রবিবারের গল্প
রিটার্ন গিফট
রবীন বসু
---দিদি, সাবধান। হাওয়া কিন্তু গরম।
---কেন? কী হয়েছে? ছোটবোন পম্পার কাছে জানতে চায় জয়িতা।
পম্পা সোফা থেকে উঠে প্রথমে দরজা বন্ধ করে। তারপর দিদির কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে, আমাদের ড্রাইভার মানিককাকু তোর আর দিব্যেন্দুদাকে কোন্ পার্কে নাকি বসে থাকতে দেখেছে। আর বাড়ি ফিরে বাবাকে ফলাও করে তা বলেছে। বাবা প্রথমে মাকে জিজ্ঞেস করে। মা কিছু জানেনা বলতে আমার ডাক পড়ে।
---বাবা তোকে কী জিজ্ঞাসা করল? জয়িতা জানতে চায়।
---বাবা আমার কাছে জানতে চাইছিল তোর কোন অ্যাফেয়ার আছে কিনা।
---তুই কী বললি?
---আমি আর কী বলব। বাবাকে তো জানিস কতটা অরথোডক্স। রাগে কাঁপছিলেন। আমি কোন রকমে ঘাড় নেড়ে বলে এসেছি, না না, দিদি এসব কিছুই করে না।
---বাবা বিশ্বাস করেছে? জয়িতার মনে সন্দেহ।
---মনে তো হয়না।
জয়িতা ভালো করে চেনে তার বাবাকে। একে বড় বিজনেসম্যান তার উপর পলিটিসিয়ান। নিজের দাপট নিয়েই ঘুরে বেড়ান। বাড়িতে কারো কোন স্বাধীনতা নেই। এমনকি মাকেও সব সময় তটস্থ থাকতে হয়। পান থেকে চুন খসলেই বিপদ। অপমানজনক কথাও শুনতে হয়। এবার বাবা যদি জানতে পারে একটা সাধারণ কেরানির ছেলেকে ভালোবাসে জয়িতা তাহলে কিছুতেই মেনে নেবে না। মানা তো দূরের কথা পারলে নিজের ক্ষমতা ও ম্যানপাওয়ার দিয়ে দিব্যেন্দুর চরম ক্ষতি করবে । জয়িতার মনে একটা দুর্ভাবনা ও ভয় বাসা বাঁধে। অজানা আতঙ্কে তার বুক কাঁপে। সে ভাবে দিব্যেন্দুকে এবার সাবধান করতে হবে। পাবলিকলি আর ঘোরাঘুরি করা যাবে না।
দিব্যেন্দু আর জয়িতা একই কলেজে পড়লেও দিব্যেন্দু এক বছর সিনিয়র। জয়িতা ইংলিশ অনার্স আর দিব্যেন্দু কমপিউটার সায়েন্স। কোন এক বৃষ্টিবিঘ্নিত বিকেলে হিস্ট্রির সীমাদি কফিহাউসে বসে সাহিত্যপাগল ছেলেটার সাথে তাকে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। তারপর ফোন, অনলাইন চ্যাট। কলেজ কেটে মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখা, কেএফসিতে খাওয়া। পার্কের সবুজে খোলা হাওয়ায় এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা। এইভাবে একদিন বুঝতে পারে তারা পরস্পরকে ভালোবাসে। কিন্তু সেই ভালোবাসায় এবার যে ভয় ঢুকল। তার পর থেকে জয়িতার সব সময় মনে হত কেউ বা কারা যেন তাকে ফলো করছে। বাবার মুখটা বার বার মনে পড়ত। দিব্যেন্দুকে বললে ও হেসে উঠত ।
---বেশতো, প্রেমে পড়ে মার খাওয়া সেতো ইতিহাসে আছে। না হয় দু'চার ঘা খাব। কিন্তু তোমাকে ছাড়তে পারব না।
দু'চার ঘা নয়, সাংঘাতিক এক কাণ্ড ঘটল কিছু দিনের মধ্যে। দিব্যেন্দুর জন্মদিন ছিল। সেলিব্রেট করার জন্য কলেজের পর জয়িতা কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার অ্যাক্রোপলিশ মলে গিয়েছিল। সেখানকার এশিয়া কিচেনে টেবিল বুক করা ছিল। দিব্যেন্দু আসার পর ওরা সবে কেক কাটতে যাবে এমন সময় জয়িতার বাবা তিন/চারজন বাউন্সার নিয়ে হাজির। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দিব্যেন্দুকে ওরা মারতে মারতে মলের বাইরে নিয়ে যায়। জয়িতা দৌড়ে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ডদের কাছে হেল্প চায়। তারা কোন এক অজ্ঞাত কারণে নিস্পৃহ থাকে। প্রভাবশালী বাবা জয়িতাকে এরপর টানতে টানতে মলের বাইরে নিয়ে গিয়ে জোর করে গাড়িতে তোলে। গাড়ির কাঁচের ভিতর দিয়ে সে দেখে রক্তাক্ত দিব্যেন্দু রাস্তায় পড়ে আছে।
অ্যাক্রোপলিস মলের সেই ঘটনার পর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। দিন চারেক তালা বন্দি থাকার পর জয়িতা কেমন নেতিয়ে পড়েছিল। এ ক'দিন সে জল ছাড়া কিছুই মুখে তোলেনি। চোখের সামনে শুধু ভাসছিল দিব্যেন্দুর রক্তমাখা মুখ আর অসহায় দৃষ্টি। সে ভাবতেই পারেনি বাবা এতটা অবুঝ হৃদয়হীন আর নিষ্ঠুর হবে! অমত থাকতেই পারে কিন্তু তা বলে গুণ্ডা দিয়ে পরের ছেলেকে মারা! তাকে শাসন করতে পারত! বাবার প্রতি একটা ঘৃণা জেগে উঠেছিল তার মধ্যে। সাথে সাথে দিব্যেন্দুর জন্য দুশ্চিন্তা। জানে না তার শরীর এখন কেমন? বাবাকে সে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
মনে মনে সে অনিন্দ্যর কাছে খুব ছোট হয়ে গিয়েছিল। খালি কান্না পেত। একটা অসহায় আকুতি তাকে যতটা ভিজিয়ে ছিল আবার একটা মানসিক দূরত্ব তাকে ততটাই দৃঢ় করল। মাস দুয়েক পর থেকে জয়িতা আবার নিয়মিত কলেজ যেতে শুরু করল। কিন্তু দিব্যেন্দুকে আর দেখতে পেল না। বন্ধুরা কেউ ওর খবর বলতে পারল না। ফোন করেও পেল না। ও প্রান্ত থেকে শুধু ভেসে এল, দিস নাম্বার ডাজনট এগজিস্ট।
অপমান আর অভিমানে দিব্যেন্দু নিশ্চয়ই পুরোন সিম ফেলে দিয়েছে। যাতে জয়িতা কোনভাবেই যোগাযোগ করতে না পারে।
অনেক দিন পর বাড়ির পাহারা যখন একটু শ্লথ হয়েছে, এক মেঘভাঙা বিকেলে জয়িতা গিয়েছিল দিব্যেন্দুর বাড়ি। বাইরের গেট থেকেই ওর মা কঠিন গলায় বলেছিল, দিব্যেন্দু আর এখানে থাকে না। ব্যাঙ্গালোরে পড়তে গেছে। তুমি আর এসো না কক্ষনো।
তারপর বাইশ বছর পার হয়ে গেছে।
কলেজ থেকে বেরিয়ে প্রথমে বিএড করে জয়িতা। তারপর মাস্টার্স কমপ্লিট করে ও এসএসসিতে বসে। ভাগ্য ভালো ছিল প্রথম বারেই পেয়ে গেল। তবে স্কুল বাড়ি থেকে অনেক দূরে। সেই বারাসাত। এমনিতেই ওই ঘটনার পর থেকে ছোটবোন ছাড়া বাড়ির সবাইয়ের সাথে তার মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এবার সুযোগ এল। বাবা-মাকে জানাল, স্কুলের চাকরিটা আমি নেব।
---তা নাও, কিন্তু তার আগে তোমাকে বিয়ে দেব। পাত্র আমার দেখা আছে। বন্ধু সুবিমলের ছেলে, সুপ্রতিম । বাবা বলল।
মা বলল, হ্যাঁ মা, খুব ভালো ছেলে । কর্পোরেট হাউসে চাকরি, নিজেদের বাড়ি। লম্বা, দেখতে সুপুরুষ।
বারেকের জন্য জয়িতার চোখের সামনে ভেসে উঠল মার খাওয়া রক্তাক্ত অসহায় দিব্যেন্দুর ম্লান চোখ । বাবার হিংস্র জান্তব মুখ। তার চোয়াল শক্ত হয়। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। এতদিন ধরে পুষে রাখা অবরুদ্ধ যন্ত্রণা এবার ফেটে পড়ল রাগে । এক অস্বাভাবিক গলায় সে বলে উঠল, ন্না, বিয়ে আমি করব না। আর এ বাড়িতেও আমি থাকব না। স্কুলের কাছে ঘর ভাড়া নেব, নাহলে কোথাও পেয়িং গেস্ট থাকব।
জয়িতার কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা, রাগী মূর্তি দেখে তার বাবা চমকে উঠল । এ যেন অন্য মেয়ে। মা আমতা আমতা করে তবু বলার চেষ্টা করেছিল, মেয়ে হয়ে একা থাকবি!
---হ্যাঁ, মেয়েরা এখন প্লেন চালাচ্ছে। জয়িতা ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল।
তারপর সত্যি সে একদিন বাড়ি ছেড়েছিল। প্রথম কয়েক বছর পেয়িং গেস্ট থাকার পর হোমলোন নিয়ে স্কুলের কাছেই এই চাঁপাডালিতে একটা আটশো স্কোয়ার ফিটের দু’ কামরার ফ্ল্যাট নিয়েছে। দক্ষিণে ব্যালকনি, সামনে অনেকটা ফাঁকা মাঠ। সারাদিন স্কুলে ক্লাস আর মেয়েদের মাঝে সময় কেটে যায়। কিন্তু বাড়ি ফিরে হাতের কাজ সেরে যখন এই দক্ষিণমুখো ব্যালকনিতে এসে বসে, তখন মনটা হু-হু করে ওঠে। একটা দলা-পাকানো কান্না গলার দিকে উঠে এসে চোখদুটো ঝাপসা করে দেয়। সেই নিঃসঙ্গতার হাত থেকে বাঁচতে সে ফেসবুককে আশ্রয় করেছিল। আর একদিন কী মনে করে সার্চে গিয়ে দিব্যেন্দু সেন টাইপ করেছিল। অনেক দিব্যেন্দুর মাঝ থেকে ছবি দেখে সে তার দিব্যেন্দুকে আইডেন্টিফাই করে। লিভস ইন মার্সেই, ফ্রান্স। স্ট্যাটাস ফাঁকা । জয়িতা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে ছিল। তিন চার দিন পর অ্যাকসেপ্ট করেছিল দিব্যেন্দু। তারপর রাতের অনেকটা সময় কেটে যেত ওদের চ্যাটে। একটু একটু করে জেনেছিল জয়িতা দিব্যেন্দুর কথা। ওই ঘটনার পর দিব্যেন্দু চলে আসে ব্যাঙ্গালোর। সেখানেই কোর্স কমপ্লিট করে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সের মার্সেই নগরীর এই আইটি সেক্টরে জয়েন করে। জড়তা কাটিয়ে আস্তে আস্তে দু'জনের হারিয়ে যাওয়া দিন আবার যেন ফ্রেমবন্দি হচ্ছিল। মরে যাওয়া আশাহত জয়িতা এই মধ্য চল্লিশে আবার যেন যুবতী হয়ে উঠছিল। ফিরে পাচ্ছিল তার হারিয়ে যাওয়া প্রেম।
এমন সময় দিব্যেন্দু জানাল সেই খুশির খবর! সে আসছে ইন্ডিয়াতে সামনের সপ্তাহে। একটা সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে! জয়িতার সঙ্গে দেখা করতে চায়। অনেক বছর আগে ওর বাবা তাকে একটা উপহার দিয়েছিলেন, এবার দিব্যেন্দু রিটার্ন গিফট দিতে চায়।
আনন্দে চোখে জল ভরেছিল জয়িতার। তার ইচ্ছা ছিল নিজে যাবে এয়ারপোর্টে ওকে আনতে। দিব্যেন্দু বারণ করেছিল।
---কী দরকার, এয়ারপোর্ট থেকে বারাসাত তো কাছেই। ঠিকানা দাও আমি উবের নিয়ে চলে যাব। তুমি বরং ভালো ভালো রান্না কর।
কিশোরী জয়িতা এখন প্রজাপতির ডানা নিয়ে ঘরময় উড়ে বেড়াচ্ছে। একবার ড্রয়িংরুম সাজাচ্ছে তো একবার কিচেনে গিয়ে পছন্দের পদ রাঁধছে। আবার এক ফাঁকে ব্যালকনি থেকে ঝুঁকে দেখছে গাড়ি ঢুকল কিনা। আর বার বার ঘড়ি দেখছে। শেষে একসময় কলিংবেলে জলতরঙ্গ বাজল। ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। বৈশাখের দমকা বাতাসের মত ঘরে ঢুকল দিব্যেন্দু। সঙ্গে এক মিষ্টি ফরাসি যুবতী।
জয়িতা অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে। স্তব্ধতা কাটিয়ে দিব্যেন্দুই প্রথম কথা বলল।
---এই হল আমার সেই রিটার্ন গিফট তোমার জন্য জয়িতা।
তারপর একটু থেমে অনেকটা চিবিয়ে পাশের ফরাসি যুবতীর দিকে ইশারা করে বলল, আমার মিসেস, অ্যাডেলা, আমরা একসাথে একই কোম্পানিতে কাজ করি। ও খুব ভালো মেয়ে।
জয়িতা দেখল তার সামনে তার প্রেমিক দিব্যেন্দু নয়, যেন প্রতিহিংসা-পরায়ণ এক হিংস্র অন্য দিব্যেন্দু । তার মুখে এক বিজাতীয় হাসি। যার সঙ্গে তার বাবার হাসির খুব মিল।
জয়িতার এতদিনের চেনা পৃথিবী শব্দহীন ভূমিকম্পে দুলে উঠলেও সে ত্বরিতে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে অ্যাডেলার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, ওয়েলকাম টু ইন্ডিয়া, অ্যাডেলা। আই অ্যাম জয়িতা।
আরও পড়ুন 👇👇👇
https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/02/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_26.html

খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুন