয়ারপোর্ট থেকেই ফেরত পাঠাবে!' কী ঝকমারি রে বাবা! আমরা বেশ শঙ্কিত হলাম৷ বললাম—'কিন্তু কলকাতা থেকে তো আমাদের বলল যে, আপনাদের ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করতে হবে না!' ওরা আশ্বস্ত করে বলল—'ঘাবড়াবেন না, আমাদের সঙ্গে আসুন৷ হয়তো সময় ছিল না বলে ওখানে ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করায় নি৷ তাই কলকাতা থেকে সঙ্গে সঙ্গে মেইল করে ওরা আপনাদের ব্যাপারে ডিটেল জানিয়েছে৷' ইমিগ্রেশন বিভাগে আমাদের পৌঁছে দিয়ে ওরা অন্য কাজে চলে গেল৷ এবার ধীরেসুস্থে আমরা ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করে কাউন্টারে লাইনে দাঁড়ালাম৷ আমাদের মুখে সবিশেষ শুনে এবং আমাদের নার্ভাস ভাব লক্ষ্য করে কাউন্টার ক্লার্ক সুমিত্রাকে উদ্দেশ্য করে বললেন—'ঘাবড়াবেন না ম্যাডাম৷ ইমিগ্রেশন সার্টিফিকেট ছাড়া আমরা কি আপনাদের উড়ানে উঠতে দেব! আমাদের দায়িত্ব নেই? আসলে আপনাদের টিকিট কনফার্ম ছিল না বলে ওখানে প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছিল৷ তাই ওরা ইমিগ্রেশনের ঝামেলা ওখানে না করেই আপনাদের পাঠিয়ে দিয়েছিল৷ তারপর সঙ্গে সঙ্গে মেইল করে সবকিছু জানিয়েছে৷ তাই তো আপনাদের পাকড়াও করে আনা হল!' নিজের রসিকতায় হাসতে হাসতেই তিনি আমাদের পাসপোর্টে সিলমোহর দিয়ে দিলেন৷ উনি হাল্কাচালে রসিকতা করলেও আমরা পুরো ব্যাপারটায় কোনও রস পাইনি৷ তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন—'প্রথমবার যাচ্ছেন নিশ্চয়ই?' আমরা 'হ্যাঁ' বলতেই আবার জিজ্ঞেস করলেন—'ওখানে কে থাকে আপনাদের?' আমরা মেয়ে-জামাই, ছেলের কথা জানাতেই আবার সহাস্যে বললেন—'আপনাদের শুভযাত্রা কামনা করি৷ আপনাদের আনন্দ-ভ্রমণ মধুর হোক৷'ওঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা সিকিউরিটি চেকিং-এর লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ সিকিউরিটি চেকিং-এর যাবতীয় বিধি সম্পন্ন করে আমরা আবার লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম৷ আমাদের উড়ান রাত্রি একটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে৷ ওখানে অপেক্ষার মধ্যেই ফোন এল মেয়ের কাছ থেকে৷ সব শুনে বলল—'বাঃ, সবই তো ঠিকঠাক উতরে গেছ৷ এবার উড়লেই এক ধাক্কায় নিউইয়র্ক৷ টেনশন কোরো না৷ আমি ম্যানহাটনে গ্রেহাউন্ড বাস টার্মিনাসের সামনে অপেক্ষা করবো৷ এখন প্লেনে উঠে স্রেফ ঘুমিয়ে পড়ো৷' আমাদের উড়ান ছাড়ার ঘণ্টাখানেক আগে টার্মিনালের নির্দিষ্ট গেট খোলা হল৷ আবার একবার সিকিউরিটি চেকিং সেরে গিয়ে বসলাম দেশের মাটির শেষ প্রতীক্ষালয়ে৷
চলবে...
---------------- ---------------- ----------------
প্রতি বৃহস্পতিবার অঙ্কুরীশা-র পাতায় প্রকাশিত এই ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা ক্লিক করে পড়ুন ও পড়ান। মতামত জানান।
---------------- ---------------- ----------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন