উন্মুক্ত কবিতাগুচ্ছ —৫
সুকুমার রুজ-এর পাঁচটি কবিতা
১.
সুতো
স্টেথোস্কোপের নল বরাবর এগিয়ে যাও
চোখ বানভাসি হলে দেখতে পাবে তোমার বাসস্থান
অন্যমনস্ক হওয়ার জন্য আশপাশে তাকালেই
দেখতে পাবে আঙুলে সূঁচ ফোটানোর রক্তের দাগ
বিধাতা ভালো সেলাই করতে পারেন...
দেখবে, কী সুন্দর ভাবে সম্পর্কটাকে জুড়ে দিয়েছেন
সুতো খুঁজতে যেও না
এ সুতোয় শুধুমাত্র সম্পর্ক জোড়া যায়
একে বলে মায়ের সুতো।
২.
স্মৃতির হ্যান্ডনোট
তোমার হৃদয়ের ওয়ালেট থেকে চুরি করা
আবেগ খুচরো করে নিই...
আমার মানি-পার্সে ছোটবড় নানা অনুভূতি।
উদ্বেগ দিয়ে অনায়াসে কিনি টকঝাল নয়নসুখ,
হাতে-গরম স্পর্শসুখ পেতে বিহ্বলতা দিই,
স্বর্গীয় সুখ পেতে বের করি কড়কড়ে উচ্ছ্বলতা।
তাই সবসময় থাকি উন্মুখ,
কখন তোমার ওয়ালেটখানা
রেখে যাবে আমার মুগ্ধতার ছায়ায়!
একদিন মুগ্ধতা নিঃশেষ...
তোমার হৃদয় আমার নাগালের বাইরে,
তখন আমার হৃদয়-বাক্সে জমিয়ে রাখা
রাশি রাশি স্মৃতির হ্যান্ডনোট ভাঙাই,
প্রাপ্তি কোকিলের বিরহ,
প্যাঁচার বিষাদ আর ঘুঘুর নিঃসঙ্গতা।
সে বিরহ বিনিময়ে অবসাদ, বিষাদ দিয়ে হতাশা,
মানিব্যাগ খালি করে নিঃসঙ্গতা ঢেলে দিতেই
শরীর-মনে অসীম শূন্যতা...
৩.
শীতল উপত্যকায়
জীবনের মলাট ঘন ঘন রঙ পাল্টায়...
প্রাচুর্যের বুকে মাথা রেখে
অহংকার শুয়ে থাকে,
আত্মতুষ্টির কার্নিশে সুখপাখি হেসে দোল খায়...
ক্রমশ পরম্পরার ধুলো জমে পরতে পরত,
উজ্জ্বল রঙও ধূসর
ছায়ার ভেতরে ছায়া আরও গাঢ়তর
ধীরে ধীরে কাছে আসে নীলধ্বজা আগুনের রথ
সে আগুনে পোড়ে অহংকার...
গলে যায় গর্বিত দেহের তালুক,
বুকের ডোবায় ফুটে থাকা আকাঙ্ক্ষা-শালুক
হেসেখেলে পুড়ে ছারখার
নদীর কলধ্বনি নিকটবর্তী হয় তড়িঘড়ি,
বাতাসে ভাসে নশ্বরতার গন্ধ...
তখন প্রাণপণ খুঁজতে থাকা তালাবন্ধ
অতুল সঞ্চয় থেকে শেষ পারানির কড়ি
দীর্ঘশ্বাসের ঝড় অচিন্ত্যপুরের বিচিত্র মোহনায়...
নাভিপদ্মে বাসনার বাসা এলোমেলো,
চার্বাক দর্শনও হয়ে যায় খেলো
নির্বাণ আদি সপ্তরথী ফাটল ধরায় ভিতর প্রতিমায়
অনন্তে হাত বাড়িয়ে কড়ি খুঁজে যাওয়া শাশ্বত অসুখে
স্থাবর অস্থাবর অচল সঞ্চয়...
নেই কণামাত্র অমৃতনিচয়
যা আলোপাখি হয়ে উড়ে যাবে অসীমের বুকে
চেনা অবয়বগুলো অচিনপুরের দিকে যায়...
তখন প্রার্থনা নামগান শুধু
চোখেতে তুলসীপাতা, জিহ্বাগ্রে মধু
নতুন প্রজন্মপথ ধরে জীবন হাঁটে শীতল উপত্যকায়
৪.
প্রজাপতি হয়ে যাই
যেহেতু আমি নিজের পিঠ নিজে চুলকোতে পারি না,
তাই সুযোগ পেলেই পরের পিঠ চুলকে দিই...
আমার এ বদ-অভ্যেস বড় বালাই!
সেই সুযোগে কেউ কেউ আমাকে দিয়ে চুলকিয়ে নেয়
তার ময়লা-জমা কর্কশ পশ্চাদদেশ,
আমাকে প্ররোচিত করে আমার পিঠ পেতে দিতে।
তখন খুব চাপে পড়ে যাই।
আমি ভয়ে ভয়ে তার হাত দেখি, আঙুল দেখি,
নখে ময়লা আছে কিনা ভালো করে দেখতে চেষ্টা করি।
একসময় আমি প্রজাপতি হয়ে যাই,
যে মুহূর্তে আবিষ্কার করি, পিঠ চুলকানোর নামে
ও আমার শরীরে ক্ষত করতে চায় তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে।
তখন আমার কবি-জীবনকে ভাসিয়ে দিই
অনাবিল সকালের খোলা হাওয়ায়...।
৫.
পতনশীলা পাতার কথা
পথের পাশে পতনশীলা পাতার ভাষা বুঝবে ক'জন!
স্বল্প আগেই সবুজ শাখায় সুর মিলিয়ে ছিলাম স্বজন।
রাজার ছেলে রাজার মেয়ে রঙবাহারি রঙ্গ বিলায়,
ভুলভুলিয়ার ভুলে ভরা ভ্রমণ সেরে আবার মিলায়।
লালপরিরা লাট খেতে চায় লক্কা যেন এক লহমায়,
গহীন গোপন গিরিখাতে গুল্ম লতার ফুল-আঙিনায়।
রূপকথা সুখ রূপ হারিয়ে রঙচটা সেই রাতকথা হয়,
সুচসুতোরা সাদা সুতোয় সেলাই করে সাতরঙা ভয়।
হঠাৎ দেখি, হাসতে থাকা হিমেল হাওয়া হৃদয় কাঁপায়...
মায়ার আলোয় মাছরাঙা মুখ ঠোঁট বাগিয়ে মঞ্চে ঝাঁপায়।
মনে মনে মৃত্যু গুনি, মৃত্তিকাদূত ফুঁকছে শিঙা...
সপ্তসাগর সাঁতার কেটে সৈকতে যায় সপ্তডিঙা।
মোমবাতিহীন মৌনমিছিল মন্দগতি মিলনরাতে,
বিন্দু বিন্দু বিষাদবাতি বিস্তারিত বিষছোঁয়াতে।
চঞ্চল হই, চমকে উঠি, চাতকপাখির হা-পিত্যেশ...
দুখজাগানি দুঃখবিলাস দিনদুপুরের দিঙনির্দেশ।
কানন ভাবে, এসব কেবল কথার কথা, কান দিতে নেই।
রিক্ত কানন পূর্ণ হওয়ার সূত্র আছে শূন্যতাতেই।
ভিজতে ভিজতে ভেতর ভবন ভরতে থাকে মৃত্যুভয়ে...
মাটির বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকি মন্দ লয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন