বইমেলা সংখ্যার গল্প
ভুলভাবে ঠিক সিদ্ধান্ত
সুবীর ঘোষ
ক্লাস টিচার ক্লাসে ঢুকে দেখেন আগের পিরিয়ডের শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডটা মুছে যাননি । তিনি বললেন --–কেউ এসে বোর্ডটা মুছে দিয়ে যা । কে আসবি ? রূপম তুই আয় ।
রূপম এগিয়ে যেতেই স্যার বললেন -- এ্যাই দাঁড়া দাঁড়া । যা যা শিগগির বাথরুমে যা । ক্লাসের মনিটর মোহন ঝাঁপিয়ে এল--কেন স্যার কী হয়েছে ?
স্যার বললেন -- দেখছিস না ওর প্যান্টে পটি হয়ে গেছে ।
রূপম ভয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে । মোহন হাঁটু মুড়ে ভালো করে দেখে বলল--না স্যার পটি নয় । এই জলটা পকেট থেকে বেরুচ্ছে । পেছন থেকে নয় । মোহনই রূপমের পকেটটা চাপ দিয়ে বলল---পকেটে নরম নরম কিছু আছে স্যার । স্যার বললেন--কী আছে বের কর । রূপম তো ভয়ে কাঠ হয়ে পকেট চেপে দাঁড়িয়ে । মোহন বলল--ভয় কিসের ? স্যারকে দেখা না কী আছে । মোহন নিজেই তখন টেনে বের করে আনল । পাতলা প্লাস্টিকে ভরা খানিকটা খিচুড়ি । সারা ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল । মোহন বলল ---কী রে মিড ডে মিলে খেতে পারিসনি না কী ? রূপমের মুখে রা টি নেই । স্যার বললেন--যা যা প্যাকেটটা ফেলে দিয়ে পা টা ধুয়ে আয়।
পল্টু দাস । লোকে বলে খোঁড়া পল্টু । খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই । কিন্তু সে তো সত্যি খোঁড়া । তবে জন্ম থেকে পায়ের কোনো দোষ ছিল না পল্টুর । ট্রেনে ট্রেনে খেলনা ফেরি করত সে । চলন্ত ট্রেনে এ কামরা থেকে সে কামরা করতে পারত পল্টু । এ রকম করতে গিয়ে গেল বর্ষার এক দিন তার পায়ের চটি পিছলে যায় । আর সে চলন্ত ট্রেন থেকে লাইনে গিয়ে পড়ে । মরেই যেত হয়তো । নেহাত কপালে পরমায়ু লেখা ছিল । স্থানীয় লোকজন তাকে কাছাকাছি এক হাসপাতালে ভর্তি করে দেয় । প্রাণে বেঁচে যায় পল্টু তবে একটা পায়ের বিনিময়ে ।
সেই থেকে সে গৃহবন্দী । বউ জবা সাত বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে । সাত বাড়ি নয় । এখন ছয় বাড়ি । একটা বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে জবা । সে বাড়ির মালকিন বাপের বাড়ি গেছিল । রোববার, বাবুটা একাই ছিল । সে বলে কী না --- সারা দুপুরটা থাকবি ? এখানেই খাবি । আলাদা পয়সা দেব । জবা সেই বেলাতেই কাজ ছেড়ে দিয়েছিল । বকেয়া মাইনে আনতেও যায়নি । ট্রেনে খেলনা বেচে পল্টু যা সঞ্চয় করেছিল সব নিজের শরীর সারাতেই চলে যায় । বসে বসে খেতে গিয়ে বাকিটাও শেষ ।
জবার চেষ্টায় দু’একবার পাড়ার কাছাকাছি একটা পানবিড়ির দোকান দেবার চেষ্টা যে সে করেনি তা নয় । কিন্তু কেউ বসতেই দেয় না । নিজেদের বিক্রি কমে যাবার ভয় । সবাই বলে কাউন্সিলর না বললে দোকান বসানো যাবে না । পিছিয়ে যায় পল্টু ।
সাত বছরের ছেলে রূপম পৌরসভার স্কুলে পড়ে । মাইনে দিতে হয় না । মিডডে মিলে দিনের খাওয়াটা হয়ে যায় তার ।
ঘরের চালের অবস্থা খারাপ । কিছু খড় কিনে ছাওয়ানো না করাতে পারলেই নয়। আগে এ সব কাজ পল্টু নিজেই করত । এখন লোক ডেকে করাতে হবে । তার জন্যে খরচা আছে ।
বেলা চারটেয় স্কুল থেকে ফেরে রূপম । পল্টু বাড়িতেই । একদিন রূপম বলে --জানো বাবা আজ মিডডে মিলে খিচুড়ি আর ডিম দিয়েছিল ।
n আস্ত ডিম ?
n হ্যাঁ বাবা একটা গোটা ডিম । এবার যেদিন দেবে তোমার জন্যে পকেটে করে নিয়ে আসব।
n না বাপ , ডিম আনতে লাগবে না । তুই বাচ্চা ছেলে । তোর এখন ভালোমন্দ খাওয়া দরকার । আমার মা চারটে হাঁস পুষেছিল । ছোটবেলায় অনেক ডিম খেয়েছি।
অন্য একদিন বাবা তাকে বলেছিল--–তোদের বুঝি প্রায়ই খিচুড়ি করে ? তোর মা-টা না খিচুড়ি করতেই চায় না । কতদিন যে খিচুড়ি খাইনি !
ছেলে কিছু বলেনি । কিন্তু মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিল তার বাবাকে সে একদিন খিচুড়ি
খাওয়াবে ।
তার বাবাকে খিচুড়ি খাওয়াতে গিয়ে যে এই কান্ড হবে কে জানত।
----------------------------------------------------------------------------
মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail.com
-----------------------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন