ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব- ১০)
নেপথ্য সংগীতের আড়ালে
অনন্যা দাশ
জিকোর
লিস্ট
নাম মোটিভ আ্যলিবাই
শেঠ
কুন্দনলাল
ঝভর - ইন্সুরেন্স থেকে টাকা আদায়? সবাই দেখেছে ফোন ধরতে বাইরে গিয়েছিলেন
ধূর্জটি
কর্মকার মণি নিয়ে বই লিখছিলেন। অর্থের জন্যে?
হিম্মতলাল
খুরানা অর্থের জন্য
পাথরটা অজিত পাঠকের হাতে
ছিল দেখেছিলেন কি? বন্ধুর জন্যে মিথ্যা বললেন?
অজিত
পাঠক
অর্থের জন্যে? পাথরটা ওনার কাছে ছিল। মিথ্যা বললেন কেন?
রাজেশ্বর
ঝা অর্থের জন্যে? বলেছেন আলো যাওয়ার সময় পাথরটা পাঠকের কাছে ছিল।
তথাগত
লাহিড়ি অর্থের জন্যে?
মামা
জিকোর লেখায় চোখ বুলিয়ে বলতে শুরু করলেন, “হ্যাঁ,
অ্যালিবাই তো শেঠজি ছাড়া কারো নেই। আবার উনি যদি
তথাগতকে
বলে থাকেন ওনার জন্যে পাথরটা নিতে এবং পরে ওকে ইনসুরেলের পয়সার সিকি ভাগ দেবেন তাহলেই তো তথাগত বড়লোক। তবে কি যেহেতু ওনাদের পরিবারের গৌরবের সাথে মণিটা জড়িত উনি মনে হয় না ওই রকম কিছু করবেন। হিন্মতলাল খুরানা সিটি প্যালেসে চাকরি করেন। ঠাকুরদার ব্যবসা ছিল কিন্তু ওনার বাবার আমলে সেটা লোকসান হয়ে হয়ে লাটে ওঠে। ওনার মনে কি আছে জানা নেই। পুলিশের মতে অজিত পাঠকের পসার ভালই ছিল কিন্তু যে বাড়িটাতে ওনার ক্লিনিক সেই বাড়িটায় কিছু একটা সমস্যার জন্যে ক্লিনিক বন্ধ। ওনার নিশ্চয় বেশ কিছুটা ক্ষতি হয়েছে তাই মণি চুরির সুযোগ পেলে লোভ সামলাতে পারবেন এমনটা ওরা মনে করেন না। তবে আমাকে ওরা ওই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে বারণ করেছিল তাই আমি করিনি।”
রাজেশ্বর ঝা
সম্পর্কে খারাপ কিছু নেই ওদের কাছে কিন্তু উনিও কি লোভ সামলাতে পারবেন? একই ব্যাপার তথাগতবাবু আর ধূর্জটিবাবুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
অখিলবাবু
বললেন,
“কিন্তু একটা কথা বলুন, ধূর্জটিবাবু যদি চুরি না করে থাকেন তাহলে ওনার বাড়িতে যে মণিগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো কোথা থেকে কী করে এলো?”
“ধূর্জটিবাবু বলেছেন উনি নাকি বাড়ির চাবি হারিয়ে ফেলেছিলেন কয়েকদিন আগে। তারপর আশ্চর্যজনকভাবে ওটা ওনার বাইরের ঘরের টেবিলের তলা থেকে খুঁজে পান কয়েকদিন পর। অথচ উনি বলেছেন যে উনি সিওর যে দু'দিন আগেও চাবিটা ওখানে ছিল না। তবে উনি ব্যাপারটা নিয়ে আর মাথা ঘামাননি। পুলিশ ধরার পর ওদেরও বলেন। যদিও পুলিশ সে কথা বিশ্বাস করেনি। ওদের বক্তব্য উনি এখন প্যাচে গড়ে ওই সব গল্প বানাচ্ছেন। আমরা যদি মেনে নিই যে উনি সত্যি চাবি হারিয়েছিলেন এবং সেই চাবির গোছাই ফিরে এসেছে, তার মানে ওনার চাবির গোছার নকল করে ফেলেছে কেউ আর ওনাকে ফাঁসাবে বলে মণিগুলো ওনার ঘরে রেখেছে।”
“মানে কালনাগ ওনার বাড়ির চাবির কপি করেছে।”
“হ্যাঁ, তাই তো মনে হয়।”
অখিলবাবু মন্তব্য করলেন, “তবে
ধূর্জটিবাবু বোকামি করেছেন। চাবি হারিয়ে যাওয়ার পর ওনার উচিত ছিল দরজার তালা
পালটে ফেলা ।”
“হ্যাঁ, তা ঠিক তবে ততক্ষণে
হয়তো যা হওয়ার হয়ে গেছে। ধূর্জটিবাবুর পক্ষে ওনলি প্লাস পয়েন্ট হল অঙ্গদের
ব্যাপারটা যখন হয় তখন উনি জেলে ছিলেন, কিন্তু ওনার বিরুদ্ধে এত বেশি প্রমাণ।”
১৬.
কালনাগের রক্ত উগবগ করে ফুটছিল। ওর সময়টা এখন মোটেই ভাল
যাচ্ছে না। বড্ড ছুঁচোর উপদ্রব বেড়েছে চারিদিকে।
এই সব ছুঁচোরা ওর সর্বনাশের ফন্দি আঁটছে। তাদেরকে নিয়ে আর
পারা যাচ্ছে না। তবে ওদের কৌন ধারণা নেই যে কালনাগ ছুঁচোদের কি দুর্দশা করে। কীধের
ব্যাগটাতে হাত ঢুকিয়ে দেখে নিলে কালনাগ। সিরিগ্রটা ঠিকঠাক আছে। যখন মণিমাণিক্যেরসন্ধানে
থাকে কালনাগ তখন সে অন্য রকম আর আজ তো ছুঁচো মারার কাজ, তাই আজ সে
সাধারণ লোকের মতনই যাচ্ছে কিন্তু ওর ঝোলায় রয়েছে কালনাগের বিষ।
ভাবা যায়,
সেই কোন ১৮৪৩ সালে নেপোলিয়ানের ভাই লুসিয়ান বোনাপার্ট সাপের বিষের
প্রোটিনগুলো আবিষ্কার করেছিলেন। কয়েকটা প্রোটিনের কি ক্ষমতা! কার্ডিয়োটজসিনগুলো
হৃদয়ের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকারক। হৃদয়ের মাংসপেশিগুলোকেশিথিল করে দেয় ওগুলো, ফলে হৃদয়
নিজের কাঁজ না করতে পারায় মৃত্যু অনিবার্ধ। হিমোটক্সিনগুলো লোহিত কণিকাগুলোকে নষ্ট
করে দেয়। ফসফোলাইপেজগুলো সেল মেস্ব্েনগুলোকে ফাটিয়ে দেয়। ফ্যাসিকিউলিন আর
ডেদ্রোটক্সিনগুলো নার্ভাস সিস্টেমকে প্যারালাইজ করে দেয়। আলফা নিউরেটক্সিনগুলো
শরীরকে প্যারালাইজ করে দেয়। ওই ছোট্ট সিরিঞ্জটার মধ্যে অত কিছু আছে ভাবলেই অবাক
লাগে কালনাগের,
কেমন জানি গা শিরশির করে। সাপের বিষ আবার খেলে নাকি কিছু হয় না। ওটাকে রক্তে মিশিয়ে
দিতে হয়।
কলিং বেল বাজাতে ছুঁচোটা এসে দরজা খুলে দিল। কেন এসেছে কি চাই
এইসব উল্টোপাল্টা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিল। কালনাগ ভুল ভাল মিথ্যে কথা কয়েকটা
আউরে দিয়ে ওর ঘরের সোফায় বসল। তবে বেশিক্ষণ বসা যাবে না সে জানে, বিষের শেল্ফ
লাইফ খুব কম। প্রোটিনগুলো বড্ড তাড়াতাড়ি ভাঙ্গতে শুরু করে। ছুঁচোকে অন্যমনস্ক
করে সিরিপ্রের পদার্থটা ওর শরীরে ঢুকিয়ে দিতে এতটুকু অসুবিধা হল না কালনাগের। কাজ
শেষ করে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সে,
মনে হয় না কেউ তাকে দেখতে পেল।
জয়গড় ফোর্টে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কামানটা রয়েছে। সেটার
নাম জয়বাণ। মহারাজা সোওয়াই জয় সিংহ (১৬৯৯-১৭৪৩) তার শাসনকালে ওই কামানটা তৈরি
করান। জয়গড়ের এক কারখানাতেই তৈরি হয় সেটা। কামানের গোল পাইপের মতন অংশটা, যেটাকে ব্যারেল
বলে, ২০ ফুট
লম্বা আর পঞ্চাশ টন তার ওজন। ব্যাস ১১ ইঞ্চি। সেটার গায়ে আবার গাছপালা, পশু পাখি
ইত্যাদি খোদাই করা আছে। কামানটাকে এমনভাবে চাকার উপর বসান হয়েছে যে সেটা
অনায়াসেই ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরানো যেতে পারে। একটা টিনের ছাউনি তৈরি করা হয়েছিল, সেটার নীচেই
থাকত কামানটা। পঞ্চাশ কেজি গোলাবারুদ লাগত আর ২২ মাইল পর্যন্ত ছুটে যেত সেই গোলা!
ওই বিশাল কামান দেখে অখিলবাবু এত আপ্লুত, অভিভূত হয়ে
পড়লেন যে ওনার মুখে ছড়া বেরিয়ে এল :
বিশাল এই কামান দেগেছিল যারা
চেহারায় সুবিশাল ছিল নাকি তারা?
নাকি তারা সব ছিল অতি ছোটখাটো
শয়ে শয়ে এসে সবে হাত পা লাগাতো
বিষম শব আর ভয়ানক আগুন
হাজারে হাজারে হত মানুষ খুন
থাকো বাবা কামান তুমি শান্ত হয়ে
দেখি তোমারে প্রাণ কাঁপে
ভয়ে
যুদ্ধবিগ্রহ বাবা আর কভু নয়
জয় জয় জয় শান্তির জয়।
জিকো শুনে বলল, “কিন্ত অখিলকাকু, আমি তো পড়লাম যে এটা কখনও যুদ্ধ ব্যবহারই হয়নি! জয়পুরের
রাজপুতদের
সাথে মোঘলদের তো সন্ধি ছিল।”
কিন্ত অখিলবাবুর কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।
দিব্যি কামানের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য পোজ দিতে দিতে
বললেন, “এ সব
তো
অনেকদিন আগেকার ব্যাপারস্যাপার। ব্যবহার হয়েছিল কি হয়নি
কেউ কি আর সঠিক বলতে পারে?
আমি তো চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছি আশুনের ভয়ানক গোলা সাঁ সাঁ
করে ছুটে চলেছে আর শয়ে শয়ে লোক লুটিয়ে পড়ছে!”
ওনার ওই কথা শুনে একজন সাহেব আর মেমসাহেব এসে কেকাকে
জিজ্ঞেস করলেন,
“হোয়াট ইজ হি সেয়িং?”
কেকাকে তখন অখিলবাবুর কথাগুলো অনুবাদ করে বলতে হল। সেটা
শুনে মেমসাহেব অখিলবাবুকে বললেন,
“সত্যি আপনার কি দারুণ কল্পনাশক্তি।”
অখিলবাবু তার উত্তরে বললেন, “পীস!
অলওয়েজ পীস! শান্তি। ওঁ শান্তি!”
সাহেব মেম জানালেন তারা লন্ডন থেকে
এসেছেন আর মহানন্দে অখিলবাবুর সঙ্গে ছবি তুললেন।
জয়গড় দেখা হবার পর একটা পাঞ্জাবি ধাবায় তন্দুরি রুটি আর
মাংস খেয়ে আনন্দমোহন ওদের গলতাজি নিয়ে চলল।
“বিদেশীরা
ওটাকে ‘মাঙ্কি টেম্পল’ বলে। অনেক বাঁদর আছে বলে।”
কেকার তো সেটা শুনে কি হাসি। জিকোকে বলল, “ওই দেখ, এখানেও তোর
বন্ধুরা আছে!”
জিকোও কম যায় না। বলল, “তোর লজ্জা করে
না পূর্বপুরুষদের নিয়ে ঠাট্টা করতে? ছি ছি!”
যাওয়ার পথে একটা মেঠো রাস্তার ধারে প্রচুর ময়ূর দেখে বাবা
মামা অখিলবাবু সবাই ছবি তুলতে নেমে পড়লেন। সে
এক অসাধারণ দৃশ্য। চিড়িয়াখানার বাইরে এত ময়ূর ওরা কখনও
দেখেনি আর ছাড়া অবস্থায় তো নয়ই।
গলতাজিতে সত্যি প্রচুর বাঁদর।
একটা লোক আবার বাঁদরদের ডেকে ডেকে রুটি খাওয়াচ্ছিল আর তারা পরম তৃপ্তি সহকারে সেগুলো
খাচ্ছিল। এখানে অনেক মন্দির আর একটা কুণড যেটা নাকি কখনও শুকায় না। সেটা
রাজস্থানের মতন মরুভূমির জায়গায় খুবই আশ্চর্যের । কিন্ত দুঃখের বিষয় জা়য়গাটাকে
যত ভাল করে সংরক্ষণ করা উচিত ততটা করা হয়নি। তাই বেশ কিছু মন্দিরের অবস্থা বেশ
জীর্ণ। ওখানে একটা বেদিক স্কুল চলে
এবং সেখানে সারা
ভারতবর্ষ থেকে ছেলেমেয়েরা এসে বেদ উপনিষদ শিক্ষা নেয়।
তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। শিলিগুড়ির একটা ছেলের
সাথে আলাপ হল ওদের। তখন ওদের খেলার সময় তাই ছেলেটার সঙ্গে কথা
বলা গেল। সেও বাংলা বলতে পেরে খুব খুশি। মা-বাবাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে আনন্দমোহন
ওদের শেঠ কুন্দনলালের বাড়ি নিয়ে গেল। কাজের লোক বসন্ত এসে দরজা খুলে দিতে মামা
জিজ্ঞেস করলেন,
“তথাগতবাবুকে একবার ডেকে দেবেন?”
“তথাগতবাবু
তো আজকে আসেননি কাজে। শেঠজি খুব রাগ করছিলেন উনি কোনও ফোনও করেননি বলে?”
“ও তাই নাকি।” মামার কপালে ভাঁজ।
“হ্যাঁ, সত্যি বলছি।
আমাকে বিশ্বাস না হয় শেঠজিকে জিজ্ঞেস করে নিন।”
“না, না, শেঠজিকে
জিজ্ঞেস করতে হবে না,” বলে মামা ছুটে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে
বসলেন।
“এখুনি
চলো!” বলে নোট বই থেকে তথাগতর ঠিকানাটা আনন্দমমোহনকে বললেন।
তথাগত লাহিড়ির বাড়ির গোটের কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে বিড়ি
ফুঁকচ্ছিল। মামা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা
তথাগত লাহিড়ির বাড়ি কোনটা?”
লোকটা আঙুল দিয়ে পিছনের দিকে যেতে বলল। পাঁচিলের ধার দিয়ে
সরু গলিপথ মতন দিয়ে বাড়িটার পিছনের দিকে
গিয়ে যে দরজাটা দেখতে পাওয়া গেল সেটার গাশের কলিং বেলটা
টিপলেন মামা। বেলটা বাজছে বোঝা যাচ্ছিল কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না দেখে মামা বললেন, “জিকো যা তো ওই
সামনে যে লোকটা দাঁড়িয়ে বিড়ি খাচ্ছে তাকে জিজ্ঞেস কর যে বাড়িওলা কে”
জিকো গিয়ে জিজ্ঞেস করতে লোকটা বলল, “আমিই তো
বাড়িওলা। কি হয়েছে?”
“আমরা
বেল দিচ্ছি কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না।”
“তার
মানে কেউ বাড়িতে নেই।”
“তাও
আপনি একবার আসুন,
প্লিজ।”
“ঠিক
আছে চলো” বলে লোকটা বিডিটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে নিবিয়ে চলল জিকোর সঙ্গে।
“কেউ
নেই মনে হয়,”
বাড়িওলা লোকটা বললে।
“কিন্ত
দরজায় তো বাইরে থেকে তালা দেওয়া নেই”
“তালা
নেই?” বলে
লোকটা দরজাটা আলতো করে ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল এবং ভিতরের বীতৎস দৃশ্যটা দেখতে পেল
সবাই। মেঝেতে পড়ে রয়েছেন তথাগত লাহিড়ি। মুখ দিয়ে গাঁজলা
উঠছে। মামা সঙ্গে সঙ্গে ওদের নিয়ে গলিপথ দিয়ে বাড়ির সামনে এসে পুলিশকে ফোন করতে
লাগলেন।
চলবে...
-------------------------------------------------------------------
প্রতি শুক্রবার অঙ্কুরীশা-র পাতায় ক্লিক করে সম্পূর্ণ বিনে পয়সায় এই ধারাবাহিকটি ডাউনলোড করুন এবং মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
---------------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন