লেবেল

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

বিমল মণ্ডলের একগুচ্ছ কবিতা




১.
তোমাকে  নিয়ে লেখা


রোজ রোজ  বসে থাকতে আর ভালো  লাগে না
লিখে  যাওয়া  কবিতাগুলোর দিকে তাকাইও না 
আসলে মনখারাপের সময়ে শুধু  তোমায় নিয়ে লিখি
অসময়ে প্রেম  এলেও প্রেমের  দিকে মন থাকে না। 

জানালা থেকে দেখি আকাশ , মাথায় ঝাঁকড়া চুল
পাখিরা  হাসে মেঘকে  দেখে , চুল আঁচড়ায় না 
তোমাকে নিয়ে  লিখতে  গিয়ে, আকাশ, নদী , প্রেম
ভাবতে ভাবতে  ঘুম আসে, আর প্রেম আসে না। 

সকাল - বিকেল , সন্ধ্যা - রাত্রি কবিতাতে থাকি
চারদিক  নির্জন , স্তব্ধ।কবিতায় নিরবতা থাকে না
লিখে যাই তোমার  জন্যে, যা আসে যখন  মনে
তোমাকে নিয়ে  কবিতায়,   শুধু  আমার  ভাবনা।



২.
অভিন্ন


নিজেই আহার করি কবিতা
ধ্বনি, অক্ষর , বর্ণ, শব্দ, বাক্য-
এই পঞ্চব্যঞ্জনে 
নিজের সমস্ত ভালোলাগা , বিশ্বাস , অনুতাপ -
কবিতার  থালায় 
কখনো  পাখি, নদী , মাছ অজান্তেই  পরিবেশন করে
আকাশ, মেঘের  ইচ্ছেগুলো  পাখিরাও  জানায়

বদ্ধঘরে একা -একা ভেসে যাই স্বপ্নে 
মধ্যরাতে ক্ষুধা মেটায় 

কবিতার  পঞ্চব্যঞ্জনে ।




৩.
তরুণ  বুকে


মাঝে মাঝে নদীর  কাছে চিৎকার করে উঠি
মনে হয় কে যেন 
বুকের উপর  বসে আছে
আঁধার  ঝুলে  পড়েছে  মুখে
শরীরের ভেতর  লুকানো তরুণ 
চুম্বনের উষ্ণতা  নেয়

ধীর পায়ে কুয়াশা ভেজা  ঘাসে ঘাসে হাঁটি
বিচিত্র  আওয়াজ  আসে  ভেসে
তবুও  দেখতে  চাই 

চাঁদ ধ'রে, জ্যোৎস্না ধ'রে 
কলকল্লোময় আনন্দ ভরা আঁধারে 

তরুণ বুকে  শুয়ে আছে 
দু' একটা  নক্ষত্র ।



৪.
মানুষের চোখে চোখ রাখা যায়না 



কিছুতেই আজ-কাল মানুষের  চোখে চোখ রাখা যায় না-
ভয় করে। অসম্ভব  ভয় 
ভেতরে  চাঁদ  কথা বলে, কেউ কথা শোনে না
আমি সারাক্ষণ এম্বুলেন্সের ডাক শুনি
পাখিদের বিদ্রুপ  শুনি
তাই, কিছুতেই  মানুষের  চোখের  দিকে  চোখ রাখা যায় না -
শুধু  ভয় আর আতঙ্কে 

বর্তমানে  মানুষের কপালে পলাতক  হরিণের  কোলাজ
বিনা  অপরাধে  যাবজ্জীবন  সাজা হবে জেনে
শরীরে  জেব্রার  পায়ের  ছাপ আঁকে 
তবুও  অবশেষে  যেতে হয় ফাঁসিকাঠে

আমার দু'চোখে শূন্যতা ভর্তি 
ক্ষুধার্ত  কয়েদিরা আজ জেলবন্দী

চোখে  চোখ  হলে পরে, চলে যায় যে যার ঘরে
আমি কিছুতেই ঠিক  হতে পারি না

আজকাল  কিছুতেই মানুষের  চোখের  দিকে চোখ রাখা যায়না -
ভয়ে কিংবা  অজানা  কারণে 
দিনের আলো নিভে গেলে 
অন্ধকারে  তৃষ্ণার্ত  হৃদয়ে  
আমি আমার দিকে চেয়ে থাকি



৫.
সময়ের আতঙ্ক 


কাকে কি ভাবে, কেমন করে বোঝাবে?
আকাশ  বোঝে  সময় - অসময় 
মেঘ আঁকে ঋতুর  ছবি 
পাখিরা ডাকে সময়ের সুরে

আমি বোঝাতে পারিনা  - শুধু  তোমাকে
যতবার  বলেছি, ততবারই  এড়িয়ে  আমায়

এখন আমার হাতে কিছুই  নেই
দেখ চেয়ে  শুধু  তোমার জন্য 
লক্ষ  লক্ষ , কোটি  কোটি  মানুষ  পথে পথে
সমুদ্রের  পাশে, শপিং মলে  নারীর  ঠোঁট , হৃদয় 
নারীর  গর্ভে  যুবক এঁটে দিচ্ছে

এছবি আমার, তোমার চোখের পাতায়

এই দুঃসময়ে মানুষ, মানুষের  মতো  না হয়ে 
দূর  থেকে  হেঁটে  আসা কোনো  জীব বলে মনে  হয় 

কেউ মানে না বাধা, তার ফলফল শুধু  মৃত্যু  আর কান্না 

তাই আমার কলম থেকে ঝরে পড়ছে খরা, 
ঝরে পড়ছে  সংবাদ , অনুতাপ  আর 
সময়ের আতঙ্ক ।


৬.
 সম্বিলন

চোখের সামনে থেকেও আড়াল ঢাকি
তোমার চোখে তখন আমি অচেনা ছবি
গায়ে ঘেষা মানুষদের ছবির মতো আঁকি
নিজেকে চেনাতে মঞ্চে বহুরূপী কবি। 

নিজের বাঁধভাঙা, ঘোলাটে নদীর জলে
ভাসিয়ে দিই ছোটো বড়ো কাগজের নৌকা
যা আমার কবিতা নদীর জলে যায় দুলে দুলে 
সময়ে  ঠিক বোঝা যায় জীবনের আশঙ্কা। 

প্রতিটি সম্মেলন ভীড়ে ঠাসা সূচি সাজানো
হাজার হাজার মৃত্যু মিছিল, নেই  ভয় মনে
বাতাসে কবিতার ভাষা, শোনো মানুষ শোনো
যদিও কবিতা ছন্নছাড়া , তবুও থাকো জনে জনে।


৭.
-ক্রমমুক্তির পথে


এক একটা সাঁকোর দূরত্ব  প্রায় এক মিটার
প্রতিটির দুই  প্রান্তে বোকা  মানুষ 
অনতিদূরে ঠেসাঠেসি  ভীড় 

সব সাঁকো  ব্যস্ত  হয়ে  ওঠে 
ঠিকঠাক  পারাপার  করার ভার
পৃথিবী  বাঁচানোর  দায় 
তুলে নেয় সারি সারি সাঁকো 

ঘর আর পথ ঠিক অচেনা 
বোকা  মানুষের  
দল বেঁধে  সবটুকু  নিশ্বাস শুষে নেয়

ক্রমমুক্তির  পথে।


৮.
জ্যোৎস্নার হাসি


আমার কবিতার  হৃদয়ের ওপর 
বিশাল  জ্যোৎস্না আড়াআড়ি শুয়ে 
বিশ্রাম  নেয় অনবদ্য  শিথিল  দেহে
নিষ্পাপ  হাতে শব্দ  বুনি শরীর  ছুঁয়ে। 

দুলে ওঠে  পিঠ,কবিতার খোলা  মাঠে
সুক্ষ্ম  সুক্ষ্ম হাসি ঢেকে শুয়ে আছে
অর্থহীন  ভাবে আমি স্পর্শ  করে যাই 
খিলখিল  করে হেসে বলে - আছি বেঁচে। 

অনুতপ্ত  অনুভবে জ্যোৎস্নার হাসি দেখি
কবিতার হৃদয়ে তার শৈল্পিক চেতনা  আঁকি।



৯.
-প্রাত্যহিকের দানা 


খেলার উঠানে প্রতিপদে চাঁদ
ভোরের সামান্য  আগে,আকাশ  সবুজ 
মেপে মেপে কুয়াশার বাঁধ ভাঙ্গে 
প্রয়োজনে বাস্তব  মেঘ, বড্ড অবু
ঝ। 

পৃথিবীর  চোখ খুলে, সকাল ভাঙা টেবিলে 
সূর্যের  গায়ে রাত কুয়াশার  দাগ
টুপটাপ  শব্দ, রাঙা সূর্য মাছেদের বিলে
অফুরন্ত রূপ-যৌবনে দুপুর রাগ। 


আকাশ  থেকে  খসে পড়ে প্রাত্যহিকের দানা
বুবুক্ষু সমস্ত  মুখ, শব্দ - ভাষা  অচেনা।




১০.
লকডাউনের অষ্টমদিন

কতগুলো দিন-রাত উদাসীনতা 
শিহরণ শরীরে ঘন্টায় ঘন্টায় 
প্রতিটি  হৃদয় পাথর হয়ে যায়
বিশ্বের শিশুরাও খবর  রাখে তা। 

মনের সমস্ত  বিশ্বাস অন্ধকার  চত্বরে 
একাকিত্বের ক্ষীণ তেলের  প্রদীপে
মৈত্রী বন্ধন,  মৃত্যুর ধ্বনি সমীপে 
প্রতিধ্বনি অশুভ শক্তি,জেগে ওঠে শিখরে। 

মনের সমস্ত চিন্তা শূন্যতার গলিতে 
বিশ্রামের স্নিগ্ধ ঘরগুলো শুষে নেয়
বিমৃত সৃষ্টির আদিতম বীজ  অজেয় 
ভয়ংকর বাজনা বাজে নাড়িতে নাড়িতে । 

স্বাগত জানিয়ে লকডাউন অষ্টম দিন 
অন্তিম শয়নে চৌদ্দের এপ্রিল হবে বিলীন।





১১.
ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ এপ্রিল  ফুল

আজ এই বসন্তে, এলো অন্ধকার 
সহসা ঘুমের ঘোরে দেখি সকালে 
কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুলে ফুলে  একাকার 
শূন্য বাসা যে বাতাসে নড়ে, এপ্রিল ফুলে। 

অন্ধকার রাত্রির কোলে ভোরের দোয়েলপাখি 
 মনে করে জাগিয়ে  তোলে দুঃখের  দিনে এসে
রং,তুলি নিয়ে আমি বসন্তের কত ছবি আঁকি
পলাশ,শিমুল গাছে আনন্দের ডানা মেলে বসে। 



ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ এপ্রিল ফুল 
মৃত্যু দুয়ারে  দাঁড়িয়ে বলে যায় বুলবুল




১২.
ভোরের  কোলাজ


আজ দেখি ভোরের কোলাজ , আঁকাবাঁকা রেখা
দুই চোখ অন্ধকরে আর্তস্বরে  ডাকছে আকাশ
সময়ের রুক্ষ হাত অধীরতা অন্বেষণ, শব্দ লেখা 
ভাঙা ভাঙা দুপুর  ছড়িয়ে  একমুঠো বাতাস। 

এলোমেলো  ভোরের কোলাজ, আগুন আলোড়ন 
জীবনের  রৌদ্র রক্ত,মৃত্যুর ক্যানটিনে  দাগ
উপচে পড়া শক্তি, ক্লান্তিতে কেড়ে নেয় মন
অসংখ্য সুরে সুরে  ভেসে, বসন্ত ফাগুন  রাগ। 


আজ ভোরে উঠানের স্নিগ্ধতা রেখে কবিতায় 
শব্দের আঁচড় কাটে শান্ত পাতার ভেতর 
মনে হয় বেদনা জেগে ওঠে ভোরের দরজায় 
আমার হৃদয় বাক্, একেবারে  নিরব- নিথর। 


নীলাভ-সাদা মেঘ ধুয়ে অসংখ্য চিত্র রেখা
সূর্যের  সঙ্গমরত  ভোরের কোলাজ আঁকা ।



১৩.
মহামারি -' মার্চ-এপ্রিল 
২০২০ 


টুকরো  টুকরো  সূর্যকিরণ আমাকে স্পর্শ  করে 
সারি সারি   ঝাউ গাছের   ফাঁক  দিয়ে
দিঘির জল, রঙিন  কাচের ছায়া  ঘরে
গভীর  পলিতে  প্রাণ খুঁজি, রক্তের  বিনিময়ে। 


দিঘির  শীতল  কণ্ঠে বজ্রকঠিন  সাহস 
ঝরা পাতার  ঘূর্ণিতে মার্চে  আমি সাঁতার  কাটি
সব শ্রম উড়ে  যায়, মহামারির পট পরিহাসে 
সত্যতার নতুন বর্ণমালাতে, যাই হেঁটে হেঁটে । 

বাতাসে রঙিন  চিত্রশৈলী  উড়ে যায় 
দিঘির ঢেউ উপহাস,প্রভূত ছবি মিথ্যাচার 
ধীরে  ধীরে  এগিয়ে কত বর্ণের  মৃত্যুবীজ খায়
অনুপম অনুপাতে মানুষ মৃত্যুর  গণহার। 



প্রতীতি আরও  স্পষ্ট, এপ্রিলের  শুরুতে
দানা গুলি  এক, দুই, করে হাজার, হাজার ছড়িয়ে 
এই ঘূর্ণিঝড় কেড়েছে লক্ষাধিক সংখ্যাতে
সময় কম, যুদ্ধ সাজ গৃহবন্দী মানুষও হেরেছে। 



মৃত্যুর  গনিত নিয়ে এক নরম  সংশয় 
দুষ্প্রাপ্য চিত্রপটে জমা ধুলো ঝাড়ে
আবেগের  উচ্চকিত  প্রতিজ্ঞা ভেসে যায় 
বিদেশের মাটি থেকে মহামান্য  মৃত্যু  ধার করে। 

ঘুমন্ত  আজ মানুষ , মর্গে মহাশশ্মানে
জাতিগৌরবে ভাঙাচোরা সূর্যালোকের আগমনে।



১৪.
 লম্বা  অবসরে 


ঘরে ঘরে  আজ লম্বা  অবসর
টেলিফোন থেকে আড্ডা  হাসছে
সমস্ত পুরনো দিনের না জানার থেকে 
আমাদের সমস্ত ভুল প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গছে। 

যে সব পুরুষ এখানে আসে, তারা লুকিয়ে 
কালো  বৃষ্টির মতো দেহে অসাড় হয়ে ঝরে 
ঝরে যাওয়া বিন্দু বিন্দু  দাগ, মৃত্যুর ওপারে 
লম্বা অবসর মহার্ঘ,পাখিরা সুখের  সংসারে। 

নিঃসঙ্গতা নেই  স্ত্রী, সন্তান  পাশাপাশি আছি 
জীবনের দুর্ভোগ একটানা শিশুদের  কলরব শুনে 
মুছে  যায় সাজানো  হাসির কুচিকুচি গানের রাগ
সমস্ত  আকাঙ্ক্ষা  কেঁপে কেঁপে  ওঠে, সমুদ্র টানে। 

চীন,আমেরিকা... স্পেন, ইউরোপ  থেকে 
খসে খসে পড়ে এক- একটা  ভবিষ্যতের তারা
মুহূর্তে অর্থহীন জীবন প্রবল ঝড়ে , নিখোঁজ 
লম্বা এই অবসরে বিশ্বাসে, বেঁচে  -মরে আমরা ।


১৫.
 মড়ক


এই মাত্র প্রচার মোড়ে  মোড়ে দাঁড়িয়ে  মড়ক
চোখের  জলে কেউ কেউ দিগন্ত  বলয়ের দিকে 
অজস্র শবের গাড়ি গ্রাম- নগরীর পথে পথে 
গোপন  সুরের  আগুন যেন হয় ফিকে। 

পাখিদের  ডানা পুড়ে, আগুন শিখায়
ভাববার  অবকাশ যাপন চিন্তার অনিদ্রায়। 


১৬.
কোয়রান্টিন


সারা বছরের শেষে , ফিরছিলাম বাড়ি
হাতে ব্যাগ, সন্তান  আর স্ত্রীর  টানে
কাদামাখা পথ ধরে আনন্দে , টোটো  গাড়ি
মাঝপথে পুলিশ গাড়ি, বুঝিনি  মানে। 

জিজ্ঞাসা , মুখে  মাক্স  নিয়ে গেল গাড়ির  ভেতর
কতকাল  পরে আসা, সংবাদ পেয়েছি তার
শশব্যস্ত  আমি চোখ, কান বন্ধ, ফিরছি ঘরে
শরীরে  মারণ ব্যাধি বুঝিনি তখন  আবার। 

ক'দিন কোয়রান্টিনে, অন্ধকার চোখের সামনে
মৃত্যুর দুয়ারে  দাঁড়িয়ে একবার ইচ্ছে জাগে
স্ত্রী, পুত্র, বাবা- মা  একবার দেখি এই জীবনে 
ভাঙা  ভাঙা  স্বপ্নগুলো জীবন পথে লাগে। 

কোয়রান্টিনের দরজার  বাইরে, ইচ্ছে হলে
সবার শরীরে  একই রোগ পজেটিভ মেলে।



 

১৭.
স্বাধীন 


আকাশ  ঘেঁষে  চলে জ্যোৎস্নার আগুন
কচ্ছপের  প্রিয় জল, ঘুমন্ত শরীর 

পথ-ঘাট শুনশান, ঘুমের  মধ্যে  হাঁটে
দূরত্ব কঠিন ; হিসেব ভয়ে পেছন  তাকায় 


ঘুম ভাঙ্গে, একটু  হাঁটে, ছায়ার শোকে
সরোবরহীন পথ যেন মরুভূমি  প্রান্তর


দিন -রাত সমান, চোখের  সামনে অন্ধকার 
পথ- ঘাট শুনশান ;খুঁজে  চলে ছায়া

আকাশ হাঁটে, বন্ধু বলে; পরিমাণ  মতো 
জ্যোৎস্নার আগুন আলোয়; মাঝে  মধ্যে  পায়

হাঁটছে  পথ, হাঁটছে  আকাশ  ;দিন- রাত্রির  কোলে 
কচ্ছপ  হেঁটে  হেঁটে, ঘুমজলে কয়েকটি  ভোর 

পৃথিবী  ঘুমে অচেতন শরীরে আঁকা জলে
মৃত্যুর  সন্ধি ;শেষ  ইচ্ছেতে মূল  পরাধীন 


হাসি ঠাট্টার  শেষ  অনুরাগ ; কাহিনীর ইতিহাস 
সানাই বাজে, পরিহাস  প্রিয় কচ্ছপ স্বাধীন । 








১৮.
মহামারি রূপে  


অন্তরে ভালোবাসা
   মন পেরিয়ে
 সঙ্গী আলিঙ্গনে। 

শরীর থেকে অভিন্নত্ব
    মানব মনের
   সরল হৃদয়ে। 

নামীদামী দেশ পরিচয় 
      হাতে-হাত 
   রেখে যায় দাগ। 

শরীরে মারণ বাসা 
    ছিঁড়ে দেয় 
  শিরা- উপশিরা। 


   অজ্ঞতা আর  মূর্খতা
     কাটে হাসপাতাল 
    চোখেও  ঝাপসা। 

ভয়ের নিশানা উড়িয়ে 
    দিগ্বিদিক রথে
   মৃত্যুর কাহিনী পর্ব। 

শুধু বাতাসে ভেসে
 হৃদয় ঘেঁটে
মহামারিরূপে। 

শবের গাড়িতে চড়ে
  চুম্বনে ছড়িয়ে
 মায়াবী জাল। 

দিশাহীন গৃহবন্দী
  ভয়ে ভয়ে রাখা
ভবিষ্যৎ ইতিহাস।   


শেষ  পর্বের লিংক 
  দূরত্ব  রেখে 
এক...দুই.. তিন...।



১৯.
ধারণা 


জন্মাবার  আগে কিংবা  পরে
পূর্ব পুরুষদের মুখে  শুনিনি 
কিংবা  দেখিনি 
চারপাশের কালচে  আগুন 

দিন-রাত  পুড়ে  অতীত , বর্তমান , ভবিষ্যৎ 
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ  অনুমতির 
নিজের দুয়ারেও তোমাকে স্পর্শ  করবো  না 

তলায়  তলায় , আমি তলিয়ে  যাচ্ছি
কেউ নেই কাছাকাছি 
তবুও  মৃত্যুভয় 

মৃত্যুর  সময়ও,  তুমি দূরে  দূরে  যাও
আমার হাত ছাড়লেও তুমি
কোটি  কোটি  হাতের স্পর্শ  নেবে 

আমার ধারণা  থেকে  জন্ম নেবে
একমুহূর্তে  বিশ্বাসের পৃথিবী

২০.
 শক্তি 


নিজের কর্তৃত্ব কেবল পরিস্ফুটনে মগ্ন
আকাশের চাঁদ  যেন তোমার  হাতে হাতে
কতগুলো  পথের  সূত্র অজানা, তবুও জানা
প্রতিটি মেঘের গহ্বর নীল তেপান্তরের সাথে। 

তোমার নির্দেশ  আদালত  ভুলে যায় সমস্ত  শক্তি 
তোমার শক্তিতে মানুষের  ঠাঁই  আজ জেলঘরে
তোমার পায়ের কাছে অগনিত মৃত্যুর  স্রোত ধারা
লুকানো সংখ্যা চোখে মুখে কান্না ভাসে নগর প্রান্তরে। 

সমস্ত রাত্রি নিঃশেষে ঢেকে যায় অবাধ ভাবে
তোমার আনন্দ তখন  জমা খরচের  মাথাতে
দেবতা তুমি, রক্ত শুষে খাও মানুষ  থেকে  মানুষের 
ভেতরে তাকিয়ে  সবাই, চরাচর শূন্যতাবোধে। 


তোমার শক্তির পরিধি, দেখেছে এই নিরন্ন দেশ
নতুন আলোতে হাত মেলায়  নিশ্চল পরিবেশ। 


২১.
বিদ্যালয়ের  চায়ের বাগান 


আমার বিদ্যালয়ে দার্জিলিঙের  চায়ের বাগান  বসিয়ে
সমস্ত গ্রামের থেকে  আসা  মানুষের  কোলাহল 
আনন্দে  গান ধরে ছোটো ছোটো  ছেলেমেয়েরা 

যে কোনো  দিন গ্রাম ঘেরা বিদ্যালয়ে 
আনন্দ সমাগমে চা শ্রমিক  হয়ে
একদিন চা পাতা তুলতে  থাকবে... তুলতে থাকবে

সারি সারি ছেলে - মেয়েরা  দাঁড়িয়ে  পড়বে
বিদ্যালয়ের  ক্লাসের বেল পড়ার সাথে সাথে গ্রাম সড়ক ধরে

হলদি  নদী জলজ চুড়িদার পরে
তেরপেখ্যা থেকে  আমার বিদ্যালয়ে  চা বাগানের  দৃশ্য পট দেখবে
শিক্ষকগণ চা শ্রমিক  সেজে
চা পাতা নিয়ে যায় ঘরে

পুকুরের  মাছ জলে ভেসে 
জল গহনা পরে
পুরনো  ফুলের  বাগানে  নানান ফুলের  বাহার

খেলার মাঠে গজিয়ে  উঠে  কচি কচি সবুজ ঘাস
সবার থেকে  বেরিয়ে  আসা
শীতার্ত  সন্ধ্যায় আবছা কুয়াশায় ঢেকে যায়
অনন্য মায়াবী জালে 
আমার বিদ্যালয়।



২২.
কবিতা  কেন লিখি




কবিতা  লিখি 
তা কেন লিখি?
এই প্রশ্ন  প্রতিক্ষনে মনে পড়ে
আমার শৈশব , কৈশোর  খুঁজে বেড়াই 
শুধু  আমার কবতায়
মায়ের আঁচলের  দাগ 
এখনো  আমার মনে

আমাকে মনে করায়
ভালোবাসা , সমাজনীতি , রাজনীতি আর প্রেমের  বাস্তবতা 
যে মেয়েটি  ধর্ষিতা , শত ছিন্নভিন্ন  শরীরে  শুয়ে
তার কথা লিখি
আমার কবিতা প্রতিবাদী  হয়ে  উঠে তখন 
যখন  সমাজে অন্যায়ের  ছবি ফুটে ওঠে 
আমি যখন  একা থাকি 
কবিতা  আমার প্রিয়তমা  হয়

আমার দারিদ্র্য, আমার যৌবনের  স্মৃতি 
লিখে  যায় যৌবনের  অসহায় দিনগুলো 

আমি লিখে  যাই 
আমার ভালোলাগা আর ভালোবাসার কথা।


২৩.
বিশ্বাস  কর


তুই বিশ্বাস  কর মনে পড়ে নানা কারণে 
আমার হাতের মুঠোয়  শূন্যতার ঝুলি
তোর চোখে নব নক্ষত্রের  আলো জ্বলে
আপাদমস্তক  প্রেমের  শৈলীতে

যেন আমার  জীবনে  এখুনি  নেমে আসবে শেষ  ভূমিকম্প 
আমার দু'চোখে  চিরকাল  বিষণ্ণ   শবের সমাধি 

হঠাৎ  তোর নরম  শরীরে উইপোকার  মতো  ছড়িয়ে করোনা 
পবিত্র পাথরের  মতো নিশ্চুপ  ভালোবাসা 

তুই বিশ্বাস কর 
একমাত্র  উপায়  আমার প্রার্থনা 
তবুও  যেন আমার চেয়ে সুখী  লোকের  মতো  হেঁটে  যেতে পারিস। 


২৪.
দুঃসময়


কতগুলো  সিঁড়ি  ভেঙে, গ্রাম, বাংলা  পথ
ব্যাকরণ  কোলাজে, বর্ণ, শব্দময় 
নদী ডাকে প্লুতস্বরে, জোয়ার  -ভাটায়
পাখিরা  অসময়ে স্বরবৃত্তের সুর করে অবরোধ 
মানুষের  হাহাকার ছন্দহীন মিলে 
দুঃসময়  কারা যেন খায় শুধু  গিলে।

২৫.
নিশানা

মুখের থেকে  গলা, গলা থেকে ফুসফুস 
কতগুলো  বর্ণের রূপে 
তাপমাত্রায় পুড়ে যায় শরীর 
নাকের থেকে  ঝরে পড়ে মোম
সারা পাকস্থলীতে  যন্ত্রণার শব্দ 
নিজের অজান্তে  ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র  অনু -পরমানু 
ছড়িয়ে  দিচ্ছি দৃশ্যহীন ভাবে 

মেরুদণ্ডহীন হয়ে থাবা বসায়
বিশ্রী ভাবে

অগনিত  মানুষের  নিশানায়।

২৬.
-অভয়াশ্রমে 


আমি চেয়ে থাকি নিঃসঙ্গ দ্বীপে
কান্নার সমুদ্রে  ভেসে চলেছি
একটা উদ্দ্যেশ্য পথে
এক নৌকায়  চেপে 

সমুদ্র  শেষে  বাইচ টেনে  টেনে  
নদীর  প্রান্ত ধরে 
দু'পাশে ঘন জঙ্গল 

সূর্য  কিংবা  চাঁদের  আলোতে আঁধার  থাকে 
আমি  চলেছি  নৌকায়  চেপে 
নৌকার  একপাশে  আমি, অন্য পাশে কলম

লিখে  চলেছি সুন্দরবন, জঙ্গল , মানুষ- ভয়
বৈকালিক  ছায়ায় কলমটা  ভোঁতা  হয়

আমি অবাক  দৃষ্টিতে 
প্রকৃতির  রূপ-লাবণ্যে 
অসহায়  বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রমে।



২৭.

মায়াবীবর্ষণ  


কয়েকটি বুকের পাথর সরিয়ে
ভরা দুপুর কিংবা মাঝ রাতে
শব্দ শব্দ খেলি
গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে

পথ পরিক্রমা বন্ধ
স্তব্ধ চরাচর
কেঁপে ওঠে প্রতিটি শরীরী প্রত্যয়

যুদ্ধের মুখোমুখি
সন্ত্রাস মুখর পরিবেশ
শুধু আড়ালে থেকে...  

যুদ্ধ চলছে -
মৃত্যুর পর্বত 
সামনে পেছনে, ডানে - বামে
মায়াবী ধারাবর্ষণ।



২৮.

ত্রুটি

কবির কবিতা
কবিতার আলোচনা
এনিয়ে বিস্ময় আনে    

কবিতার প্রথমভাগেই মলত্যাগ করি
নিয়মিত ব্যাকরণ ভেঙে পড়ে
যতি চিহ্নের অজস্র ত্রুটির কারণে

তখন আমি  আমার নিজের বুকে ঘুষি মারি
সমস্ত অপরাধ মাথা পেতে নিই
নিজেই নিজের পাপের ভাগিদার হই

কিন্তু যখন বিশিষ্ট কবি বলে প্রচারমুখি   
ঠিক তখনই তাঁদের কবিতায়
যতি এবং অর্ধযতি শূন্য ঘরে

তখনই আমি ত্রুটি মুক্ত
আকাশের অনুকরণে।      
   
                 
         
                       
             


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন